নগরকীর্তন – বাঁচার অধিকার ওদেরও…

সিনেমাটা কেন দেখতে চান?
‘নগরকীর্তন’ এর দুটো টিকিট চাইতেই টিকিট কাউন্টার থেকে ইন্টারভিউসম প্রশ্ন ধেয়ে এলো….
বাংলাসহ সারাভারতে আলোড়ন করা বিশেষ এই সিনেমা দেখতে চাওয়া দুই বন্ধুকে এক বৃদ্ধের এই প্রশ্ন।

বললাম – ‘কৌশিক গাঙ্গুলি আমার প্রিয় পরিচালক…..! একটু ইয়ার্কি মেরেই বললাম, বাকিটা দেখে এসে বলি…!
ভদ্রলোক হাসলেন।
বললেন শুধুই এই কারণ….?

বললাম — না আসলে ঋদ্ধি কেও ভালো লাগে, সেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ থেকেই ফ্যান!
বললেন — ‘কৌশিক গাঙ্গুলি প্রিয় পরিচালক, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হয় উনি নিজেকে ঋতুপর্ণর জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন!’

টিকিট কাটা হলো৷
আসলে একটা পরীক্ষা পড়েছিলো কলকাতায়, দুই বন্ধু মিলে ট্রেনে আসতে আসতেই একটা প্ল্যান মাথাচাড়া দেয়, আর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ১ কিমি দূরত্বে সিনেমাহলে ‘নগরকীর্তন’ চলছে। সুরজিৎ বললো – ‘এ সুযোগ হাতছাড়া করলে অ্যাচিভমেন্ট বলে কিছু থাকবে…?’ এরকম গোছেরই কিছু। অতএব, চলো, এগিয়ে যাওয়া যাক্। ব্যস্ ‘মিত্রা’ দাঁড়িয়ে আছে!

টিকিট তো কাটলাম, দেড় ঘন্টা বাকি এখনো। এদিক ওদিক ঘুরছি, কিন্তু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সিনেমাটা দেখতেই হবে, অতিশয় আগ্রহকে সঙ্গী করে।

——————————————————————
সিনেমা শুরুর আগে কিছু কথা উঠলো।
এই গল্প সেইসব প্রেমের গল্প, যে গুলো আর পাঁচটা প্রেমের মতো নয়।
ভেসে উঠলো Tributed To…. কে হতে পারে? আরে, নান্ আদার দ্যান ঋতুপর্ণ ঘোষ…!
ছবির নীচে ইটালিক্সে লেখা
“পরজনমে হইও রাধা….”
বুঝতে বাকি রইলো না। সদ্য ‘সমান্তরাল’ দেখেছি৷ কৌশিক গাঙ্গুলিও আগে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বানিয়েছিলেন, মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ৷ তবে কৌশিক গাঙ্গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। সত্যিই তো সিনেমাটা কেন দেখতে যাবো?
‘ছোটোদের ছবি’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘শব্দ’ কেন দেখতে গিয়েছিলাম বা কেন দেখেছি?
কারণ উনি অন্যদের কথা বলেন, অন্যকিছু বলেন, সবাই যেটাকে নিয়ে ভাবেন না, যাদের নিয়ে ভাবেন না, উনি তাদের কথা তুলেই ধরেন। তাই…….! এটা অবশ্য বৃদ্ধকে বলা হয়নি৷

পরিমল-পরি-পুঁটি (ঋদ্ধি সেন) এই গল্প একদিকে চলতে থাকে, আর একদিকে….পুঁটির প্রেম চলতে থাকে, প্রেমিকের ওপর ভরসা করে চলতে থাকে জলে থেকে কুমীরের সাথে লড়াই করার অব্যহতির খোঁজ। শৈশব থেকে মনের মধ্যে পুষতে থাকা নারীত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আবদার — “শরীরে ভুল আছে মধুদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী) , শুধরে নিতে হবে….!”
সমান্তরালভাবে দুটো গল্প বলায় একটুও বোরিং লাগেনি, ততটাই সাবলীল লাগলো শুভজিৎ সিংহের কাঁচি চালালনোটা, অবশ্য আগেও ‘ছায়া ও ছবি’, ‘মাছের ঝোল’, ‘বিসর্জন’, ‘শব্দ কল্প দ্রুম’ এর মতো সিনেমাগুলিতে একই কাজ করেছেন।

বহুদিন আগে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ পড়েছিলাম, বেশ লেগেছিলো, সিনেমাটা দেখতে দেখতে বেশ ওটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যদিও সেখানে গল্প ভিন্ন। তবে সেই উপন্যাসের একজনের উল্লেখ ছিলো বারবার, সিনেমাতে দেখি স্বমহিমায় তিনি উপস্থিত – মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালকের মুন্সীয়ানা চোখে পড়লো, সোমানাথ থেকে মানসী হওয়ার লড়াই – গল্প সবকিছু বলিয়ে নিলেন তার মুখ দিয়ে, শুধু তাই নয়, বলিয়ে নিলেন – শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণভাবে মজে যাওয়ার ঘটনাটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার ফলে সিনেম্যাটিক ভ্যালু বেড়ে যায় বলেই মনে হয়৷

সিনেমার দৃশ্যপট এতো বাস্তব যে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়েও এই সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও বারবার মনে হচ্ছিলো এটা বোধ হয় খুব সহজ একটা ঘটনা৷ মধুদের পৈতৃক বাড়ি – নবদ্বীপ, যেখানে চিত্রনাট্য পৌঁছানোর পর থেকেই একটা ক্ষীণ উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হতে বাধ্য দর্শকদের মনে, যেটা তীব্র হয়, যখন দোলপূর্ণিমার আসরে মধু বাঁশি বাজায়, আর পুরুষরূপী নারীমনের পুঁটির আসল রূপ আচমকাই প্রকাশিত হয়ে যায়।

এরপরও আরো ঘটনা……! ঘটতেই থাকে….! শেষ আধ ঘন্টা দর্শকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দিতে বাধ্য, ভাবাতে বাধ্য। সিটে আরাম করে বসে থাকা ঘুচিয়ে দিতে সফল এই সিনেমা। ওয়াটসআপ-ফেসবুকের মাধ্যমে কিভাবে কোনো ঘটনা ভাইরাল করা যায় তা দেখাতেও ছাড়লেন না। ‘নগরকীর্তন’ নামটা বেশ ব্যঞ্জনধর্মী বলেই মনে হলো, নগর বা সমাজে চলতে থাকা অহরহ ঘটনাপ্রবাহগুলোকেই বলা হচ্ছে এখানে।
ঋদ্ধি সেন কেন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, তার সদুত্তর মিলবেই, কস্টিউম-মেক আপের সাথে যেভাবে পরতে পরতে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন, অসাধারণ….! (তাই দুটো জাতীয় পুরস্কার কস্টিউম আর মেকআপে, নগরকীর্তনের ঝুলিতেই) সাথে আবার ঋত্বিক থাকলে তো পাশের লোককে ভালো অ্যাক্টিং করতেই হবে….! আর্ট ডিরেকশন প্রশংসনীয়। কীর্তনের সাথে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঁশিকে, অনেক দুঃখের মাঝে একটা আনন্দের চোরাস্রোত বয়ে যায় দর্শকের অলিন্দ বেয়ে…..! সৌজন্যে – প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি….! ভালো লেগেছে সুজন মুখার্জি ওরফে নীলকে, মধুর বৌদির চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী যতক্ষণ ছিলেন ফাটিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যটা৷

মন ছুঁয়ে যায়, কীর্তনের মাধ্যমে বলা – “তুমি আমারই মতন জ্বলিও…” এই অকপট কথা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে….! রাধার প্রেমে মজে নিজেকেই রাধারাণী করতে উদ্যত।

সবশেষে বলতেই হয় কৌশিক গাঙ্গুলি আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন নিজেকে। অভিনয়ও করিয়ে নিলেন তাদের দিয়ে। ওনারা আশাবাদী এ সিনেমা দেখার পর মানুষজন তাদের হয়তো এতেটা অবজ্ঞা করবেন না। যাদের একঘর করে রাখে সমাজ, তিনি বারবার তাদের উপস্থাপিত করে গেছেন, বলে গেছেন সমাজকে পাল্টে নিতে ভাবধারা, কয়েকজনের বাঁচার মতো সমাজ কি আমারা গড়তে পারিনা, শ্রেনীশত্রু সৃষ্টি করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না…!
হলের টিকিট কাউন্টারের বৃদ্ধ মানুষটির দোষ খুঁজে পেলাম না বিশেষ, কারণ এ সিনেমা সবার জন্য নয়, কৌশিক গাঙ্গুলি বলেইছিলেন, এ সিনেমা রোজগারের জন্য বানানো নয়, এগুলো বানানোর পেছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো বোঝেননি….কবেই বা বুঝবেন।

কবেই বা বুঝবেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কেন আছেন এ সিনেমায়, কেন উৎসর্গ করার জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির নীচে লেখা

‘পর জনমে হইও রাধা…..’

© শুভঙ্কর দত্ত || February 25, 2019 

একটা কনভারশেসন কল এবং… কর্ণগড়

PANO_20171229_145823
প্যনোরমাতে কর্ণগড় মহামায় মন্দির

কথা ছিলো মকর সংক্রান্তিতে কর্ণগড়, দ্বিচক্রীকে বাহন করে যাওয়া হবে!
কথা ছিলো বেলপাহাড়ী ঘুরতে যাওয়া হবে! সঙ্গ এবং সময়ের অভাবে বেলপাহাড়ী সিল্করুট আপাতত বন্ধ! কিন্তু ১৪ ই জানুয়ারির কর্ণগড় ভ্রমণকে একটা কনভারশেসন কল মারফৎ এগিয়ে আনতে হলো! পার্টনার? – সেই বছর দুয়েক আগে যে দুজন জুটেছিল। সৌমেন আর ইমতিয়াজ।

 

dS photography20171230_060449
প্রবেশমুখ থেকে…

 

dS photography20171230_060600
দণ্ডেশ্বর ও খড়্গেশ্বর জীউ মন্দির, প্রবেশদ্বার থেকে

 

বাসে করে ভাদুতলা, তারপর বাকিটা কর্ণগড় গামী বা শিরোমণিগামী অটোতে চেপেছিলাম মনে নেই, তবে হালকার ওপর ফেন্সি করে ভিড় ছিলো, প্রথমে কোথায় পা রাখবো, তা নিয়ে বেশ ধন্দে ছিলাম। যাই হোক্, অটো চলতে শুরু করতেই বসার জায়গায় ঠিকঠাক সেঁটে গেলাম।

 

দু বছর পর মহামায়া মন্দিরে এসে “জুতো স্ট্যান্ড” চোখে পড়লো! বহু বহু স্ট্যান্ড দেখছি, জুতো স্ট্যান্ড, এই প্রথম!কে জানে, হয়তো শেষ বারও। বছর দুয়েক রংটা এমনই কৃত্রিম ছিল কিনা মনে নেই মন্দিরের, তবে প্রথম যখন এসেছিলাম মন্দিরের রংটার মধ্যে একটা প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ ছিল। সে যাই হোক্, দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরিয়েছিলাম, কারণ আমাদের সাফসুতরো লক্ষ্যই ছিল ঘোরা আর ছবি তোলা! ওখানে যখন নামছি ইণ্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম বললো দুটো ১৭। তারপর প্রায় দেড় – দু ঘন্টা জুড়ে দাপাদাপি চললো। ফটো শিকার! মকরে এলে ছবি তোলাটা হয়তো ফিকে হয়ে যেতো কিন্তু সেই মহাপ্রসাদ! সে তো প্রাণ জুড়িয়েদিয়েছিলো, সেটা মিস করলাম, স্বাভাবিক। দু ঘন্টার শেষটা কাটলো ঐ পুকুর পাড়ে, সঙ্গে আগের বারের ট্রিপগুলোর স্মৃতি রোমন্থন! বেশ কেটে গেলো। আসার সময়, অটোচালককে জিগ্গেস করতে জানা গেলো – ‘এতো শুধু মন্দির, যে রাস্তা দিয়ে আমরা আসছি, ঐ রাস্তা দিয়ে মন্দির পেরিয়ে গেলে কর্ণগড় এর বিস্তৃত এলাকা চোখে পড়বে, তবে তেমন কিছুই আর নেই!” সবই অঅন্তঃসারশূন্য। তারপর ঠাহর হলো – হ্যাঁ তো, কর্ণগড়, একটা কেমন যেন সমাসবদ্ধ পদ ঠেকছে! চলো তবে একটু হাতড়ানো শুরু হোক্। শুরু করলাম। ওমনি গুগল ঝপঝপ করে কাঙ্খিত দু’খান লিংক দিয়ে দিলো! পড়ে যা জানলাম, বলার চেষ্টা করছি মাত্র-

 

IMG_20171230_071845
Descending….

 

dS photography20171230_062032
অস্তগামী সূর্যের সামমে

 

কর্ণগড়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। ইন্দ্রকেতু নামে এক রাজা এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ইন্দ্রকেতুর ছেলে নরেন্দ্রকেতু মনোহরগড় স্থাপন করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। রণবীর সিংহ নামে এক লোধা সর্দারকে রাজ্য শাসনের ভার দেন তিনি। অপুত্রক রণবীর সিংহ অভয়া নামে এক মাঝির ছেলেকে পোষ্যপুত্র করে তাঁর হাতে রাজ্য শাসনের ভার অর্পণ করেন। তারপর বংশপরম্পরায় রাজ্য শাসন চলতে থাকে।

কর্ণগড়ের যাবতীয় আকর্ষণ এই মহামায়া মন্দিরকে কেন্দ্র করে। মন্দিরে মহামায়া ও দণ্ডেশ্বরের বিগ্রহ রয়েছে। উৎকল শিল্পরীতিতে তৈরি মন্দিরটিতে পঞ্চমুণ্ডির আসনও রয়েছে। কর্ণগড়ের নিসর্গও মনোরম। গাছগাছালি, নদী দিয়ে চারদিক ঘেরা। মেদিনীপুর শহর থেকে জায়গাটি খুব বেশি দূরেও নয়। তাই এক সময় এই এলাকাটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, রাস্তা তৈরি হবে, হবে পার্ক। এবার গিয়ে অবশ্য কিছু কেমন প্রস্তুতি চোখে পড়লো। রাস্তা সারাইয়ের কাজও চলছে।

রয়েছে বলতে শুধু মহামায়ার মন্দির। সংরক্ষণের অভাবে বাকি সব হারিয়ে গিয়েছে। বহু খুঁজেও দু-চারটে ইটের বেশি কিছু মিলবে না। চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত রানি শিরোমণির গড়ের এখন এমনই দশা। গড় অর্থাৎ দুর্গের আর অস্তিত্ব নেই। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় শেষ অপুত্রক রাজা অজিত সিংহের। তাঁর দুই রানি ছিলেন ভবানী ও শিরোমণি। রানি শিরোমণি ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনদের এককাট্টা করে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এই জন্য ইংরেজদের কোপে পড়েন রানি। তাঁকে বন্দিও করা হয়। নাড়াজোলের রাজা আনন্দলাল খানের মধ্যস্থতায় চরম সাজা না হলেও তাঁকে আবাসগড়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

কর্ণগড় ছাড়াও আরও দুটি গড় ছিল রাজবংশের , আবাসগড় ও জামদারগড়। মেদিনীপুর শহরের উত্তরে বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তায় পড়ে। সেখানেও কিছু নিদর্শন মেলে। কিন্তু সময়ের চোরাস্রোতে হারাতে বসেছে সেইসব ইতিহাসের সূত্র। ১৬৯৩ থেকে ১৭১১ সাল প‌র্যন্ত এই গড়ে রাজ করেছিলেন রাজা রাম সিংহ। পরে রানী শিরোমনি এবং নাড়াজোলের রাজা মোহনলাল খাঁ এই গড়ের উন্নয়ন করেছিলেন।

 

মেদিনীপুর শহর থেকে উত্তর দিকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কর্ন রাজবংশের রাজধানী ছিল, তার প্রমাণ আজও মেলে। প্রধান গড় ছিল কর্ণগড়। মেদিনীপুরের প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার ব্যস ধরলে  বিস্তৃত ছিল । এই গড়ের নিজস্ব চরিত্রটি অদ্ভুত। জঙ্গলমহলের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে জলস্রোত নদীর আকার ধারণ করে  ‌যেখান দিয়ে বয়ে ‌যেত সেটি গড়ের অন্দরমহল। নদীটি খুবই ছোট, নাম পারাং। গড়ের দু দিক দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে একসঙ্গে মিলিত হত পারাং নদী। অনেকটাই পরিখার মতো। এই গড়ের মধ্যেই ছিল, কুল দেবতাদের মন্দির অধিদেবতা দণ্ডেশ্বর এবং অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভগবতী মহামায়া।

তবে মহামায়ার মন্দিরটি এখনও অটুট রয়েছে যেখানে বসে কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য সাধনা করতেন। প্রচলিত রয়েছে, এখানে বসেই রামেশ্বর শিবায়ন কাব্য রচনা করেছিলেন। রামেশ্বরের কাব্যে কর্ণগড়ের উল্লেখও রয়েছে
‘যশোবন্ত সিংহ/ সর্বগুণযুত/ শ্রীযুত অজিত সিংহের তাত। মেদিনীপুরাধিপতি/ কর্ণগড়ে অবস্থিতি/ ভগবতী যাহার সাক্ষাৎ।’

তবে রাণী শিরোমণি স্মরণে মেদিনীপুর শহরেই গেস্ট হাউস আছে, এমনকি ভারতীয় রেল রাণী শিরোমনির স্মৃতির উদ্দেশ্যে আদ্রা-হাওড়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনও চালু করেছে! গেস্ট হাউসের কথা কেউ মনে রাখতে না পারলে এই ট্রেনটির কথা তো অনেকেই জানেন!

 

 

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কর্ণগড় একদিনের ট্রিপ হিসেবে দারুণ! যতবার যাই, অনেক অনেক ছবি কুড়িয়ে আনি আর মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়, উৎসবের সময় না গেলে ওখানের নিরিবিলি প্রকৃতির শোভা বেমালুম উপলব্ধি করা যায়, আর মকরে গেলে তো পায়েসসহ উত্তম প্রসাদ খাওয়ার সুযোগ রইলই!

dS photography20171230_062355
ঘরের মধ্যে ঘর
IMG_20171229_155020
ফ্রেম-এ-ক্যামেরা

 

পথনির্দেশিকা:: মেদিনীপুর/খড়গপুর থেকে বাঁকুড়া রোড ধরে ভাদুতলা, তারপর আর বলতে লাগবে কি! অটোওয়ালারা উপস্থিত মহামায়ার অধিষ্ঠানে হাজির করানোর জন্য।

তথ্যসূত্র::
 আনন্দবাজার পত্রিকা
 (http://archives.anandabazar.com/archive/1140102/2med4.html)

 

DSC_0654
চলো এবার, ফেরার পালা….

‘অক্ষয়’ অনুভূতি

“মানুষের কতরকমের যে উদ্ভাবনী শক্তি এবং প্রয়োজন৷ আর এতো অক্লান্ত উদ্ভাবনী শক্তি আছে বলেই এত উলটোপালটা প্রয়োজন।”

— অক্ষয় মালবেরি পড়া শেষ করলাম।

এমন উপন্যাস পড়তে পারলে দারুন আরাম লাগে।মনের…! প্রশান্তি, বলা ভালো।  আমাদের মানুষদের একটা দারুন মিল প্রায় সবার মধ্যেই রয়েছে সকলেই জীবনে একবার হলেও শৈশবে ফিরে যাওয়ার বাসনা প্রকাশ করে। হয়তো একাধিকবার!
শৈশবে ফিরে যাওয়া তো সম্ভব নয়৷ কিন্তু বই পড়তে পড়তে তেমন স্বাদ যদি মেলে….!

