প্রসঙ্গ – হিউম্যানিটি

 

তখনও অফিসিয়ালি গ্র্যাজুয়েট হইনি। লাস্ট ইয়ারের পরীক্ষা দিয়েছি মাত্র। লাস্ট ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই বা তারও আগে বেশ কয়েকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্নাতকোত্তর এর ফর্ম ফিল আপ করতে দেয়।

আশেপাশের কোন বন্ধুর এটিএম কার্ড ছিলো না বলে আমার কার্ড দিয়ে অনেকেই ফর্ম ফিল আপ করতো। যা হোক্…..

সেবার বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ফর্ম ফিল আপ। আমার বন্ধু তাপস আমায় ধরেছে, সেই মিস ট্রান্সজাকশনের যুগে আমার অকুতোভয়ই হয়তো আমার কথা ভাবতে তাকে বাধ্য করে।

ফরম ফিল শুরু করলাম। তার আগে অবশ্য আমি ঐ একই কাজ করেছি। তাই ঐ ফরম্যাটটা মোটামুটি মনেই ছিলো। তবে যে জিনিসটা নিয়ে বলছি সেটা ভাসা ভাসা মনে পড়ছে।
রিলিজিয়ন এর জায়গাটায় আসতেই (ঠিক মনে নেই বানান করে লিখতে হয়েছিলো নাকি অপশনের মধ্যে চয়েস করতে হয়েছিল) তাপস থামিয়ে দিলো।
আমি তো অবাক৷ এমনিতেই বন্ধুটি যুক্তিবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য, ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসীও নয়, পরিবেশপ্রেমী এবং বিজ্ঞান-সচেতনতাটা তীব্রভাবে আছে।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগে বললো – “ওটা অন্য কিছু করলে হয় না?”
( সম্ভবত কোনো অপশন থেকে বাছতে হয়নি তখন, তাহলে তো খবর হয়ে যেতো৷ আবার ফাঁকাও রাখা যাবে না, পাওয়ার প্লের মতো ম্যানডেটোরি)
আমি বললাম – “সে আবার কি?”
(দেখছি আমি…..)
বললো – “এই ধর যদি Others করে Humanism করি….!”

বলেছিলাম – “ধর্, তোকে প্রমাণ হিসেবে কিছু চাইলো, তখন কি করবি? কি দরকার ভাই, বেকার চব্ব করে! বাদ দে….”

টিকটিকর মতো ঘাড় নাড়লো আর একটা সল্প তীব্রতার ‘হুমমম’ ছেড়ে বললো — “যাক্ গে বাদ দে…”

বললাম – “দেখ ভাই তুই যে কাজ করিস তার জন্য তুই এমনিতেই মানবতাবাদী, তার জন্য খাতায় কলমে যাওয়ার দরকার নেই।”

আজ এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কতগুলো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে….

Religion – Humanity করলেই কি মানবতাবাদী হওয়া যায়?
নাকি নির্দিষ্ট কোনো ধর্মে থেকে মানবতাবাদী হওয়া যায় না?
মানুষের প্রতি যত দরদ তার মানে ধর্ম – হিউম্যানিটি হলেই থাকবে? অন্যথায়?
নাকি যে কোনো ধর্মই আমার চোখে এতো খারাপ হয়ে গেছে যে EMV এর NOTA মতো আশ্রয়ে গিয়ে বেশ হাওয়া লাগাতে পারবো?
কোনটা? জানতে ইচ্ছে করছে।

****** ****** ****** ******

© শুভঙ্কর দত্ত || June 1, 2019

গরমের ছুটিতে দুর্গেশগড়…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ দেখেছিলাম, মণিকান্তপুরের সেই রহস্য উদঘাটন পর্বে পরিচয় হয়েছিলো সোনাদা, ঝিনুক আর আবীরের সাথে। আসলে এই তিনজনকে পর্দায় দেখে অ্যাডভেঞ্চার পিপাসুদের মতো আমারও চলে যেতে ইচ্ছে করে, বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। তাই যখন জানলাম এবার দুর্গেশগড়ে আবার এক অন্য গুপ্তধনের সন্ধানে তিনমূর্তির অভিযান, যার ষাট শতাংশ শ্যুটিং আমার প্রিয় ঝাড়গ্রামে তখন আর অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিলো না।

আগের বার ছিলো শাহ সুজার গুপ্তধন আর এবার দুর্গাবতি দেবরয় এর গুপ্তধন, যা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের থেকে তিনি পেয়েছিলেন।

  • হিস্ট্রি – নট অলওয়েজ বোরিং….

সিনেমা জুড়ে ইতিহাসের গল্প…. বইয়ের পাতায় পড়তে হলে ভীষণই বোরিং লাগে যে কাহিনী, এখানে সুবর্ণ সেন এর গল্পের ছলে বিষয়টির ভাবগম্ভীর ব্যাপারটিকে লুফে নেওয়ার মতোই সহজ করেছে৷

  • সাবলীল অভিনয়

‘ঝিনুক’ এর চরিত্রে ঈশা সাহা কে আমার বেশ লাগে, নামটার সাথে চরিত্রটা খুব মানায়। প্রথমবার গুপ্তধন উদ্ধার পর্যায়ের পর এবাারেও দারুণ লেগেছে….! সবচেয়ে ভালো লাগে অর্জুনকে, আবীরের চরিত্রে…. সেই বেশ একটা খাদ্যরসিক এবং হিউমারাস চরিত্র যা বাঙলির খুব কাছের লোক৷ সোনাদা কে নিয়ে বলার কিছু নেই।

  • ক্যামিও….

ক্যামিও হিসেবে খরাজের উপস্থিতিটা একটুও বোরিং হতে দেয় না, ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারে হার্দিক পাণ্ডিয়ার মতো ব্যাপারটা….. শেষপাতে চাটনীর মতো, পুরো চেটেপুটে খেলাম, একটা শব্দ বারবার বলছিলো, সেটা আর মনে নেই…

মে মাসে দুর্গাপুজো, কাশবনের পাশ দিয়ে মায়ের আগমণ, বনেদি বাড়ির পুজো — দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গুপ্তধনের সন্ধান গল্পটিকে বড্ড বাঙালিদের করে তোলে, তার সাথে যোগ হওয়া পুজোবাড়ির খাওয়াদাওয়া — সব মিলিয়ে বাঙালিয়ানার অনবদ্য নিদর্শন এই সিনেমা।

  • হারানো সুর আর কথা….

গানের কথার ছলে গুপ্তধনের এ টু জেড জানতে পারা – এদিক থেকে গীতিকার আর সঙ্গীত পরিচালকের প্রতি অতিরিক্ত সম্ভ্রম জাগে…. সেই পুরনো ফ্লেভারটা পুরোমাত্রায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই সুরটা লেগে থাকার মতোই….. সিনেমার গল্পের সাথে, সময়ের সাথে অদ্ভুৎ ভাবে খাপ খেয়ে যায়…!

  • যা কিছু চাইছি.. মোচড়

গল্পের বুনোটে সময় লেগেছে…. সেটা হওয়াটা স্বাভাবিক….. ইতিহাসটাকে বেশ ভালো ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে টুকরো টুকরোভাবে যাতে দর্শকের মাথায় সেঁটে যায় চেয়ার ছাড়ার পরেও….! শেষকালে ঐ রকম একটা মোড় ঘোরানো— আশা করছিলাম, তবে ভাবনারও অতীত ছিলো, আর পরিচালক ধ্রুব ব্যানার্জী পুরো পয়েন্ট নিয়ে চলে গেলেন এখান থেকেই…..!

  • ক্যামেরা…আলো.. ইত্যাদি

সৌমিক হালদার নিজের খ্যাতির মর্যাদা রেখেছেন। এই সিনেমার সাপেক্ষে যেটা খুব মধ্যমানের হলেও চোখে লাগতো, সেরকম একবারও লাগেনি, জমাটিই লেগেছে।
কাজটাকে সহজ করেছে আলোর অনবদ্য ভালো ব্যবহার…. এইরকমভাবে আলোর ব্যবহার কটা সিনেমায় হয়, সন্দেহ আছে, অবশ্য সুযোগও থাকে না

  • বোনাস পয়েন্ট…..

কৌশিক সেন…. ফোকাস টেনেছেন গল্পের খাতিরে, সে জন্য অবশ্য পরিচালকের ধন্যবাদ প্রাপ্য…
আরো আছেন – লিলি চক্রবর্তী, পিসির চরিত্রে ওনার উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরো বেশি করে বোধ হয় আট থেকে আশির জন্য মাস্ট ওয়াচ করে দেবে…..

