“অনল অন্তরাল” – পর্দার ওপারের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল…

শেখর স্যারের সাথে পরিচয় আসলে ঝাড়গ্রামের সূত্রে৷ তখন মাস্টার্স করছি ওখানে। স্যারের লেখাপত্র পড়েছি কিন্তু জানতাম না উনি আমার কলেজেরই অধ্যাপক। তারপর আমার ঘোরাঘুরির জন্য বিভিন্ন সময় পরামর্শ নিতে হয়েছে।

শারদীয়া আনন্দবাজার ১৪২৭ এ উপন্যাস তালিকায় শেখর মুখোপাধ্যায় নামটা দেখে তাই অপেক্ষা করতে পারিনি। হাতে পাওয়া মাত্রই শুরু করে দিই। বেশ বড়ো উপন্যাস এবং খুব সহজ নয় আবার! তার সবচেয়ে বড়ো কারণ চরিত্রের ভিড়…! অনেক কিছুই জীবনে অপাঠ্য আমার, তবুও বলতে দ্বিধা নেই যে এই কাহিনীতে ঘটনার ঘনঘটা আর চরিত্রের প্রাচুর্য আমি আর কোনো উপন্যাসে পড়িনি৷ তাও প্রথম থেকে একদম শেষ পর্যন্ত অদ্ভুৎ মাদকতায় আমি পড়েছি। রাত জেগে পড়েছি, পড়ে ঘুমিয়েছি আবার উঠে পড়েছি। এরকম তিনবার নিয়ে বসতে হয়েছে! আর শেষ দিকে তো প্রবল টান, যেনো ভাঁটার টান। অনেক কথা বললাম, উপন্যাসের নামটা বলা হয়নি, — “অনল অন্তরাল”! সভ্যতা কালক্রমে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু সমাজ – সভ্যতার পর্দা ক্রমশ পিছিয়ে গিয়েছে…. অতলস্পর্শী যে সে! সূর্যাস্তের পরে যেমন অন্ধকার নেমে আসে, রাঙা আলোর ওপারের গল্প অজানা! সেরকমই পর্দাপতিত হলেই নেমে আসে আঁধার! অজানা থেকে যায় ওপারের ঘটনাপ্রবাহ! লেখকের কলমে উঠে আসে যবনিকার পেছনে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা, কালের নিয়মে একদিন যা এগিয়ে নিয়ে এসেছে আমাদের আর নিজেরা রয়ে গিয়েছে পেছনে!

কাল বললে আবার সাল-তারিখ বলতে হয়। তবে এ উপন্যাসের কাহিনী আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগের এবং এখনও হয়তো প্রবাহমান! পড়তে যখন শুরু করেছিলাম তখন এর বিশালতা বুঝতে পারিনি, কি হতে চলেছে আন্দাজ করতে পারিনি৷

একজন সাড়া ফেলেদেওয়া, মরণাপন্ন লেখকের বহুদিনের গবেষণার উপন্যাস সমাপ্ত করার ডাক পড়ে অমিতজ্যোতি নামের এক নবাগতর কাছে…. শয্যাশায়ী রেবন্ত রায় তাকে সবকিছু হস্তগত করেন! এরপর এই কাঁচা লেখকের উপন্যাস যাত্রা শুরু হয়। উপন্যাসের শুরুয়াত যে সময় দিয়ে সেটা ১৭৩২ সাল! এবার ল্যাপটপে উপন্যাসের গল্প টাইপিং এর মাধ্যমে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে চলতে থাকে পুরো গল্প!
ক্ষমা করবেন, এর চেয়ে বেশি কিছু বলা অসম্ভব।
আসলে গল্পটা একটা বহু দিন আগের এক সম্পর্কের সূত্র খোঁজা!
তবে গোটা কাহিনীতে সে কালের কোন দিকটা তুলে ধরেননি লেখক, আমি সেটা ভাবছি! কত রকমের গান হতো, সে সবও উল্লেখ আছে। হরু ঠাকুর এর নাম আছে! বললাম তো কে নেই এখানে…!
তার সাথে আছে জটিল থেকে জটিলতর সম্পর্কের বুনোট যা মানে না দেশ কালের বেড়াজাল। সতীদাহ থেকে শুরু করে বিধবা বিবাহ – কি নেই সেখানে? এরকম বাস্তব প্রেক্ষাপটের গল্প! যেদিকেই যাই চেনা চেনা গন্ধ! পারাং নদী? সেও চেনা! শোভাবাজার রাজবাড়ি? সেও চিনি! আসলে ইতিহাস টুকরো টুকরো! তারই বা দোষ কোথায়? যে যার গুছিয়ে নিয়ে বাকি ফেলে রেখে দিয়েছে, সেই তো ইতিহাস, সেই তো হেরিটেজ!
নবাব আলিবর্দি থেকে শুরু করে হেস্টিংস – ক্যানিং কে নেই? রবার্ট ক্লাইভ! ডিরোজিও — সব্বাই! নাম নিতে গেলে এ লেখা উপন্যাসের এক তৃতীয়াংশ হয়ে যেতে পারে! নতুন করে অনেক কিছু জেনেছি! কিছুদিন আগে গৌতম ভট্টাচার্যের “বারপুজো” পড়ে বলেছিলাম যে এই বইটাকে কোলকাতার লোকজন আপন করে নেবে, এক্ষেত্রেও তাই! পুরনো কলকাতার আরো একটা দলিল হয়ে থাকবে হয়তো। যেমন জেনেছি ছড়াগুলোর মানে! “গোবিন্দরামের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, নকু ধরের কড়ি, মথুর সেনের বাড়ি!” সেরকমই জেনেছি কিভাবে মেদিনীপুর আলিবর্দি খাঁ এর সাথে জড়িত! জেনেছি নবকৃষ্ণ দেবের রাজা হওয়ার গল্প, জেনেছি বহুবাজার থেকে বউবাজারের গল্প! শোভাবাজার রাজবাড়িতে বলি বন্ধ হওয়ার গল্প!আরও অনেক কিছুই! বলে হয়তো শেষ করা যাবে না। গল্প জেনে গেলেও তথ্য জানতে বইটা আবার পড়া যেতে পারে!

সবচেয়ে ভালো লাগার কারণ, গল্পের স্টাইল! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ি, পড়ার পর বুঝতে পারি – সবটাই লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত, শুধু টুকরো টুকরো ইতিহাসটুকু সত্যি। এক্ষেত্রে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে যতটা বলা হয়েছে, ততটার কতটা সত্য সে আমি জানি না, তবে ইতিহাসের এতো চরিত্রের ভিড়ে, এতো গল্পের ভিড়েও এক অদ্ভুৎ নেশার ঘোরে চুবিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে “অনল অন্তরাল”! এত সব ঘটনার মাঝে একবারও বিরক্ত লাগেনি! আসলে এভাবে ইতিহাস পড়ার সৌভাগ্য হয়নি৷ আমাদের আনাচে কানাচের গলিপথে যদি এতো অচেনা অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে, তার আস্বাদ নিতে কার না ভালো লাগে? অন্তত যেখানে পরীক্ষা দেওয়ার মতো যাতনা থাকে না….!

কতগুলো জিনিসের জন্যে আমি কুর্নিশ জানাবো ঔপন্যাসিককে….
এক, তিনি পুরো বছর আড়াইশোর ঘটনাকে টুকরো টুকরো ইতিহাস দিয়ে দারুন কোলাজ বানিয়েছেন, মাঝে মাঝে নিয়ে এসেছেন আজকের দিনে!

দুই, এমন কাহিনী লিখতে গেলে কতটা অধ্যবসায় প্রয়োজন হয়, তা গল্পের পরতে পরতে যে কোনো পাঠক অনুভব করতে পারবেন!

তিন, গল্প একটা নির্দিষ্ট ক্রোনোলজি কে ফলো করে গেলেও তার দেওয়া তিনটি বংশপুঁজি না দিলে পাঠকের কালঘাম ছুটে যেতো, অবশ্য এই উপন্যাসের পাঠকদেরও কম পরিশ্রম করতে হবে বলে মনে হয় না। এই দিক থেকে পুরোমাত্রাই জড়িয়ে রাখতে সক্ষম…. যে যত বেশি জড়াবে সে তত পিছনে তাকাবে।

চার, শিল্পী অমিতাভ চন্দ্রের অলংকরণ! এমন চমৎকার অলংকরণ বারংবার মনে করিয়ে দেয় পাঠক ভুলে গেলেও! তবে আরও দু তিনখানা তুলির টান থাকলে দারুন লাগতো।

আমাদের চেনা পরিধির মধ্যেও এমন অনেক হয়তো গল্প রয়েছে যা আবহমান কাল ধরেই পর্দার ওপারে…..! অবশ্য এমন পর্দা ফাঁসে অদম্য ইচ্ছে লাগে…. অবশ্য সূত্রও লাগে তার জন্যে….! আবার সে অনলে দগ্ধ হওয়ার ভয় থাকলেও চলে না। “অনল অন্তরাল”, প্রায় তিন শতকের একটা শহরের বিস্মৃত ইতিহাসের জীবন্ত একখণ্ড দলিল হয়ে বেঁচে থাকুক বাঙালির হৃদয়ে….একজন ক্ষুদ্র পাঠক হিসেবে এই কামনা করি! প্রণাম জানাই স্যারকে…. তার অধ্যবসায়কে নতমস্তকে আবারও কুর্নিশ! তবে এবার হয়তো শালধোয়ানিয়ার জন্য অসংখ্য রেবন্ত রায় গজাবে, আর আপনাকে তাগাদা দেবে! যাই হোক্ আপাতত মলাটবন্দী অবস্থায় চাই এই উপন্যাসকে!

তবে এ উপন্যাস পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে জনৈক কবির উক্তিটি – ”যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন..!”অবশ্য এরকম মনে হওয়ার কারণ অজানা।

পুনশ্চঃ সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কথা বলেছেন। এই মানুষটির সাথে মনে হয় মন্দিরময় পাথরার যোগসূত্র আছে।

© শুভঙ্কর দত্ত || August 25, 2020

নগরকীর্তন – বাঁচার অধিকার ওদেরও…

সিনেমাটা কেন দেখতে চান?
‘নগরকীর্তন’ এর দুটো টিকিট চাইতেই টিকিট কাউন্টার থেকে ইন্টারভিউসম প্রশ্ন ধেয়ে এলো….
বাংলাসহ সারাভারতে আলোড়ন করা বিশেষ এই সিনেমা দেখতে চাওয়া দুই বন্ধুকে এক বৃদ্ধের এই প্রশ্ন।

বললাম – ‘কৌশিক গাঙ্গুলি আমার প্রিয় পরিচালক…..! একটু ইয়ার্কি মেরেই বললাম, বাকিটা দেখে এসে বলি…!
ভদ্রলোক হাসলেন।
বললেন শুধুই এই কারণ….?

বললাম — না আসলে ঋদ্ধি কেও ভালো লাগে, সেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ থেকেই ফ্যান!
বললেন — ‘কৌশিক গাঙ্গুলি প্রিয় পরিচালক, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হয় উনি নিজেকে ঋতুপর্ণর জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন!’

টিকিট কাটা হলো৷
আসলে একটা পরীক্ষা পড়েছিলো কলকাতায়, দুই বন্ধু মিলে ট্রেনে আসতে আসতেই একটা প্ল্যান মাথাচাড়া দেয়, আর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ১ কিমি দূরত্বে সিনেমাহলে ‘নগরকীর্তন’ চলছে। সুরজিৎ বললো – ‘এ সুযোগ হাতছাড়া করলে অ্যাচিভমেন্ট বলে কিছু থাকবে…?’ এরকম গোছেরই কিছু। অতএব, চলো, এগিয়ে যাওয়া যাক্। ব্যস্ ‘মিত্রা’ দাঁড়িয়ে আছে!

টিকিট তো কাটলাম, দেড় ঘন্টা বাকি এখনো। এদিক ওদিক ঘুরছি, কিন্তু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সিনেমাটা দেখতেই হবে, অতিশয় আগ্রহকে সঙ্গী করে।

——————————————————————
সিনেমা শুরুর আগে কিছু কথা উঠলো।
এই গল্প সেইসব প্রেমের গল্প, যে গুলো আর পাঁচটা প্রেমের মতো নয়।
ভেসে উঠলো Tributed To…. কে হতে পারে? আরে, নান্ আদার দ্যান ঋতুপর্ণ ঘোষ…!
ছবির নীচে ইটালিক্সে লেখা
“পরজনমে হইও রাধা….”
বুঝতে বাকি রইলো না। সদ্য ‘সমান্তরাল’ দেখেছি৷ কৌশিক গাঙ্গুলিও আগে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বানিয়েছিলেন, মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ৷ তবে কৌশিক গাঙ্গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। সত্যিই তো সিনেমাটা কেন দেখতে যাবো?
‘ছোটোদের ছবি’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘শব্দ’ কেন দেখতে গিয়েছিলাম বা কেন দেখেছি?
কারণ উনি অন্যদের কথা বলেন, অন্যকিছু বলেন, সবাই যেটাকে নিয়ে ভাবেন না, যাদের নিয়ে ভাবেন না, উনি তাদের কথা তুলেই ধরেন। তাই…….! এটা অবশ্য বৃদ্ধকে বলা হয়নি৷

পরিমল-পরি-পুঁটি (ঋদ্ধি সেন) এই গল্প একদিকে চলতে থাকে, আর একদিকে….পুঁটির প্রেম চলতে থাকে, প্রেমিকের ওপর ভরসা করে চলতে থাকে জলে থেকে কুমীরের সাথে লড়াই করার অব্যহতির খোঁজ। শৈশব থেকে মনের মধ্যে পুষতে থাকা নারীত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আবদার — “শরীরে ভুল আছে মধুদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী) , শুধরে নিতে হবে….!”
সমান্তরালভাবে দুটো গল্প বলায় একটুও বোরিং লাগেনি, ততটাই সাবলীল লাগলো শুভজিৎ সিংহের কাঁচি চালালনোটা, অবশ্য আগেও ‘ছায়া ও ছবি’, ‘মাছের ঝোল’, ‘বিসর্জন’, ‘শব্দ কল্প দ্রুম’ এর মতো সিনেমাগুলিতে একই কাজ করেছেন।

বহুদিন আগে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ পড়েছিলাম, বেশ লেগেছিলো, সিনেমাটা দেখতে দেখতে বেশ ওটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যদিও সেখানে গল্প ভিন্ন। তবে সেই উপন্যাসের একজনের উল্লেখ ছিলো বারবার, সিনেমাতে দেখি স্বমহিমায় তিনি উপস্থিত – মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালকের মুন্সীয়ানা চোখে পড়লো, সোমানাথ থেকে মানসী হওয়ার লড়াই – গল্প সবকিছু বলিয়ে নিলেন তার মুখ দিয়ে, শুধু তাই নয়, বলিয়ে নিলেন – শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণভাবে মজে যাওয়ার ঘটনাটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার ফলে সিনেম্যাটিক ভ্যালু বেড়ে যায় বলেই মনে হয়৷

সিনেমার দৃশ্যপট এতো বাস্তব যে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়েও এই সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও বারবার মনে হচ্ছিলো এটা বোধ হয় খুব সহজ একটা ঘটনা৷ মধুদের পৈতৃক বাড়ি – নবদ্বীপ, যেখানে চিত্রনাট্য পৌঁছানোর পর থেকেই একটা ক্ষীণ উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হতে বাধ্য দর্শকদের মনে, যেটা তীব্র হয়, যখন দোলপূর্ণিমার আসরে মধু বাঁশি বাজায়, আর পুরুষরূপী নারীমনের পুঁটির আসল রূপ আচমকাই প্রকাশিত হয়ে যায়।

এরপরও আরো ঘটনা……! ঘটতেই থাকে….! শেষ আধ ঘন্টা দর্শকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দিতে বাধ্য, ভাবাতে বাধ্য। সিটে আরাম করে বসে থাকা ঘুচিয়ে দিতে সফল এই সিনেমা। ওয়াটসআপ-ফেসবুকের মাধ্যমে কিভাবে কোনো ঘটনা ভাইরাল করা যায় তা দেখাতেও ছাড়লেন না। ‘নগরকীর্তন’ নামটা বেশ ব্যঞ্জনধর্মী বলেই মনে হলো, নগর বা সমাজে চলতে থাকা অহরহ ঘটনাপ্রবাহগুলোকেই বলা হচ্ছে এখানে।
ঋদ্ধি সেন কেন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, তার সদুত্তর মিলবেই, কস্টিউম-মেক আপের সাথে যেভাবে পরতে পরতে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন, অসাধারণ….! (তাই দুটো জাতীয় পুরস্কার কস্টিউম আর মেকআপে, নগরকীর্তনের ঝুলিতেই) সাথে আবার ঋত্বিক থাকলে তো পাশের লোককে ভালো অ্যাক্টিং করতেই হবে….! আর্ট ডিরেকশন প্রশংসনীয়। কীর্তনের সাথে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঁশিকে, অনেক দুঃখের মাঝে একটা আনন্দের চোরাস্রোত বয়ে যায় দর্শকের অলিন্দ বেয়ে…..! সৌজন্যে – প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি….! ভালো লেগেছে সুজন মুখার্জি ওরফে নীলকে, মধুর বৌদির চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী যতক্ষণ ছিলেন ফাটিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যটা৷

মন ছুঁয়ে যায়, কীর্তনের মাধ্যমে বলা – “তুমি আমারই মতন জ্বলিও…” এই অকপট কথা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে….! রাধার প্রেমে মজে নিজেকেই রাধারাণী করতে উদ্যত।

সবশেষে বলতেই হয় কৌশিক গাঙ্গুলি আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন নিজেকে। অভিনয়ও করিয়ে নিলেন তাদের দিয়ে। ওনারা আশাবাদী এ সিনেমা দেখার পর মানুষজন তাদের হয়তো এতেটা অবজ্ঞা করবেন না। যাদের একঘর করে রাখে সমাজ, তিনি বারবার তাদের উপস্থাপিত করে গেছেন, বলে গেছেন সমাজকে পাল্টে নিতে ভাবধারা, কয়েকজনের বাঁচার মতো সমাজ কি আমারা গড়তে পারিনা, শ্রেনীশত্রু সৃষ্টি করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না…!
হলের টিকিট কাউন্টারের বৃদ্ধ মানুষটির দোষ খুঁজে পেলাম না বিশেষ, কারণ এ সিনেমা সবার জন্য নয়, কৌশিক গাঙ্গুলি বলেইছিলেন, এ সিনেমা রোজগারের জন্য বানানো নয়, এগুলো বানানোর পেছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো বোঝেননি….কবেই বা বুঝবেন।

কবেই বা বুঝবেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কেন আছেন এ সিনেমায়, কেন উৎসর্গ করার জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির নীচে লেখা

‘পর জনমে হইও রাধা…..’

© শুভঙ্কর দত্ত || February 25, 2019 

একটা কনভারশেসন কল এবং… কর্ণগড়

PANO_20171229_145823
প্যনোরমাতে কর্ণগড় মহামায় মন্দির

কথা ছিলো মকর সংক্রান্তিতে কর্ণগড়, দ্বিচক্রীকে বাহন করে যাওয়া হবে!
কথা ছিলো বেলপাহাড়ী ঘুরতে যাওয়া হবে! সঙ্গ এবং সময়ের অভাবে বেলপাহাড়ী সিল্করুট আপাতত বন্ধ! কিন্তু ১৪ ই জানুয়ারির কর্ণগড় ভ্রমণকে একটা কনভারশেসন কল মারফৎ এগিয়ে আনতে হলো! পার্টনার? – সেই বছর দুয়েক আগে যে দুজন জুটেছিল। সৌমেন আর ইমতিয়াজ।

 

dS photography20171230_060449
প্রবেশমুখ থেকে…

 

dS photography20171230_060600
দণ্ডেশ্বর ও খড়্গেশ্বর জীউ মন্দির, প্রবেশদ্বার থেকে

 

বাসে করে ভাদুতলা, তারপর বাকিটা কর্ণগড় গামী বা শিরোমণিগামী অটোতে চেপেছিলাম মনে নেই, তবে হালকার ওপর ফেন্সি করে ভিড় ছিলো, প্রথমে কোথায় পা রাখবো, তা নিয়ে বেশ ধন্দে ছিলাম। যাই হোক্, অটো চলতে শুরু করতেই বসার জায়গায় ঠিকঠাক সেঁটে গেলাম।

 

দু বছর পর মহামায়া মন্দিরে এসে “জুতো স্ট্যান্ড” চোখে পড়লো! বহু বহু স্ট্যান্ড দেখছি, জুতো স্ট্যান্ড, এই প্রথম!কে জানে, হয়তো শেষ বারও। বছর দুয়েক রংটা এমনই কৃত্রিম ছিল কিনা মনে নেই মন্দিরের, তবে প্রথম যখন এসেছিলাম মন্দিরের রংটার মধ্যে একটা প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ ছিল। সে যাই হোক্, দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরিয়েছিলাম, কারণ আমাদের সাফসুতরো লক্ষ্যই ছিল ঘোরা আর ছবি তোলা! ওখানে যখন নামছি ইণ্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম বললো দুটো ১৭। তারপর প্রায় দেড় – দু ঘন্টা জুড়ে দাপাদাপি চললো। ফটো শিকার! মকরে এলে ছবি তোলাটা হয়তো ফিকে হয়ে যেতো কিন্তু সেই মহাপ্রসাদ! সে তো প্রাণ জুড়িয়েদিয়েছিলো, সেটা মিস করলাম, স্বাভাবিক। দু ঘন্টার শেষটা কাটলো ঐ পুকুর পাড়ে, সঙ্গে আগের বারের ট্রিপগুলোর স্মৃতি রোমন্থন! বেশ কেটে গেলো। আসার সময়, অটোচালককে জিগ্গেস করতে জানা গেলো – ‘এতো শুধু মন্দির, যে রাস্তা দিয়ে আমরা আসছি, ঐ রাস্তা দিয়ে মন্দির পেরিয়ে গেলে কর্ণগড় এর বিস্তৃত এলাকা চোখে পড়বে, তবে তেমন কিছুই আর নেই!” সবই অঅন্তঃসারশূন্য। তারপর ঠাহর হলো – হ্যাঁ তো, কর্ণগড়, একটা কেমন যেন সমাসবদ্ধ পদ ঠেকছে! চলো তবে একটু হাতড়ানো শুরু হোক্। শুরু করলাম। ওমনি গুগল ঝপঝপ করে কাঙ্খিত দু’খান লিংক দিয়ে দিলো! পড়ে যা জানলাম, বলার চেষ্টা করছি মাত্র-

 

IMG_20171230_071845
Descending….

 

dS photography20171230_062032
অস্তগামী সূর্যের সামমে

 

কর্ণগড়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। ইন্দ্রকেতু নামে এক রাজা এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ইন্দ্রকেতুর ছেলে নরেন্দ্রকেতু মনোহরগড় স্থাপন করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। রণবীর সিংহ নামে এক লোধা সর্দারকে রাজ্য শাসনের ভার দেন তিনি। অপুত্রক রণবীর সিংহ অভয়া নামে এক মাঝির ছেলেকে পোষ্যপুত্র করে তাঁর হাতে রাজ্য শাসনের ভার অর্পণ করেন। তারপর বংশপরম্পরায় রাজ্য শাসন চলতে থাকে।

কর্ণগড়ের যাবতীয় আকর্ষণ এই মহামায়া মন্দিরকে কেন্দ্র করে। মন্দিরে মহামায়া ও দণ্ডেশ্বরের বিগ্রহ রয়েছে। উৎকল শিল্পরীতিতে তৈরি মন্দিরটিতে পঞ্চমুণ্ডির আসনও রয়েছে। কর্ণগড়ের নিসর্গও মনোরম। গাছগাছালি, নদী দিয়ে চারদিক ঘেরা। মেদিনীপুর শহর থেকে জায়গাটি খুব বেশি দূরেও নয়। তাই এক সময় এই এলাকাটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, রাস্তা তৈরি হবে, হবে পার্ক। এবার গিয়ে অবশ্য কিছু কেমন প্রস্তুতি চোখে পড়লো। রাস্তা সারাইয়ের কাজও চলছে।

রয়েছে বলতে শুধু মহামায়ার মন্দির। সংরক্ষণের অভাবে বাকি সব হারিয়ে গিয়েছে। বহু খুঁজেও দু-চারটে ইটের বেশি কিছু মিলবে না। চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত রানি শিরোমণির গড়ের এখন এমনই দশা। গড় অর্থাৎ দুর্গের আর অস্তিত্ব নেই। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় শেষ অপুত্রক রাজা অজিত সিংহের। তাঁর দুই রানি ছিলেন ভবানী ও শিরোমণি। রানি শিরোমণি ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনদের এককাট্টা করে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এই জন্য ইংরেজদের কোপে পড়েন রানি। তাঁকে বন্দিও করা হয়। নাড়াজোলের রাজা আনন্দলাল খানের মধ্যস্থতায় চরম সাজা না হলেও তাঁকে আবাসগড়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

কর্ণগড় ছাড়াও আরও দুটি গড় ছিল রাজবংশের , আবাসগড় ও জামদারগড়। মেদিনীপুর শহরের উত্তরে বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তায় পড়ে। সেখানেও কিছু নিদর্শন মেলে। কিন্তু সময়ের চোরাস্রোতে হারাতে বসেছে সেইসব ইতিহাসের সূত্র। ১৬৯৩ থেকে ১৭১১ সাল প‌র্যন্ত এই গড়ে রাজ করেছিলেন রাজা রাম সিংহ। পরে রানী শিরোমনি এবং নাড়াজোলের রাজা মোহনলাল খাঁ এই গড়ের উন্নয়ন করেছিলেন।

 

মেদিনীপুর শহর থেকে উত্তর দিকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কর্ন রাজবংশের রাজধানী ছিল, তার প্রমাণ আজও মেলে। প্রধান গড় ছিল কর্ণগড়। মেদিনীপুরের প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার ব্যস ধরলে  বিস্তৃত ছিল । এই গড়ের নিজস্ব চরিত্রটি অদ্ভুত। জঙ্গলমহলের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে জলস্রোত নদীর আকার ধারণ করে  ‌যেখান দিয়ে বয়ে ‌যেত সেটি গড়ের অন্দরমহল। নদীটি খুবই ছোট, নাম পারাং। গড়ের দু দিক দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে একসঙ্গে মিলিত হত পারাং নদী। অনেকটাই পরিখার মতো। এই গড়ের মধ্যেই ছিল, কুল দেবতাদের মন্দির অধিদেবতা দণ্ডেশ্বর এবং অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভগবতী মহামায়া।

তবে মহামায়ার মন্দিরটি এখনও অটুট রয়েছে যেখানে বসে কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য সাধনা করতেন। প্রচলিত রয়েছে, এখানে বসেই রামেশ্বর শিবায়ন কাব্য রচনা করেছিলেন। রামেশ্বরের কাব্যে কর্ণগড়ের উল্লেখও রয়েছে
‘যশোবন্ত সিংহ/ সর্বগুণযুত/ শ্রীযুত অজিত সিংহের তাত। মেদিনীপুরাধিপতি/ কর্ণগড়ে অবস্থিতি/ ভগবতী যাহার সাক্ষাৎ।’

তবে রাণী শিরোমণি স্মরণে মেদিনীপুর শহরেই গেস্ট হাউস আছে, এমনকি ভারতীয় রেল রাণী শিরোমনির স্মৃতির উদ্দেশ্যে আদ্রা-হাওড়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনও চালু করেছে! গেস্ট হাউসের কথা কেউ মনে রাখতে না পারলে এই ট্রেনটির কথা তো অনেকেই জানেন!

