“অনল অন্তরাল” – পর্দার ওপারের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল…

শেখর স্যারের সাথে পরিচয় আসলে ঝাড়গ্রামের সূত্রে৷ তখন মাস্টার্স করছি ওখানে। স্যারের লেখাপত্র পড়েছি কিন্তু জানতাম না উনি আমার কলেজেরই অধ্যাপক। তারপর আমার ঘোরাঘুরির জন্য বিভিন্ন সময় পরামর্শ নিতে হয়েছে।

শারদীয়া আনন্দবাজার ১৪২৭ এ উপন্যাস তালিকায় শেখর মুখোপাধ্যায় নামটা দেখে তাই অপেক্ষা করতে পারিনি। হাতে পাওয়া মাত্রই শুরু করে দিই। বেশ বড়ো উপন্যাস এবং খুব সহজ নয় আবার! তার সবচেয়ে বড়ো কারণ চরিত্রের ভিড়…! অনেক কিছুই জীবনে অপাঠ্য আমার, তবুও বলতে দ্বিধা নেই যে এই কাহিনীতে ঘটনার ঘনঘটা আর চরিত্রের প্রাচুর্য আমি আর কোনো উপন্যাসে পড়িনি৷ তাও প্রথম থেকে একদম শেষ পর্যন্ত অদ্ভুৎ মাদকতায় আমি পড়েছি। রাত জেগে পড়েছি, পড়ে ঘুমিয়েছি আবার উঠে পড়েছি। এরকম তিনবার নিয়ে বসতে হয়েছে! আর শেষ দিকে তো প্রবল টান, যেনো ভাঁটার টান। অনেক কথা বললাম, উপন্যাসের নামটা বলা হয়নি, — “অনল অন্তরাল”! সভ্যতা কালক্রমে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু সমাজ – সভ্যতার পর্দা ক্রমশ পিছিয়ে গিয়েছে…. অতলস্পর্শী যে সে! সূর্যাস্তের পরে যেমন অন্ধকার নেমে আসে, রাঙা আলোর ওপারের গল্প অজানা! সেরকমই পর্দাপতিত হলেই নেমে আসে আঁধার! অজানা থেকে যায় ওপারের ঘটনাপ্রবাহ! লেখকের কলমে উঠে আসে যবনিকার পেছনে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা, কালের নিয়মে একদিন যা এগিয়ে নিয়ে এসেছে আমাদের আর নিজেরা রয়ে গিয়েছে পেছনে!

কাল বললে আবার সাল-তারিখ বলতে হয়। তবে এ উপন্যাসের কাহিনী আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগের এবং এখনও হয়তো প্রবাহমান! পড়তে যখন শুরু করেছিলাম তখন এর বিশালতা বুঝতে পারিনি, কি হতে চলেছে আন্দাজ করতে পারিনি৷

একজন সাড়া ফেলেদেওয়া, মরণাপন্ন লেখকের বহুদিনের গবেষণার উপন্যাস সমাপ্ত করার ডাক পড়ে অমিতজ্যোতি নামের এক নবাগতর কাছে…. শয্যাশায়ী রেবন্ত রায় তাকে সবকিছু হস্তগত করেন! এরপর এই কাঁচা লেখকের উপন্যাস যাত্রা শুরু হয়। উপন্যাসের শুরুয়াত যে সময় দিয়ে সেটা ১৭৩২ সাল! এবার ল্যাপটপে উপন্যাসের গল্প টাইপিং এর মাধ্যমে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে চলতে থাকে পুরো গল্প!
ক্ষমা করবেন, এর চেয়ে বেশি কিছু বলা অসম্ভব।
আসলে গল্পটা একটা বহু দিন আগের এক সম্পর্কের সূত্র খোঁজা!
তবে গোটা কাহিনীতে সে কালের কোন দিকটা তুলে ধরেননি লেখক, আমি সেটা ভাবছি! কত রকমের গান হতো, সে সবও উল্লেখ আছে। হরু ঠাকুর এর নাম আছে! বললাম তো কে নেই এখানে…!
তার সাথে আছে জটিল থেকে জটিলতর সম্পর্কের বুনোট যা মানে না দেশ কালের বেড়াজাল। সতীদাহ থেকে শুরু করে বিধবা বিবাহ – কি নেই সেখানে? এরকম বাস্তব প্রেক্ষাপটের গল্প! যেদিকেই যাই চেনা চেনা গন্ধ! পারাং নদী? সেও চেনা! শোভাবাজার রাজবাড়ি? সেও চিনি! আসলে ইতিহাস টুকরো টুকরো! তারই বা দোষ কোথায়? যে যার গুছিয়ে নিয়ে বাকি ফেলে রেখে দিয়েছে, সেই তো ইতিহাস, সেই তো হেরিটেজ!
নবাব আলিবর্দি থেকে শুরু করে হেস্টিংস – ক্যানিং কে নেই? রবার্ট ক্লাইভ! ডিরোজিও — সব্বাই! নাম নিতে গেলে এ লেখা উপন্যাসের এক তৃতীয়াংশ হয়ে যেতে পারে! নতুন করে অনেক কিছু জেনেছি! কিছুদিন আগে গৌতম ভট্টাচার্যের “বারপুজো” পড়ে বলেছিলাম যে এই বইটাকে কোলকাতার লোকজন আপন করে নেবে, এক্ষেত্রেও তাই! পুরনো কলকাতার আরো একটা দলিল হয়ে থাকবে হয়তো। যেমন জেনেছি ছড়াগুলোর মানে! “গোবিন্দরামের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, নকু ধরের কড়ি, মথুর সেনের বাড়ি!” সেরকমই জেনেছি কিভাবে মেদিনীপুর আলিবর্দি খাঁ এর সাথে জড়িত! জেনেছি নবকৃষ্ণ দেবের রাজা হওয়ার গল্প, জেনেছি বহুবাজার থেকে বউবাজারের গল্প! শোভাবাজার রাজবাড়িতে বলি বন্ধ হওয়ার গল্প!আরও অনেক কিছুই! বলে হয়তো শেষ করা যাবে না। গল্প জেনে গেলেও তথ্য জানতে বইটা আবার পড়া যেতে পারে!

সবচেয়ে ভালো লাগার কারণ, গল্পের স্টাইল! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ি, পড়ার পর বুঝতে পারি – সবটাই লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত, শুধু টুকরো টুকরো ইতিহাসটুকু সত্যি। এক্ষেত্রে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে যতটা বলা হয়েছে, ততটার কতটা সত্য সে আমি জানি না, তবে ইতিহাসের এতো চরিত্রের ভিড়ে, এতো গল্পের ভিড়েও এক অদ্ভুৎ নেশার ঘোরে চুবিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে “অনল অন্তরাল”! এত সব ঘটনার মাঝে একবারও বিরক্ত লাগেনি! আসলে এভাবে ইতিহাস পড়ার সৌভাগ্য হয়নি৷ আমাদের আনাচে কানাচের গলিপথে যদি এতো অচেনা অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে, তার আস্বাদ নিতে কার না ভালো লাগে? অন্তত যেখানে পরীক্ষা দেওয়ার মতো যাতনা থাকে না….!

কতগুলো জিনিসের জন্যে আমি কুর্নিশ জানাবো ঔপন্যাসিককে….
এক, তিনি পুরো বছর আড়াইশোর ঘটনাকে টুকরো টুকরো ইতিহাস দিয়ে দারুন কোলাজ বানিয়েছেন, মাঝে মাঝে নিয়ে এসেছেন আজকের দিনে!

দুই, এমন কাহিনী লিখতে গেলে কতটা অধ্যবসায় প্রয়োজন হয়, তা গল্পের পরতে পরতে যে কোনো পাঠক অনুভব করতে পারবেন!

তিন, গল্প একটা নির্দিষ্ট ক্রোনোলজি কে ফলো করে গেলেও তার দেওয়া তিনটি বংশপুঁজি না দিলে পাঠকের কালঘাম ছুটে যেতো, অবশ্য এই উপন্যাসের পাঠকদেরও কম পরিশ্রম করতে হবে বলে মনে হয় না। এই দিক থেকে পুরোমাত্রাই জড়িয়ে রাখতে সক্ষম…. যে যত বেশি জড়াবে সে তত পিছনে তাকাবে।

চার, শিল্পী অমিতাভ চন্দ্রের অলংকরণ! এমন চমৎকার অলংকরণ বারংবার মনে করিয়ে দেয় পাঠক ভুলে গেলেও! তবে আরও দু তিনখানা তুলির টান থাকলে দারুন লাগতো।

আমাদের চেনা পরিধির মধ্যেও এমন অনেক হয়তো গল্প রয়েছে যা আবহমান কাল ধরেই পর্দার ওপারে…..! অবশ্য এমন পর্দা ফাঁসে অদম্য ইচ্ছে লাগে…. অবশ্য সূত্রও লাগে তার জন্যে….! আবার সে অনলে দগ্ধ হওয়ার ভয় থাকলেও চলে না। “অনল অন্তরাল”, প্রায় তিন শতকের একটা শহরের বিস্মৃত ইতিহাসের জীবন্ত একখণ্ড দলিল হয়ে বেঁচে থাকুক বাঙালির হৃদয়ে….একজন ক্ষুদ্র পাঠক হিসেবে এই কামনা করি! প্রণাম জানাই স্যারকে…. তার অধ্যবসায়কে নতমস্তকে আবারও কুর্নিশ! তবে এবার হয়তো শালধোয়ানিয়ার জন্য অসংখ্য রেবন্ত রায় গজাবে, আর আপনাকে তাগাদা দেবে! যাই হোক্ আপাতত মলাটবন্দী অবস্থায় চাই এই উপন্যাসকে!

তবে এ উপন্যাস পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে জনৈক কবির উক্তিটি – ”যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন..!”অবশ্য এরকম মনে হওয়ার কারণ অজানা।

পুনশ্চঃ সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কথা বলেছেন। এই মানুষটির সাথে মনে হয় মন্দিরময় পাথরার যোগসূত্র আছে।

© শুভঙ্কর দত্ত || August 25, 2020

নগরকীর্তন – বাঁচার অধিকার ওদেরও…

সিনেমাটা কেন দেখতে চান?
‘নগরকীর্তন’ এর দুটো টিকিট চাইতেই টিকিট কাউন্টার থেকে ইন্টারভিউসম প্রশ্ন ধেয়ে এলো….
বাংলাসহ সারাভারতে আলোড়ন করা বিশেষ এই সিনেমা দেখতে চাওয়া দুই বন্ধুকে এক বৃদ্ধের এই প্রশ্ন।

বললাম – ‘কৌশিক গাঙ্গুলি আমার প্রিয় পরিচালক…..! একটু ইয়ার্কি মেরেই বললাম, বাকিটা দেখে এসে বলি…!
ভদ্রলোক হাসলেন।
বললেন শুধুই এই কারণ….?

বললাম — না আসলে ঋদ্ধি কেও ভালো লাগে, সেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ থেকেই ফ্যান!
বললেন — ‘কৌশিক গাঙ্গুলি প্রিয় পরিচালক, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হয় উনি নিজেকে ঋতুপর্ণর জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন!’

টিকিট কাটা হলো৷
আসলে একটা পরীক্ষা পড়েছিলো কলকাতায়, দুই বন্ধু মিলে ট্রেনে আসতে আসতেই একটা প্ল্যান মাথাচাড়া দেয়, আর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ১ কিমি দূরত্বে সিনেমাহলে ‘নগরকীর্তন’ চলছে। সুরজিৎ বললো – ‘এ সুযোগ হাতছাড়া করলে অ্যাচিভমেন্ট বলে কিছু থাকবে…?’ এরকম গোছেরই কিছু। অতএব, চলো, এগিয়ে যাওয়া যাক্। ব্যস্ ‘মিত্রা’ দাঁড়িয়ে আছে!

টিকিট তো কাটলাম, দেড় ঘন্টা বাকি এখনো। এদিক ওদিক ঘুরছি, কিন্তু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সিনেমাটা দেখতেই হবে, অতিশয় আগ্রহকে সঙ্গী করে।

——————————————————————
সিনেমা শুরুর আগে কিছু কথা উঠলো।
এই গল্প সেইসব প্রেমের গল্প, যে গুলো আর পাঁচটা প্রেমের মতো নয়।
ভেসে উঠলো Tributed To…. কে হতে পারে? আরে, নান্ আদার দ্যান ঋতুপর্ণ ঘোষ…!
ছবির নীচে ইটালিক্সে লেখা
“পরজনমে হইও রাধা….”
বুঝতে বাকি রইলো না। সদ্য ‘সমান্তরাল’ দেখেছি৷ কৌশিক গাঙ্গুলিও আগে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বানিয়েছিলেন, মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ৷ তবে কৌশিক গাঙ্গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। সত্যিই তো সিনেমাটা কেন দেখতে যাবো?
‘ছোটোদের ছবি’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘শব্দ’ কেন দেখতে গিয়েছিলাম বা কেন দেখেছি?
কারণ উনি অন্যদের কথা বলেন, অন্যকিছু বলেন, সবাই যেটাকে নিয়ে ভাবেন না, যাদের নিয়ে ভাবেন না, উনি তাদের কথা তুলেই ধরেন। তাই…….! এটা অবশ্য বৃদ্ধকে বলা হয়নি৷

পরিমল-পরি-পুঁটি (ঋদ্ধি সেন) এই গল্প একদিকে চলতে থাকে, আর একদিকে….পুঁটির প্রেম চলতে থাকে, প্রেমিকের ওপর ভরসা করে চলতে থাকে জলে থেকে কুমীরের সাথে লড়াই করার অব্যহতির খোঁজ। শৈশব থেকে মনের মধ্যে পুষতে থাকা নারীত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আবদার — “শরীরে ভুল আছে মধুদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী) , শুধরে নিতে হবে….!”
সমান্তরালভাবে দুটো গল্প বলায় একটুও বোরিং লাগেনি, ততটাই সাবলীল লাগলো শুভজিৎ সিংহের কাঁচি চালালনোটা, অবশ্য আগেও ‘ছায়া ও ছবি’, ‘মাছের ঝোল’, ‘বিসর্জন’, ‘শব্দ কল্প দ্রুম’ এর মতো সিনেমাগুলিতে একই কাজ করেছেন।

বহুদিন আগে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ পড়েছিলাম, বেশ লেগেছিলো, সিনেমাটা দেখতে দেখতে বেশ ওটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যদিও সেখানে গল্প ভিন্ন। তবে সেই উপন্যাসের একজনের উল্লেখ ছিলো বারবার, সিনেমাতে দেখি স্বমহিমায় তিনি উপস্থিত – মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালকের মুন্সীয়ানা চোখে পড়লো, সোমানাথ থেকে মানসী হওয়ার লড়াই – গল্প সবকিছু বলিয়ে নিলেন তার মুখ দিয়ে, শুধু তাই নয়, বলিয়ে নিলেন – শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণভাবে মজে যাওয়ার ঘটনাটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার ফলে সিনেম্যাটিক ভ্যালু বেড়ে যায় বলেই মনে হয়৷

সিনেমার দৃশ্যপট এতো বাস্তব যে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়েও এই সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও বারবার মনে হচ্ছিলো এটা বোধ হয় খুব সহজ একটা ঘটনা৷ মধুদের পৈতৃক বাড়ি – নবদ্বীপ, যেখানে চিত্রনাট্য পৌঁছানোর পর থেকেই একটা ক্ষীণ উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হতে বাধ্য দর্শকদের মনে, যেটা তীব্র হয়, যখন দোলপূর্ণিমার আসরে মধু বাঁশি বাজায়, আর পুরুষরূপী নারীমনের পুঁটির আসল রূপ আচমকাই প্রকাশিত হয়ে যায়।

এরপরও আরো ঘটনা……! ঘটতেই থাকে….! শেষ আধ ঘন্টা দর্শকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দিতে বাধ্য, ভাবাতে বাধ্য। সিটে আরাম করে বসে থাকা ঘুচিয়ে দিতে সফল এই সিনেমা। ওয়াটসআপ-ফেসবুকের মাধ্যমে কিভাবে কোনো ঘটনা ভাইরাল করা যায় তা দেখাতেও ছাড়লেন না। ‘নগরকীর্তন’ নামটা বেশ ব্যঞ্জনধর্মী বলেই মনে হলো, নগর বা সমাজে চলতে থাকা অহরহ ঘটনাপ্রবাহগুলোকেই বলা হচ্ছে এখানে।
ঋদ্ধি সেন কেন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, তার সদুত্তর মিলবেই, কস্টিউম-মেক আপের সাথে যেভাবে পরতে পরতে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন, অসাধারণ….! (তাই দুটো জাতীয় পুরস্কার কস্টিউম আর মেকআপে, নগরকীর্তনের ঝুলিতেই) সাথে আবার ঋত্বিক থাকলে তো পাশের লোককে ভালো অ্যাক্টিং করতেই হবে….! আর্ট ডিরেকশন প্রশংসনীয়। কীর্তনের সাথে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঁশিকে, অনেক দুঃখের মাঝে একটা আনন্দের চোরাস্রোত বয়ে যায় দর্শকের অলিন্দ বেয়ে…..! সৌজন্যে – প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি….! ভালো লেগেছে সুজন মুখার্জি ওরফে নীলকে, মধুর বৌদির চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী যতক্ষণ ছিলেন ফাটিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যটা৷

মন ছুঁয়ে যায়, কীর্তনের মাধ্যমে বলা – “তুমি আমারই মতন জ্বলিও…” এই অকপট কথা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে….! রাধার প্রেমে মজে নিজেকেই রাধারাণী করতে উদ্যত।

সবশেষে বলতেই হয় কৌশিক গাঙ্গুলি আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন নিজেকে। অভিনয়ও করিয়ে নিলেন তাদের দিয়ে। ওনারা আশাবাদী এ সিনেমা দেখার পর মানুষজন তাদের হয়তো এতেটা অবজ্ঞা করবেন না। যাদের একঘর করে রাখে সমাজ, তিনি বারবার তাদের উপস্থাপিত করে গেছেন, বলে গেছেন সমাজকে পাল্টে নিতে ভাবধারা, কয়েকজনের বাঁচার মতো সমাজ কি আমারা গড়তে পারিনা, শ্রেনীশত্রু সৃষ্টি করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না…!
হলের টিকিট কাউন্টারের বৃদ্ধ মানুষটির দোষ খুঁজে পেলাম না বিশেষ, কারণ এ সিনেমা সবার জন্য নয়, কৌশিক গাঙ্গুলি বলেইছিলেন, এ সিনেমা রোজগারের জন্য বানানো নয়, এগুলো বানানোর পেছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো বোঝেননি….কবেই বা বুঝবেন।

কবেই বা বুঝবেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কেন আছেন এ সিনেমায়, কেন উৎসর্গ করার জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির নীচে লেখা

‘পর জনমে হইও রাধা…..’

© শুভঙ্কর দত্ত || February 25, 2019 

একটা কনভারশেসন কল এবং… কর্ণগড়

PANO_20171229_145823
প্যনোরমাতে কর্ণগড় মহামায় মন্দির

কথা ছিলো মকর সংক্রান্তিতে কর্ণগড়, দ্বিচক্রীকে বাহন করে যাওয়া হবে!
কথা ছিলো বেলপাহাড়ী ঘুরতে যাওয়া হবে! সঙ্গ এবং সময়ের অভাবে বেলপাহাড়ী সিল্করুট আপাতত বন্ধ! কিন্তু ১৪ ই জানুয়ারির কর্ণগড় ভ্রমণকে একটা কনভারশেসন কল মারফৎ এগিয়ে আনতে হলো! পার্টনার? – সেই বছর দুয়েক আগে যে দুজন জুটেছিল। সৌমেন আর ইমতিয়াজ।

 

dS photography20171230_060449
প্রবেশমুখ থেকে…

 

dS photography20171230_060600
দণ্ডেশ্বর ও খড়্গেশ্বর জীউ মন্দির, প্রবেশদ্বার থেকে

 

বাসে করে ভাদুতলা, তারপর বাকিটা কর্ণগড় গামী বা শিরোমণিগামী অটোতে চেপেছিলাম মনে নেই, তবে হালকার ওপর ফেন্সি করে ভিড় ছিলো, প্রথমে কোথায় পা রাখবো, তা নিয়ে বেশ ধন্দে ছিলাম। যাই হোক্, অটো চলতে শুরু করতেই বসার জায়গায় ঠিকঠাক সেঁটে গেলাম।

 

দু বছর পর মহামায়া মন্দিরে এসে “জুতো স্ট্যান্ড” চোখে পড়লো! বহু বহু স্ট্যান্ড দেখছি, জুতো স্ট্যান্ড, এই প্রথম!কে জানে, হয়তো শেষ বারও। বছর দুয়েক রংটা এমনই কৃত্রিম ছিল কিনা মনে নেই মন্দিরের, তবে প্রথম যখন এসেছিলাম মন্দিরের রংটার মধ্যে একটা প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ ছিল। সে যাই হোক্, দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরিয়েছিলাম, কারণ আমাদের সাফসুতরো লক্ষ্যই ছিল ঘোরা আর ছবি তোলা! ওখানে যখন নামছি ইণ্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম বললো দুটো ১৭। তারপর প্রায় দেড় – দু ঘন্টা জুড়ে দাপাদাপি চললো। ফটো শিকার! মকরে এলে ছবি তোলাটা হয়তো ফিকে হয়ে যেতো কিন্তু সেই মহাপ্রসাদ! সে তো প্রাণ জুড়িয়েদিয়েছিলো, সেটা মিস করলাম, স্বাভাবিক। দু ঘন্টার শেষটা কাটলো ঐ পুকুর পাড়ে, সঙ্গে আগের বারের ট্রিপগুলোর স্মৃতি রোমন্থন! বেশ কেটে গেলো। আসার সময়, অটোচালককে জিগ্গেস করতে জানা গেলো – ‘এতো শুধু মন্দির, যে রাস্তা দিয়ে আমরা আসছি, ঐ রাস্তা দিয়ে মন্দির পেরিয়ে গেলে কর্ণগড় এর বিস্তৃত এলাকা চোখে পড়বে, তবে তেমন কিছুই আর নেই!” সবই অঅন্তঃসারশূন্য। তারপর ঠাহর হলো – হ্যাঁ তো, কর্ণগড়, একটা কেমন যেন সমাসবদ্ধ পদ ঠেকছে! চলো তবে একটু হাতড়ানো শুরু হোক্। শুরু করলাম। ওমনি গুগল ঝপঝপ করে কাঙ্খিত দু’খান লিংক দিয়ে দিলো! পড়ে যা জানলাম, বলার চেষ্টা করছি মাত্র-

 

IMG_20171230_071845
Descending….