  • আত্মিক টান

রহস্য, সাসপেন্স আর অ্যাডভেঞ্চার এর সাথে বাঙালির আত্মিক টান, তার সাথে যদি যোগ হয়ে যায় ইতিহাস, তাহলে আর কথায় নেই….! যাকে বলে টরে টক্কা! অযাচিতভাবেই গুপ্তধনের সন্ধানে এসে সোনাদা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে আরও যে বিষয়টি উদঘাটন করলেন, তার জন্য এক্সট্রা একটা নম্বর দেওয়ায় যায় পরিচালককে

  • গরমের ছুটি – লুটি

গরমের ছুটিতে দুর্গাপুজো, সৃজিৎ মুখার্জি ‘উমা’ র হাত ধরে এরকমটা করেছিলেন, সেটা শহরে যদিও আর ধ্রুব ব্যানার্জি করলেন গরমকালে, গ্রীষ্মবকাশে…. অতএব লুটি!

  • পারিবারিক ফিল্মও….

পারিবারিক সিনেমাও বটে৷ একদম শেষে সে কথা আরো বেশি করে জোরালো হলো…..! পিসিমা- সোনাদা- অপুদা (খরাজ) এর কথোপকথনে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক একাত্মতার বিষয়টি বেশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

  • যথাযোগ্য উত্তরাধিকার…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ এর যোগ্য সিক্যুয়েল বলেই মনে করি….. একবারের জন্যেও অগ্রজপ্রতিম সিনেমাটিকে অসম্মান করা হয়নি…. বরং শেষ কয়েক মিনিটের থ্রিল আর গুপ্তধন খোঁজার পন্থাস্বরূপ গান — এই দুটির জন্য অবিসংবাদীভাবে ‘দুর্গেশগড়’ এগিয়ে থাকবে।

  • এবং ঝাড়গ্রাম…

ঝাড়গ্রামকে যারা খুব ভালেবাসি, তাদের জন্য এই সিনেমা দেখা অত্যন্ত জরুরি। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি থেকে শুরু করে চেনা চিল্কিগড় সহ বিভিন্ন অচেনা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই সিনেমার ফ্রেমগুলো। বিশেষ করে রাজবাড়ি….! কি সুন্দরভাবে অন্দরমহলটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরো কিছু জায়গার ছবি ফুটে ওঠে কিন্তু নাম জানি না আমি….! অরণ্যসু্ন্দরী ঝাড়গ্রাম কে ভালো চিত্রায়িত করেছেন ক্যামেরাম্যান৷

সুতরাং এই গরমের ছুটিতে বাড়ির সকলকে নিয়ে ‘দুর্গেশগড়’ ঘুরে আসা যেতেই পারে…. যেখানে  সোনাদা – ঝিলিক – আবীরের দেখা মিলবেই৷

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 29, 2019

‘কণ্ঠ’ – এভাবেও ফিরে পাওয়া যায়

যখন উচ্চমাধ্যমিক পড়তাম, একটা গল্প ছিলো – স্টিফেন লেককের…. “Further Progress In Specialisation.” বাংলা সিনেমায় বিগত দশ বারো বছর ধরে এরকম বিশেষ বিশেষ বিষয় নিয়ে সিনেমা উপহার দিয়েছেন কৌশিক গাঙ্গুলি – নাম বলছি না, যে যার মতো করে মনে করে নিলেই ভালো। আর কেউ বানাননি বলবো না, কিন্তু এরকম ধারাবাহিকভাবে বানাননি কেউই। সেই তালিকায় এবার নবতম সংযোজন শিবপ্রসাদ-নন্দিতার “কণ্ঠ”….

কলকাতার এক রেডিও জকি আর জে অর্জুন (শিবপ্রসাদ) স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার ‘কণ্ঠ’ হারাবেন….. একজন লেখকের কাছে কলমটা যতটা প্রয়োজনীয়, হাতটা যতটা প্রয়োজনীয়, তার চেয়েও একজন রেডিও জকির কাছে তার কণ্ঠটা বেশি করে প্রয়োজন…বস্তুত একজন রেডিও জকির থেকে তার ‘কণ্ঠ’ কেড়ে নেওয়া মানে একটা মরা মানুষেই পরিণত হওয়া, সে কথা তো সিনেমা দেখতে দেখতেই পরিচালক জানিয়ে দিলেন।

কিন্তু সত্যিই ‘কণ্ঠ’ হারিয়ে গেলেই কি সব শেষ? রেডিও জকি তার শো এ জানাচ্ছেন – ” ইচ্ছেশক্তি যখন আছে, তখন তাকে হার মানাবে কে! কণ্ঠ যখন বলতে চায়,,তাকে আটকাবে কে!”

অর্জুন এবং পৃথা (পাওলি দাম) – দুজনেই বাচিক শিল্পী, সম্পর্কের শুরু – গভীরতা – বাঁধন সবটাতেই কণ্ঠের অবদান যে সবচেয়ে বেশি সে কথাও বারবার ফিরে এসেছে গল্পে। কিন্তু কণ্ঠ হারিয়ে যাওয়ায় ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকা একটা মানুষের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার তাগিদে সহায় হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। এ গল্পে অভিনেতাদের সাথে তাই আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিকেও কুর্নিশ জানাতে হয়। Laryngectomy র স্পেশালিষ্ট রোমিলা চৌধুরীর চরিত্রে জয়া এহসান এর এই অভিনয় সিনেমাটাকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করেছে বলে মনে করি।
Laryngectomy – এই শব্দটা খুব একটা পরিচিত নয়, যতই আমরা ক্যান্সার নামে মারণ রোগের কথা বলি না কেন!! কি সুন্দরভাবে এই শব্দটার মানে বুঝিয়ে দেওয়া হয় গল্পতে…. একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝতে পারবে, এই জায়গাটা দারুণ লেগেছে।

মাঝে মাঝেই সাসপেন্স এর একটা ঝটকা বয়ে চলবে। ভূত নিয়ে সাম্প্রতিক কালে বাংলা সিনেমা বহুল-চর্চিত, সেলুলয়েড এ শিবু আবার নিয়ে এলেন অতিপরিচিত “ভূতের রাজা” কে, ….. সিনেম্যাটিক উপস্থাপনা যাকে বলে…!

পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ছোট্ট ক্যামিওকে ব্যবহার করা হলো সুনিপুণভাবে….!!
যারা সিনেমা দেখতে বসে চিকিৎসার ধরন দেখে ইন্সট্যান্ট খিল্লি করতে যাবেন তারা একটু জেনে বুঝে করবেন, আসা রাখি— সিনেমার চিত্রনাট্যের খাতিরে এরকমটা করা হয়নি বলেই অন্তত আমার তা মনে হয়।

শিবপ্রসাদ এর পরিচালনা নিয়ে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন ওঠে…..! কিন্তু অভিনয়! সেটা আমি সেই “অ্যাক্সিডেন্ট” সিনেমা থেকে দেখে আসছি, কি অসামান্য অভিনয় দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব সাইলেন্টলি। এই সিনেমার অ আ ক খ সবটা জুড়েই তিনি….! তবুও বর্ণপরিচয় পূর্ণ হতো না যদি না জয়া এহসানের ওরকম একটা অসামান্য উপস্থিতি পেতাম..! পাওলি দাম নিজের জায়গায় দারুণ, নতুন করে বলার কিছু নেই। সিনেম্যাটোগ্রাফি নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়, বেশি কিছু নয়, সাহানা বাজপেয়ীর “সবাই চুপ” গানটাতে ক্যামেরার ব্যবহার দেখে সার্চ করতে বসি কে সেই ক্যামেরাম্যান! শুভঙ্কর ভড়– এই সেই ভদ্রলোক যার অনবদ্য কাজ “বাকিটা ব্যক্তিগত” কে অন্য মাত্রা দেয়।
এই সিনেমার বাড়তি পাওনা অবশ্যই — সিনেমার গানগুলো…. শুরুতেই তার ইঙ্গিত দিয়ে দেবেন স্বয়ং প্রসেন —- “অবাক জলে……… তুমি সেই গান বানানোর কারণ হলে….!”