প্রকৃতি যেখানে মানুষের রূপ পায় আর মানুষের মধ্যেই প্রকৃতির সৌন্দর্য – মণীন্দ্র গুপ্ত কি স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে বইটি পড়িয়ে নিলেন। আহামরি উৎকণ্ঠা অনুভব করিনি পড়তে পড়তে তবুও মনে হচ্ছিলো যে এ বই যত জলদি শেষ করবো তত জলদি জানতে পারবো লেখকের কি গতি হলো!

পার্থিব জগতের বস্তুগুলির তুলনাগুলি কি সুন্দর লেগেছে, সে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সত্যি বলতে চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে, বসেও ছিলাম। কতবার যে শৈশবে ফিরে গিয়েছি। না জানি, বয়স্ক মানুষরা পড়লে তাদের কি হাল হবে!  এক অফুরান আনন্দে হয়তো কেউ থামতেই পারবেন না। ছোটোবেলাটা যে কত সুখের, সেটা উপন্যাসের তৃতীয় বা শেষ পর্বে এলেই বোঝা যায়! কারণ পড়তে তুলনামূলক ভালো লাগে না অথচ লেখকের কোন দোষ নেই। তিনি কি সুন্দর সব গল্প বলেছেন আমাদের। পাঠক কি না, খিদে একটু বেশিই! কেউ কেউ চতুর্থ পর্বের জন্য অপেক্ষা করেন, চিঠি পাঠান, অবশ্য তার সম্ভাবনার কথা তিনি অঙ্কুরেই বিনাশ করেছেন।

বারবার পড়তে ইচ্ছে করে যেন মালবেরির অপার্থিব গন্ধ পাই পাতা থেকে। পড়তে পড়তে স্তব্ধ হয়ে ভেবেছি — আহ! এমনটাই তো হয়েছিলো! বয়সকালে গিয়ে ফেলে আসা শৈশবের কাহিনী লেখাটা কতটা কষ্টের আবার আনন্দেরও সে বলাই বাহুল্য! সত্যিই সে জীবন ‘অক্ষয়’! এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ বলে মনে করি আমি।

এর চেয়ে বেশি কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই বা আরও পড়তে হবে দু’বার  অনুভূতি টনটনে করার জন্য।  শব্দ জানলাম বেশ কয়েকটি, নতুন। পরে হয়তো সাহায্য করবে এই ‘অক্ষয়’ই!

শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর

March 16, 2020

 

সিমলিপাল অরণ্যের দিনরাত্রি…

 

IMG20200223065729-01
কুয়াশার চাদর পেরিয়েছি সবে….

 

পঞ্চলিঙ্গেশ্বর আর দেবকুন্ড ঘুরে বারিপাদায় হোটেলে উঠলাম। ঘুম না হওয়ার অনেক কারণ থাকলেও তার দায় মশককুলকে দেওয়ায় যায়। পরের দিন ভোরে উঠে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়েছি, ড্রাইভার আসলো। নাম – শরৎ, আগের দিনই রাতে পরিচয় করে গিয়েছে সে। গাড়ি চললো, উদ্দেশ্য – সিমলিপাল, পিঠাবাটা (পড়ুন পিঠেব্যথা) গেট। আসলে সিমলিপাল ঢোকার একাধিক গেটই রয়েছে, কিন্তু রাস্তা সব গেট থেকে ভালো নয় বা দূরত্বও বেশি, আর বারিপাদা থেকে এই পিঠেব্যথার দূরত্ব অন্যান্য গেট এর চেয়ে কমই। আনন্দের আর সীমা নেই যখন জানলাম আমাদের ড্রাইভারদা বাংলা জানে, বাঙালীর এ যেন স্বর্গে হাতে পাওয়া।

IMG20200223064802-01
অজানার উদ্দেশ্যে..

(আসলে কথাটা সিমিলিপাল কিন্তু প্রচলিত শব্দ সিমলিপালই বলা হয়ে গিয়েছে বারবার)

 

IMG20200223153956-01
সূর্যলোক গায়ে মাখে এ অরণ্য
IMG20200223084426-01
অক্সিজেনের প্রাচুর্যে
IMG20200223091130-01
সর্পিল পথে অনন্ত বনরাজির পানে..

টিকিট কাটা হলো, গাইড এর জন্য বরাদ্দ টাকা দিতে হবেই। সে এবার গাইড কে গাড়িতে না নিলেও হবে আর আমাদের ড্রাইভার বেশ পরিচিত, সে ওসব থেকে বাঁচিয়ে দিলো নইলে গাড়ির মধ্যে দোকান রাখার বেশ অসুবিধা হতো বইকি! গাড়ি প্রবেশের আগে আমাদের চেকিং করলো একটা পুলিশ…. এলকোহল (এই টার্ম আমি এম এস সি পড়ার সময় শিখেছি) আছে কিনা! এরপর গেট খুলতে গাড়ি ঢুকলো সিমলিপাল জাতীয় উদ্যানে। দুপাশে ঘন জঙ্গলের মাঝের মোরাম রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো….প্রথম গেট আসলো ভজম বলে একটা জায়গায়….এরকম গেট আছে আরও চার বা পাঁচটা গোটা রাস্তায় কিন্তু আমার আর মনেও নেই। তখন বাজে প্রায় সাড়ে সাতটা। আমরা প্রথম গেটটা পেরোলাম আমরা। সুরজিৎ মোটামুটি ড্রাইভারের সাথে হিন্দিতে বাতচিত চালিয়ে যাচ্ছে, ভুলে গিয়েছে যে তিনি বাংলা বলেন, এবং বোঝেন, আমরাও ভাবছি ‘বাতচিত’ কখন বাক্যালাপে পরিণত হবে…!

IMG20200223111057-01
হেথা উর্ধ্বে উঁচায়ে মাথা দিলো ঘুম….

 

IMG_20200223_162220-01
যত আদিম মহাদ্রুম….

এরপর চলেছি, এক অজানা তালিকা কি কি দেখতে পাবো তা ভেবে, দূর থেকে ড্রাইভার এর চোখে পড়লো প্রমাণ সাইজের বনমোরগ। এবার নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার মধ্যেই বনের মধ্যে ঢুকে গেলো সে। আরও এগিয়ে চলেছি, একটা সবুজ পায়রা দৃষ্টি পড়তেই উড়ে মিলিয়ে গেলো…পাহাড়ি পথের বাঁকে মাঝে মাঝেই দেখা মেলে জলের…কোথাও শুকিয়েও গিয়েছে সেই জল। আসলে গহীন অরণ্যের বুক চীরে এগিয়ে চলা নদী বা ঝর্ণায় হবে। একটা জায়গা এলো.. গাছের পাতাগুলো দেখলেই যেন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় যে এখানের বাতাস সবই বিশুদ্ধ। এরপর দুটো ময়ূর দেখা গেলো। আহহ, পরমেশ্বর যেন দুহাত দিয়ে গড়েছেন, চিড়িয়াখানায় খাঁচার ওপারে দেখা আর জঙ্গলে তাদের বাসস্থানে নিজস্ব ভঙ্গিমায় দেখা একদম আলাদা মাত্রা। একটা সম্বর দৌড়ে রাস্তা পার হলো। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সাথে কারো বাইনোকুলার নেই। গাড়ি কখন যে একটু সমতল পেয়েছে ঠাহর হয়নি। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা ছেলেমেয়ের দল হাত নাড়িয়ে ওয়েলকাম জানাচ্ছে। পরে ভুল ভাঙলো। আসলে অনেকেই পুরনো জামাকাপড় দিয়ে যান এদের, ওরাও হয়তো বুঝেছে আমরা দেবো। আমাদেরকেও বলেছিলো কিন্তু সে কথা খেয়াল ছিলো না বিন্দুমাত্র। মনে মনে স্থির করলাম পরের বার আর হবে না।

IMG20200223101554-01
হল্ট স্টেশনের দোকান খানি

 

IMG20200223100003
সেই স্কুলবাড়িটা

 

IMG20200223100656
শুধু বেসনের পাকোড়া

 

IMG20200223145827-01
বেড়া হয় সব ঘরেরই…

সেখানে স্কুলবাড়িও রয়েছে, রয়েছে আস্ত একটা গ্রাম। আর অনেক সময় ধরেই চোখ পড়ছিলো যে এখানে বিদ্যুৎ দফতর তো পৌঁছায়নি কিন্তু সূর্যদেবতা আর বিজ্ঞানের পরম আশিষে সৌরকোষ দিয়ে চলে যায় এদের। মোবাইলের নেটওয়ার্ক জুড়ে শুধুই শূন্যতা। একজন বন্ধু বললো শুধু একটু নেটওয়ার্কটা লাগতো, আমরা দু একজন বললাম বেশ তো ভালোই লাগছে, নির্ঝঞ্ঝাট আছি। একটা দোকানে গিয়ে পকোড়া সাঁটানো গেল। এতো ওপরে মালপত্র আসে কিভাবে জিগ্যেস করতে ড্রাইভারের থেকে জানা গেল – গাড়ি আসে সপ্তাহে দু দিন। এরপর আবার চলতে শুরু করলো গাড়ি। যাচ্ছি জোরান্দা জলপ্রপাত, পশু-পাখি দেখা ছাড়াও আমাদের পিপাসা মেটানোর জন্য প্রথম গন্তব্যস্থল এটাই। পাহাড়ি রাস্তা ছেড়ে একটু সমতল পেয়েছে গাড়ি। শহুরে – সুবিধেবাদী  সভ্যতা থেকে এতো যোজন দূরে এই পাহাড়ি এলাকায় ইঁটের বসতি দেখে ভিরমি খাই আমার মতো পর্যটকেরা। ড্রাইভারের শরণাপন্ন হওয়ার কিঞ্চিৎ পূর্বেই নিজেদের চোখেই দেখি একদল লোকজন ইঁট বানাচ্ছে, আর মাঠে কোদাল দিয়ে মাটি চোপাচ্ছে তিনজন শিশু, বয়স আট বছরও হবে না কারোর।

IMG20200223094938-01
|| মানুষের ঘরবাড়ি ||

 

IMG20200223095727-01
পাহাড়ের কোলে ঠাঁই হয়নি যাদের…

 

IMG20200223100050
বিদ্যালয়েরই অংশবিশেষ

 

টলতে টলতে পৌঁছালাম জোরান্দা জলপ্রপাত। প্রায় পাঁচশো ফুটের এই একধাপের জলপ্রপাতটি ওড়িশার অন্যতম মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। ঝরাপাতার চাদর মাড়িয়ে হেঁটে পৌঁছালাম এমন একটা জায়গায় যেখান থেকে ঝর্ণাটাকে আধি দেখা যায়, অতঃপর সে জায়গায়….একটা ক্ষীণ স্রোত, খুব কম পরিমাণ জল নিয়েই পাঁচশো ফুট নীচে পড়ছে আর তাতে যে শব্দ সৃষ্টি করেছে সেটা দূরত্বে থাকা পর্যটকদের কানে এমন কিছু বেশি লাগছে না। মিহি সুরে কারা যেন কোরাস ধরেছে।

DSC_6830
ঝরাপাতার বিছানা মাড়িয়ে জোরান্দা অভিমুখে

 

IMG20200223110501-01
জানান দেয়… আমাদের অবস্থান

 

IMG20200223104435-01
নয়নাভিরাম…

 

ঘড়িতে দেখলাম এগারোটাও বাজেনি। কিন্তু এই জলপ্রপাত আর পাহাড়ের অসংখ্য গাছ-গাছালি মিলে এমন এক ধোঁয়ার সৃষ্টি করেছে যে কোনো ছবিই ভালো ওঠে না। সুরজিৎ এর প্ল্যান অনুযায়ী এক রকম টি শার্ট কেনা হয়েছিল, এবার শ্যুটিং এর পালা। একটু অন্যদিকে গিয়ে দেখলাম কতগুলো ঘর এর শুধু কাঠামো বর্তমান। ড্রাইভার পরে বলে দিলো তার কারণ- মাওবাদীদের উৎপাত।

IMG20200223111639-01
এ কি দৃশ্য দেখি অন্য…এ যে বন্য

 

IMG20200223111311-01
নীল রঙ ছিলো ভীষণ প্রিয়

 

IMG20200223104736-01
সন্তর্পণে…

 

IMG20200223110421-01
মধ্যমণি জোরান্দা…
IMG20200223111231
ফ্রেমবন্দী করে রাখার প্রয়াস…আমিও তুলে রাখি

 

IMG_20200223_104702
শ্যুটিং শেষে ফিরে যেতে হয়

আবার ঐ পথেই গাড়ি এসে একটা পথনির্দেশক বোর্ড চোখে পড়লো। ফেরার পথে চোখে পড়লো সেই দলটাকে। একজন বাচ্চা মেয়ে একটা কোলের বাচ্চাকে নিয়ে লোফালুফি করছে ঐ সদ্য বানানো কাঁচা ইঁটের সারির পেছনেই! গহীনে অরণ্যের রোমাঞ্চকে দশ গোল দেয় সে দৃশ্য, ক্যামেরাবন্দী করার সাহস হলো না।  বরেহিপানি ফলস বেশ কিছু কিমি দূরত্বে। আমাদের গন্তব্য – বরেহিপানি। একটা গাড়ি পেছন থেকে এসে ধুলো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেলো। থেমে গেলাম আমরা কিছুক্ষণ, নইলে ঘনঘন গাড়ির আওয়াজে প্রাণীগুলির দর্শন পাবো না। খাওয়াদাওয়ার প্ল্যান শুরু হতে ড্রাইভার বললো যে এখানে দেশী মুরগী কিনে রান্না করিয়েও নেওয়া যায়, সে উদ্দেশ্য “কুকড়া হ্যায়?” অভিযান শুরু হলো কিন্তু সে অভিযান ব্যর্থ হলো। গাড়ি থামলো একটা হোটেলে। খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো…পাশেই একটা অস্থায়ী দোকানে শাল চিকেন বিক্রি হচ্ছে, অতএব একবার চেখে দেখা যাক্, তাই হলো। ম্যানেজার একটু খাদ্যরসিক হলে এসব উটকো খিদেতে সিলমোহর পড়তে বেশি সময় লাগে না।

IMG20200223123723
শাল চিকেন ওরফে স্বর্গ

 

IMG20200223123449-01
ছদ্মবেশীর দল…

 

IMG_20200306_172142
প্রস্তুত হয় যেমন করে…

খাবার অর্ডার দিয়ে বরেহিপানির উদ্দেশ্যে গাড়ি রওনা দিলো। এরপর রাস্তায় পড়লো হরিণ। গভীর জঙ্গল যেখানে একটু আলগা হয়েছে সেখানেই ওদের চরে বেড়ানো। একটা টাওয়ারও করা আছে আর তাকে ব্যবহার করা হলো না। আমরা দেখতেই ওরা ভেতরে ঢুকে গেলো। আবার আমরা যখন চলে গিয়েছি এরকম অভিনয় করলাম তখনই বেরিয়ে চলে এলো। যেন “লুকোচুরি” চলছে। আরও দেখতে পাবো এমন আশায় বরেহিপানির দিকে চরৈবতি। চলে এসেছি।  জঙ্গলাকীর্ণ সে স্থানে একটা ওয়াচ টাওয়ার আর রেলিং দিয়ে ঘেরা একটা পাহাড়ের কিনারা থেকে দেখছি ওপারে সুউচ্চ একটা পাহাড় থেকে ঝর্ণার জল পড়ছে…. তবে এর উচ্চতা অনেক বেশি, সুরজিৎ জানান দিলো সব ধাপ ধরলে এটিই ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত। প্রায় ১৩০০ ফুটের কাছাকাছি, মানে জোরান্দার আড়াইগুণ। অনেক বেশি রোদ্দুর থাকার কারণে স্পষ্ট বোঝা গেলো। গাছ থেকে ঝরে যাওয়া পাতা, উড়ে যাওয়া পাখির দল সবেমিলে বুড়িবালাম নদীর এই ভয়ংকর অথচ সুন্দর রূপকে আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে তোলে….! পাহাড়ের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলরাশি যে বর্ষার সময়ে তার রূপ আরও বাড়িয়ে নেয় তা পাহাড়ের গা দেখলেই অনুমেয়।

IMG_20200223_125904
চুপটি করে থাক্
IMG20200223132053
নিঃশব্দে শ্যুটিং চলছেই
IMG_20200228_192624-01
বুড়িবালামের ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ – বরেহিপানি

স্নানের উপায় নেই। খিদে পেয়েছে। ফিরে এলাম। ড্রাইভারের সাথে গল্প চালাচ্ছে সুরজিৎ। জানা গেলো – এখানের গ্রামে যারা থাকে তাদের একটা লোকাচার রয়েছে, বছরে একবার জঙ্গলমাতার পুজো হয় এবং তাদের একটা বিশ্বাস রয়েছে যে তাদের গরু, ছাগলগুলিকে এই পুজোর কারণে বাঘ কখনো খাবার করেনি। আমাদের মতো শহুরে ভ্রমণপিপাসু লোকজন এক-দু’দিন ঘুরতে গিয়ে এসব লোকাচারকে অবান্তর বলে হয়তো হাসাহাসি করবে, তবে প্রতিটা জঙ্গলেই যেখানেই মানুষের বাস সেখানেই কিন্তু এমন বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। হোটেলে ফিরে নানারকম পদ আর কুকড়ার ঝোল দিয়ে ভাত সাঁটানো গেল। তার আগে অবশ্য শাল চিকেন সাঁটানো হয়েছে আরও একবার। শাল পাতায় চিকেন মুড়ে, মশলা মাখিয়ে আগুনে সেঁকে পুড়িয়ে নেওয়া, অতঃপর পাতা গুলো কালো হয়ে গেলে তা খুলে নিয়ে পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে….আহা সে কি স্বাদ! একটু হজম হতেই আবার বেরিয়ে পড়লাম শেষ গন্তব্য চাহালা। এবার একটু বন্যপ্রাণী দেখার বড়োই ইচ্ছে প্রকাশ হলো। ড্রাইভারও উৎসাহ দিলো। গাড়ি চললো, রাস্তা একটু ভেজা ভেজা। মনে হলো বেশি যায় না গাড়ি, সুরজিৎ জিগ্যেস করতে জানা গেল– এ জায়গার বন এতো ঘন যে সূর্যের আলো পড়ে না তেমনভাবে। জংলী আর আর্দ্র পথে পাতা পড়ে তাকে আরও নরম করেছে। ফরেস্ট এর পাহারাদারদের একটা টাওয়ারে এসে দাঁড়ালো, ড্রাইভার নেমে গেলো, আমাদেরও ডাকলো৷ দেখলাম কি দুর্বিসহ সে চাকুরী যদিও এখানকার ট্রাইবাল লোকজনদের জন্যই সে চাকরী ঠিকঠাক। সে বললো বাবুরা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন দেখলে অন্য গাড়িগুলোও ভিড় জমাবে। তাই তাড়াতাড়ি আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম। প্রবল উৎকণ্ঠায় চোখ মিলছি গাড়ির জানালা দিয়ে কিন্তু কিছুই পেলাম না। নাহহ, আর বোধ হয় দেখা পাবো না।