 

 

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কর্ণগড় একদিনের ট্রিপ হিসেবে দারুণ! যতবার যাই, অনেক অনেক ছবি কুড়িয়ে আনি আর মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়, উৎসবের সময় না গেলে ওখানের নিরিবিলি প্রকৃতির শোভা বেমালুম উপলব্ধি করা যায়, আর মকরে গেলে তো পায়েসসহ উত্তম প্রসাদ খাওয়ার সুযোগ রইলই!

dS photography20171230_062355
ঘরের মধ্যে ঘর
IMG_20171229_155020
ফ্রেম-এ-ক্যামেরা

 

পথনির্দেশিকা:: মেদিনীপুর/খড়গপুর থেকে বাঁকুড়া রোড ধরে ভাদুতলা, তারপর আর বলতে লাগবে কি! অটোওয়ালারা উপস্থিত মহামায়ার অধিষ্ঠানে হাজির করানোর জন্য।

তথ্যসূত্র::
 আনন্দবাজার পত্রিকা
 (http://archives.anandabazar.com/archive/1140102/2med4.html)

 

DSC_0654
চলো এবার, ফেরার পালা….

প্যারাসিটামল, ট্রাফিক জ্যাম আর দেওরিয়াতাল

দেবভূমিতে দুজনে (দ্বিতীয় কিস্তি)

২৭ শে মে, হরিদ্বার

ভোরে উঠে হোটেলেই স্নান সেরে নিলাম। ভূপিন্দরজী কে সময় দেওয়া হয়েছিলো সকাল ছটা! উনি আগের দিন রাতে ফোন করেছিলেন৷ যাই হোক্, বেরোতে বেরোতে হয়ে গেলো সাড়ে ছটা প্রায়। আমরা হরিদ্বার থেকে সারি যাওয়ার জন্যেই শুধু গাড়ি বুক করেছিলাম৷ ওনার হোমস্টে তে গিয়ে থাকবো। সেই সূত্রে উনিই আইডিয়া দিয়েছিলেন, সেটাতে শিলমোহর দিতে সময় নিইনি। এমনিতে লম্বা ট্যুর, তারপর ট্রেকের ব্যাপার আছে। সুতরাং, প্রথম থেকে একটু আরাম করেই যাওয়া যাক। সাথে যাওয়ার পথে দেবপ্রয়াগ, ধারী দেবী দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে। ইচ্ছে ছিলো, সেটাও ভূপিন্দরজী কে পেয়ে হয়েও গেলো। হর কি পৌরি পেরিয়ে গাড়ি ধরলো ৭ নং জাতীয় সড়ক যেটা একদম বদ্রীনাথ পৌঁছে দেবে। লোকজন গঙ্গাস্নানে মজেছে সকাল সকাল। মনে মনে বললাম, গঙ্গাস্নানটা তোলা রইলো, পরে হবে ক্ষণ। ডানদিকে গঙ্গাজী কে সাক্ষী রেখে গাড়ি ছুটছে। আমাদের একটা স্বভাব হচ্ছে ড্রাইভারদের সাথে অবিরাম গল্প করতে করতে যাওয়া৷ বেশ ভালো লাগে, জায়গাটা সম্পর্কে তৎক্ষনাৎ একটা ধারনা পাওয়া যায়। হৃষীকেশ পেরিয়ে চলেছে আমাদের বাহন, তপোবন – শিবপুরী পড়লো রাস্তায়৷  মাঝে মাঝে দেখলাম লোকজন rafting এর জন্যে মালপত্র নিয়ে নদীর দিকে নামছে, অনেকে করছেও।  কৌদিয়ালার কাছে নদীর পাড়ে বেশ কিছু লোকজন জমায়েত হয়েছে, জায়গাটা কি রকম সমুদ্রতটের মতো। এদিক সেদিক থেকে মুহুর্মুহু গাড়ি – বাইক পেরিয়ে চলেছে। প্রচুর মানুষ সারা ভারতবর্ষ থেকেই চার ধাম যাত্রায় সামিল হয়েছেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে পতাকা লাগানো বাইক বা গাড়ি মানেই পাঞ্জাবের। তবে বেশ কিছু লোকজন এই সব জায়গায় স্থান মাহাত্ম্য না বুঝেই চলে আসে, ভূপীন্দরজীর কথা অনুযায়ী হরিয়ানা বা দিল্লীর লোকজনকে তিনি তার হোমস্টেতে রাখেন না, কারণ তাদের অ্যাটিটিউড। সাম্প্রতিক কিছু ভাইরাল ভিডিওতেও আমি সে সব দেখেছি। ভূপীন্দরজীর সাথে গল্পতে বাঙালি পর্যটকদের প্রশংসা ঘুরে ফিরে আসছে। তার কথা অনুযায়ী বাঙালিরাই গোটা ভারতের লোককে ঘুরতে শেখালো আর এখন ভিড় বেশি বলে বাঙালিরা কম আসে, এড়িয়ে চলে।
এই করতে করতে হালকা খিদেও পেয়েছে, প্রাতঃরাশ করতে হবে। প্রায় দুঘন্টা অতিক্রান্ত। গাড়ি এসে থামলো শিব গঙ্গা হোটেলে। ঘুগনির মতো কিছু একটা সহযোগে সাঁটিয়ে ফেললাম আলু পরোটা। রাস্তার ওপাশে হালকা সবুজাভ অবয়ব নিয়ে এগিয়ে চলেছে মা গঙ্গা, তার স্রোতধ্বনি অবশ্য ক্ষীণ গ্রাহ্য…! আমরা একটু ভূপীন্দরজীকে বলে নীচে নামলাম, আহহহহ! গঙ্গাজীর সাথে প্রথম মূলাকাত, একটু লেন্সবন্দী না করলে হয়!  নদীবক্ষে রকমফের সাইজের পাথর অবশিষ্ট রেখে গঙ্গা বয়ে চলেছে হরিদ্বারের দিকে।

প্রথম দর্শন

২৭শে মে, দেবপ্রয়াগ

গাড়ি আবার চলতে শুরু করলো। দেবপ্রয়াগ পড়বে সামনে….এক ঘন্টার রাস্তা৷ সেই দেবপ্রয়াগ, ভূগোল বইয়ের দেবপ্রয়াগ….কিছুতেই মনে রাখতে পারতাম না। বিষ্ণু-নন্দ-কর্ণ-রুদ্র তারপর এটা-সেটা নদীর নাম দিয়ে পুরো ঘেঁটে ঘ হয়ে যাওয়া আমি, বড়ো হয়ে কম্পিটিটিভ এর কিঞ্চিৎ প্রিপারেশন নিতে গিয়ে আবার সেই গোলমাল! তবে দেবপ্রয়াগ টা মনে রাখা সহজ৷ কারণ এখানেই একমাত্র অলকানন্দা তার নাম অটুট রেখে এগিয়ে যেতে পারেননি এবং তার কারণ ভাগীরথী৷ কিন্তু জায়গাটা চোখে দেখলাম বলেই এতো সহজে এখন বলতে পারছি। আমাদের ঘোরাঘুরি শুরু হচ্ছে শেষ সঙ্গম দিয়ে (প্রয়াগরাজ যেহেতু অন্য রাজ্যে, তাকে বাইরে রেখেই বলছি)….ভাগীরথী বামদিক থেকে আর অলকানন্দা ডানদিক থেকে…..বোঝা যাচ্ছে অলকানন্দা বেশ স্ফীত কিন্তু শান্ত এবং ভাগীরথী একটু চঞ্চল, স্রোতস্বীনি এবং তুলনায় সংকীর্ণ তার দেহ….(সহজেই লক্ষ্যনীয়), দুজনের রঙের ফারাকটাও চোখে পড়ার মতো! আসলে অলকানন্দা অনেকটা পলিমাটি বয়ে আনে যেহেতু সে চওড়া অনেক এবং সেই বিষ্ণুপ্রয়াগ থেকে শুরু করে রুদ্রপ্রয়াগ পর্যন্ত স্থান বিশেষে চার-চারটি নদীকে আপন করে নিয়েছে।

আগের চার প্রয়াগে অলকানন্দার প্রভাব-প্রতিপত্তি মানে জলধারার পরিমাণ – বেগ বেশি থাকার কারণে সঙ্গম থেকে বেরিয়ে এসেছে অলকানন্দা নাম নিয়েই….! মানে নিয়মটা হচ্ছে যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো একজনের শক্তি বেশি হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার নাম নিয়ে প্রবাহিত হবে, যেই মুহুর্তে দুজনেরই শক্তি সমান, তখন আর ওসব চলবে না, নতুন নাম দিতে হবে, রসায়নের হাইব্রিডাইজেশনের মতো – একটা s আর তিনটে p…. শক্তি সমান যদি হয়ে যায়, অতএব নতুন নাম দাও sp3…বোঝানোর একটা ভালো টেকনিক পাওয়া গেলো। প্রকৃতি কতকিছু শিখিয়ে দেয়! দেবপ্রয়াগ সঙ্গমটা শিখিয়ে দেয় যে দুটো মানুষের মতামত, প্রকৃতি এসব আলাদা হতেই পারে, কিন্তু তারা যখন একসাথে চলবো ভেবেছে তার মানে ইগো ঝেড়ে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে নতুন কিছু মহৎ উদ্দেশ্য,  চরৈবতি! চরৈবতি! এটা একটা দারুন শিক্ষনীয় বিষয়। দেবপ্রয়াগের ওপর প্রান্তে সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়, পাহাড়ের ওপর নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে সগর্বে।

দেবপ্রয়াগ সঙ্গম

দিল্লীর গরম, এসি নন-এসির বারংবার যাতায়াতের কারণে অর্ধাঙ্গিনীর জ্বর আসছে। প্যারাসিটামল ছাড়া উপায় নেই। হরিদ্বার – হৃষিকেশ – দেবপ্রয়াগ পেরিয়ে এসেছি, গরম কিন্তু আছে, ভূপীন্দরজী বললেন রুদ্রপ্রয়াগ পেরিয়ে যখন কুন্ড পর্যন্ত যাবো, তারপর থেকে গরমটা কমবে৷ দেবপ্রয়াগে রাস্তার ধার থেকেই মা গঙ্গাকে দেখে ক্ষান্ত থাকলাম, নীচে নেমে দেখতে হলে এক ঘন্টা লেগে যাবে, সময় নষ্ট করলে চলবে না কারণ রাস্তায় জ্যাম বাবাজীর সাথে দেখা হতে পারে, সেই মতো মানসিক প্রস্তুতিও দরকার। আর একটু রেস্টও দরকার, পাহাড়ি পথে লম্বা যাত্রা একদম প্রথমেই ক্লান্ত করে দেয়।

২৭শে মে, শ্রীনগর – ধারী দেবী মন্দির
এরপরের গন্তব্য ধারী দেবীর মন্দির , শ্রীনগরে অবস্থিত, অলকানন্দার বুকে। গ্রামের নাম অনুসারে দেবীর এমন নাম৷ মা কালীর একটি রূপ৷ উত্তরাখণ্ডের যে চারধাম রয়েছে, তার অভিভাবক এবং রক্ষাকর্ত্রী হিসেবে মানা হয়। এই প্রসঙ্গে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলতে হয়৷ ২০১৩ সালে একটি হাইড্রো পাওয়ার প্রজেক্টের জন্যে ধারী দেবীকে অলকানন্দার বুক থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়, আর ঠিক তার পরের দিনই গাড়োয়াল জুড়ে নেমে আসে সেই বিধ্বংসী বন্যা। মেঘভাঙা বৃষ্টির কারণেই সেই বন্যা আর ধস নেমেছিলো। কেদারনাথ মুভির দৌলতে তার ধারনা আমরা পেয়েছি আগেই৷ তবে তারপরেই কর্তৃপক্ষ আর সাহস পাননি, ধারী দেবীকে তার পুরনো স্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়৷ হয়তো বিষয়টা কাকতালীয়, কিন্তু দেবভূমিতে এসে এইসব জায়গার স্থান মাহাত্ম্যর কথা মাথায় রাখতে হয় বইকি! ওপরের একটা জায়গায় নামিয়ে দিলো, ঢালু রাস্তা দিয়ে সহজেই চলে এলাম মন্দিরে৷ অনেকেই ধারী দেবীকে সাক্ষী রেখে অলকানন্দার সবুজ জলরাশিতে অবগাহনে ব্যস্ত। কেউ কেউ আবার জলকেলিতে মজেছেন। আসলে এখানে কেদারনাথ থেকে ফিরতি পথে লোকজনের একটু ক্লান্তি নিবারনও হয়ে যায়৷
উইকি ঘেঁটে দেখলাম,  আগেও একবার কোন রাজা নাকি এই দেবী কে সরানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং সেই সময়ও এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়েছিলো এবং সেই দুর্যোগে নাকি কেদারনাথের জায়গাটা সমতল হয়ে গিয়েছিলো।  তবে পুরো ব্যাপারটাই লোকবিশ্বাসের ব্যাপার। একটা জিনিস মনে রাখা খুব জরুরি, এই লোকবিশ্বাস গুলোই কিন্তু জঙ্গলকে, পাহাড়কে বাঁচিয়ে রাখে।

অলকানন্দার বুকে ধারী দেবী মন্দির
ধারী দেবী মন্দিরের পেছনের ঝোলা….ধারী গ্রামে যাওয়ার

আমরা এমনিই ভেতরে গিয়ে মায়ের দর্শন করলাম। বলে রাখা ভালো এই ধারী দেবীর সারা দিনে তিনটি আলাদা রূপে পূজা হয়,  সকালে বালিকা, দুপুরে যুবতী এবং সন্ধ্যেয় বৃদ্ধা রূপে পূজিত হন৷ তবে শুধুমাত্র মূর্তিটি….! আমরা সম্ভবত যুবতী রূপেই দর্শন করেছিলাম৷

যাই হোক ধারী দেবী পেরিয়ে আসার পর ওর শরীরটা খারাপ হলো। এবার প্যারাসিটামল খেতেই হলো। আরও এক ঘন্টা পরে গাড়ি থামলো একটা হোটেলে। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে খনিক পেরিয়ে। লাঞ্চ সেরে নিলাম। সে অনেক কষ্টে খেয়েছিলাম ভাত সেদিন। গাড়িতে এসি চলছে, বাইরে গরম৷ এবার জ্যাম লাগছে ধীরে ধীরে।  কুন্ডের আগে থেকেই প্রচণ্ড জ্যাম। গাড়ি থামিয়ে অপোক্ষা করতে হলো৷ আমাদের প্ল্যান ছিলো  সারি গ্রামে পৌঁছে একটু ফ্রেশ হয়েই দেওরিয়া তালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া কিন্তু সমস্যা হলো ধকল আর এই বিরাট লম্বা জার্নির অপেক্ষা৷ তার ওপর শরীর ঠিক নেই৷ গাড়ির মধ্যে অপেক্ষা করার যন্ত্রণা কি, তাও আবার জ্যামের কারণে সেটা আগেও অনুভব করেছি, দার্জিলিং গিয়ে। কেদারনাথের রুট বলে, এই দিকটাকে ওয়ান ওয়ে করে দিয়েছে। আমাদের এখন এই রুটে অগস্তমুনি – উখী – চোপতা হয়ে সারি যেতে হবে।  মিনিট কুড়ি পরে গাড়ি ছাড়লো, ভূপিন্দরজী নিজেই হোমস্টের মালিক, ওনারই গাড়ি, ড্রাইভারের শরীর খারাপ বলে নিজেই এসেছেন৷ এবার হোমস্টে সংক্রান্ত বারবার ফোন আসছে, উনিও জলদি বাড়ি ফেরার জন্যে উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন৷ কিছু এগিয়ে একটু ওপরে উঠতে শুরু করেছে, বেলা পড়ে এলো তখন৷ ঘড়ির কাঁটা বলছে সাড়ে চারটে, এই জায়গাটায় এতো দেরী হয়ে গেলো! এখানটা পেরিয়ে গেলে আর চাপ নেই। প্রায় আধ ঘন্টা বিরতির পর, আবার চলতে শুরু করলো গাড়ি। উখীমঠের ওপর দিয়ে চলছে, দেখতে পেলাম ভারত সেবাশ্রম সংঘ, উখীমঠ বিখ্যাত জায়গা। আমরা যে কটা জায়গা ঘুরবো, তার প্রধান কেন্দ্র হচ্ছে উখীমঠ, তার কারণ এখান থেকে সবদিকের শেয়ার কার সহজলভ্য। উত্তরাখণ্ড ঘুরতে এলে এটা একটা দারুন সুবিধা। কেউ যদি দলবল নিয়ে আসতে না পারেন, তাহলেও শেয়ার কারে সুন্দর ঘোরা যাবে। উখী থেকে যখন সারি পৌঁছালাম তখন  ছ’টা পেরিয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ ১২ ঘন্টার জার্নি!  আমরা ভেবেছিলাম যতই হোক্, আমাদের খুব বেশি হলে ৮-৯ ঘন্টা লাগবে কিন্তু জ্যাম এবং তার জন্যে হালকা ঘুর পথে আসতে হলো কুন্ডের পর থেকে, প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ ঘুরে! Mountain View, আমাদের আস্তানা। দেওরিতাল ট্রেক যেখান থেকে শুরু হচ্ছে, একদম তার উল্টোদিকেই হোমস্টে আমাদের। আজকে আর হবেনা ট্রেক টা, আমাদের প্ল্যান ছিলো দেওরি তাল করে পরের দিন তুঙ্গনাথের ওপরে গিয়ে থাকা,  তবে গাড়িতে আসার সময়েই ভূপীন্দরজী বললেন সারিতে দুদিন থেকে যান, ম্যাডামকী তবিয়ৎ ভি ঠিক হো জায়েগা…! হোমস্টের রুমে ঢোকার পর বেজায় পছন্দ হয়ে গেলো। তাই ভাবলাম দুটো রাত এখানেই কাটিয়ে দিই৷ তুঙ্গনাথ দিয়ে আমাদের প্ল্যানিং শুরু হয়েছিলো, স্টাডি করতে করতে আরও সেই প্ল্যানিং এ যোগ হয় মধ্যমহেশ্বর… কার্তিক স্বামী এইসব! কিন্তু সবগুলোকে পিছিয়ে দেওয়া কার্যত অসম্ভব, তাই তুঙ্গনাথকে একদম শেষে রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে তুঙ্গনাথের নীলকন্ঠে ফোন করে রিশিডিউল করতে অনুরোধ করলাম, রাত পর্যন্ত সেখান থেকে কোনো খবর পেলাম না যদিও৷ তবে ভদ্রলোক আশ্বস্ত করলেন! আসলে এইসব জায়গায় এলে বাফার ডে রাখতে হয়, শিক্ষাটা হয়ে গেলো একদম প্রথম দিনেই৷ বৌ এর আবার জ্বর এলো, প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগেছে। কিচেনে একটু কাড়া বানিয়ে দেওয়ার রিকোয়েস্ট করলাম। ভূপীন্দরজীও ওনাদের বলে দিলেন৷ হোমস্টে ছাড়াও এই কিচেনটির ভালোই পসার আছে বুঝলাম, লাগোয়া একটি দোকানও আছে, দরকারী জিনিসপাতি, শুকনো খাবার পাওয়া যায়। দোকানটা সামলান মূলত ওনার বাবা, হোমস্টের অতিথিদের খাবারের হিসেবও উনিই রাখেন। গলা ধরে গিয়েছে দুজনেরই, আমার একটু কম, কারণ গরমের জায়গা থেকে ঠাণ্ডায় এসেছি আর জলটাও ঠাণ্ডা তো!
মোবাইল নেটওয়ার্কের সমস্যা এখানে নেই বললেই চলে। সন্ধ্যে তো এখানে দেরী করে হয়, সূয্যিমামা ডুবে গিয়েছে কিন্তু পাহাড়ের মায়াবী গোধূলী আমাদের হোটেলের রুমে আর ফিরতে দিলো না, গাড়োয়ালি মেয়েরা তাদের মাথায় চিরকালীন প্রথার আবরণ দিয়ে বাড়ির গৃহপালিতর জন্যে ঘাস কেটে নিয়ে ফিরছেন….একটা চারচাকার নিচে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে এক সারমেয় আর বিড়ালের মধ্যে ঝগড়া চলছে, বিড়ালটা অবশ্য তার কিছু পূর্বেই আমার ক্যামেরাতে একটা বাইট দিয়েছে। একটু এদিক ওদিক ঘুরে, ফিরলাম৷ আদা-লেবু-মধু সহযোগে চা পান করা গেলো। দারুন বানায় এখানে। আজকে একটা শান্তির ঘুম দরকার৷ আমরা যতটুকু প্ল্যান করেছিলাম, সেটা আপাতত অনিশ্চিত এই ভেবেই ঘুমোতে হবে। তারপর যা হয় দেখা যাবে। রাতের খাবার খাওয়ার পরেই কাড়া নেবো বলেছিলাম, একদম গরম গরম রেডি। পুরো ঘরোয়া…!  সব সাঁটিয়ে ফিরলাম, ঘুম হলো ভালো। তবে ওর জ্বরটা মাঝে মাঝেই কামব্যাক করছে! আগের রাতেই ঠিক করেছিলাম পরের দিন তো তুঙ্গনাথ যাচ্ছি না, এখানেই থাকছি, সকালে উঠে যেতে পারলে যাবো, নইলে পরেই যাবো। ঘুমোতে গিয়ে ভাবছি – বৌ এর শরীরটা খারাপ হয়ে গেলো, ওর ইচ্ছে, ওর প্ল্যানিং পুরোটা, বেচারির মনটা খারাপ হয়ে যাবে না হলে, মহাদেবের এতো বড়ো ভক্তকে কি উনি ডেকেও ফিরিয়ে দেবেন! ঘুম ঘুম চোখের মধ্যে দেওরিতাল-মধ্যমহেশ্বর-তুঙ্গনাথ এসবের সম্ভাব্য সৌন্দর্যতা মনের মধ্যে আঁকতে থাকলাম। কিরকম হবে জায়গা গুলো ভাবতে থাকলাম, আর ভাবতে থাকলাম, কিই বা হবে যদি না যেতে পারি….! এসব ভাবতে ভাবতে জোর ঘুমিয়ে পড়েছি।

২৮শে মে, সারি গ্রামের হোটেল

প্রতিভাত সূর্যালোকে সারিগ্রাম

সকাল সকাল ঘুম ভেঙেই গেলো, জানালাটা হালকা খুলে ভেতর থেকেই দেখে নিলাম আবহাওয়া কিরকম! প্রকৃতির আহ্বানে আর চুপটি করে বসে থাকা যায় না৷ ঐ সকাল পাঁচটা হবে, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। ভোরের আলো ফুটছে সবে, এখন আর ট্রেক করে যেতে অসুবিধা হবে না।
ধীর পায়ে এগোলাম, আমাদের ভুল হয়েছিলো দুটো শোয়েটার পরা, আসলে অনভিজ্ঞতার দরুন বুঝতে পারিনি যে হোটেলের বাইরে যতই শীত লাগুক, ট্রেক করে ওপরে উঠতে উঠতে গরম লাগবে৷ আড়াই কিলোমিটারের পাথুরে রাস্তা হলেও কঠিন নয় মোটেও। ধীরস্থির পদক্ষেপে শৈলশিরা পেছনে রেখে এগিয়ে চলেছি, ওপর থেকে ভোরের আলো মেখে সারি গ্রাম নিজের সৌন্দর্যে বিরাজমান৷ কত্ত রকমের পাখির আহ্বান, দুপাশের অসংখ্য বুরান্স, ফুল নেই অবশ্য! বেশ কিছু দোকান পড়লো চোখে, তবে খোলেনি কোনোটাই তখনও। একটা শিব মন্দির চোখে পড়লো। বৌ এবার বেশ নিরাশ হয়ে বসে পড়লো, আর পারছে না ও, তবে ওর মনের জোরটা বিশাল৷ আমি বললাম চলো দেওরিতালটা করে বাকি যতটা যা পারবো করবো, নইলে তৎকাল কেটে চলে যাবো! আসলে পাহাড়ের একটা নিয়ম হচ্ছে পেছন ফিরে তাকানো যাবে না, কষ্ট হবে, তোমায় নিঙড়ে নেবে, তবুও এগিয়ে চলতে হবে! তবে ওর শরীরটা ভালো নেই এটাও যেমন ঠিক। একটু জিরিয়ে নিয়ে এগিয়ে চললাম আরও। দুটো কাকের মতো সাদা লেজওয়ালা পাখি ঝগড়া লেগেছে খুব, একদম ক্ষিপ্রতার সাথে বেরিয়ে গেলো, আমাকে সুযোগই দিলো না ক্যামেরাবন্দী করার। পরে এক ভাইকে বর্ণনা দিতে ও আমাকে বললো ঐ পাখি গুলো কি, পরে তুঙ্গনাথেও দেখেছিলাম৷ একজাতীয় কাক আর কি!  আমরা যতক্ষণ হেঁটে চলেছি, একটা চার – পাঁচজনের একটা দলকে দেখেছি, বাকি কাউকে দেখিনি৷  একজন কলেজ পড়ুয়া মেয়ে এলো, জল খেতে চাইলো, আমরাও তখন একটু ক্লান্ত, রোদ বেরোচ্ছে একটু একটু করে। বেনারস  বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট….! গ্র্যাজুয়েশন। মনে হলো – এর ভাগ্য কত ভালো, কত কম বয়স থেকে শুরু করে দিয়েছে। দেওরি তাল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৪৩৮ মিটার উঁচুতে। আমরা এমন একটা জায়গায় আছি যেখান থেকে চন্দ্রশিলা দেখতে পাওয়া যায়। বলে রাখা ভালো এই পথেও বেশ কিছু হোমস্টে এবং টেন্ট আছে, কেউ চাইলে ওখানেও থাকতে পারে। মন্দ হয় না। দেওরি তাল একটি পৌরাণিক হ্রদ, কথিত আছে, এখানে পাণ্ডবরা শিবের খোঁজে বেরিয়ে এখানে জল পান করেন….! পবিত্র এই তালের জলে স্নান করা বারণ। বনদপ্তরের লোকটা আমাদের সাথেই এলেন, তাকেই দেখলাম পরে ওখানে টিকিট কাটতে। মাথাপিছু ২০০ টাকা, ও বলা হলো না, পথে একটু জিরিয়ে নেওয়ার ফাঁকে একটা দোকানে বসেছিলাম, ইতালী থেকে আগত একজনের সাথে সাক্ষাৎ হলো, আরও সকাল বেরিয়েছেন, তবে সূর্যোদয় দেখা যায় নি কারণ মেঘলা আকাশ, দূরের কোন জঙ্গলে নাকি আগুন লেগেছে (ভূপীন্দরজী বলছিলেন)…..দোকানদার তো বাঙালি পর্যটকদের ভূয়সী প্রশংসা করলেন, এই বিষয়ে নিজের গর্ব বোধ হয়৷ বাঙালিদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন বটে দুধে-ভাতে বাঙালি, কিন্তু উনি বাঙালির এই উত্থানটা দেখে যেতে পারেননি৷ যাই হোক্, এবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!  পৌঁছালাম দেওরিতালে….!