তবে সবচেয়ে যেটা অসামান্য এবং প্রশংসনীয় লেগেছে সেটা হলো — ‘জুজু’ নামকরণ…! না দেখলে এই ভালো লাগার কারণ অবশ্য বোঝা যাবেই না। শেষ কালে নজরুলের ‘বিদ্রাহী’ কবিতা দিয়ে…… Laryngectomy ক্লাবের সকলে মিলে উপস্থাপন।

এই সিনেমা তাই আশার আলো….! রোগী – পেশেন্ট যে কতটা বন্ধু হওয়া দরকার তাও বলে, শুধু তাই নয়, সবকিছুকে ছাপিয়ে একটা ভালো বন্ধুত্বের গল্পও বলে, ‘কণ্ঠ’ হাতিয়ার করে বিখ্যাত নয়, বরং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প বলে। বাচিক শিল্পীদের শুধু নয় একই রোগে আক্রান্ত হয়ে কণ্ঠহৃত বহু মানুষের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক মৃত-সঞ্জীবনী….! কিভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আর মানবতার মেলবন্ধনে একজন স্বরযন্ত্র হারানো মানুষ কিভাবে ফিরে পাবে তার ‘কণ্ঠ’ জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে….! বাংলা সিনেমায় প্রতিযোগীতা কি পরিমাণ ফিরে এসেছে, তা বাতলে দেবে “কণ্ঠ”! সিনেমা দেখতে দেখতে আর জে চরিত্রে শিবুর কোনো ভালো পরিবর্ত খুঁজছিলাম, পেলাম না!! কুর্নিশ!! অভিনয়- জাস্টিফায়েড..!

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 18, 2019

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” – তিন যুগের পৃথিবীতে অতীশ দীপংকর

‘কেমন লাগলো’ – এ কথার উত্তর দিতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবতে হবে….! গত দুই বছরে ফেসবুকে এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু পেয়ে অন্য স্বাদের বেশ ভালো রকম তিনখানা বইয়ের সন্ধান পাই। আবার তারই এক পোস্টে দেখি তিনিই “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” পড়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। তার আগে নাম শুনিনি, এমনতর নয় যদিও বিষয়টি। কিন্তু একটা বিশ্বাসযোগ্যতা কাজ করলো…..

collegestreet নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বেশ ভালো রকম ছাড়ে পেয়েও গেলাম বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তাও আবার ডেলিভারি চার্জ মুকুব। ব্যস!

উপন্যাসের নামকরণেই লেখা আছে “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী”… হাস্যকর হলো বিষয়টা যখন ওনারা ফোন করে বলছিলেন ‘দাদা আপনার অর্ডার করা দুটো বইয়ের একটাই পেয়েছি’, পরে বুঝিয়ে বলার পর বুঝলেন – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী কোনো আলাদা বই নয়।

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকর এর নিয়ে এমন আকর একখানা উপন্যাসে লেখক তার মুন্সিয়ানার দারুণ পরিচয় বহন করেছেন একথা প্রথমে স্বীকার করে নেওয়ায় ভালো।

এ উপন্যাস জুড়ে চিত্রায়িত হয়েছে অতীশ দীপংকরের জীবনী, তার সাথে জড়িয়ে থাকা শতাধিক চরিত্রের সাক্ষাৎ হয় পাঠকের সাথে।

মোটামুটি আমরা জানি যে ৯৭৭ সালে প্রথম তুর্কি আক্রমণ হয়, সুবুক্তগীন করেন। সফলতা আসেনি। এরপর প্রায় ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি আক্রমণ চালালেন, তুরস্কদেশাগত আক্রমণকারীর রোষানলে পড়লো ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষুদ্র থেকে গভীরতর উপাদান সমূহ – মূর্তি, শাস্ত্র, দর্শন এবং হাজারো পুঁথি তাদের ধর্মান্ধতার চোখে পড়তে বাকি থাকলো না। তিব্বত থেকে আগত পর্যটক – চাগ্ লোচাবা, নালন্দা দর্শনে এই ভয়াবহতার মাঝেই, নালন্দার তৎকালীন অধ্যাপক আর্য শ্রীভদ্র তাকে ফেরালেন না। নালন্দা কাউকে খালি হাতে ফেরায় না বলে তিনি অতীশ দীপংকর ব্যবহৃত একটি কাষ্ঠপেটিকা তুর্কি আক্রমণ থেকে বাঁচাতে তিব্বতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেন।

যাত্রাপথে বিক্রমণিপুর গ্রামের এক তন্ত্রবিদ্যাপটিয়সী গৃহকর্ত্রী স্বয়ংবিদার সাথে পরিচয় হয় তার….. এরপর দু শো বছর পিছিয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ হলো – চন্দ্রগর্ভ, অবধূত, কুন্তলার সাথে৷

রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ জীবনের অর্থ সন্ধান করতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মহর্ষি জিতারির সাথে, পরে অবধূত অদ্বয়বজ্র নামে তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে তন্ত্রচক্রে পড়ে যান৷ রাহুলগুপ্তের শিষ্যত্বে তান্ত্রিক অভিষেক হয়। তার বাল্যসঙ্গী- প্রেমিকা কুন্তলা তাকে প্রত্যাখান করেন…..!

“যখন বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস,
নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধূলীকালীন মেঘ,
পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে,
আর পালতোলা নৌকা ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতধারায়….
সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে-
আমার কেশপাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থিনির্মিত মালাঃ
তখন… কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব…..
এ রূপে নয়। এ ভাবে নয়। এখানে আর নয়।”

এই কথা বলে মৃত্যুর নিঃসীম অন্ধকারে ডুব দিলেন কুন্তলা। জীবনে চলার পথ সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে, প্রিয়তমা কে হারানোর পর একের পর দুঃস্বপ্ন দেখে বেরিয়ে পড়লেন অনন্তের উদ্দেশ্যে। ওদন্তপুরী মহাবিহারের অধ্যক্ষ আচার্য শীলরক্ষিতের সাক্ষাতে তার জীবনের প্রকৃত পথ সন্ধানে তিনি ব্রতী হোন। এক বৈশাখী তিথিতে চন্দ্রগর্ভকে শ্রামণ্যে দীক্ষিত করেন পণ্ডিত – ভিক্ষু শীলরক্ষিত। শ্রামণ্যের প্রতিজ্ঞাবাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে চন্দ্রগর্ভের অবসান হলো, জন্ম নিলো অতীশ দীপংকর…… চিরজাগ্রত জ্ঞানদীপ যার হৃদয়কন্দরে সতত দেদীপ্যমান!

এরপর আবার ফিরে আসা যাক্ বর্তমানে, যেখানে বাংলাদেশের বিক্রমপুরের অনঙ্গ দাস নামের এক কৃষকের জমি থেকে পাওয়া এক কাঠের বাক্স উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু অধিকার করে বসে। রহস্য আবৃত সেই শ্যাওলা পড়া কাষ্ঠপেটিকার অভ্যন্তরস্থ পুঁথি এবং ধাতব মূর্তির রহস্য সমাধানের দায়িত্ব পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি হয়ে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার গবেষক কলকাতা নিবাসী সম্যক ঘোঘের হাতে, পেলিওগ্রাফি অর্থাৎ ঐতিহাসিক হাতের লেখা নিয়ে পড়াশোনা যার ক্ষেত্র…. তিনি সেই দায় ন্যস্ত করেন অমিতায়ুধ এবং শ্রীপর্ণার ওপর। অমিতায়ুধ সেই দায়িত্ব সযত্নে রক্ষা করতে তড়িঘড়ি বাংলাদেশ যান। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” প্রত্যক্ষ করার উদ্দেশ্য নিয়ে গেলেন বটে কিন্তু পরিচয় হলো কৃষককন্যা জাহ্নবীর সাথে, যেই কথাগুলো শুনিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে ছিলো হাজার বছর আগের এক নারী – কুন্তলা, সেই কথাগুলোই পূর্ববঙ্গীয় সতেজ উচ্চারণে ভটিয়ালির সুরে গান হয়ে ফেরে জাহ্নবীর কণ্ঠে। অমিতায়ুধ তার প্রত্যক্ষদর্শী।

IMG_20190506_143012~2.jpg

মোতালেব মিঁয়ার বাড়িতে বসাবাস কালে উৎসুক্যের দরুণ অমিতায়ুধ আবিষ্কার করে ফেলেন এক অপার্থিব গুঢ় স্থান, পৃথিবীর সমগ্র জাদু-বাস্তবতা থেকে তা অনেক গভীরে, লোকচক্ষুর অনেক আড়ালে তা বিরাজমান….. কালের চক্রে অতীতে গিয়ে সে দৃশ্য দেখতো পেলেন পাঠককুল৷ অমিতায়ুধ উদ্ধার করলেন – ‘শ্বেততারা’, পাথরনির্মিত! কাষ্ঠপেটিকার অবিকল প্রতিরূপ…! সাথে সহস্র শতাব্দী প্রাচীন একটি পুঁথিও, নাম – “করুণকুন্তলাকথা”!