IMG20200223125519-01
শিরা ধমনী নিয়ে বরেহিপানি জলপ্রপাত
IMG20200223090551-01
আরণ্যক
IMG20200223142051
ব্যঞ্জন বেষ্টিত খাদ্য, এই একটাই ছবি যত্ন করে তোলা হয়নি

পৌঁছে গেলাম চাহালা। হাট বসলে যাকে খানিকটা সোনাঝুরির মতোই লাগবার কথা। বেশ উচ্চতার ইউক্যালিপটাস দিয়ে ঘেরা এই ওয়াচ টাওয়ারটি আসলে চাহালা নামক গ্রামে উপস্থিত। এটা কোর এরিয়ার মধ্যে বলা চলে। মনোরম এই স্থানে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই দেখা মেলে হরিণ, খরগোশ, ইয়াব্বড়ো কাঠবেড়ালির। কিন্তু ধৈর্য্য ততক্ষণে বিদায় নিয়েছে, একটুক্ষণ ওয়াচ টাওয়ারে কাটিয়েই নেমে এলাম গাড়ির কাছে। হঠাৎ চোখে পড়লো একদম মগডালে একটি Malabar Giant Squirrel মোটা লেজখানা নাড়াতে নাড়াতে টপকে অন্য ডালে…..! ড্রাইভার বললো শেষে বেরোবে কিন্তু অন্য গাড়ির লোকজন একই তালে থাকার দরুন আমরাই আগে বেরিয়ে পড়লাম।

IMG20200223161719
চাহালার ওয়াচ টাওয়ার
IMG20200223161646-01
প্যাভিলিয়নের পথে চাহালায় সূয্যিমামা…
IMG20200223160313
মিনার থেকে চাহালায় অপেক্ষারত ভ্রমণপিয়াসীর দল

 

IMG_20200223_151424
ফরেস্ট গার্ডদের জীবনযাত্রার হালচাল

 

IMG_20200223_111059
ফেলে আসা জোরান্দার সেই ধ্বংসাবশেষ, কারণ মাওবাদী

 

IMG_20200223_151410
১৪ ঘন্টার সঙ্গী

সন্ধ্যে হব হব করছে….অনেকটাই পথ। ঘুমও পাচ্ছে কিন্তু দেখা মেলে তৎক্ষণাৎ দেখতে হবে এইজন্য ঘুমতে ইচ্ছে হলো না। দিনের আলোর জঙ্গল রাতে কি ভয়াল রূপ নেয় তা বোঝা গেলো কয়েক ঘন্টার ঐ জার্নিতে। প্রতিটা গেটে জানান দিয়ে যেতে হয় আমরা পেরোলাম, এত সিরিয়াল নম্বর ছিল, জেনে নিতে হয় কটা গাড়ি পেরিয়েছে। আবার সেই হোটেলে গিয়ে থামলো গাড়ি, চা পানের বিরতি। দেখলাম সেই ছোট্ট মেয়েটা যে থালা পরিস্কার করছিলো তখন এবার সে চা জোগাড়ের অনেক কাজ করে দিলো। আমি বেশ দেখছিলাম, কিন্তু কথা বলার সাহস হয়নি৷ আমাদের সাথে ব্যবহার জামা কাপড় ছিলো না যে। একটা কেমন সুবিধাবাদীর লজ্জা আমার মনে তখন। এবার আবার অনিশ্চয়তার পথে পাড়ি….! একদল মহিলা হাত সেঁকছেন আগুন জ্বালিয়ে। কাজ করতে এসেছিলেন লোকজন, অপেক্ষা করছেন কখন ফরেস্ট এর গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। বেশ কিছুটা যেতে ঝিম ধরে গেলো। ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ গাড়িটা দাঁড়ালো, সামনে একটা গাড়ি ছিলো আমাদের অজান্তেই। দাঁড়িয়ে আছে, নিশ্চয় দেখেছে হাতি। এবার আবার সেই ভজম গেট। ড্রাইভার বললো ওরা বাঘ দেখেছে। আমাদের আফসোস এর সীমা নেই। পিঠেব্যথা গেট আর বেশি দূরত্বে নয়। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় রাতের বনানীকে দেখতে দেখতে যখন বন ছেড়ে বেরোলাম তখন রাত সাড়ে আটটা পেরিয়েছে সবে। এমনিতে নাকি ছ’টার আগেই বেরিয়ে যেতে হয়। শরৎ ড্রাইভার বহু অভিজ্ঞতার লোক বলে তার ব্যাপার আলাদা। অবশ্য বিভীষিকাময় হাতি বা বাঘ দেখার উৎকণ্ঠাটা রয়েই গেলো, পথ মধ্যে তেনারা স্থানুবৎ দন্ডায়মান হলে অবস্থা যে কি হতো আমাদের, তা অজ্ঞাতই রয়ে গেল। গাইতে হলো না – ‘পায়ে পড়ি বাঘমামা’….

IMG_20200223_101638
কাচাকাচির জন্য কিলোমিটার হয়তো

 



IMG20200223113818-01
সংগ্রাম অথবা নিজেরাই শ্রমিক

 

IMG20200223121218-01
টিফিনে একটু টায়ার খেলা…

 

DSC_6980
Men In Blue – সুরজিৎ ডেলিভার্স 🤘

ফিরে তো এসেছি, কিন্তু মনে মনে ভাবছি সেখানকার জনজাতির কথা, কিভাবে দিন গুজরান করে ওরা। আমরা সমতলের মানুষ, ফ্লিপকার্ট – অ্যামাজন – সুইগি আরও কত কি আমাদের জীবন জুড়ে….দু চারটে ক্লিকেই মুখে হাসি ফুটিয়ে দেবে। এক মিনিট দেরী করলে আমাদের কত অভিযোগ! ওখানে ওদের অভিযোগই নেই। আর করবেই বা কার কাছে? ড্রাইভারের থেকে জানলাম ওড়িশা সরকার এই লোকজনদের জঙ্গল ছাড়ার জন্য মাথাপিছু আট লাখ করে দেবে কিন্তু তবুও তারা ছাড়তে নারাজ, কি জানি! মোবাইলে ফোন করলে পাওয়া দুঃসাধ্য, কেবল ওরা ফোন করলেই খবর মেলে…। অভাব আছে, অভিযোগ নেই, নিজেদের মতো করে ধান চাষ করে নেয়, না জানি এভাবেই কত অভাবকে ওরা বশ মানিয়ে নিয়েছে। অভিযোজনটাই সব। জীবনটাই আসল। বেঁচে থাকাটাই…..একটা অরণ্য অভিযানই শিখিয়ে দিলো আবার!

 

IMG20200223093526-01
নাম জানিনা, ক্লান্ত পথ ঘিরেছিলো

 

পুনশ্চঃ দিনরাত্রি বললাম অথচ আমার কাছে রাতের একটাই ছবি রয়েছে সেটাও দেওয়ার মতো নয়। সুরজিতের থেকে নেওয়া হয়নি। ছেলেটা ফোন করে সিমলিপাল যাওয়ার প্রস্তাবটা দেয়। ভালো লেগেছিলো।

IMG_20200223_131617-01
বরেহিপানির জল কম পড়ায়….

ঋণস্বীকার: প্রায় সব ছবিই আমার তোলা তবুও তিন চারটে ছবি আছে যেগুলো সৌমেন আর শৌণকের তোলা। তবে সবচেয়ে বেশি ঋণী সেই অচেন ভিন্নভাষী মানুষটির প্রতি যিনি আমাদের গ্রুপ ছবিটি তুলে দিয়েছেন, কারণ এই একটাই ছবি পুরো গ্রুপের।

IMG_20200223_104436
Yes! Never Ever Forget You…..

 

© শুভঙ্কর দত্ত ||   March 6, 2020 

লাউসেনের হতশ্রী ময়নাগড়ে…

IMG20191116152203-01
ময়নাগড়ের তোরণ

ময়নাগড়ের ইতিহাস বড়োই বিচিত্র! অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় ময়নাগড় মূলতঃ লাউসেনের গড়, ঠিক তেমনই মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। দুটির মধ্যে যোগ-সম্পর্ক স্থাপন করাটাই ইতিহাসের কাজ৷

IMG20191116154859-01
অপেক্ষা… এপারে আসার

উঁকি মারে ইতিহাস….

গৌড়ের অধিপতি দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে যুদ্ধে পরাজিত কর্ণসেন তাঁর অধীনে সেনভূম ও গোপভূম অঞ্চল শাসন করতেন। গৌড়েশ্বর এর মন্ত্রীর নাম ছিলো মহামদ যার চক্রান্তে সোম ঘোষ নামে একজন অনুগত প্রজা কারাগারে বন্দী হন। পরে এই সোম ঘোষের সাথে গৌড়েশ্বরের গাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন হলে রাজপাট্টা, একটি ঘোড়া এবং একশ দেহরক্ষী সৈন্যসহ সোম ঘোষ কর্ণসেনের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। সোম ঘোষের পুত্র ইছাই ঘোষ কর্ণসেনকে যু্দ্ধে পরাস্ত করেন। তাঁর ছয় পুত্রকে বিনাশ করে রাজ্যের অধিকার নেন। পাঠক হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে এটা মহামদের ষড়যন্ত্র বই কিছু নয়। পুত্রশোকে কর্ণসেন-মহিষী বিষপানে আত্মহত্যা করেন। তখন গৌড়েশ্বর কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের অংশবিশেষ (ময়নামণ্ডল) এর রাজত্ব দেন। তিনি আগমন করেন কংসাবতীর শাখানদী কালিন্দীর জলপথে, কর্ণসেনের নতুন রাজধানী কর্ণগড় যা পরে ময়নাগড় নামে বিখ্যাত হয়।

কর্ণসেন এর দ্বিতীয় ধর্মপত্নী রঞ্জাবতী বাঁকুড়ার রামাই পণ্ডিতের উপদেশে ধর্মঠাকুরের তপস্যা করে লাউসেন (বা লবসেন) কে পুত্ররূপে লাভ করেন যিনি মঙ্গলকাব্যে লাম্বাদিত্য নামেও খ্যাত। লাউসেন অজয় নদীর তীরে ইছাই ঘোষকে নিহত করে পিতৃরাজ্য উদ্ধার করেন৷ এইভাবে বীরবর লাউসেনের সাম্রাজ্য বীরভূম থেকে ময়না পর্যন্ত বিস্তার লাভ করলো। এই ময়না গড়ে এখনও লাউসেনের কীর্তিচিহ্ন রয়ে গেছে। রাঢ় বাংলার জাতীয় কাব্য ধর্মমঙ্গল এর নায়ক লাউসেনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িতে জায়গাটি যে ময়নাগড় সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই৷ রঙ্কিনী কালীমূর্ত্তি তাঁরই পূজিত এবং এই কালীমূর্ত্তি অন্যদিকে লাউসেনের বৌদ্ধ ধর্মপ্রীতিকেই স্পষ্ট করে….! যাই হোক্, এ কথায় পরে আসা যাবে।

IMG20191116153632-01
পারাপার @ কালিদহ
IMG20191116152924-01
স্বমহিমায়… নৌরাসযাত্রায়

বঙ্গ হলো। এবার বঙ্গের সাথে কলিঙ্গের যোগসূত্রটা ধরা যাক্।

মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যভুক্ত – ‘জলৌতি দন্ডপাট’ এর অন্যতম৷ পরগণা ছিলো দুটি — সবং-পিংলা, ময়না৷ প্রায় ছয়শো বছর আগে ১৪০৩ খ্রীষ্টাব্দে কপিলেন্দ্রদেব (শোনা শোনা লাগছে কি? কুড়ুমবেড়াতে জড়িত যিনি)
সিংহাসন অধিকার করেন, তার পরে তাঁরই অধস্তন সেনানায়ক কালিন্দীরাম সামন্ত অধিষ্ঠিত হন, সবং এর বালিসীতাগড়ে একটি দুর্গ নির্মিত হয়। প্রাপ্ত সূত্র এবং তথ্য অনুযায়ী এই কালিন্দীরামই হলেন বর্তমানে ময়নাগড়ে বসবাসকারী বাহুবলীন্দ্র বংশের আদিপুরুষ।

এরপর প্রায় দেড়শো বছর এগিয়ে যায় রাজ্য-রাজ্যত্ব, বংশ পরম্পরায় গোবর্ধন সামন্ত বালিসীতাগড়ের অধিপতি হন। যাই হোক্, উৎকল সাম্রাজ্য তখন হরেক চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে আসছে। সিংহাসনে বসলেন হরিচন্দন। সাম্রাজ্যের স্বরূপ উদঘাটনে তিনি সমস্ত রাজন্যবর্গের থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিতে উদগ্রীব হলেন। বশ্যতা স্বীকার করতে সম্মত হলেন না গোবর্ধন। বন্দী অবস্থায় তাকে আনা হলো কারাগারে। গোবর্ধনের দেবোপম কান্তি, সঙ্গীতপ্রতিভা, মল্লযুদ্ধ — দেখে মুগ্ধ হলেন রাজা। উৎকল সাম্রাজ্যের খারাপ সময়ে এমন রণনিপুণ এবং রাজকীয় মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপন করতে পিছপা হলেন না উৎকল-নৃপতি৷ সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হলো তাঁকে, সঙ্গে সিংহাসন, রাজচ্ছত্র, চামর, বাণ, ডঙ্কা, যজ্ঞোপবীতাদি রাজচিহ্ন দেওয়া হলো। তাঁকে দেওয়া হলো উপাধি – একটা নয়, তিনটে — ‘রাজা’, ‘আনন্দ’ এবং ‘বাহুবলীন্দ্র’…. যে পদবী এখনও রাজপরিবারের সদস্যরা বহন করেন, এর অর্থ হলো ইন্দ্রের ন্যায় বাহুবলশালী। মূল শাসনকেন্দ্র হিসেবে সিলমোহর পেলো ময়নাগড়।

IMG20191116154812-01
বর্তমান “বাহুবলীন্দ্র” রা

বেয়াড়া জলদস্যু শ্রীধর হুইকে ময়না থেকে উৎখাত করেন তিনি, ফিরে এসেই। তখন তিনি ঐ গড় নতুন করে পরিখাবেষ্টিত করে দুর্ভেদ্য গড়ে পরিণত করতে আগ্রহী হন। দুটি পরিখা (কালিদহ ও মাকড়দহ) দিয়ে ঘেরা ছিলো তার গড়। প্রথম পরিখার মধ্যে চারিদিকে বেশ উঁচু পার্বত্য গুলিবাঁশের ঝাড় (১৯৫৫ সালের পর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়) এমন ঘনভাবে পরস্পর সংলগ্ন ছিলো যে অস্ত্রধারী সৈন্য তো দূর কোনও যুদ্ধাস্ত্রও প্রবেশ করতে পারতো না। প্রচুর অর্থব্যয়ে রাজা গোবর্ধন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন, যা ছিলো নিখুঁত এবং রন্ধ্রবিহীন, গড় সংস্কারেই তার পরিচয় মেলে। বৃটিশ কালেকটর এইচ.ভি.বেইলির বর্ণনায় সেদিক ফুটে উঠেছে।

IMG20191116154640-01
তাল সারি
IMG20191116154833-01
সেকালের পরিখা আজও অক্ষত

এই হলো যোগসূত্র… এরপর কালের নিয়মে তৃতীয় আর একটি পরিখা আজ বিলীন৷ বালিসীতাগড় এর দুর্গ ধুলায় মিশে গিয়েছে। বাহুবলীন্দ্র সাম্রাজ্যে বংশপরম্পরায় এসেছেন – পরমানন্দ, মাধবানন্দ, গোকুলানন্দ, কৃপানন্দ, জগদানন্দ, ব্রজানন্দ, আনন্দনন্দ, রাধাশ্যামানন্দ। আগ্রার মুঘল দরবারে এক সময় উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিলো পরমানন্দের — উড়িষ্যার রাজপ্রতিনিধি হিসেবে। মুর্শিদাবাদের নবাবী হুকুমতেও জগদানন্দ ছিলেন সমাদৃত। স্বাধীন ময়নাগড় বৃটিশ পর্বে কেবল পরবশ হয়েই রয়ে গিয়েছিল। মারাঠাদের আক্রমণও ভেদ করতে পারেনি প্রতিরক্ষার চাবি, তাও অষ্টাদশ শতকে।

এবার আসি কি আছে এই ময়নাগড়ে….

ময়নাদুর্গের চৌহদ্দির মধ্যে রয়েছে বৈষ্ণব – শৈব – শাক্ত মন্দির যা যথাক্রমে শ্যামসুন্দর মন্দির, লোকেশ্বর শিব, মহাকালী রঙ্কিণীদেবী)। রয়েছেন ধর্মঠাকুর (যদিও দেখা হয়নি), মোহান্ত নয়নানন্দ দেবগোস্বামী সমাধিমন্দির, তিন শতাব্দী প্রাচীন সূফীপীর দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা), যা নৌকা থেকে দেখেই শান্ত থাকতে হলো, যদিও সেখানে যাওয়ার জন্য ছোটো ডিঙা রয়েছে। সত্যিই AN ISLAND WITH AN ISLAND এই ময়নাগড় পঞ্চদেবতার গড়ও বটে, যেখানে বৈষ্ণব -শৈব-শাক্ত-ধর্ম-পীর সকলেই আছেন।

IMG20191116164531-01
ময়নাগড় – সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র
IMG20191116160759-01
রাজবাড়ির অংশবিশেষ

সেই মধ্যযুগ থেকেই এখানে গড়ে উঠেছিলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থান। আজও সেই ঐতিহ্য সমানে চলে আসছে। একসময় প্রচলিত ছিলো ধর্ম ঠাকুরের নিত্য পূজা, জগন্নাথ- বলরাম- সুভদ্রা রথযাত্রা, বড় হোলির সান্ধ্যমেলা এবং মহেশ্বরের বৈশাখী গাজন। অবশ্য সেসব আজ স্মৃতিকথা মাত্র। গড়সাফাৎ গ্রামের চতুষ্পার্শ্বে ছিল পরিকল্পিত পরিখা, প্রতিরক্ষার তৃতীয় ধাপ হিসেবে গণ্য হতো। তা আজ অবলুপ্ত। তবে কার্তিকী পূর্ণিমায় বর্ণাঢ্য নৌ-রাসযাত্রার দৃষ্টান্ত আজ বিরল। রাসমেলা পেরিয়ে কালিদহে নৌযাত্রা করে দুর্গে গিয়ে খানিক ঘোরাঘুরির সুযোগ এই রাসমেলাকে এক দারুণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সারা বছর এই ময়নাগড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, শুধুমাত্র এই রাসমেলার কয়েকদিনই। সূর্যাস্তের সময় কালিদহ যে কি রূপ নেয়, তা হয়তো না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। লাউসেন এক কিংবদন্তি, বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুরে পশ্চিম আকাশে কোনো এক অমাবস্যার রাতে সূর্যোদয় ঘটান বলে জনশ্রুতি আছে। যাই হোক্, সে ময়নাগড়ও আজ নেই আর, হতশ্রী, তার গরিমা আর নেই,তবুও তার কাঠামো আজও অটুট। এতো বছর পরেও সেখানে রাজবংশীয়রা রয়েছেন, এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কিচ্ছুটি হয়নি। ভাবতে অবাকই লাগে… তবে পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নালোকে বা সৌদামিনীর ক্ষণিক উপস্থিতিতে কেমন অপরূপ রূপ ধারন করে এই কালিদহ তার বেশ উপভোগ্য – এটুকু দেখার ইচ্ছে রইলো….