২৮ শে মে, দেওরিতাল

ছবির মতোই সুন্দর দেওরিয়া তাল
সবুজ গালিচায় মোড়া বুগিয়াল

মেঘলা আাকাশের জন্যে পশ্চাদপটে চৌখাম্বা অধরা বটে, তবুও দেওরিতালের সৌন্দর্যে এতটুকু কমতি নেই! পাথুরে শৈলশিরা টপকে, প্যারসিটামলের সাহায্য নিয়ে বৌ যে এতো দূর আসতে পেরেছে এতেই আমি খুশি৷ অপেক্ষা করলে চৌখাম্বা ঠিকই দেখা দেবে, দোকনের লোকটাও তাই বলেছিলো। সূর্য প্রতিভাত হওয়ার সাথে সাথে চৌখাম্বার সামনে থেকে মেঘের চাদরটা ধীরে ধীরে সরে গেলেই তা আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠবে তুষারাবৃত ভূধর ….! তখন তাকে দেওরির মুকুটের মতো লাগে। আমাদের অবশ্য মুকুটহীন তালটিকেই দারুন লাগছে। সবুজ গালিচায় মোড়া তৃণভূমিতে ও বসে পড়লো, আমি ইতিউতি ঘুরে একটু ক্যামেরার কারসাজি করে বেড়ালাম। বাঁদর গুলো, ওপারে, জল খেতে নামছে। একটু ঘুরে এসে বসলাম দুজনে। পাইন বনের ছায়ায় দূর থেকে তালের পরিবেশটা গলফ কোর্সের মতো লাগছে। এখানে বসে থাকার মতো আরাম আর হয় না।

উঁকিঝুঁকি
প্রাণ নেই তবু জীবন্ত যেন….
Black-headed Jay Couple

ওর আবার জ্বর এলো, সঙ্গে কিছু ড্রাই ফ্রুট ছিলো, একটু খেয়ে, তারপর প্যারাসিটামল নিয়ে ওখানেই ঘুমিয়ে পড়লো। তবে শান্তির ঘুম৷ একটু বসে পড়লাম আমিও৷ সবুজ গালিচার মতো হালকা ভেজা,নরম ঘাসের মতো, সবে তার ওপর থেকে শিশিরের রেখা বিলীন হয়েছে, কি আরাম….! কয়েকটা পাখি, পরে জানলাম Black-headed Jay…, একদম গা বরাবর উড়ে চলেছ, আর একটু হলে ওকে স্পর্শ করে চলে যাচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পরেই একদম আমার পাশে এসে বসলো, ওমনি খচাৎ শব্দে লেন্সবন্দী। একটু চুপ করে বসে আছি। চোখ বুজে দূর থেকে আসা শব্দ শোনার চেষ্টা করছি। দূর দূরান্তের পাখির আওয়াজ, মানুষজনের কথাবার্তার ধ্বনি ভেসে আসছে। মৃদুমন্দ হাওয়া মেশানো রোদ্দুর…. ঘুম ভাঙলো খানিক পরে ওর! একটা কুকুর অনেকক্ষণ থেকেই এর তার সাথে ঘুরছিলো। এবার আমাদের দিকে এলো, একটা বিস্কুটের প্যাকেট খুলে ওকে দেওয়া হলো, খেয়ে নিলো আরামসে, তবে ড্রাই ফ্রুট ছুঁলো না পর্যন্ত। ঘন্টা দেড়েক কাটিয়ে নিলাম৷ তুঙ্গনাথের নীলকন্ঠ থেকে ফোন করলো, এখানে নেটওয়ার্ক খুবই উইক, নেই বললেই চলে, তবুও বুঝতে পারলাম ২৮-২৯ এর বুকিংটা রিশিডিউল করে ১-২ জুন করে দিয়েছে, আমার কথা শুনতে পেলো না,তবুও আমি একটা টেক্সট মেসেজ করে থ্যাঙ্কু জানিয়ে রাখলাম৷  দুজনে  জলের দিকে গেলাম, বসলাম কিছু সময়। দেখলাম দূরের চৌখাম্বা হালকা হয়ে বেরিয়েছে, মানে মেঘমণ্ডলকে রোদ্দুর পুরো বাগে আনতে পারেনি..৷  ক্যামেরায় ধরা দিলো না, তবে চোখের ক্যামেরায় যে ধরা পড়েছে, এতেই খুশি। অনেকে লক্ষ্য করেও দেখতেই পেলো না৷ জলে ব্যাঙাচি ঘুরে বেড়াচ্ছে….মাছও আছে। একজন দোকানদার জল ভরতে এসেছে, বৌ জিগ্যেস করলো, জল পান করা যায়? বললো – খুব সমস্যায় পড়লে পানও করতে হয় কি আর করা যাবে! মাঝে একটা ট্রেকার গ্রুপ এসেছিলো, তারা কিছু মজার অ্যাক্টিভিটি করে বেরিয়ে গেলো। আসলে দেওরিতাল থেকে শুরু করে বুগিয়াল হয়ে তুঙ্গনাথ ট্রেক করা যায়৷ ভালো ট্রেকার গ্রুপ গুলো এই পথেই যান৷ সব মিলিয়ে ১৮-২০ কিমি হবে বোধ হয়।  ঘন্টা দেড়েক কাটিয়ে নেওয়ার পরে দেওরিতালের উদ্দেশ্য প্রণাম করে বিদায় জানালাম৷ রোডোডেনড্রনের সময় এই জায়গা স্বর্গসম হয়ে যায়। তখন মেঘমুক্ত আকাশে চৌখাম্বার প্রতিবিম্ব আরও সুন্দর করে তোলে এই তালকে।

পাহাড়ি দোকান…. নিজের মাতৃভাষার ছোঁয়া
পাহাড় আর ম্যাগি, unavailable combo

ফেরার পথে দুবার স্টপেজ দিলাম, দোকানে বসে একটু পাহাড়ের ম্যাগির স্বাদ নেওয়া যাক্। পুদিনা পাতা দেখতে পেলাম পাহাড়ের ঘা ঘেঁষে, দোকানে দেখি পুদিনার চা ও পাওয়া যায়, সুতরাং তাই নেওয়া যাক্। দেখি বাচ্চাটা একদম ফ্রেশ পুদিনা তুলে নিয়ে গেলো। এখানের গিরগিটি গুলো নীলচে কালো রঙের কিন্তু বেশ হৃষ্টপুষ্ট! এই জায়গাটা থেকে পুরো সারি গ্রাম কে দেখতে দারুন লাগে, ঝুম চাষের জমিগুলো বেশ স্পষ্ট, বোধগম্য।

দূরের সারিগ্রাম
শিব মন্দির

কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার শুরু করলাম, পথে কয়েকজনের সাথে দেখা হলো, বয়স ষাটোর্ধ্ব তো হবেই,গুজরাট থেকে এসেছেন, ছয় বন্ধুর দল। আমরা বেঙ্গল থেকে জানার পর বললেন – “লেকিন বাঙ্গাল মমতা সে মুক্ত হো গ্যায়া, তোড়াসা শান্তি তো মিলেগা আপলোগোকা”…. ওনাদের দিকে নমস্কার জানিয়ে বললাম ”বহুত বহুত বাঁচ গ্যায়ে হামলোগ”, ”স্রেফ হামলোগ নেহি পুরা দেশ কো শান্তি মিলনা চাহিয়ে…” আগের দিন – ভূপীন্দরজীও বলছিলেন একই কথা, মোটামুটি সবাই জেনে গিয়েছে মাননীয়া কি ক্ষতিটা করে দিয়েছে! হালকা হাসিঠাট্টা করে আবার এগিয়ে চললাম৷  এসে পৌঁছালাম সেই মন্দিরে। শিব মন্দির। হোটেলে এসে সেদিন লাঞ্চ সেরে দারুন ঘুম দিলাম৷ বিকেলের দিক থেকে মেঘ সাজলো…. আজ মনে হয় ঢালবে…! রাতে ডিনারের পরে আবার আজকে কাড়া লাগবে, বলে দিলাম। ওদের সার্ভিসও দুর্দান্ত। পরের দিন গন্তব্য মধ্যমহেশ্বর, সেখানে একটাই রুকস্যাক নিয়ে যাবো, এই জন্যে মোটামুটি সব গুছিয়ে রাখলাম৷ সন্ধ্যে থেকে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো, শিলাবৃষ্টি, এখানে ওলা বলে। দেখলাম দূরের পাহাড় পুরো শিলে ভরে গেছে। মনে হচ্ছে কেউ সাদা রঙের চাদর চাপিয়েছে। ভূপীন্দরজীকে দেখলাম রেনকোট পরে সমানে হোটেলের সামনেটা ঝাঁটা দিয়ে যাচ্ছেন। ঐ বৃষ্টির মধ্যেই৷ যেমন বৃষ্টি, তেমন শিল….বুঝলাম এটা এখানে নর্মাল। রাতের ডিনার সেরে রুমে এলাম৷ ঘুম দিতে হবে টানা, বৌ এর জ্বরটা ঠিক হচ্ছে না। কাড়া খাওয়ার পরে জমে থাকা কফটা গলতে শুরু করেছে, আর তার জন্যে কাশি হচ্ছে ভালোই। উপকার দিয়েছে কাড়াটা।

পাথুরে সর্পিল পথ

রাতে আবার একটা প্যারাসিটামল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো, বৃষ্টি কিন্তু স্টপ-পজ-স্টপ-পজ খেলতে খেলতে ভালোই পারফরম্যান্স দিয়ে চলেছে….কর্ণভেদী আওয়াজ, শিল পড়ছে টিনের ছাদের ওপরে….! ঘুম ভেঙে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই কিন্তু তারপর যেটা হলো সেটার জন্যে দুজনের কেউই প্রস্তুত ছিলাম না৷ হঠাৎ প্রায় রাত সাড়ে বারোটার দিকে মোবাইল তীব্র শব্দে বেজে উঠলো, যেন কেউ হ্যাক করে দিয়েছে, কি একটা মেসেজ ভেসে এলো, চোখে ঘুম-আড়ষ্ট, তাকিয়ে দেখলাম, কিছু বুঝলামও না…..! বেশ ভয় লাগলো, কিছু একটা অপশন এসেছিলো, প্রেস করে দিলাম, শুয়ে পড়লাম, আমি ভেবেছিলাম শুধুমাত্র আমার মোবাইলে, পরের দিন জানলাম ওর মোবাইলেও….এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ নতুন….আগে কোনোদিন হয়নি……! (চলবে….)

দেওরিয়া তালের উপহার সমূহ

আমরা দেওরিতালে যে হোটেলে ছিলাম তার নাম
Mountain View –   9410507618

আস্তানা Hotel Mountain View, স্মৃতিতে রয়ে যাবে…

প্রথম পর্বের লিঙ্ক
https://duttasubhankar.wordpress.com/2026/06/12/dujone_devbhumi_part_1/

✒️শুভঙ্কর দত্ত || June 13, 2026

মিডিল বার্থের ললিপপ….

গরমের ছুটিতে কোথায় যাবো…! বেশি অবশ্য ভাবতে হয়নি৷ এবার পুরোটাই দায়িত্ব নিয়েছিলো বউ। পাঁচ কেদার যে হয়,  সেটাই জানতাম না৷ না, আমি উমাপ্রসাদের বইদুটো পড়িনি আগে। আমার ভ্রমণপিয়াসু মনের জন্যে বুদ্ধদেব গুহ, বিভূতিভূষণ এনারা দায়ী! যাই হোক্, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠিক হলো একরকম৷ টিকিটও কাটা হলো, আপ – ডাউন দুটোই! দিল্লী পর্যন্ত।  রাজধানীতে। তবে দিল্লী থেকে হরিদ্বার কেটেছিলাম তৎকাল, মহাদেবের নাম করে৷  আমাদের প্ল্যান-বুকিং সব ৫০ শতাংশ দিনের জন্যে হয়েছিলো। বাকিটা প্ল্যান করিনি। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা করবো এটাই মনে ছিলো। আমরা যে চারজনের গ্রুপটাই যেতাম তাদের বাকি দুজনের নানা সমস্যা হলো, জেনুইন, সৌমেনের ট্রেনিং৷ তার পরে এই ট্রেকের ব্যাপারটা শুনে সন্দীপও মুখ ঘুরিয়ে নিলো। রেল টিকিট ক্যান্সেল সংক্রান্ত নতুন নিয়ম বানিয়েছিলো, তাই দেখে সাহস করে টিকিট কেটেই নিলাম, ক্যান্সেল করলে করবো ক্ষণ। বেশি তো গচ্চা যাবে না! শেষমেশ কাউকে পেলাম না, মানে ঐ দল তৈরী হলো না। দেবাদিদেবের নাম নিয়ে দুজনেই বেরিয়ে পড়লাম দেবভূমি উত্তরাখণ্ড এর উদ্দেশ্যে। হোমস্টে গুলোতে ফোন করে, ওরা অনেকটা সাহায্য করে, ফলে বুঝতে সুবিধা হয়েছিলো। গাইডেন্সের কাজটা মূলত ওরাই করে দেয়। আমি প্রায় সন্ধ্যেবেলা ফোন করে কথা বলে নিতাম৷ একটা মোটামুটি নকশা রেডি ছিলো। কিন্তু তীর্থযাত্রার অমোঘ নিয়ম অনুযায়ী, সেই নকশা প্রায় ইউ-টার্ন নেবে ভাবিনি! অর্ধাঙ্গিনী বলতো – এটাকে ট্রেক বলো না, যাত্রা বলো! ভাগ্য হয় না সবার! আর  হিমালয়ের কোলে ঐ সব জায়গায় এক ভেবে যাবে আর এক হবে! সবকিছু সমাপ্ত হওয়ার পরে এই অনুভূতি টা হতে আমার এক সেকেন্ডও লাগেনি।

২৫ শে মে, শিয়ালদহ স্টেশন!
RAC থেকে এক মাস আগে কনফার্ম হওয়া টিকিট, যাত্রার একদিন আগে যখন মেসেজ এলো দুটোই আপার, তখন একটু মনটা খারাপ হয়ে গেছিলো। কিন্তু তখনও ভাবিনি এই ট্রেন সফর থেকেই একটা অসাধারণ যাত্রার বর্ণনা আমাকে ফিরে এসে লিখতে হবে৷ দুজনে দুটো রুকস্যাক নিয়েছি। আমার খুঁতখুঁতে মন রুকস্যাক গুলোর ওজনটা নিয়ে বড়োই চিন্তিত! বলে রাখা ভালো ওজন মেপেই বেরিয়েছিলাম। ট্রেনে উঠেই এক ভদ্রলোক এর সাথে আলাপ। রুদ্রনাথ যাবেন ট্রেকে।  শিয়ালদহ স্টেশনে ট্রেন ছাড়ার অব্যবহিত পূর্বে একজন মহিলাকে দেখলাম, বেশ কর্তৃত্বের সাথে ইয়াব্বড় একটা রুকস্যাক আবার রেনকভার লাগানো। একটু আশ্বস্ত হলাম৷ তবে হ্যাঁ, উনি নিজেও বেশ ভারী! তখন থেকেই ভাবছি কি করে যাবে রে বাবা! এ নির্ঘাত ট্রেকে৷ পরে জানা গেলো ঐ ভদ্রলোকের গ্রুপেই। ট্রেন ছাড়লো। ওনাদের সাথে আলাপ হলো। আমাদের দিকের সহযাত্রীরা উঠবেন দুর্গাপুর বা আসানসোলে। তাই ওনারা আমাদের সাথে আড্ডা মারতে চলে এলেন। কথায় কথায় বেশ জমে উঠলো, পরিচয় হলো৷ সুকমল দে, রিটায়ার্ড টিচার, রামকৃষ্ণ মিশনের৷ যাই হোক্, ওনার আর একজন যে সহযাত্রী তিনি একটি স্কুলের হেডমাস্টার। দুজনে মিলে আমাদের সাথে ওনাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করতে থাকলেন। বেশিরভাগই ঐ হিমালয় বা কেদার সম্পর্কে। পরে বুঝলাম ঐ প্রমাণ সাইজের রুকস্যাক নিয়ে যিনি, উনি এই হেডস্যারের হোম-মিনিস্টার৷ এটা বুঝতে দেরী হলো না যে চেহারায় ভদ্রমহিলা ভারী হলেও ওনার অভিজ্ঞতার ঝুলিটিও বেশ ভালোই ভারী৷  আসানসোল আসতে আমাদের সহযাত্রীরা এলেন! আসলে আমরা দুরকম মানুষের কথা মনে রাখি – যে ভালো চায় আর যে খারাপ চায়! এই সহযাত্রীদের কথা আমি জীবনে ভুলবো না৷ লোয়ার বার্থে বসে আছি, দুম করে উঠেই বলে ”কাকা! এবার উঠতে হবে…!” তাকিয়ে দেখি একটা ষাটোর্ধ্ব লম্বা লোক৷ বটে রে বাপ্! আমরা চারজনে গল্প করছিলাম , সহ্য হলো না! যাই হোক্, অগত্যা, তেনার অধিকার বলে কথা, সরে গেলাম৷ ট্রেন ছুটে চলেছে! এবার ভদ্রলোক বেশ মাঝে মাঝেই ওনাদের একটি মিডিল বার্থের ললিপপ আমার সামনে ঝুলিয়ে দিলেন! আর এইসব লোকের থেকে মিডিল বার্থ নেওয়া যে কি মুর্খামির কাজ হতো সে পরে বুঝেছি৷ ভদ্রলোক, তার ভাই, বৌমা-নাতি, মেয়ে,আরও কে সব ছিলো, মোটামুটি ছ’জন! দিল্লী যাচ্ছে মেয়ের কাছে…..প্রথমে তো সুকমল বাবুকে বলেই দিলেন যে আমরা বাঙালি কিন্তু দিল্লিতে থাকি….বোঝো ঠ্যালা, আরে ভাই পিসি বিদেয় হয়েছে তারপরেও নিজেকে পঃবঃ এর বাঙালি বলতে এতো দ্বিধা! যাই হোক্ ধানবাদ আসার আগেই ডিনার সার্ভ করে দিলো। নিজেদের আপার বার্থের তলার লোয়ার থেকে ছিটকে গিয়ে ওনাদেরই একটা সাইড বার্থে বসে খেয়ে নিলাম। ভদ্রলোকের দিকে একবার তাকাচ্ছি,আর খাচ্ছি! বুঝলাম উনি খুব একটা ভালো চোখে নিলেন না, খাওয়া শেষ হতে না হতেই বললেন – একটু কাগজ দিয়ে মুছে দিন সিটটা….বললাম মোছার মতো এমন কিছুই হয়নি! আর মুছতে হলে আপনার হাতের কাগজটা দিয়ে একটু মুছেই নিন! বুঝলাম ঐ এঁটোকাঁটা এসবের ঠিকা নিয়ে ট্রেনে ভ্রমণ করছেন। হেডস্যার এবং তার দলবল ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে। বলে – আপনারা সাইড লোয়ারে বসে খেলেন? এরপর খাওয়া পর্ব শেষ হতে ভদ্রলোক আবার বলে উঠলেন – আপনাকে তো বললাম একটা মিডিল নিয়ে নিন…..ম্যাডাম আছেন! ওপরে অসুবিধা হবে! ললিপপ উনি বিক্রি করেই ছাড়বেন কিন্তু আমরাও নাছোড়বান্দা, ললিপপ আমরা খাবো না৷ হেডস্যারেদের গ্রুপে একজন বাচ্চা মেয়ে ছিলো, পাঠ ভবনের ছাত্রী। গোটা চৌহদ্দির ভূতুড়ে গল্পের ঝুলি নিয়ে ঠাকুরমার ঝুলি খুলেছিলো বউ এর কাছে। তার অভিযোগ হলো তার সাথে কেউ গল্প করে না। আসলে তার যে সাবজেক্ট সেটাকে সবাই বেশ খিল্লি করে উড়িয়ে দেয়৷ তবে শিশু মনস্তত্ত্ব বলে – প্রতিটি বাচ্চাকেই গুরুত্ব দেওয়া দরকার এবং  মনযোগ সহকারে তাদের গল্প গুলো শোনা দরকার, নইলে সে তার অনুভূতি ব্যক্ত করার একরকম আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগবে!

দুটো রুকস্যাককে জড়িয়ে এসি থ্রি টায়ারের আপার বার্থে  ঘুমোনোর চেষ্টা করেছি দুজনেই কিন্তু হয়নি৷ তার কারণ আছে। ওনাদের এক বাচ্চার খুব কফ হয়েছে বুকে! সারারাত বেচারি কেশেছে খুব, আর কাশলেই কফ উঠে এসেছে। ঐ আওয়াজেই ঘুম ভেঙে যায় বারবার। তবে সকালে উঠে দেখি বাচ্চাটার জ্বর!
মিডল বার্থে ওনাদের লোক, তাহলে সকালে তো বসতে হবে। লোয়ার বার্থে ওনাদের আর এক বাচ্চা। এবার ওখানে বসেই বৌ এর সাথে ভূতের গল্প চালিয়ে গেলো পাঠ ভবনের সেই স্টুডেন্টটি। মাঝে মাঝেই আমি দিল্লীওয়ালে বাঙালি ভদ্রলোকের দিকে তাকাচ্ছি, উনি সিগন্যাল দিলেন মিডিল বার্থের ওনাদের লোক যাতে এখুনি ঘুম থেকে না ওঠে! কি রকম বিছুটিখচ্চর লোক হলে এরকম মানসিকতা হয় ভাবুন! আমি দেখলাম গতিক গোলমাল, বললাম দিদি, সকাল ছটার পরে বসতে দিতে হবে, সাতটা বেজে গিয়েছে। এবার উঠে পড়ুন! ব্যস! আর কে আটকায়…। এবার ভদ্রলোকের দিকে দেখলাম, কিঞ্চিৎ রুষ্ট হয়েছেন। তারপর তার চা খাওয়ার বাতিক শুরু হলো। সমস্যাটা হলো – ক্যাটারিং এর  লোকজন সকাল থেকেই চা-চা করে একবার গিয়েছেন কিন্তু তখন তিনি নিদ্রাদেবী তে মগ্ন ছিলেন, এখন হঠাৎ করেই হম্বিতম্বি শুরু করে দিলেন! সেই ছেলেটা এলে, তার ফোন থেকে ক্যাটারিং ম্যানেজার কে ফোন করে – আমি এই, আমি সেই, আজ তিন দশক ধরে রাজধানীতে যাতায়াত করছি, কোনোদিন এমন দেখিনি….! ওনারা রাতে গরম জল চেয়েছিলেন বাচ্চাটার জন্যে,পাননি। আসলে সবাই একটু ভালো ব্যবহার আশা করেন। পরে আমাকে ক্যাটারিং এর ছেলেটা বলছিলো লোকটি খুবই ভুলভাল। যাই হোক্, ক্যাটারিং ম্যানেজার এসেই তাকে জোর ঝাড়লো, একদম লাগোয়া বার্থ ছিলো বলে আমরাও সব শুনতে পেলাম। ভদ্রলোকের সামনে দেখি নিজের সহ প্রায় চার পাঁচটা  টি-কিটের প্যাকেট। তারপর তার সে কি ঘ্যাম! আগের দিন কখন যেন একটা বলেছিলেন – আরে আমাদের দুটো টিকিট ক্যান্সেল হয়েছে বলেই আপনাদেরটা কনফার্ম হয়েছে। বুঝলাম, জীবনে বুড়ো বয়সে গিয়ে এনার যে কনফিডেন্স তার সিকিভাগ থুক্কুম টেন পার্সেন্ট পেলেই আমার চলে যাবে। যাই হোক্, ভদ্রলোক চা নিয়ে ব্যস্ত, এদিকে বাচ্চাটির শরীর সময়ের সাথে আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তখন ওনাদের সাইড লোয়ারে বসে আছি, বৌ একটা ওষুধ বের করে দিতে গেলো, ওনাদের কথামতোই, দেখলাম মহিলাটি (মানে মা) খুব একটা আগ্রহ দেখালেন না। ভদ্রলোক নিজেদের গল্পটা বললেন তারপর, কে কে, কোথায় যাচ্ছেন! আমি ভাবলাম, এ ব্যাটা তো একদম পাঁড় বাঙালি, তাহলে নিজেকে আবার দিল্লীওয়ালে বললো তখন! সে যাই হোক্, বাচ্চাটাকে ঐ পাশের গ্রুপের একজন এসে ইনহেলার দিলেন। আসলে তার নেবুলাইজার লাগে, এবার তার মা এই অত্যাবশ্যকীয় জিনিসটিও সঙ্গে করে আনেনি, তার আবার ঐ ক্যান্টিন বয়কে সে কি সবক শেখানো রে বাবা, গরম জল দেয়নি বলে…। যিনি ইনহেলার টা দিলেন, ওনার মেয়েই বারবার আমার বৌ এর সাথে এসে গল্প করছিলো। তিনি, ঐ মহিলাকে বললেন – ম্যাডাম, আপনি নিজের মানিপার্স ভুলে যাবেন, কসমেটিকস কিট ভুলে যাবেন কিন্তু বাচ্চার নেবুলাইজারটা ভুলবেন না কখনো। আসলে পেরেন্টিং যে এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ, এটা সত্যি! যাই হোক্, এবার গাজিয়াবাদ পেরিয়ে গিয়েছি। ট্রেনটা হালকা লেট ছিলো, কিন্তু সময়ে অব্যবহিত পূর্বেই পৌঁছে দিলো। নিজের নাম – ধাম – কাম জাহির করা ষাটোর্ধ্ব ভদ্রলোক নামার সময় বললেন – ভাই, ব্যবহারে খারাপ কিছু লাগলে মনে করো না…..! কোনো ক্রমে গালাগালিকে রুখে নিলাম।

২৬ শে মে, নিউ দিল্লী স্টেশন

দিল্লি তে নামলাম তখন প্রায় এগারোটা। হরিদ্বারের ট্রেন জনশতাব্দী! সেই তিনটে কুড়ি। নিউ দিল্লীতে ভেবেছিলাম ঐ লাউঞ্জে কাটিয়ে দেবো। কিন্তু খুঁজে দেখলাম সেই লাউঞ্জ আর নেই। কুড়ি টাকার স্লিপ কেটে ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসলাম৷ সুকমলবাবু-হেডস্যার ওনাদের গ্রুপটাও ছিলো।
ওনাদের সাথে দারুন পরিচয় হয়ে গিয়েছিলো, একটা রুম কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মন্দ হয় না। বড়ো ব্যাগ গুলো ওনাদের দায়িত্বে রেখে ছোটো ব্যাগ গুলো রেখে, আমরা দুজন,সুকমল বাবুকে নিয়ে বেরোলাম, পাহাড়গঞ্জের দিকে। আসলে উনি আগে হোটেলটাই থেকেছেন। বাঙালি বলেই নিয়ে এলেন নিজে। আসলে, দিল্লিতে একবার নবোদয়ের ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে এক বন্ধুর সাথে বেশ ফ্রড হয়েছিলো, তাই ঐ টুকু সময়ের জন্যে রুম নেওয়ার একটা ভয় ছিলো আমার৷ বাঙালি হোটেলটায় কিছুক্ষণের জন্যে ৫০০ টাকার বিনিময়ে একটা ব্যবস্থা করে উনি বেরিয়ে গেলেন। আমরাও একটু ফ্রেশ হয়ে, লাঞ্চ সেরে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। জনশতাব্দী আসবে ৯ নং প্ল্যাটফর্মে। আমাদের চেয়ার কার আর ওনাদের টু এস। আমরা এগিয়ে এলাম৷ দিল্লীর গরম, এখানে থেকে অন্য রকম৷ ঘাম দেয় না, এখানে যেমন গরম, তেমন ঘামও দেয়, ওখানে হাওয়া দিচ্ছে যেন পুড়িয়ে দিয়ে চলে যাবে, দূর থেকে দাবানলের মতো৷ ট্রেনে যেতে যেতে ভাবলাম, মানুষ কত রকমের হয় – রাজধানীতে আমাদের যাত্রাটা সেরকমই হলো। অপরিচিত মানুষজনের সাথে আলাপের খাতিরে তারা কতটা আপন করে নিলেন যেন ওনাদের সাথে আমরাও রুদ্রনাথ যাবো! পাঠ ভবনের ছাত্রীটিকে বৌকে শেষকালে জড়িয়ে ধরে ফেললো….ট্রেনে ওঠার আগে। যাই হোক্ এদিকে সন্ধ্যে হয় দেরীতে। ট্রেনে রূড়কি পেরোলাম। রূড়কি আইআইটির নাম তো শুনেছি ছোটো থেকে। ঘড়ির কাঁটায়, প্রায় সাতটা তখন৷ তখনও স্পষ্ট বেলা বোঝা যাচ্ছে। গমের চাষ হয়েছে, তবে জমিতে মাঝে মাঝেই বড়ো বড়ো কি সব গাছ, রোদ থেকে বাঁচানোর জন্যে কি? কে জানে! হরিদ্বারে এসে পৌঁছালো, নির্ধারিত সময়ের একটু পরেই৷ বেশ জমকালো স্টেশন। লোকজন বলা ভালো পূণ্যার্থীরা সব বসে আছে স্টেশন চত্বরেই, বাইরে আরও দারুন৷ স্টেশনের বাইরেটা দারুন। হেঁটেই এলাম শিবমূর্তি লেন, হোটেল একটা বুক করে রেখেছিলাম৷ রাতটুকু কোনো রকমে কাটিয়ে সকাল সকাল বেরোতে হবে। জাঁকজমকপূর্ণ জায়গা একদম, খাওয়ারের স্টল আর শীতের পোশাকের হকারে ভর্তি। দুটো টুপি কিনলাম, কাজে লাগবে। খেয়ে হোটেল ফিরলাম৷ আরাম করে ঘুমোতে হবে……! তবে হ্যাঁ, ওনারা ক্যান্সেল না করলে আমাদের টিকিট কনফার্ম হতো না….! মনে পড়লেই হাসি পাচ্ছে।  ললিপপ টা ভাগ্যিস নিইনি…..। (চলবে….)