 

dS photography20171230_062032
অস্তগামী সূর্যের সামমে

 

কর্ণগড়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। ইন্দ্রকেতু নামে এক রাজা এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ইন্দ্রকেতুর ছেলে নরেন্দ্রকেতু মনোহরগড় স্থাপন করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। রণবীর সিংহ নামে এক লোধা সর্দারকে রাজ্য শাসনের ভার দেন তিনি। অপুত্রক রণবীর সিংহ অভয়া নামে এক মাঝির ছেলেকে পোষ্যপুত্র করে তাঁর হাতে রাজ্য শাসনের ভার অর্পণ করেন। তারপর বংশপরম্পরায় রাজ্য শাসন চলতে থাকে।

কর্ণগড়ের যাবতীয় আকর্ষণ এই মহামায়া মন্দিরকে কেন্দ্র করে। মন্দিরে মহামায়া ও দণ্ডেশ্বরের বিগ্রহ রয়েছে। উৎকল শিল্পরীতিতে তৈরি মন্দিরটিতে পঞ্চমুণ্ডির আসনও রয়েছে। কর্ণগড়ের নিসর্গও মনোরম। গাছগাছালি, নদী দিয়ে চারদিক ঘেরা। মেদিনীপুর শহর থেকে জায়গাটি খুব বেশি দূরেও নয়। তাই এক সময় এই এলাকাটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, রাস্তা তৈরি হবে, হবে পার্ক। এবার গিয়ে অবশ্য কিছু কেমন প্রস্তুতি চোখে পড়লো। রাস্তা সারাইয়ের কাজও চলছে।

রয়েছে বলতে শুধু মহামায়ার মন্দির। সংরক্ষণের অভাবে বাকি সব হারিয়ে গিয়েছে। বহু খুঁজেও দু-চারটে ইটের বেশি কিছু মিলবে না। চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত রানি শিরোমণির গড়ের এখন এমনই দশা। গড় অর্থাৎ দুর্গের আর অস্তিত্ব নেই। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় শেষ অপুত্রক রাজা অজিত সিংহের। তাঁর দুই রানি ছিলেন ভবানী ও শিরোমণি। রানি শিরোমণি ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনদের এককাট্টা করে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এই জন্য ইংরেজদের কোপে পড়েন রানি। তাঁকে বন্দিও করা হয়। নাড়াজোলের রাজা আনন্দলাল খানের মধ্যস্থতায় চরম সাজা না হলেও তাঁকে আবাসগড়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

কর্ণগড় ছাড়াও আরও দুটি গড় ছিল রাজবংশের , আবাসগড় ও জামদারগড়। মেদিনীপুর শহরের উত্তরে বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তায় পড়ে। সেখানেও কিছু নিদর্শন মেলে। কিন্তু সময়ের চোরাস্রোতে হারাতে বসেছে সেইসব ইতিহাসের সূত্র। ১৬৯৩ থেকে ১৭১১ সাল প‌র্যন্ত এই গড়ে রাজ করেছিলেন রাজা রাম সিংহ। পরে রানী শিরোমনি এবং নাড়াজোলের রাজা মোহনলাল খাঁ এই গড়ের উন্নয়ন করেছিলেন।

 

মেদিনীপুর শহর থেকে উত্তর দিকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কর্ন রাজবংশের রাজধানী ছিল, তার প্রমাণ আজও মেলে। প্রধান গড় ছিল কর্ণগড়। মেদিনীপুরের প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার ব্যস ধরলে  বিস্তৃত ছিল । এই গড়ের নিজস্ব চরিত্রটি অদ্ভুত। জঙ্গলমহলের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে জলস্রোত নদীর আকার ধারণ করে  ‌যেখান দিয়ে বয়ে ‌যেত সেটি গড়ের অন্দরমহল। নদীটি খুবই ছোট, নাম পারাং। গড়ের দু দিক দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে একসঙ্গে মিলিত হত পারাং নদী। অনেকটাই পরিখার মতো। এই গড়ের মধ্যেই ছিল, কুল দেবতাদের মন্দির অধিদেবতা দণ্ডেশ্বর এবং অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভগবতী মহামায়া।

তবে মহামায়ার মন্দিরটি এখনও অটুট রয়েছে যেখানে বসে কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য সাধনা করতেন। প্রচলিত রয়েছে, এখানে বসেই রামেশ্বর শিবায়ন কাব্য রচনা করেছিলেন। রামেশ্বরের কাব্যে কর্ণগড়ের উল্লেখও রয়েছে
‘যশোবন্ত সিংহ/ সর্বগুণযুত/ শ্রীযুত অজিত সিংহের তাত। মেদিনীপুরাধিপতি/ কর্ণগড়ে অবস্থিতি/ ভগবতী যাহার সাক্ষাৎ।’

তবে রাণী শিরোমণি স্মরণে মেদিনীপুর শহরেই গেস্ট হাউস আছে, এমনকি ভারতীয় রেল রাণী শিরোমনির স্মৃতির উদ্দেশ্যে আদ্রা-হাওড়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনও চালু করেছে! গেস্ট হাউসের কথা কেউ মনে রাখতে না পারলে এই ট্রেনটির কথা তো অনেকেই জানেন!

 

 

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কর্ণগড় একদিনের ট্রিপ হিসেবে দারুণ! যতবার যাই, অনেক অনেক ছবি কুড়িয়ে আনি আর মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়, উৎসবের সময় না গেলে ওখানের নিরিবিলি প্রকৃতির শোভা বেমালুম উপলব্ধি করা যায়, আর মকরে গেলে তো পায়েসসহ উত্তম প্রসাদ খাওয়ার সুযোগ রইলই!

dS photography20171230_062355
ঘরের মধ্যে ঘর

IMG_20171229_155020
ফ্রেম-এ-ক্যামেরা

 

পথনির্দেশিকা:: মেদিনীপুর/খড়গপুর থেকে বাঁকুড়া রোড ধরে ভাদুতলা, তারপর আর বলতে লাগবে কি! অটোওয়ালারা উপস্থিত মহামায়ার অধিষ্ঠানে হাজির করানোর জন্য।

তথ্যসূত্র::
 আনন্দবাজার পত্রিকা
 (http://archives.anandabazar.com/archive/1140102/2med4.html)

 

DSC_0654
চলো এবার, ফেরার পালা….

ধ্যান ‘চাঁদ’ ফিরে আসুন…

১৯৩৫ সাল…
অ্যাডিলেডে একটি হকি ম্যাচ চলছে… দর্শক আসনে স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান, একজনের খেলা দেখে উচ্ছ্বসিত! বললেন – “He scores goals like runs in cricket…”

যাকে নিয়ে বলছেন তিনি মেজর ধ্যানচাঁদ! অবশ্য নামটা আসলেই ধ্যান সিং ছিলো। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন Indian Army তে যোগ দিলেন, তখন প্রখর দৃষ্টিশক্তি আর রিফ্লেক্সের জন্য চাঁদের আলোয় প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। মজা করে সতীর্থরা নাম দিলেন ”চাঁদ”, সেই থেকেই ধ্যান চাঁদ, নামের পরের “সিংহ” উবে গেলো। কিন্তু তার খেলা থেকে উড়লো না….! ছোটো থেকেই ধ্যানজ্ঞান ছিলো হকি স্টিকটা! পেয়ে গেলেন একটা রেজিমেন্টও, তখন চুটিয়ে হকি খেলা হতো সেখানে, হতো প্রতিযোগীতাও৷ কিভাবে সুযোগকে কাজে লাগাতে হয় সেটা ধ্যানচাঁদ শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। প্রথমে সুযোগ পেলেন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে, ব্যস্, নজর পড়লো জাতীয় নির্বাচকদের৷ চললেন কিউইদের দেশে, দুই ডজন থেকে মাত্র চারটে গোল কম করে সেই যে দ্বৈরথ শুরু হলো…. বাকিটা ইতিহাস৷ দেশে ফেরামত্রই আগে পেলেন Lance Nayak এর পদ।

খবরে…

আমস্টারডাম, অলিম্পিক – ১৯২৮
বেশ কিছু মাস আগে একটা খেলায় ইংল্যান্ড কে হারিয়ে দেওয়ায় ব্রিটিশরা কুটনীতি করে আমস্টারডামে ভারতীয় হকি দলকে পাঠালেন না, বেশ টালবাহানার পরে অবশ্য সেটা হয়। অবশ্য ১৯২৪ এর প্যারিস অলিম্পিকে পরিকাঠামোর অভাবে হকি রাখা না হলেও ১৯০৮ আর ১৯২০ এই দুবারই সোনার পদকটা পেয়েছিলো ব্রিটেনই! সুতরাং তাদের একটা ভয় ছিলোই। ভারতীয় দল প্র্যাক্টিস ম্যাচ থেকেই নজর কাড়তে শুরু করে। প্রথম ম্যাচ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ৬-০ তে জয়। তারপর একে একে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড এবং ফাইনালে ডাচরা! জয়ী ভারত! ধ্যানচাঁদ গোটা টুর্নামেন্টে করলেন ১৪ টা গোল। স্থানীয় সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হলো – “This is not a game of hockey, but magic. Dhyan Chand is, in fact, the magician of hockey.” এটাই অলিম্পিকে ভারতের প্রথম সোনা জয় এবং কোনো গোল হজম না করেই!

আমস্টারডামে প্রথমবার সোনার ছেলেরা

১৯৩২, লস অ্যাঞ্জেলস

প্রথম ম্যাচে জাপানকে ১১-১, ফাইনালে আমেরিকাকে ২৪-১…. এতো গোলের ফুলঝুরি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। সহোদর Roop Singh কে সঙ্গে নিয়ে দুই জনে মিলে গোল করলেন ২৫ টা। ক্রীড়াজগৎ আখ্যা দিলো Hockey Twins. দ্বিতীয় সোনা ভারতের সেই হকির হাত ধরেই।

Dhayn Roop Singh – the Hockey Twins

এরপর অধিনায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৩৩ সালে ভারতীয় হকির অন্যতম সম্মানজনক Beighton Cup এ Jhansi Heroes কে জেতান, পরেও অনেকবার বলেছেন সে ম্যাচটাই তার জীবনের প্রিয় ম্যাচ ছিলো, Calcutta Customs এর বিরুদ্ধে। তিনি বলতেন – If anybody asked me which was the best match that I played in, I will unhesitatingly say that it was the 1933 Beighton Cup final between Calcutta Customs and Jhansi Heroes. Calcutta Customs was a great side those days; they had Shaukat Ali, Asad Ali, Claude Deefholts, Seaman, Mohsin, and many others who were then in the first flight of Indian hockey.”

The Golen Era of Indian Sports

১৯৩৬ অলিম্পিক, আসর এবার বার্লিন, হিটলারের দেশে

বিভিন্ন দেশকে ৪০ টা গোল দিয়ে, একটিও হজম না করে ধ্যানচাঁদের ভারত ফাইনালে। গোটা বার্লিন শহর ভারতীয় দলের সাফল্য নিয়ে মজে গেলো। পোস্টারে ছয়লাপ সে শহরে – “Visit the hockey stadium to watch the Indian magician Dhyan Chand in action.” গোটা য়ুরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক উপস্থিত…। বলা হতে লাগলো – “The Olympic Complex now has a magic show too”.
ফাইনালে প্রতিপক্ষ – জার্মানি যারা ভারতকে প্র্যাকটিস ম্যাচে ৪-১ গোলে হারিয়েছিলো, একটু চিন্তিত ছিলো ভারতীয় শিবির। দলের ম্যানেজার পঙ্কজ গুপ্তা তখনকার দিনের একটা পতাকা আনলেন, যেটা জাতীয় কংগ্রেস ব্যবহার করতো, ত্রিরঞ্জিত! তেতে উঠলেন খেলোয়াড়রা! শুরু হলো খেলা! স্টেডিয়ামে অ্যাডলফ হিটলার! প্রথমার্ধে জার্মান গোলকিপারের সঙ্গে জোর সংঘর্ষে দাঁত খোয়ালেন ধ্যানচাঁদ, কিন্তু দমে যাননি! সতীর্থদের বললেন – ওদের উচিৎশিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে বল কন্ট্রোল করতে হয় ওদের শিখিয়ে দেবো৷ প্রথমার্ধে একটু আটকে রাখতে পারলেও, দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো সেই ধুন্ধুমার খেলা, নিজেদের অর্ধ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করলো জার্মানরা…. নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো The Wizard এবং কোম্পানি! ৮-১ গোলে জয় এলো, ফাইনাল জেতার হ্যাটট্রিক করে পরপর তৃতীয় বারের জন্য সোনা পেলো ভারত। উল্লেখযোগ্য অবদান দুইভাই ধ্যানচাঁদ সিং আর রুপ সিং এর।

The Wizard
হিটলারের দেশে সোনাজয়ী দল

এরপরেই সেই বিখ্যাত কথোপকথন, যা আজও ধ্যানচাঁদ কে নিয়ে কথা হলে বলতেই হয়। হিটলার এবং ম্যাজিশিয়ানের মধ্যে–

That conversation between Dhyan Chand & Hitler

হিটলারের প্রস্তাবের সামনেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে কথা বলেছেন তিনি৷ আবার বেশ মজার হলেও কোনো খেলায় গোল না করতে পারলে অভিযোগ জানাতেন গোলপোস্ট এর মাপ নিয়ে এবং দেখা যেতো যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তেমন ভুলটাই হয়েছে। ১৯২৬ থেকে ১৯৪৮ এর বর্ণময় কেরিয়ারে প্রায় ৪০০ র বেশি গোল করেছেন তিনি৷ তাঁর সম্মানার্থে দিল্লীর জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের নাম ২০০২ সালে পরিবর্তন করে করা হয়েছে Dhyan Chand National Hockey Stadium, দেশের বাইরেও এরকম নামকরণ হয়েছে৷ লন্ডনে একটি টিউব স্টেশন আছে তাঁর নামে, জিমখানা ক্লাবেও তিনি উজ্জ্বল অক্ষরে বিরাজমান। হকির জাদুকর বা ম্যাজিশিয়ানের জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই প্রতি বছর এই দিনটিকে ভারতবর্ষে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়, দেশের প্রতিটি কোণা থেকে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বদের পুরস্কার প্রদান করা হয় তাদের সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম গৌরবান্বিত করার জন্যে….

ধ্যান চাঁদ স্টেডিয়াম
রেজিমেন্টে…

১৯৫৬ সালে ভারতীয় আর্মি ছাড়ছেন যখন তখন তিনি ‘মেজর’…. আজ যখন ভারতীয় টিম অলিম্পিকে জায়গা পেতে হিমশিম খেয়ে যায়, তখন আমরা তাঁকে আমাদের দিবাস্বপ্নে অনুভব করতে চাই, করে ফেলি হয়তো…. তিনি শুধু সোনাই দেননি, এটাও বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন যে – হকি খেলেও বিশ্বে নাম কুড়ানো যায়। Happy Birthday, the Wizard!

ঝাঁসির এক পাহাড় চূড়োয়…

তথ্যসূত্র – কথোপকথন https://www.storypick.com/hitler-and-major-dhyan-chand/

ফিচার ইমেজ – Suchita Karmakar 🙏

© শুভঙ্কর দত্ত ✍ || August 29, 2020

শুভ জন্মদিন ‘ডন’…

সাল ১৯৭১
দক্ষিন আফ্রিকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ভর্স্টার এবং অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যানের বাদানুবাদ! বিষয়? — ক্রিকেটে জাতিবিদ্বেষ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা দল জড়িয়ে পড়ছে তাতে। কৃষ্ণাঙ্গদের জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না – এই নিয়ে সে দেশ তোলপাড়! ভর্স্টার এর মতে তাদের যোগ্যতা নেই। অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের তরফ থেকে চেয়ারম্যান জানিয়ে দিলেন – “We will not play them until they choose a team on a non-racist basis.” তিনি জন কে রীতিমতো ভর্ৎসনা করে জানিয়ে দিলেন — তিনি আদৌ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বা গ্যারি সোবার্সের নাম শুনেছেন?

Cut to
সাল ১৯৮৬
স্থান – পলসমুর জেলখানা….
তৎকালীন অষ্ট্রেলিয় প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম ফ্র্যাসের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে, সে দেশের জেলবন্দী সংগ্রামী নেলসন ম্যাণ্ডেলার সাক্ষাৎপ্রার্থী তিনি… তাকে দেখা মাত্রই ‘মাদিবা’ র প্রশ্ন –
“Mr Fraser, can you tell me, is Donald Bradman still alive?”

স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান! আজ ২৭ শে আগষ্ট, আজ তাঁর জন্মদিন, ১৯৭১ এর সেই ক্রিকেট প্রশাসক যিনি ক্রিকেটে জাতিবিদ্বেষের প্রবেশ করতে দেননি। পরিসংখ্যানের আতিশয্যে ডুবে থাকা ব্র্যাডম্যান যে শুধুমাত্র সেরা ক্রিকেটার ছিলেন, তাই নয়, দারুন মানুষও ছিলেন। প্রাক্তন অজি ক্রিকেটার ট্রেভর বেইলির কথায় উঠে আসে সেই কথায় – “He was perfectionist, good at everything he did and very nice man as well”, অবশ্য ম্যাণ্ডেলা আর ডনের কখনো সাক্ষাৎ হয়নি৷ মাদিবা জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ব্র্যাডম্যান তাকে একটা ব্যাট উপহার দিয়ে পাঠান, তাতে লেখা ছিলো – ‘To Nelson Mandela, in recognition of a great unfinished innings’
এরকমই অনেক গল্প আছে ডনকে নিয়ে, তেমনই কিছু পরিসংখ্যান গল্পের মোড়কে শোনা যাক্

ডন ব্র্যাডম্যান এবং তার প্রিয় সাথী

🏏 ৮০ টা ইনিংসে (১০ টা নট আউট) ৬৯৯৬ রান, গড় – ৯৯.৯৪, বলা হয় শেষ ইনিংসে শূন্যের বদলে তিনি যদি চার রান করেও আউট হতেন, তাহলেও তার সর্বকালীন গড় একদম তিনের ঘরে পৌঁছে যেতো। চার্লস ডেভিস নামক এক বিজ্ঞানী তার গবেষণায় দাবী করেন ডনের গড় ১০০ হওয়াই উচিৎ। স্কোরিংয়ের ভুলে ১৯২৮-২৯ অ্যাসেজ সিরিজের টেস্টে তাঁর একটা বাউন্ডারি নাকি জ্যাক রাইডারকে দিয়ে দেওয়া হয়। ওই বাউন্ডারিটা পেলে টেস্ট গড় ১০০ই দাঁড়ায়।

Sachin and Warne met Don on his 90th Birthday

🏏 এক ব্র্যাডম্যান পাগল গবেষক অনেক বছর রিসার্চের পর বলেন যে ডনের পূর্বসূরিরা ইতালীর লোক। পরে জানা যায় তার দাদু জাহাজি ছিলেন, উদ্দেশ্য ছিলো ডাচেদের দেশ কিন্তু পথ ভুলে চলে আসেন সিডনি। এই ভুলটা না হলে হয় তো এমন কিংবদন্তিকে পাওয়া যেতো না যাকে নিয়ে সে দেশের ক্রিকেটার বিল উডফুল বলেছেন – ‘ডন তিনজন অজির সমান’।

🏏 ১৯৪৮ সাল। ভারতে এক আঞ্চলিক দলের সাথে ক্রিকেট খেলছিলো মহারাষ্ট্রের দল, নিম্বলকর নামে এক ব্যাটসম্যান যখন ৪৪৩ রানে অপরাজিত তখন দুই দল এবং আম্পায়ার মিলে সেই ম্যাচটি আর না খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ? ডন ব্র্যাডম্যানে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান ৪৫২, তাই তাদের মনে হয়েছিলো এটা করাই বোধহয় সম্মান জানানো যাবে। একই ঘটনা ঘটেছিলো একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে, অধিনায়ক মার্ক টেলর ব্যাট করছিলেন ৩৩৪ রানে, অপরাজিত। ব্যাট না করার সিদ্ধান্ত নেন। তার মনে হয়েছিলো – ‘স্যার’ কে টপকানোটা ঠিক হবে না৷ কারন – ডন ব্র্যাডম্যানের টেস্ট কেরিয়ার এর সর্বোচ্চ স্কোর ৩৩৪…

সেই প্র্যাক্টিস

🏏 ডন এর শৈশব কেটেছে বাউরালে, সিডনি থেকে বেশ দূরে! তার জীবনের প্রথম শতরান তিনি এখানেরই একটা স্কুলে পড়ার সময় করেন ১২ বছর বসয়ে স্কুল ক্রিকেটে। এইখানের শেফার্ড স্ট্রিটে তাঁর বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দান করেছিলেন স্বয়ং শচীনও। বলা হয়, এখানেই একটা পুরোনো জলট্যাঙ্কিতে একটা স্ট্যাম্প দিয়ে আর গলফ বল দিয়ে প্র্যাকটিস করতেন, যা তার রিফ্লেক্সে সাহায্য করেছিলো।

Bradmanesque

🏏 ব্র্যাডম্যান প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে একই দিনে ২০০ বা তার বেশি রান করেছেন — এমন ঘটনা ২৭ বার ঘটেছে। সুতরাং, বলা যায় তিনি বোলারদের ওপর বেশ কর্তৃত্ব বজায় রেখেই খেলতেন। পরবর্তী কালে Collins English Dictionary তে ডনের এই ডমিনেটিং দৃষ্টিভঙ্গির সম্মানে “Bradmanesque” শব্দটি কে ঠাঁই দেওয়া হয়, যার অর্থ হলো বিপক্ষ দলের বোলারকে ডমিনেট করা।

🏏 প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট নিয়ে কথা উঠলে বলতে হয় — এই লোকটি ১০০টার বেশি শতরান করেছিলেন এবং সেটা ২৯৫ ইনিংসে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যাণ্ডের ডেনিস কম্পটন করতে নিয়েছিলেন মাত্র ৫৫২ টি ইনিংস!