IMG20191116163003-01
কালিদহ তখন ডুবুডুবু সূর্যের আভা গায়ে মাখে
IMG20191116163306-01
সূর্যাাস্ত পানে একলা নাও
IMG20191116163858-01
নৈসর্গিক

লোকেশ্বর শিব মন্দির

কালিদহের তীরে রয়েছে লোকেশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বেশ গভীরে শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিলো। বর্গী হামলা থেকে রক্ষা পেতে যে সুড়ঙ্গ পথ নদীতীর অবধি বিস্তৃত ছিলো, তা বেশ ভালো রকম সক্রিয় থাকায় শিবকুন্ডটি বন্যায় অতিরিক্ত জলে ডুবে যায়। মন্দিরটির নির্মাণকাল আধুনিক যুগ হলেও, টেরাকোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়৷ বিষয়বস্তু গুলিও বেশ সময়সাময়িক – অশ্বারোহী, কৃষ্ণের রথ ইত্যাদি। তবে সবথেকে আকর্ষণীয় এবং একই সাথে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া মন্দিরটি চালে একটি নারীমূর্তি। যদিও এখন এমন রঙ করা হয়েছে যে বুঝতে বেশ অসুবিধা হয় যে আদৌ টেরাকোটা আছে কি না। এই শিব মন্দিরেই এখন পূজিত হন রঙ্কিণী দেবী — যা কালীমূর্ত্তির বৌদ্ধ সংস্করণ বলা ভালো। লাউসেনের অস্তিত্বের পরিচায়ক যা….।

IMG20191116155451-01
লোকেশ্বর শিব মন্দির : সামনে থেকে
IMG20191116160104-01
লোকেশ্বর মন্দির : পেছনের দিক
IMG20191116162501-01
রঙ্কিণী কালি মূর্ত্তি
IMG20191116162414-01
টেরাকোটার নিদর্শন : রথ
IMG20191116162406-01
অশ্বারোহী : লোকেশ্বর শিব মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা
IMG20191116162323-02
শায়িত নারী

Statue Of Dignity

লোকেশ্বর শিব মন্দিরের সামনে একটু দূরত্বে রয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ, রাজা জগনানন্দের সম্মানার্থে – Statue of Dignity, ২০১৪ সালে নির্মিত৷ রাজার শেষদশায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ময়নাগড় আক্রমণ করলে জগনানন্দ আত্মসমর্পণ করেননি,গড়ের ভেতরে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকেন। হেস্টিংস অনেক হম্বিতম্বি করলেও ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মীরকাশিমের মধ্যে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী জমিদারী অক্ষুন্নই থেকে গেলো।

IMG20191116155351-01
Statue of Dignity

শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির

কালিদহের তীরে অবস্থিত আর একটি মন্দির — শ্যামসুন্দরজীউর ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দির, দেউল রীতির। এই শ্যামসুন্দরজীউ হলেন বাহুবলীন্দ্র পরিবারের কুলদেবতা। প্রতিষ্ঠা লিপি নেই, খুঁজেও পেলাম না। শুধু সংস্কারের কতগুলি তথ্য মিললো। শ্যামসুন্দর মন্দিরের দেওয়ালে নৃত্যরত গৌর-নিতাই এর মূর্তি পাওয়া গেলো। সেখানে একজন বুকস্টল নিয়ে বসে ছিলেন, একটা বই নিলাম।

IMG20191116161423-01
কুলদেবতার অধিষ্ঠান
IMG20191116161841-01
গৌর – নিতাই
IMG20191116161923-01
সংলগ্ন ঘাটের পথ
IMG20191116162027-01
শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির : গোপাল থাকেন যেখানে 

লাউসেনের গড়

লাউসেন – লাউসেন করছি এতোবার। লাউসেনের নির্মিত গড়ের প্রায় পুরোটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। যেটুকু আছে, যে কোনো সময় হয়তো ভেঙে পড়তে পারে। জঙ্গলাকীর্ণ ঐ ভগ্ন গড়ে এখন বটগাছের বাস৷ স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে কিছু সাপখোপ হয়তো আছে, এখন শীতঘুমে গিয়েছে বলে মুখোমুখি হতে হয়নি। ভেতরে ঢুকে দেখলাম কিছু বিকৃতমস্তিষ্কের লোকজন এসে দেওয়ালে নিজেদের নামগুলি খোদাই করে গিয়েছে। একটা সিঁড়ি আছে, ভাঙা। দেখলাম, কয়েকজন কিশোর বয়সী ছেলে সেটা দিয়ে ওপরে উঠে মজা করছে, আমার একটু ইচ্ছে হলেও, সঙ্গীরা পেছন টানলো। অগত্যা, শুধু ফটো তুলে ক্ষান্ত থাকতে হলো।

IMG20191116160629-01
জঙ্গলাকীর্ণ
IMG20191116160601-01
আড্ডা, এটিই লাউসেনের গড়
IMG20191116160645-01
না থাকার মতোই
IMG20191116160832-01
মাথাহীন রাজবাড়ি

সম্প্রীতির ময়নাগড়ে…

দ্বিতীয় পরিখার পর গড়ের অন্তর্ভুক্ত যে ভূখণ্ডটি ছিলো সেখানে বর্তমানে রবিবারের বাজার (ময়নার প্রাচীনতম)। এই বাজারেই বসে রাসের মেলা এই ভূখণ্ড ময়নাগড়ের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ দূর করে দেয় এখানে অবস্থিত তোরণটি, যেটি খুব ভিড়েও রাসমেলার মধ্যে সঠিক দিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অতীতে পাঠান,শেখ ও খাঁনদের আনা হয়েছিলো গড় রক্ষার কাজে। গড়সাফাতের প্রাচীন হক্কানি মসজিদটি রাজার অর্থানুকূল্যে নির্মিত। বস্তুত ময়নাগড়ের এক প্রান্তে কালিদহের অপর পাশে রয়েছে সূফীপীরে দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা) । সুতরাং, এই গড়সাফাৎ যে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির সাক্ষর বহন করে চলেছে, তার বাংলা-আরবী শব্দসমন্বয় দেখেই অনুমেয়।

IMG20191116154531-01
সূফীপীরের দরগা, নৌকা থেকে 

আকর্ষণ…

একদা প্রচলিত বাহুবলীন্দ্রদের রথযাত্রা তমলুক মহকুমার মধ্যে প্রাচীনতম৷ ময়নাগড়ের শ্যামসুন্দরজীউর রাস উৎসব পঞ্জিকাতে লিপিবদ্ধ বাংলার অন্যতম একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হয়ে আসা প্রায় ৪৬০ বছরের পুরনো এই রাসমেলা পূর্বে একমাস ধরে হলেও, পরে ২২ দিন এবং বর্তমানে পক্ষকাল ধরে চলে। এই মেলার মুখ্য আকর্ষণ থালার মতো বাতাসা এবং ফুটবলের আকারে কদমা, যদিও এখন ছোট কদমার কদর বেশি, ঠিক যেন কদম ফুলটি।

সত্যজিৎ রায় – গয়নাবড়ি এবং ময়নাগড়

অনেকেই হয়তো জানেনই না সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্ববন্দিত পরিচালকের পা পড়েছিল এই ময়নাগড়ে। এখানকার বিখ্যাত গহনাবড়ি (উপহার স্বরূপ প্রাপ্ত) সত্যজিৎ রায় তার “আগন্তুক” সিনেমার একটি দৃশ্যে ব্যবহার করেন। তারও বহু বছর পূর্বে “অশনি সংকেত” সিনেমার শ্যুটিং এর অভিপ্রায়ে রিক্সা করে এসেছিলেন ময়নাগড়, পরিখাবেষ্টিত গড় ঘুরে দেখেনও, কিন্তু পুরো ইউনিট নিয়ে যাওয়ার সাহস পাননি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গার অসুবিধার জন্য। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ হয়তো পথের পাঁচালীর বোড়াল গ্রামের মতো ময়নাগড়ও বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকতো। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা চিঠি থেকেও বাহুবলীন্দ্র পরিবারের তৈরী গহনাবড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রণবেশ সেন এর কথায় — দুটি জিনিস খুব দুঃখের, এক দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন এবং এতো সুন্দর গহনার মতো বড়ি ভেঙে খাওয়া। তাঁর উদ্যোগে এই বাড়ির গয়নাবড়ি পুরো প্রস্তুতির দৃশ্য কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রে সম্প্রচার করা হয়।

গয়নাবড়ি @ আগন্তুক
আগন্তুক সিনেমার একটি দৃশ্যে : আহারের এতো বাহার

কালিদহ পার হয়ে…

যাই হোক্, আমাদের ভাগ্যটা ভালো ছিলো। আমরা এক শনিবারে তিনটের দিকে রবিবারের বাজারে বসা ঐ রাসমেলাতে পৌঁছে তড়িঘড়ি নৌযাত্রায় চলে যায়, লাউসেনের স্মৃতিবিজড়িত ময়নাগড় ঘুরে যখন ফেরৎ আসি তখন দেখি প্রায় দু’শো লোক নৌরাসযাত্রা উপভোগ করতে উৎসাহে অপেক্ষারত। কালিদহের জলে গোধূলির আকাশ প্রতিফলিত হওয়ার পূর্বেই আমরা সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্রের মেলা থেকে খানিক কদমা কিনে,ব্যাগস্থ করে ফিরে আসি…..!

IMG20191116165353-01
কদমা
IMG_20191119_183434
পুরো মানচিত্র রইলো, যাতে আগ্রহী যারা, তারা কেউ ছেড়ে না আসে (‘কিল্লা ময়নাচৌরা’ থেকে সংগৃহীত), আমরা ঘুরতে পারিনি 

তথ্যসূত্র :
কিল্লা ময়নাচৌরা – ডঃ কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

© শুভঙ্কর দত্ত || November 19, 2019

ঘুরে এলাম কুড়ুমবেড়া-মোগলমারি-শরশঙ্কা…

বহুদিনের ইচ্ছে কুড়ুমবেড়া যাবো…
সেই কবে ফেসবুকে জনৈক ভবঘুরের পোস্ট দেখেছিলাম৷। সেই কত্ত দিনের প্ল্যান একটা। আগে দু’বার ব্যর্থ হয়েছে। তার মধ্যে একবার বুলবুল এর জন্য। শেষমেশ যাওয়া হলো…. তাও কুড়ুমবেড়া শুধু নয়, সাথে মোগলমারি বৌদ্ধবিহার হয়ে শরশঙ্কা দীঘি — এক্কেবারে কম্বো প্যাকেজ যাকে বলে….! সৌমেন তো থাকই, এবার সুুুুুরজিৎও সামিল হলো….!

কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু…

 

IMG20191113105514-01
বহিরাবরণ

এবার কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু করা যাক্…! বেলদা থেকে কেশিয়াড়ী যাওয়ার বাসে করে ১০ কিমিরও কম দূরত্বে কুকাই, সেখান থেকে সদ্য বাঁধানো পথে টোটোই করে গগণেশ্বর গ্রাম…..! বটতলায় এসে থামলো… একদিকে বিস্তীর্ণ পুকুর আর তারই উল্টো দিকে ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলা প্রায় সাতশো বছরের পুরনো এই দুর্গ।ইংরেজরা জেলার গেজেটিয়ার রচনার সময়ও এটিকে দুর্গ বলেই উল্লেখ করেছে।

IMG20191113110357-02
করমবেরা….
IMG_20191114_123357-01
গুগল ম্যাপে স্যাটেলাইট ভার্সান কি? কারুকাজ বটে…

নামের বিভিন্নতায় ‘র’ আর ‘ড়’ এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিলো। ও বাবা, ভেতরো ঢুকে দেখি লেখা আছে আর একরকম- ‘করমবেড়া’!
যাই হোক্, নাম যাই হোক্, এবার একটু ইতিহাস কি বলছে, সেখানে তাকানো যাক্! আর এক গোলমাল! ইতিহাস এমনিতেই বিতর্কিত এবং এই জায়গাটির ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি “নানা মুণির নানা মত” একদম সাড়ম্বরে প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও সেদিকে যাচ্ছি না।

 

একটু ইতিহাস…

১৪৩৮ থেকে ১৪৭০ সালের মধ্যে ওড়িশার রাজা কপিলেন্দ্রদেবের আমলে নির্মিত হয় এই দুর্গ। গজপতি বংশের রাজা কপিলেন্দ্রদেবের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল বর্তমান হুগলি জেলার দক্ষিণ অংশ মান্দারণ থেকে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ পর্যন্ত। অবশ্য মান্দারণ আমার বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই। বারবার গেলেও এটা একদমই অজানা ছিলো। ঝামা বা ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে আদতে একটি শিবমন্দিরই তৈরি হয়েছিল এখানে।

IMG20191113111227-01
প্যানোরমা তে কুড়ুমবেড়া
IMG20191113114133-01
শৈলী…মাকড়া পাথর

প্রথমে আফগান সুলতানরা (পড়ুন দাউদ খাঁ) দখল করেন এ দুর্গ। অতঃপর ঔরঙ্গজেবের আমলে আফগানরা পরাজিত হলে মোগল সম্রাটের হাতে আসে সে দুর্গ। বাংলা এবং উড়িষ্যার বহু মন্দির মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর ফরমান আসে, বাদ যায়নি এই দুর্গের ভেতরকার মন্দিরটিও, একেবারে দুর্গের ভেতরের মাঝে জলাধারের মতো যে ভাঙা অংশটি রয়েছে (যাকে যজ্ঞবেদীও বলা হচ্ছে), দেখলে বোঝা যায়, সেটি কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যদিও ভিন্নমত। তবে তিন গম্বুজের ঐ স্থাপত্যখানি যে মসজিদ সেটাও আন্দাজ করা খানিক সহজই।

IMG20191113111337-01
দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ
IMG20191113115750-02
কিছু নবীন…

তাহের খানের অধীনে সেনাদের আশ্রয় শিবির হয়ে ওঠে কুড়ুমবেড়া। সেই থেকে মন্দির বদলে যায় দুর্গে। ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা যোগেশচন্দ্র বসু লিখেছেন, “…মন্দির গাত্রে উড়িয়া ভাষায় লিখিত যে প্রস্তর ফলকখানি আছে, তাহার প্রায় সকল অক্ষরই ক্ষয় হইয়া গিয়াছে, কেবল দু’একটি স্থান অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট আছে, উহা হইতে ‘বুধবার’ ও ‘মহাদেবঙ্কর মন্দির’ এই দুইটি কথা মাত্র পাওয়া যায়।” (বই খানি আমি পড়িনি যদিও)।

IMG20191113105731-01
প্রাচীন…

পরে এই দুর্গে মারাঠারাও ঘাঁটি তৈরি করেছিল বলে মনে করা হয়। বেশ কয়েকজন গবেষক সে কথা জানিয়েছেনও। লিখেছেন। তবে এটিকে ঠিক দুর্গ বলা যায় কি? কোনো অস্ত্র ভাণ্ডার নেই, লুকিয়ে থাকার গোপন কুঠুরি নেই, বিপদ-আপদে-আক্রমণে হুট করে পলায়ন করার জন্য বাইরে বেরোনোর রাস্তা কোথায়? সবথেকে বড়ো কথা ওয়াচটাওয়ার নেই। বরং এটি একটি উৎকল স্থাপত্যেরই নির্দেশক, মানে এর গঠন শৈলী। যারা বহু বার পুরী গিয়ে তা করায়ত্ত করতে পারেননি, তাদের প্রতি সমবেদনা।
মাকড়া পাথরে তৈরী অপূর্ব এই সৌধের প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকে রয়েছে তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদ। একদা জেলা গেজেটিয়ারে লেখা হয়েছিল, সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জনৈক মহম্মদ তাহির এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯৯০ সালে কুড়ুমবেড়া অধিগ্রহণ করেছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া।

IMG20191113114533-01
পরিখা থেকে….
IMG20191113111702-01
তিন গম্বুজের মসজিদ
IMG20191113114707-01
মধ্যমণি বিলীন…মসজিদই তাই কেন্দ্র
IMG20191113120751
কারসাজি… ট্রিপল ক্যামেরা 😂

তবে দেখে ভালো লাগলো যে রক্ষণাবেক্ষণ হয়, রেলিং দিয়ে দুর্গ মধ্যস্থ এলাকাগুলিতে এখন বোধহয় আর ঢোকা যায় না। শোভাবর্ধক গাছ লাগানো আছে, রলিং ঘেঁষে। একজন লোককেও দেখলাম, জল দিতে।

দুর্গটির ভেতর এবং বাহির — দারুণ লেগেছে। প্রাকৃতিক বড্ড বেশিই। পরিধি বরাবর হাঁটতে থাকলে মাঝে মাঝে পা হড়কে যায়, শ্যাওলার দল জমি অধিগ্রহণ করেছে যে। পুরো দুর্গটা চক্কর দিতে বেশ সময়ও লাগে….বেশ ঠাণ্ডাও অনুভূত হয়, শ্যুটিং স্পট হিসেবে মন্দ নয়। ভাবতেই অবকা লাগে পুরোটা পাথর কেটে বানানো… অথচ এখনও অটুট,যদিও কিছু পিলার নতুন করে বানানো। যে কোনো একটা কর্ণারে গিয়ে ক্যামেরা তাক করলেই একটা একটা করে লকস্ক্রিন করার ফটো বেরিয়ে আসবে….! সঙ্গে থাকলো – রবিকিরণ, প্রায় সব সময়ই দারুণ দারুণ সব ফ্রেম উপহার দিয়ে দিলো সে।

 

IMG20191113113449-01
সাতরঙা ফ্রেম…
IMG20191113120139-01
প্রাকৃতিক ভাজক…

বাইরে থেকে বহু চেষ্টা করেও… ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, পুকুরপাড় সবকিছুর ইস্তেমাল করেও পুরোটা এলো না। বটগাছের ঝুরির ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে দুর্গ, — তার ভেতর আর বাহির যেন একে অন্যের পরিপূরক৷

IMG20191113122251-01
মৎস্য সন্ধানে… সামনের পুষ্করিণীতে
IMG20191113113004_01-01
প্রতিভাত রবি

—————————————————————-

এবারে মোগলমারি…

IMG20191113144743
কদম কদম বড়ায়ে যা..

বেলদায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে চলে এলাম মনোহরপুর। গুগল ম্যাপে ভুলভাল এবং একাধিক অবস্থানের কারণে প্রথমে হেঁটে বিপথগামী হচ্ছিলাম, সহায় হলেন একজন বৌদিস্থানীয় ভদ্রমহিলা। পরে বুঝলাম একটা পথ নির্দেশক বোর্ডকে আমরা অবহেলা করেছি৷ ব্যাক গিয়ার মেরে হেঁটে প্রায় হাফ কিমি যেতেই গ্রাম্য রাস্তার একপাশে পড়লো – মোগলমারির বৌদ্ধবিহার। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সুন্দর নয়, অর্থ সাহায্যের অভাবে অবহেলিত এবং সুসজ্জিত নয় বটে, তবে তার ইতিহাস রীতিমতো গাম্ভীর্য বহন করে। প্রায় ১৫০০ বছরের ইতিহাস এই মোগলমারি৷ ওখানের এক বিবরণ বোর্ডে দেখলাম লেখা আছে এটি গুপ্তোত্তর যুগের একটি স্থাপত্য!