দেবভূমিতে দুজনে (প্রথম পর্ব)

✒️শুভঙ্কর দত্ত

মেঘের আলয়ে (দ্বিতীয় পর্ব)- ডাউকি হয়ে মাওলিনং

ডাউকি! মনে পড়লেই উমগোট নদীর স্বচ্ছ জলের কথা ভেসে আসে। তবে ঐ কাঁচের মতো স্বচ্ছ জল বর্ষাকালে পাওয়া যায় না। তার জন্যে আসতে হবে শীতের দিকে, খুব শীতে আবার জলপ্রপাতে জল থাকে না। তার মানে মেঘালয়ে যে কোনো সময়ে এসে সবটুকু পাওয়া যাবে না। যাই হোক্, পরের দিন বেশ দেরী হলো ঘুম ভাঙতে। গেস্ট হাউসের পাশেই একটা ফুটবল মাঠ আছে। লোকজন প্র্যাকটিস করে। সেখান থেকে চেক আউট করে বেরিয়ে এলাম, সামনেই তামাবিল, বর্ডার চেকিং পয়েন্ট! একটু ঢুঁ মেরে এলাম।

Only GOAT can trespass?
Tamabil Border Point


এলাম ডাউকি বাজারে, বাংলাদশের কিছু বেকারীর জিনিস কিনলাম কিন্তু সে জিনিস আর খাওয়া হয়নি, কেনার সময় ডেট দেখে কিনিনি, কেস খেয়েছি আর কি! ডাউকি বোটিং পয়েন্টে এলাম৷ সুপারি বাগান দিয়ে পুরোটা সাজানো মনে হলো। গাছের সারির ফাঁকে ফাঁকে ফ্রুট জুসের দোকান – আনারস, আপেল, ওয়াটারমেলন – সবই আছে, ১০০ টাকা, একদম টাটকা রস, সঙ্গে সঙ্গে দেবে। ভাবলাম নদীবক্ষে হালকা হাওয়া খেয়ে তারপর টেস্ট করা যাবে। পাঁচজন এর জন্য দুটো নৌকো করে তরী ভাসানো হলো….জলটা বর্ষার জন্য ঘোলা। সেই আক্ষেপ থেকেই গেলো। ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানরা অতন্দ্র প্রহরী সেখানের, বাংলাদেশ এর সাথে এমন উন্মুক্ত বর্ডার আর কোথায় আছে জানা নেই৷ একটা নদীর ওপর দিয়ে বর্ডার, সেখানেও দড়ি ফেলে রাখা আছে, ডিঙিয়ে যাওয়ার জো নেই! আমাদের জাতীয় পতাকা উড়ছে, গর্বের তেরঙ্গা, অনতিদূরেই মুজিবের দেশেরও!

Areca!
Umngot River alias Dawki
Jana-Gana-Mana
Divided by Green Stones


মামাদের দেইখ্যা হালকা কইরা হাই হ্যালো করলাম….! যতই লাফান-ঝাপান করুক, প্রতিবেশী তো বটে…! তবে ডাউকির জল সেরকম না হলেও নৌবিহার টি বেশ আকর্ষণীয়, দূরের এক নৌকার মাঝি পাহাড়িয়া সুরে গান গেয়ে চলেছে, আর একটি নৌকাতে কিশোর বয়সী ছেলে মেয়েরা বেশ হাততালি দিয়ে হিন্দি গান করে চলেছে। বেশ উপভোগ্য…. একটু এগিয়ে যেতেই একটা সাসপেনসন ব্রীজ, জলটা আয়নার মতো থাকলে ওটার ওপরে গিয়ে ছবি তোলাটা একরকম বাধ্যতামূলক হতো। যদিও BSF জওয়ানরা ওদিকটাই সদাজাগ্রত! ফটো বা ভিডিও তোলা বারণ ঐ ব্রীজের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময়ে….! যখন যাত্রা শুরু হলো তখন রোদে একটু গরম লাগছিলো, একটু করে এগিয়ে গেলেই রোদ্দুরটা কোথায় যেন হাপিশ হয়ে গেলেই দারুন লাগছে, মাঝে মাঝে দেখছি পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে জলস্রোত নেমে আসছে ঝরণা হয়ে নদীর দিকে, নীচ থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ছুটে আসছে ওরা নদীকে আলিঙ্গন করতে। নদীর দুই ধারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করেছে একটি সেতু, সাসপেনসেন টাইপের, তার ওপর দিয়েই সব যোগাযোগ! এই সেতুবন্ধনটিও ডাউকির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

To meet you, River
Catch me if you can….

ওদিকে বাংলাদেশের জাফলং, একবার গুগল ম্যাপে গিয়ে এটিএম সার্চ করতে গিয়ে জাফলং এর এটিএম এর ঠিকানা দিয়ে দিলো, এখন টাকার লগে আমারে বর্ডার ক্রস করতে লাগবো, কঠিন ব্যাপার! তবে ডাউকি নদীতে বোটিং এর সময় ঐ দূর থেকে পাহাড়ের ওপর ঘরবসতি গুলো দারুন লাগে, বেশ সুন্দর! চারিদিকে সবুজ দিয়ে ঘেরা পাহাড়ের ওপর কেউ যেন আঠা দিয়ে চিপকে দিয়েছে ঘরগুলোকে। মিনিট ১৫ পর, একটা জায়গায় এসে থামলো নৌকা, বললো ১০ মিনিট সময়৷ এ জায়গাটা বেশ ফটোজেনিক! কত রকম রঙের যে পাথর, বেশিরভাগই মসৃণ, অনেকেই সংগ্রহ করে নিয়ে যায়, কয়েকটা আমরাও তুললাম – সবুজ, কালো, গোলাপি, মেরুন, ধূসর….যেমন ইউনিক টেক্সচার, তেমন অদ্ভুত সাইজ আর রঙ! পেপারওয়েট এর কাজ করবে বেশ৷ ঐ জায়গাতে পাথরের ওপর বসে ছবি তোলাটা আবশ্যিক, যেন মনে হলো ঐ জন্যেই দাঁড়িয়েছে নৌকাটি।

Way of communications
Only 10 minutes, okay?

বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে ফেরার পথ ধরবো, মাঝি এলো৷ এবার ফেরার পালা! এদিকের জলটা একটু তুলনায় স্বচ্ছ! ফেরার পথে একটু পাহাড়ের পাশে পাশে যেতে লাগলো নৌকা, আমিও সুযোগ বুঝে ঝরণার ভিডিও-ফটো তুলতে লাগলাম। একটা নৌকা থেকে শিষ দিয়ে গানের সুর ভেসে আসছে, ঝরণার জলের বিন্দুবৎ ধারা আমার ফোন ভিজিয়ে দিলো, যেভাবে আমি দেখলাম, আমার ক্যামেরা দেখতে পেলো না, এতো নিশ্চিত!

Touch & feel
River calls between two hills
Waiting…
Following the path…

ফিরে এসে পাঁচজন তিন রকমের ফ্রুট জুস নিলাম৷ সেই স্বাদ! একদম আসল! কোনো ভেজাল নেই, জল নেই৷ দাম যেমন নিচ্ছে, সেরকম জেনুইন জিনিস বটে। এখানে দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। সময় সেরকম থাকলে করে নেওয়া ভালো। কয়েকটা কথা বলে নেওয়ার দরকার আছে, বোটিং এ পার বোট ৮০০ টাকা, একটাতে তিনজনের বেশি অ্যালাও না, আর টিকিট কাটতে গেলে গাড়ির নম্বর লাগবে মানে যে গাড়িতে করে টুরিস্টরা ওখানে যাবে, ওটাই একরকম আইডেন্টিটি।

Eastbengal fruit juice 😜

এবার আমাদের গন্তব্য মাউলিনং…এশিয়ার পরিষ্কারতম গ্রাম!

পুরো রাস্তাটাই দারুন৷ যাওয়ার পথে পড়লো দুটো জলপ্রপাত, একটা Umkrem আর একটা Borhyll,  পরেরটা সবার প্ল্যানে থাকলেও প্রথমেরটা থাকে না৷ উমক্রেম জলপ্রপাতটাই জল খুব একটা বেশি না থাকায় নেমে পড়তে ইচ্ছে করছিলো। স্নান করার জন্যে একদম উপযুক্ত জায়গা এটা, তবে টয়লেট বা চেঞ্জিং রুম এখানে নেই, বানানোর কাজ চলছে, এখানে স্নান না করার আক্ষেপটাও থেকেই গেলো। বেশ কিছু লোকজন আরামে স্নান করছে, কাপড় ধুয়ে কেউ কেউ ওখানেই রোদে মিলে দিয়েছে। জুগাড়ু লোকজন সব!

Umkrem

ওখান থেকে বেরোনোর সময় দেখলাম লিচু বিক্রি হচ্ছে, তবে রাজুদা (ড্রাইভার) তার আগেই আমাদের জন্যে কিনে রেখে দিয়েছেন৷ লোকটা এক বিরাট এনার্জির কাজ করেছে মানতে হবে….উনি নিজেও আমাদের কে পেয়ে খুব খুশি।

Borhyll Falls from the road

যাত্রাপথে একটু যেতে পড়লো বরহিল….! বরহিলের একটা বেশ ভৌগলিক গুরুত্ব আছে, এখান থেকে ওপার বাংলার সমতল ভূমিরুপের শুরুটা লক্ষ্যনীয়৷ মাওলিনং যাওয়ার পথে যা পুরো যাত্রাপথ জুড়ে থাকবে।  দেখে নিলাম, তোলা হলো ছবিও! পাথরে পথে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ধেয়ে আসা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলকণা গুলি প্রিজমের ন্যায় কাজ করে, সাতরঙা রামধনু গঠন করেছে, ক্যামেরাও সেটা ধরে নিলো। 

Rainbow maker

এরপর পুরো রাস্তাটা দারুন, শুধুই দুপাশে সুপারি গাছ, নেটওয়ার্ক শূন্য হয়ে গেলো। এগিয়ে চলেছি আমরা, বাম দিকে বাংলাদেশের জাফলং আর ডাউকি নদী দেখা যাচ্ছে, একটু এগিয়ে যেতেই কাঁটাতারের বেড়া চোখে পড়লো….. ওপাশে বাংলাদেশের কোন পোলা গোসলে ব্যস্ত! সাথে একটি গোরুকেও দেখলাম। দারুন কম্বিনেশন। ঘন্টাখানেক পরেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। গ্রামে ঢুকতে গেলে গাড়িকে একটা চার্জ দিতে হয়, আসলে এই গ্রামকে মেঘালয় সরকার পুরো ট্যাক্স ফ্রি করে দিয়েছে, এতো সংখ্যক টুরিস্ট দেয় এরা, তাই৷ ওরা যে টাকাটা নেয়, তাতে ওরা পুরো গ্রামের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কাজ করে চলে।
একটা হোটেলে গিয়ে উদরপূর্তি করা হলো। দারুন স্বাদ। এটা রাজুদা আগেই বলেছিলেন। সত্যই কতদিন পর দারুন স্বাদের খাবার খেলাম। Beth Hotel… গেলে অবশ্যই চিকেন ট্রাই করুন। একটা স্যালাড না চাটনি দিয়েছিলো সবাই দু বার করে নিলো, দারুন বানায়। হোটেলটা চালায় মেয়েরা, আট থেকে আটচল্লিশ সব বয়সেরই খাসি মহিলা এখানে কাজ করে অহরহ, প্রচন্ড ক্ষিপ্রতার সাথে কাজ করে আর প্রত্যেকের পরনে খাসি ট্র্যাডিশনাল পোশাক! এটা তারিফ যোগ্য।

Towards the sky view


খেয়ে আসতে না আসতেই যাওয়া হলো Sky View, এখানে মাথাপিছু ৩০ টাকা নেবে, মামাদের দ্যাইশডা দেখতে পাওয়ার এক দারুন জায়গা, ওপর থেকে গ্রামটাও একটা অসম্ভব ভালো ভিউ পাওয়া যায়। পুরোটাই বাঁশ দিয়ে তৈরী, গাছের ডালে ডালে ভর করে! ভালো আইডিয়া, তবে ব্যাম্বু ট্রেকিং করা থাকলে এখানে না আসলেও হয়।

Bangladesh from Sky View
Bamboo and branches of trees


জীবনে প্রথমবারের মতো কলসপত্রী দেখলাম এই গ্রামেই। মেঘালয় টুরিজমের যে লোগো তাতেও Pitcher Plant ঠাঁই নিয়েছে।  কতদিনের ইচ্ছে পূরণ, সেই কবে ক্লাস সেভেন এইটে পড়েছিলাম, পতঙ্গভুক উদ্ভিদের কথা! আজ চাক্ষুষ করছি, নস্টালজিক হয়ে পড়লাম, রঞ্জিত বাবুর কথা মনে পড়লো।

We, the pitchers..
  • Nepenthes khasiana, বিজ্ঞানসম্মত নাম! খাসিয়ানা অর্থাৎ এ উদ্ভিদ মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ের স্থায়ী বাসিন্দা যাকে বলে। বেশ কিছু পড়াশুনার পর জানলাম বিভিন্ন কারণে উদ্ভিদটি ধীরে ধীরে বেশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে, IUCN RED LIST, 2014 অনুযায়ী। তবে এখন উদ্ভিদটিকে গারো, জয়ন্তীয়া সহ আসামের ডিমা হাসাও অঞ্চলেও পাওয়া গিয়েছে।  উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে সাউথ গারো হিলসে একটি অভয়ারণ্য আছে এই পতঙ্গভুক উদ্ভিদের সংরক্ষণের জন্যে। তবে মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকার লোকজনও এখন নিজ উদ্যোগে গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখে। লোকজনের বাগানে না থাকলে গাছটিকে আমিও লেন্সবন্দী করতে পারতাম না৷  খাসি মানুষরা ‘Tiew-rakot’ বলে ডাকে, যার মানে ‘devouring plant’ মানে ‘শিকারি’ বলা যায়; গারো ভাষায় নামটি বেশ  মজাদার। ‘মেমাং-ককসি’ (Memang-koksi), যার অর্থ ভূতের ঝুড়ি  আবার জয়ন্তীয়াতে এটিই   ‘Kset-phare’ নামে পরিচিত, মানেটা ওদের অনুযায়ী একটু হাস্যকরই, ‘lidded fly net.’

Ready to trap my foods
Not hungry….take my liquid, Bro!

এখান থেকে এলাম  MAW RYNGKEW SHARATIA, সোজা ভাষায় বললে Balancing Rock, একটি বেশ বড়ো পাথরের চাঁই অপেক্ষাকৃত একটি ছোট্ট পাথরের ওপরে কি সুন্দর ব্যালেন্স করে রয়েছে! বেশ সুন্দর। আমি হেলান দিতে কে একজন বললো হেলছে সেটাও, খুব হালকা। তবে এসবই ফিজিক্সের খেলা! পয়েন্ট মাস আসলে! ফিজিক্স আর জিওলজির মেলবন্ধন যে। ভারতবর্ষে আরও বেশ কয়েকটি উদাহরণ এরকম রয়েছে, তার মধ্যে একটি আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই, দুবরাজপুরে! তবে বছরের পর বছর পাথরটি এভাবে রয়েছে, হাজরো ঝড়ঝাপটা উপেক্ষা করে, এ জন্যে সৃষ্টিকর্তাকে কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় নেই! তবে এখানেও প্রবেশমূল্য রয়েছে, দশ টঙ্কা! পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন যথেষ্ট! বুনো পোকামাকড়ের আওয়াজ মাতিয়ে দিচ্ছে একদম৷ মেঘালয় টুরিজমের ওয়েবসাইট পড়ে দেখলাম জায়গাটি খাসি মানুষজনদের একটি প্রাচীন মন্দির বলা হচ্ছে (ancient shrine), তাই হয়তো এ হেন কাঠামো নির্মিত। প্রবেশমূল্য তবে ১০ টাকা মাথাপিছু।

Gift of science on the lap of nature

ব্যালেন্স দেখে বেরিয়ে এলাম, রাজুদা ততক্ষণে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে, এবার গন্তব্য Mawlynnong Living Root Bridge, এটি আসলেই Riwai গ্রামে অবস্থিত, যা মাওলিনং এর অব্যবহিত পূর্বেই পড়ে।  মেঘালয় এমন একটা জায়গা এখানে Suspension Bridge, Bamboo Bridge আর লিভিং রুট ব্রীজে ভর্তি! গুনে মনে হয় শেষ করা যাবে না। তার মধ্যে বিখ্যাত গুলোই টুরিস্টদের জন্যে৷ মাউলিনং থেকে নওয়েট… এই দুটি গ্রামের যোগাযোগ এর জন্যে এই রুট ব্রীজটি তৈরী হয়৷ এখন সেটিই দর্শনীয় স্থান। মেঘালয়ে এসে এই প্রথম লিভিং রুট ব্রীজ দেখবো, উচ্ছ্বাস হচ্ছে বেশ! শিরা-উপশিরার মতো রবার গাছ তার সাম্রাজ্য বিস্তার করে পুরো জায়গা কে কিরকম মায়াবী জালে আটকে রেখেছে যেন!  এক কথায় নয়নাভিরাম! সৃষ্টিকর্তার দান আর ট্রাইবাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মেলবন্ধনের দৌলতে কি জিনিস চোখের সামনে দেখছি, এ যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না! ভালো করে দেখলাম আবার ওপর – নীচ করে। শত-শত বছর ধরে খাসি – জয়ন্তীয়াদের লোকাল কালচার কে বয়ে বেড়াচ্ছে এই লিভিং রুট ব্রীজ!

Riwai Living Root Bridge
Footfalls of generations

ব্রীজের ওপর থেকে দুদিকের সবুজ বনানী, পাথরের ওপর দিয়ে প্রবাহমান স্বচ্ছ কাঁচের মতো জলধারা, যেন কেউ বলে যাচ্ছে বিশুদ্ধ বাতাস, যত পারবে নিয়ে নাও বুক ভরে! সে কি আরাম! অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায় এখানে। ঠান্ডা জলটাই একটু পা দিয়ে বসলাম, কেরামতি করে ফটো তুললাম, সামনে যাওয়া মানা, ওদিকে স্থানীয়রা স্নান করে। দেখছি, কয়েকটা বাচ্চা আর একজন মায়ের বয়সী মহিলা স্নান করছে। মানুষের ভিড় থেকে থেকে বাড়ছে, শিকড়ের সেতুকে একলা পাওয়া চাপ! এই সব গাছগুলো আসলে রবার গাছ, কত কাল পুরনো, দুইশো বছর তো হবেই হবে। হতে পারে আরও পুরনো।

Crystal clear top view


কটা গাছের কীর্তি, সেটা অবশ্য বোঝা কঠিন বটে। পাথুরে পথে চলা অবিরাম স্রোতের আওয়াজ, গাছের ডাল থেকে ভেসে আসছে অচেনা পাখির ডাক, তারই মাঝে অসংখ্য পোকামাকড়দের ধ্বনি-সবমিলিয়ে যেন এক রোমাঞ্চক্ষণ রচনা করেছে, ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না৷ একটু বসলাম। হিমশীতল জল পায়ে লাগা মাত্রই শরীর জুড়ে যেন ক্লান্তির বিসর্জন হলো। আহ! সে কি আরাম! ওপরের দিকে গিয়ে সেখান থেকে ব্রীজটাকে দেখতে আরও সুন্দর লাগে। কয়েকটা বাচ্চা দেখলাম অত্যাধুনিক ছিপ নিয়ে মাছের জন্যে চেষ্টা চালাচ্ছে। একজনকে জিগ্যেস করলাম? How many fishes? Have you caught anything? বুঝলাম সে একটু হতাশই! তার বন্ধু কিন্তু হাসিমুখে।

Concentration

ওখানে নীচে নেমে আর কয়েকটা ফটো তুলে ফিরবো, অর্ধাঙ্গিনী কে ডাকছি! দেখি একটা কাগজ নিয়ে একটি মেয়ের সাথে কি সব বলছে! বাঙালি! ব্যস! ঘটনাক্রমে জানলাম উনি কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয়ের টুরিজম ডিপার্টমেন্ট থেকে এসেছেন, কোর্সে কয়েকটি সার্ভে আছে আর জিজ্ঞাসাবাদের কারণ তাইই! আলাপ হলো, কোর্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বললাম। একটু জেনে রাখতে আর কি দোষ! বলে রাখা ভালো এখানে আসার দুটি রাস্তা রয়েছে, ওপরের পার্কিং আর নীচের পার্কিং, অনেকেই গুলিয়ে ফেলে, নীচের পার্কিং থেকে এসে ফেরার সময়ে অনেকেই ওপরের পার্কিং এ চলে যায়! এই ভুল যাতে না হয় তার জন্যে রাজুদা আগেভাগেই বলে রেখেছিলেন আর লিভিং রুট থেকে আসার পথেও রাস্তা জুড়ে  ডিরেকশন বোর্ড আছে, সুতরাং একটু সতর্ক থাকলে সেই ভুল হবার নয়। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৪০ টাকা! টয়েলেটের ব্যবস্থা এখানেও আছে, তবে ফ্রি নয় কোনো কিছুই! ব্যবস্থাপনার তারিফ না করে পারলাম না।

Purity
Take a breathe!

সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ফিরলাম গ্রামে। বেশ কিছুদিন আগে শচীন এখানে এসেছিলেন, ক্রিকেটের ভগবান পা রেখে গিয়েছেন৷ তবে এশিয়ার পরিষ্কারতম কিনা সেটার অথেন্টিসিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকলেও, এই গ্রাম যে পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে সেরা পাঁচ বা দশে থাকবে বলায় চলে। Discover India বলে একটা ভ্রমণ ম্যাগাজিনের একটি সার্ভেতে ২০০৩ এ গ্রামটি এই শিরোপা পায়, তারপর থেকে খাসি মানুষরা গ্রামটিকে আগলে রেখেছে, গ্রামটা ঘুরে মনে হলো যেনো কোনো ফেয়ারি টেলের একটা পটভূমি! চার্চ আছে একটা, খেলার মাঠও রয়েছে সংলগ্ন! মানুষরা শিক্ষিত, রিপোর্ট বলছে ২০১৪ সালেই ৯০%, তবে না হওয়ার কিছু নেই! তবে টুরিজম বাদ দিলে এদের মূল জীবিকা চাষ আবাদ আর সেটা মূলত সুপারি, আনারস আর লিচু!

Tree House

Sky view বাদ দিয়েও একটি ট্রি হাউস আছে, রাস্তার এপার থেকে উঠে ওপারে গিয়ে ট্রি হাউস, পুরোটাই মনে হয় বাঁশের তৈরী, সময়ের অভাবে আমরা যেতে পারিনি। গ্রামের বাড়ি, চার্চ, মাঠ, প্রতিটি কোণা থেকে শুরু করে বাগান এত্তোটাই সাজানো যে প্রেমে পড়ে যেতে হয়! একটি জায়গা আছে, খানিকটা জংশন টাইপের! তাতে বসার জায়গাটাও ভারি প্রাকৃতিক। পুরোপুরি প্লাস্টিক বর্জিত এলাকা! একটা ছিঁটেফোঁটা পেলাম না নোংরার! প্রতিটি পদক্ষেপে তারা প্রকৃতিকে এতটাই প্রায়োরিটি দিয়েছে, যা প্রশংসার যোগ্য। ইঁট নয়, পাথর দিয়ে রাস্তার ধার গুলি সাজানো।

The silent Junction
Bougainvillea

আমরা ছিলাম Iartong Homestay তে। বেশ সাজানো। গ্রামের মধ্যে দিয়ে একটি ছোট্ট নদীই হবে, বয়ে চলেছে, সেটা আগেও টের পেয়েছি, সেটিই দেখলাম আমাদের হোমস্টেতেই বিরাজমান, তার ধ্বনিতে হোমস্টেটি মুখরিত বলা চলে! বেশ একটা রোম্যান্টিক হোমস্টে বলতে হবে। হোমস্টের বাইরে বাহারী ফুলের বাগান, লিচু গাছও রয়েছে, বাইরে বেরোতেই সেই কলসপত্রী ঘিরে ধরলো, রাত্রি হলে এরা সেই গন্ধ ছাড়ে যা টানে পোকাপাকড়রা চলে আসে, ব্যস্!  ক্যাচ-কট-কট!