🏏 ডনের সময়কালেই তাঁর তীব্র কম্পিটিটর ছিলেন ‘ওয়ালি’ হ্যামন্ড! গড়ের দিক থেকে তো তাইই। কিন্তু মজার কথা হলো ডন সারাজীবনে টেস্ট কেরিয়ারে কুড়ি ওভার বল করে দুটিই উইকেট পেয়েছিলেন এবং তার মধ্যে একজন ইংল্যান্ডের হ্যামন্ড৷ যদিও প্রথম শিকার ক্যারিবিয়ান ইভান ব্যারো।

🏏 ডনের অধরা রেকর্ডের মধ্যে একটা ৯৭৪ রান, পাঁচ ম্যাচের টেস্টে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে । যেটার কাছে গিয়েছিলেন একমাত্র ওয়ালি, ৯০৫ রান। তাছাড়াও টেস্ট সিরিজের সেরা গড় – ২০১.৫, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে, এটাও অধরা!

🏏 হ্যারাল্ড লারউড, ডগলাস জার্ডিন খ্যাত ১৯৩২-৩৩ এর বিখ্যাত বডিলাইন সিরিজের প্রথম টেস্ট থেকে ডন ব্র্যাডম্যানের সরে যাওয়া নিয়ে ইংল্যান্ড শিবিরে দারুণ হাসাহাসি চলতো। ডন ব্র্যাডম্যান অবশ্য মুখরক্ষা করেছিলেন – ৫ ম্যাচের এই অ্যাশেজ সিরিজে ব্যাটিং গড় ছিলো ৫৬.৫৭! জ্যাক ফিঙ্গলটন নামের এক অজি ব্যাটসম্যান বলেছিলেন – এই সিরিজ ব্র্যাডম্যানের স্টাইলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। বস্তুত এই সিরিজেই ডন জীবনে প্রথম এবং শেষবারের জন্য প্রথম বলে শূন্যরানে আউট হন! পরে লারউডকে এই সিরিজ নিয়ে জিগ্যেস করা হলে তিনি বলেন –
“Bodyline was devised to stifle Bradman’s batting genius. They said I was a killer with the ball, without talking into account that Bradman, with the bat, was the greatest killer of all.” 

সামরিক বাহিনীতে

🏏ব্র্যাডম্যান তার কেরিয়ার চলাকালীন দেশের মোট টেস্ট রানে ২৬ শতাংশই কন্ট্রিবিউট করেছিলেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ এই ছ বছর তার ক্রিকেট জীবন স্তব্ধ ছিলো কারণ তিনি ১৯৪০ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সে দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে, আবার Air Force এও ছিলেন।

Such an Australian Cricketer

🏏 ভারতীয় ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে ছয় ইনিংসে তাঁর গড় ১৭৮.৭৫, এই সিরিজেই একমাত্র ভারতীয় হিসেবে বিজয় হাজারে তাকে শিকার করেছিলেন। ১৯৪৭-৪৮ এর এই সিরিজের একটা আলাদা গুরুত্ব অবশ্য আছে। প্র্যাকটিস ম্যাচের পর বিল ব্রাউনকে ভিনু মানকড় একটি টেস্টে আবারও সেই বিতর্কিত ”মাকড়ীয়” রান আউট করেন। ধারাভাষ্যকার এবং সংবাদপত্রে ভারতীয়দের স্পিরিট নিয়ে প্রশ্ন ওঠে…! পরে ব্র্যাডম্যান তাঁর আত্মজীবনী “Farewell to Cricket” এ লেখেন – “For the life of me, I can’t understand why (the press) questioned his sportsmanship. The laws of cricket make it quite clear that the non-striker must keep within his ground until the ball has been delivered. If not, why is the provision there which enables the bowler to run him out? By backing up too far or too early, the non-striker is very obviously gaining an unfair advantage.”
এটাই স্যার ডন ব্র্যাডম্যান।

🏏 নামের আগে ‘স্যার’ কেন? কারণ তিনি ‘নাইটহুড’ সম্মানে ভূষিত এবং এখনও পর্যন্ত এই উপাধিতে ভূষিত একমাত্র অস্ট্রেলিয় তিনি৷

🏏 নার্ভাস নাইন্টিন নিয়ে আমরা কত কথা বলি। তিনি কখনো ৯০ এর ঘরে গিয়ে আউট হননি৷ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে অন্তত তাই-ই।

🏏 অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত প্রদেশ এবং প্রদেশের রাজধানীতে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটবোর্ডের যে অফিস আছে সব অফিসের পোস্টঅফিস নাম্বার ৯৯৯৪। এটি স্যার ডনের ব্যাটিং অ্যাভারেজ ৯৯.৯৪ এর সম্মানে।

PO – 9994

🏏 আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে মোট ছটা ছয় মেরেছিলেন, তার মধ্যে একটা ভারতের বিরুদ্ধে আর বাকিগুলো ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে। মজার কথা হলো সারাজীবনে তার বাউন্ডারি আর ওভার বাউন্ডারির পাশে দুটো পাঁচ রানও আছে।

🏏 ১৯৭৮ এর দিকে, ডনের অ্যাডিলেডের বাড়িতে আড্ডাতে এককালের বিশ্বত্রাস জেফ থমসন। রসিকতা করে একজন বলেন আজকের ডনকে কি থামাতে পারবেন থমসন! তৎক্ষনাৎ চ্যালেঞ্জ লুফে নেন দুইজনই! তবে নিরাশ হতে হয়েছিলো জেফকেই। মানে খেলা ছাড়ার তিরিশ বছর পরেও এমন রিফ্লেক্স দেখে তাজ্জব বলে গেছিলেন জেফ, যিনি সবে আট বা ন বছর রিটায়ানমেন্ট নিয়েছেন।

পিয়ানোবাদক

🏏 স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান এর ক্রিকেট শিল্প নিয়ে তো বিস্তর কথা হয়। কিন্তু তিনি আর্টিস্ট ছিলেন যথেষ্টই! ২০১৮ তে আইসিসি একটি প্রতিবেদন বের করে – A Band Of Cricketers, তাতে দেখা যায় মিউজিকের প্রতি তার আগ্রহ। 1930 সালে ”Everyday is a rainbow day for me” বলে একটা গানের রেকর্ড পাওয়া যায়, পিয়ানোবাদক হিসেবেও তার রেকর্ড আছে, ‘Old fashioned locket’ এবং ‘Our bungalow of dreams’ এবল দুটিই ১৯৩০ ইংল্যান্ড সফরে, কলম্বিয়া রেকর্ড স্টুডিও তে করা সেসব। এইসব জিনিসপত্র অবশ্য অনেকদিন চাপা পড়েছিলো, ডোনাল্ড এর নাতনি এগুলো উদঘাটন করে।

🏏 শুধু তাই নয়৷ ১৯৩৬ সালে National Production Ltd.এর সাথে তার চুক্তি হয় এবং সে চুক্তি অনুযায়ী – কোনো সিনেমায় ক্রিকেট খেলার দৃশ্যে তাকে অভিনয় করতে হবে, মানে প্রধানত তার খেলার দৃশ্য দেখানো হবে৷ এই মর্মে একটাই মাত্র পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিতে দেখা যায় — “The flying Doctor”, সেখানে দিনের শেষে নায়ক (যিনি দর্শক) একজন খেলোয়াড়ের সাথে হাতাহাতিতে জড়িয়ে জেলখানার পথ দেখবেন। এই সিনেমার একটি দৃশ্যে ডন ব্র্যাডম্যানকে খালি গায়ে দেখার সৌভাগ্য হয় দর্শকদের।

ফিল্মে ব্র্যাডম্যান

🏏 রাস্তাঘাট তো নামকরণ করা হয়ই। কিন্তু ব্র্যাডম্যানকে শ্রদ্ধা জানাতে সেদেশের একটা ”বোয়েয়িং” এয়ারক্রাফট কে স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয় গন্ধে ও বর্ণে অতুলনীয় Meilland International SA Breed নামের এক গোলাপ ফুল এর নাম Sir Don Bradman Rose রাখা হয়েছে।

এটিই সেই বিখ্যাত গোলাপ ফুল

🏏 তিন ইনিংসে ৫০ গড় শুরু, তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি, সবসময়ই ৫০ এর বেশি গড় থাকা কিংবদন্তীর স্কুল জীবনে প্রিয় বিষয় ছিলো গণিত।

🏏 তার শৈশবে বাড়ি যেটা বাউরালের শেফিল্ড স্ট্রিটে, সেখানে সম্প্রতি একটি ক্রিকেট মিউজিয়াম খোলাও হয়েছে। একটি মূর্তিও আছে এখানে, মেলবোর্ন আর অ্যাডিলেডেও মূর্তি আছে এই কিংবদন্তীর৷

বাউরাল, শেফিল্ড স্ট্রিটে বাড়ি – এখন মিউজিয়াম

🏏 ডনকে নিয়ে অনেকে প্রশস্তি বাক্য শোনা গেলেও, আমার কাছে ওয়ালি হ্যামন্ড এর উক্তিটি সেরা, তখন ওয়ালি ক্যাপ্টেন — “I was forced to admire the cool way Don batted. On one or two occasions, when he was well set, and when he saw me move a fieldsman, he would raise his gloved hand to me in mock salute, and then hit the next ball exactly over the place from which the man had just been moved. Reluctantly I had to admit once more that he was out of the ordinary run of batsmen – a genius!”

জিম লিকার এর ভাষ্যে…

🏏 তবে এতো প্রশংসার পরেও স্বদেশীয় বোলার রডনি হগ বলেছেন যে ব্র্যাডম্যান এই যুগে খেললে হয়তো সেরা গড়ে পৌঁছাতে পারতেন না৷ রেডিওতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন – “Sir Donald Bradman was a freak, but I don’t think he would have averaged 99 now.”

ক্রিকেটার, নির্বাচক এবং ক্রিকেট প্রশাসক প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ‘ডন’ ছিলেন, স্বীকার করে নিতেই হবে৷ নিজের খেলার স্টাইল নিয়ে জিগ্যেস করলে বলতেন – “Predominately a back foot player” কিন্তু ৯২ বছরের জীবনে কখনো তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি।

শুভ জন্মদিন, স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান৷

আবক্ষ ব্র্যাডম্যান

© শুভঙ্কর দত্ত ✍ || August 27, 2020

তথ্যসূত্র ::

১. আইসিসির প্রতিবেদন – https://www.icc-cricket.com/news/630331

২. নেলসন ম্যান্ডেলা সংক্রান্ত – https://www.news.com.au/nelson-mandela-from-his-prison-cell-can-you-tell-me-is-donald-bradman-still-alive/news-story/a69c4ff23df3f8767079ad1e42fb6e49

৩. শৈশবের বাড়ি – https://www.anandabazar.com/supplementary/anandaplus/special-write-up-on-don-bradman-by-gautam-bhattacharya-1.130014

৪. হগের জবানি – https://sportstar.thehindu.com/cricket/international/bradman-would-not-have-been-as-successful-today-rodney-hogg/article9528527.ece

৫. এছাড়াও অনেক দিন আগে পড়া বেশ কিছু পত্রিকা

শতবর্ষেও ‘জীবন্ত মানুষ’ – ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

“মাসিমা মালপো খামু”
“ভোলা গুঁতো”
“আপনি অত্যন্ত পেট পাতলা লোক”
“আমরা গোরুর কেস করি না”
“আপনার ডাক্তার না হয়ে মোক্তার হওয়া উচিৎ ছিলো”

জন্মশতবর্ষে ”জীবন্ত মানুষ”…

বাংলা সিনেমা জগতের এরকম আরও অনেক সংলাপ দিয়ে তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন….! আজ তাঁরই জন্মের শতবর্ষ! ২৬ শে আগষ্ট, ১৯২০ খৃষ্টাব্দে তিনি বাংলাদেশের (তখন সবটাই ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া) মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মোক্তার আর মা সুনীতাদেবী শিক্ষা দপ্তরের চাকরি করতেন! সরোজিনী নাইডুর আত্মীয়া তিনি আবার! অবশ্য এমন হাসাতে পারেন যিনি তার জন্ম যে পূর্ববঙ্গে হবে এমনটাই তো স্বাভাবিক, যদিও বাপ মা প্রদত্ত নাম ছিলো সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। “সাম্যময়” থেকে “ভানু” হয়ে ওঠার গল্পটা এতো সহজ নয় অবশ্য! হতে পারতেন অভিনেতা বাদে অন্যকিছু – স্বদেশী বা বিপ্লবী বা হয়তো পার্টির সর্বময় কর্তা কিন্তু হলেন কি? ‘কমেডিয়ান’ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। বলতেন — ছিলাম ‘বাঁড়ুজ্জে’, হয়ে গেলাম ‘ভাঁড়ুজ্জে’…! অবশ্য শুরুটা এভাবে হয়নি। খুব ছোটবেলা থেকেই গুরু মানতেন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত কে। ছোটবেলা থেকেই তার সাইকেলে চেপে ঘুরেছেন বিস্তর। শুধু তাই নয়, বুকের মধ্যে নিষিদ্ধ বই চেপে বা টিফিন বক্সে রিভলবার নিয়ে ঘুরেছেন, পাচার করেছেন। দীনেশ গুপ্ত মারা যাবার পর জড়িয়ে গিয়েছিলেন অনুশীলন সমিতির কাজে। তখন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে, বিজ্ঞানী সত্যেন বসু, রমেশচন্দ্র মজুমদার বা কবি জসীমউদ্দিনের প্রিয় ছাত্র তিনি, এদিকে পুরোমাত্রায় জড়িয়ে পড়েছেন স্বদেশী আন্দোলনে, হুলিয়া জারি হল তার নামে, ছাড়তে বাধ্য হলেন বাংলা, তাও আবার এক বন্ধুর গাড়ির ব্যাকসিটের পাদানিতে শুয়ে! ভাবা যায় এ পার বাংলায় আগমণটাও তার এরকম নাটকীয়ভাবে হয়েছিলো। এরকম স্বদেশী করা লোক কর্মজীবনের প্রথম দিকে অভিনয় করে বেড়ালেন বেশ কিছু নাটকে, অতঃপর পরিচালকদের নজরে পড়েন। প্রথম ছবি অবশ্য ‘জাগরণ’, ১৯৪৭ সালে, পরিচালক বিভূতি চক্রবর্তীর ডাকে স্টুডিওতে গিয়ে হাজির। পরিচালক বলে বসলেন দুর্ভিক্ষপীড়িত চিমসে চেহারা চরিত্রে তাকে অভিনয় করতে হবে৷ জানতে চাইলেন ভানু রাজি কিনা! ভানু ‘হ্যাঁ’ করতে দেরী করেননি। আসলে তখন ভানু বেশ রোগা ছিলেন, সেটা আমরা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ দেখলেই বুঝতে পারি। সাড়ে চুয়াত্তরেই ভানু প্রথম সাড়া ফেলে দেন, তার কারণ এক ঝাঁক নতুন অভিনেতা – অভিনেত্রীর কেরিয়ার শুরু হতে চলেছে একই ছায়াছবি দিয়ে কিন্তু ভানুর দিশি স্টাইলের কথাবার্তা তাকে আলাদা করে চিনতে বাধ্য করেছিলো। “মাসিমা মালপো খামু” – সংলাপটি তাই আজও প্রতিটা বাঙালির মুখে মুখে। রোগা চেহারার ভানু সেই প্রথম এক ঝাঁক জাত শিল্পীর মাঝেও নিজের স্বতন্ত্রতা তুলে ধরতে পেরেছিলেন, এই ছবি যদি ভালো করে দেখে থাকেন, তাহলে বুঝবেন যে একজন শিল্পী প্রতিটা আলাদা সিচুয়েশন মোতাবেক কেমন হাসাতে পারেন, এদিক থেকে তার মতো সিচুয়েশনাল কমেডিয়ান অভিনেতা বাঙালি আর দেখেনি! শুধু অভিনয় করে হাসাতেন না, বরং আজকাল ওগুলো দেখলে যেনো মনে হয় উনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন – এটাই কমেডি অ্যাক্টিং, আর পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন ওনার হাসানো আর কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর মধ্যে। “সাড়ে চুয়াত্তর” এ মেসের মিটিং এ কেদারের উপস্থিতি, আমার মতো মেসে থাকা পাবলিকদের কাছে আদর্শ হয়ে থাকবে বোধ হয়। এর পর বেশ কিছু ছবি করলেও, কয়েকটি ছবি আজ অমরত্ব লাভ করেছে, যেমন – ”যমালয়ে জীবন্ত মানুষ”, ”৮০তে আসিও না”, “ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট”, “ভানু পেলো লটারি”, ”পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট”, “মিস প্রিয়ংবদা”…. এর মধ্যে কিছু কিছু ছবিতে ভানুই হিরো আবার টাকাও উনিই ঢেলেছেন। কিন্তু কতগুলো কমেডি, কতগুলো রোমান্টিক কমেডি, আবার বেশ কয়েকটি ছবিতে ভানু-জহরের যুগলবন্দী আমরা দেখতে পাই।

কেদার এর চরিত্রে ভিড়ের মাঝে


“যমালয়ে জীবন্ত মানুষ” নিয়ে কথা বলতে গেলে শেষ হবে না….. স্বর্গলোকে যমালয়ে ভুল করে তুলে এনে যে কি বিপদ করেছে সেখানের কর্মীরা…!একজন জীবন্ত মানুষ ধরে ধরে ভুল ধরছেন যমরাজ থেকে চিত্রগুপ্তের…। সিস্টেম বদলাতে বদ্ধপরিকর তিনি। সহাস্যে বলছেন ‘যতদিন আছি বুঝলে বিচিত্রগুপ্ত, অপঘাতে মৃত্যু নিয়ে একটা বিহিত করে যাই…’। বিপ্লবী অনন্ত সিংহ ছিলেন ছবির প্রযোজক — তার প্রথম দুটো সিনেমা ফ্লপ করলে, ভানু তাকে বরাভয় দেন। বাকিটা আমরা দেখতে পেয়েছি, আমার তো মনে হয় সিনেমাটা যতটা রোম্যান্টিক কমেডি তার চেয়ে বেশি স্যাটায়ার! স্বর্গলোকের প্রতিটা চরিত্রের সাথে তার কথোপকথনগুলো আলাদা আলাদা ভিডিও ফাইল করে রাখতে ইচ্ছে করে…. তিনি বলছেন – “সেবাই তো আমার ধর্ম, তার ওপর আমি আবার মানুষ!” একবারও ঐ চরিত্রে ভানু ছাড়া ইহ জগতের আর কাউকেই কল্পনা করা কষ্টের ব্যাপার। সিনেমাটি অবশ্য একটি হলিউড ফিল্ম থেকে অনুপ্রাণিত কিন্তু কে ওসব মনে রেখেছে। আবার এই সিনেমাতেই ভানুকে আমরা পেয়েছি দারুন রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে…. মাধুরী – সিদ্ধেশ্বর এর প্রেমের দৃশ্যগুলো যেমন রোম্যান্টিক, তেমনই কমেডির। তার প্রেমিকা প্রেম করতে গিয়ে ভক্তিমূলক গান গাইছে, সেখানে পাশে বসে ভানুর মুখের অভিব্যক্তি গান শোনা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য। আবার ভানু-জহরের ঐ অপঘাতে মৃত্যু নিয়ে যে দৃশ্যটা ওটাও অসামান্য….ডুবলো কিন্তু মরলো না, অথচ সাঁতারও জানে না। উর্বশীকে নাচ শেখানোর দৃশ্য — ‘হাম হাম গুড়ি গুড়ি’ নাচ! এই সিনেমাটা দেখার পর ঐ ছোটোবেলাতেই যে এই নামটা নিয়ে কতবার হেসেছি, গুনে শেষ করা যাবে না, এমনকি এখনও! সেখানে নাচের নাম জিগ্যেস করতেই সিধুর অকপট স্বীকারোক্তি – “আগ্রহই হচ্ছে নাচের প্রধান অঙ্গ”, “নাচের একটা ভালো নাম থাকলে আর নাচতেই হয় না…”! এই জায়গাটাই চোখ ফেরানো যায় কি? যায় না।

সিধু হয়ে যমালয়ে

এরপর কথা বলতে গেলে “৮০ তে আসিও না” নিয়ে বলতে হয়, সেখানে আবার সমাজের এক অন্য রূপ, ব্যঙ্গের মাধ্যমে। এক বৃদ্ধের যুবকে পরিণত হয়ে যাওয়ার গল্প, আসলে গল্পটা কিন্তু অন্য – একজন বৃদ্ধের প্রতি তার ছেলেমেয়েদের অবহেলার গল্প। এই সিনেমাতেও ভানু আর রুমা গুহ ঠাকুরতার রসায়ন দেখার মত। “আমি এখন জল পুলিশের আন্ডারে” — এই সংলাপটিকে ভানু ছাড়া অন্য কেউ অমরত্ব দিতে পারতেন কি? মনে হয় না পারতেন বলে। আবার এ ছবিতে জহরও আছেন।

জল পুলিশের Under এ

“পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট” আরও একটা ছবি যেটা ভানুর নিজের ছবি, একদমই নিজের, রমাপদ গুপ্ত থেকে রমা গুপ্ত আর মিনতি মিত্র হওয়ার গল্প কোন্ ভানুপ্রিয় দর্শকের মনে নেই! ঐ ছবিতে মেদিনী দেবীর বাড়িতে পিয়ানো বাজানোর দৃশ্য আজও পেটে খিল ধরাতে বাধ্য, তরুন কুমার আর ভানুর বন্ধুত্বের যে সমীকরণ ছবিতে দেখতে পাই, সেটা দারুন লাগে। টাইপিং টেস্টের সময় ভানুর ভেকগুলো তীব্র হাসির উদ্রেক করে আট থেকে আশি – সবারই। এই ছবিটা অবশ্যি করার কথা ছিলো উত্তমকুমারের, কিন্তু মনমতো স্ক্রিপট না পাওয়ার কারণে তিনি সরে দাঁড়ালে ভানুর কাছে অফার আসে, লুফে নেন ভানু৷ নচিকেতা ঘোষ গান লিখে ফেলেছেন উত্তমকুমার আছে জেনে…. ভানু স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শুনে তিনি বলেছিলেন – যা ব্বাবা, ভানু থাকবে জানলে আমি গানই লিখতাম না। অবশ্য সিনেমা দেখে প্রশংসাই করেছিলেন।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গল্পের অভাব নেই। তার বাড়িতে বসতো চাঁদের হাট। কে আসতো না? উত্তমকুমার থেকে সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী থেকে অনুপ কুমার, সোমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বিকাশ রায়কে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, উনি বাড়ি এলে নাকি ওনার পাশে বসতেন না, বসতেন পায়ের কাছে। ছবি বিশ্বাসও ছিলেন ভানুর ভীষন কাছের মানুষ, দিন দুবেলা ভেনোর বাড়ি আসা চাই-ই চাই। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিতে ছবি বিশ্বাস আর তুলসী চক্রবর্তীকে নেওয়া একরকম বাধ্যতামূলকই ছিলো।

রমাপদ থেকে রমা হয়ে মিনতি মিত্র

তারপর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিট্যান্ট’ সিনেমাতেও সেই জুটি। বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে কমেডি সিনেমা বললে এটা আসবেই….! আমি জানি না এরকম আসল নামেই অভিনেতার ভাগ্যে চরিত্র জুটেছে ক’জনের কপালে! ঐ ফিল্মে ‘কমলা’ তদন্ত উদঘাটনে আসা বৃদ্ধার সাথে ভানু – জহরের দৃশ্যটা দেখবার মতো। ভানুর মুখভঙ্গি আলাদা মাত্রা দেবে যখন বলবে “দুধ!, দুধ দেয়?” বা ”আমরা গোরুর কেস করি না”….. এগুলো সবই চলন্ত ফ্রেম হয়ে থাকবে!