IMG20191113135851-01
মোগলমারি বৌদ্ধবিহারের প্রবেশপথ
IMG20191113140359-01
খননস্থল

‘মোগলাই’ খেতে গিয়ে প্রথমবার যেমন মনে হয়েছিল বেশ একটা ঐতিহাসিক ফাস্ট ফুড খাচ্ছি, সেরকম ‘মোগলমারি’র নামকরণের কারণ খুঁজতেই অবধারিতভাবেই চলে এলো — মোগলাই থুড়ি মোগল…মুঘল।
কেউ বলেন মুঘল-পাঠান যুদ্ধে অনেক মুঘল সৈন্য মারা গিয়েছিল বলে জায়গাটির নাম মোগলমারি। কেউ বলেন মুঘলরা এই পথ (‘মাড়’ অর্থ পথ) মাড়িয়ে গিয়েছিল; তাই অমন নাম। পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত সুবর্ণরেখা…সে বিহার নেই, নেই সুবর্ণরেখাও, মন খারাপ করেই সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, প্রায় দু-তিনি কিমি দূরে…..
সামন্তরাজা বিক্রমকেশরীর রাজধানী ছিল এ অঞ্চল। কন্যা সখীসেনার পড়াশোনার জন্য জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছিল।

IMG20191113142914-01
মিউজিয়াম @ মোগলমারি
IMG20191113142759
অবহেলিত মিউজিয়াম

চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বিবরণীতেও এই বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ রয়েছে।
২০০৩-০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষক ডঃ অশোক দত্তের তত্ত্বাবধানে খননকার্য প্রথম শুরু হয়, যদিও তার আগে ময়ূরভঞ্জ (অধুনা ওড়িশা) এর আর্কিওলজিকাল সার্ভেতে এর কথা উল্লেখ আছে, হয়তো সেটিই সূত্র হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে অদূরে যেই কুড়ুমবেড়ার গল্প এতক্ষণ করলাম, সেখানে আফগান সুলতান দখল নেওয়ার সময় এই মোগলমারির সেনা ছাউনি থেকেই ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি তাকে আক্রমণ করেন, পরে ঔরঙ্গজেবের মুদ্রার হদিশ মেলে এখানে।
পশ্চিমবঙ্গে আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারগুলির মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়। খননে পাওয়া গেছে প্রায় ৫২ ধরণের নকশাযুক্ত ইঁট, রাজা সমাচার দেবের মিশ্রধাতুর মুদ্রা, স্বর্ণ লকেট এবং মুকুট, বুদ্ধ-বোধিসত্ত্ব-বৌদ্ধ দেবদেবীর ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, স্টাকোর কারুকার্য মণ্ডিত নক্সাযুক্ত দেওয়ালঅলংকরণ ও ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র, প্রদীপ প্রভৃতি জিনিস। গুপ্ত পরবর্তী ব্রাহ্মি অক্ষর যুক্ত সীল ও সীলমোহরও আবিষ্কৃত হয়েছে এইখানে। বর্তমানে খননকার্য স্থগিত আছে, মিউজিয়ামের ওখানের একজন দাদা বললেন এখন আর খননের পারমিশন নেই।

IMG20191113142349
প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শনবাহী…
IMG20191113143056-01
মাটি খুঁড়ে পাওয়া স্টাকো মূর্তির কতিপয় এখনো বিরাজমান

বেশিরভাগই এখানে এখন আর নেই। কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে পাশে একটা ছোট্ট মিউজিয়াম আছে যাতে খননে প্রাপ্ত কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় তরুণ সংঘের উদ্যোগে সে মিউজিয়াম দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছেছি, তখন চাবি লাগানো দেখে ফোন করলাম, একজন খানিক পরে এসেই খুলে দিলেন। একটু একটু গল্প বললেন। মিউজিয়ামটির হাল ফেরাতে এবং সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার জন্যে ওনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁবু খাটানোর মতো একটা জায়গায় গিয়ে দেখলাম কতগুলো আরো মূর্তি৷ মিউজিয়ামের ভেতরে শুধুই খুচরো কতগুলো জিনিসপত্র আছে। বাকি সবই সরকারের অধীনে, কলকাতার জাদুঘরে।
খননকার্যে পাওয়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অবাক করে তথ্য হলো – এখানে একদিনে, একই স্থান থেকে একই সঙ্গে ৯৫ টি ব্রোঞ্জ মূর্তি উদ্ধার পৃথিবীর প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এক বিরলতম নজির। পণ্ডিতগণের মতানুসারে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতে অবস্থিত প্রাচীন এবং বৃহৎ বৌদ্ধ স্থাপত্যগুলির মধ্যে অন্যতম।

IMG20191113142107
এখন সবই যাদুঘরে
IMG20191113143437
পর্যটকদের সাত্ত্বনাদায়ক জায়গাটি

ভারতবর্ষের মাটিতেই পথচলা শুরু হয় হিন্দু – জৈন- বৌদ্ধ ধর্মের। কালক্রমে সব ধর্মের চড়াই-উতরাই হয়েছে। সেই ষষ্ঠ শতক থেকে বারংবার পুনর্নির্মাণের মধ্যে দিয়ে সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে এই মোগলমারি৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের অখ্যাত এক গ্রামের পথের পাশে….. ক’জনই বা আর বুঝবে এর গুরুত্ব? বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে!
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তাই দেখে আসা উচিৎ, এই জন্য যে আমাদের অবহলোর দরুণ কত জানা জিনিসও আমাদের কাছে অজানা হয়েই রয়ে যায়।

পথনির্দেশ – বেলদা থেকে দাঁতনগামী বাসে মনোহরপুর বা ট্রেনে খড়গপুর থেকে ট্রেনে করে নেকুড়সেনি থেকে অনতিদূরেই….

 

————————————————————-

অপরাহ্নের  শরশঙ্কা দীঘি….

IMG20191113160631-01
যে দিকে দুচোখ যায়..

মোগলমারি পর্ব চুকিয়ে বাসে উঠেছি, সরাইবাজার (দাঁতন) যাবো। সুরজিৎ এর বন্ধুর সাথে দেখা, সে জিগ্যেস করলো কোথায় যাবি?
উত্তরে শরশঙ্কা শুনে আশেপাশের বেশ কয়েকজন অবাক হলেন। সে হোক গে…

দাঁতন থেকে একটা ট্রেকারের মাথায় চেপে বসলাম। দুলতে দুলতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু নামবো কোথায়? শরশঙ্কা বলতে ট্রেকারের হেল্পারের পোস্টে থাকা লোকটি বললো – শরশঙ্কাতে ৪ টে স্টপেজ, কোথায় নামবে? বলে দিলাম যেখানে নামলে দীঘিতে সহজে যাওয়া যাবে। এসব বলতেই স্থানীয় এক ভাই সহায় হলেন, তিনিই বলে দিলেন লোকটিকে আমাদের আসলে কোথায় নামলে সুবিধে হবে। নেমে দীঘির পাড়ে গিয়ে দেখি কতগুলো বাঁদর সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে, উঁচু পাড়ে বসে। একটা জিনিস দেখে রীতিমতো অবাক লাগলো….দীঘিতে যাতে কচুরিপানারা ভিড় না জমায় তার জন্য দীঘির পাড়েই চারপাশে আলাদা আলাদা করে ছোটো ছোটো পুকুর কেটে তার মধ্যেই কচুরিপানাকে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। দীঘির এপার থেকে ওপার স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। যেদিক তাকায় শুধু জল আর জল…..ব্যাকগ্রাউণ্ড জুড়ে শুধু সাদা রং! চারদিকের পাড়ে গাছগাছালি….পাখিদের ডাক! কি অপূর্ব বাস্তুতন্ত্র সেখানে বিরাজ করে, বায়োলজির কেউ গেলে আরো ভালো প্রত্যক্ষ করতে পারতো। দীঘির চারদিকে পাড়ে পাড়ে বেশ কিছু মন্দির রয়েছে।

IMG20191113155355-02
একটু জিরো…..
IMG20191113160810-01
ছটা…
IMG20191113160821-01
দূরে দিগন্তে মন্দির….

ওই দীঘির দক্ষিণ পূর্ব কোনে রয়েছে পীর দেওয়ানগঞ্জের মাজার। পৌষ সংক্রান্তির দিন তাঁর কবরে মাটি দিতে আসেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। পৌষ সংক্রান্তির দিন মেলা বসে। সেখানে রয়েছে পান্ডব ঘাট।
মাজারের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য মন্দির।
জগন্নাথের মন্দির, জটেশ্বর শিব ,ঝিঙ্গেশ্বর শিব, রামেশ্বর শিব,কালী ও শীতলা মন্দির।
সে সব জায়গায় যাওয়া আর হলো না। অপরাহ্নের ডাকে ফিরে আসার ট্রেকার ধরার ছিলো যে….!

IMG20191113155822-01
বিলীয়মান সূর্যের আভা

লোকবিশ্বাস

মহাভারতের মূষল পর্বে শ্রীকৃষ্ণ বৃক্ষে আশ্রয় নেওয়াকালীন জরা ব্যাধের শরাঘাতে হাত থেকে পাঞ্চজন্য শঙ্খ ছিটকে পড়ে। তার আঘাতেই এই দীঘির সৃষ্টি বলে লোকবিশ্বাস।

পাণ্ডবরা বিরাটনগরে যাওয়ার পথে ক্লান্ত হয়ে এই দীঘির পাড়ে রাত্রিযাপন ও স্নান করেন। তারই অনুকল্পে দিঘির একটি ঘাটের নাম পাণ্ডব ঘাট। এই সেই পাণ্ডব ঘাট যেখানে মকর সংক্রান্তিতে স্নান করেন পুণ্যার্থীরা।

রাজ‍্যের বৃহত্তম দীঘি এই দীঘি নিয়ে বহুচর্চিত জনশ্রুতিটি হলো এটি নাকি রাজা শশাঙ্কের আমলে বানানো।
সর শব্দের সংস্কৃত ভাষায় ‘জল’।
রাজা শশাঙ্ক মাকে নিয়ে সম্ভবত জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছিলেন পুরীতে। যাচ্ছিলেন বা ফিরছিলেন ,ওই গ্রামে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে তাঁবু ফেলেন তাঁরা। গ্রামবাসীদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হন শশাঙ্কের মা। প্রশ্ন করেন ,এত ভালো জমি থাকা সত্ত্বেও এখানে ভালো ফসল হয়না কেন ? গ্রামবাসীরা বলেন জলের অভাব। জল নেই গ্রামে। শশাঙ্কের মা তখন বাংলার রাজাকে বলেন , এদের জন্য তুই কিছু করতে পারিস না ?
মায়ের কথায় শশাঙ্ক তখন তাঁর তুন থেকে সবচেয়ে বড় তির বের করেন। প্রতিজ্ঞা করেন,তির যত দূর যাবে , তত বড় করা হবে দীঘি। যা বানাতে সময় লেগেছিল তিন বছর।
শশাঙ্কের শর থেকে সৃষ্ট বলেই এরূপ নামকরণ। তবে কোনোটির তেমন ভিত্তি নেই। যদিও এই জনশ্রুতিগুলিই অপূর্ব সুন্দর এবং সুবিশাল এই দীঘিকে মহিমা দান করেছে!

IMG20191113155240-01
গাছের অলিগলি থেকে…

বেশ কিছুক্ষণ দীঘির পাড়ে বিশ্রাম নিয়ে, টাটকা অক্সিজেন নিয়ে উঠে এলাম, ফেরার জন্যে। সূর্যাস্তটা দেখতে পেলে ১৬ আনা পূর্ণ হতো। ভাবিইনি যে এটাও দেখা হবে, বারবার বাস-ট্রেকার এসব করেও, যতই গুগল ম্যাপ বলে চিৎকার করি না কেন, জীবন্ত জিপিএস খুব বেশি কাজে দেয়, এবারেও তার অন্যথা হয়নি।

IMG20191113161137-01
মন্দির….অন্যতম একটি

পথনির্দেশ – খড়গপুর থেকে ট্রেনে দাঁতন, সেখান থেকে হেঁটে উল্টো দিকে এলে ক্রসিং এর কাছেই ট্রেকার মিলবে অথবা সরাইবাজার গিয়েও ট্রেকার ধরা যায়! বাসেও আসা যায়। দাঁতনগামী বাস ধরে সরাইবাজার, বাকিটা আগের মতোই।

IMG20191113113742
তিনমূর্তি 😉

এখানেই সমাপ্ত….

IMG20191113121323-01
উৎসুক চোখে আমাদের টা টা করে @ কুড়ুমবেড়া

তথ্যসূত্র – গুগল, ফেসবুক এবং সংবাদপত্র.. এছাড়াও অনেকেই সাহায্য করেছে পথনির্দেশ দিয়ে সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে! তাছাড়া সুরজিৎ আর সৌমেন এর উপযুক্ত সঙ্গৎ ছাড়া বারবার বাস পাল্টে তিনটে বেশ দূরত্বে থাকা  জায়গা ঘোরা সম্ভব হতো না।

ও হ্যাঁ, সৌমেনের নব আবিষ্কৃত  অ্যাপটির কথা কি করে ভুলে যায়? সদস্য বেড়ে গেলে উত্তম সাহায্য করবে…! Trip Expense Manager 🤘👌

©  শুভঙ্কর দত্ত || November 14, 2019

 

ইতিহাসের সাক্ষী নাড়াজোল রাজবাড়িতে…

PANO_20190908_133810-01
অন্তরগড়ে…. সারিবদ্ধ

ইতিহাস সাবজেক্টটা মোটেও বিরক্তিকর নয়, বরং ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষক বোধ হয় কমই আছেন, অন্তত যারা পাতায় আবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস চাক্ষুষ করবার সুযোগ করে দেন। তারপর, ঘোরার সাথে না জানা হরেক কাহিনী! অবশ্য মজাটা অন্য জায়গায়, পরীক্ষা দিতে হবে না এসবের…. আগ্রহটা বাড়ে, এই আর কি!

এরকমই জাতীয় কংগ্রেস বা পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুপ্তস্থান নিয়ে আলোচনার সময় মেদিনীপুর এর বিশেষ উল্লেখ থাকলে তখনই ইতিহাস চেটেপুটে নিতাম৷ সে সময় চলে গিয়েছে। এখন ব্যস্ততার জীবন, তার মধ্যেই একদিন টুক্ করে বেরিয়ে যাওয়া….
এরকমই একদিন বেরিয়ে পড়লাম ইতিহাস-বিজড়িত নাড়াজোল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে…. মেদিনীপুর – কেশপুর হয়ে পৌঁছে গেলাম দাসপুর – ১ নং ব্লকের কিসমত নাড়াজোলে….

কিসমতই বটে! কেন কিসমত সে বিষয়ে পরে আসা যাক্….

—————————————————————–

১. নাড়াজোল – নাম কেন?

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ‘নাড়া’ অর্থে আমরা যাকে গ্রাম্য ভাষায় লাড়া বলি অর্থাৎ জমিতে ধান কেটে নেওয়ার পর ধান গাছের যে অংশ জমিতে অবশিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকে আর অসমীয় ভাষা ‘জোলা’ এর মানে জল….. নাড়া+জোলা থেকেই নাড়াজোল।

২. নাড়াজোলের প্রথম ঠাঁই

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীরজাফরকে গদিচ্যুত করে ইংরেজরা তার জামাই মিরকাশিমকে নবাব পদে বসান। বিনিময়ে মিরকাশিম ইংরেজদের উপহার দিলেন মেদিনীপুর, বর্ধমান, ও চট্টগ্রামের জমিদারি এবং এর সাথেই মেদিনীপুরের সঙ্গে নাড়াজোলের স্বাধীনসত্তার অবলুপ্তি ঘটে। পূর্বতন মেদিনীপুর জেলার ৫৪ টি পরগনার মধ্যে নাড়াজোল একটি উল্লেখযোগ্য পরগনা হিসেবে পরিচিত ছিল।

৩. ঘোষবাবুর স্বপ্ন বটে…

আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠার পেছনে জনশ্রুতি রয়েছে —  বর্ধমান নিবাসী উদয়নারায়ন শিকারের খোঁজে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং শিকার করতে করতে গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেন। সন্ধ্যালগ্নে তিনি প্রত্যক্ষ করেন এক অলৌকিক দৃশ্য, তিনি একটি স্থানে অসম্ভব রকমের আলোর আভাস প্রত্যক্ষ করেন। রাত্রে শয়নকালে উদয়নারায়ন দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান এবং সেই স্থান থেকেই দেবী জয়দুর্গার সোনার মূর্তি ও প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। সেই জয়দুর্গা আজও রাজবাড়িতে পূজিত হয়ে আসছেন। সেই ধনসম্পদ দিয়েই রাজা এই রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

IMG_20190908_133443
মূল ফটক
IMG_20190908_131002-01
রাজকীয় বাতায়ন
IMG_20190908_132919-01
বিপ্লবের সাক্ষী

৪. ‘ঘোষ’ থেকে ‘খান’, ভায়া ‘রায়’…

প্রতিষ্ঠাতা উদয়নারায়ণের এক উত্তরপুরুষ কার্ত্তিকরাম ঘোষের আমলে তৎকালীন বাংলার অধীশ্বর থেকে ‘রায়’ উপাধী পান। ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে বলবন্ত রায় তদানীন্তন বাংলার নাজিমের কাছ থেকে খান উপাধি লাভ করেন। সেই থেকে নাড়াজোলের জমিদাররা খান পদবি গ্রহণ করেন।

IMG_20190908_125605-02
শুধু আমিষের জন্য
IMG_20190908_131352
এখন স্কুল….রাজকীয় তাই না?

৫. মোহনলাল খান

এই রাজ পরিবারের স্থাপত্য কীর্তিগুলির প্রায় সবই মোহনলাল খানের আমলে স্থাপিত হয়। লংকার অনুকরণে গড় – লংকাগড় তৈরী করেন, প্রায় ষাড়ে ষাট বিঘা জমিতে পুকুর খনন করে তিনি একটি গৃহ নির্মাণ করেন যা বর্তমানে ‘জলহরি’ নামে খ্যাত। যেটা করতে নাকি সেই সময় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিলো।

IMG_20190908_143011
মধ্যমণি

 

IMG_20190908_143354-01
জলহরি

শুধু তাই নয়, মোহনলাল খান রাজবাড়ির ভেতরের গড়ে একটি দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অযোধ্য থেকে পাথর এবং দেবমূর্তি এনে তিনি নাটমন্দির টি স্থাপন করেন। কথিত আছে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একবার ছোটো রবিকে নিয়ে নাড়াজোল আসেন এবং বেলজিয়াম কাঁচ সমৃদ্ধ এই নাটমন্দির তাকে এতোটাই প্রভাবিত করে যে তিনি এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তিনিকেতনে ছাতিমতলার সাধনামঞ্চ তৈরী করেন।

IMG_20190908_133616
রাজকীয় নাটমন্দির
IMG_20190908_133547
প্রবেশদ্বার

৬. উত্তারাধিকার প্রাপ্তি?