অতঃপর ঔপন্যাসিক পরিচয় করালেন এ কাহিনীর কাহিনীকারের সাথে, শাওন বসু – যার ঐন্দ্রজালিক লেখনীর ওপর ভর করে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক সাহসী মিলনে সৃষ্টি হয় অসাধারণ বিচ্ছুরণ…..! অতীশ দীপংকরের মহিমান্বিত গাথা দৃষ্টিগোচরে আসে পাঠকের। তিব্বত লামা চাগ্ লোচাবা আচম্বিত চুম্বন প্রাপ্ত হোন বাঙালি কুলবধূ স্বয়ংবিদার ওষ্ঠ হতে, বিষ চুম্বনে মুর্ছায়িত হয়ে চাগ্ এর সময় পশ্চাৎ প্রসারণ করলো দুইশত বছর, ধ্বনিত হলো – ” বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি…ধম্মং শরণং গচ্ছামি…”

অধুনাকালের প্রত্নতত্ত্ববিদ অমিতায়ুধ মোতালেব মিয়াঁর বাড়ির এক সুড়ঙ্গ পথে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে খু্ঁজে পেলেন আরো একটি মূর্তি, কাঠের মূর্তি, আরও একটি প্রতিরূপ। বজ্রাসন বিহারে যেই মূর্তিটি দীপংকর তিব্বত যাত্রার পূর্বে পাঠিয়েছিলেন তার জন্মস্থানে, অমিতায়ুধের কাছে পুরোটা পরিস্কার হলো এবার, সমাধান হলো সুড়ঙ্গ পথের গভীর প্যাটার্ন, আশ্চর্য যোগাযোগ পন্থা। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” র রহস্য অমিতায়ুধের দ্বারা পুরোপুরি সমধান করে ফেললেন কাহিনীকার শাওন বসু৷ কিন্তু বাকি থেকে গেলো সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া ধাতব আইকনটি…!

ভারতবর্ষের বিক্রমশীলে অধ্যাপনাকালে অতীশ দীপংকর ভারতবর্ষকে বহিরাগতদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে রাজাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের বার্তা দেন, সে কথা উপন্যাসে গল্প আকারে সুন্দরভাবে বর্ণিত- নয়পাল ও চেদীরাজ কর্ণের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনে দীপংকরের এক অসামান্য দিক তুলে ধরেছেন কাহিনীকার৷ মধ্য তিব্বতীয় সম্রাট এশেওদের আমন্ত্রণে অতীশ দীপংকর পাড়ি দেন তিব্বত অভিমুখে, তিব্বতীয় অনুবাদক বিনয়ধর, বীর্যসিংহ, অতীশের ভাই শ্রীগর্ভ, সচীব পরহিতভদ্র কে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় সে যাত্রা….! আর সর্বক্ষণের সঙ্গী সেই কাষ্ঠপেটিকা, যা শৈশব থেকে তার সাথে আছে– ধাতব মূর্তির সেই কাঠের বাক্স, সেই বাক্স চাগ্ লোচাবার হাত দিয়ে নালন্দায় পাঠিয়ে দেন তিনি। সেই বাক্সই কালক্রমে অনঙ্গ দাসের জমি থেকে উদ্ধার হয়।

এই তিন মূর্তির সন্ধানের পাশাপাশি কশেরুকা অস্থিমালা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে…! কালের সংস্থাপনে আবার উঠে আসে সেই মন্ত্র, যা ধ্বনিত হয়েছিল অতলস্পর্শী আত্মবিসর্জনের মুহূর্তে কুন্তলার মুখে, বীর্যসিংহ জীবনের শেষ মুহুর্তে যা উচ্চারণ করেছিলেন, সেই গাথার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে বিলম্ব হলো দীপংকরের৷ তখনই শ্বেত কশেরুকার মালাটি চাগ্ কে দান করেন অতীশ যা তিনি পেয়েছেন সেই সুন্দর মুহুর্তে…! এই কশেরুকা যে স্বয়ংবিদার প্রতি তার (চাগ্) গুরুদক্ষিণা স্বরূপ….। তার সাথে সযত্নে রক্ষিত কাষ্ঠপেটিকাটি ও চাগের হাতে দিয়ে ভারতে প্রেরণের ব্যবস্থা করতে বলেন…..! গোটা কাহিনীর অজস্র শব্দমালায় এবার মৃন্ময়ী প্রতিমা, দারুমূর্তি এবং ধাতব আইকন — সব কিছুকে ছাপিয়ে দীপংকরের ভাষ্যে উঠে আসে সেই অমোঘ চিরভাষ্য….. চাগের সেই প্রশ্নের উত্তরে পরিচিত হই রক্তমাংসের মানুষ, এক বাৎসল্যকরুণ হৃদয় – বিশিষ্ট অর্থের অতীশ এর সাথে পরিচিত হয় চাগ্… পরিচিত হই আমরা।

চাগ্ বিমূঢ়ৎ বললেন, “এ মূর্তিতে আপনার আর প্রয়োজন নাই?”
নিঃসংশয়িত প্রত্যয়ে অতীশ উচ্চারণ করলেন, “না, আমার আর প্রয়োজন নাই। আজ দ্বিপ্রহরে এক বালিকাকে দর্শন করে, তার অনাবিল স্নেহের স্পর্শ পেয়ে আমি বুঝেছি, আমি কাষ্ঠ, মৃত্তিকা বা ধাতু নই; আমি মানুষ। আমি শুধু স্নেহবুভুক্ষু অপার এক সত্তা। শুধু সকাতর এক মাতৃহৃদয়। ….. আমি সেই আবর্তমান উচ্ছ্বসিত কারুণ্যব্যাকুলতা…।”

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

নেথাং বিহারের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটিয়ে দেন অতীশ। তাঁর সমাধির ওপর নির্মিত মন্দির কালের নিয়মে জঙ্গলাকীর্ণ আজ। অতীশের তিব্বতীয় শিষ্য ব্রোম্ তোন্ পা জন্ম দেন নতুন এক সম্প্রদায়ের, কাদম্পা থেকে গেলুক্পা হয়ে সেই সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু যাকে আমরা দলাই লামা বলি তিনিও একদিন চিনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ভারতে চলে আসেন।

নগর পত্তন হয়েছে, পুঁথি হারিয়েছে অজস্র- অগুন্তি, হাজার বছর আগেকার সেই ইতিহাসের আক্রমণকারীরা আজও আছে বেঁচে পৃথিবীর বুকে….তার সাথে শাশ্বত থাকবে দীপংকরের মতো শ্রমণরা, যারা হিংসে নয়, প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে দুর্জ্ঞেয় কে জয় করেছেন, মানুষের মনুষ্যত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন বারংবার…..যেখানেই গিয়েছেন চেষ্টা করেছেন শান্তির বার্তা দিতে….!!

লেখকের মতে অতীত – বর্তমান – ভবিষ্যৎ বলে আলাদা কিছু নেই, যুগপৎ প্রবাহমান। একই সমতলে অঙ্কিত পরস্পরছেদী তিনটি বৃত্ত– ঐ তিনটি বৃত্তের ছেদবিন্দু গুলিতে কোনো বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে এক যুগের চরিত্রগুলি পরিচিত হবে অন্য যুগের চরিত্রের সাথে৷ শুধু তাই নয়, ঘটবে বিনিময়ও। বেশ জটিলতর একটি কৌশলে বিষয়টিকে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করা গিয়েছে বলে মনে করি৷ এক সাথে তিনটি গল্প সমান্তরালে চলছে, লেখক প্রস্তাবনাতেই সে কথা বলেছেন এবং আরো সহজবোধ্য যাতে হয় তার জন্য তিনটি আলাদা সময় কে প্রতিটি পরিচ্ছদেই তুলে ধরেছেন। সময় বিশেষে তাদের ভাষা তুলে ধরেছেন৷
দশম-একাদশ শতক, ত্রয়োদশ শতক এবং সাম্প্রতিক কালে বিচরণের পর তাই অভিভূত হয়ে যেতে হয় অসামাণ্য লেখনশৈলীর জন্য, উপন্যাস পড়তে পড়তেই তাই নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে হয় বারবার। নিজেকেও পিছিয়ে যেতে হয় পৃষ্ঠা উল্টিয়ে। তিন যুগ ধরে পরস্পরছেদী নায়িকাদের সাথে তাই বারবার দেখা হয়ে যায়, বুঝতে তবু সুবিধে হয় না তাদের চাওয়া-পাওয়া…! অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকি কখন তাদের প্রাপ্তি পূর্ণ হবে…..! শাওন বসুর কল্পলোকের চরিত্র অমিতায়ুধ, জাহ্নবী এরা বড্ড আপন হয়ে ওঠে তখন, শেষ হওয়ার পরেও তাই মেনে নিতে কিঞ্চিৎ দ্বিধা হয়। কি অসামান্য গবেষণা এবং অধ্যবসায় থাকলে এরকম উপন্যাস আসে তা বলাই বাহুল্য, ঠিক যেই কারণে আনন্দ পুরস্কার এর বাছাই পর্বে ঠাঁইও মিলে যায় লেখক সন্মাত্রানন্দ শোভনের……! কুর্ণিশ ওনাকে..! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “চৌথুপীর চর্যাপদ” পড়েছিলাম বলে এই উপন্যাসের অনেক শব্দার্থ বোঝা সম্ভবপর হয়েছে। বাংলা ভাষায় আজকাল ভালো উপন্যাস আর হয় না- এই গোছের মন্তব্য করে যারা বসে থাকেন তাদের জন্য এই উপন্যাস উপযুক্ত জবাব। লেখকে আরো ধন্যবাদ এই জন্য যে — এই গ্রন্থটিকে কেউ স্রেফ গল্পবই হিসেবে নিলে মস্ত বড়ো ভুল করবে….! এখানে কাহিনীর ধারা বিবরণী এবং শব্দের মনোরম ব্যবহার, লেখনশৈলী সবকিছুই পাঠককে বাধ্য করবে সময় নিয়ে পড়ার জন্য…..! পড়তে গিয়ে উঠে আসবে না জানা কত ইতিহাস…..! একটা পরিচ্ছদের পর আর একটা পরিচ্ছদ এমনভাবে সাজানো যে পড়তে পড়তে ব্রেক কষা বেশ দুঃসাধ্য….! শাওন বসুকে দিয়ে লেখক বলিয়ে নিয়েছেনও এ কাহিনী আরো বড়ো হয়ে যেত…. পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে গেলে পাঠকের বিরক্তির প্রকাশও কাম্য নয় অবশ্য….! সে সবের ধারেকাছে যাননি বলা ভুল, তবে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসেছেন সুকৌশলে….. অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য টাইম মেশিনে ভর করে আলেখ্যটিকে ছোটো করে ফেলেছেন লেখক৷ কয়েকটি ক্ষেত্রে এতো বিশেষ লেগেছে যে বারংবার পড়তে ইচ্ছে করেছে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের প্রতি কতটা ভালোবাসা এবং আনুগত্য থাকলে এরকম তিন টি আলাদা যুগে স্থানবিশেষে আলাদা রকম ভাষারীতি প্রয়োগ করে এরকম রচনা সম্ভব, সে কথা একজন সামন্য পাঠক হিসেবে কল্পনা করা দুঃসাধ্যই..!

হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে যাওয়া নাগরিক সভ্যতার, আজকের পৃথিবীকে জড়িয়ে ফেলেছেন সেই সময়বর্তিকায়….! তিন যুগের তিন নারীর প্রণয়কথায় , শাশ্বত নারীসত্তার জন্মজন্মান্তরে  চিত্রায়িত এই উপন্যাস তাই বাংলা ভাষায় অতীশ অনুসন্ধান এর এক অনন্য ইতিবৃত্ত, এক অসামান্য আলেখ্য, যা বাংলা ভাষার একটি সম্পদ হিসেবে ঠাঁই করে নেবে বলে আশা রাখি৷

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা”
লেখক – সন্মাত্রানন্দ শোভন
ধানসিড়ি
দাম – ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা – ৩৫৯

***************************************

© শুভঙ্কর দত্ত  || May 6, 2019

 

প্রেমের উপহার : গল্প হলেও সত্যি…

সিনেমার শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফিরবেন। মাঝে বোনের বাড়িতে দেখা করে যাবেন পরিচালক মশাই..!
গল্পটা সুদূর আমেরিকার৷ নিউইয়র্ক থেকে ফিলাডেলফিয়া তে যাচ্ছিলেন, ট্রেনের সেই যাত্রাপথের একবার থেমে যাওয়া যে তার জীবনে এতো কিছু দিয়ে যাবে, সেকথা বোধ হয় ভাবেননি তিনি। আর ভাববেনই বা কি করে, অদূর ভবিষ্যৎ দেখা যায় নাকি??? সবাই কি আর “প্রিডেস্টিনেশন” এর অধিকারী হতে পারেন নাকি? সবার মগজে টাইম মেশিন এর ফর্মুলা ইনপুট করা আছে….!

পরিচালকের নাম – রিচার্ড লিঙ্কল্যাটার, তখনও ফিল্মজগতে চুনোপুঁটি হিসেবেই পরিচিত। সালটা ১৯৮৯, সবে “Slacker” সিনেমার শ্যুটিং শেষ করে ফিরছেন, ভাবলেন ফিলাডেলফিয়া তে একরাত কাটিয়ে নেবেন। একটা খেলনার দোকানে একটি মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয় তার। নাম – অ্যামি লেরহাউপ্ট, আমেরিকা থেকে ইউরোপ যাবে সে। বেশ কয়েক ঘন্টা হেঁটে হেঁটে গল্প করেন তারা, সিনেমা-রাজনীতি-মিডিয়া সব কিছু উঠে আসে সেই সব কথোপকথনে। প্রেমে পড়ে যান দুজনে, রিচার্ডের হোটেলেই রাত কাটান দুজনে। যেটা স্মরণীয় হয়ে যায় দুজনের কাছেই। পরের দিন সকাল হতেই বিদায় জানাতে হয় একে অপরকে, ফোন নম্বরও এদিক-ওদিক হয় দুজনের মধ্যে। ঠিক হয় ছ’মাস অন্তর একবার করে এই একই স্টেশনে দেখা করবেন তারা, কিন্তু পরিচালক মশাই কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেলে সেসব আর হয় কি করে….! ফোনে কথা হয়েছিলো খুব কম বারই। তারপর কেটে গেছে অনেক গুলো বছর…..!!
রিচার্ডের কথা মতো “that long distance thing”…. স্বভাবতই সে প্রেম আর রইলো না।

ভাবলেন মেয়েটিও হয়তো ভুলে গেছে সে কথা, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের পেশাকে পন্থা হিসেবে বেছে নিলেন। সিনেমা বানাবেন সেই সাক্ষাৎ এর ওপর নির্ভর করে, যদি কোনদিন দেখে অ্যামি, তাহলে হয়তো বুঝতে পারবে যে সেই এক রাতের ভালোবাসা এখনও আছে অটুট, মনের গভীরে, অন্তরালে।
ইথান হক, জুলি ডেলপি কে নেওয়া হলো, স্ক্রিপ্টেও সাহায্য করলেন, জুলি ডেলপি এমনিতেই স্ক্রিপ্ট রাইটার, চিত্রনাট্যতে অবদান রাখলেন কিম ক্রিজান, বিখ্যাত আমেরিকান মহিলা …!

সিনেমার শ্যুটিং হলো পুরো ভিয়েনাকেই কেন বেছে নিলেন? তার মনে হয়েছিলো সিনেমাটির জন্য খুব ন্যাচেরাল এটা- এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেটা জানিয়েছিলেন। ১৯৯৫ এ রিলিজ করলো ” Before Sunrise”…. একদম “from midnight until six in the morning” এর কথা মাথায় রেখেই এমন নাম।
ছবি খুব একটা যে রোজগার করতে পারলো এমন নয়, কিন্তু যত দিন যেতে থাকলো, মানুষের মনে ভালো লাগা জন্মালো এই সিনেমা নিয়ে। রিচার্ড ততদিনে জীবনসঙ্গী পেয়ে গেছেন৷

Before Sunrise
মনোহারি কথোপকথন….@ Before Sunrise

এই সিনেমা টা এখনও বেশ কিছু ওয়েবসাইট, সিনেমাপ্রেমীরা সেরা প্রেমের সিনেমার তালিকায় রাখেন। বিশেষ করে কথোপকথন গুলো মন দিয়ে শোনার মতো….. এমন একটা জায়গায় গিয়ে শেষ হয়, যেখান থেকে দর্শকদের চার পাঁচ রকম জিজ্ঞাসা উঠে আসে, সে সব না হয় সিনেমাটা যারা এখনও দেখেননি তারাই দেখে বুঝে নেবেন। কিন্তু কথাটা হলো অ্যামি কি আদৌ পারলো এটা দেখতে??? জানা গেলো না৷ 

(সিনেমাতে যদিও ফোন নম্বর আদান প্রদানের কথা এড়িয়ে যাওয়া হয় চিত্রনাট্যের খাতিরেই) 

সিকুয়েল এর ভাবনা এলো। এবারেও স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে জুলি জায়গা পেলেন না।
রিচার্ড ভাবলেন, সাক্ষাৎ তো হলো না, যদি হতো কেমন হতো , সে সব ব্যাপার নিয়ে আরো দুটো ফিল্ম বানাবেন- ঠিক হলো। যেখানে ছেড়ে গিয়েছিলেন হাফ ডজন উৎকণ্ঠা জড়ানো প্রশ্ন নিয়ে একদম অন্য জায়গা থেকে শুরু করলেন পরের ফিল্মটা — “Before Sunset” — জেসে (ইথান হক) সেই রাতের কথা স্মরণ করে বই লিখে ইউরোপে ফেমাস হয়ে গেছেন… প্যারিসের একটি বুক স্টোরে তারই পাঠ চলছে আর দেখলেন সেলিন (ডেলপি) বাইরে…! তারপর আবার গল্প,আবার কথোপকথন, আবার সেই রাতের উত্থাপন….! কখনও রাস্তায়, কখনো ফেরিতে….! লেখক তার কনফারেন্সের ফ্লাইট মিস করবেন??? সেলিনের কথা – “Baby you are going to miss the plane” দিয়ে শেষ হলো সিনেমা…..সূর্যাস্ত আর হলোই না। আবারও প্রশ্ন গুচ্ছেক। বাজিমাৎ করলেন পরিচালক।