আসল নামেই চরিত্র – অভিনয়

‘ভানু পেলো লটারি’ র প্রথমেই জহরের আগমণ আর ঐ ‘জহুরে’ বলে ডাক্ বলেই দেয় অফস্ক্রিনে তাদের বন্ধুত্বের গাঢ়ত্ব কতটা ছিলো। তখন খুব ছোটোবেলা, টিভিতে দিতো সিনেমাটা৷ ‘আমার এই ছোট্ট ঝুড়ি’ গানটাতে ভানুকে দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকতাম, এই ছবিতে ভানুর গোঁফটাই ছবির ডিএনএ। সাথে, জহরের পাশে একফ্রেমে বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তারপর দুই ভানু সামনে আসার পর তো আরোই হাস্যকর।

ভানু তখন মধ্যগগণে…

ভানুর আরও একটি হিট ছবি “মিস প্রিয়ংবদা”, হাসির দৃশ্যের জন্য আগের ছবিগুলোর সাথেই যেটাকে স্মরণ করা হয়। বামা চরিত্রে তিনি যে বহুমুখী একটা অভিনয় করেছিলেন, সেটা দেখলেই মনে হয় কত বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন…. তরুন কুমারের সাথে গলায় কাঁথা গলিয়ে ধূমপানের দৃশ্যটি বেশ হাস্যকর! মানে উনি যে চরিত্রটা করতেন, তাতে বাঁচতেন, আগের সবগুলোকে সেই মুহুর্তে ভুলিয়ে রাখতে পারতেন। সেরকমই একটা দৃশ্যে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন যেখানে প্রিয়ংবদা নামের মহিলা সেজে তিনি হরিধন বাবুর কাছে যাবেন তাকে পটাতে! এ দৃশ্য দেখার পর ঐ সিনেমার আগের হাসির দৃশ্য কিছুই আর মনে থাকে না।

তরুন – ভানু জুটিতেও

অনস্ক্রিনের ভানুর সেন্স অব হিউমর নিয়ে কথা বলি আমরা কিন্তু মানুষটার পর্দার বাইরের রসবোধ নিয়েও অগাধ কাহিনী আছে। ইষ্টবেঙ্গলের ভক্ত ছিলেন, শচীন দেব বর্মনের সাথে খেলা দেখতে গিয়ে তার থেকে ঝেঁপে খেয়েও নিতেন। ম্যান ম্যানেজার ছিলেন দারুন। শ্যুটিং এ তাকে দেখতে ভিড়! সামাল দিলেন ভানু! ঢাকার হস্টেলে পুজোর খাওয়া নিয়ে গোলমাল….. ভানু এলেন এগিয়ে, উচ্চকণ্ঠে ঘোষনা – কাউকে খাওয়ার দরকার নেই। রসিকতা করতেন গলা ছেড়ে…. প্রায়শই আড্ডাতে বলতেন – ‘‘আমার দশা ক্যামনে শুনেন। মা মারা গ্যাছে। শ্মশানে গেছি। চোখে জল। একটা লোক কাছে আইয়া কইল, আরে ভানুদা কী হইসে? কোনওক্রমে কইলাম, ভাই মা মারা গ্যাসেন। শুইন্যা হাসতে হাসতে চইল্যা যাইতে যাইতে কইল, ‘দ্যাখ, ভানুরে কাঁদলে কেমন লাগে!’ বুঝেন একবার! হালা, নিজে যখন শ্মশান যামু লোকে দেইখ্যা বলবে, ওই দ্যাখ, ভানুর মাথাটা কেমন নড়তাসে!’’ এইসবই তাঁর ভাগ্যবান পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্যে পড়ি আনন্দবাজারে। কোলকাতা তার এতোটাই প্রিয় ছিলো যে মুম্বইয়ের ডাক প্রত্যাখান করেছেন সহজেই। গুরু দত্তের ‘পিয়াসা’ র অফার ছেড়েছিলেন। তবে বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ‘বন্দীস’, ‘মুসাফির’ সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন। আসলে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন আদ্যোপান্তো দেশীয় সংস্কৃতির মানুষ, চার্লি চ্যাপলিনের স্টাইলটাকে পুরোমাত্রায় দেশীয় স্টাইলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। বিকাশ রায়, ছবি বিশ্বাস এরা ছিলেন ওনার দাদার মতো, গুরু মানতেন…আর জহর? লোকজন ভাবতো এদের খুব কম্পিটিশন কিন্তু একটা ঘটনা সে সব তোয়াক্কায় করতে দিলো না — ভানু গাড়ি কিনেছে, স্টুডিও তে জহর সবাইকে ডেকে বলে দিলো — ভেনোই একমাত্র যে বাংলাদেশে কৌতুক অভিনয় করে গাড়ি কিনেছে। এটা ওর একার গাড়ি নয়, ভেনো প্রতি শনিবার আমার জন্য গাড়ি পাঠাস….. শারদীয়া এই সময় এ এটা পড়েছিলাম। আর ভানু সত্যিই তেল ভরে গাড়ি পাঠিয়ে দিতেন, নিজে ব্যস্ত থাকতেন, ট্যাক্সি তে চড়তেন আর জহুরে চষে বেড়াতো শহর। ভাবা যায়! আমরা শুধু রুপোলি পর্দায় দেখেই আহ্লাদিত হয়ে যায়!

পার্শ্বচরিত্র হলেও সমানে নজর কেড়েছেন

সেই কত ছোটোবেলায় দেখেছিলাম ‘ভ্রান্তিবিলাস’, এখনও মনে আছে তার “কিংকর” চরিত্রটাকে.. ঐ নিশিতে ডাকার সিনে তার যে অভিব্যক্তি এখনও চোখে লেগে আছে। “চৌরঙ্গী”র শাজাহান হোটেলের সবাইকে ভুলে গেলেও ভুলতে পারবো না ন্যাটাহরি কে! ঐ কোঁকড়ানো চুল আর গোল চশমার ছবি দেখলে যে কেউ বলবে ওটা নিত্যহরির অবয়ব। এগুলো সবই ভানুর পার্শ্বচরিত্র কিন্তু তাতেও দাগ রেখেছেন সমানে। ‘পাশের বাড়ি’ বলে একটা ছবি করেছিলেন কেরিয়ারের প্রথম দিকে, বেশ কিছু বছর পরে হিন্দিতে ‘পাড়োসান’ হচ্ছে, মেহবুব তো ভানুর কাছে চলে এলেন পরামর্শ নিতে, একই রোল যে। সাড়ে চুয়াত্তর এর কাজ দেখে কেষ্ট মুখুজ্জে প্রায় কোলে তুলে নিয়েছিলেন।

তবে ভানুর বেশ কিছু ছবির রেকর্ড আজ আর পাওয়া যায় না। বেশ কিছু বছর আগে ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’ ছবিটির সংস্করণ উদ্ধার করা হয়, নইলে বাংলা সিনেমার দর্শক ভানুর অভিনীত সেরা সিনেমাটা দেখা থেকে বঞ্চিত হতেনই। সারা জীবন কমেডি চরিত্রেই অভিনয় করিয়ে যাওয়া পরিচালকরা বোধ হয় বুঝতে পারেননি যে উনি সিরিয়াস চরিত্রেও সমান দক্ষ এবং এই ছবি তার প্রমাণ। প্রহ্লাদ চন্দ্র ঘোষ থেকে পরাশর ঘোষ থেকে সন্ন্যাসী – চরিত্রটা ভানু অসামান্য শিল্পনৈপুণ্যতায় তুলে ধরেছেন। এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন ওনার নিজের মেয়ে, বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশু শিল্পীর চরিত্রে! এই ছবিটা দেখার পরে হয়তো অনেক দক্ষ পরিচালকই হাত কামড়ে ছিলেন ভানুর জাত সঠিকভাবে না চিনতে পারার জন্য। এই ছবির কিছু গানের তালিম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিতে হয়েছিলো ভানুর স্ত্রীর কাছে, যিনি আবার নামকরা গায়িকা ছিলেন, আকাশবাণীতে গাইতেন। এই ছবির প্রথমার্ধ হাসালেও দ্বিতীয়ার্ধ যে কোনো মানুষকে কাঁদিয়ে দেবে এবং তার একমাত্র কারণ ভানুর অভিনয়।

নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া ভানু

ভানু, উত্তমকুমার থেকে শুরু করে জহর, অনিল চট্টোপাধ্যায় এনারা ‘অভিনেতৃ সংঘ’ করেছিলেন, কিন্তু একসময় উত্তমকুমার সেখান থেকে বেরিয়ে গেলে ভানু আঘাত পান, কাজ কম পেতে থাকেন। কিন্তু কখনোই বসে থাকেননি। রেডিও তে নাটক করলেন, হাস্যকৌতুক করলেন! তার কিছু কিছু নমুনা আজ আমরা ইউটিউবে পায়। বেশিরভাগটাই হয়তো আমরা সংরক্ষণ করতেই পারিনি। বেশ কয়েকবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পরে মারা যান ১৯৮৩ তে! মারা যাওয়ার পরের বছর তার শেষ অভিনীত সিনেমাটি মুক্তি পায় – শোরগোল। শুধু আক্ষেপ একটাই শুধুমাত্র কমেডিয়ান হয়েই রয়ে গেলেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এমনই একজন শিল্পী যিনি প্রতিটি চরিত্রে বেঁচেছেন, উত্তরসূরীকে শিখিয়ে গিয়েছেন কমেডি অ্যাক্টিং আসলেই কি, যিনি আদ্যোপান্ত বুঝিয়ে দিয়েছেন – দেশীয় সংস্কৃতিটাকে নিজের মধ্যে দিয়ে জনমানসে বাঁচিয়ে রাখার মাহাত্ম্যটাও শিল্প, যিনি বরাভয় জুগিয়েছেন পরিচালকদের মনে অথচ কত সহজ সরল এবং স্বতন্ত্র ভঙ্গিমায় নিজের হিট ছবিগুলো পর পর দিয়ে গেছেন….. জন্মশতবর্ষে এসেও তাই তিনি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছেন…..আসলেই তিনি “জীবন্ত মানুষ” !

ব্যক্তিগত জীবনে ‘ভানু’

সাহায্য — ১. শারদীয়া এই সময় (১৪২৬)
২. আনন্দবাজার পত্রিকার ” পত্রিকা” সংস্করণ

© শুভঙ্কর দত্ত || August 26, 2020

শুভ জন্মদিন – কামু মুখোপাধ্যায়….

সত্যজিৎ রায়। হ্যাঁ, ছোটোবেলা থেকে এই একটা পরিচালকের নাম আমাদের সবার চেনা। কত বড়ো মাপের পরিচালক ছিলেন। ধরুন, তারই বাড়িতে একদিন হুট করে চলে গেলেন আনকোরা কোনো অভিনেতা যিনি হয়তো আগে একটি সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন। হ্যাঁ, ঠিক এমনটাই করেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। ওনার যে সাহসের ওপর ভর করে সত্যজিৎ রায়ও স্বস্তির ঘুম দিতেন, মানুষটি এরকমই ছিলেন। হঠাৎ করেই একদিন ‘মাণিকদা’র বৈঠকখানায় গিয়ে বলে বসলেন —‘আমি আপনার ছবিতে অভিনয় করতে চাই’। আক্কেলটা ভাবুন খালি। সত্যজিৎ রায় ফিরিয়ে দেননি। “চারুলতা” তে ছোট্ট একটা চরিত্রে সুযোগ দিয়েছিলেন। অতিথি শিল্পীই বলা যায়। অবশ্য তার আগে কামু মুখোপাধ্যায় জীবনের প্রথম অভিনয় করে ফেলেছেন “সোনার হরিণ” চলচ্চিত্রে….. উত্তম কুমার, তরুণ কুমার, ছবি বিশ্বাস, সুপ্রিয়া দেবী, কালী ব্যানার্জি, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কে ছিলো না সেই ছবিতে? তবুও নজর কেড়েছিলেন – ‘আবদাল্লা’!

Kamu's debut

অবশ্য ‘চারুলতা’য় কম স্ক্রিন প্রেজেন্সের জন্য দুঃখ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে, উনি বুঝিয়েছিলেনও যে – কম সময়ে মুন্সিয়ানা দেখানোয় আসল কথা। তারপর “নায়ক” মুক্তি পেলো, ভালোই সময় পেলেন কামু, প্রীতিশ সরকার এর স্পেকট্রাম কোম্পানির কথা মনে নেই? তবে সময় অল্প হোক বা বেশি কামু মুখোপাধ্যায় মানেই দারুন স্ক্রিন প্রেজেন্স… মনে আছে ‘হীরক রাজার দেশে’ র সেই পরোয়ানা দেখতে চাওয়া রক্ষীকে? যার উদ্দেশ্যে গুপিবাঘা গাইবে – “ধরো নাকো…. সান্ত্রী মশাই….!” ঐ ছোট্ট একটা রোল, তাতেই কামাল। মগললাল মেঘরাজের ডেরার ‘অর্জুন’কে ভোলার কথা নয় কারো…. কেরামতি দেখে ‘তনখা’ বাড়িয়ে দেয় মগনলাল, সেই ছুরি ছুঁড়ে সার্কাস দেখানো লোকটার ভূমিকাতেও…..,ঐ টুকু সময়েও কি এক্সপ্রেশন! শেষেরটা ছোঁড়ার পরে কোমর ধরে বসে পড়লেন, গোটা শরীরে পদকের ঝনঝন আওয়াজ। শোনা যায় “সোনার কেল্লা” তে একটা দৃশ্য বাদ দেওয়া হয়েছিলো। ‘মন্দার বোস’এর দুঃসাহসিক অভিযানের স্বাক্ষর ছিলো সেটা, খালি বোতলে বিছে ধরার দৃশ্য, সম্পাদকের কাঁচিতে যেটা জায়গা পেয়েছিলো, তাই দুঃখ করেছিলেন তিনি তার প্রিয় মাণিকদার কাছে। আসলে ঐ দৃশ্য একদম সত্যিই ছিলো। এমনই খল – ছল চরিত্রে তাঁর আদবকায়দা শিক্ষনীয় বিষয়।

Kamu as Guard

Kamu as Arjun

264-kamu-mukherjee-sonar-kella-01

Kamu ft Nayak

অভিনীত চরিত্রগুলি যেমন বিচিত্র ছিলো তেমনই ছিলো তার অভিব্যক্তি। এমনি কি আর “ফটিকাচাঁদ” এ হারুন-অল-রশিদ বা ‘হারুন’ ভরসা হয়ে ওঠে ফটিকের…. জাগলার হারুনই বোধহয় কামু মুখোপাধ্যায়কে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছিলেন নিজেকে মেলে ধরার, তাই তো এ চরিত্র বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রিয় সিনেমাপ্রেমীদের। ‘শাখা প্রশাখা’ তে মজুমদার বাড়ির লোকদের দেখা শোনার ভার তার ওপরেই, কতটুকু সময় আর? “সোনার কেল্লা”, “নায়ক” বা “ফটিকচাঁদ” এ কামুকে যতটুকু সুযোগ দিতে পেরেছেন সত্যজিৎ – সন্দীপ রায় মিলে…. ততটাও অন্যান্য পরিচালকরা তাদের সিনেমায় ব্যবহার করতে পারেননি। তবে যত স্বল্প সময়েরই রোল হতো কামু পর্দায় আসলেই একটা আলাদা ভালো লাগা ছিলো। কি তার চাহনি, কি তার সংলাপ ছু্ঁড়ে দেওয়া – সবেতেই যেন সব সময় একটা চ্যালেঞ্জের ছাপ। সত্যজিৎ রায় মারা যাবার পর তাঁর মরদেহের পাশে বসে অঝোর নয়নে কেঁদেছিলেন কামু, সর্বজনবিদিত সে কথা। কাঁদবেন নাই বা কেন — মাণিকদার মতো তাকে কেউ সাহায্য করেননি যে! বলে না ‘জহুরি তে জহর চেনে’, একদম সে রকমই ব্যাপার। কামুর সাহস আর অকুতোভয়ের ওপর ভরসা করে সত্যজিৎ রায় তাকে ইচ্ছেমতো রোল দিতে পারতেন, ছোট্ট একটা চরিত্রে কম সময় হলেও তাকে দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করতেন৷ “গুগাবাবা ট্রিলজি” র সব সিনেমাতেই তিনি আছেন কিন্তু চিনতে গেলেই হার মেনে যাবো আমরা। যেমন “গুপি বাঘা ফিরে এলো” তে ‘হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার’ বলে দৌড়ে যাচ্ছে গুপি আর বাঘা, পালকির ভেতরে এক রাজা আঙুর খেতে খেতে স্তব্ধ। মনে আছে নিশ্চয়? ভেবে দেখেছেন কি ঐ ছোট্ট একটা দৃশ্য, তাও কতটা স্মরণীয়, সৌজন্যে – অবশ্যই কামু মুখোপাধ্যায় ! “শতরঞ্জ কি খিলাড়ি” তেও আছেন। অন্যান্য পরিচালকরা তেমন উড়তে দেননি তাকে, সে “হংসরাজ” ছবিতে ‘দালাল’ হোক্ বা গৌতম ঘোষের “পার” ছবিতে পাটকলে কাজ দেওয়া ‘সর্দার’ এর চরিত্র – সবকটায় ছোটো, তবে ফ্রেমে এলেই আলাদা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন।

Kamu in HansarajKamu as kingKamu as SardarKamu in Sakha Prasakha

Kamu as Harun
ফটিকের হারুন…

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একটা সুযোগ দিয়েছিলেন, তার ”ফেরা” চলচ্চিত্রে, নাট্যদলের মালিকের ভূমিকায়। জমিয়ে দিয়েছিলেন, “মৌচাক” সিনেমাতেও, ঐ দেড় মিনিট – সুপারভাইজারের মাথা ম্যাসেজ করতে দেখবেন। বাংলা সিনেমাতে চরিত্রাভিনেতাদের রমরমা চিরকালই, নায়কদের ছাপিয়ে তারা জায়গা করে নেন। কিন্তু এই কামু ব্রাত্যই থেকে গেলে, স্বল্প সময়ে ওরকম স্ক্রিন প্রেজেন্স দিয়েও অন্যান্য বাঘা বাঘা পরিচালকরা তাকে সুযোগ তেমন দিতে আর পেরেছিলেন কোথায়? সে কথা টের পেয়েওছিলেন তিনি, নিজে মজা করে বলতেনও সে কথা – “মন্দার বোসের বাজার মন্দা”! সত্যজিৎ রায় খুব ভালোবাসতেন তার ‘মন্দার বোস’ কে। উনি মারা যাবার পর সেভাবে কামু মুখোপাধ্যায় সুযোগ পেলেন না, সন্দীপ রায়ও মনে রাখেননি। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তখনই হারিয়ে ফেললো প্রতিভাবান, অসমসাহসী এই অভিনেতাটিকে, যিনি বারবার দুঃখবোধ করেছেন স্বচ্ছন্দে জায়গা না পাওয়ার জন্য…. অথচ দেখুন কোনো নায়কের অভিনয়ে তাঁর অভিনীত চরিত্র ঢেকে যায়নি, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেই নামও কেউ কেউ এখনও মনে রেখেছেন, এটা হয়? এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। আজ তাঁরই জন্মদিন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের স্বর্ণযুগের প্রতিভাবান এবং প্রভাবশালী অতিথি শিল্পীকে তাই প্রণাম জানাই।

Kamu @ mouchak

সূত্র:: একাধিক ম্যাগাজিন এবং আমার দেখা সিনেমা

© শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর || June 14, 2020

‘অক্ষয়’ অনুভূতি

“মানুষের কতরকমের যে উদ্ভাবনী শক্তি এবং প্রয়োজন৷ আর এতো অক্লান্ত উদ্ভাবনী শক্তি আছে বলেই এত উলটোপালটা প্রয়োজন।”

— অক্ষয় মালবেরি পড়া শেষ করলাম।

এমন উপন্যাস পড়তে পারলে দারুন আরাম লাগে।মনের…! প্রশান্তি, বলা ভালো।  আমাদের মানুষদের একটা দারুন মিল প্রায় সবার মধ্যেই রয়েছে সকলেই জীবনে একবার হলেও শৈশবে ফিরে যাওয়ার বাসনা প্রকাশ করে। হয়তো একাধিকবার!
শৈশবে ফিরে যাওয়া তো সম্ভব নয়৷ কিন্তু বই পড়তে পড়তে তেমন স্বাদ যদি মেলে….!