মোহনলাল খানের মৃত্যুর পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে নাড়াজোল রাজপরিবারের উত্তারাধিকার প্রাপ্তি অন্তর্কলহের শুরু হয় যা তখনকার দিনে প্রতিটি রাজবংশেই কমবেশি চালু ছিলো। এরপর মনেন্দ্রলাল খান অধিপতি হওয়ার মধ্যে দিয়ে সে সবের ইতি ঘটে। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারত সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি উৎসব উপলক্ষে ইংরেজ সরকার মহেন্দ্রলাল খানকে ‘রাজা’ উপাধি প্রদান করেন। সেই থেকেই….. নামের আগে রাজা আর পরে খান…

৭. স্বদেশী আন্দোলন এবং নরেন্দ্রলাল খান

এরপর নরেন্দ্রলাল খান রাজা হন এবং তিনি মূলত জনকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের তার নাম স্বণাক্ষরে লেখা থাকবে, তার যোগদানের সাথে সাথেই নাড়াজোল রাজবাড়ির পরিচিতি আরো বাড়তে থাকে। নরেন্দ্রলাল খানের সহযোগিতায় এই রাজবাড়িতেই গুপ্ত সমিতির বৈঠক চলতো। হেমচন্দ্র কানুনগো, অরবিন্দ ঘোষ এর মতো বিপ্লবীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তখন মেদিনীপুর কেন্দ্রিক যে স্বদেশী আন্দোলনটা চলতো তার প্রায় পুরোটাই রাজাদের অর্থানুকূল্যে হতো এবং নরেন্দ্রলাল খান সেই দিক থেকে প্রচুর অর্থই ব্যয় করেন।  নরেন্দ্রলালের প্রতি ইংরেজ সরকারের দৃষ্টি সজাগ ছিল। ১৯০৮ সালের ২৮ শে আগস্ট নরেন্দ্রলালের গোপ প্রাসাদে পুলিশ তল্লাশি চালায় এবং মেদিনীপুর বোমা মামলায় নরেন্দ্রলালকে গ্রেপ্তার করে কনডেমড সেলে রাখা হয়। কিন্তু উপযুক্ত প্রমানের অভাবে নরেন্দ্রলালকে মুক্তি দিতে হয়। নরেন্দ্রলাল খান পরলোকগমন করেন ১৯২১ সালে।

IMG_20190908_131910
গোপন ডেরায়….

৮. দেবেন্দ্রলাল খান…

দেবেন্দ্রলাল খান তার পিতার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এবং পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচনে সরাসরি নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯৩০ সালে ২৬ শে জানুয়ারি তিনি নাড়াজোল রাজবাড়িতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, সেই শুরু হয়, তারপর ১৯৪০ পর্যন্ত সারা মেদিনীপুর জুড়ে তিনি বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়ে গুপ্ত সমিতির সদস্যদের জাগ্রত করেন। এরই ফলস্বরূপ মেদিনীপুরের তিন কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করা হয়, তার মধ্যে বার্জ এর নাম সর্বজনবিদিত৷ ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভপতি হওয়ার পর নেতাজী মেদিনীপুরে আসেন, এবং দেবেন্দ্রলাল খান কে নিয়ে তিনি যে তিনটি সভা করেন তার মধ্যে নাড়াজোল রাজবাড়িতর সভাটি মেদিনীপুরের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ক্ষুদিরাম বসুর বাবা এই রাজবাড়ির তহশিলদার ছিলেন এবং সেই সূত্রে শৈশব থেকেই তার এই রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এইখানে বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা ছিলো, ছিলো বোমা তৈরীর কক্ষ, অস্ত্র রাখার গোপন জায়গা,,শুধু তাই নয়, বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যার প্রধান ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো৷ এছাড়াও বারীণ ঘোষ, উল্লাসকর দত্তের মতো বিপ্লবীদের সব ষড়যন্ত্রের সভা এখানেই সংগঠিত হত।

IMG_20190908_133509
কাছারির মাঠ – নেতাজীর সভাস্থল
IMG_20190908_133500
দুর্গাদালান-শিব মন্দির
IMG_20190908_124503~2
নেতাজী – এখনও অতন্দ্র প্রহরী

৯. গান্ধীজী এবং অন্যান্যরা….

গান্ধীজী এই রাজবাড়িতেই ‘অস্পৃশ্যতা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ১৯২৫ এর দিকে। 

কাজী নজরুল ইসলাম এর পদধূলি পড়েছিল এই রাজবাড়িতে। মোতিলাল নেহেরু থেকে জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইড়ু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পদার্পণে নাড়াজোল পবিত্রভূমিতে পরিণত হয়েছিলো, সে কথা বলাইবাহুল্য।

১০. রানি অঞ্জলি খান….

স্বাধীন ভারতবর্ষের পাঁচ বার বিধায়ক হওয়া রাজপরিবারের সদস্য রানি অঞ্জলি খান নারী শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হন। মেদিনীপুরের গোপ রাজবাড়ি এবং নাড়াজোলের রাজবাড়ি তিনি প্রদান করেন, যা বর্তমানে যথাক্রমে গোপ কলেজ (মহিলা) এবং নাড়াজোল রাজবাড়ি নামে পরিচিত।

IMG_20190908_130546
পূর্বতন নাড়াজোল রাজ কলেজ

 

**************************************

 এরপর থেকেই রাজবাড়ির সাথে সাথে রাজপরিবারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে… ২০০৮ সালে পঃবঃ সরকার হেরিটেজ তকমা দিলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এখন কাজ চলছে যদিও…. এই বছর নেতাজীর জন্মজয়ন্তীর দিনে হাওয়া মহলের সামনেই নেতাজীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে নাড়াজোল গ্রামবাসী এবং প্রশাসনের সহযোগিতায়…! 

এবার নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে কেন কিসমত। যে রাজ বাড়ির দেওয়ালে স্বাধীনতা আন্দোলনের বাঘা বাঘা সব মানুষের নিঃশ্বাস পড়েছে, সেই রাজবাড়ির কিসমত আলাদাই!
ঘোরার জায়গা বলতে রাস্তা দিয়ে ঢুকেই শিব মন্দির, উল্টোদিকে রাসমঞ্চ। তারপর একটু গেলেই পেল্লায় হাওয়া মহল বা নাচ মহল, রাজবাড়ির অন্দরে আমিষ খাওয়া বারণ, তাই এই মহল বানানো, বহুদূর থেকে আসা নর্তকীদের নিয়ে মদ-মাংস সহযোগে ফূর্তিতে মেতে উঠতেন রাজা এবং তার তাঁবেদাররা। এর পেছনেই বাগান আর পবিত্র পুকুরটি কিন্তু সবই এখন সংরক্ষণের অভাব।

IMG_20190908_125818-01
হাওয়া মহলে যেতে হলে…
IMG_20190908_123143
জিরচ্ছে….
IMG_20190908_122234
প্রবীনের কাঁধে নবীন ছোঁয়া
IMG_20190908_124405
হাওয়া মহল
IMG_20190908_124101~2
ফাঁক ফোঁকর..

রাস্তার উল্টোদিকে নাড়াজোল রাজবাড়ি, যেখানে আগে নাড়াজোল রাজ কলেজের ক্লাস চলতো নিয়মিত। কলেজের গেট দিয়ে ঢুকেই যেটা প্রথমে দেখা যায়, সেটা নহবতখানা, এখান থেকেই দিনে তিনবার নহবতের সুর ভেসে যেত রাজবাড়ির অন্দরমহলে সহ গোটা নাড়াজোলের আকাশে বাতাসে। এরপর শিব মন্দির, কাছারি, ভগ্নপ্রায় দুর্গাদালান, সরস্বতী দালান, নবরত্ন মন্দির যেখানে এখন জয়দূর্গা পূজিত হন। পরিয়ে গেলেই আসল রাজবাড়ি। যার অন্দরমহলে ঢুকলেই একটা আলাদা গন্ধ অনুভূত হতে বাধ্য। এই রাজবাড়িতেই আগে কলেজের ক্লাস চলতো৷ রাজবাড়ির ভেতর ঢুকলেই বিপ্লবীদের কক্ষগুলি চোখের সামনে চলে আসে। সারি সারি কক্ষ, যতই যাওয়া যায় আর পুরো রাজবাড়িটাই পরিখা দিয়ে ঘেরা। যেটা ভালো করে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। রাজবাড়ির ছাদে ওঠা হলো না। এই আক্ষপে নিয়েই ফিরতে হলো। ফেরার পথে দুপুরের আহার সেরে মাত্র দু কিমি চরণবাবুর ট্যাক্সি চেপে চলে এলাম – লংকাগড়, জলহরি৷ গোটা ভ্রমণের এই জলহরিই ছিলো একটা অমোঘ টান। কি অসাধারণ টেকনোলজি দিয়ে তৈরী হয়েছিলো জানিনা, বেশ বড়োসড়ো একটা পুকুরের মাঝে একটা গড়। পুকুরের চার ধারে না হলেও তিন ধারেই লোকজন বেশ আয়েস করে ছিপ ফেলছে, মাছ পড়ছেও….. ইতিউতি ঘোরার পর বাস ধরলাম….. এবার ইতিহাসের গলি থেকে বিদায়ের পালা! গন্তব্য – সেই মেদিনীপুর!

IMG_20190908_134830
শিবের ৯ রূপ
IMG_20190908_134858
রাসমঞ্চ
IMG_20190908_130134
পেল্লায়….
IMG_20190908_123410-01
সেকেলে প্রযুক্তি আজও অটুট
IMG_20190908_123853-01-01
শুকনো ঝর্ণা @ হাওয়া মহল

একদিনের ট্যুরে আসায় যায়, তবে তার সাথে কিছু যোগও করতে হয়, দুপুর নাগাদ ঘুরে নাড়াজোল বাস স্টপেজে মধ্যাহ্নভোজ সেরে সর্ট রুটে বিদ্যাসাগরের বাড়ি – বীরসিংহ এর দিকে যাওয়া যায়, কুড়ি কিমিও নয়। নাড়াজোল রাজবাড়িতে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে, এমনিতে কলেজের হোস্টেল হওয়ার দৌলতে অনেকেই থাকেন, তাদের থেকেই জানলাম – মাঝে মাঝে ফিল্মের লোকজন আসেন বলে তাদের জন্য একটা রুম বরাদ্দ! আর রাজবাড়ির লোকজন যে কোনো অতিথিকে সর্বাধিক পরিষেবা দিতে সদাপ্রস্তুত….অন্তত এমনটাই আমার জানা।

IMG_20190908_130734-01
নহবতখানা
IMG_20190908_130753~2
রাজার কাছারি… পরে ক্যান্টিন এবং ছাত্র সংসদ
IMG_20190908_132841
রাজদরবারে….
IMG_20190908_133107-01
খিড়কি থেকে
IMG_20190908_133341
কেন তোর উঁচু বাড়ি, কেন তুই বাবু রে?।

কোলকাতা থেকে আসতে হলে মেছগ্রাম হয়ে দাসপুর আসতে হবে, তারপর মেদিনীপুরগামী রাস্তায় বাঁক নিলেই পৌঁছে যাবেন বিপ্লবীদের ডেরায়….! 

IMG_20190908_143431
नमो-नमो, जी शंकरा

 

IMG_20190908_134942~2
ঐতিহ্যশালী রথ
IMG_20190908_124642
নাচ মহলা

 

পুনশ্চঃ
১. তথ্যের জন্য ইউটিউব এবং গুগল দায়ী..
২. থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একদিন আগে জানাতে হয়…রথের সময় জলহরি তে একটি নৌকা চলে।

IMG_20190908_143900
৮০ বন্ধু
© শুভঙ্কর দত্ত || September 9, 2019

প্রসঙ্গ – হিউম্যানিটি

 

তখনও অফিসিয়ালি গ্র্যাজুয়েট হইনি। লাস্ট ইয়ারের পরীক্ষা দিয়েছি মাত্র। লাস্ট ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই বা তারও আগে বেশ কয়েকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্নাতকোত্তর এর ফর্ম ফিল আপ করতে দেয়।

আশেপাশের কোন বন্ধুর এটিএম কার্ড ছিলো না বলে আমার কার্ড দিয়ে অনেকেই ফর্ম ফিল আপ করতো। যা হোক্…..

সেবার বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ফর্ম ফিল আপ। আমার বন্ধু তাপস আমায় ধরেছে, সেই মিস ট্রান্সজাকশনের যুগে আমার অকুতোভয়ই হয়তো আমার কথা ভাবতে তাকে বাধ্য করে।

ফরম ফিল শুরু করলাম। তার আগে অবশ্য আমি ঐ একই কাজ করেছি। তাই ঐ ফরম্যাটটা মোটামুটি মনেই ছিলো। তবে যে জিনিসটা নিয়ে বলছি সেটা ভাসা ভাসা মনে পড়ছে।
রিলিজিয়ন এর জায়গাটায় আসতেই (ঠিক মনে নেই বানান করে লিখতে হয়েছিলো নাকি অপশনের মধ্যে চয়েস করতে হয়েছিল) তাপস থামিয়ে দিলো।
আমি তো অবাক৷ এমনিতেই বন্ধুটি যুক্তিবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য, ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসীও নয়, পরিবেশপ্রেমী এবং বিজ্ঞান-সচেতনতাটা তীব্রভাবে আছে।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগে বললো – “ওটা অন্য কিছু করলে হয় না?”
( সম্ভবত কোনো অপশন থেকে বাছতে হয়নি তখন, তাহলে তো খবর হয়ে যেতো৷ আবার ফাঁকাও রাখা যাবে না, পাওয়ার প্লের মতো ম্যানডেটোরি)
আমি বললাম – “সে আবার কি?”
(দেখছি আমি…..)
বললো – “এই ধর যদি Others করে Humanism করি….!”

বলেছিলাম – “ধর্, তোকে প্রমাণ হিসেবে কিছু চাইলো, তখন কি করবি? কি দরকার ভাই, বেকার চব্ব করে! বাদ দে….”

টিকটিকর মতো ঘাড় নাড়লো আর একটা সল্প তীব্রতার ‘হুমমম’ ছেড়ে বললো — “যাক্ গে বাদ দে…”

বললাম – “দেখ ভাই তুই যে কাজ করিস তার জন্য তুই এমনিতেই মানবতাবাদী, তার জন্য খাতায় কলমে যাওয়ার দরকার নেই।”

আজ এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কতগুলো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে….

Religion – Humanity করলেই কি মানবতাবাদী হওয়া যায়?
নাকি নির্দিষ্ট কোনো ধর্মে থেকে মানবতাবাদী হওয়া যায় না?
মানুষের প্রতি যত দরদ তার মানে ধর্ম – হিউম্যানিটি হলেই থাকবে? অন্যথায়?
নাকি যে কোনো ধর্মই আমার চোখে এতো খারাপ হয়ে গেছে যে EMV এর NOTA মতো আশ্রয়ে গিয়ে বেশ হাওয়া লাগাতে পারবো?
কোনটা? জানতে ইচ্ছে করছে।

****** ****** ****** ******

© শুভঙ্কর দত্ত || June 1, 2019

গরমের ছুটিতে দুর্গেশগড়…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ দেখেছিলাম, মণিকান্তপুরের সেই রহস্য উদঘাটন পর্বে পরিচয় হয়েছিলো সোনাদা, ঝিনুক আর আবীরের সাথে। আসলে এই তিনজনকে পর্দায় দেখে অ্যাডভেঞ্চার পিপাসুদের মতো আমারও চলে যেতে ইচ্ছে করে, বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। তাই যখন জানলাম এবার দুর্গেশগড়ে আবার এক অন্য গুপ্তধনের সন্ধানে তিনমূর্তির অভিযান, যার ষাট শতাংশ শ্যুটিং আমার প্রিয় ঝাড়গ্রামে তখন আর অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিলো না।

আগের বার ছিলো শাহ সুজার গুপ্তধন আর এবার দুর্গাবতি দেবরয় এর গুপ্তধন, যা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের থেকে তিনি পেয়েছিলেন।

  • হিস্ট্রি – নট অলওয়েজ বোরিং….

সিনেমা জুড়ে ইতিহাসের গল্প…. বইয়ের পাতায় পড়তে হলে ভীষণই বোরিং লাগে যে কাহিনী, এখানে সুবর্ণ সেন এর গল্পের ছলে বিষয়টির ভাবগম্ভীর ব্যাপারটিকে লুফে নেওয়ার মতোই সহজ করেছে৷

  • সাবলীল অভিনয়

‘ঝিনুক’ এর চরিত্রে ঈশা সাহা কে আমার বেশ লাগে, নামটার সাথে চরিত্রটা খুব মানায়। প্রথমবার গুপ্তধন উদ্ধার পর্যায়ের পর এবাারেও দারুণ লেগেছে….! সবচেয়ে ভালো লাগে অর্জুনকে, আবীরের চরিত্রে…. সেই বেশ একটা খাদ্যরসিক এবং হিউমারাস চরিত্র যা বাঙলির খুব কাছের লোক৷ সোনাদা কে নিয়ে বলার কিছু নেই।

  • ক্যামিও….

ক্যামিও হিসেবে খরাজের উপস্থিতিটা একটুও বোরিং হতে দেয় না, ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারে হার্দিক পাণ্ডিয়ার মতো ব্যাপারটা….. শেষপাতে চাটনীর মতো, পুরো চেটেপুটে খেলাম, একটা শব্দ বারবার বলছিলো, সেটা আর মনে নেই…

মে মাসে দুর্গাপুজো, কাশবনের পাশ দিয়ে মায়ের আগমণ, বনেদি বাড়ির পুজো — দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গুপ্তধনের সন্ধান গল্পটিকে বড্ড বাঙালিদের করে তোলে, তার সাথে যোগ হওয়া পুজোবাড়ির খাওয়াদাওয়া — সব মিলিয়ে বাঙালিয়ানার অনবদ্য নিদর্শন এই সিনেমা।

  • হারানো সুর আর কথা….

গানের কথার ছলে গুপ্তধনের এ টু জেড জানতে পারা – এদিক থেকে গীতিকার আর সঙ্গীত পরিচালকের প্রতি অতিরিক্ত সম্ভ্রম জাগে…. সেই পুরনো ফ্লেভারটা পুরোমাত্রায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই সুরটা লেগে থাকার মতোই….. সিনেমার গল্পের সাথে, সময়ের সাথে অদ্ভুৎ ভাবে খাপ খেয়ে যায়…!

  • যা কিছু চাইছি.. মোচড়

গল্পের বুনোটে সময় লেগেছে…. সেটা হওয়াটা স্বাভাবিক….. ইতিহাসটাকে বেশ ভালো ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে টুকরো টুকরোভাবে যাতে দর্শকের মাথায় সেঁটে যায় চেয়ার ছাড়ার পরেও….! শেষকালে ঐ রকম একটা মোড় ঘোরানো— আশা করছিলাম, তবে ভাবনারও অতীত ছিলো, আর পরিচালক ধ্রুব ব্যানার্জী পুরো পয়েন্ট নিয়ে চলে গেলেন এখান থেকেই…..!

  • ক্যামেরা…আলো.. ইত্যাদি

সৌমিক হালদার নিজের খ্যাতির মর্যাদা রেখেছেন। এই সিনেমার সাপেক্ষে যেটা খুব মধ্যমানের হলেও চোখে লাগতো, সেরকম একবারও লাগেনি, জমাটিই লেগেছে।
কাজটাকে সহজ করেছে আলোর অনবদ্য ভালো ব্যবহার…. এইরকমভাবে আলোর ব্যবহার কটা সিনেমায় হয়, সন্দেহ আছে, অবশ্য সুযোগও থাকে না

  • বোনাস পয়েন্ট…..

কৌশিক সেন…. ফোকাস টেনেছেন গল্পের খাতিরে, সে জন্য অবশ্য পরিচালকের ধন্যবাদ প্রাপ্য…
আরো আছেন – লিলি চক্রবর্তী, পিসির চরিত্রে ওনার উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরো বেশি করে বোধ হয় আট থেকে আশির জন্য মাস্ট ওয়াচ করে দেবে…..