Before Sunset
পথচলতি গল্পরা @ Before Sunset

পরের ফিল্ম৷ ২০১৩ “Before Midnight” এবার গ্রীস। সেলিনের আর তার দুই জমজ মেয়ে আছে। কেটে গিয়েছে প্রায় দশটা বছর। গ্রীসে গরমের ছুটি কাটাতে গিয়েছেন তারা….তারপর আবার কিছু গল্প, বয়স বাড়ার সাথে তাতে তিক্ততা যুক্ত হলো। এবার উত্তপ্ত কথোপকথন, পরিচালকের “Before Trilogy” র শেষ পর্যায় এটা। অসম্ভব রকমের, অন্য ধরনের কথোপকথন দিয়ে শেষ হলো সিনেমা। এবার হয়তো কোন প্রশ্ন আর পড়ে রইলো না, আগের দুটোর সাথে তুলনা করতে করতে অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই বেশ কিছু ব্যাপার অনুভূত হতে থাকারই কথা, যে যে বয়সে দেখবেন এই সিনেমা,তার সেই রকম ফিলিং আসার কথা, রিচার্ড একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন –

“I always said that the movie was a litmus test for how you view romance.” (New York Times, 2004)!

Before Midnight
এবার গল্প বলার পালা অন্যদেরকে @ Before Midnight

 

এতো দূর তো ঠিক আছে। কিন্তু…. তিন বছর একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক্, ২০১৩ থেকে। অর্থাৎ ২০১০ তখন।  ইতিমধ্যে বিখ্যাত তিনটি সিনেমা  অ্যামির এক বান্ধবী দেখেন…! বুঝতে অসুবিধা রইলো না। অনেক চেষ্টার পর পরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তখনই জানা যায় যে অ্যামি লেরহাউপ্ট ১৯৯৪ এ একটি মোটরকার দুর্ঘটনায় মারা যান, সিনেমা শ্যুটিং শুরুর ঠিক এক মাস আগে…..! ভাবা যায়। উনি চেপে দিলেন পুরো ব্যাপারটাকে।
২০১৩ তে Before Midnight এ আর কিছু বাকি রাখলেন না৷ শেষ পর্যন্ত দেখলে, দর্শক প্রথমবারের জন্য দেখতে পাবেন Dedicated to…… AMY LEHRHAUPT…..
স্ক্রিপ্টের জন্য জায়গা পেলেন জুলি ডেলপিও।

তবে কিছুটা অবাক করার হলেও এই সিনেমা বানানোর কথা পরিচালক তাদের প্রথম সাক্ষাতেই জানিয়েছিলেন তার প্রেমিকাকে।

Even as that experience was going on … I was like, “I’m gonna make a film about this.” And she was like, “What ‘this’? What’re you talking about?” And I was like, “Just this. This feeling. This thing that’s going on between us.”

সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন ঘটনাটা খুব দুঃখেরই ছিলো।

ভালোবাসার স্মারকটাই অ্যামি দেখে যেতে পারেনি….সত্যি এমনও হয়….!
সব গল্প তাই গল্প নয়, সত্যিও হয়….! এভাবেই বারবার “গল্প হলেও সত্যি”…….. সত্যিই হয়ে যায়। কুর্নিশ!!


© শুভঙ্কর দত্ত || April 21, 2019 

তথ্যসূত্র : https://slate.com/culture/2013/05/before-sunrise-inspiration-before-midnight-is-dedicated-to-amy-lehrhaupt-who-inspired-the-series.html

__________________________________________

★ সম্প্রতি পুড়ে যাওয়া নটরে ডাম চার্চ নিয়ে ভবিষ্যৎবাণীটা বড়োই মনে করিয়ে দেয় সিনেমাটাকে

20190416_122524
কথায় কথায় নটরে ডাম চার্চ @ Before Sunset

‘পদ্মশ্রী’ হলেন শ’চারেকের মা

আশীষ
শতায়ুর ছোঁয়া

প্রথা ভেঙেছেন বলে খবরে?
না না, তা কেন হবে? আমার মতো লোক যারা চিনতো না, জানতো না, তাদের কাছে হয়তো নতুন এই খবরের দৌলতে….কিন্তু না…..!

পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণের সময় আমাদের দেশের প্রেসিডেন্টের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছেন “ভ্রুক্সা মাথে”….! প্রথা ভেঙেছেন ১০৫ বছর বয়সী  বৃদ্ধাটি…! ভাগ্য ভালো বলতে হবে সম্মানীয় রাষ্ট্রপতির, সে কথা স্বীকার করেও নিয়েছেন তিনি…! আবেগঘন মুহুর্তটিকে তুলে রাখার জন্য ফেসবুক পেজেই পোস্ট করেছেন আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ মহাশয়।

সালুমারাদা থিমাক্কা….. Saalumarada Thimmakka…. ইংরেজি থেকে বাংলা করতে হয়তো ভুল হতে পারে….যারা চেনেন না, তাদের চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।

বয়স ১০৫ হবে, নিজেই বলেছেন তার কোনো বার্থ সাটিফিকেট নেই। সালটা ১৯২৮, বিয়ে হলো তার, বয়স কুড়ি হবে তখন। এরপরের কুড়িটা বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও সন্তান প্রসবে অক্ষম হলেন। ততদিনে “বন্ধ্যা” শব্দটা শুনে হাঁপিয়ে উঠেছেন, একদিন সহ্য করতে না পেরে জলে ঝাঁপ দিলেন, শেষ করে ফেলবেন এ জীবন। কিন্তু সহায় হলো একটা গাছ, বেঁচে গেলেন সে যাত্রায়।
সেই বছরই তার জীবনসঙ্গী, তার স্বামী বিক্কালুচিক্কায়াকে নিয়ে নেমে পড়লেন এক নতুন জীবনের খোঁজে, ব্রতী হলেন এক নতুন কর্মে। সন্তানহীনা হওয়ার শোক ভুলতে ঠিক করলেন গাছ লাগাবেন রাস্তার ধারে, লাগালেন বট গাছ। সন্তানের মা হতে পারেন নি তো কি? মা হয়ে গেলেন প্রায় চারশো খানা গাছেদের, মা না হওয়ার শোক ভুলে গেলেন লোকজনের মুখে শোনা ‘ভ্রুক্সা মাথে’ ডাকে যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘গাছেদের মা’ ……. ‘Mother Of Trees’…
কন্নড় শব্দ Saalumarada মানে হলো গাছেদের সারি, সেই শব্দই বসে গেছে তার নামের বদলে।

বেঙ্গালুরু শহর থেকে অনতিদূরেই হুলিকাল নামে গ্রামে এই কর্মকাণ্ড তার, যার শুরু সেই ১৯৪৮ এ, আজও চলছে। দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে একইভাবে গাছ লাগিয়ে যান মহান এই মানবীটি।

১৯৫৮ তে গ্রামের দুই মুখ্যে প্রথম তাদের লক্ষ্য করেন গাছে জল দিতে, পরে স্থানীয় এক মেলায় ডেকে তাদের রুপোর পদক দিয়ে সম্মান জানানো হয়। তখন সেই গ্রাম থেকে কাছের বাজারে যেতে কর্দমাক্ত পথ পেরোতে হতো। দূর দূরান্তের কুয়া থেকে জল এনে চারাগাছে দিতেন, ১০-১৫ টি করে নতুন নতুন চারাগাছ লাগিয়ে এসেছেন ফি বছর।

১৯৯১ সালটা খুব কঠিন হয়ে গেলো তার জন্য। স্বামী মারা গেলেন। হাস্যকর হলেও শুনলে খারাপ লাগার কথা তার স্বামী নিজের লাগানো গাছ কাটার অপরাধে হাজতবাস করেন, তারপর থেকেই শরীর ভেঙে যায় তার, বয়স্কা মহিলাটিকে রেখে চলে যান ইহলোকে। আত্মীয় সজনরা তাদের জমিজমা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য জবরদখল করলেন, অসহায় বৃদ্ধা বেচে দিলেন কিছু, কম টাকার বিনিময়ে…..! বন্যা হলো, যে বাড়ি ছিলো, সেটাও গেলো নিশ্চিহ্ন হয়ে। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্য পেয়ে তিনি বিধবা ভাতার জন্য দরখাস্ত করলেন, পেয়েও গেলে ৭৫ টাকা করে, মাসকাবারি বন্দোবস্তো হলো একটা।

থামলেন না, জন্ম দেওয়া চললো নতুন গাছের।
এরপর এলো একটা দিন, সালটা ১৯৯৪….