প্রকৃতি যেখানে মানুষের রূপ পায় আর মানুষের মধ্যেই প্রকৃতির সৌন্দর্য – মণীন্দ্র গুপ্ত কি স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে বইটি পড়িয়ে নিলেন। আহামরি উৎকণ্ঠা অনুভব করিনি পড়তে পড়তে তবুও মনে হচ্ছিলো যে এ বই যত জলদি শেষ করবো তত জলদি জানতে পারবো লেখকের কি গতি হলো!

পার্থিব জগতের বস্তুগুলির তুলনাগুলি কি সুন্দর লেগেছে, সে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সত্যি বলতে চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে, বসেও ছিলাম। কতবার যে শৈশবে ফিরে গিয়েছি। না জানি, বয়স্ক মানুষরা পড়লে তাদের কি হাল হবে!  এক অফুরান আনন্দে হয়তো কেউ থামতেই পারবেন না। ছোটোবেলাটা যে কত সুখের, সেটা উপন্যাসের তৃতীয় বা শেষ পর্বে এলেই বোঝা যায়! কারণ পড়তে তুলনামূলক ভালো লাগে না অথচ লেখকের কোন দোষ নেই। তিনি কি সুন্দর সব গল্প বলেছেন আমাদের। পাঠক কি না, খিদে একটু বেশিই! কেউ কেউ চতুর্থ পর্বের জন্য অপেক্ষা করেন, চিঠি পাঠান, অবশ্য তার সম্ভাবনার কথা তিনি অঙ্কুরেই বিনাশ করেছেন।

বারবার পড়তে ইচ্ছে করে যেন মালবেরির অপার্থিব গন্ধ পাই পাতা থেকে। পড়তে পড়তে স্তব্ধ হয়ে ভেবেছি — আহ! এমনটাই তো হয়েছিলো! বয়সকালে গিয়ে ফেলে আসা শৈশবের কাহিনী লেখাটা কতটা কষ্টের আবার আনন্দেরও সে বলাই বাহুল্য! সত্যিই সে জীবন ‘অক্ষয়’! এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ বলে মনে করি আমি।

এর চেয়ে বেশি কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই বা আরও পড়তে হবে দু’বার  অনুভূতি টনটনে করার জন্য।  শব্দ জানলাম বেশ কয়েকটি, নতুন। পরে হয়তো সাহায্য করবে এই ‘অক্ষয়’ই!

শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর

March 16, 2020

 

সিমলিপাল অরণ্যের দিনরাত্রি…

IMG20200223065729-01
কুয়াশার চাদর পেরিয়েছি সবে….

পঞ্চলিঙ্গেশ্বর আর দেবকুন্ড ঘুরে বারিপাদায় হোটেলে উঠলাম। ঘুম না হওয়ার অনেক কারণ থাকলেও তার দায় মশককুলকে দেওয়ায় যায়। পরের দিন ভোরে উঠে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়েছি, ড্রাইভার আসলো। নাম – শরৎ, আগের দিনই রাতে পরিচয় করে গিয়েছে সে। গাড়ি চললো, উদ্দেশ্য – সিমলিপাল, পিঠাবাটা (পড়ুন পিঠেব্যথা) গেট। আসলে সিমলিপাল ঢোকার একাধিক গেটই রয়েছে, কিন্তু রাস্তা সব গেট থেকে ভালো নয় বা দূরত্বও বেশি, আর বারিপাদা থেকে এই পিঠেব্যথার দূরত্ব অন্যান্য গেট এর চেয়ে কমই। আনন্দের আর সীমা নেই যখন জানলাম আমাদের ড্রাইভারদা বাংলা জানে, বাঙালীর এ যেন স্বর্গে হাতে পাওয়া।

IMG20200223064802-01
অজানার উদ্দেশ্যে..

(আসলে কথাটা সিমিলিপাল কিন্তু প্রচলিত শব্দ সিমলিপালই বলা হয়ে গিয়েছে বারবার)

IMG20200223153956-01
সূর্যলোক গায়ে মাখে এ অরণ্য

IMG20200223084426-01
অক্সিজেনের প্রাচুর্যে

IMG20200223091130-01
সর্পিল পথে অনন্ত বনরাজির পানে..

টিকিট কাটা হলো, গাইড এর জন্য বরাদ্দ টাকা দিতে হবেই। সে এবার গাইড কে গাড়িতে না নিলেও হবে আর আমাদের ড্রাইভার বেশ পরিচিত, সে ওসব থেকে বাঁচিয়ে দিলো নইলে গাড়ির মধ্যে দোকান রাখার বেশ অসুবিধা হতো বইকি! গাড়ি প্রবেশের আগে আমাদের চেকিং করলো একটা পুলিশ…. এলকোহল (এই টার্ম আমি এম এস সি পড়ার সময় শিখেছি) আছে কিনা! এরপর গেট খুলতে গাড়ি ঢুকলো সিমলিপাল জাতীয় উদ্যানে। দুপাশে ঘন জঙ্গলের মাঝের মোরাম রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো….প্রথম গেট আসলো ভজম বলে একটা জায়গায়….এরকম গেট আছে আরও চার বা পাঁচটা গোটা রাস্তায় কিন্তু আমার আর মনেও নেই। তখন বাজে প্রায় সাড়ে সাতটা। আমরা প্রথম গেটটা পেরোলাম আমরা। সুরজিৎ মোটামুটি ড্রাইভারের সাথে হিন্দিতে বাতচিত চালিয়ে যাচ্ছে, ভুলে গিয়েছে যে তিনি বাংলা বলেন, এবং বোঝেন, আমরাও ভাবছি ‘বাতচিত’ কখন বাক্যালাপে পরিণত হবে…!

IMG20200223111057-01
হেথা উর্ধ্বে উঁচায়ে মাথা দিলো ঘুম….

IMG_20200223_162220-01
যত আদিম মহাদ্রুম….

এরপর চলেছি, এক অজানা তালিকা কি কি দেখতে পাবো তা ভেবে, দূর থেকে ড্রাইভার এর চোখে পড়লো প্রমাণ সাইজের বনমোরগ। এবার নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার মধ্যেই বনের মধ্যে ঢুকে গেলো সে। আরও এগিয়ে চলেছি, একটা সবুজ পায়রা দৃষ্টি পড়তেই উড়ে মিলিয়ে গেলো…পাহাড়ি পথের বাঁকে মাঝে মাঝেই দেখা মেলে জলের…কোথাও শুকিয়েও গিয়েছে সেই জল। আসলে গহীন অরণ্যের বুক চীরে এগিয়ে চলা নদী বা ঝর্ণায় হবে। একটা জায়গা এলো.. গাছের পাতাগুলো দেখলেই যেন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় যে এখানের বাতাস সবই বিশুদ্ধ। এরপর দুটো ময়ূর দেখা গেলো। আহহ, পরমেশ্বর যেন দুহাত দিয়ে গড়েছেন, চিড়িয়াখানায় খাঁচার ওপারে দেখা আর জঙ্গলে তাদের বাসস্থানে নিজস্ব ভঙ্গিমায় দেখা একদম আলাদা মাত্রা। একটা সম্বর দৌড়ে রাস্তা পার হলো। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সাথে কারো বাইনোকুলার নেই। গাড়ি কখন যে একটু সমতল পেয়েছে ঠাহর হয়নি। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা ছেলেমেয়ের দল হাত নাড়িয়ে ওয়েলকাম জানাচ্ছে। পরে ভুল ভাঙলো। আসলে অনেকেই পুরনো জামাকাপড় দিয়ে যান এদের, ওরাও হয়তো বুঝেছে আমরা দেবো। আমাদেরকেও বলেছিলো কিন্তু সে কথা খেয়াল ছিলো না বিন্দুমাত্র। মনে মনে স্থির করলাম পরের বার আর হবে না।

IMG20200223101554-01
হল্ট স্টেশনের দোকান খানি

IMG20200223100003
সেই স্কুলবাড়িটা

IMG20200223100656
শুধু বেসনের পাকোড়া

IMG20200223145827-01
বেড়া হয় সব ঘরেরই…

সেখানে স্কুলবাড়িও রয়েছে, রয়েছে আস্ত একটা গ্রাম। আর অনেক সময় ধরেই চোখ পড়ছিলো যে এখানে বিদ্যুৎ দফতর তো পৌঁছায়নি কিন্তু সূর্যদেবতা আর বিজ্ঞানের পরম আশিষে সৌরকোষ দিয়ে চলে যায় এদের। মোবাইলের নেটওয়ার্ক জুড়ে শুধুই শূন্যতা। একজন বন্ধু বললো শুধু একটু নেটওয়ার্কটা লাগতো, আমরা দু একজন বললাম বেশ তো ভালোই লাগছে, নির্ঝঞ্ঝাট আছি। একটা দোকানে গিয়ে পকোড়া সাঁটানো গেল। এতো ওপরে মালপত্র আসে কিভাবে জিগ্যেস করতে ড্রাইভারের থেকে জানা গেল – গাড়ি আসে সপ্তাহে দু দিন। এরপর আবার চলতে শুরু করলো গাড়ি। যাচ্ছি জোরান্দা জলপ্রপাত, পশু-পাখি দেখা ছাড়াও আমাদের পিপাসা মেটানোর জন্য প্রথম গন্তব্যস্থল এটাই। পাহাড়ি রাস্তা ছেড়ে একটু সমতল পেয়েছে গাড়ি। শহুরে – সুবিধেবাদী সভ্যতা থেকে এতো যোজন দূরে এই পাহাড়ি এলাকায় ইঁটের বসতি দেখে ভিরমি খাই আমার মতো পর্যটকেরা। ড্রাইভারের শরণাপন্ন হওয়ার কিঞ্চিৎ পূর্বেই নিজেদের চোখেই দেখি একদল লোকজন ইঁট বানাচ্ছে, আর মাঠে কোদাল দিয়ে মাটি চোপাচ্ছে তিনজন শিশু, বয়স আট বছরও হবে না কারোর।

IMG20200223094938-01
|| মানুষের ঘরবাড়ি ||

IMG20200223095727-01
পাহাড়ের কোলে ঠাঁই হয়নি যাদের…

IMG20200223100050
বিদ্যালয়েরই অংশবিশেষ

টলতে টলতে পৌঁছালাম জোরান্দা জলপ্রপাত। প্রায় পাঁচশো ফুটের এই একধাপের জলপ্রপাতটি ওড়িশার অন্যতম মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। ঝরাপাতার চাদর মাড়িয়ে হেঁটে পৌঁছালাম এমন একটা জায়গায় যেখান থেকে ঝর্ণাটাকে আধি দেখা যায়, অতঃপর সে জায়গায়….একটা ক্ষীণ স্রোত, খুব কম পরিমাণ জল নিয়েই পাঁচশো ফুট নীচে পড়ছে আর তাতে যে শব্দ সৃষ্টি করেছে সেটা দূরত্বে থাকা পর্যটকদের কানে এমন কিছু বেশি লাগছে না। মিহি সুরে কারা যেন কোরাস ধরেছে।

DSC_6830
ঝরাপাতার বিছানা মাড়িয়ে জোরান্দা অভিমুখে

IMG20200223110501-01
জানান দেয়… আমাদের অবস্থান

IMG20200223104435-01
নয়নাভিরাম…

ঘড়িতে দেখলাম এগারোটাও বাজেনি। কিন্তু এই জলপ্রপাত আর পাহাড়ের অসংখ্য গাছ-গাছালি মিলে এমন এক ধোঁয়ার সৃষ্টি করেছে যে কোনো ছবিই ভালো ওঠে না। সুরজিৎ এর প্ল্যান অনুযায়ী এক রকম টি শার্ট কেনা হয়েছিল, এবার শ্যুটিং এর পালা। একটু অন্যদিকে গিয়ে দেখলাম কতগুলো ঘর এর শুধু কাঠামো বর্তমান। ড্রাইভার পরে বলে দিলো তার কারণ- মাওবাদীদের উৎপাত।

IMG20200223111639-01
এ কি দৃশ্য দেখি অন্য…এ যে বন্য

IMG20200223111311-01
নীল রঙ ছিলো ভীষণ প্রিয়

IMG20200223104736-01
সন্তর্পণে…

IMG20200223110421-01
মধ্যমণি জোরান্দা…

IMG20200223111231
ফ্রেমবন্দী করে রাখার প্রয়াস…আমিও তুলে রাখি

IMG_20200223_104702
শ্যুটিং শেষে ফিরে যেতে হয়

আবার ঐ পথেই গাড়ি এসে একটা পথনির্দেশক বোর্ড চোখে পড়লো। ফেরার পথে চোখে পড়লো সেই দলটাকে। একজন বাচ্চা মেয়ে একটা কোলের বাচ্চাকে নিয়ে লোফালুফি করছে ঐ সদ্য বানানো কাঁচা ইঁটের সারির পেছনেই! গহীনে অরণ্যের রোমাঞ্চকে দশ গোল দেয় সে দৃশ্য, ক্যামেরাবন্দী করার সাহস হলো না। বরেহিপানি ফলস বেশ কিছু কিমি দূরত্বে। আমাদের গন্তব্য – বরেহিপানি। একটা গাড়ি পেছন থেকে এসে ধুলো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেলো। থেমে গেলাম আমরা কিছুক্ষণ, নইলে ঘনঘন গাড়ির আওয়াজে প্রাণীগুলির দর্শন পাবো না। খাওয়াদাওয়ার প্ল্যান শুরু হতে ড্রাইভার বললো যে এখানে দেশী মুরগী কিনে রান্না করিয়েও নেওয়া যায়, সে উদ্দেশ্য “কুকড়া হ্যায়?” অভিযান শুরু হলো কিন্তু সে অভিযান ব্যর্থ হলো। গাড়ি থামলো একটা হোটেলে। খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো…পাশেই একটা অস্থায়ী দোকানে শাল চিকেন বিক্রি হচ্ছে, অতএব একবার চেখে দেখা যাক্, তাই হলো। ম্যানেজার একটু খাদ্যরসিক হলে এসব উটকো খিদেতে সিলমোহর পড়তে বেশি সময় লাগে না।

IMG20200223123723
শাল চিকেন ওরফে স্বর্গ

IMG20200223123449-01
ছদ্মবেশীর দল…

IMG_20200306_172142
প্রস্তুত হয় যেমন করে…

খাবার অর্ডার দিয়ে বরেহিপানির উদ্দেশ্যে গাড়ি রওনা দিলো। এরপর রাস্তায় পড়লো হরিণ। গভীর জঙ্গল যেখানে একটু আলগা হয়েছে সেখানেই ওদের চরে বেড়ানো। একটা টাওয়ারও করা আছে আর তাকে ব্যবহার করা হলো না। আমরা দেখতেই ওরা ভেতরে ঢুকে গেলো। আবার আমরা যখন চলে গিয়েছি এরকম অভিনয় করলাম তখনই বেরিয়ে চলে এলো। যেন “লুকোচুরি” চলছে। আরও দেখতে পাবো এমন আশায় বরেহিপানির দিকে চরৈবতি। চলে এসেছি। জঙ্গলাকীর্ণ সে স্থানে একটা ওয়াচ টাওয়ার আর রেলিং দিয়ে ঘেরা একটা পাহাড়ের কিনারা থেকে দেখছি ওপারে সুউচ্চ একটা পাহাড় থেকে ঝর্ণার জল পড়ছে…. তবে এর উচ্চতা অনেক বেশি, সুরজিৎ জানান দিলো সব ধাপ ধরলে এটিই ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত। প্রায় ১৩০০ ফুটের কাছাকাছি, মানে জোরান্দার আড়াইগুণ। অনেক বেশি রোদ্দুর থাকার কারণে স্পষ্ট বোঝা গেলো। গাছ থেকে ঝরে যাওয়া পাতা, উড়ে যাওয়া পাখির দল সবেমিলে বুড়িবালাম নদীর এই ভয়ংকর অথচ সুন্দর রূপকে আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে তোলে….! পাহাড়ের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলরাশি যে বর্ষার সময়ে তার রূপ আরও বাড়িয়ে নেয় তা পাহাড়ের গা দেখলেই অনুমেয়।

IMG_20200223_125904
চুপটি করে থাক্

IMG20200223132053
নিঃশব্দে শ্যুটিং চলছেই

IMG_20200228_192624-01
বুড়িবালামের ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ – বরেহিপানি

স্নানের উপায় নেই। খিদে পেয়েছে। ফিরে এলাম। ড্রাইভারের সাথে গল্প চালাচ্ছে সুরজিৎ। জানা গেলো – এখানের গ্রামে যারা থাকে তাদের একটা লোকাচার রয়েছে, বছরে একবার জঙ্গলমাতার পুজো হয় এবং তাদের একটা বিশ্বাস রয়েছে যে তাদের গরু, ছাগলগুলিকে এই পুজোর কারণে বাঘ কখনো খাবার করেনি। আমাদের মতো শহুরে ভ্রমণপিপাসু লোকজন এক-দু’দিন ঘুরতে গিয়ে এসব লোকাচারকে অবান্তর বলে হয়তো হাসাহাসি করবে, তবে প্রতিটা জঙ্গলেই যেখানেই মানুষের বাস সেখানেই কিন্তু এমন বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। হোটেলে ফিরে নানারকম পদ আর কুকড়ার ঝোল দিয়ে ভাত সাঁটানো গেল। তার আগে অবশ্য শাল চিকেন সাঁটানো হয়েছে আরও একবার। শাল পাতায় চিকেন মুড়ে, মশলা মাখিয়ে আগুনে সেঁকে পুড়িয়ে নেওয়া, অতঃপর পাতা গুলো কালো হয়ে গেলে তা খুলে নিয়ে পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে….আহা সে কি স্বাদ! একটু হজম হতেই আবার বেরিয়ে পড়লাম শেষ গন্তব্য চাহালা। এবার একটু বন্যপ্রাণী দেখার বড়োই ইচ্ছে প্রকাশ হলো। ড্রাইভারও উৎসাহ দিলো। গাড়ি চললো, রাস্তা একটু ভেজা ভেজা। মনে হলো বেশি যায় না গাড়ি, সুরজিৎ জিগ্যেস করতে জানা গেল– এ জায়গার বন এতো ঘন যে সূর্যের আলো পড়ে না তেমনভাবে। জংলী আর আর্দ্র পথে পাতা পড়ে তাকে আরও নরম করেছে। ফরেস্ট এর পাহারাদারদের একটা টাওয়ারে এসে দাঁড়ালো, ড্রাইভার নেমে গেলো, আমাদেরও ডাকলো৷ দেখলাম কি দুর্বিসহ সে চাকুরী যদিও এখানকার ট্রাইবাল লোকজনদের জন্যই সে চাকরী ঠিকঠাক। সে বললো বাবুরা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন দেখলে অন্য গাড়িগুলোও ভিড় জমাবে। তাই তাড়াতাড়ি আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম। প্রবল উৎকণ্ঠায় চোখ মিলছি গাড়ির জানালা দিয়ে কিন্তু কিছুই পেলাম না। নাহহ, আর বোধ হয় দেখা পাবো না।

IMG20200223125519-01
শিরা ধমনী নিয়ে বরেহিপানি জলপ্রপাত

IMG20200223090551-01
আরণ্যক

IMG20200223142051
ব্যঞ্জন বেষ্টিত খাদ্য, এই একটাই ছবি যত্ন করে তোলা হয়নি

পৌঁছে গেলাম চাহালা। হাট বসলে যাকে খানিকটা সোনাঝুরির মতোই লাগবার কথা। বেশ উচ্চতার ইউক্যালিপটাস দিয়ে ঘেরা এই ওয়াচ টাওয়ারটি আসলে চাহালা নামক গ্রামে উপস্থিত। এটা কোর এরিয়ার মধ্যে বলা চলে। মনোরম এই স্থানে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই দেখা মেলে হরিণ, খরগোশ, ইয়াব্বড়ো কাঠবেড়ালির। কিন্তু ধৈর্য্য ততক্ষণে বিদায় নিয়েছে, একটুক্ষণ ওয়াচ টাওয়ারে কাটিয়েই নেমে এলাম গাড়ির কাছে। হঠাৎ চোখে পড়লো একদম মগডালে একটি Malabar Giant Squirrel মোটা লেজখানা নাড়াতে নাড়াতে টপকে অন্য ডালে…..! ড্রাইভার বললো শেষে বেরোবে কিন্তু অন্য গাড়ির লোকজন একই তালে থাকার দরুন আমরাই আগে বেরিয়ে পড়লাম।

IMG20200223161719
চাহালার ওয়াচ টাওয়ার

IMG20200223161646-01
প্যাভিলিয়নের পথে চাহালায় সূয্যিমামা…

IMG20200223160313
মিনার থেকে চাহালায় অপেক্ষারত ভ্রমণপিয়াসীর দল

IMG_20200223_151424
ফরেস্ট গার্ডদের জীবনযাত্রার হালচাল

IMG_20200223_111059
ফেলে আসা জোরান্দার সেই ধ্বংসাবশেষ, কারণ মাওবাদী

IMG_20200223_151410
১৪ ঘন্টার সঙ্গী

সন্ধ্যে হব হব করছে….অনেকটাই পথ। ঘুমও পাচ্ছে কিন্তু দেখা মেলে তৎক্ষণাৎ দেখতে হবে এইজন্য ঘুমতে ইচ্ছে হলো না। দিনের আলোর জঙ্গল রাতে কি ভয়াল রূপ নেয় তা বোঝা গেলো কয়েক ঘন্টার ঐ জার্নিতে। প্রতিটা গেটে জানান দিয়ে যেতে হয় আমরা পেরোলাম, এত সিরিয়াল নম্বর ছিল, জেনে নিতে হয় কটা গাড়ি পেরিয়েছে। আবার সেই হোটেলে গিয়ে থামলো গাড়ি, চা পানের বিরতি। দেখলাম সেই ছোট্ট মেয়েটা যে থালা পরিস্কার করছিলো তখন এবার সে চা জোগাড়ের অনেক কাজ করে দিলো। আমি বেশ দেখছিলাম, কিন্তু কথা বলার সাহস হয়নি৷ আমাদের সাথে ব্যবহার জামা কাপড় ছিলো না যে। একটা কেমন সুবিধাবাদীর লজ্জা আমার মনে তখন। এবার আবার অনিশ্চয়তার পথে পাড়ি….! একদল মহিলা হাত সেঁকছেন আগুন জ্বালিয়ে। কাজ করতে এসেছিলেন লোকজন, অপেক্ষা করছেন কখন ফরেস্ট এর গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। বেশ কিছুটা যেতে ঝিম ধরে গেলো। ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ গাড়িটা দাঁড়ালো, সামনে একটা গাড়ি ছিলো আমাদের অজান্তেই। দাঁড়িয়ে আছে, নিশ্চয় দেখেছে হাতি। এবার আবার সেই ভজম গেট। ড্রাইভার বললো ওরা বাঘ দেখেছে। আমাদের আফসোস এর সীমা নেই। পিঠেব্যথা গেট আর বেশি দূরত্বে নয়। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় রাতের বনানীকে দেখতে দেখতে যখন বন ছেড়ে বেরোলাম তখন রাত সাড়ে আটটা পেরিয়েছে সবে। এমনিতে নাকি ছ’টার আগেই বেরিয়ে যেতে হয়। শরৎ ড্রাইভার বহু অভিজ্ঞতার লোক বলে তার ব্যাপার আলাদা। অবশ্য বিভীষিকাময় হাতি বা বাঘ দেখার উৎকণ্ঠাটা রয়েই গেলো, পথ মধ্যে তেনারা স্থানুবৎ দন্ডায়মান হলে অবস্থা যে কি হতো আমাদের, তা অজ্ঞাতই রয়ে গেল। গাইতে হলো না – ‘পায়ে পড়ি বাঘমামা’….