  • আত্মিক টান

রহস্য, সাসপেন্স আর অ্যাডভেঞ্চার এর সাথে বাঙালির আত্মিক টান, তার সাথে যদি যোগ হয়ে যায় ইতিহাস, তাহলে আর কথায় নেই….! যাকে বলে টরে টক্কা! অযাচিতভাবেই গুপ্তধনের সন্ধানে এসে সোনাদা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে আরও যে বিষয়টি উদঘাটন করলেন, তার জন্য এক্সট্রা একটা নম্বর দেওয়ায় যায় পরিচালককে

  • গরমের ছুটি – লুটি

গরমের ছুটিতে দুর্গাপুজো, সৃজিৎ মুখার্জি ‘উমা’ র হাত ধরে এরকমটা করেছিলেন, সেটা শহরে যদিও আর ধ্রুব ব্যানার্জি করলেন গরমকালে, গ্রীষ্মবকাশে…. অতএব লুটি!

  • পারিবারিক ফিল্মও….

পারিবারিক সিনেমাও বটে৷ একদম শেষে সে কথা আরো বেশি করে জোরালো হলো…..! পিসিমা- সোনাদা- অপুদা (খরাজ) এর কথোপকথনে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক একাত্মতার বিষয়টি বেশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

  • যথাযোগ্য উত্তরাধিকার…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ এর যোগ্য সিক্যুয়েল বলেই মনে করি….. একবারের জন্যেও অগ্রজপ্রতিম সিনেমাটিকে অসম্মান করা হয়নি…. বরং শেষ কয়েক মিনিটের থ্রিল আর গুপ্তধন খোঁজার পন্থাস্বরূপ গান — এই দুটির জন্য অবিসংবাদীভাবে ‘দুর্গেশগড়’ এগিয়ে থাকবে।

  • এবং ঝাড়গ্রাম…

ঝাড়গ্রামকে যারা খুব ভালেবাসি, তাদের জন্য এই সিনেমা দেখা অত্যন্ত জরুরি। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি থেকে শুরু করে চেনা চিল্কিগড় সহ বিভিন্ন অচেনা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই সিনেমার ফ্রেমগুলো। বিশেষ করে রাজবাড়ি….! কি সুন্দরভাবে অন্দরমহলটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরো কিছু জায়গার ছবি ফুটে ওঠে কিন্তু নাম জানি না আমি….! অরণ্যসু্ন্দরী ঝাড়গ্রাম কে ভালো চিত্রায়িত করেছেন ক্যামেরাম্যান৷

সুতরাং এই গরমের ছুটিতে বাড়ির সকলকে নিয়ে ‘দুর্গেশগড়’ ঘুরে আসা যেতেই পারে…. যেখানে  সোনাদা – ঝিলিক – আবীরের দেখা মিলবেই৷

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 29, 2019

‘কণ্ঠ’ – এভাবেও ফিরে পাওয়া যায়

যখন উচ্চমাধ্যমিক পড়তাম, একটা গল্প ছিলো – স্টিফেন লেককের…. “Further Progress In Specialisation.” বাংলা সিনেমায় বিগত দশ বারো বছর ধরে এরকম বিশেষ বিশেষ বিষয় নিয়ে সিনেমা উপহার দিয়েছেন কৌশিক গাঙ্গুলি – নাম বলছি না, যে যার মতো করে মনে করে নিলেই ভালো। আর কেউ বানাননি বলবো না, কিন্তু এরকম ধারাবাহিকভাবে বানাননি কেউই। সেই তালিকায় এবার নবতম সংযোজন শিবপ্রসাদ-নন্দিতার “কণ্ঠ”….

কলকাতার এক রেডিও জকি আর জে অর্জুন (শিবপ্রসাদ) স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার ‘কণ্ঠ’ হারাবেন….. একজন লেখকের কাছে কলমটা যতটা প্রয়োজনীয়, হাতটা যতটা প্রয়োজনীয়, তার চেয়েও একজন রেডিও জকির কাছে তার কণ্ঠটা বেশি করে প্রয়োজন…বস্তুত একজন রেডিও জকির থেকে তার ‘কণ্ঠ’ কেড়ে নেওয়া মানে একটা মরা মানুষেই পরিণত হওয়া, সে কথা তো সিনেমা দেখতে দেখতেই পরিচালক জানিয়ে দিলেন।

কিন্তু সত্যিই ‘কণ্ঠ’ হারিয়ে গেলেই কি সব শেষ? রেডিও জকি তার শো এ জানাচ্ছেন – ” ইচ্ছেশক্তি যখন আছে, তখন তাকে হার মানাবে কে! কণ্ঠ যখন বলতে চায়,,তাকে আটকাবে কে!”

অর্জুন এবং পৃথা (পাওলি দাম) – দুজনেই বাচিক শিল্পী, সম্পর্কের শুরু – গভীরতা – বাঁধন সবটাতেই কণ্ঠের অবদান যে সবচেয়ে বেশি সে কথাও বারবার ফিরে এসেছে গল্পে। কিন্তু কণ্ঠ হারিয়ে যাওয়ায় ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকা একটা মানুষের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার তাগিদে সহায় হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। এ গল্পে অভিনেতাদের সাথে তাই আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিকেও কুর্নিশ জানাতে হয়। Laryngectomy র স্পেশালিষ্ট রোমিলা চৌধুরীর চরিত্রে জয়া এহসান এর এই অভিনয় সিনেমাটাকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করেছে বলে মনে করি।
Laryngectomy – এই শব্দটা খুব একটা পরিচিত নয়, যতই আমরা ক্যান্সার নামে মারণ রোগের কথা বলি না কেন!! কি সুন্দরভাবে এই শব্দটার মানে বুঝিয়ে দেওয়া হয় গল্পতে…. একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝতে পারবে, এই জায়গাটা দারুণ লেগেছে।

মাঝে মাঝেই সাসপেন্স এর একটা ঝটকা বয়ে চলবে। ভূত নিয়ে সাম্প্রতিক কালে বাংলা সিনেমা বহুল-চর্চিত, সেলুলয়েড এ শিবু আবার নিয়ে এলেন অতিপরিচিত “ভূতের রাজা” কে, ….. সিনেম্যাটিক উপস্থাপনা যাকে বলে…!

পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ছোট্ট ক্যামিওকে ব্যবহার করা হলো সুনিপুণভাবে….!!
যারা সিনেমা দেখতে বসে চিকিৎসার ধরন দেখে ইন্সট্যান্ট খিল্লি করতে যাবেন তারা একটু জেনে বুঝে করবেন, আসা রাখি— সিনেমার চিত্রনাট্যের খাতিরে এরকমটা করা হয়নি বলেই অন্তত আমার তা মনে হয়।

শিবপ্রসাদ এর পরিচালনা নিয়ে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন ওঠে…..! কিন্তু অভিনয়! সেটা আমি সেই “অ্যাক্সিডেন্ট” সিনেমা থেকে দেখে আসছি, কি অসামান্য অভিনয় দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব সাইলেন্টলি। এই সিনেমার অ আ ক খ সবটা জুড়েই তিনি….! তবুও বর্ণপরিচয় পূর্ণ হতো না যদি না জয়া এহসানের ওরকম একটা অসামান্য উপস্থিতি পেতাম..! পাওলি দাম নিজের জায়গায় দারুণ, নতুন করে বলার কিছু নেই। সিনেম্যাটোগ্রাফি নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়, বেশি কিছু নয়, সাহানা বাজপেয়ীর “সবাই চুপ” গানটাতে ক্যামেরার ব্যবহার দেখে সার্চ করতে বসি কে সেই ক্যামেরাম্যান! শুভঙ্কর ভড়– এই সেই ভদ্রলোক যার অনবদ্য কাজ “বাকিটা ব্যক্তিগত” কে অন্য মাত্রা দেয়।
এই সিনেমার বাড়তি পাওনা অবশ্যই — সিনেমার গানগুলো…. শুরুতেই তার ইঙ্গিত দিয়ে দেবেন স্বয়ং প্রসেন —- “অবাক জলে……… তুমি সেই গান বানানোর কারণ হলে….!”

তবে সবচেয়ে যেটা অসামান্য এবং প্রশংসনীয় লেগেছে সেটা হলো — ‘জুজু’ নামকরণ…! না দেখলে এই ভালো লাগার কারণ অবশ্য বোঝা যাবেই না। শেষ কালে নজরুলের ‘বিদ্রাহী’ কবিতা দিয়ে…… Laryngectomy ক্লাবের সকলে মিলে উপস্থাপন।

এই সিনেমা তাই আশার আলো….! রোগী – পেশেন্ট যে কতটা বন্ধু হওয়া দরকার তাও বলে, শুধু তাই নয়, সবকিছুকে ছাপিয়ে একটা ভালো বন্ধুত্বের গল্পও বলে, ‘কণ্ঠ’ হাতিয়ার করে বিখ্যাত নয়, বরং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প বলে। বাচিক শিল্পীদের শুধু নয় একই রোগে আক্রান্ত হয়ে কণ্ঠহৃত বহু মানুষের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক মৃত-সঞ্জীবনী….! কিভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আর মানবতার মেলবন্ধনে একজন স্বরযন্ত্র হারানো মানুষ কিভাবে ফিরে পাবে তার ‘কণ্ঠ’ জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে….! বাংলা সিনেমায় প্রতিযোগীতা কি পরিমাণ ফিরে এসেছে, তা বাতলে দেবে “কণ্ঠ”! সিনেমা দেখতে দেখতে আর জে চরিত্রে শিবুর কোনো ভালো পরিবর্ত খুঁজছিলাম, পেলাম না!! কুর্নিশ!! অভিনয়- জাস্টিফায়েড..!

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 18, 2019

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” – তিন যুগের পৃথিবীতে অতীশ দীপংকর

‘কেমন লাগলো’ – এ কথার উত্তর দিতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবতে হবে….! গত দুই বছরে ফেসবুকে এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু পেয়ে অন্য স্বাদের বেশ ভালো রকম তিনখানা বইয়ের সন্ধান পাই। আবার তারই এক পোস্টে দেখি তিনিই “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” পড়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। তার আগে নাম শুনিনি, এমনতর নয় যদিও বিষয়টি। কিন্তু একটা বিশ্বাসযোগ্যতা কাজ করলো…..

collegestreet নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বেশ ভালো রকম ছাড়ে পেয়েও গেলাম বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তাও আবার ডেলিভারি চার্জ মুকুব। ব্যস!

উপন্যাসের নামকরণেই লেখা আছে “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী”… হাস্যকর হলো বিষয়টা যখন ওনারা ফোন করে বলছিলেন ‘দাদা আপনার অর্ডার করা দুটো বইয়ের একটাই পেয়েছি’, পরে বুঝিয়ে বলার পর বুঝলেন – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী কোনো আলাদা বই নয়।

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকর এর নিয়ে এমন আকর একখানা উপন্যাসে লেখক তার মুন্সিয়ানার দারুণ পরিচয় বহন করেছেন একথা প্রথমে স্বীকার করে নেওয়ায় ভালো।

এ উপন্যাস জুড়ে চিত্রায়িত হয়েছে অতীশ দীপংকরের জীবনী, তার সাথে জড়িয়ে থাকা শতাধিক চরিত্রের সাক্ষাৎ হয় পাঠকের সাথে।

মোটামুটি আমরা জানি যে ৯৭৭ সালে প্রথম তুর্কি আক্রমণ হয়, সুবুক্তগীন করেন। সফলতা আসেনি। এরপর প্রায় ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি আক্রমণ চালালেন, তুরস্কদেশাগত আক্রমণকারীর রোষানলে পড়লো ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষুদ্র থেকে গভীরতর উপাদান সমূহ – মূর্তি, শাস্ত্র, দর্শন এবং হাজারো পুঁথি তাদের ধর্মান্ধতার চোখে পড়তে বাকি থাকলো না। তিব্বত থেকে আগত পর্যটক – চাগ্ লোচাবা, নালন্দা দর্শনে এই ভয়াবহতার মাঝেই, নালন্দার তৎকালীন অধ্যাপক আর্য শ্রীভদ্র তাকে ফেরালেন না। নালন্দা কাউকে খালি হাতে ফেরায় না বলে তিনি অতীশ দীপংকর ব্যবহৃত একটি কাষ্ঠপেটিকা তুর্কি আক্রমণ থেকে বাঁচাতে তিব্বতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেন।

যাত্রাপথে বিক্রমণিপুর গ্রামের এক তন্ত্রবিদ্যাপটিয়সী গৃহকর্ত্রী স্বয়ংবিদার সাথে পরিচয় হয় তার….. এরপর দু শো বছর পিছিয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ হলো – চন্দ্রগর্ভ, অবধূত, কুন্তলার সাথে৷

রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ জীবনের অর্থ সন্ধান করতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মহর্ষি জিতারির সাথে, পরে অবধূত অদ্বয়বজ্র নামে তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে তন্ত্রচক্রে পড়ে যান৷ রাহুলগুপ্তের শিষ্যত্বে তান্ত্রিক অভিষেক হয়। তার বাল্যসঙ্গী- প্রেমিকা কুন্তলা তাকে প্রত্যাখান করেন…..!

“যখন বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস,
নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধূলীকালীন মেঘ,
পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে,
আর পালতোলা নৌকা ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতধারায়….
সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে-
আমার কেশপাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থিনির্মিত মালাঃ
তখন… কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব…..
এ রূপে নয়। এ ভাবে নয়। এখানে আর নয়।”

এই কথা বলে মৃত্যুর নিঃসীম অন্ধকারে ডুব দিলেন কুন্তলা। জীবনে চলার পথ সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে, প্রিয়তমা কে হারানোর পর একের পর দুঃস্বপ্ন দেখে বেরিয়ে পড়লেন অনন্তের উদ্দেশ্যে। ওদন্তপুরী মহাবিহারের অধ্যক্ষ আচার্য শীলরক্ষিতের সাক্ষাতে তার জীবনের প্রকৃত পথ সন্ধানে তিনি ব্রতী হোন। এক বৈশাখী তিথিতে চন্দ্রগর্ভকে শ্রামণ্যে দীক্ষিত করেন পণ্ডিত – ভিক্ষু শীলরক্ষিত। শ্রামণ্যের প্রতিজ্ঞাবাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে চন্দ্রগর্ভের অবসান হলো, জন্ম নিলো অতীশ দীপংকর…… চিরজাগ্রত জ্ঞানদীপ যার হৃদয়কন্দরে সতত দেদীপ্যমান!

এরপর আবার ফিরে আসা যাক্ বর্তমানে, যেখানে বাংলাদেশের বিক্রমপুরের অনঙ্গ দাস নামের এক কৃষকের জমি থেকে পাওয়া এক কাঠের বাক্স উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু অধিকার করে বসে। রহস্য আবৃত সেই শ্যাওলা পড়া কাষ্ঠপেটিকার অভ্যন্তরস্থ পুঁথি এবং ধাতব মূর্তির রহস্য সমাধানের দায়িত্ব পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি হয়ে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার গবেষক কলকাতা নিবাসী সম্যক ঘোঘের হাতে, পেলিওগ্রাফি অর্থাৎ ঐতিহাসিক হাতের লেখা নিয়ে পড়াশোনা যার ক্ষেত্র…. তিনি সেই দায় ন্যস্ত করেন অমিতায়ুধ এবং শ্রীপর্ণার ওপর। অমিতায়ুধ সেই দায়িত্ব সযত্নে রক্ষা করতে তড়িঘড়ি বাংলাদেশ যান। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” প্রত্যক্ষ করার উদ্দেশ্য নিয়ে গেলেন বটে কিন্তু পরিচয় হলো কৃষককন্যা জাহ্নবীর সাথে, যেই কথাগুলো শুনিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে ছিলো হাজার বছর আগের এক নারী – কুন্তলা, সেই কথাগুলোই পূর্ববঙ্গীয় সতেজ উচ্চারণে ভটিয়ালির সুরে গান হয়ে ফেরে জাহ্নবীর কণ্ঠে। অমিতায়ুধ তার প্রত্যক্ষদর্শী।

IMG_20190506_143012~2.jpg

মোতালেব মিঁয়ার বাড়িতে বসাবাস কালে উৎসুক্যের দরুণ অমিতায়ুধ আবিষ্কার করে ফেলেন এক অপার্থিব গুঢ় স্থান, পৃথিবীর সমগ্র জাদু-বাস্তবতা থেকে তা অনেক গভীরে, লোকচক্ষুর অনেক আড়ালে তা বিরাজমান….. কালের চক্রে অতীতে গিয়ে সে দৃশ্য দেখতো পেলেন পাঠককুল৷ অমিতায়ুধ উদ্ধার করলেন – ‘শ্বেততারা’, পাথরনির্মিত! কাষ্ঠপেটিকার অবিকল প্রতিরূপ…! সাথে সহস্র শতাব্দী প্রাচীন একটি পুঁথিও, নাম – “করুণকুন্তলাকথা”!

অতঃপর ঔপন্যাসিক পরিচয় করালেন এ কাহিনীর কাহিনীকারের সাথে, শাওন বসু – যার ঐন্দ্রজালিক লেখনীর ওপর ভর করে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক সাহসী মিলনে সৃষ্টি হয় অসাধারণ বিচ্ছুরণ…..! অতীশ দীপংকরের মহিমান্বিত গাথা দৃষ্টিগোচরে আসে পাঠকের। তিব্বত লামা চাগ্ লোচাবা আচম্বিত চুম্বন প্রাপ্ত হোন বাঙালি কুলবধূ স্বয়ংবিদার ওষ্ঠ হতে, বিষ চুম্বনে মুর্ছায়িত হয়ে চাগ্ এর সময় পশ্চাৎ প্রসারণ করলো দুইশত বছর, ধ্বনিত হলো – ” বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি…ধম্মং শরণং গচ্ছামি…”

অধুনাকালের প্রত্নতত্ত্ববিদ অমিতায়ুধ মোতালেব মিয়াঁর বাড়ির এক সুড়ঙ্গ পথে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে খু্ঁজে পেলেন আরো একটি মূর্তি, কাঠের মূর্তি, আরও একটি প্রতিরূপ। বজ্রাসন বিহারে যেই মূর্তিটি দীপংকর তিব্বত যাত্রার পূর্বে পাঠিয়েছিলেন তার জন্মস্থানে, অমিতায়ুধের কাছে পুরোটা পরিস্কার হলো এবার, সমাধান হলো সুড়ঙ্গ পথের গভীর প্যাটার্ন, আশ্চর্য যোগাযোগ পন্থা। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” র রহস্য অমিতায়ুধের দ্বারা পুরোপুরি সমধান করে ফেললেন কাহিনীকার শাওন বসু৷ কিন্তু বাকি থেকে গেলো সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া ধাতব আইকনটি…!