এক কংগ্রেস নেতা যাচ্ছিলেন ঐ রাস্তা দিয়ে, অপরাহ্নের ক্লান্ত রবিকিরণেও তখন তিনি ঘায়েল, হঠাৎ মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা বাতাস লাগলো গাড়ির ভেতরে এসে…..! গাড়ি থামালেন….!  বয়স্কা মহিলাকে এককালীন ৫০০০ টাকা দিলেন, তক্ষুণি। স্থানীয় এক সভায় সেই নেতা উল্লেখ করলেন সে কথা, সালু তখন স্বপ্নে ভাসছেন। নিরক্ষর হলে কি হবে, তখন গুচ্ছেক শুভেচ্ছা বার্তা আর মিডিয়ার রিপোর্ট প্রকাশিত হলো সেই নিয়ে।
রাজ্যসভার এক সদস্য সচ্চিদানন্দস্বামী তৎকালীন প্রধান বিচারপতি পি.এন.ভাগবতী র কাছে আর্জি করলেন, সালটা ১৯৯৬…. প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়ার থেকে National Citizen’s Award এ ভূষিত হলেন Mother Of Trees….!

(দিল্লীতে সেই সম্মান পেলেন বটে, তবে তাকে যখন বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়, তখন ঐ পুরস্কারের সাথে মানপত্রটি এলেও অর্থটা আসেনি, পরে সেসব কথা তিনি জানিয়েছেন তার বায়োগ্রাফিতে…! বায়োগ্রাফার কে বলেছিলেন সব সত্যি কথা  লিখতে হবে, ফিল্মি হলে চলবে না৷ )

এরপর আর অপেক্ষা করতে হয়নি, বসে থাকতে হয়নি তাকে। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। একজন ছেলেকে দত্তক নেন, শিক্ষিত সেই ছেলের একটি নার্সারি আছে….!
কর্ণাটক সরকার ২০১৪-১৫ সালের দিকে তার নামে একটি প্রকল্প শুরু করে যার উদ্দেশ্য রাস্তার পাশে গাছ লাগানো, Saalumarada Thimmakke Shade Plan….

২০১৬ তে বিবিসি তাকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী এবং অনুপ্রেরণাদায়ী মহিলার দলে তালিকাভুক্ত করেছে।

আমেরিকার একটি সংস্থা তার নামে পরিবেশশিক্ষাটি নামাঙ্কিত করেছে, যা মূলত ওকল্যাণ্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলসে রয়েছে।

পেয়েছেন আরো সম্মান, অজস্র সম্মান….! রাষ্ট্রপতি ভবনে যখন তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিলেন , কে বলবে ১০৫ বছর বয়সী বয়স্কাটি এখনো তার বুড়ো হাতগুলো দিয়ে পরিচর্যা করেন। ঐ হাসি দেখে কে বলবে তিনি সন্তানহীনা।

কে বলবে তার খাদ্যতালিকায় আছে বিখ্যাত দক্ষিণী মিষ্টি রাগি মুদ্দে….! নিজে আবার বলছেন – এই বয়সেও সময়সুযোগে ফিস্ট হলে তিনি চিকেন বা মাটন খান।

রাষ্ট্রপতি ভবনে পুরস্কার নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি মহাশয়ের মাথায় তার হাতটা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন….. গোটা হল হাততালিতে ফেটে পড়লো…. ‘পদ্মশ্রী’ হলেন শ’চারেকের মা…….!

51 (1)
পদ্মশ্রী হাতে
Mother of trees
INFLUENTIAL & INSPIRING

আমার এক বন্ধুর কথায় ভারতরত্ন বড়ো রাজনৈতিক বাকবিতন্ডাময়, তার চেয়ে “পদ্মশ্রী” ই ভালো….!

আজও তার আক্ষেপ….
শিক্ষিত সমাজ, শহুরে মানুষরা কেন গাছ কেটে দেয়…..!!! ফল দেয়, ফুল দেয়, ছায়া দেয় তবু কেন? কোথায় সেরকম গাছ? এসবই তার আক্ষেপ…!
আসলে সবাই তো আর যন্ত্রণ ঢাকার জন্য জীবন সংগ্রামে লিপ্ত নয়, তাই না?

Mother Of Trees
সন্তানদের মাঝে

——————————————————————

(তথ্য – গুগলে এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে।

ফিচার ফটোর সৌজন্যে – বন্ধুবরেষু সৌমেন দাস….! একবার জানতেও চায়নি কি দরকার ছবিটা।)

© শুভঙ্কর দত্ত || March 17, 2019

নগরকীর্তন – বাঁচার অধিকার ওদেরও…

সিনেমাটা কেন দেখতে চান?
‘নগরকীর্তন’ এর দুটো টিকিট চাইতেই টিকিট কাউন্টার থেকে ইন্টারভিউসম প্রশ্ন ধেয়ে এলো….
বাংলাসহ সারাভারতে আলোড়ন করা বিশেষ এই সিনেমা দেখতে চাওয়া দুই বন্ধুকে এক বৃদ্ধের এই প্রশ্ন।

বললাম – ‘কৌশিক গাঙ্গুলি আমার প্রিয় পরিচালক…..! একটু ইয়ার্কি মেরেই বললাম, বাকিটা দেখে এসে বলি…!
ভদ্রলোক হাসলেন।
বললেন শুধুই এই কারণ….?

বললাম — না আসলে ঋদ্ধি কেও ভালো লাগে, সেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ থেকেই ফ্যান!
বললেন — ‘কৌশিক গাঙ্গুলি প্রিয় পরিচালক, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হয় উনি নিজেকে ঋতুপর্ণর জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন!’

টিকিট কাটা হলো৷
আসলে একটা পরীক্ষা পড়েছিলো কলকাতায়, দুই বন্ধু মিলে ট্রেনে আসতে আসতেই একটা প্ল্যান মাথাচাড়া দেয়, আর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ১ কিমি দূরত্বে সিনেমাহলে ‘নগরকীর্তন’ চলছে। সুরজিৎ বললো – ‘এ সুযোগ হাতছাড়া করলে অ্যাচিভমেন্ট বলে কিছু থাকবে…?’ এরকম গোছেরই কিছু। অতএব, চলো, এগিয়ে যাওয়া যাক্। ব্যস্ ‘মিত্রা’ দাঁড়িয়ে আছে!

টিকিট তো কাটলাম, দেড় ঘন্টা বাকি এখনো। এদিক ওদিক ঘুরছি, কিন্তু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সিনেমাটা দেখতেই হবে, অতিশয় আগ্রহকে সঙ্গী করে।

——————————————————————
সিনেমা শুরুর আগে কিছু কথা উঠলো।
এই গল্প সেইসব প্রেমের গল্প, যে গুলো আর পাঁচটা প্রেমের মতো নয়।
ভেসে উঠলো Tributed To…. কে হতে পারে? আরে, নান্ আদার দ্যান ঋতুপর্ণ ঘোষ…!
ছবির নীচে ইটালিক্সে লেখা
“পরজনমে হইও রাধা….”
বুঝতে বাকি রইলো না। সদ্য ‘সমান্তরাল’ দেখেছি৷ কৌশিক গাঙ্গুলিও আগে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বানিয়েছিলেন, মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ৷ তবে কৌশিক গাঙ্গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। সত্যিই তো সিনেমাটা কেন দেখতে যাবো?
‘ছোটোদের ছবি’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘শব্দ’ কেন দেখতে গিয়েছিলাম বা কেন দেখেছি?
কারণ উনি অন্যদের কথা বলেন, অন্যকিছু বলেন, সবাই যেটাকে নিয়ে ভাবেন না, যাদের নিয়ে ভাবেন না, উনি তাদের কথা তুলেই ধরেন। তাই…….! এটা অবশ্য বৃদ্ধকে বলা হয়নি৷

পরিমল-পরি-পুঁটি (ঋদ্ধি সেন) এই গল্প একদিকে চলতে থাকে, আর একদিকে….পুঁটির প্রেম চলতে থাকে, প্রেমিকের ওপর ভরসা করে চলতে থাকে জলে থেকে কুমীরের সাথে লড়াই করার অব্যহতির খোঁজ। শৈশব থেকে মনের মধ্যে পুষতে থাকা নারীত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আবদার — “শরীরে ভুল আছে মধুদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী) , শুধরে নিতে হবে….!”
সমান্তরালভাবে দুটো গল্প বলায় একটুও বোরিং লাগেনি, ততটাই সাবলীল লাগলো শুভজিৎ সিংহের কাঁচি চালালনোটা, অবশ্য আগেও ‘ছায়া ও ছবি’, ‘মাছের ঝোল’, ‘বিসর্জন’, ‘শব্দ কল্প দ্রুম’ এর মতো সিনেমাগুলিতে একই কাজ করেছেন।