IMG_20200223_101638
কাচাকাচির জন্য কিলোমিটার হয়তো



IMG20200223113818-01
সংগ্রাম অথবা নিজেরাই শ্রমিক

IMG20200223121218-01
টিফিনে একটু টায়ার খেলা…

DSC_6980
Men In Blue – সুরজিৎ ডেলিভার্স 🤘

ফিরে তো এসেছি, কিন্তু মনে মনে ভাবছি সেখানকার জনজাতির কথা, কিভাবে দিন গুজরান করে ওরা। আমরা সমতলের মানুষ, ফ্লিপকার্ট – অ্যামাজন – সুইগি আরও কত কি আমাদের জীবন জুড়ে….দু চারটে ক্লিকেই মুখে হাসি ফুটিয়ে দেবে। এক মিনিট দেরী করলে আমাদের কত অভিযোগ! ওখানে ওদের অভিযোগই নেই। আর করবেই বা কার কাছে? ড্রাইভারের থেকে জানলাম ওড়িশা সরকার এই লোকজনদের জঙ্গল ছাড়ার জন্য মাথাপিছু আট লাখ করে দেবে কিন্তু তবুও তারা ছাড়তে নারাজ, কি জানি! মোবাইলে ফোন করলে পাওয়া দুঃসাধ্য, কেবল ওরা ফোন করলেই খবর মেলে…। অভাব আছে, অভিযোগ নেই, নিজেদের মতো করে ধান চাষ করে নেয়, না জানি এভাবেই কত অভাবকে ওরা বশ মানিয়ে নিয়েছে। অভিযোজনটাই সব। জীবনটাই আসল। বেঁচে থাকাটাই…..একটা অরণ্য অভিযানই শিখিয়ে দিলো আবার!

IMG20200223093526-01
নাম জানিনা, ক্লান্ত পথ ঘিরেছিলো

পুনশ্চঃ দিনরাত্রি বললাম অথচ আমার কাছে রাতের একটাই ছবি রয়েছে সেটাও দেওয়ার মতো নয়। সুরজিতের থেকে নেওয়া হয়নি। ছেলেটা ফোন করে সিমলিপাল যাওয়ার প্রস্তাবটা দেয়। ভালো লেগেছিলো।

IMG_20200223_131617-01
বরেহিপানির জল কম পড়ায়….

ঋণস্বীকার: প্রায় সব ছবিই আমার তোলা তবুও তিন চারটে ছবি আছে যেগুলো সৌমেন আর শৌণকের তোলা। তবে সবচেয়ে বেশি ঋণী সেই অচেন ভিন্নভাষী মানুষটির প্রতি যিনি আমাদের গ্রুপ ছবিটি তুলে দিয়েছেন, কারণ এই একটাই ছবি পুরো গ্রুপের।

IMG_20200223_104436
Yes! Never Ever Forget You…..

© শুভঙ্কর দত্ত ||   March 6, 2020 

লাউসেনের হতশ্রী ময়নাগড়ে…

IMG20191116152203-01
ময়নাগড়ের তোরণ

ময়নাগড়ের ইতিহাস বড়োই বিচিত্র! অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় ময়নাগড় মূলতঃ লাউসেনের গড়, ঠিক তেমনই মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। দুটির মধ্যে যোগ-সম্পর্ক স্থাপন করাটাই ইতিহাসের কাজ৷

IMG20191116154859-01
অপেক্ষা… এপারে আসার

উঁকি মারে ইতিহাস….

গৌড়ের অধিপতি দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে যুদ্ধে পরাজিত কর্ণসেন তাঁর অধীনে সেনভূম ও গোপভূম অঞ্চল শাসন করতেন। গৌড়েশ্বর এর মন্ত্রীর নাম ছিলো মহামদ যার চক্রান্তে সোম ঘোষ নামে একজন অনুগত প্রজা কারাগারে বন্দী হন। পরে এই সোম ঘোষের সাথে গৌড়েশ্বরের গাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন হলে রাজপাট্টা, একটি ঘোড়া এবং একশ দেহরক্ষী সৈন্যসহ সোম ঘোষ কর্ণসেনের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। সোম ঘোষের পুত্র ইছাই ঘোষ কর্ণসেনকে যু্দ্ধে পরাস্ত করেন। তাঁর ছয় পুত্রকে বিনাশ করে রাজ্যের অধিকার নেন। পাঠক হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে এটা মহামদের ষড়যন্ত্র বই কিছু নয়। পুত্রশোকে কর্ণসেন-মহিষী বিষপানে আত্মহত্যা করেন। তখন গৌড়েশ্বর কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের অংশবিশেষ (ময়নামণ্ডল) এর রাজত্ব দেন। তিনি আগমন করেন কংসাবতীর শাখানদী কালিন্দীর জলপথে, কর্ণসেনের নতুন রাজধানী কর্ণগড় যা পরে ময়নাগড় নামে বিখ্যাত হয়।

কর্ণসেন এর দ্বিতীয় ধর্মপত্নী রঞ্জাবতী বাঁকুড়ার রামাই পণ্ডিতের উপদেশে ধর্মঠাকুরের তপস্যা করে লাউসেন (বা লবসেন) কে পুত্ররূপে লাভ করেন যিনি মঙ্গলকাব্যে লাম্বাদিত্য নামেও খ্যাত। লাউসেন অজয় নদীর তীরে ইছাই ঘোষকে নিহত করে পিতৃরাজ্য উদ্ধার করেন৷ এইভাবে বীরবর লাউসেনের সাম্রাজ্য বীরভূম থেকে ময়না পর্যন্ত বিস্তার লাভ করলো। এই ময়না গড়ে এখনও লাউসেনের কীর্তিচিহ্ন রয়ে গেছে। রাঢ় বাংলার জাতীয় কাব্য ধর্মমঙ্গল এর নায়ক লাউসেনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িতে জায়গাটি যে ময়নাগড় সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই৷ রঙ্কিনী কালীমূর্ত্তি তাঁরই পূজিত এবং এই কালীমূর্ত্তি অন্যদিকে লাউসেনের বৌদ্ধ ধর্মপ্রীতিকেই স্পষ্ট করে….! যাই হোক্, এ কথায় পরে আসা যাবে।

IMG20191116153632-01
পারাপার @ কালিদহ

IMG20191116152924-01
স্বমহিমায়… নৌরাসযাত্রায়

বঙ্গ হলো। এবার বঙ্গের সাথে কলিঙ্গের যোগসূত্রটা ধরা যাক্।

মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যভুক্ত – ‘জলৌতি দন্ডপাট’ এর অন্যতম৷ পরগণা ছিলো দুটি — সবং-পিংলা, ময়না৷ প্রায় ছয়শো বছর আগে ১৪০৩ খ্রীষ্টাব্দে কপিলেন্দ্রদেব (শোনা শোনা লাগছে কি? কুড়ুমবেড়াতে জড়িত যিনি)
সিংহাসন অধিকার করেন, তার পরে তাঁরই অধস্তন সেনানায়ক কালিন্দীরাম সামন্ত অধিষ্ঠিত হন, সবং এর বালিসীতাগড়ে একটি দুর্গ নির্মিত হয়। প্রাপ্ত সূত্র এবং তথ্য অনুযায়ী এই কালিন্দীরামই হলেন বর্তমানে ময়নাগড়ে বসবাসকারী বাহুবলীন্দ্র বংশের আদিপুরুষ।

এরপর প্রায় দেড়শো বছর এগিয়ে যায় রাজ্য-রাজ্যত্ব, বংশ পরম্পরায় গোবর্ধন সামন্ত বালিসীতাগড়ের অধিপতি হন। যাই হোক্, উৎকল সাম্রাজ্য তখন হরেক চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে আসছে। সিংহাসনে বসলেন হরিচন্দন। সাম্রাজ্যের স্বরূপ উদঘাটনে তিনি সমস্ত রাজন্যবর্গের থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিতে উদগ্রীব হলেন। বশ্যতা স্বীকার করতে সম্মত হলেন না গোবর্ধন। বন্দী অবস্থায় তাকে আনা হলো কারাগারে। গোবর্ধনের দেবোপম কান্তি, সঙ্গীতপ্রতিভা, মল্লযুদ্ধ — দেখে মুগ্ধ হলেন রাজা। উৎকল সাম্রাজ্যের খারাপ সময়ে এমন রণনিপুণ এবং রাজকীয় মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপন করতে পিছপা হলেন না উৎকল-নৃপতি৷ সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হলো তাঁকে, সঙ্গে সিংহাসন, রাজচ্ছত্র, চামর, বাণ, ডঙ্কা, যজ্ঞোপবীতাদি রাজচিহ্ন দেওয়া হলো। তাঁকে দেওয়া হলো উপাধি – একটা নয়, তিনটে — ‘রাজা’, ‘আনন্দ’ এবং ‘বাহুবলীন্দ্র’…. যে পদবী এখনও রাজপরিবারের সদস্যরা বহন করেন, এর অর্থ হলো ইন্দ্রের ন্যায় বাহুবলশালী। মূল শাসনকেন্দ্র হিসেবে সিলমোহর পেলো ময়নাগড়।

IMG20191116154812-01
বর্তমান “বাহুবলীন্দ্র” রা

বেয়াড়া জলদস্যু শ্রীধর হুইকে ময়না থেকে উৎখাত করেন তিনি, ফিরে এসেই। তখন তিনি ঐ গড় নতুন করে পরিখাবেষ্টিত করে দুর্ভেদ্য গড়ে পরিণত করতে আগ্রহী হন। দুটি পরিখা (কালিদহ ও মাকড়দহ) দিয়ে ঘেরা ছিলো তার গড়। প্রথম পরিখার মধ্যে চারিদিকে বেশ উঁচু পার্বত্য গুলিবাঁশের ঝাড় (১৯৫৫ সালের পর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়) এমন ঘনভাবে পরস্পর সংলগ্ন ছিলো যে অস্ত্রধারী সৈন্য তো দূর কোনও যুদ্ধাস্ত্রও প্রবেশ করতে পারতো না। প্রচুর অর্থব্যয়ে রাজা গোবর্ধন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন, যা ছিলো নিখুঁত এবং রন্ধ্রবিহীন, গড় সংস্কারেই তার পরিচয় মেলে। বৃটিশ কালেকটর এইচ.ভি.বেইলির বর্ণনায় সেদিক ফুটে উঠেছে।

IMG20191116154640-01
তাল সারি

IMG20191116154833-01
সেকালের পরিখা আজও অক্ষত

এই হলো যোগসূত্র… এরপর কালের নিয়মে তৃতীয় আর একটি পরিখা আজ বিলীন৷ বালিসীতাগড় এর দুর্গ ধুলায় মিশে গিয়েছে। বাহুবলীন্দ্র সাম্রাজ্যে বংশপরম্পরায় এসেছেন – পরমানন্দ, মাধবানন্দ, গোকুলানন্দ, কৃপানন্দ, জগদানন্দ, ব্রজানন্দ, আনন্দনন্দ, রাধাশ্যামানন্দ। আগ্রার মুঘল দরবারে এক সময় উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিলো পরমানন্দের — উড়িষ্যার রাজপ্রতিনিধি হিসেবে। মুর্শিদাবাদের নবাবী হুকুমতেও জগদানন্দ ছিলেন সমাদৃত। স্বাধীন ময়নাগড় বৃটিশ পর্বে কেবল পরবশ হয়েই রয়ে গিয়েছিল। মারাঠাদের আক্রমণও ভেদ করতে পারেনি প্রতিরক্ষার চাবি, তাও অষ্টাদশ শতকে।

এবার আসি কি আছে এই ময়নাগড়ে….

ময়নাদুর্গের চৌহদ্দির মধ্যে রয়েছে বৈষ্ণব – শৈব – শাক্ত মন্দির যা যথাক্রমে শ্যামসুন্দর মন্দির, লোকেশ্বর শিব, মহাকালী রঙ্কিণীদেবী)। রয়েছেন ধর্মঠাকুর (যদিও দেখা হয়নি), মোহান্ত নয়নানন্দ দেবগোস্বামী সমাধিমন্দির, তিন শতাব্দী প্রাচীন সূফীপীর দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা), যা নৌকা থেকে দেখেই শান্ত থাকতে হলো, যদিও সেখানে যাওয়ার জন্য ছোটো ডিঙা রয়েছে। সত্যিই AN ISLAND WITH AN ISLAND এই ময়নাগড় পঞ্চদেবতার গড়ও বটে, যেখানে বৈষ্ণব -শৈব-শাক্ত-ধর্ম-পীর সকলেই আছেন।

IMG20191116164531-01
ময়নাগড় – সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র

IMG20191116160759-01
রাজবাড়ির অংশবিশেষ

সেই মধ্যযুগ থেকেই এখানে গড়ে উঠেছিলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থান। আজও সেই ঐতিহ্য সমানে চলে আসছে। একসময় প্রচলিত ছিলো ধর্ম ঠাকুরের নিত্য পূজা, জগন্নাথ- বলরাম- সুভদ্রা রথযাত্রা, বড় হোলির সান্ধ্যমেলা এবং মহেশ্বরের বৈশাখী গাজন। অবশ্য সেসব আজ স্মৃতিকথা মাত্র। গড়সাফাৎ গ্রামের চতুষ্পার্শ্বে ছিল পরিকল্পিত পরিখা, প্রতিরক্ষার তৃতীয় ধাপ হিসেবে গণ্য হতো। তা আজ অবলুপ্ত। তবে কার্তিকী পূর্ণিমায় বর্ণাঢ্য নৌ-রাসযাত্রার দৃষ্টান্ত আজ বিরল। রাসমেলা পেরিয়ে কালিদহে নৌযাত্রা করে দুর্গে গিয়ে খানিক ঘোরাঘুরির সুযোগ এই রাসমেলাকে এক দারুণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সারা বছর এই ময়নাগড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, শুধুমাত্র এই রাসমেলার কয়েকদিনই। সূর্যাস্তের সময় কালিদহ যে কি রূপ নেয়, তা হয়তো না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। লাউসেন এক কিংবদন্তি, বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুরে পশ্চিম আকাশে কোনো এক অমাবস্যার রাতে সূর্যোদয় ঘটান বলে জনশ্রুতি আছে। যাই হোক্, সে ময়নাগড়ও আজ নেই আর, হতশ্রী, তার গরিমা আর নেই,তবুও তার কাঠামো আজও অটুট। এতো বছর পরেও সেখানে রাজবংশীয়রা রয়েছেন, এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কিচ্ছুটি হয়নি। ভাবতে অবাকই লাগে… তবে পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নালোকে বা সৌদামিনীর ক্ষণিক উপস্থিতিতে কেমন অপরূপ রূপ ধারন করে এই কালিদহ তার বেশ উপভোগ্য – এটুকু দেখার ইচ্ছে রইলো….

IMG20191116163003-01
কালিদহ তখন ডুবুডুবু সূর্যের আভা গায়ে মাখে

IMG20191116163306-01
সূর্যাাস্ত পানে একলা নাও

IMG20191116163858-01
নৈসর্গিক

লোকেশ্বর শিব মন্দির

কালিদহের তীরে রয়েছে লোকেশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বেশ গভীরে শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিলো। বর্গী হামলা থেকে রক্ষা পেতে যে সুড়ঙ্গ পথ নদীতীর অবধি বিস্তৃত ছিলো, তা বেশ ভালো রকম সক্রিয় থাকায় শিবকুন্ডটি বন্যায় অতিরিক্ত জলে ডুবে যায়। মন্দিরটির নির্মাণকাল আধুনিক যুগ হলেও, টেরাকোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়৷ বিষয়বস্তু গুলিও বেশ সময়সাময়িক – অশ্বারোহী, কৃষ্ণের রথ ইত্যাদি। তবে সবথেকে আকর্ষণীয় এবং একই সাথে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া মন্দিরটি চালে একটি নারীমূর্তি। যদিও এখন এমন রঙ করা হয়েছে যে বুঝতে বেশ অসুবিধা হয় যে আদৌ টেরাকোটা আছে কি না। এই শিব মন্দিরেই এখন পূজিত হন রঙ্কিণী দেবী — যা কালীমূর্ত্তির বৌদ্ধ সংস্করণ বলা ভালো। লাউসেনের অস্তিত্বের পরিচায়ক যা….।

IMG20191116155451-01
লোকেশ্বর শিব মন্দির : সামনে থেকে

IMG20191116160104-01
লোকেশ্বর মন্দির : পেছনের দিক

IMG20191116162501-01
রঙ্কিণী কালি মূর্ত্তি

IMG20191116162414-01
টেরাকোটার নিদর্শন : রথ

IMG20191116162406-01
অশ্বারোহী : লোকেশ্বর শিব মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা

IMG20191116162323-02
শায়িত নারী

Statue Of Dignity

লোকেশ্বর শিব মন্দিরের সামনে একটু দূরত্বে রয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ, রাজা জগনানন্দের সম্মানার্থে – Statue of Dignity, ২০১৪ সালে নির্মিত৷ রাজার শেষদশায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ময়নাগড় আক্রমণ করলে জগনানন্দ আত্মসমর্পণ করেননি,গড়ের ভেতরে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকেন। হেস্টিংস অনেক হম্বিতম্বি করলেও ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মীরকাশিমের মধ্যে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী জমিদারী অক্ষুন্নই থেকে গেলো।

IMG20191116155351-01
Statue of Dignity

শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির

কালিদহের তীরে অবস্থিত আর একটি মন্দির — শ্যামসুন্দরজীউর ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দির, দেউল রীতির। এই শ্যামসুন্দরজীউ হলেন বাহুবলীন্দ্র পরিবারের কুলদেবতা। প্রতিষ্ঠা লিপি নেই, খুঁজেও পেলাম না। শুধু সংস্কারের কতগুলি তথ্য মিললো। শ্যামসুন্দর মন্দিরের দেওয়ালে নৃত্যরত গৌর-নিতাই এর মূর্তি পাওয়া গেলো। সেখানে একজন বুকস্টল নিয়ে বসে ছিলেন, একটা বই নিলাম।

IMG20191116161423-01
কুলদেবতার অধিষ্ঠান

IMG20191116161841-01
গৌর – নিতাই

IMG20191116161923-01
সংলগ্ন ঘাটের পথ

IMG20191116162027-01
শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির : গোপাল থাকেন যেখানে 

লাউসেনের গড়

লাউসেন – লাউসেন করছি এতোবার। লাউসেনের নির্মিত গড়ের প্রায় পুরোটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। যেটুকু আছে, যে কোনো সময় হয়তো ভেঙে পড়তে পারে। জঙ্গলাকীর্ণ ঐ ভগ্ন গড়ে এখন বটগাছের বাস৷ স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে কিছু সাপখোপ হয়তো আছে, এখন শীতঘুমে গিয়েছে বলে মুখোমুখি হতে হয়নি। ভেতরে ঢুকে দেখলাম কিছু বিকৃতমস্তিষ্কের লোকজন এসে দেওয়ালে নিজেদের নামগুলি খোদাই করে গিয়েছে। একটা সিঁড়ি আছে, ভাঙা। দেখলাম, কয়েকজন কিশোর বয়সী ছেলে সেটা দিয়ে ওপরে উঠে মজা করছে, আমার একটু ইচ্ছে হলেও, সঙ্গীরা পেছন টানলো। অগত্যা, শুধু ফটো তুলে ক্ষান্ত থাকতে হলো।

IMG20191116160629-01
জঙ্গলাকীর্ণ

IMG20191116160601-01
আড্ডা, এটিই লাউসেনের গড়

IMG20191116160645-01
না থাকার মতোই

IMG20191116160832-01
মাথাহীন রাজবাড়ি

সম্প্রীতির ময়নাগড়ে…

দ্বিতীয় পরিখার পর গড়ের অন্তর্ভুক্ত যে ভূখণ্ডটি ছিলো সেখানে বর্তমানে রবিবারের বাজার (ময়নার প্রাচীনতম)। এই বাজারেই বসে রাসের মেলা এই ভূখণ্ড ময়নাগড়ের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ দূর করে দেয় এখানে অবস্থিত তোরণটি, যেটি খুব ভিড়েও রাসমেলার মধ্যে সঠিক দিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অতীতে পাঠান,শেখ ও খাঁনদের আনা হয়েছিলো গড় রক্ষার কাজে। গড়সাফাতের প্রাচীন হক্কানি মসজিদটি রাজার অর্থানুকূল্যে নির্মিত। বস্তুত ময়নাগড়ের এক প্রান্তে কালিদহের অপর পাশে রয়েছে সূফীপীরে দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা) । সুতরাং, এই গড়সাফাৎ যে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির সাক্ষর বহন করে চলেছে, তার বাংলা-আরবী শব্দসমন্বয় দেখেই অনুমেয়।