ভারতবর্ষের বিক্রমশীলে অধ্যাপনাকালে অতীশ দীপংকর ভারতবর্ষকে বহিরাগতদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে রাজাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের বার্তা দেন, সে কথা উপন্যাসে গল্প আকারে সুন্দরভাবে বর্ণিত- নয়পাল ও চেদীরাজ কর্ণের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনে দীপংকরের এক অসামান্য দিক তুলে ধরেছেন কাহিনীকার৷ মধ্য তিব্বতীয় সম্রাট এশেওদের আমন্ত্রণে অতীশ দীপংকর পাড়ি দেন তিব্বত অভিমুখে, তিব্বতীয় অনুবাদক বিনয়ধর, বীর্যসিংহ, অতীশের ভাই শ্রীগর্ভ, সচীব পরহিতভদ্র কে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় সে যাত্রা….! আর সর্বক্ষণের সঙ্গী সেই কাষ্ঠপেটিকা, যা শৈশব থেকে তার সাথে আছে– ধাতব মূর্তির সেই কাঠের বাক্স, সেই বাক্স চাগ্ লোচাবার হাত দিয়ে নালন্দায় পাঠিয়ে দেন তিনি। সেই বাক্সই কালক্রমে অনঙ্গ দাসের জমি থেকে উদ্ধার হয়।

এই তিন মূর্তির সন্ধানের পাশাপাশি কশেরুকা অস্থিমালা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে…! কালের সংস্থাপনে আবার উঠে আসে সেই মন্ত্র, যা ধ্বনিত হয়েছিল অতলস্পর্শী আত্মবিসর্জনের মুহূর্তে কুন্তলার মুখে, বীর্যসিংহ জীবনের শেষ মুহুর্তে যা উচ্চারণ করেছিলেন, সেই গাথার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে বিলম্ব হলো দীপংকরের৷ তখনই শ্বেত কশেরুকার মালাটি চাগ্ কে দান করেন অতীশ যা তিনি পেয়েছেন সেই সুন্দর মুহুর্তে…! এই কশেরুকা যে স্বয়ংবিদার প্রতি তার (চাগ্) গুরুদক্ষিণা স্বরূপ….। তার সাথে সযত্নে রক্ষিত কাষ্ঠপেটিকাটি ও চাগের হাতে দিয়ে ভারতে প্রেরণের ব্যবস্থা করতে বলেন…..! গোটা কাহিনীর অজস্র শব্দমালায় এবার মৃন্ময়ী প্রতিমা, দারুমূর্তি এবং ধাতব আইকন — সব কিছুকে ছাপিয়ে দীপংকরের ভাষ্যে উঠে আসে সেই অমোঘ চিরভাষ্য….. চাগের সেই প্রশ্নের উত্তরে পরিচিত হই রক্তমাংসের মানুষ, এক বাৎসল্যকরুণ হৃদয় – বিশিষ্ট অর্থের অতীশ এর সাথে পরিচিত হয় চাগ্… পরিচিত হই আমরা।

চাগ্ বিমূঢ়ৎ বললেন, “এ মূর্তিতে আপনার আর প্রয়োজন নাই?”
নিঃসংশয়িত প্রত্যয়ে অতীশ উচ্চারণ করলেন, “না, আমার আর প্রয়োজন নাই। আজ দ্বিপ্রহরে এক বালিকাকে দর্শন করে, তার অনাবিল স্নেহের স্পর্শ পেয়ে আমি বুঝেছি, আমি কাষ্ঠ, মৃত্তিকা বা ধাতু নই; আমি মানুষ। আমি শুধু স্নেহবুভুক্ষু অপার এক সত্তা। শুধু সকাতর এক মাতৃহৃদয়। ….. আমি সেই আবর্তমান উচ্ছ্বসিত কারুণ্যব্যাকুলতা…।”

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

নেথাং বিহারের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটিয়ে দেন অতীশ। তাঁর সমাধির ওপর নির্মিত মন্দির কালের নিয়মে জঙ্গলাকীর্ণ আজ। অতীশের তিব্বতীয় শিষ্য ব্রোম্ তোন্ পা জন্ম দেন নতুন এক সম্প্রদায়ের, কাদম্পা থেকে গেলুক্পা হয়ে সেই সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু যাকে আমরা দলাই লামা বলি তিনিও একদিন চিনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ভারতে চলে আসেন।

নগর পত্তন হয়েছে, পুঁথি হারিয়েছে অজস্র- অগুন্তি, হাজার বছর আগেকার সেই ইতিহাসের আক্রমণকারীরা আজও আছে বেঁচে পৃথিবীর বুকে….তার সাথে শাশ্বত থাকবে দীপংকরের মতো শ্রমণরা, যারা হিংসে নয়, প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে দুর্জ্ঞেয় কে জয় করেছেন, মানুষের মনুষ্যত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন বারংবার…..যেখানেই গিয়েছেন চেষ্টা করেছেন শান্তির বার্তা দিতে….!!

লেখকের মতে অতীত – বর্তমান – ভবিষ্যৎ বলে আলাদা কিছু নেই, যুগপৎ প্রবাহমান। একই সমতলে অঙ্কিত পরস্পরছেদী তিনটি বৃত্ত– ঐ তিনটি বৃত্তের ছেদবিন্দু গুলিতে কোনো বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে এক যুগের চরিত্রগুলি পরিচিত হবে অন্য যুগের চরিত্রের সাথে৷ শুধু তাই নয়, ঘটবে বিনিময়ও। বেশ জটিলতর একটি কৌশলে বিষয়টিকে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করা গিয়েছে বলে মনে করি৷ এক সাথে তিনটি গল্প সমান্তরালে চলছে, লেখক প্রস্তাবনাতেই সে কথা বলেছেন এবং আরো সহজবোধ্য যাতে হয় তার জন্য তিনটি আলাদা সময় কে প্রতিটি পরিচ্ছদেই তুলে ধরেছেন। সময় বিশেষে তাদের ভাষা তুলে ধরেছেন৷
দশম-একাদশ শতক, ত্রয়োদশ শতক এবং সাম্প্রতিক কালে বিচরণের পর তাই অভিভূত হয়ে যেতে হয় অসামাণ্য লেখনশৈলীর জন্য, উপন্যাস পড়তে পড়তেই তাই নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে হয় বারবার। নিজেকেও পিছিয়ে যেতে হয় পৃষ্ঠা উল্টিয়ে। তিন যুগ ধরে পরস্পরছেদী নায়িকাদের সাথে তাই বারবার দেখা হয়ে যায়, বুঝতে তবু সুবিধে হয় না তাদের চাওয়া-পাওয়া…! অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকি কখন তাদের প্রাপ্তি পূর্ণ হবে…..! শাওন বসুর কল্পলোকের চরিত্র অমিতায়ুধ, জাহ্নবী এরা বড্ড আপন হয়ে ওঠে তখন, শেষ হওয়ার পরেও তাই মেনে নিতে কিঞ্চিৎ দ্বিধা হয়। কি অসামান্য গবেষণা এবং অধ্যবসায় থাকলে এরকম উপন্যাস আসে তা বলাই বাহুল্য, ঠিক যেই কারণে আনন্দ পুরস্কার এর বাছাই পর্বে ঠাঁইও মিলে যায় লেখক সন্মাত্রানন্দ শোভনের……! কুর্ণিশ ওনাকে..! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “চৌথুপীর চর্যাপদ” পড়েছিলাম বলে এই উপন্যাসের অনেক শব্দার্থ বোঝা সম্ভবপর হয়েছে। বাংলা ভাষায় আজকাল ভালো উপন্যাস আর হয় না- এই গোছের মন্তব্য করে যারা বসে থাকেন তাদের জন্য এই উপন্যাস উপযুক্ত জবাব। লেখকে আরো ধন্যবাদ এই জন্য যে — এই গ্রন্থটিকে কেউ স্রেফ গল্পবই হিসেবে নিলে মস্ত বড়ো ভুল করবে….! এখানে কাহিনীর ধারা বিবরণী এবং শব্দের মনোরম ব্যবহার, লেখনশৈলী সবকিছুই পাঠককে বাধ্য করবে সময় নিয়ে পড়ার জন্য…..! পড়তে গিয়ে উঠে আসবে না জানা কত ইতিহাস…..! একটা পরিচ্ছদের পর আর একটা পরিচ্ছদ এমনভাবে সাজানো যে পড়তে পড়তে ব্রেক কষা বেশ দুঃসাধ্য….! শাওন বসুকে দিয়ে লেখক বলিয়ে নিয়েছেনও এ কাহিনী আরো বড়ো হয়ে যেত…. পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে গেলে পাঠকের বিরক্তির প্রকাশও কাম্য নয় অবশ্য….! সে সবের ধারেকাছে যাননি বলা ভুল, তবে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসেছেন সুকৌশলে….. অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য টাইম মেশিনে ভর করে আলেখ্যটিকে ছোটো করে ফেলেছেন লেখক৷ কয়েকটি ক্ষেত্রে এতো বিশেষ লেগেছে যে বারংবার পড়তে ইচ্ছে করেছে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের প্রতি কতটা ভালোবাসা এবং আনুগত্য থাকলে এরকম তিন টি আলাদা যুগে স্থানবিশেষে আলাদা রকম ভাষারীতি প্রয়োগ করে এরকম রচনা সম্ভব, সে কথা একজন সামন্য পাঠক হিসেবে কল্পনা করা দুঃসাধ্যই..!

হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে যাওয়া নাগরিক সভ্যতার, আজকের পৃথিবীকে জড়িয়ে ফেলেছেন সেই সময়বর্তিকায়….! তিন যুগের তিন নারীর প্রণয়কথায় , শাশ্বত নারীসত্তার জন্মজন্মান্তরে  চিত্রায়িত এই উপন্যাস তাই বাংলা ভাষায় অতীশ অনুসন্ধান এর এক অনন্য ইতিবৃত্ত, এক অসামান্য আলেখ্য, যা বাংলা ভাষার একটি সম্পদ হিসেবে ঠাঁই করে নেবে বলে আশা রাখি৷

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা”
লেখক – সন্মাত্রানন্দ শোভন
ধানসিড়ি
দাম – ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা – ৩৫৯

***************************************

© শুভঙ্কর দত্ত  || May 6, 2019

 

প্রেমের উপহার : গল্প হলেও সত্যি…

সিনেমার শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফিরবেন। মাঝে বোনের বাড়িতে দেখা করে যাবেন পরিচালক মশাই..!
গল্পটা সুদূর আমেরিকার৷ নিউইয়র্ক থেকে ফিলাডেলফিয়া তে যাচ্ছিলেন, ট্রেনের সেই যাত্রাপথের একবার থেমে যাওয়া যে তার জীবনে এতো কিছু দিয়ে যাবে, সেকথা বোধ হয় ভাবেননি তিনি। আর ভাববেনই বা কি করে, অদূর ভবিষ্যৎ দেখা যায় নাকি??? সবাই কি আর “প্রিডেস্টিনেশন” এর অধিকারী হতে পারেন নাকি? সবার মগজে টাইম মেশিন এর ফর্মুলা ইনপুট করা আছে….!

পরিচালকের নাম – রিচার্ড লিঙ্কল্যাটার, তখনও ফিল্মজগতে চুনোপুঁটি হিসেবেই পরিচিত। সালটা ১৯৮৯, সবে “Slacker” সিনেমার শ্যুটিং শেষ করে ফিরছেন, ভাবলেন ফিলাডেলফিয়া তে একরাত কাটিয়ে নেবেন। একটা খেলনার দোকানে একটি মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয় তার। নাম – অ্যামি লেরহাউপ্ট, আমেরিকা থেকে ইউরোপ যাবে সে। বেশ কয়েক ঘন্টা হেঁটে হেঁটে গল্প করেন তারা, সিনেমা-রাজনীতি-মিডিয়া সব কিছু উঠে আসে সেই সব কথোপকথনে। প্রেমে পড়ে যান দুজনে, রিচার্ডের হোটেলেই রাত কাটান দুজনে। যেটা স্মরণীয় হয়ে যায় দুজনের কাছেই। পরের দিন সকাল হতেই বিদায় জানাতে হয় একে অপরকে, ফোন নম্বরও এদিক-ওদিক হয় দুজনের মধ্যে। ঠিক হয় ছ’মাস অন্তর একবার করে এই একই স্টেশনে দেখা করবেন তারা, কিন্তু পরিচালক মশাই কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেলে সেসব আর হয় কি করে….! ফোনে কথা হয়েছিলো খুব কম বারই। তারপর কেটে গেছে অনেক গুলো বছর…..!!
রিচার্ডের কথা মতো “that long distance thing”…. স্বভাবতই সে প্রেম আর রইলো না।

ভাবলেন মেয়েটিও হয়তো ভুলে গেছে সে কথা, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের পেশাকে পন্থা হিসেবে বেছে নিলেন। সিনেমা বানাবেন সেই সাক্ষাৎ এর ওপর নির্ভর করে, যদি কোনদিন দেখে অ্যামি, তাহলে হয়তো বুঝতে পারবে যে সেই এক রাতের ভালোবাসা এখনও আছে অটুট, মনের গভীরে, অন্তরালে।
ইথান হক, জুলি ডেলপি কে নেওয়া হলো, স্ক্রিপ্টেও সাহায্য করলেন, জুলি ডেলপি এমনিতেই স্ক্রিপ্ট রাইটার, চিত্রনাট্যতে অবদান রাখলেন কিম ক্রিজান, বিখ্যাত আমেরিকান মহিলা …!

সিনেমার শ্যুটিং হলো পুরো ভিয়েনাকেই কেন বেছে নিলেন? তার মনে হয়েছিলো সিনেমাটির জন্য খুব ন্যাচেরাল এটা- এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেটা জানিয়েছিলেন। ১৯৯৫ এ রিলিজ করলো ” Before Sunrise”…. একদম “from midnight until six in the morning” এর কথা মাথায় রেখেই এমন নাম।
ছবি খুব একটা যে রোজগার করতে পারলো এমন নয়, কিন্তু যত দিন যেতে থাকলো, মানুষের মনে ভালো লাগা জন্মালো এই সিনেমা নিয়ে। রিচার্ড ততদিনে জীবনসঙ্গী পেয়ে গেছেন৷

Before Sunrise
মনোহারি কথোপকথন….@ Before Sunrise

এই সিনেমা টা এখনও বেশ কিছু ওয়েবসাইট, সিনেমাপ্রেমীরা সেরা প্রেমের সিনেমার তালিকায় রাখেন। বিশেষ করে কথোপকথন গুলো মন দিয়ে শোনার মতো….. এমন একটা জায়গায় গিয়ে শেষ হয়, যেখান থেকে দর্শকদের চার পাঁচ রকম জিজ্ঞাসা উঠে আসে, সে সব না হয় সিনেমাটা যারা এখনও দেখেননি তারাই দেখে বুঝে নেবেন। কিন্তু কথাটা হলো অ্যামি কি আদৌ পারলো এটা দেখতে??? জানা গেলো না৷ 

(সিনেমাতে যদিও ফোন নম্বর আদান প্রদানের কথা এড়িয়ে যাওয়া হয় চিত্রনাট্যের খাতিরেই) 

সিকুয়েল এর ভাবনা এলো। এবারেও স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে জুলি জায়গা পেলেন না।
রিচার্ড ভাবলেন, সাক্ষাৎ তো হলো না, যদি হতো কেমন হতো , সে সব ব্যাপার নিয়ে আরো দুটো ফিল্ম বানাবেন- ঠিক হলো। যেখানে ছেড়ে গিয়েছিলেন হাফ ডজন উৎকণ্ঠা জড়ানো প্রশ্ন নিয়ে একদম অন্য জায়গা থেকে শুরু করলেন পরের ফিল্মটা — “Before Sunset” — জেসে (ইথান হক) সেই রাতের কথা স্মরণ করে বই লিখে ইউরোপে ফেমাস হয়ে গেছেন… প্যারিসের একটি বুক স্টোরে তারই পাঠ চলছে আর দেখলেন সেলিন (ডেলপি) বাইরে…! তারপর আবার গল্প,আবার কথোপকথন, আবার সেই রাতের উত্থাপন….! কখনও রাস্তায়, কখনো ফেরিতে….! লেখক তার কনফারেন্সের ফ্লাইট মিস করবেন??? সেলিনের কথা – “Baby you are going to miss the plane” দিয়ে শেষ হলো সিনেমা…..সূর্যাস্ত আর হলোই না। আবারও প্রশ্ন গুচ্ছেক। বাজিমাৎ করলেন পরিচালক।

Before Sunset
পথচলতি গল্পরা @ Before Sunset

পরের ফিল্ম৷ ২০১৩ “Before Midnight” এবার গ্রীস। সেলিনের আর তার দুই জমজ মেয়ে আছে। কেটে গিয়েছে প্রায় দশটা বছর। গ্রীসে গরমের ছুটি কাটাতে গিয়েছেন তারা….তারপর আবার কিছু গল্প, বয়স বাড়ার সাথে তাতে তিক্ততা যুক্ত হলো। এবার উত্তপ্ত কথোপকথন, পরিচালকের “Before Trilogy” র শেষ পর্যায় এটা। অসম্ভব রকমের, অন্য ধরনের কথোপকথন দিয়ে শেষ হলো সিনেমা। এবার হয়তো কোন প্রশ্ন আর পড়ে রইলো না, আগের দুটোর সাথে তুলনা করতে করতে অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই বেশ কিছু ব্যাপার অনুভূত হতে থাকারই কথা, যে যে বয়সে দেখবেন এই সিনেমা,তার সেই রকম ফিলিং আসার কথা, রিচার্ড একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন –

“I always said that the movie was a litmus test for how you view romance.” (New York Times, 2004)!

Before Midnight
এবার গল্প বলার পালা অন্যদেরকে @ Before Midnight

 

এতো দূর তো ঠিক আছে। কিন্তু…. তিন বছর একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক্, ২০১৩ থেকে। অর্থাৎ ২০১০ তখন।  ইতিমধ্যে বিখ্যাত তিনটি সিনেমা  অ্যামির এক বান্ধবী দেখেন…! বুঝতে অসুবিধা রইলো না। অনেক চেষ্টার পর পরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তখনই জানা যায় যে অ্যামি লেরহাউপ্ট ১৯৯৪ এ একটি মোটরকার দুর্ঘটনায় মারা যান, সিনেমা শ্যুটিং শুরুর ঠিক এক মাস আগে…..! ভাবা যায়। উনি চেপে দিলেন পুরো ব্যাপারটাকে।
২০১৩ তে Before Midnight এ আর কিছু বাকি রাখলেন না৷ শেষ পর্যন্ত দেখলে, দর্শক প্রথমবারের জন্য দেখতে পাবেন Dedicated to…… AMY LEHRHAUPT…..
স্ক্রিপ্টের জন্য জায়গা পেলেন জুলি ডেলপিও।

তবে কিছুটা অবাক করার হলেও এই সিনেমা বানানোর কথা পরিচালক তাদের প্রথম সাক্ষাতেই জানিয়েছিলেন তার প্রেমিকাকে।

Even as that experience was going on … I was like, “I’m gonna make a film about this.” And she was like, “What ‘this’? What’re you talking about?” And I was like, “Just this. This feeling. This thing that’s going on between us.”

সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন ঘটনাটা খুব দুঃখেরই ছিলো।

ভালোবাসার স্মারকটাই অ্যামি দেখে যেতে পারেনি….সত্যি এমনও হয়….!
সব গল্প তাই গল্প নয়, সত্যিও হয়….! এভাবেই বারবার “গল্প হলেও সত্যি”…….. সত্যিই হয়ে যায়। কুর্নিশ!!


© শুভঙ্কর দত্ত || April 21, 2019 

তথ্যসূত্র : https://slate.com/culture/2013/05/before-sunrise-inspiration-before-midnight-is-dedicated-to-amy-lehrhaupt-who-inspired-the-series.html

__________________________________________

★ সম্প্রতি পুড়ে যাওয়া নটরে ডাম চার্চ নিয়ে ভবিষ্যৎবাণীটা বড়োই মনে করিয়ে দেয় সিনেমাটাকে

20190416_122524
কথায় কথায় নটরে ডাম চার্চ @ Before Sunset