Iartong Guest House
Welcome
A cup of coffee or tea for each

ব্যাগপত্র রেখে একটু ফ্রেশ হয়ে এসেই, বেরিয়ে পড়লাম ডিনারে! বাজার সংলগ্ন একটি হোটেলে কোনোক্রমে গলাধঃকরণ করেই ফিরছি, অভিপ্রায় একটু গ্রামটা ঘুরে দেখি। রাতের গ্রামটাও দারুন, নিশ্চুপ একদম, সাজানো গ্রামটা কে ঝিঁঝিপোকার কোরাস গানে যেন আরও মোহাচ্ছন্ন লাগছে! মখমলের মতো রাস্তা একদম। মাঝে মাঝে একটা দুটো দোকান, সবই বন্ধ! বসার জায়গা গুলো বাঁশ দিয়ে তৈরী। চাঁদ আর রাতের আলোয় বোগেনভিলিয়াকে আরও সুন্দরী লাগছে। ফিরলাম এবার হোমস্টে….!

Bougainvillea @ night walk

একটানা ঘুম লাগবে একটা…. আসছে দিন! ব্যাম্বু ট্রেকিং….

তবে মাওলিনং আসার পরে একটা খাসি ভাষা শিখলাম এবং বলতে ইচ্ছে করছে Khublei Mawlynnong!

© ✒️শুভঙ্কর দত্ত || June 4, 2025

Iartong Guest House – 9362684895, 9366075185

প্রথম পর্ব – https://duttasubhankar.wordpress.com/2025/06/01/meghalaya-part-1/

মেঘের আলয়ে – প্রথম পর্ব

মেঘালয় ঘুরতে যাবো। শিলং-চেরাপুঞ্জি এইসব আর কি! সে বহুদিনের ইচ্ছে। এতোদিন আগে থেকে কখনো প্ল্যান করিনি কোনো ট্যুরের আগে। ভাগ্যক্রমে পেয়েও গেলাম একজনের ফোন নম্বর। তিনি একটা প্ল্যান যাকে সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষায় আইটেনারি বলে(itinerary), করে দিলেন, সত্যি বলতে আমি এই শব্দবন্ধের সাথে আগে পরিচিত ছিলাম না। এটা এই ট্যুরের সুবাদেই। যিনি প্ল্যানটা বানিয়ে দিলেন ওনার সাথেই ঘোরার কথা ছিলো। কতজন যাবো সেটা নিয়েই বিরাট গোলযোগ তৈরী হলো। কখনো সংখ্যাটা দুই, কখনো বেড়ে চার, আবার কখনো ছয়, কখনো বা পাঁচ, এরকম করতে করতে শেষমেশ গিয়ে দাঁড়ালো পাঁচ। সুতরাং যার সাথে ঘোরার কথা ছিলো, যিনি বানিয়ে দিলেন, তাকে আর পাবো না, এটা জেনেই গেলাম৷ কারণ তার গাড়িতে চারজনের বেশি হবে না৷ আর আমরা পাঁচজন, তিনি অন্য আর একজনকে  দিলেন। তার নামও ঘটনাক্রমে রাজু….! সত্যি বলতে ট্যুর শেষ হয়েছে, ফিরে এসেছি ছয় দিন হয়ে গেলো, এখনও ভদ্রলোককে মিস করছি। বাপরে! কি এনার্জি। একটা কথা সত্যি, যে কোনো বড়ো ট্যুরে একটা কমপক্ষে এন্টারটেইনিং ফ্যাক্টার না থাকলে হয় না, সেটা বেশিরভাগ সময়ে গ্রুপেরই কোনো এক সদস্যকে করে দেওয়া হয়, না না রকম ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। এবার আমাদের ড্রাইভারই ঐ কাজটা করে দিয়েছে। বেচারা আমাদের আগের ট্রিপে কেরালার ছ জন মহিলার একটি গ্রুপ পেয়েছিলেন, এবং সেই যাত্রার হতাশা তার বিসর্জিত হয়েছে আমাদেরকে পেয়ে। এতোটাই তিনি আনন্দিত। আমাদের পাঁচ জনের একজোট হতে একটু সময় চলেই গেলো। গুয়াহাটি থেকে যখন বেরোচ্ছি, তখন প্রায় আড়াইটে। সেদিনের সাইটসিং গুলো হবে না, এটা জানতামই৷ গুয়াহাটি থেকে শিলং যাওয়ার পথেই বুঝলাম অন্তত দারুন একজন ড্রাইভার কে পেয়েছি।

Pro-sunset @ Umiam Lake

গুয়াহাটি থেকে শিলং যাওয়ার পথটা বেশ অদ্ভুত! মেঘালয়ের রিভোই জেলাতে ঢুকতেই রাস্তার বামদিক আসাম আর ডানদিকটা (মানে ডিভাইডারের ডানদিক) হয়ে গেলো মেঘালয়৷ এরকমই চললো। তারপর একটা তেলপাম্পে গিয়ে খানিক জ্বালানি ভরা হলো গাড়ির, পরের দিন লং জার্নি আছে বেশ। কিন্তু ততক্ষণে আমাদেরও খিদে চরমে! হালকা এগিয়ে একটা হোটেলে এসে থামলো গাড়ি। রাজুদা (ড্রাইভার) ততক্ষণে কোথায় কিভাবে ছবি তুলবো, সে সব শুরু করে দিয়েছে। সেখানে চা-কফি-সিঙারা সহযোগে হালকা টিফিন করেই নিয়েই আবার শুরু হলো যাত্রা! রাস্তার দুপাশে শুধুই সুপারি গাছ, এবার রাজুদা বলতে শুরু করলেন গুয়াহাটির নামকরণ কিভাবে হলো! তার মুখ থেকেই শোনা – ‘গুয়া’ মানে সুপারি আর ‘হাটি’ হচ্ছে হাট বা বাজার। অতএব আর বুঝতে সমস্যা রইলো না। গুয়াহাটি রেলস্টেশনের ‘পলটনবাজার’ বা শিলং এর পুলিশবাজারের নামের তাৎপর্যও উনিই বুঝিয়ে দিলেন। মনে হচ্ছিলো কোনো ব্লগারের সাথে যাচ্ছি। উমিয়াম লেকে এসে থামলো গাড়ি। সূর্য অস্ত গিয়েছে আগেই, সুতরাং সূর্যাস্ত গায়েমাখা আদুরে লেকটির রূপ দর্শন করার সৌভাগ্য হলো না৷ উমিয়াম লেক আসলে মানুষের বানানো।

যাই হোক্ এরপর শিলং শহরের ঢোকার মুখে সেই বিখ্যাত ট্রাফিক পেরিয়ে যখন পুলিশ বাজারে ডিনার করলাম, ততক্ষণে রাত হয়ে গিয়েছে, দোকানও বন্ধ হচ্ছে এক এক করে। এটা সেটা কিনেই হোটেল চলে গেলাম। নিবিড় টানা ঘুম, পরের দিন সকাল থেকে পাড়ি দিতে হবে জয়ন্তীয়া পাহাড়ের দিকে, জোয়াই এর দিকে।

Present, Sir!

সকাল সকাল হোটেল থেকে চেক আউট করেই বেরোলাম জয়ন্তীয়া পাহাড়ের দিকে। অখ্যাত এক টি শপে হালকা ব্রেকফাস্ট  করে পৌঁছালাম Tyrshi Falls এ…. টিকিট কাউন্টারের লোকজন নেই, ওসব তোয়াক্কা না করেই এগিয়ে চললাম, দুপাশে জলভর্তি ধানক্ষেত, মেঠো পথটি পাথর দিয়ে বাঁধানো, দোপাটির মতো একটা ফুল বেশ ভিড় জমিয়েছে। একটু হেঁটে এগিয়ে গেলাম আরও, বৃষ্টি পড়ছে, ছাতার তলা থেকে ছবি তুলে নিলাম, গাছের পাতার ফাঁক দিয়েই জলের স্রোতের ছবি, সেই শব্দ! আরও একটু নীচে নামতে চোখে পড়লো জলপ্রপাত, বৃষ্টি আর জলপ্রপাতের জলকে আলাদা করা তখন অসম্ভব। তারই মধ্যে চললো ফটোগ্রাফি৷ জলপ্রপাত যদিও এটাকে বলা যায় না, কাসকেড এক রকমের৷ ধাপে ধাপে জলের ধারা নেমে আসছে নীচের দিকে, নীচের দিকে এগিয়ে চলেছে ধান জমির দিকে। জায়গাটি বেশ নির্জন, তার জন্যেই এতো ভালো লাগে। পুরো পথ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে এখানের এক ফুল, বুঝলাম স্থানীয় বাসিন্দা এখানকার। ফিরে আসার সময় দেখলাম  টিকিট কাউন্টারে লোক। বেরোনোর সময় এমন অভূতপূর্ব এন্ট্রি ফি আগে দিইনি।

Kind of umbrellas….
The leaves – garments of the falls….
Cascades….. Ms. Tyrshi

এখান থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটছে Phe Phe র উদ্দেশ্যে, রাজুদা তার আগের ট্রিপের গল্প বলে চলেছে মাঝে মাঝেই৷ Phe Phe র পার্কিং এ এসে দাঁড়ালো। ম্যাগি আর চা খেয়ে এগিয়ে চললাম ছোট্ট একটা নদীর দিকে। ওখানের রিসর্ট গুলোর টুকরো টুকরো জলছবির জন্যে বেশ নৈসর্গিক বানিয়ে দিয়েছে জায়গাটাকে।  একটা ছোটো ডিঙি নৌকায় করে পেরোতে হলে নদীটা, মাথাপিছু ১১০ করে। কি সুন্দর একটা জায়গা, একজন খাসি মহিলা ছাতা মাথায় গরু চরাচ্ছে। চড়াই উৎরাই রাস্তায় মাঝে মাঝে কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে চলেছি, কয়লা খনন হয়েছে এ পথ থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছে, একটা ঘোড়া না গাধা – ওটা! সেটারও ব্যবস্থা আছে, কেউ হাঁটতে না পারলে। অবলা প্রাণীটি তার গ্রাহকের অপেক্ষায় ক্লান্ত মনে হলো। তার মালিককে দেখলাম হতাশ হয়ে শুয়ে পড়লো। একটা করে লাঠি নিয়ে এগিয়ে চলেছি Phe Phe র দর্শনে….যে নদীটিকে পেরিয়ে এসেছি, এখন দেখলাম সেইই ঐ চড়াই-উৎরাই এর সাক্ষী! বেশ হালকা শব্দে জানান দিয়ে চলেছে তার উপস্থিতি, ওপারে কতিপয় পাইন গাছের মিটিং চলছে মনে হলো। যাওয়ার পথেই দেখলাম আমাদের সাথে যারা এসেছিলেন, তারা ফিরছেন, এতো জলদি?

Landscape
to and fro for Phe Phe
Livelihood
Now calm and cool….!


ইতিমধ্যেই বৃষ্টিও শুরু হয়েছে, হালকা করে….! তোয়াক্কা না করেই এগোলাম৷ ব্যস্ চোখে পড়লো জলপ্রপাত! এটা ওপরের ফলস। এবার বুঝলাম আমাদের কিছু আগেপরে আসা লোকজন এত জলদি ফিরছে কি করে! রহস্য উদঘাটিত। এবার প্রবেশমূল্য লাগবে। মেঘালয় ঘুরতে এসে যেটা বুঝেছি, সেটা হচ্ছে এখানের টুরিজমটা চালায় সাধারণ মানুষরা, প্রবেশমূল্যের কত পার্সেন্ট সরকারের ঘরে যায় সে নিয়ে আমার কোনো অভিযোগের জায়গায় নেই, বরং মানুষজন তদারকি করে বলেই কিছু পাণ্ডববর্জিত এলাকাতেও  লোকাল মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো….!

The upper falls with the absolute landscape…
Upper and lower into the clouds…
Peeping through the leaves…
The foggy lens takes him closer… 

যাই হোক্ এবার ট্রেকিং এর রাস্তা আর সেটা মোটামুটি নাই নাই করে হলেও ২০-২৫ মিনিট। পুরোটাই নীচে নামতে হবে। রাস্তা ঘিরে আছে  ছোটো ছোটো বাঁশের ঝোপ, যেগুলো দিয়ে তৈরী হয় ঝাড়ু। একটু একটু করে নীচে নামছি আর lower falls টা তার গুরুগম্ভীর গর্জনের সাথে জানান দিচ্ছে! পৌঁছে গেলাম সে জায়গায়। এ কি দৃশ্য! এ অনন্য! এ যে বন্য! দু চোখ ভরে দেখতে থাকলাম – Paradise Waterfalls, হ্যাঁ জয়ন্তীয়া এলাকার স্থানীয় ভাষায় ‘Phe Phe’ মানে প্যারাডাইস, নৈসর্গিক!  সত্যিই তাই…..! কথায় আছে যে জিনিস যতটা প্রকৃতির ভেতরে তার সৌন্দর্যও ততটাই! এই Phe Phe এর নীচের ফলসটা তারই প্রমাণ যেন। উঁচু থেকে জলরাশি নীচে নামার আগেই যেন বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে, ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের আর ক্যামেরাকে….যেন কিছুতেই তাকে ফ্রেমবন্দী করতেই দেবে না! এই তার চ্যালেঞ্জ! শব্দদানবের মতো হু হু শব্দে নীচে নেমে আসছে, পাথুরের সাথে তীব্র সংঘর্ষ যেন! নীল জলরাশি, গাছের ফাঁক দিয়ে তাকে দেখে নিলাম নামার আগেই! ঐ ওতো দূর থেকেই ভিজিয়ে দিলো পুরো। বাঁশের সেতু পেরিয়ে অন্য দিকটাই যাওয়া যাবে। আসলে Jowai এর দিক থেকেও এই জলপ্রপাতটা তে আসা যায়, আমরা ডাউকি র দিক থেকে গিয়েছি। ওদিক থেকে আসাটা একটু কঠিন৷ পুরোটাই পাহাড়ি পথ।  বাঁশের সেতুটা  অসামান্য রোমাঞ্চকর! বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরলাম।

Phe Phe waterfalls
The falls and the dancing bidge….
Natural swimming pool

তবে ফেরার পথে এইখানে সাঁতার কাটতে না পারার আক্ষেপ টা রয়েই গেলো। ফিরতি পথে ভাবছি যারা ওপরের ফলস টা দেখেই ফিরে চলে গেলো, তারা কি লোকসানটাই না করলো, তবে যে পথে শুরু করেছিলাম বিন্দুমাত্র বুঝতে পারিনি যে এতো সুন্দরী হবে জলপ্রপাতটা, এটাই বোধহয় মেঘালয়ের বিশেষত্ব। যাওয়ার পথে বৃষ্টি এলো, এবার বর্ষাতি ছাড়া উপায় নেই। এখানে স্নান করার দারুন একটা সুযোগ ছিলো, চেঞ্জিং রুমও আছে, তবে ড্রাইভার রাজুদা বললেন পরেরটাই দারুন ব্যবস্থা, তাই আর এখানে করিনি। ফেরার সময়ে অনেকেই জিগ্যেস করলেন কতটা, প্রায় একঘন্টা বলতে তারা একটু মনঃক্ষুণ্ন হলেন, বুঝলাম, আসলে মেঘালয় ঘুরতে আসার আগে তারা ন্যূনতম হোমওয়ার্ক করে আসেননি, এটা বুঝেছি। দেখি সেই গাধা না ঘোড়া না খচ্চর কি জানি সে তার পিঠে করে একটা বাচ্চা কে নিয়ে আসছে! যাই হোক্! ডিঙিতে করে পেরোলাম নদীটা….!

Clouds are just about to….


এবার গন্তব্য Krang Shuri Waterfalls….
ওখানে গিয়েই লাঞ্চ সেরে নিলাম৷ বেশ কয়েকটি হোটেল আছে, মেঘালয় এতোটা উন্নত রাজ্য এটা আমার ধারনার বাইরে ছিলো। প্রায় প্রতিটি টুরিস্ট স্পটেই কমবেশি খাওয়া, টয়লেট, চেঞ্জিং রুমের ব্যবস্থা রয়েছে। তার মানে মানুষজন কতটা আপন করে নিয়েছে টুরিজমটাকে। খেয়েই বেরিয়ে গেলাম ক্রাংসুরির উদ্দেশ্যে! দূর থেকেই শোনা গেলো শব্দ! জঙ্গলে ঘেরা একটা জলপ্রপাত, যার ওপরের দিকে ন্যাচারাল সুইমিং পুলে লোকজন কায়াকিং করছে, সাঁতার কাছে, দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে। আসলেই স্থানীয় ভাষায় Krang” শব্দের মানে “cave,” আবার “Suri” মানে “sickled-shaped weapons”. সুতরাং ক্রাংসুরি মানে ”কাস্তের মতো অস্ত্রের গুহা”,  এর পেছনেও গল্প আছে, সেটা পরে জানলাম – জলপ্রপাত এবং এর আশেপাশের এলাকা ঐতিহাসিকভাবে একটি নির্জন অস্ত্রাগার হিসেবে পরিচিত ছিল, এখানেই প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে জয়ন্তীয়া রাজারা অস্ত্র লুকিয়ে রাখতেন। তবে ক্রাংসুরির রাস্তাটা বেশ ভালো। এখানে জিপ লাইনিং এর মতো অ্যাডভেঞ্চার করার সুযোগ আছে। তবে পৌঁছে বুঝলাম নীচের পুলটায় নামতে দেবে না, কারণ  জলের স্রোত অনেক বেড়ে গিয়েছে। আসল মজাটাই মাটি হয়ে গেলো। এখানে ব্যবস্থা ভালো, তবে ওপরের পুলটা বেশ কৃত্রিম এবং ছোটো! তবে এখানে কায়াকিং এর ব্যবস্থাও রয়েছে। আমি আর অর্ধাঙ্গিনী দুটো লাইফ জ্যাকেট ভাড়া করে নেমে পড়লাম, ঠাণ্ডা জল, তার সাথে আবার বেলাও পড়েছে ভালোই! একটু সময়ে কাটিয়ে উঠে পড়লাম। সূয্যি পাটে গিয়েছে, এবার ফিরে পড়লাম! হোটেল ফিরতে হবে!  রাত্রিবাস ডাউকিতে….! 

Krang Shuri Waterfalls
Hidden in the jungle
Peace with teal green

শিলং এ আমরা ছিলাম গলফ লিঙ্কের কাছে হিলসাইড লাক্সারি ভিলা তে। Goibibo তে পেয়েছিলাম। বেশ সস্তায় মোটামুটি। আর পরের দিন ডাউকি তে ছিলাম, বাংলাদেশের বর্ডার তামাবিলের থেকে একটু কাছেই, বোটিং পয়েন্টের কাছের হোটেল গুলো তুলনামূলকভাবে ভালো। আমরা ছিলাম Niongti Guest House এ। খুব একটা ভালো নয়, তবে একটা রাত কাটিয়ে দেওয়া যাবে যেভাবেই হোক্।

পরের পর্বে – ডাউকি আর মাউলিনং

✒️শুভঙ্কর দত্ত || June 1, 2025

অভয়ারণ্যের অন্দরমহল ‘চটকপুর’ এ একরাত্রি…

পাহাড়ের ট্র্যাফিক জ্যাম আর ‘দীপুদা’র ‘দা’ মানে দার্জিলিং এর চূড়ান্ত অব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে প্রথমে তো ভেবেছিলাম দার্জিলিং যাবোই না। কিন্তু পরে ভাবলাম আমার অর্ধাঙ্গিনীসহ আমার বাকি সহযাত্রীদেরও “দী-পু-দা” এখনও কমপ্লিট হয়নি। সুতরাং, ঐ কাজ আগে সেরে নেওয়া যাক্, তবে আগে থেকেই প্ল্যান ছিলো দু রাত ”কুইন অব হিলস” এ কাটিয়ে দেওয়ার পরে একটা রাত অফবিটে কাটাবো৷ আর সেটা চটকপুর হলে ক্ষতি নেই৷ দার্জিলিং থেকে Glenarys আর জু-এর রেড পান্ডা ছাড়া পজিটিভ কিছুই ছিলো না। তবে ”চটকপুর” পুষিয়ে দিলো, নইলে ভীষণ মন খারাপ হয়ে যেতো। একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত!

পাহাড়ের কোলে চমৎকার চটকপুরে…


দার্জিলিং থেকে সোনাদা এলাম, কুলুং হোমস্টের দূরত্ব এখান থেকে মাত্র ৭ কিমি৷ তবে কিলোমিটারে বললে বুঝতে খুব ভুল হবে। কারণ পাহাড়ি পথ। এতক্ষণ পর্যন্ত এটাই জানতাম৷ কিন্তু যেই গাড়ি মোড় নিলো জঙ্গলী পথে, ক্রমশ বোঝা গেলো যে পথ খুব কঠিন৷ দু ধারের ঘন জঙ্গলের বুক চিরে পাথুরে পথ, আমাদের দিকে চেয়ে আছে যেন টুকরো টুকরো পাথর গুলো। পাকদণ্ডী সেই পথে আমাদের ড্রাইভারও প্রথমবার, তার অভিজ্ঞতা ছিলো না আগে। এটা জানলে আমরাই নিতাম না, তার ওপর আবার সুমো বা বোলেরো গাড়ি না৷ তারও কষ্ট দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার পথে একজন মধ্যবয়স্ককে দেখলাম স্কুটি নিয়ে আসছে, কিছুটা এগিয়ে কয়েকটা হোমস্টে আর তারও পরে তিনজন যুবককে দেখলাম হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে। একটা সময় পরে একটা চেকপোস্টে এসে গাড়ি থামলো।

সেই চেকপোস্ট যেখান থেকে এন্ট্রি নিতে হয়…

ঘন পাইন বন, মেঘের দল গাছগুলোকে রীতিমতো ঘিরে ধরেছে। চেকপোস্টে জনপ্রতি ১৫০ টাকা দিয়ে ঢুকতে হলো, গাড়ির জন্যে ৪০০ টাকা। এই বিষয়টা জানা ছিলো না একেবারেই। চটকপুর আসলে একটা পাহাড়ি গ্রাম, যা কিনা Senchal Wildlife Sanctuary র মধ্যে অবস্থিত, West Bengal Tourism এর ওয়েবসাইট এর দেওয়া তথ্য মতো এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 7887 ফুট উঁচুতে অবস্থিত, যা কিনা টাইগার হিল (8500 ফুট) থেকে কিছুটা কম। মেঘের দল এতোক্ষণ ছোটাছুটি করছিলো, কিন্তু কখন যে বারিধারা হয়ে ঝরে পড়তে শুরু করেছে, বুঝতেই পারিনি। তুমুল বৃষ্টি, আর তার মধ্যেই পাহাড়ি পথ দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে, এবার দ্বিতীয় একটা চেকপোস্টে এসে গাড়ি থামলো। এবার পথটা আরও খাড়া, নেমে দাঁড়াতে হলো দুজনকে, গাড়ির কালো ধোঁয়ার রাশি ঐ অবস্থাতেও নিজের কষ্টের জানান দিলো বোধ হয়। অবশ্য সুমো বা বোলেরো হলে এমন হতো না। এবার হোমস্টে গুলো শুরু, একটা জায়গায় এসে গাড়িটা থামতে বাধ্য হলো। সন্দীপ আর সৌমেন ঐ বৃষ্টির মধ্যে দুটো ছাতা নিয়ে হোমস্টের খোঁজে নামলো, ততক্ষণে বেশ কয়েকবার কল করেও পাইনি, নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়নি৷ দুজনকে সঙ্গে করে নিয়ে এলো ওরা, তারা আমাদের মালপত্র গুলো কে নিয়ে গেলেন। Kulung Homestay, এখানেই আমাদের একরাত্রির ঠিকানা, বৃষ্টি থামলো, আমরাও একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপর দুপুরের আহারাদি সেরে নিজেরাই বেরিয়ে পড়লাম।

এমনই বারান্দা চাই
Kulung Homestay

আহহহ কি আরাম! চটকপুর যে কতটা অপূর্ব সেটা প্রথম দর্শনেই বোঝা গেলো – দূরের পাইন বনের কোলে ফরেস্ট বাংলো, অর্গানিক ফার্মিং এর আনাজপাতি, হাজারো পাখির কলরব, এপিফাইটিক অর্কিডসহ রঙবেরঙের অজস্র বাহারি ফুল আর তার সাথে মেঘ-পাহাড়ের ভোলবদল!

পাহাড়ি ফুল
ভিন্ন সময়, ভিন্ন প্রাকৃতিক সাজগোছ কিন্তু এই একটা জিনিস স্থির….

আগেই বিনোদ রাই (হোমস্টের মালিক, আর ফরেস্টো বাংলোর ম্যানেজার) বলে দিলেন সন্ধ্যে হবার আগে ফিরে আসতে। কালি পোখরির দিকে যদিও চারটের পরে আর যাওয়া নিষেধ, সেটা নীচে যেতেই বুঝতে পারলাম। হোমস্টের ওপর থেকে সে কি নয়নাভিরাম দৃশ্য, মন ভরে গেলো, আগের দুদিনের হতাশা আর সোনাদা থেকে ঐ রাস্তার ভয়ানক অভিজ্ঞতা এক নিমেষে ভুলে গেলাম যেন। 

ওয়াচ টাওয়ার – এটাই চটকপুরের লোগো

হোমস্টে থেকে কিঞ্চিৎ দূরেই ওয়াচ টাওয়ার, সেখানে পৌঁছাতে দেখি ১০-১২ জনের একটা বুড়িদের দল, ক্যামেরাটা আমার হাতে দিয়ে তাদের সে কি উল্লাস! লজ্জা পেলো নিজেদের। তারা চলে যেতে ওয়াচ টাওয়ার টা ফাঁকা হয়ে গেলো। আর এখান থেকে চটকপুরের পুরো ভিউটা পাওয়া যায়, শোনা যায় দূরের পাহাড়ের (জানা গেলো সিটং এর) কোনো মনাস্ট্রি থেকে প্রার্থনার আওয়াজ। পাহাড়ের কোল থেকে মেঘমালা যেন উর্ধ্বগামী, সে এক অপূর্ব দৃশ্য, মনে হলো এক কাপ চা নিয়ে এখানে বসে থাকলে ভালো হতো। দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ঢেকে ফেলেছে মেঘ গুলো। তার দর্শন পাবো কিনা নির্ভর করছে বৃষ্টি কতটা হবে তার ওপর। ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে বসলাম, উঠতেই ইচ্ছে করে না। মেঘেদের ছোটাছুটি, মেঘ-রোদ্দুরের লুকোচুরি, সামনের গাছগুলোও যেন সেই তালে নেচে চলেছে, প্রতিটা আওয়াজ একদম কানে এসে লাগছে, মন শান্ত করে দেওয়া হাওয়া, অপূর্ব শান্তি! মনে হচ্ছে সর্বশক্তিমান নিজে হাতে এসব বানিয়েছেন, এমন অপরূপ সুন্দর এই পৃথিবী, তৎক্ষনাৎ চোখে পড়লো কটা প্লাস্টিকের প্যাকেট, ছবি তুলতে গিয়ে দেখি পুরো ফ্রেমটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে, মাঝে মাঝে ভাবি এই নিসর্গতার মাঝেও কার ইচ্ছে করে নোংরা করে দিয়ে যেতে? আসলে চটকপুর সবার জন্য নয়। মৃদুমন্দ বাতাস মাঝে মাঝে পাগলও হয়ে যাচ্ছে, সাথে মেঘ গুলোও, বৃষ্টি আসবে মনে হলো। পাহাড়ে ওয়েদার খুব জলদি পাল্টে যায়,এই অভিজ্ঞতা মোটামুটি তামেঙলঙের দৌলতে ছিলোই৷ এবার বেরিয়ে এলাম, অর্গানিক ফার্মিং এর রমরমা বাজার এখানে, প্রায় প্রতিটা ঘরই এই পদ্ধতিতে চাষ করে, তবে ম্যাক্সিমামটাই ফুলকপি দেখলাম৷ আর আমাদের খাবারের ম্যাক্সিমামটাই জৈব পদ্ধতিতে চাষ করা।

Organic Farming….