IMG20191116154531-01
সূফীপীরের দরগা, নৌকা থেকে 

আকর্ষণ…

একদা প্রচলিত বাহুবলীন্দ্রদের রথযাত্রা তমলুক মহকুমার মধ্যে প্রাচীনতম৷ ময়নাগড়ের শ্যামসুন্দরজীউর রাস উৎসব পঞ্জিকাতে লিপিবদ্ধ বাংলার অন্যতম একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হয়ে আসা প্রায় ৪৬০ বছরের পুরনো এই রাসমেলা পূর্বে একমাস ধরে হলেও, পরে ২২ দিন এবং বর্তমানে পক্ষকাল ধরে চলে। এই মেলার মুখ্য আকর্ষণ থালার মতো বাতাসা এবং ফুটবলের আকারে কদমা, যদিও এখন ছোট কদমার কদর বেশি, ঠিক যেন কদম ফুলটি।

সত্যজিৎ রায় – গয়নাবড়ি এবং ময়নাগড়

অনেকেই হয়তো জানেনই না সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্ববন্দিত পরিচালকের পা পড়েছিল এই ময়নাগড়ে। এখানকার বিখ্যাত গহনাবড়ি (উপহার স্বরূপ প্রাপ্ত) সত্যজিৎ রায় তার “আগন্তুক” সিনেমার একটি দৃশ্যে ব্যবহার করেন। তারও বহু বছর পূর্বে “অশনি সংকেত” সিনেমার শ্যুটিং এর অভিপ্রায়ে রিক্সা করে এসেছিলেন ময়নাগড়, পরিখাবেষ্টিত গড় ঘুরে দেখেনও, কিন্তু পুরো ইউনিট নিয়ে যাওয়ার সাহস পাননি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গার অসুবিধার জন্য। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ হয়তো পথের পাঁচালীর বোড়াল গ্রামের মতো ময়নাগড়ও বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকতো। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা চিঠি থেকেও বাহুবলীন্দ্র পরিবারের তৈরী গহনাবড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রণবেশ সেন এর কথায় — দুটি জিনিস খুব দুঃখের, এক দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন এবং এতো সুন্দর গহনার মতো বড়ি ভেঙে খাওয়া। তাঁর উদ্যোগে এই বাড়ির গয়নাবড়ি পুরো প্রস্তুতির দৃশ্য কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রে সম্প্রচার করা হয়।

গয়নাবড়ি @ আগন্তুক
আগন্তুক সিনেমার একটি দৃশ্যে : আহারের এতো বাহার

কালিদহ পার হয়ে…

যাই হোক্, আমাদের ভাগ্যটা ভালো ছিলো। আমরা এক শনিবারে তিনটের দিকে রবিবারের বাজারে বসা ঐ রাসমেলাতে পৌঁছে তড়িঘড়ি নৌযাত্রায় চলে যায়, লাউসেনের স্মৃতিবিজড়িত ময়নাগড় ঘুরে যখন ফেরৎ আসি তখন দেখি প্রায় দু’শো লোক নৌরাসযাত্রা উপভোগ করতে উৎসাহে অপেক্ষারত। কালিদহের জলে গোধূলির আকাশ প্রতিফলিত হওয়ার পূর্বেই আমরা সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্রের মেলা থেকে খানিক কদমা কিনে,ব্যাগস্থ করে ফিরে আসি…..!

IMG20191116165353-01
কদমা

IMG_20191119_183434
পুরো মানচিত্র রইলো, যাতে আগ্রহী যারা, তারা কেউ ছেড়ে না আসে (‘কিল্লা ময়নাচৌরা’ থেকে সংগৃহীত), আমরা ঘুরতে পারিনি 

তথ্যসূত্র :
কিল্লা ময়নাচৌরা – ডঃ কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

© শুভঙ্কর দত্ত || November 19, 2019

ঘুরে এলাম কুড়ুমবেড়া-মোগলমারি-শরশঙ্কা…

বহুদিনের ইচ্ছে কুড়ুমবেড়া যাবো…
সেই কবে ফেসবুকে জনৈক ভবঘুরের পোস্ট দেখেছিলাম৷। সেই কত্ত দিনের প্ল্যান একটা। আগে দু’বার ব্যর্থ হয়েছে। তার মধ্যে একবার বুলবুল এর জন্য। শেষমেশ যাওয়া হলো…. তাও কুড়ুমবেড়া শুধু নয়, সাথে মোগলমারি বৌদ্ধবিহার হয়ে শরশঙ্কা দীঘি — এক্কেবারে কম্বো প্যাকেজ যাকে বলে….! সৌমেন তো থাকই, এবার সুুুুুরজিৎও সামিল হলো….!

কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু…

 

IMG20191113105514-01
বহিরাবরণ

এবার কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু করা যাক্…! বেলদা থেকে কেশিয়াড়ী যাওয়ার বাসে করে ১০ কিমিরও কম দূরত্বে কুকাই, সেখান থেকে সদ্য বাঁধানো পথে টোটোই করে গগণেশ্বর গ্রাম…..! বটতলায় এসে থামলো… একদিকে বিস্তীর্ণ পুকুর আর তারই উল্টো দিকে ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলা প্রায় সাতশো বছরের পুরনো এই দুর্গ।ইংরেজরা জেলার গেজেটিয়ার রচনার সময়ও এটিকে দুর্গ বলেই উল্লেখ করেছে।

IMG20191113110357-02
করমবেরা….

IMG_20191114_123357-01
গুগল ম্যাপে স্যাটেলাইট ভার্সান কি? কারুকাজ বটে…

নামের বিভিন্নতায় ‘র’ আর ‘ড়’ এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিলো। ও বাবা, ভেতরো ঢুকে দেখি লেখা আছে আর একরকম- ‘করমবেড়া’!
যাই হোক্, নাম যাই হোক্, এবার একটু ইতিহাস কি বলছে, সেখানে তাকানো যাক্! আর এক গোলমাল! ইতিহাস এমনিতেই বিতর্কিত এবং এই জায়গাটির ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি “নানা মুণির নানা মত” একদম সাড়ম্বরে প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও সেদিকে যাচ্ছি না।

 

একটু ইতিহাস…

১৪৩৮ থেকে ১৪৭০ সালের মধ্যে ওড়িশার রাজা কপিলেন্দ্রদেবের আমলে নির্মিত হয় এই দুর্গ। গজপতি বংশের রাজা কপিলেন্দ্রদেবের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল বর্তমান হুগলি জেলার দক্ষিণ অংশ মান্দারণ থেকে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ পর্যন্ত। অবশ্য মান্দারণ আমার বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই। বারবার গেলেও এটা একদমই অজানা ছিলো। ঝামা বা ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে আদতে একটি শিবমন্দিরই তৈরি হয়েছিল এখানে।

IMG20191113111227-01
প্যানোরমা তে কুড়ুমবেড়া

IMG20191113114133-01
শৈলী…মাকড়া পাথর

প্রথমে আফগান সুলতানরা (পড়ুন দাউদ খাঁ) দখল করেন এ দুর্গ। অতঃপর ঔরঙ্গজেবের আমলে আফগানরা পরাজিত হলে মোগল সম্রাটের হাতে আসে সে দুর্গ। বাংলা এবং উড়িষ্যার বহু মন্দির মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর ফরমান আসে, বাদ যায়নি এই দুর্গের ভেতরকার মন্দিরটিও, একেবারে দুর্গের ভেতরের মাঝে জলাধারের মতো যে ভাঙা অংশটি রয়েছে (যাকে যজ্ঞবেদীও বলা হচ্ছে), দেখলে বোঝা যায়, সেটি কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যদিও ভিন্নমত। তবে তিন গম্বুজের ঐ স্থাপত্যখানি যে মসজিদ সেটাও আন্দাজ করা খানিক সহজই।

IMG20191113111337-01
দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ

IMG20191113115750-02
কিছু নবীন…

তাহের খানের অধীনে সেনাদের আশ্রয় শিবির হয়ে ওঠে কুড়ুমবেড়া। সেই থেকে মন্দির বদলে যায় দুর্গে। ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা যোগেশচন্দ্র বসু লিখেছেন, “…মন্দির গাত্রে উড়িয়া ভাষায় লিখিত যে প্রস্তর ফলকখানি আছে, তাহার প্রায় সকল অক্ষরই ক্ষয় হইয়া গিয়াছে, কেবল দু’একটি স্থান অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট আছে, উহা হইতে ‘বুধবার’ ও ‘মহাদেবঙ্কর মন্দির’ এই দুইটি কথা মাত্র পাওয়া যায়।” (বই খানি আমি পড়িনি যদিও)।

IMG20191113105731-01
প্রাচীন…

পরে এই দুর্গে মারাঠারাও ঘাঁটি তৈরি করেছিল বলে মনে করা হয়। বেশ কয়েকজন গবেষক সে কথা জানিয়েছেনও। লিখেছেন। তবে এটিকে ঠিক দুর্গ বলা যায় কি? কোনো অস্ত্র ভাণ্ডার নেই, লুকিয়ে থাকার গোপন কুঠুরি নেই, বিপদ-আপদে-আক্রমণে হুট করে পলায়ন করার জন্য বাইরে বেরোনোর রাস্তা কোথায়? সবথেকে বড়ো কথা ওয়াচটাওয়ার নেই। বরং এটি একটি উৎকল স্থাপত্যেরই নির্দেশক, মানে এর গঠন শৈলী। যারা বহু বার পুরী গিয়ে তা করায়ত্ত করতে পারেননি, তাদের প্রতি সমবেদনা।
মাকড়া পাথরে তৈরী অপূর্ব এই সৌধের প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকে রয়েছে তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদ। একদা জেলা গেজেটিয়ারে লেখা হয়েছিল, সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জনৈক মহম্মদ তাহির এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯৯০ সালে কুড়ুমবেড়া অধিগ্রহণ করেছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া।

IMG20191113114533-01
পরিখা থেকে….

IMG20191113111702-01
তিন গম্বুজের মসজিদ

IMG20191113114707-01
মধ্যমণি বিলীন…মসজিদই তাই কেন্দ্র

IMG20191113120751
কারসাজি… ট্রিপল ক্যামেরা 😂

তবে দেখে ভালো লাগলো যে রক্ষণাবেক্ষণ হয়, রেলিং দিয়ে দুর্গ মধ্যস্থ এলাকাগুলিতে এখন বোধহয় আর ঢোকা যায় না। শোভাবর্ধক গাছ লাগানো আছে, রলিং ঘেঁষে। একজন লোককেও দেখলাম, জল দিতে।

দুর্গটির ভেতর এবং বাহির — দারুণ লেগেছে। প্রাকৃতিক বড্ড বেশিই। পরিধি বরাবর হাঁটতে থাকলে মাঝে মাঝে পা হড়কে যায়, শ্যাওলার দল জমি অধিগ্রহণ করেছে যে। পুরো দুর্গটা চক্কর দিতে বেশ সময়ও লাগে….বেশ ঠাণ্ডাও অনুভূত হয়, শ্যুটিং স্পট হিসেবে মন্দ নয়। ভাবতেই অবকা লাগে পুরোটা পাথর কেটে বানানো… অথচ এখনও অটুট,যদিও কিছু পিলার নতুন করে বানানো। যে কোনো একটা কর্ণারে গিয়ে ক্যামেরা তাক করলেই একটা একটা করে লকস্ক্রিন করার ফটো বেরিয়ে আসবে….! সঙ্গে থাকলো – রবিকিরণ, প্রায় সব সময়ই দারুণ দারুণ সব ফ্রেম উপহার দিয়ে দিলো সে।

 

IMG20191113113449-01
সাতরঙা ফ্রেম…

IMG20191113120139-01
প্রাকৃতিক ভাজক…

বাইরে থেকে বহু চেষ্টা করেও… ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, পুকুরপাড় সবকিছুর ইস্তেমাল করেও পুরোটা এলো না। বটগাছের ঝুরির ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে দুর্গ, — তার ভেতর আর বাহির যেন একে অন্যের পরিপূরক৷

IMG20191113122251-01
মৎস্য সন্ধানে… সামনের পুষ্করিণীতে

IMG20191113113004_01-01
প্রতিভাত রবি

—————————————————————-

এবারে মোগলমারি…

IMG20191113144743
কদম কদম বড়ায়ে যা..

বেলদায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে চলে এলাম মনোহরপুর। গুগল ম্যাপে ভুলভাল এবং একাধিক অবস্থানের কারণে প্রথমে হেঁটে বিপথগামী হচ্ছিলাম, সহায় হলেন একজন বৌদিস্থানীয় ভদ্রমহিলা। পরে বুঝলাম একটা পথ নির্দেশক বোর্ডকে আমরা অবহেলা করেছি৷ ব্যাক গিয়ার মেরে হেঁটে প্রায় হাফ কিমি যেতেই গ্রাম্য রাস্তার একপাশে পড়লো – মোগলমারির বৌদ্ধবিহার। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সুন্দর নয়, অর্থ সাহায্যের অভাবে অবহেলিত এবং সুসজ্জিত নয় বটে, তবে তার ইতিহাস রীতিমতো গাম্ভীর্য বহন করে। প্রায় ১৫০০ বছরের ইতিহাস এই মোগলমারি৷ ওখানের এক বিবরণ বোর্ডে দেখলাম লেখা আছে এটি গুপ্তোত্তর যুগের একটি স্থাপত্য!

IMG20191113135851-01
মোগলমারি বৌদ্ধবিহারের প্রবেশপথ

IMG20191113140359-01
খননস্থল

‘মোগলাই’ খেতে গিয়ে প্রথমবার যেমন মনে হয়েছিল বেশ একটা ঐতিহাসিক ফাস্ট ফুড খাচ্ছি, সেরকম ‘মোগলমারি’র নামকরণের কারণ খুঁজতেই অবধারিতভাবেই চলে এলো — মোগলাই থুড়ি মোগল…মুঘল।
কেউ বলেন মুঘল-পাঠান যুদ্ধে অনেক মুঘল সৈন্য মারা গিয়েছিল বলে জায়গাটির নাম মোগলমারি। কেউ বলেন মুঘলরা এই পথ (‘মাড়’ অর্থ পথ) মাড়িয়ে গিয়েছিল; তাই অমন নাম। পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত সুবর্ণরেখা…সে বিহার নেই, নেই সুবর্ণরেখাও, মন খারাপ করেই সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, প্রায় দু-তিনি কিমি দূরে…..
সামন্তরাজা বিক্রমকেশরীর রাজধানী ছিল এ অঞ্চল। কন্যা সখীসেনার পড়াশোনার জন্য জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছিল।

IMG20191113142914-01
মিউজিয়াম @ মোগলমারি

IMG20191113142759
অবহেলিত মিউজিয়াম

চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বিবরণীতেও এই বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ রয়েছে।
২০০৩-০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষক ডঃ অশোক দত্তের তত্ত্বাবধানে খননকার্য প্রথম শুরু হয়, যদিও তার আগে ময়ূরভঞ্জ (অধুনা ওড়িশা) এর আর্কিওলজিকাল সার্ভেতে এর কথা উল্লেখ আছে, হয়তো সেটিই সূত্র হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে অদূরে যেই কুড়ুমবেড়ার গল্প এতক্ষণ করলাম, সেখানে আফগান সুলতান দখল নেওয়ার সময় এই মোগলমারির সেনা ছাউনি থেকেই ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি তাকে আক্রমণ করেন, পরে ঔরঙ্গজেবের মুদ্রার হদিশ মেলে এখানে।
পশ্চিমবঙ্গে আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারগুলির মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়। খননে পাওয়া গেছে প্রায় ৫২ ধরণের নকশাযুক্ত ইঁট, রাজা সমাচার দেবের মিশ্রধাতুর মুদ্রা, স্বর্ণ লকেট এবং মুকুট, বুদ্ধ-বোধিসত্ত্ব-বৌদ্ধ দেবদেবীর ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, স্টাকোর কারুকার্য মণ্ডিত নক্সাযুক্ত দেওয়ালঅলংকরণ ও ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র, প্রদীপ প্রভৃতি জিনিস। গুপ্ত পরবর্তী ব্রাহ্মি অক্ষর যুক্ত সীল ও সীলমোহরও আবিষ্কৃত হয়েছে এইখানে। বর্তমানে খননকার্য স্থগিত আছে, মিউজিয়ামের ওখানের একজন দাদা বললেন এখন আর খননের পারমিশন নেই।

IMG20191113142349
প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শনবাহী…

IMG20191113143056-01
মাটি খুঁড়ে পাওয়া স্টাকো মূর্তির কতিপয় এখনো বিরাজমান

বেশিরভাগই এখানে এখন আর নেই। কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে পাশে একটা ছোট্ট মিউজিয়াম আছে যাতে খননে প্রাপ্ত কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় তরুণ সংঘের উদ্যোগে সে মিউজিয়াম দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছেছি, তখন চাবি লাগানো দেখে ফোন করলাম, একজন খানিক পরে এসেই খুলে দিলেন। একটু একটু গল্প বললেন। মিউজিয়ামটির হাল ফেরাতে এবং সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার জন্যে ওনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁবু খাটানোর মতো একটা জায়গায় গিয়ে দেখলাম কতগুলো আরো মূর্তি৷ মিউজিয়ামের ভেতরে শুধুই খুচরো কতগুলো জিনিসপত্র আছে। বাকি সবই সরকারের অধীনে, কলকাতার জাদুঘরে।
খননকার্যে পাওয়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অবাক করে তথ্য হলো – এখানে একদিনে, একই স্থান থেকে একই সঙ্গে ৯৫ টি ব্রোঞ্জ মূর্তি উদ্ধার পৃথিবীর প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এক বিরলতম নজির। পণ্ডিতগণের মতানুসারে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতে অবস্থিত প্রাচীন এবং বৃহৎ বৌদ্ধ স্থাপত্যগুলির মধ্যে অন্যতম।

IMG20191113142107
এখন সবই যাদুঘরে

IMG20191113143437
পর্যটকদের সাত্ত্বনাদায়ক জায়গাটি

ভারতবর্ষের মাটিতেই পথচলা শুরু হয় হিন্দু – জৈন- বৌদ্ধ ধর্মের। কালক্রমে সব ধর্মের চড়াই-উতরাই হয়েছে। সেই ষষ্ঠ শতক থেকে বারংবার পুনর্নির্মাণের মধ্যে দিয়ে সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে এই মোগলমারি৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের অখ্যাত এক গ্রামের পথের পাশে….. ক’জনই বা আর বুঝবে এর গুরুত্ব? বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে!
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তাই দেখে আসা উচিৎ, এই জন্য যে আমাদের অবহলোর দরুণ কত জানা জিনিসও আমাদের কাছে অজানা হয়েই রয়ে যায়।

পথনির্দেশ – বেলদা থেকে দাঁতনগামী বাসে মনোহরপুর বা ট্রেনে খড়গপুর থেকে ট্রেনে করে নেকুড়সেনি থেকে অনতিদূরেই….

 

————————————————————-

অপরাহ্নের  শরশঙ্কা দীঘি….

IMG20191113160631-01
যে দিকে দুচোখ যায়..

মোগলমারি পর্ব চুকিয়ে বাসে উঠেছি, সরাইবাজার (দাঁতন) যাবো। সুরজিৎ এর বন্ধুর সাথে দেখা, সে জিগ্যেস করলো কোথায় যাবি?
উত্তরে শরশঙ্কা শুনে আশেপাশের বেশ কয়েকজন অবাক হলেন। সে হোক গে…

দাঁতন থেকে একটা ট্রেকারের মাথায় চেপে বসলাম। দুলতে দুলতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু নামবো কোথায়? শরশঙ্কা বলতে ট্রেকারের হেল্পারের পোস্টে থাকা লোকটি বললো – শরশঙ্কাতে ৪ টে স্টপেজ, কোথায় নামবে? বলে দিলাম যেখানে নামলে দীঘিতে সহজে যাওয়া যাবে। এসব বলতেই স্থানীয় এক ভাই সহায় হলেন, তিনিই বলে দিলেন লোকটিকে আমাদের আসলে কোথায় নামলে সুবিধে হবে। নেমে দীঘির পাড়ে গিয়ে দেখি কতগুলো বাঁদর সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে, উঁচু পাড়ে বসে। একটা জিনিস দেখে রীতিমতো অবাক লাগলো….দীঘিতে যাতে কচুরিপানারা ভিড় না জমায় তার জন্য দীঘির পাড়েই চারপাশে আলাদা আলাদা করে ছোটো ছোটো পুকুর কেটে তার মধ্যেই কচুরিপানাকে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। দীঘির এপার থেকে ওপার স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। যেদিক তাকায় শুধু জল আর জল…..ব্যাকগ্রাউণ্ড জুড়ে শুধু সাদা রং! চারদিকের পাড়ে গাছগাছালি….পাখিদের ডাক! কি অপূর্ব বাস্তুতন্ত্র সেখানে বিরাজ করে, বায়োলজির কেউ গেলে আরো ভালো প্রত্যক্ষ করতে পারতো। দীঘির চারদিকে পাড়ে পাড়ে বেশ কিছু মন্দির রয়েছে।

IMG20191113155355-02
একটু জিরো…..

IMG20191113160810-01
ছটা…

IMG20191113160821-01
দূরে দিগন্তে মন্দির….

ওই দীঘির দক্ষিণ পূর্ব কোনে রয়েছে পীর দেওয়ানগঞ্জের মাজার। পৌষ সংক্রান্তির দিন তাঁর কবরে মাটি দিতে আসেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। পৌষ সংক্রান্তির দিন মেলা বসে। সেখানে রয়েছে পান্ডব ঘাট।
মাজারের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য মন্দির।
জগন্নাথের মন্দির, জটেশ্বর শিব ,ঝিঙ্গেশ্বর শিব, রামেশ্বর শিব,কালী ও শীতলা মন্দির।
সে সব জায়গায় যাওয়া আর হলো না। অপরাহ্নের ডাকে ফিরে আসার ট্রেকার ধরার ছিলো যে….!