কিন্তু হোমস্টে ফিরে বসে থাকতে ইচ্ছে করলো না, আবার বেরিয়ে পড়লাম দুজনে,এবার নীচের দিকটাই যাবো। Lower Chatakpur বলে যেটাকে। অন্য হোমস্টে গুলো চোখে পড়লো তখন৷ একদম নীচে ফরেস্ট বাংলো, যার ম্যানেজার বিনোদ জী, আমাদের হোমস্টের মালিক, বিনোদজী ১৫ বছর ধরে ফরেস্টের কাজে যুক্ত, বনের মধ্যে বুনো জন্তু জানোয়ারের আনাগোনা সেইই প্রত্যক্ষ করে, ট্যাপিং ক্যামেরা তে। পরিচয় হলো এক হোমস্টের মালকিনের সাথে, সামনেই, এক কাপ কফি ওনার ছোট্ট দোকানে অর্ডার মারলাম, বেশ সুন্দর জায়গাটা, আমি আর আমার অর্ধাঙ্গিনী বসে একটু গল্প করছিলাম। এবার উঠতে হবে। দ্বিতীয় চেকপোস্ট থেকে দুটো রাস্তার যেটা নেমে গিয়েছে নীচের দিকে সেটা ধরে আমরা উপরে এলাম, কিন্তু এতোক্ষণ হাঁটছিলাম বেশ ভয় লাগছিলো। অতঃপর এলাম সেই জায়গাটাতেই। হোমস্টে ফিরে চিকেন পকোড়া সহযোগে চা পানের বিরতি চললো। পকোড়ার স্বাদ অতুলনীয়।

Lower Chatakpur থেকেই আসলে গ্রামের শুরুয়াত
সান্ধ্যকালীন
ये शाम मस्तानी

সন্ধ্যে নামার পালা এবার। পাহাড়ে সন্ধ্যে কখন হয়ে যায় বোঝা দায়, হুট করেই। আর সন্ধ্যের চটকপুরের আকাশের রঙ ঘনঘন বদলাতে শুরু করে। তবে একটু সন্ধ্যে হতেই একদম নিস্তব্ধ, মনে হচ্ছিলো কেউ যেন Mute button টা প্রেস করে দিয়েছে, চারদিকের হোমস্টে গুলোতে পরিমাণমতো আলো, যেটুকু না জ্বালালেই নয়, আর দূরের ঘন জঙ্গলটা তখন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে, এমনিতেই সন্দীপ ”পর্ণশবরীর শাপ” এর কেসটা বললো, শুনিনি তখনও, একদম গা ছমছমে ব্যাপার। আস্তে আস্তে পুরো অন্ধকার সবকিছু। আর কি সুন্দর হাওয়া, ঐ হাওয়া নিস্তব্ধতার সাথে মিশে গিয়ে আমাদের টেনে আনলো বারান্দায়, পরিস্কার আকাশে তারা গুলো জ্বলজ্বল করছে, এরকম পরিস্কার আকাশ আমি শেষ দেখেছিলাম তামেঙলঙে। তবে যা হাওয়া দিচ্ছে, ছবি তোলা দায়। রাতের ডিনার দিয়ে গেলো সাড়ে আটটায়, ডিনার সাপটে শুলাম যখন ঘুম একদম চোখের সামনে। চোখ বুজলেই একটাই চিন্তা সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা দেবে কি না! বিছানায় এলিয়ে যাওয়ার আগে লক্ষ্য করলাম হোমস্টে গুলোর লাইট সব বন্ধ করে রাখা৷ অভয়ারণ্যের নিয়ম যা।
ক্লান্ত শরীর আর শান্ত মন – ঘুম হলো জমিয়ে। পরের দিন ভোরে উঠে দেখি সন্দীপ টাইম ল্যাপ্স নেওয়া স্টার্ট করে দিয়েছে, দূরের কাঞ্চনজঙ্ঘা স্পষ্ট না হলেও বোঝা যাচ্ছে দারুণভাবে।  ৪:৪৮ এ সানরাইজ, প্রাতঃকর্মের মায়া পরিত্যাগ করে দৌড়ালাম ওয়াচ টাওয়ার এর দিকে,  দেখি  কাঞ্চনজঙ্ঘা!  চমৎকার!  অপূর্ব!  অসাধারণ!  নয়নাভিরাম!  ঈশ্বরের দর্শন পেলাম যেন৷ তবে অস্পষ্ট, মনে হলো সব কি আর একবারে হয়? তবে সূর্যোদয় হলো ঠিক সময়েই, সূর্যিমামা বেরোনোর সাথে সাথেই আর একটা কাণ্ড ঘটলো, কাঞ্চনজঙ্ঘা টা আস্তে আস্তে মেঘেই ঢেকে গেলো। পরে যারা এলেন, তারা হতাশ।

কাঞ্চনজঙ্ঘা র দর্শন
Five Treasuries of the Great Snow
ওয়াট টাওয়ার থেকে সূর্যোদয়…
Homestay থেকে…..! চটকপুর
মেঘ গুলো যেন পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে…
প্রকৃতির ভোলবদলের সাক্ষী

হোমস্টে ফিরে এটা সেটা খেয়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে বেরোলাম বহু প্রতীক্ষিত  কালি পোখরির দিকে, বিনোদজীর সাথে দেখা হলো তার আগে৷ উনি যা সব দেখালেন, রীতিমতো রোমাঞ্চকর ব্যাপার, গা শিউরে ওঠে। সে সব থাক। আমাদের মনে একটা প্রশ্ন ছিলো যে এখানকার বাচ্চারা পড়াশুনো করে কি করে? বিনোদজী বললেন – ওরা রোজ সোনাদা পর্যন্ত হেঁটে যায় আর আসে, একজন বড়ো কেউ থাকে ওদের সাথে। 

অভিসারী পাইন বন
ট্রেকিং পথে ষাটোর্ধ্ব রা
মেঘের দল যখন প্রিজমের কাজ করে…

আসলে জঙ্গলের ভেতরে ওদের গার্ড ছাড়া যেতে দেওয়া নিষেধ। কিন্তু আমাদের বললেন কোনো সমস্যা নেই, আপনারা যেতে পারেন। পাইন বনের ভেতর থেকে আকাশ দেখা যাচ্ছে কিঞ্চিৎ,  গাছের গায়ে শ্যাওলা, শুধু কি তাই? বুনো জন্তুদের আঁচড়ের দাগ, সৌজন্যে – ভালুক, ভালুকের রাজত্ব এই জঙ্গলে। দু ধারের ঘন পাইন বনের মাঝে দিয়ে বুনো রাস্তা ধরে এগিয়ে চললাম, একটা সময় পরে রাস্তা ক্রমাগত সরু হতে শুরু করলো, তার সাথে বাড়তে থাকলো আঁচড় খাওয়া গাছের সংখ্যা, মোবাইল নেটওয়ার্ক শূন্য, জিপিএস তথৈবচ! এই হচ্ছে আসল মজা, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আপলোডিং, ভয় লাগছিলো একটা কারণেই যে এখান থেকে সবকিছু Irreversible! সরু রাস্তা ধরে এগোচ্ছি আর সন্দীপের ম্যাপ ডিরেকশন নিয়ে দশবার প্রশ্ন তুলছি! স্যাঁতস্যাঁতে  সরু রাস্তা ধরে এগিয়েই চলেছি, শেষ কবে সূর্যরশ্মি পড়েছিলো এখানে ভগবান জানে! মোটামুটি সাত মিনিট সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটার পরেই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ – কালি পোখরি! মহাদেব এখানে অধিষ্ঠাতা, জঙ্গলের ঘেরা একটা ছোট্ট জলাশয়, নেপালি ভাষায় কালি মানে কালো আর পোখরি মানে লেক আসলে! এই কালি পোখরি চটকপুরের মানুষের কাছে খুবই বিশ্বাসের একটা জায়গা, তবে জলটা কালো নয় আসলে সবুজ। কিন্তু বিশাল কিছু পাতা পড়ে থাকতে দেখলাম না জলের ওপরে। কে জানে কি রহস্য আছে! ট্রেকিং করতে আসার সময়ে মনেই হচ্ছিলো এই জলাশয়ে বুনো জন্তুরা তেষ্টা মেটাতে আসে, আর জলাশয়ের ধার বরাবর  একটু এগিয়ে যেতেই বোঝা গেলো এটা ঠিকই! দেখলাম – চিতার পায়ের ছাপ, স্পষ্ট বোঝা গেলো, স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে। আর পায়ের ছাপ বলছে তিনি আমাদের রাস্তা ধরেই জলপানের বিরতি সারতে এসেছিলেন…..! ব্যস আর কি? শুধু দেখা হলো না, জলপানের সাথে একদম সপ্তাখানেকের লাঞ্চ ডিনার সব তিনি মিস করে ফেলেছেন – মনে ভয়, মুখে হাসি নিয়ে এসবই বলাবলি হচ্ছে।

শীতে অনেক সময় জমে যায় – কালি পোখরি
কালি পোখরি তে মহাদেবের অধিষ্ঠান
চিতার বায়োমেট্রিক

পুরো জলশয়টা এক চক্কর মারতে চেয়েছিলাম, সিলমোহর দিলো না অন্যরা। অগত্যা, ফিরে যেতে হবে৷ তবে সেদিন কালি পোখরি তে আমাদের আগে মনে হয় কেউ যায়নি, গেলে ঐ পাগ মার্ক দেখতে পেতাম না আমরা, বন্যরা ভোরের দিকে আসে, ফেরার পরে বিনোদজীর সাথে গল্প হচ্ছিলো, বললেন। ফেরার পথে দেখলাম দুজন আসছেন, সঙ্গে একজন গাইড আর দুটো কুকুর! কুকুর কেন সেটা নিশ্চয় বলে দিতে হবে না! এই গ্রামে কুকুর প্রায় নেই বললেই চলে, আসলে চিতাবাঘ নিয়ে চলে যায়। জানা গেলো এদের মধ্যে একটা কুকুর ইতিমধ্যেই চিতার সাথে যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে।

কালি পোখরি থেকে ফেরার পথে


রহস্য ঘনীভূত ততক্ষণে, কালি পোখরির পাথরের মধ্যে কি দেবদেবী আছে, সেটা অবশ্য আমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো, কিন্তু বাকিরা সঙ্গ দিলো না। ফেরার পথে ওপরে এসে খানিকটা জিরোলাম, জঙ্গল থেকে ইতিউতি পাখিদের ডাক, আরও কত বুনো পোকার অস্তিত্বের আওয়াজ, pindrop silence একদম! মনে হলো রেকর্ড করলে আস্ত কয়েকটা ringtone পেয়ে যাবো। এরকম নিস্তব্ধতা, তার ওপর ঘন পাইন বন, কখনো তার ফাঁকতালে আকাশ আবার কখনো মেঘ! এক অসামান্য রোমাঞ্চকর অনুভূতি,  সে সব ব্যক্ত করার মতো ভাষা নেই! শহর দার্জিলিং থেকে অনতিদূরেই একটা অভয়ারণ্যের অভ্যন্তরে আমাদের জন্যে যে এতোটা সুখ লুকিয়ে থাকবে কল্পনাও করতে পারিনি। একটা রাত্রিযাপনেই একটা পাহাড়ের এতো গুলো রূপ— রোদ-মেঘ-বৃষ্টি-হাওয়া-জঙ্গল-বন্যপ্রাণী! কালি পোখরি এই চটকপুরের একদম অন্দরমহলে, তার হয়তো রূপ বিরাট কিছু নয়, কিন্তু অবস্থানই তাকে এতোটা মূল্যবান করে রেখেছে। দিনের আলো এখানে পড়ে খুব কম, আর পড়লেও  তা সূর্যাস্তের অনেক আগেই বিলীন হয়ে যায়, হয়তো তখনই ভালুক গুলো নিজেদের অস্তিত্বের পরিচয় দিতে গাছগুলোকে চিরে দেয়।

ভালুর আঁচড়


হোমস্টে ফিরে প্রাতঃরাশ সেরে নিলাম। এবার ফেরার পালা!  একটা সুমোয় করে ফিরছি। সর্পিল পাকদণ্ডী পাহাড়ি পথে এবার সংযোজন হলো মেঘ! ঘন মেঘ চিরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে, সামনে দুহাত দূরে কি আছে দেখা যায় না। বৃষ্টি – মেঘ,  পাইন বন সবমিলিয়ে চটকপুর যেন প্যান্ডোরার বক্সের মতো তার সারপ্রাইজ দিয়েই চলেছে!  সেই চেকপোস্ট টা পেরিয়ে কিছুটা নামতেই সোনাদা!

পথ আটকে মেঘ
জঙ্গল সাফারি
নৈসর্গিক – ক্যানভাসে আঁকা ছবি
গাছের গুঁড়ি যখন ফুলের টব

কয়েকটা বিষয় এক্ষেত্রে বলে রাখি! বিনোদজীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী –
১. কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সবচেয়ে ভালো সময় অক্টোবর নভেম্বর! তবে জুনের ১৫ থেকে সেপ্টেম্বর এর ১৫ পর্যন্ত এই অভয়ারণ্যে প্রবেশ নিষেধ কারণ ঐ সময়টা Breeding season বন্য জন্তুদের!
২. অভয়ারণ্যের নিয়ম অনুযায়ী এখানে বনফায়ার করা নিষেধ, তাই কেউ এই আশা নিয়ে আসবেন না আর অনুরোধও না!
৩. কেউ চাইলে ট্রেকিং করেও আসতে পারেন সোনাদা থেকে, দু ঘন্টা লাগবে বড়োজোর (আমরা আসার সময়ে যে তিনজন যুবককে দেখেছিলাম, তারা পুরোটা ট্রেক করে এসেছিলো…!
৪. এখান থেকে কাছেই দাওয়াইপানি, তিনচুলে, তাকদা, লামাহাট্টা! দাওয়াইপানিও দারুন। ঐ জায়গাতে একরাত কাটিয়েও এখানে আসতে পারেন।

রাস্তা নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকতে পারে কিন্তু রাস্তা এমনতর কেন, সেটা বুঝেছিলাম বিনোদজীর থেকেই! অভয়ারণ্য, তাই সবকিছুই বুনো হতে হয়৷ এই আর কি…..! পাহাড় ভালোবাসলে, চটকপুর আপনাকে হতাশ করবে না, রোমাঞ্চকর অনুভূতি থেকেও বঞ্চিত করবে না পাহাড়ি এই ছোট্ট গাঁ…..!

পথনির্দেশ - শিলিগুড়ি হোক বা দার্জিলিং থেকে আসতে হবে সোনাদা, শেয়ার ট্যাক্সি বা বাস বা টয় ট্রেন যে কোনো একটাতে আসা যায়। টয় ট্রেন বাদে বাকিগুলো শিলিগুড়ি বাস স্ট্যান্ড থেকে পাওয়া যায়। সোনাদা তে এসে ১২০০ টাকায় গাড়ি বুক করে যেতে হবে, হোমস্টে কে বলে দিলেও ওরা অ্যারেঞ্জ করে দেয়। 
চটকপুর ফরেস্ট বাংলো
Yes, I will visit again

কয়েকটি হোমস্টের যোগাযোগ নম্বর

1. Kulung Homestay – 89003 12451

2. Prema Homestay – 9609717651 , 9476381475

3. Akriti Homestay – 8207221164 , 9933104230

4. Tashi Homestay – 9832100868 , 7583911776

5. Pooja Homestay – 9883854338 , 9732411902

প্রতিটারই রেট কমবেশি একই৷ ফুড আর লজিং নিয়ে চার্জ পড়ে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিজন আর হোমস্টের অবস্থান এর ওপর নির্ভর করে। তবে প্রত্যেকেরই রেটিং দুর্দান্ত। ফরেস্ট বাংলো বুক করতে হলে ওয়েবসাইট থেকে করতে হয়।

✒️শুভঙ্কর দত্ত || May 19, 2024

হঠাৎ করেই হংসেশ্বরী…

কথায় আছে যে খায় চিনি, যোগায় চিন্তামণি….

আসছি সে কথায়। সেদিন একটা পরীক্ষা ছিলো ব্যারাকপুরে, শ্রীরামপুরের ফেরী ঘাট থেকে ফেরী ধরেই জাস্ট নদী পেরোলেই ব্যারাকপুরে আমার গন্তব্য মানে পরীক্ষার সেন্টার! ব্যারাকপুরের ইতিহাস বিজড়িত ধোবিঘাট। মঙ্গল পাণ্ডের ব্যারাকপুর। প্রথম যখন সেন্টার জানতে পারি, সেকি আনন্দ! গুগল ম্যাপে সার্চ করতেই সে জানিয়ে দিলো শ্রীরামপুর রাজবাড়ির গন্ধ পাওয়া যেতে পারে, তারপর ব্যান্ডেল চার্চ, ইমামবারা তো আছেই, আরও কত কি! আমার বাড়ি থেকে এই জায়গা গুলো যদিও খুব দূর নয়, তবুও কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি, কতবারই তো ইচ্ছে হয়েছিলো। তবে সেদিন সবকিছু ছাড়িয়ে একদম দূরে বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির চলে গিয়েছিলাম। বহুদিন থেকে তক্কে তক্কে ছিলাম। বহু লোভ ছিলো সে জায়গা ঘুরে দেখার। প্রথম দর্শনে হ্যারি পর্টারের ক্যাসেল মনে হয়েছিলো, কিম্বা কোনো চার্চ হবে হয়তো। এমন রকমের নির্মাণ শৈলী আগে কখনো চোখে পড়েনি কিনা! শ্রীরামপুর থেকে ব্যান্ডেল তো কাছেই, উদ্যোম ছিলো, দূরের জায়গাতেই আগে যাবো। বাঁশবেড়িয়া তে নেমে একটা টোটো ধরে যখন মন্দির পানে গেলাম, টোটো টা এমন জায়গায় নামালো যে সেখান থেকেই বেমালুম ফটোগ্রাফি করা যায়। মন্দির চত্বরটা এতো সুন্দর প্ল্যানিং করে বানানো যে দারুন ফটোগ্রাফি করা যায়। রাজবাড়ি সংলগ্ন মন্দির। রাজফটক আজ প্রায় ধ্বংসের মুখেই! রাজবাড়ি তে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। দূর থেকেই তাকে নিরীক্ষণ করতে হলো। মন্দির চত্বরে স্ট্রিট লাইট গুলো দেখে মনে হলো সত্যি যেন কোনো ফ্রেঞ্চ বা ব্রিটিশ কলোনিতে পৌঁছে গিয়েছি।

কলোনি যেন…
রাজফটক
স্ট্রিট লাইট
আবছা

আগে কস্মিনকালেও এমন দেখিনি, সাজানো গোছানোও নয়। সবেতেই কিন্তু পুরনো দিনের গন্ধ লেগে আছে। মন্দির প্রবেশের কিঞ্চিৎ পূর্বে একটা জলাশয় পড়ে, বোঝায় যায় রাজবাড়ি আর মন্দির সবই একটা সময়ে পরিখা দ্বারা আবৃত ছিলো, বহিরাক্রমণ থেকে রক্ষার্থে। তবে মন্দিরের সামনে গিয়ে দেখে আমি স্তম্ভিত। ক্যাসেলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়৷ হংসেশ্বরী এখানে আরাধ্যা দেবী। উপনিষদে হংস মানে জ্ঞান বা আলো। এসব নিয়ে আর কথা বাড়াচ্ছি না৷ প্রথমে নজর কেড়ে নিলো মন্দিরের চূড়াগুলো। পদ্মের নয়নাভিরাম কারুকাজ দৃষ্টি সরাতে দেয় না। মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবীর মূর্তি একদমই অন্যরকম৷ শায়িত মহাকালের হৃদপদ্মে মা অধিষ্ঠাত্রী। মূর্তি টি সম্ভবত কাঠের হবে, পরে পড়ে জানলাম দারুমূর্তি অর্থাৎ নিমকাঠের তৈরী। দেবী হংসেশ্বরী যেখানে উপবিষ্টা সে আসনটি অভিনবত্বে ভরপুর, না দেখলে বোঝা মুশকিল।

জগজ্জননী হংসেশ্বরী
অনন্ত বাসুদেব এর মন্দির থেকে
পরিখার এপার থেকে
রাজবাড়ি এবং মন্দির

যাই হোক্ এই মন্দিরটি ১৪ টি শিব মন্দির দিয়ে চারদিক দিয়ে ঘেরা, মনে হয় যেন এই চতুর্দশ শিব ই দেবীর প্রহরী। মন্দিরটি নির্মাণ কাজ শুরু করেন রাজা নৃসিংহদেব রায়, ১৭৯৯ সালে কিন্তু ১৮০২ সালে তিনি মারা গেলে অসমাপ্ত থেকে যায় নির্মাণ কাজ, তাঁর বিধবা পত্নী রানী শঙ্করী ১৮১৪ সালে নির্মাণ শেষ করেন। ঘুরতে ঘুরতে খিদে পেয়ে গেলো, ভাবলাম খাবোটা কি! দেখি খিচুরি প্রসাদ খাচ্ছে কয়েক জন, ঠাকুর মশাই কে গিয়ে বলতে উনি চল্লিশ টাকার বিনিময়ে একটা পার্সেল করে দিলেন, তাতে খিচুরি, বাঁধাকপির তরকারি, পায়েস, চাটনি আর পাঁপড়….৪০ টাকায় একদম উদরপূর্তি করে প্রসাদ খেলাম, একেই বলে “যে খায় চিনি যোগায় চিন্তামণি….”

অনন্ত বাসুদেব এর মন্দির

এতোক্ষণ অনেকটা সময় মন্দিরকে দিলাম এবার একটু পাশের মন্দিরে আসি…
মন্দির সংলগ্ন আর একটি মন্দিরও রয়েছে, এক টুকরো বিষ্ণুপুর যেন। অনন্ত বাসুদেবের মন্দির। মন্দিরটির পাদদেশে প্রতিষ্ঠা ফলক থেকে বুঝলাম ১৬০১, পরে বই পড়ে বুঝলাম সেটা শকাব্দ অর্থাৎ ১৬৭৯ খ্রীস্টাব্দ। রাজা রামেশ্বরদেব রায় মহাশয় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কষ্টিপাথরে নির্মিত বাসুদেবের উজ্জ্বল মূর্তিটি এক সময়ে অপহৃত হয়। একটা দারুন তথ্য পেলাম বইটা থেকে, সেটা হলো ভারতবর্ষের বেশ কিছু জমিদার নবাব, বাদশা, সম্রাট ইত্যাদি উপাধি পেলেও একমাত্র বংশবাটী পরিবার বা জমিদাররাই ‘রাজা মহাশয়’ উপাধি পেয়েছিলেন ১৬৭৩ খ্রীস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব কর্তৃক সনদ তা-ই বলে। রামেশ্বর দেব ছিলেন তৎকালীন জমিদার।

এক ঝলক টেরাকোটা

মন্দির প্রাঙ্গণটি অসম্ভব সুন্দর। বসে শুয়ে দিব্যি কয়েক ঘন্টা আরামে কাটিয়ে দেওয়া যায়। বেশ ভিড়েও ছিমছাম লাগছিলো কেমন একটা। সব দেখে শুনে এবার, বেরিয়ে আসবো, রাজবাড়ি দেখে লোভ হলো, কিন্তু সে জায়গায় প্রবেশাধিকার নেই, সুতরাং দূর থেকেই……!

রাজার বাড়ি


একটা বোর্ডে মন্দির নিয়ে লেখা আছে, পড়ছি! ১৩ টা চূড়া যে আছে সেটা তখনও খেয়াল হয়নি। ভুল করে ১১ টা গুনে ছিলাম, হাতঘড়ি জানান দিলো ট্রেন এখনো এক ঘন্টা দেরী। সুতরাং, আবার চললাম। এবার হিসেব বললো – নাহহহ ১৩ টাই হবে। হংসেশ্বরী মন্দিরে বিভিন্ন সময়ে পা পড়েছে অসংখ্য গুণীজনের…. রবি ঠাকুর, নন্দলাল বসু, নিয়মিত আসতেন স্বামীজী! রামকৃষ্ণদেব এসেছেন, পদধুলি পড়েছে স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধীরও যখন তিনি নন্দলাল বসুর ছাত্রী ছিলেন।

আসলে প্রতিটি রাজ পরিবার এবং তার মন্দিরের সাথে অসংখ্য লোকগাথা, লোকাচার জড়িয়ে রয়েছে, সব কিছু অতি অল্প শব্দবন্ধে ব্যক্ত করা মুশকিল…. আপাতত এইটুকুই হয়তো হংসেশ্বরী মন্দিরে ঘুরতে আসার জন্য প্রেরণা জোগাবে….তবে দারুন ভাবে কয়েক ঘন্টা কেটে যাবে….!

বামদিকে অনন্ত বাসুদেব মন্দির এবং ডানদিকে হংসেশ্বরী মন্দির

পুনশ্চঃ আমি এটা লিখতে গিয়ে একটি বইয়ের সাহায্য নিয়েছি, মন্দিরের পুরোহিত শ্রী তপন চট্টোপাধ্যায়ের ”জগজ্জননী হংসেশ্বরী”…..মন্দির চত্বর থেকেই কিনেছিলাম। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সবই আছে তাতে! তবে এবার নারায়ণ সান্যালের ‘হংসেশ্বরী’ উপন্যাসটা পড়ে ফেলতে হবে, যে বইটা লেখকের কাছে অনুপ্রেরণা ছিলো, নইলে এমন সুন্দর একখানা বই থেকে আমার মতো ভবঘুরে মার্কা লোকজন বঞ্চিত গোবিন্দদাস হয়েই থেকে যেতো…!

পথনির্দেশ – হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে বাঁশবেড়িয়া স্টেশন এসে টোটো ধরলেই পৌঁছে দেবে….!

© শুভঙ্কর দত্ত || Apr 5,2023

কৃষ্ণচন্দ্রের ‘শিবনিবাস’ আর ষোলা আনার সিঙ্গারা… 

কৃষ্ণচন্দ্রের রাজপ্রাসাদের চিহ্ন নেই যে হেথায়,
রামসীতা-রাজ্ঞীশ্বর-বুড়োশিব স্মৃতি পটে টনক নাড়ায়।
মহাকাল অধিষ্ঠিত শিবনিবাসে, চূর্ণী নদীর তীরে;
হরেক রকম জনশ্রুতি শুধু তারই উত্থান ঘিরে!

কথায় আছে ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে…! আর আমি তো মাত্র নদীয়া এসেছি, তাও চাকরী সূত্রে। ভাবলাম, এসেই যখন পড়েছি, আর সুযোগ যখন রয়েছে, তখন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সাম্রাজ্যের কিঞ্চিৎ অংশে একটু ঢুঁ মেরে আসি। এমনিতেও আশেপাশের ঐতিহাসিক জায়গা গুলো আমায় টানে খুবই।

গন্তব্য শিবনিবাস….! কাছের মানুষ কে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লাম।   ট্রেন ধরলাম, রানাঘাট স্টেশনে। ট্রেনে আগে থেকেই স্কুলের তিন ম্যাডাম আসছেন। গেদে লোকাল ধরে, নামলাম তারকনগর হল্টে…! টিকিট কাটা ছিলো এরপরের স্টেশন মাঝদিয়া পর্যন্ত। তারকনগরে নেমে টোটোতে উঠলাম, পাঁচ জনের দল, সুতরাং অপেক্ষা করার কোনো ব্যাপারই নেই! রাস্তা দারুন, একদম মখমলের মতো। দুপাশের গাছগাছালিকে সাক্ষী রেখে চললাম আমরা, এখানে কলা গাছের জনঘনত্ব লক্ষ্যনীয়, তবে আমগাছ বাদেও বেশ ভালো সংখ্যায় লিচু গাছ দেখে আমি অবাক। স্কুল গ্রাউন্ডে মেলা বসেছে, সেই মেলা পার হয়ে টোটো এসে থামলো মন্দিরের কাছেই।

নামলাম, এবার টোটো…


রাস্তার একদিকে দুটো ইয়াব্বড় বড়ো মন্দির, মোবাইল স্ক্রিনে কোনো ভাবে ধরে না। আর একদিকে রাম সীতা মন্দির।

রাজ্ঞীশ্বর আর পেছনে রাজ রাজেশ্বর….


প্রথমেই ঢুকলাম রাম সীতা মন্দিরে…. আলতা সিঁদুর সহযোগে পুজো দেওয়া হলো সেখানে, ঠাকুর মশাইয়ের থেকে জানলাম মন্দিরটি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রেরই বানানো….! কষ্টিপাথরের রাম মূর্তির পাশেই আলো করে রয়েছেন অষ্টধাতুর মা সীতা, (মূর্তি দুটো সম্পর্কেও তিনিই বলে দিলেন) শুধু তাই না, সঙ্গে আরো অনেক দেব দেবী —অন্নপূর্ণা, বেশ উঁচু একটি শিবলিঙ্গ, মা দুর্গা, বজরঙবলী, জগন্নাথ, এমনকি সরস্বতী ও….! তবে মন্দিরটির গঠনশৈলী আমায় একটু অন্যরকমের লাগলো….!

রাম সীতা মন্দির
রাম সীতা মন্দিরের প্রস্তর ফলক… ১৬৮৪ বোঝা যায়

মন্দিরের পশ্চিম দেওয়ালের প্রস্তর ফলক থেকে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মন্দিরটি ১৬৮৪ শকাব্দে তৈরী (‘শকাব্দ’ আন্দাজ করেছিলাম, কারণ আগেও দেখেছি এই সব হিসেব গুলো বাংলার রাজারা বঙ্গাব্দে করতেন না) ৭৮ যোগ করলে হয় ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দ। পরে জানতে পারলাম, মন্দিরে রাজার প্রতিষ্ঠা করা মূর্তি গুলি এখন আর নেই! এগুলি পরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। হয়তো কোনো তস্করের কাজ। যাই হোক্, এখানের পাট চুকিয়ে গেলাম এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ শিবলিঙ্গ এর বাসস্থানে….! আসলে এই থেকেই শিবনিবাস…! চূর্ণি নদীর তীরে প্রাচীন এই জায়গাটির নামকরণ নিয়ে নানা রকম জনশ্রুতি বিদ্যমান…! এই জায়গাটির নামকরণ করেছিলেন শিব নিবাস, রাজা কৃষ্ণচন্দ্র,   আবার কারো মতে মহারাজের জ্যেষ্ঠ পুত্র শিব চন্দ্রের নামে কেউ কেউ বলেন মহারাজ শিব মন্দির তৈরি করে শিবের নামকরণ করেছিলেন শিব নিবাস। তার এক দেওয়ানের কথায়  বর্গী হামলার ভয়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র কৃষ্ণনগর থেকে একটু দূরে  নিরিবিলিতে আরেকটি রাজধানী স্থাপন করেছিলেন যাতে করে অতর্কিতে হামলা আটকানো যায়। আবার কারো মতে – এই স্থানে নসরৎ খাঁ নামে এক ফকির বাস করতেন, স্থানীয় মানুষের কাছে এই জায়গা ‘নসরৎ খাঁ র বেড়’ নামে পরিচিত ছিলো। ফকিরের অনুমতি নিয়ে এখানে রাজধানীর স্থাপন ও রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। এছাড়াও অনেক রকম কথকতা ঘোরাফেরা করে লোক মুখে। তবে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্র রায়ের লেখা ”অন্নদামঙ্গল” কাব্যে শিবনিবাসের উল্লেখ আছে –
‘কৃষ্ণচন্দ্র মতিমান।
কাশীতে করিবে জ্ঞান বাপীর সমান।।
বিগ্রহ ব্রহ্মণ্যদেব মূর্তি প্রকাশিবে।
নিবাস করিবে শিবনিবাস করিয়া।।’

প্রসাদের পসরা….
আকন্দ মালা….

অতএব এ স্থান যে ইতিহাস বিজড়িত, এ সন্দেহ আর রইলো না। নতুন রাজধানী স্থাপনের পর শিবনিবাসে তিনি সমারোহের সাথে অগ্নিহোত্র এবং বাজপেয় যজ্ঞ সম্পন্ন করেন, ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গুণীজনদের পদধূলিতে মুখরিত হয়েছিলো চূর্ণী নদীর তীরের প্রাচীন এই অখ্যাত গ্রাম। কাশী সহ বিভিন্ন প্রান্তের পণ্ডিতগণ মহারাজকে ‘বাজপেয়’ উপাধিতে ভূষিত করেন। প্রথম বাঙালি হিসেবে এই যজ্ঞ যে তিনিই সম্পন্ন করেছিলেন, এ কথা জানা যায় দেওয়ান কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায়ের লেখনী থেকে।

রাজ রাজেশ্বর শিব মন্দির

রাজ রাজেশ্বর শিব মন্দির, যা লোকজনের কাছে বাবা বুড়োশিবের মন্দির।  পশ্চিমবঙ্গের বুকে এত উঁচু প্রাচীন মন্দির আর একটাও আছে বলে আমার মনে হয় না। ভেতরে ঢুকে লাইনে দাঁড়ালাম, ছ’ ছটা সিঁড়ি টপকে তবে বাবার মাথায় জল ঢালতে পারা যাবে….! পুরোহিতের সাথে আগত পুণ্যার্থীরা কণ্ঠ মিলিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন, সাথে সাথেই অনুরণন সৃষ্টি করছে শব্দ গুলি, এতো বড়ো মন্দির যে! তাকিয়ে দেখি, সব মিলিয়ে আটটা তল তার, অর্থাৎ ‘অষ্টকোণ’ প্রচ্ছেদের মন্দিরটি, শিখরটি ছাতার মতোই বটে। এতোদিন ধরে বাংলার বুকে যে সব মন্দির দেখেছি, একদমই আলাদা রকমের এটা। তবে মন্দিরটির উচ্চতা ভালোই হবে, মেপে না দেখলেও ১০০ ফুটের বেশি হবে, এতো আন্দাজ করা যায়ই। মন্দির গাত্রে প্রস্থর ফলক থেকে বোঝা যায় মন্দিরটি ১৬৭৬ শকাব্দ বা ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিলো। ৯ ফুট উচ্চতার কষ্টিপাথরের এতো বড়ো শিবলিঙ্গ পূর্ব ভারতে আর নেই। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নিজেই এই শিবলিঙ্গ স্থাপন করে তার নাম রাখেন — রাজরাজেশ্বর!

ছবি তোলা বারন করা থাকলেও দেদার ছবি তোলা হলো, সবাইই তুলছে। বাইরে ডাবের দোকানে ডাব কিনতে গিয়ে এক ভদ্রলোক বললেন, ঠান্ডা লাগার ওষুধও নিয়ে যান। এখানে ঢুকে ভাবলাম — এই উচ্চতা, শিবরাত্রির দিনেও বাবার ঠান্ডা লাগা অসম্ভব ব্যাপার। মন্দিরের চতুর্দিকে দূর-দূরান্ত থেকে মেলায় পসরা সাজিয়েছেন দোকানদাররা….! রাজার আমল থেকেই এই মেলার সূচনা। ‘ভীম একাদশী’ থেকে প্রতি বছর মেলা শুরু হয়, চলে শিবরাত্রি পর্যন্ত, তা ছাড়াও শ্রাবণ মাসেও মানুষের ঢল নামে এখানে। রাজরাজেশ্বর শিব মন্দিরে ছটা সিঁড়ি টপকে বাবার মাথায় জল ঢেলে বেরিয়ে এলাম, বাইরে এসে কিছু ফটো তোলা হলো। স্মৃতির সাক্ষর। এই মন্দিরের ওপরের দিকে দেওয়ালে অনেক গুলি গর্ত, টিয়াপাখি সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা, মেলা ছাড়া কখনো এখানে এলে এদের আনাগোনা আর ডাকই মন ভালো করে দেবে মনে হয়।

জয়কাল মহাকাল….!
রাজ রাজেশ্বর মন্দিরের প্রস্তর ফলক
दूसरों के वास्ते भोलेनाथ शंकरा
ঠিক যেন বাবা র ওপরে কেউ ছাতা ধরে আছে…
এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শিবলিঙ্গের ওপরে এমনই কারুকাজ
অষ্টকোণীয় অপূর্ব কারুকার্য

এরপর সামনের মন্দিরটি, যেটিতে তুলনামূলক কম ভিড়। মন্দিরের সামনের চত্বরে একটা রথ দেখলাম৷ তার মানে রথটাও এখানে জাঁকজমকপূর্ণ হয়।
নাম – রাজ্ঞীশ্বর মন্দির। শিবলিঙ্গের উচ্চতা নেহাৎ কম না, সাত ফুটের বেশিই হবে বলে আন্দাজ। প্রস্তর ফলক বলছে স্থাপনকাল ১৬৮৪ শকাব্দ অর্থাৎ ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দ মানে রাম-সীতার সাথেই এবং তিনটি মন্দিরের মধ্যে ”রাজরাজেশ্বর’ অগ্রজ – এটাও প্রমাণিত।

গাছ পাতাদের আবডালে রাজ্ঞীশ্বর
অনুজ শিব
রথ

পুজো পাঠ সেরে, এবার পেটপুজোর পালা। ম্যাডামরা মোটামুটি একটা খোঁজখবর নিয়ে এসেছিলেন, সেটা হচ্ছে এক টাকার সিঙারা, সে দোকানে যাওয়া হলো…! একদম সরেজমিনে সিঙারা বানানো থেকে, ভাজা সবটাই..!  শুধু তাই নয়, সে সব সিঙারা হাতে নিয়ে পোজ দেওয়া। তবে স্বাদে হলদিরামকে চাপেই রাখবে। পাঁচ জন মিলে পঁচিশটার মতো সাঁটানো হলো। অতঃপর কিছু পার্সেল। এইসব চলতে চলতে জানা গেল ভদ্রলোকের নাম-গোপাল রায়, বয়স আন্দাজ ৭৫ হবে। কিন্তু ১ টাকার সিঙারা কে স্রেফ সাইজ দিয়ে বিচার করলে হবে না।

ভাজার আগের মুহুর্তে
ষোলো আনার সিঙ্গারা

তবে এতে কি আর উদরপূর্তি হয়? সামনেই কচুরি, তাও হলো। কিন্তু এরপর করি কি? কচুরি দোকানেই এক ভদ্রলোক এর থেকে জানলাম যে রাজার প্রতিষ্ঠিত রাজপ্রাসাদের শেষ ধ্বংসাবশেষ এর চিহ্নটুকুও এখানে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

বাঁশের সেতু সাথে নৌকো… 

সামনেই চূর্ণী নদী, মাঝদিয়া স্টেশনে নেমে লোকজন এই সেতু পার হয়ে মন্দিরে আসেন। নদীর জল দূষিত, সম্ভবত কোনো চিনি কলের কারণে। নদীর কাছে গিয়ে ভাবলাম সেই সময়ের চিত্রটা, একটি নদীর তীরে অখ্যাত এক গ্রামে শহুরে কোলাহল থেকে বহুদূরে শিবশম্ভূ অধিষ্ঠাতা! শিবনিবাস! সার্থক তার নামকরণ। দেখি, দুটো লোক বটগাছের তলায় আরামসে এলিয়ে পড়ে আছে, দূষিত জলের গন্ধ তাদের ক্লান্তিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। এই জায়গা এখনও  পরিচিতির অনেক বাইরে। ভালোই হয়েছে একদিকে। বেলা বাড়ছে যত, ভিড়ও বাড়ছে।

চূর্ণীর তীরে

চূর্ণী নদীর ওপরে বাঁশের সেতু খানিক কেৎ মেরে চলে এলাম চূর্ণী রিসর্টে! ২০ টাকা টিকিট কেটে ঘোরা যায়। সময় কাটানোর বেশ দারুন একটা জায়গা। আম বাগানে ঘেরা জায়গাটা গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে যে কতটা আরামের হবে সেটাই ভাবছিলাম,

একটা জতুগৃহ দেখে ভাবলাম এটাই বোধ হয় রাজপ্রাসাদ বা বাগানবাড়ির শেষ চিহ্ন। কিন্তু না! ভুল ভাঙিয়ে দিলেন এক ভদ্রলোক! অজ্ঞাত একজন ষাটোর্দ্ধ এলেন, পরিচয় হলো, এখানকার আদি বাসিন্দা, আসলে ঐ জতুগৃহ টি ওনার স্যারের, নামটা মনে নেই! ইংরেজি পড়াতেন, সামথিং গাঙ্গুলিই হবেন, এখানে পড়তে আসতেন ওনারা…..! গল্প এই পর্যন্ত, ব্যস তারপরেই উনি চলে গেলেন, ঘুরতেই এসেছিলেন। একটু নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলেন বোধ হয়৷  তারপরেই ডাক পড়তে, চলে গেলেন।

জতুগৃহ
রিসর্ট থেকে তিনমূর্তি
রিসর্টের অন্দরের ঢোলকপুর

ট্রেন ছিলো দেরীতে, তাই এদিক ওদিক ঘোরাও হয়ে গেলো। এরপর ফিরলাম স্টেশন, একই পথে৷ তারকনগর হল্ট, কেউ চাইলে মাঝদিয়া ও যেতে পারে। গেদে থেকে শিয়ালদহ লোকাল ধরবো, ট্রেন লেট। দেখলাম বাংলাদেশ থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস দুরন্তগতিতে বেরিয়ে গেলো ধুলো উড়িয়ে। ট্রেন এলো আমাদের….! উঠলাম। একটা রবিবার দারুন কাটলো….. শৈবতীর্থ শিবনিবাসে!

হল্ট স্টেশনের ছায়া
পাঁচে পঞ্চবাণ

এতো কথার উপাদান, একটি বই যা স্বপন মৈত্র এর লেখা! আর বাকি পুরোহিত, দোকানদার, সেই দোকানের অন্য গ্রাহক — এদের থেকেই জানা।

পুনশ্চঃ কোলকাতা থেকে জলপথে ঢাকা যাওয়ার সময় রেভরেন্ড হিবার সাহেব রাজপ্রাসাদের প্রবেশপথ এবং এই মন্দির গুলি দেখে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন এবং লন্ডনে ফিরে তাঁর স্মৃতিচারণায় তিনি সে নিয়ে লিখেওছিলেন।

পথনির্দেশ – কোনো ভবঘুরের হঠাৎ ইচ্ছে হলে আসতে পারেন শিয়ালদা থেকে গেদে লোকালে, তারকনগর বা মাঝদিয়া তে নেমে টোটো তে করে…..।

শিক্ষকতার এক সপ্তাহ আর অনুভূতি…

বেশ কিছুদিন আগে LUNANA বলে একটা সিনেমা দেখেছিলাম, ভূটানের সিনেমা, সম্ভবত, অস্কারে গিয়েছিলো সেরা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্মের ক্যাটাগরিতে। একজন টিচারের গল্প। হাজারো প্রতিকূলতা কে জয়ের গল্প ছিলো সেটা, পোস্টিং ছিলো একদম পাহাড়ের ওপর। যেদিন আমার জয়েনিং লেটার এলো, আমি দেখলাম Tamenglong, Manipur, গুগলের স্মরণাপন্ন হতেই বুঝলাম এটা সেই Lunana সিনেমার পাহাড়ি স্কুল নয়তো! আসলে এই স্কুলটা নবোদয় স্বীকৃত Very hard and difficult station, মোটামুটি তিনটে কারণে এমনটা হয়ে থাকে। প্রথমত, যোগাযোগ ব্যবস্থা। দ্বিতীয়ত, আবহাওয়া আর তৃতীয়ত, জল এবং খাবার! এখানে তিনটে কারণই Very hard হওয়ার জন্যে উপযুক্ত। তবে Difficult হচ্ছে খাবারের জন্যে….! উত্তর-পূর্ব ভারতের খাদ্যাভাস আমাদের কাছে এতোটাই অজানা যে কি বলবো! ইম্ফলে পৌঁছে Laxmi Kitchen এ খেতে গিয়েছিলাম, মণিপুরের স্পেশাল ডিশ দেবে বলে কে জানতো, তাতে একটা থালায় ভাত দিলো, আর তার চারপাশে এগারোটা বাটিতে এগারো রকমের সবজী, আচার ইত্যাদি, ইত্যাদি। কোনটা খাবো, কোনটা খাবো না, কেনই বা খাবো, আর কেনই বা খাবো না! বুঝতে গিয়ে দম বেরিয়ে গেলো, মনে হচ্ছিলো খাওয়ার উপায় জানতে হলে ইউটিউবের দ্বারস্থ হতে হবে! যাই হোক্, ইম্ফলে আমাদের এক রাত বেশি থাকতে হলো কারণ ড্রাইভাররা গ্রিন সিগন্যাল পাচ্ছিলেন না, আমরা ইম্ফলের পৌঁছানোর আগের দিন থেকেই সেখানে হঠাৎ করে ঝামেলা দানা বাঁধতে শুরু করে, সুতরাং রাস্তা সেফ ছিলো না, তাই অগত্যা! আসলে মণিপুরের রাজধানী শহরে দু’রাত কাটিয়ে যেটা বুঝলাম, এখানকার অবস্থা সত্যিই খুব একটা ভালো নয়। লড়াই অনেকটা গভীরের সমস্যা নিয়ে। সে সব থাক।

The ornaments of the hills…
From the school

বারান্দা থেকে

Touching the hills…
পাহাড়ী পথের বাঁকে

roadside view on the way to Tamenglong from Imphal

ইম্ফল থেকে তামেঙলঙ আসার সময় বুঝলাম, কেন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো নয়, পুরোটাই পাহাড়ি রাস্তা, না, আমাদের সোনার বাংলার পুরুলিয়া বা দার্জিলিং এর মতো পাহাড়ি রাস্তা নয়, এ রাস্তার কিছু অংশ এখনও পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হয়নি। এরকম অ্যাডভেঞ্চারাস রাস্তা দিয়ে আসার সময় বেশ কয়েকবার শিহরণ দিয়ে দেয় শরীরে….! সর্পিল পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে মেঘেদের আনাগোনা, কোথাও কোথাও তো মেঘ ভেঙে যাচ্ছি মনে হলো। সরু একটা রাস্তা, কর্দমাক্ত তার ওপরে, ড্রাইভারের বদন্যতায় শর্টকাট রুট পার হয়ে গেলাম। পার হয়েই অসীমের উদ্দেশ্যে প্রণাম! বাপরে, বাপ্! পাঁচ ঘন্টার রাস্তা পেরিয়ে বুঝতে পারলাম কতটা সুবিধাজনক জায়গাতে আমরা থাকি, সেটা আরো ঠাহর হলো এখানে এসে পৌঁছানোর পরে। একদম পাহাড়ের ওপরে একটা স্কুল। সকালে উঠে রোজ দেখি পাহাড় গুলো সারিবদ্ধ হয়ে বিরাজমান, সাদা তুলোর মতো ঘন মেঘরাশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাদের কোলে….! পাহাড়ের গায়ে শিরার মতো বিছিয়ে আছে সবুজশ্রেণী।  মোবাইল ক্যামেরা আর চুপ থাকে কি করে?

মেঘেরা গোলমাল না করলে রোজ এমনই দৃশ্য মেলে রুম থেকে পা বাড়ালেই…..

ঐ একটাই জিনিস রোজ সকালে অনেক তাড়না দিয়ে দেয়, হাসিমুখে মেনে নিই সব অসুবিধা। সকাল থেকে মেঘ গুলো বেশিরভাগই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে থাকে, সময় যতই যায়, যতই বেলা বাড়ে, মেঘ গুলো উপত্যকায় বৃষ্টি দিতে দিতে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ”কমলো মেঘেদের ওজন” হলেও কি হবে, হালকা হয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠে আসে , কিন্তু অধঃক্ষেপণের জন্যে তখনও তার মধ্যে বেঁচে আছে যথেষ্ট বারিকণা…..! ঠিক বেলা ১২ টা হলেই অঝোর ধারায় শুরু হয়ে যায়….!  আসলে এখানে আবহওয়া খুবই অনিশ্চিত৷ কখন শুরু কখন শেষ কেউ জানে না। আর সমতলের ছাতায় কিচ্ছুটি হবার নয়। এমনিতেই মেঘের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। ২০-৩০ মিটার দূরের জিনিসও আবছা হয়ে যায়।

Remedial class এ যাওয়ার সময়
Rain can’t stop anything here

অফিসের ওয়াই-ফাই এর অপেক্ষাতে থাকতে হয়েছিলো বেশ কিছুদিন, প্রথম দু’দিন মেলেনি, তারপর পেয়েছি, তারপর শুনলাম একদম নীচের দিকে একটা স্যারের রুমের আশেপাশে আসামের নেটওয়ার্ক ধরে নেয়, ব্যাস্ খোঁজাখুঁজি শুরু। এরকম করেই একদিন ধরে ফেললাম আসামের জিও টাওয়ার, আর তাতেই চললো নেট৷ আমার কোয়ার্টারের ঠিক বাইরে গেলেই জিওর নেটওয়ার্ক ফুল,তার মানেই এটা মণিপুরের, আর চৌকাঠ পেরিয়ে জাস্ট বসে পড়লেই আসামের নেটওয়ার্ক, দুটো কাঠি হলেই নেট অন, ওয়াটসআপ এ টুকটক টা হয়ে যায়। বেশ শান্তি আছে বিষয়টার মধ্যে, ব্যক্তিগত পরিসরটা মেলে, নইলে সারাদিনের ক্লান্তির পরে ঐ অবসরটা স্ক্রল করেই কেটে যেতো। এদিক দিয়ে ভালোই! গোটা ক্যাম্পাসটা আসলে পাহাড়ের ওপরে, আর ধাপে ধাপে বিভিন্ন হস্টেল গুলো… নীলগিরি, উদয়গিরি, আরাবল্লী, শিবালিক….. মাঝে ডাইনিং হলটা, খাওয়ার জন্যে ওপরে চড়তে হয়, স্কুল যেতে আরও ওপরে চড়তে হয়, আবার স্কুল থেকে যাওয়ার সময় নীচে নামতে হয়…. বিনে পয়সায় মধ্যপ্রদেশ কমানোর এতো সহজ উপায় আর মিলবে? তার ওপর ঘাম দিচ্ছে না একটুও….! বেলা বাড়তে বাড়তে যখন অপরাহ্নে এসে পৌঁছায় তখন চারিদিকের নিস্তব্ধতা মুগ্ধ করে দেয়, দূরের পাহাড়গুলো সব কিরকম একটা রহস্যময় রঙ ধারন করে। আসলে তার যত রঙ সবই তো গাছগাছালির দৌলতে। তারপর সাঁঝ পেরিয়ে রাত নামে, নিঝুম রাতে কীটপতঙ্গের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যায়, আবার কোথা দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে, তার শব্দও, মনে হয় কেউ বুঝি হেঁটে গেলো, কিন্তু আসলে সেরকম না….পাতার আওয়াজ, বৃষ্টি পতনের শব্দ….! রাতে ঘুম নামে দু’চোখ জুড়ে, এমন ঘুম আমার কস্মিনকালেও পায় না, এখানে যেমন ভাবে ঘুম পায়, তারপরে আর একদম জেগে থাকা যায় না। তবে এখানের ওয়েদার বেশ সুন্দর, শুধু একটু lukewarm water লাগবে খাওয়ার জন্যে….!