IMG20191113155822-01
বিলীয়মান সূর্যের আভা

লোকবিশ্বাস

মহাভারতের মূষল পর্বে শ্রীকৃষ্ণ বৃক্ষে আশ্রয় নেওয়াকালীন জরা ব্যাধের শরাঘাতে হাত থেকে পাঞ্চজন্য শঙ্খ ছিটকে পড়ে। তার আঘাতেই এই দীঘির সৃষ্টি বলে লোকবিশ্বাস।

পাণ্ডবরা বিরাটনগরে যাওয়ার পথে ক্লান্ত হয়ে এই দীঘির পাড়ে রাত্রিযাপন ও স্নান করেন। তারই অনুকল্পে দিঘির একটি ঘাটের নাম পাণ্ডব ঘাট। এই সেই পাণ্ডব ঘাট যেখানে মকর সংক্রান্তিতে স্নান করেন পুণ্যার্থীরা।

রাজ‍্যের বৃহত্তম দীঘি এই দীঘি নিয়ে বহুচর্চিত জনশ্রুতিটি হলো এটি নাকি রাজা শশাঙ্কের আমলে বানানো।
সর শব্দের সংস্কৃত ভাষায় ‘জল’।
রাজা শশাঙ্ক মাকে নিয়ে সম্ভবত জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছিলেন পুরীতে। যাচ্ছিলেন বা ফিরছিলেন ,ওই গ্রামে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে তাঁবু ফেলেন তাঁরা। গ্রামবাসীদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হন শশাঙ্কের মা। প্রশ্ন করেন ,এত ভালো জমি থাকা সত্ত্বেও এখানে ভালো ফসল হয়না কেন ? গ্রামবাসীরা বলেন জলের অভাব। জল নেই গ্রামে। শশাঙ্কের মা তখন বাংলার রাজাকে বলেন , এদের জন্য তুই কিছু করতে পারিস না ?
মায়ের কথায় শশাঙ্ক তখন তাঁর তুন থেকে সবচেয়ে বড় তির বের করেন। প্রতিজ্ঞা করেন,তির যত দূর যাবে , তত বড় করা হবে দীঘি। যা বানাতে সময় লেগেছিল তিন বছর।
শশাঙ্কের শর থেকে সৃষ্ট বলেই এরূপ নামকরণ। তবে কোনোটির তেমন ভিত্তি নেই। যদিও এই জনশ্রুতিগুলিই অপূর্ব সুন্দর এবং সুবিশাল এই দীঘিকে মহিমা দান করেছে!

IMG20191113155240-01
গাছের অলিগলি থেকে…

বেশ কিছুক্ষণ দীঘির পাড়ে বিশ্রাম নিয়ে, টাটকা অক্সিজেন নিয়ে উঠে এলাম, ফেরার জন্যে। সূর্যাস্তটা দেখতে পেলে ১৬ আনা পূর্ণ হতো। ভাবিইনি যে এটাও দেখা হবে, বারবার বাস-ট্রেকার এসব করেও, যতই গুগল ম্যাপ বলে চিৎকার করি না কেন, জীবন্ত জিপিএস খুব বেশি কাজে দেয়, এবারেও তার অন্যথা হয়নি।

IMG20191113161137-01
মন্দির….অন্যতম একটি

পথনির্দেশ – খড়গপুর থেকে ট্রেনে দাঁতন, সেখান থেকে হেঁটে উল্টো দিকে এলে ক্রসিং এর কাছেই ট্রেকার মিলবে অথবা সরাইবাজার গিয়েও ট্রেকার ধরা যায়! বাসেও আসা যায়। দাঁতনগামী বাস ধরে সরাইবাজার, বাকিটা আগের মতোই।

IMG20191113113742
তিনমূর্তি 😉

এখানেই সমাপ্ত….

IMG20191113121323-01
উৎসুক চোখে আমাদের টা টা করে @ কুড়ুমবেড়া


তথ্যসূত্র – গুগল, ফেসবুক এবং সংবাদপত্র.. এছাড়াও অনেকেই সাহায্য করেছে পথনির্দেশ দিয়ে সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে! তাছাড়া সুরজিৎ আর সৌমেন এর উপযুক্ত সঙ্গৎ ছাড়া বারবার বাস পাল্টে তিনটে বেশ দূরত্বে থাকা  জায়গা ঘোরা সম্ভব হতো না।

ও হ্যাঁ, সৌমেনের নব আবিষ্কৃত  অ্যাপটির কথা কি করে ভুলে যায়? সদস্য বেড়ে গেলে উত্তম সাহায্য করবে…! Trip Expense Manager 🤘👌

©  শুভঙ্কর দত্ত || November 14, 2019

 

ইতিহাসের সাক্ষী নাড়াজোল রাজবাড়িতে…

PANO_20190908_133810-01
অন্তরগড়ে…. সারিবদ্ধ

ইতিহাস সাবজেক্টটা মোটেও বিরক্তিকর নয়, বরং ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষক বোধ হয় কমই আছেন, অন্তত যারা পাতায় আবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস চাক্ষুষ করবার সুযোগ করে দেন। তারপর, ঘোরার সাথে না জানা হরেক কাহিনী! অবশ্য মজাটা অন্য জায়গায়, পরীক্ষা দিতে হবে না এসবের…. আগ্রহটা বাড়ে, এই আর কি!

এরকমই জাতীয় কংগ্রেস বা পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুপ্তস্থান নিয়ে আলোচনার সময় মেদিনীপুর এর বিশেষ উল্লেখ থাকলে তখনই ইতিহাস চেটেপুটে নিতাম৷ সে সময় চলে গিয়েছে। এখন ব্যস্ততার জীবন, তার মধ্যেই একদিন টুক্ করে বেরিয়ে যাওয়া….
এরকমই একদিন বেরিয়ে পড়লাম ইতিহাস-বিজড়িত নাড়াজোল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে…. মেদিনীপুর – কেশপুর হয়ে পৌঁছে গেলাম দাসপুর – ১ নং ব্লকের কিসমত নাড়াজোলে….

কিসমতই বটে! কেন কিসমত সে বিষয়ে পরে আসা যাক্….

—————————————————————–

১. নাড়াজোল – নাম কেন?

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ‘নাড়া’ অর্থে আমরা যাকে গ্রাম্য ভাষায় লাড়া বলি অর্থাৎ জমিতে ধান কেটে নেওয়ার পর ধান গাছের যে অংশ জমিতে অবশিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকে আর অসমীয় ভাষা ‘জোলা’ এর মানে জল….. নাড়া+জোলা থেকেই নাড়াজোল।

২. নাড়াজোলের প্রথম ঠাঁই

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীরজাফরকে গদিচ্যুত করে ইংরেজরা তার জামাই মিরকাশিমকে নবাব পদে বসান। বিনিময়ে মিরকাশিম ইংরেজদের উপহার দিলেন মেদিনীপুর, বর্ধমান, ও চট্টগ্রামের জমিদারি এবং এর সাথেই মেদিনীপুরের সঙ্গে নাড়াজোলের স্বাধীনসত্তার অবলুপ্তি ঘটে। পূর্বতন মেদিনীপুর জেলার ৫৪ টি পরগনার মধ্যে নাড়াজোল একটি উল্লেখযোগ্য পরগনা হিসেবে পরিচিত ছিল।

৩. ঘোষবাবুর স্বপ্ন বটে…

আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠার পেছনে জনশ্রুতি রয়েছে —  বর্ধমান নিবাসী উদয়নারায়ন শিকারের খোঁজে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং শিকার করতে করতে গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেন। সন্ধ্যালগ্নে তিনি প্রত্যক্ষ করেন এক অলৌকিক দৃশ্য, তিনি একটি স্থানে অসম্ভব রকমের আলোর আভাস প্রত্যক্ষ করেন। রাত্রে শয়নকালে উদয়নারায়ন দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান এবং সেই স্থান থেকেই দেবী জয়দুর্গার সোনার মূর্তি ও প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। সেই জয়দুর্গা আজও রাজবাড়িতে পূজিত হয়ে আসছেন। সেই ধনসম্পদ দিয়েই রাজা এই রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

IMG_20190908_133443
মূল ফটক

IMG_20190908_131002-01
রাজকীয় বাতায়ন

IMG_20190908_132919-01
বিপ্লবের সাক্ষী

৪. ‘ঘোষ’ থেকে ‘খান’, ভায়া ‘রায়’…

প্রতিষ্ঠাতা উদয়নারায়ণের এক উত্তরপুরুষ কার্ত্তিকরাম ঘোষের আমলে তৎকালীন বাংলার অধীশ্বর থেকে ‘রায়’ উপাধী পান। ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে বলবন্ত রায় তদানীন্তন বাংলার নাজিমের কাছ থেকে খান উপাধি লাভ করেন। সেই থেকে নাড়াজোলের জমিদাররা খান পদবি গ্রহণ করেন।

IMG_20190908_125605-02
শুধু আমিষের জন্য

IMG_20190908_131352
এখন স্কুল….রাজকীয় তাই না?

৫. মোহনলাল খান

এই রাজ পরিবারের স্থাপত্য কীর্তিগুলির প্রায় সবই মোহনলাল খানের আমলে স্থাপিত হয়। লংকার অনুকরণে গড় – লংকাগড় তৈরী করেন, প্রায় ষাড়ে ষাট বিঘা জমিতে পুকুর খনন করে তিনি একটি গৃহ নির্মাণ করেন যা বর্তমানে ‘জলহরি’ নামে খ্যাত। যেটা করতে নাকি সেই সময় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিলো।

IMG_20190908_143011
মধ্যমণি

 

IMG_20190908_143354-01
জলহরি

শুধু তাই নয়, মোহনলাল খান রাজবাড়ির ভেতরের গড়ে একটি দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অযোধ্য থেকে পাথর এবং দেবমূর্তি এনে তিনি নাটমন্দির টি স্থাপন করেন। কথিত আছে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একবার ছোটো রবিকে নিয়ে নাড়াজোল আসেন এবং বেলজিয়াম কাঁচ সমৃদ্ধ এই নাটমন্দির তাকে এতোটাই প্রভাবিত করে যে তিনি এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তিনিকেতনে ছাতিমতলার সাধনামঞ্চ তৈরী করেন।

IMG_20190908_133616
রাজকীয় নাটমন্দির

IMG_20190908_133547
প্রবেশদ্বার

৬. উত্তারাধিকার প্রাপ্তি?

মোহনলাল খানের মৃত্যুর পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে নাড়াজোল রাজপরিবারের উত্তারাধিকার প্রাপ্তি অন্তর্কলহের শুরু হয় যা তখনকার দিনে প্রতিটি রাজবংশেই কমবেশি চালু ছিলো। এরপর মনেন্দ্রলাল খান অধিপতি হওয়ার মধ্যে দিয়ে সে সবের ইতি ঘটে। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারত সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি উৎসব উপলক্ষে ইংরেজ সরকার মহেন্দ্রলাল খানকে ‘রাজা’ উপাধি প্রদান করেন। সেই থেকেই….. নামের আগে রাজা আর পরে খান…

৭. স্বদেশী আন্দোলন এবং নরেন্দ্রলাল খান

এরপর নরেন্দ্রলাল খান রাজা হন এবং তিনি মূলত জনকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের তার নাম স্বণাক্ষরে লেখা থাকবে, তার যোগদানের সাথে সাথেই নাড়াজোল রাজবাড়ির পরিচিতি আরো বাড়তে থাকে। নরেন্দ্রলাল খানের সহযোগিতায় এই রাজবাড়িতেই গুপ্ত সমিতির বৈঠক চলতো। হেমচন্দ্র কানুনগো, অরবিন্দ ঘোষ এর মতো বিপ্লবীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তখন মেদিনীপুর কেন্দ্রিক যে স্বদেশী আন্দোলনটা চলতো তার প্রায় পুরোটাই রাজাদের অর্থানুকূল্যে হতো এবং নরেন্দ্রলাল খান সেই দিক থেকে প্রচুর অর্থই ব্যয় করেন।  নরেন্দ্রলালের প্রতি ইংরেজ সরকারের দৃষ্টি সজাগ ছিল। ১৯০৮ সালের ২৮ শে আগস্ট নরেন্দ্রলালের গোপ প্রাসাদে পুলিশ তল্লাশি চালায় এবং মেদিনীপুর বোমা মামলায় নরেন্দ্রলালকে গ্রেপ্তার করে কনডেমড সেলে রাখা হয়। কিন্তু উপযুক্ত প্রমানের অভাবে নরেন্দ্রলালকে মুক্তি দিতে হয়। নরেন্দ্রলাল খান পরলোকগমন করেন ১৯২১ সালে।

IMG_20190908_131910
গোপন ডেরায়….

৮. দেবেন্দ্রলাল খান…

দেবেন্দ্রলাল খান তার পিতার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এবং পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচনে সরাসরি নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯৩০ সালে ২৬ শে জানুয়ারি তিনি নাড়াজোল রাজবাড়িতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, সেই শুরু হয়, তারপর ১৯৪০ পর্যন্ত সারা মেদিনীপুর জুড়ে তিনি বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়ে গুপ্ত সমিতির সদস্যদের জাগ্রত করেন। এরই ফলস্বরূপ মেদিনীপুরের তিন কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করা হয়, তার মধ্যে বার্জ এর নাম সর্বজনবিদিত৷ ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভপতি হওয়ার পর নেতাজী মেদিনীপুরে আসেন, এবং দেবেন্দ্রলাল খান কে নিয়ে তিনি যে তিনটি সভা করেন তার মধ্যে নাড়াজোল রাজবাড়িতর সভাটি মেদিনীপুরের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ক্ষুদিরাম বসুর বাবা এই রাজবাড়ির তহশিলদার ছিলেন এবং সেই সূত্রে শৈশব থেকেই তার এই রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এইখানে বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা ছিলো, ছিলো বোমা তৈরীর কক্ষ, অস্ত্র রাখার গোপন জায়গা,,শুধু তাই নয়, বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যার প্রধান ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো৷ এছাড়াও বারীণ ঘোষ, উল্লাসকর দত্তের মতো বিপ্লবীদের সব ষড়যন্ত্রের সভা এখানেই সংগঠিত হত।

IMG_20190908_133509
কাছারির মাঠ – নেতাজীর সভাস্থল

IMG_20190908_133500
দুর্গাদালান-শিব মন্দির

IMG_20190908_124503~2
নেতাজী – এখনও অতন্দ্র প্রহরী

৯. গান্ধীজী এবং অন্যান্যরা….

গান্ধীজী এই রাজবাড়িতেই ‘অস্পৃশ্যতা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ১৯২৫ এর দিকে। 

কাজী নজরুল ইসলাম এর পদধূলি পড়েছিল এই রাজবাড়িতে। মোতিলাল নেহেরু থেকে জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইড়ু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পদার্পণে নাড়াজোল পবিত্রভূমিতে পরিণত হয়েছিলো, সে কথা বলাইবাহুল্য।

১০. রানি অঞ্জলি খান….

স্বাধীন ভারতবর্ষের পাঁচ বার বিধায়ক হওয়া রাজপরিবারের সদস্য রানি অঞ্জলি খান নারী শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হন। মেদিনীপুরের গোপ রাজবাড়ি এবং নাড়াজোলের রাজবাড়ি তিনি প্রদান করেন, যা বর্তমানে যথাক্রমে গোপ কলেজ (মহিলা) এবং নাড়াজোল রাজবাড়ি নামে পরিচিত।

IMG_20190908_130546
পূর্বতন নাড়াজোল রাজ কলেজ

 

**************************************

 এরপর থেকেই রাজবাড়ির সাথে সাথে রাজপরিবারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে… ২০০৮ সালে পঃবঃ সরকার হেরিটেজ তকমা দিলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এখন কাজ চলছে যদিও…. এই বছর নেতাজীর জন্মজয়ন্তীর দিনে হাওয়া মহলের সামনেই নেতাজীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে নাড়াজোল গ্রামবাসী এবং প্রশাসনের সহযোগিতায়…! 

এবার নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে কেন কিসমত। যে রাজ বাড়ির দেওয়ালে স্বাধীনতা আন্দোলনের বাঘা বাঘা সব মানুষের নিঃশ্বাস পড়েছে, সেই রাজবাড়ির কিসমত আলাদাই!
ঘোরার জায়গা বলতে রাস্তা দিয়ে ঢুকেই শিব মন্দির, উল্টোদিকে রাসমঞ্চ। তারপর একটু গেলেই পেল্লায় হাওয়া মহল বা নাচ মহল, রাজবাড়ির অন্দরে আমিষ খাওয়া বারণ, তাই এই মহল বানানো, বহুদূর থেকে আসা নর্তকীদের নিয়ে মদ-মাংস সহযোগে ফূর্তিতে মেতে উঠতেন রাজা এবং তার তাঁবেদাররা। এর পেছনেই বাগান আর পবিত্র পুকুরটি কিন্তু সবই এখন সংরক্ষণের অভাব।

IMG_20190908_125818-01
হাওয়া মহলে যেতে হলে…

IMG_20190908_123143
জিরচ্ছে….

IMG_20190908_122234
প্রবীনের কাঁধে নবীন ছোঁয়া

IMG_20190908_124405
হাওয়া মহল

IMG_20190908_124101~2
ফাঁক ফোঁকর..

রাস্তার উল্টোদিকে নাড়াজোল রাজবাড়ি, যেখানে আগে নাড়াজোল রাজ কলেজের ক্লাস চলতো নিয়মিত। কলেজের গেট দিয়ে ঢুকেই যেটা প্রথমে দেখা যায়, সেটা নহবতখানা, এখান থেকেই দিনে তিনবার নহবতের সুর ভেসে যেত রাজবাড়ির অন্দরমহলে সহ গোটা নাড়াজোলের আকাশে বাতাসে। এরপর শিব মন্দির, কাছারি, ভগ্নপ্রায় দুর্গাদালান, সরস্বতী দালান, নবরত্ন মন্দির যেখানে এখন জয়দূর্গা পূজিত হন। পরিয়ে গেলেই আসল রাজবাড়ি। যার অন্দরমহলে ঢুকলেই একটা আলাদা গন্ধ অনুভূত হতে বাধ্য। এই রাজবাড়িতেই আগে কলেজের ক্লাস চলতো৷ রাজবাড়ির ভেতর ঢুকলেই বিপ্লবীদের কক্ষগুলি চোখের সামনে চলে আসে। সারি সারি কক্ষ, যতই যাওয়া যায় আর পুরো রাজবাড়িটাই পরিখা দিয়ে ঘেরা। যেটা ভালো করে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। রাজবাড়ির ছাদে ওঠা হলো না। এই আক্ষপে নিয়েই ফিরতে হলো। ফেরার পথে দুপুরের আহার সেরে মাত্র দু কিমি চরণবাবুর ট্যাক্সি চেপে চলে এলাম – লংকাগড়, জলহরি৷ গোটা ভ্রমণের এই জলহরিই ছিলো একটা অমোঘ টান। কি অসাধারণ টেকনোলজি দিয়ে তৈরী হয়েছিলো জানিনা, বেশ বড়োসড়ো একটা পুকুরের মাঝে একটা গড়। পুকুরের চার ধারে না হলেও তিন ধারেই লোকজন বেশ আয়েস করে ছিপ ফেলছে, মাছ পড়ছেও….. ইতিউতি ঘোরার পর বাস ধরলাম….. এবার ইতিহাসের গলি থেকে বিদায়ের পালা! গন্তব্য – সেই মেদিনীপুর!

IMG_20190908_134830
শিবের ৯ রূপ

IMG_20190908_134858
রাসমঞ্চ

IMG_20190908_130134
পেল্লায়….

IMG_20190908_123410-01
সেকেলে প্রযুক্তি আজও অটুট

IMG_20190908_123853-01-01
শুকনো ঝর্ণা @ হাওয়া মহল

একদিনের ট্যুরে আসায় যায়, তবে তার সাথে কিছু যোগও করতে হয়, দুপুর নাগাদ ঘুরে নাড়াজোল বাস স্টপেজে মধ্যাহ্নভোজ সেরে সর্ট রুটে বিদ্যাসাগরের বাড়ি – বীরসিংহ এর দিকে যাওয়া যায়, কুড়ি কিমিও নয়। নাড়াজোল রাজবাড়িতে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে, এমনিতে কলেজের হোস্টেল হওয়ার দৌলতে অনেকেই থাকেন, তাদের থেকেই জানলাম – মাঝে মাঝে ফিল্মের লোকজন আসেন বলে তাদের জন্য একটা রুম বরাদ্দ! আর রাজবাড়ির লোকজন যে কোনো অতিথিকে সর্বাধিক পরিষেবা দিতে সদাপ্রস্তুত….অন্তত এমনটাই আমার জানা।

IMG_20190908_130734-01
নহবতখানা

IMG_20190908_130753~2
রাজার কাছারি… পরে ক্যান্টিন এবং ছাত্র সংসদ

IMG_20190908_132841
রাজদরবারে….

IMG_20190908_133107-01
খিড়কি থেকে

IMG_20190908_133341
কেন তোর উঁচু বাড়ি, কেন তুই বাবু রে?।

কোলকাতা থেকে আসতে হলে মেছগ্রাম হয়ে দাসপুর আসতে হবে, তারপর মেদিনীপুরগামী রাস্তায় বাঁক নিলেই পৌঁছে যাবেন বিপ্লবীদের ডেরায়….! 

IMG_20190908_143431
नमो-नमो, जी शंकरा

 

IMG_20190908_134942~2
ঐতিহ্যশালী রথ

IMG_20190908_124642
নাচ মহলা

 

পুনশ্চঃ
১. তথ্যের জন্য ইউটিউব এবং গুগল দায়ী..
২. থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একদিন আগে জানাতে হয়…রথের সময় জলহরি তে একটি নৌকা চলে।

IMG_20190908_143900
৮০ বন্ধু

© শুভঙ্কর দত্ত || September 9, 2019