Evening in the campus

প্রাত্যহিক কাজের জন্যে যে জল লাগে তার একটা সমস্যা আছে বটে, তবে বৃষ্টির জল ধরে নিলেই কেল্লাফতে! বৃষ্টি এখানে ধারাবাহিকভাবে পড়ে। আসলে এই শিক্ষকতার চাকরীটা করতে এসে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। পরিবার, কাছের মানুষদের থেকে অনেকটা দূরে কিনা, যদিও নবোদয়ে কাছেপিঠে হলেও নিরুপায় ঘর আসা।

Window view…
The clouds…
sunlight enhances the beauty…
The School

তবে এই চাকরীটা আমার ভীষণ দরকার ছিলো, অন্য চাকরী নয়, এটাই। কারণ এটার জন্যে আমি যোগ্য, সেই আত্মবিশ্বাস টা ছিলো আমার। কত লোক, কত বন্ধু কত কথা বলেছে! জানতে চেয়েছে প্রাইভেট স্কুলে ঢুকছি না কেন? তবে যে যখনই কিছু বলেছে হয় ভদ্রভাবে বলেছি, নয়তো খুব রেগে ঝেড়ে দিয়েছি। আমার এই জবটা আরও একটা কারণে দরকার ছিলো, আমার মতো যারা সাবজেক্ট নিয়ে পড়ে আছে তাদের জন্যেও, তারা যদি একটু সাহস পায়, একটু ভরসা পায়! বিএড বনাম ডিএড এ বিএড হেরে গেছে, অনেকে ভাগ্যবান হয়ে মাঝখান থেকে প্রাইমারির চাকরীও পেয়ে গেছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রাইমারির চাকরীটা আমি কোনোদিন করতে চাইনি। আমি বিএড করেছিলাম প্রাইমারির চাকরী করবো বলে নয়, হাইস্কুলের টিচার হবো বলেই। সুতরাং এই রায়ের পরে যারা হাহুতাশ করছে তাদের বলবো যদি শিক্ষক হওয়ার নিদারুণ ইচ্ছে থাকে তাহলে পশ্চিমবঙ্গ নামক অভিশাপ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা শুরু হোক্, সেই মতো প্রস্তুতি….! আমার অনেক বন্ধু আমার অনেক বছর আগে থেকেই সরকারি সে হোক স্টেট বা সেন্ট্রাল আর প্রাইভেট মিলিয়ে চাকরী করছে, সে সব আমায় কোনোদিন দিশাচ্যূত করেনি। আমার কখনো মনখারাপও হতো না, শুধু খারাপ লেগেছিলো যখন ২০২০ তে নোটিফিকেশন এলো বিএডরাও প্রাইমারির ইন্টারভিউ এর জন্যে যোগ্য…..কারণ ঐ একটাই পরীক্ষার অ্যাডমিট আমি গুছিয়ে রাখিনি। আজ কোনো দুঃখ নেই, রিগ্রেট নেই! কারণ ঐ জবটা আমি করতেই চাইনি। একটাই কথা বলবো কোনোদিক না তাকিয়ে চুপচাপ পড়ে যাও, লোকে অনেক কথা বলবে, মেসের বন্ধুও অনেক কথা বলবে! এতো পড়ে কি হয়, এই কটা তো ভ্যাকেন্সি! এইসবকে হেলায় হারানো সম্ভব যদি নিজে চুপচাপ কাজ করে যায়। এখন খারাপ লাগে না আর। ভালোই লাগে। অনেকটা দূরে আছি, নেটওয়ার্ক ঠিকঠাক নেই, ইন্টারনেট shut down…. খারাপ লাগছে না কিন্তু। ক্লাস করছি, দরজা ধাক্কা দিয়ে বেশ কিছু মোল মেঘ ঢুকে গেলো। ঠান্ডা লাগছে, স্বপ্নেও ভাবিনি নিজের পছন্দের কাজটা পেতে হলে এতোদূরে আসতে হবে, প্রকৃতি রোজ এসে আমাকে তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যাবে! বাঙালি ঘরমুখো, এই মিথটা একটু একটু করে ভাঙতে হবে, নইলে ঐ পাশের বাড়ির ছেলেকে দেখে আফসোস হবে। গাল দিতে ইচ্ছে করবে শাসকদলকে, কিন্তু তাতে চাকরী মিলবে না! সকালে স্কুলে এসে যখন প্রার্থনা টা শুনি সমবেত কণ্ঠে, তখন একদম শান্তি নেমে আসে, নিজের ইচ্ছের কাজটা করতে পারার শান্তি।

Absolute.. 
Unknown though beautiful….
taking the bath…
Manipuri Dish…
Panoramic view
You have to go down…

✒️ শুভঙ্কর দত্ত || Aug 14, 2023 || Tamenglong, Manipur

শিক্ষক দিবস টু মাই স্টুডেন্টস…

মসনদে আসীন লোকের থেকে ”ঘেউ ঘেউ”, সংবাদপত্রের অসংখ্য শিরোনাম যেখানে শিক্ষককে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, আবার শিক্ষকদেরও অনেকাংশে ব্যবসায়িক —- সমাজের বিভিন্ন কোওর্ডিনেটে দাঁড়িয়ে ভাবলে যে মুহুর্তে ‘অবক্ষয়’ শব্দটা এসে নাড়িয়ে দিয়ে চলে যায়, সেই রকম একটা ক্ষণে দাঁড়িয়ে “শিক্ষক দিবস” এক অতি আশ্চর্যের দিনই বটে। আসলেই দিনটি ভালোবাসার, উদযাপনের, গল্প বলার, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের নাকি নেহাৎই লোক দ্যাখানি তা নিয়ে আমার মধ্যেই দোলচাল আছে। লোক দ্যাখানি তাদের কাছেই যারা দু দিন আগে টেবিল চাপড়ে আজ আবার সেই টেবিলেই শুভেচ্ছা বার্তা সহ উপহার সাজিয়ে দিয়েছে…! আসলে অনুষ্ঠান যতই আড়ম্বরপূর্ণ হোক্ না কেন তা একদম অন্তঃসারশূন্য তো হয় না….! ভালো-খারাপ মিশিয়েই সবটা! ছোটোবেলা থেকে আমরা মা বাবার পরে যা সংস্পর্শে সবচেয়ে বেশি আসি তিনি শিক্ষক! Teacher! Sir, Madam, Mam কোথাও তিনিই দাদা বা দিদি….! আমার আবার সেই সব টিচার কেই বেশি ভালো লাগে বা লাগতো যারা সাবজেক্ট বা পড়াশুনোর গন্ডি ছাড়িয়ে হাজারো যোজন দূরত্ব নিয়ে যেতো আমাদের, আমাকে….! সব সময় পড়াশুনো আবার কি? তবে যত বড়ো হয়েছি ততই পরিশ্রমী, ডেডিকেটেড স্যার ম্যাডামদের ভালো লেগে গিয়েছে, আমার শিক্ষকসুলভ মননটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, আমি আজ গর্ব করে বলতে পারি আমি আমার কাজে ফাঁকিবাজ নই মোটেও তার সবচেয়ে বড়ো কারণ আমার সেই সব স্যার – ম্যাডাম! না, আমি কারো নাম নেবো না, কারণ আমি মনে করি আমার তালিকা অসম্পূর্ণ! আমি বিশ্বাস করি আমার সে সব শিক্ষকরা কিছুই মনে করবেন না তাতে! তারাও জানেন তারা কি অবদান রাখতে পেরেছেন বা পারেননি! একজন স্যারকে পেয়েছিলাম ছাত্র অবস্থার প্রথমের দিকে, ক্লাস সিক্স সেভেন, রিটায়ার্ডের মুখে তিনি তখন, শিখেছি সময়ানুবর্তিতা কাকে বলে! মানে তখন শিখিনি, এখন সময়ে না পৌঁছালে তার হাসিমুখটা মনে পড়ে…! এখনও প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি, করে যাচ্ছি সময়ে পৌঁছানোর…. যত বড়ো হচ্ছি, ততই শিখছি নিজের কাছে সৎ থাকার মতো মূল্যবান জিনিস বোধহয় নেই! কজন পারে? একটা স্কুলে পড়াতে গিয়ে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছিলাম, সোশ্যাল মিডিয়াতে যেই মানুষটাকে দেখে রিটায়ার্ড বুড়ো মানুষরা বলেছেন,’শুভ তুমি বিসিএস’ দাও, সেই মানুষ গুলোকে মুখ ফুটে কিছু বলিনি…! টিউশন পড়িয়ে খাওয়া মানুষটা আমি সারাদিনে বেশি পড়াতেই পারি না, তবে যতটুকু যা করি, ভীষণ এনজয় করি! রোজ কিছু না কিছু শিখছি, প্রবলেম করতে গিয়ে আটকে যাচ্ছি, আবার শিখছি, স্টুডেন্ট রেগে যাচ্ছে, আমিও রেগে যাচ্ছি, আবার শিখছি — অনেক নমনীয় হতে হবে যে…! মহেন্দ্র সিংহ ধোনির ভক্ত আমি, তার একটা হিল্লে তো হওয়া দরকার! সরকারি তকমা লাগানো শিক্ষক হতে পারিনি এখনও….কিন্তু নিজের মধ্যে যে মালমশলা মজুত রয়েছে তার সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে যেতে চাই, কিন্তু ভীষণ ভয় হয়! সময়ের সাথে সাথে (সেদিন একজন স্যার বললেন সময় ভেক্টর রাশি, সত্যিই তো না হওয়ার কি আছে? টাইম মেশিন তাহলে?) সর্বশক্তিমান আমার থেকে স্ফূরণ টা কেড়ে নেবেন না তো? এই ভয়টা প্রতিনিয়ত হয়, সময়ের সাথে বয়সের সাথে শিক্ষক মনটা অনেক শান্ত, humble, পজিটিভ হয়ে গিয়েছে….! অনেক সময় ব্যয় করে এগুলো এসেছে, ভয় হয় একদিন হঠাৎ করে যদি ঈশ্বর এসে চেক বই দেখিয়ে উইথড্র করে নেয়? তবে এই সবের মাঝেও পজিটিভ থাকার রসদ জুগিয়ে যায় আমার ছাত্ররা…আমি বিশ্বাস করি আমার ছাত্রছাত্রীরা আমার সবচেয়ে বড়ো শিক্ষক! জীবনের কিঞ্চিৎ ঝঞ্ঝাট, নেতিবাচক প্রভাব সবকিছু কাটিয়ে যাদেরকে পড়ানোর, যাদেরকে তথ্য সরবরাহের তাগিদ, যাদের পরীক্ষা নেওয়ার সদিচ্ছা আমাকে উভমুখী বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে দেয় না — তারাই আসলে আমার শিক্ষক। আমার শিক্ষকরা আমায় যা শেখাতে বাকি রেখেছিলেন তার সবকটায় আমার ছাত্রছাত্রীরা শিখিয়ে দিয়েছে কিন্তু চুপিসারে….! স্টুডেন্টের সাফল্য, অ্যাচিভমেন্ট এর খবর – একজন শিক্ষকের কাছে পরমপ্রাপ্তি। নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টা করি সব সময়….! আমার আয়না তো ওরাই, ওদের ঠকিয়ে আমি কি দেখবো? সত্যি বলতে আমারও মনে হয় শিক্ষক দিবসের মতো আলাদা একটা দিন কেন থাকবে না? সবার তো থাকে একটা করে আলাদা দিন,তাহলে আমাদের জন্য নয় কেন? তবে তথাকথিত শিক্ষক না হয়েও কেমন জানি বিলাসিতা মনে হয় মাঝে মাঝে এদিনটিকে….! না মনে হলেই বোধ করি ভালো হতো। তবে শিক্ষক হিসেবে আমার স্টুডেন্ট রা আমার ছাত্র অবস্থার ভুলের পুনরাবৃত্তি করুক — এটা আমার সহ্য হবে না….! তবে এই মুহুর্তে যা অবস্থা তাতে সত্যি করেই ইচ্ছে করে মুখোশধারী কিছু শিক্ষকের স্বরূপ উদঘাটন হোক্, অবশ্য নোংরা পরিষ্কার এর প্রথম ধাপই হলো আগে জঞ্জালে নামতে হবে আমাকেই…..!

জীবনে শেখার জন্যে শুধু যে শিক্ষিত মানুষই লাগে এমন নয় কিন্তু…. রাস্তাঘাটে, হাটেবাজারে আমরা এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী হয়ে যায় তাতে কিছু অপাংতেয় মানুষজনও আমাকে শিখিয়ে যায়। আর শিখিয়ে যায় জীবনের সাথে জুড়ে যাওয়া কেউ কেউ যারা শিখিয়ে দিচ্ছে আবার পরীক্ষাও নিচ্ছে….খুব কঠিনও সে সব…!

সকলকে ‘শিক্ষক দিবস”….হ্যাপি শিক্ষক দিবস!

✒️ শুভঙ্কর দত্ত,  September 5, 2022 

“লক্ষ্মী ছেলে”রা শহর-গ্রামের মেলবন্ধন

লক্ষ্মী ছেলে… An Angel’s kiss

প্রথমেই বলে রাখি আমি জীবনে খুব কম সিনেমা দেখার আগে তার ট্রেলার দেখেছি। সব মিলিয়ে হয়তো দশও পেরোবে না। আসলে ট্রেলার দেখলে ঠকে যেতে হয় প্রায়শই। আমার ক্ষেত্রে সে সবের বালাই নেই। ভালো হোক্ বা খারাপ আমি আগে দেখবো৷
যাই হোক্ এটার ক্ষেত্রেও তাই, ট্রেলার দেখিনি৷ কৌশিক গাঙ্গুলির সিনেমা, ট্রেলার – গল্প – অভিনেতা – মিউজিক এসবের কোনো কিছুই আর ডিটেক্টিং ফ্যাক্টর নয় যখন পরিচালক উনি। আমার সবচেয়ে প্রিয় ডিরেক্টর বর্তমান সময়ের যিনি কখনো একদম নিরাশ করেননি। তবে একটু সন্দেহ হয়েছিলো যখন দেখলাম Windows এর প্রযোজনা, ঘটনা হচ্ছে শিবু-নন্দিতার সিনেমা মানেই সেই প্যানপ্যানানি মেলোড্রামা… সে পরিচালক বা প্রযোজক যাই হোক্, আমাকে একদমই টানে না…. এই সিনেমাটার জন্যে একটা অতিরিক্ত কুর্নিশ তাদের তাদের ধারার বাইরের একটা সিনেমার জন্যে অচলায়তনের ‘জানালা’ টা খুলে দেওয়ার জন্যে৷

প্রথমেই কৃতজ্ঞতার পাট চুকিয়ে দিলাম। এবার আসি কেমন লাগলো? গল্প প্রায় সবাই জেনে গিয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’ র সাথে তুলনা টানা হচ্ছে, অনেকে বলছেন ‘দেবী’ আর ‘গণশত্রু’ র হাইব্রিডাইজেশন। এসব শুনলে কেমিস্ট্রির স্টুডেন্ট হিসেবে বেশ ভালোই লাগে। তবে সেসবের দিকে যাচ্ছি না।

শহর ছাড়িয়ে বহুদূরে এক গ্রামীণ সমাজে তিন বন্ধু, মেডিক্যাল স্টুডেন্ট, রোজকার জীবনযাত্রা থেকে একটু অন্যরকম ভাবনা ভাবে যারা তারা, আর এক সাংবাদিক সকলে মিলে এক অজ পাড়া গাঁয়ে যেখানে সেঞ্চুরি করা হরেন বুড়ো, যে  ”দেবতার জন্ম” এর দরুন নিজের জাতকে প্রায় উচ্চবর্গীয় জায়গায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে মশগুল। আসলে সে যে স্বপ্নটা দেখেছে এমনটা নয়, বা ইচ্ছে ছিলো এমনটাও নয়, ”দিচ্ছে যখন নে না” এরকম স্টাইলের আর কি! একটা কন্যা সন্তানের জন্ম কি করে সমাজের ফারাক কমিয়ে দিতে পারে, মানে উচ্চবর্ণীয় আর নিম্নবর্নীয় অপাংক্তেয় মানুষজনের মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে দিতে পারে, সিনেমার প্রথম ১৫ মিনিট এ নিয়ে চলবে!
আর সেটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবো আমরা মানে দর্শকরা….!  আমরাও জানি আসলেই ভেতরটা ফাঁপা! এই বিশ্বাস যখন জন্মাচ্ছে ঠিক তখনই পরিচালকের মাস্টারস্ট্রোক — রজত রায় সরি রজত নারায়ণ রায় (ইন্দ্রাশিষ) প্রত্যাখান করলেন সে বাড়ির ভোগ খাওয়া! পরিচালক কতটা সুনিপুণভাবে বুনেছেন চিত্রনাট্য আর একটা দৃশ্য বলা যাক্ — যখন হরেন খু্ঁড়োকে বোঝানো হচ্ছে এটা একটা ব্যধি, তার যে শোনা এবং উত্তর দেওয়ার ধরন আর উত্তর — আহা!  এটাই তো শুনতে চাইছিলাম! একদিনের জন্যে জাতে উঠেছে একজনের জন্যে, কেন খোয়াবে? হরেন খুঁড়োর চরিত্রটা মনে হয় প্রদীপ ভট্টাচার্যের কথা মনে করেই লেখা হয়েছিলো।
এই সিনেমা ভালো লাগার অন্যতম কারণ এটার শুটিং হয়েছে পুরুলিয়ায়, বাঙালি পরিচালকরা গ্রাম বলতে শুধু বোলপুর বা ডুয়ার্সের কোনো গ্রাম বোঝেন, ”বাকিটা ব্যক্তিগত” র পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য বহুদিন আগে এটা নিয়ে বলেছিলেন। কৌশিক গাঙ্গুলি কিন্তু  এটা নিয়ে পরীক্ষা করে চলেছেন…টাকি, নবদ্বীপ তারপর পুরুলিয়া,বাকি গুলো আমি জানিনা, তবে আশা রাখি অন্য জায়গাতেই হবে! বহুদিন পরে সিনেমা এলো তার পরিচালনায়, শেষ ছিলো ”নগরকীর্তন”, সেটাও হলে দেখে বেশ গর্বিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে আমার পরিচালকের সিনেমা হলে দেখেছি, তাও কোলকাতায়, যদিও সেই মিত্রা সিনেমা হল এখন অতীত, পুরোটাই শুনছি শপিং মল হয়ে গিয়েছে।
গোপী ভগতের সমৃদ্ধ ক্যামেরা আর প্রবুদ্ধ ব্যানার্জীর মিউজিক – অসাধারণ বললে কম বলা হবে, “কালো জলে কুচলা তলে” গানটা কে কিভাবে মিশিয়ে দিলেন! সত্যি বলতে গান গুলো সিনেমাটার সাথে ভীষণ মিশে গিয়েছে, মনে হচ্ছিলো যেন Azeotropic mixture,  গান গুলোকে ওড়াতে গেলে দৃশ্য সহ উড়ে যাবে! এরকম ভাবে লোকগানের সুচারু ব্যবহার আমি আগে প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য কেই করতে দেখেছি, সাম্প্রতিক!

একটা সদ্যোজাত কিভাবে সমাজের জাতপাত ভেদকে এক নিমেশে ভেঙে ফেললো, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী র “কলকাতার যিশু” র কথা মনে পড়ছিলো!  যদিও কনটেক্সট আলাদা। ইক্যুলিব্রিয়ামে আসছে ব্রাহ্মণ আর শূদ্র! ছোটোবেলা থেকে যে শিক্ষায় স্যার ম্যাডামরা বড়ো করেছেন আমরা তো একটা আধুনিক ভারতেরই স্বপ্ন দেখতাম, তবে এই “আমরা” টা এখন আর নেই! সমাজ অসুস্থ? নাকি তার এলিমেন্ট? এসবের উত্তর খোঁজার মতো সময় নেই আমির-গায়িত্রী-শিবনাথ এর কাছে, সময় নেই সাংবাদিক জয় পাত্র র কাছে…!  তারা সলিউশন চায়, তারা জয় করতে চাই! স্ট্র্যাটেজি জানে না, জানার দরকার হয় না! আসলে অনেকে বলছে এবং বলবেও এদের লক্ষ্য কি সেটা বোঝা গেলো না! থাকে না–আমার আশেপাশের এরকম “লক্ষ্মী ছেলে” দেখেছি যারা সলিউশনে ব্যস্ত! তারা মেকানিজমের পরোয়া করে না! ব্যস্ততা আর মানবতা বিমুখ মানুষদের ভিড়ে তারা স্বতন্ত্র, তারা সব সময় জেগে আছে! ডাক্তারি পাঠরত আমির (উজান গাঙ্গুলি) র মুখ দিয়ে পরিচালক যে সব সংলাপ বলিয়েছেন যখন হোটেল রুমে গিয়ে তাদের মধ্যে বাদানুবাদের সময় তাদের ডাক্তারি পড়ার সততা নিয়ে বলবে খুব প্রাসঙ্গিক লাগবে….এসি সিনেমা হলে দর্শকের তখন নাচোস (nachos) খাওয়ায় বিরতি! সত্যি বলতে খুব কোরিলেট করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো…আমার এক বন্ধু বলে কিচ্ছু না — যে যার নিজের কাজটা করে গেলেই সমাজটা সুন্দর থাকবে। সত্যিই তাই! নিজের কাজ, নিজের ডিগ্রীর প্রতি কটা শিক্ষিত মানুষের সততা আছে? আস্থাটাও কি আছে? এ প্রশ্ন আমিরদের মুখ দিয়ে তুলে দিলেন পরিচালক। আর চরিত্রের নামকরণ?  উফফ…. 👌🏼

পরিচালককে কুর্নিশ প্রতিটা চরিত্রকে মেলে ধরার জন্য জায়গা দিলেন! Kia & Cosmos এ ঋত্বিকা কে দেখেছিলাম৷ গায়িত্রীর চরিত্রে কৌশিক গাঙ্গুলি কি সুন্দর জায়গা করে দিলেন ওকে! আর তার যোগ্য জবাব দিলেন ঋত্বিকাও! যখন কথকের ভূমিকায় ওকে শুনছিলাম, তখনও দারুন লাগছিলো। পূরবের চরিত্রটা কে বেশ চেনা লাগে, প্রতিটা বন্ধুদের গ্রুপে এরকম একজন থাকবেই, যার লেগপুলিং করা হবে সবচেয়ে বেশি, যাকে রাগানো সহজ কিন্তু মনটা একদম “লক্ষ্মী ছেলে” র মতো। সত্যিই কি ‘লক্ষ্মী ছেলে’ আছে সমাজে? উত্তর হচ্ছে অবশ্যই আছে, কিন্তু সাক্ষাৎ এর সৌভাগ্য সবার হয় না, হবেও না। যেমন দেখেছে সাংবাদিক জয় মিত্র, অম্বারিশ কে আমার দারুন লাগে, দারুন মানে দারুন! লোকটা হাসিমুখ থেকে হুট করে এত্ত জলদি সিরিয়াস অ্যাক্টিং করে দেয়! জয় মিত্রকে দেখেও কোথাও যেন মনে হচ্ছিলো পরিচালক ন্যারেটিভ সেট করে দেওয়া সাংবাদিকদের থেকে শত যোজন দূরে! এরকম কিছু সাংবাদিকদের আমিও কিন্তু এক্সপেক্ট করি। বাবুল সুপ্রিয়র চরিত্রটা দরকার ছিলোই, প্রভাবশালী লোকজন যে জালিয়াতি করে ভালো কাজও করতে পারে -তারও একটা নমুনা থাকুক!
ডক্টরের ভূমিকায় চূর্ণী – পরিচালক তাকেও জায়গা দিয়েছেন, সত্যিই তো একজন এতোটা পেশাগত জায়গা থেকে বেরিয়ে এমন একটা ঝুঁকি কেন নেবেন? পরিচালক তারও উত্তর দিলেন। সত্যি বলতে কি আমার সিনেমাটায় কিছুই খারাপ লাগেনি! এবার প্রশ্ন হচ্ছে সিনেমাটা কি পারলো? উত্তর হচ্ছে সিনেমা একটা শিল্প, সেটার সমাজে কতটা ইমপ্যাক্ট পড়বে তার নির্ভর করছে দর্শকদের ওপরে…সিনেমাটা তো সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত, রোগটা নিয়ে বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তথ্য আছে, তথ্যগুলোকে আমি বিচার করে দেখিনি সব সত্যি কিনা! তবে বিশ্বাস রাখি সত্যি হবে। ”লক্ষ্মী ছেলে” আসলেই নিজের কাজের ওপর সততার শিক্ষা দেয়, নিজের ডিগ্রী র ওপর আস্থা রাখতে বলে! লক্ষ্যের চেয়ে সমাধান বড়ো, সেই গল্পই বলে যায়। প্রদীপ ভট্টাচার্য কে নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। কাজের লোক হোক বা এসব চরিত্রে তার জুড়ি মেলাভার, স্ক্রিনে আসা মানে হাসবো, কিছু একটা বলবে! তবে এই সিনেমার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি ইন্দ্রাশিষ রায়। “গানের ওপারে” থেকে লোকটাকে দেখছি, সৃজিতের চতুষ্কোণেও ছিলো বোধ হয়, লোকটা RJ SAYAN, AMIT DAS এদের মতোই ইন্দ্রাশিষ ও কি ছুপা রুস্তম! বাংলা সিনেমা তো খলনায়কও হারাতে বসেছে! ওকে নিয়ে অন্যান্য পরিচালকরা কি আরও সচেতন হবেন? তবে সিনেমাটা ড্রামা জঁরার হলেও মাঝে মাঝেই থ্রিলারে প্রবেশ করে ফেলে! এসি রুমে কোল্ড ড্রিংকস খেতে বাঙালি দর্শক প্রেডিক্ট করে – ফেরত নেবে আদৌ? এই জায়গাটা একদম মনের মতো! তখনই মাথায় এলো বছর চারেক আগে Amazon Prime এ দেখা “Lakhon Mein Ek” এর সিজন টু! মনে হচ্ছিলো All well that ends well এই বাক্যটি কি এবার হজম করতে হবে? নিরাশ করলেন না — অসামান্য সিনেম্যাটিক ভ্যালু দিয়ে শেষ করলেন সেই দ্বন্দ্ব গুলোকে। দর্শকের পিঠ তখন সিট ছাড়িয়ে গিয়েছে! আর শেষ ১৫ মিনিট উজান গাঙ্গুলি যে অভিনয়টা ডেলিভার করলেন, হলফ করে বলতে পারি ঋদ্ধি সেন কিন্তু এবার প্রতিযোগিতায় পড়তে বাধ্য!

এরকম সিনেমা আরও হওয়া উচিৎ যেখানে শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামের মানুষদের গল্প বলা যায়, এই সিনেমা প্রচন্ড বাস্তব, শহর – গ্রাম মানুষদের বন্ধন তৈরী করে। কোনো শহুরে  শিক্ষিত লোক গ্রামের মানুষকে অশিক্ষিত বলেনি, বরং ভিডিও  ক্লিপিংস দেখিয়ে সচেতন করতে চেয়েছে, সমাধান চেয়েছে…! এমনটাই তো হওয়া উচিৎ, শিক্ষা যাদের কাছে আছে তাদেরই তো উচিৎ কতটা সহজ উপায়ে সেটা দিয়ে শহর বা গ্রাম কেন্দ্রিক কুসংস্কার গুলোকে নির্মূল করা, যে আধুনিক ভারতের স্বপ্ন আমাদেরকে স্যাররা দেখাতেন, সেরকম একটা। লক্ষ্মী ছেলেদের মতো আরও সচেতন পড়ুয়ারা উঠে আসুক। আর রজত নারায়ণ রায়ের মতো লোক জেল খেটে এসে আবারও টিকিট পাক —- একদম শেষ লাইনেও জয় মিত্রের কথনে পরিচালক এটাও জানাতে ভোলেননি….!

কুর্নিশ ‘লক্ষ্মী ছেলে’! কুর্নিশ কৌশিক গাঙ্গুলি!
বাংলা সিনেমা একটু অক্সিজেন পেলো আপনার হাত ধরে আবারও….একটা সৎ প্রচেষ্টা…. 

© শুভঙ্কর দত্ত  September 4, 2022