বহুদিন আগে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ পড়েছিলাম, বেশ লেগেছিলো, সিনেমাটা দেখতে দেখতে বেশ ওটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যদিও সেখানে গল্প ভিন্ন। তবে সেই উপন্যাসের একজনের উল্লেখ ছিলো বারবার, সিনেমাতে দেখি স্বমহিমায় তিনি উপস্থিত – মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালকের মুন্সীয়ানা চোখে পড়লো, সোমানাথ থেকে মানসী হওয়ার লড়াই – গল্প সবকিছু বলিয়ে নিলেন তার মুখ দিয়ে, শুধু তাই নয়, বলিয়ে নিলেন – শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণভাবে মজে যাওয়ার ঘটনাটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার ফলে সিনেম্যাটিক ভ্যালু বেড়ে যায় বলেই মনে হয়৷

সিনেমার দৃশ্যপট এতো বাস্তব যে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়েও এই সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও বারবার মনে হচ্ছিলো এটা বোধ হয় খুব সহজ একটা ঘটনা৷ মধুদের পৈতৃক বাড়ি – নবদ্বীপ, যেখানে চিত্রনাট্য পৌঁছানোর পর থেকেই একটা ক্ষীণ উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হতে বাধ্য দর্শকদের মনে, যেটা তীব্র হয়, যখন দোলপূর্ণিমার আসরে মধু বাঁশি বাজায়, আর পুরুষরূপী নারীমনের পুঁটির আসল রূপ আচমকাই প্রকাশিত হয়ে যায়।

এরপরও আরো ঘটনা……! ঘটতেই থাকে….! শেষ আধ ঘন্টা দর্শকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দিতে বাধ্য, ভাবাতে বাধ্য। সিটে আরাম করে বসে থাকা ঘুচিয়ে দিতে সফল এই সিনেমা। ওয়াটসআপ-ফেসবুকের মাধ্যমে কিভাবে কোনো ঘটনা ভাইরাল করা যায় তা দেখাতেও ছাড়লেন না। ‘নগরকীর্তন’ নামটা বেশ ব্যঞ্জনধর্মী বলেই মনে হলো, নগর বা সমাজে চলতে থাকা অহরহ ঘটনাপ্রবাহগুলোকেই বলা হচ্ছে এখানে।
ঋদ্ধি সেন কেন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, তার সদুত্তর মিলবেই, কস্টিউম-মেক আপের সাথে যেভাবে পরতে পরতে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন, অসাধারণ….! (তাই দুটো জাতীয় পুরস্কার কস্টিউম আর মেকআপে, নগরকীর্তনের ঝুলিতেই) সাথে আবার ঋত্বিক থাকলে তো পাশের লোককে ভালো অ্যাক্টিং করতেই হবে….! আর্ট ডিরেকশন প্রশংসনীয়। কীর্তনের সাথে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঁশিকে, অনেক দুঃখের মাঝে একটা আনন্দের চোরাস্রোত বয়ে যায় দর্শকের অলিন্দ বেয়ে…..! সৌজন্যে – প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি….! ভালো লেগেছে সুজন মুখার্জি ওরফে নীলকে, মধুর বৌদির চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী যতক্ষণ ছিলেন ফাটিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যটা৷

মন ছুঁয়ে যায়, কীর্তনের মাধ্যমে বলা – “তুমি আমারই মতন জ্বলিও…” এই অকপট কথা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে….! রাধার প্রেমে মজে নিজেকেই রাধারাণী করতে উদ্যত।

সবশেষে বলতেই হয় কৌশিক গাঙ্গুলি আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন নিজেকে। অভিনয়ও করিয়ে নিলেন তাদের দিয়ে। ওনারা আশাবাদী এ সিনেমা দেখার পর মানুষজন তাদের হয়তো এতেটা অবজ্ঞা করবেন না। যাদের একঘর করে রাখে সমাজ, তিনি বারবার তাদের উপস্থাপিত করে গেছেন, বলে গেছেন সমাজকে পাল্টে নিতে ভাবধারা, কয়েকজনের বাঁচার মতো সমাজ কি আমারা গড়তে পারিনা, শ্রেনীশত্রু সৃষ্টি করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না…!
হলের টিকিট কাউন্টারের বৃদ্ধ মানুষটির দোষ খুঁজে পেলাম না বিশেষ, কারণ এ সিনেমা সবার জন্য নয়, কৌশিক গাঙ্গুলি বলেইছিলেন, এ সিনেমা রোজগারের জন্য বানানো নয়, এগুলো বানানোর পেছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো বোঝেননি….কবেই বা বুঝবেন।

কবেই বা বুঝবেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কেন আছেন এ সিনেমায়, কেন উৎসর্গ করার জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির নীচে লেখা

‘পর জনমে হইও রাধা…..’

© শুভঙ্কর দত্ত || February 25, 2019 

‘ক্যুইন’ এর আত্মজীবনী “বোহেমিয়ান র‍্যাপসডি”

ফারুক বুলসারা বললে কেমন অচেনা লাগে, ফ্রেডি মার্কারী বললেই কেমন একজন চেনা মানুষ হয়ে যায়। ‘ক্যুইন’ ব্যান্ডটার নাম আমি একবারই শুনেছি, সৌজন্যে- ‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসডি’ নামের গানটা৷ তখন নোকিয়ার একটা মোবাইল ছিলো, জাভার.. খবরে পড়েছিলাম দুনিয়ার সবচেয়ে মন ভালো করে দেওয়া গান হলো এটা। বেশ কষ্টাকুষ্টি করে ডাউনলোডও করা হলো, প্রথমবার শুনে তেমন কিছু হলো না। পরে সত্যি সত্যি মন ভালো হওয়ার যখন দরকার পড়ে তখন চালিয়ে শুনতে শুনতে লিরিক্স আর মিউজিকটা মন ছুৃঁয়ে দিলো। সেই থেকে জানি ওটা একটা গান। ২০১৮ তে এসে শুনি ঐ নামে একটা ব্রিটিশ- আমেরিকান সিনেমাও আসছে। ডিরেক্টর কে? সেই ‘ইউজুয়াল সাসপেক্ট’ খ্যাত ব্রায়ান সিংগার৷ ‘এক্স মেন’ দেখিনি আমি।
যাই হোক্, “এ স্টার ইস বর্ন” দেখেছি, তার আগের বছর “লা লা ল্যান্ড” দেখেছি৷ সবই মিউজিক্যাল জার্নি৷ কিন্তু এটা “ক্যুইন” ব্যন্ডটির বায়োপিক বলা যায়৷ এরকম একটা ব্যান্ডের বায়োপিক কবে দেখেছি মনে নেই, আদৌ দেখেছি কিনা, তাও মনে নেই। তার মানে একটা ব্যান্ড কোন জায়গায় পৌঁছলে তা সম্ভব। বাজেটের প্রায় দশ-এগারো গুণ টাকা কামানো টা খুব সহজ কি? যেখানে তথাকথিত কোনো স্টার নেই, হোক্ না হলিউড।

ফারুক বুলসারা…..জন্ম জাঞ্জিবার….মা বাবা পার্সি…. জরাথ্রুস্টের অনুগামী তারা। ফারুকের শৈশব কাটে ভারতে, তারপর তারা চলে আসে ইংল্যান্ডে। সিনেমা থেকে এটুকুই জানা যায়। চারটে কৃন্তক দাঁত বেশি নিয়ে জন্মে ছিলো ফারুক বুলসারা…… একটা ব্যান্ডের পারফর্ম দেখার পর তাদের কাছে গিয়ে দাবি করে বসে আমার এই বেশি দাঁতের জন্য মুখের জায়গাও বেশি৷ তাতে করে গাইতে সুবিধেই হয়। তাদেরও নতুন লিড সিংগার দরকার ছিলো, মেঘ না চাইতেই জলের মতো মিলেও গেলো একজনকে। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ডেন্টিস্ট ছেড়ে দিয়ে আসা তিনজনের সাথে যুক্ত হলো ফারুক….! ব্যান্ড হলো নতুন৷ নাম হলো – ক্যুইন৷ তারা তাদের প্রথম অ্যালবামের জন্য ভ্যানটাকেও বেচে দিলো। এলো প্রথম অ্যালবাম৷ টাকা ঢাললেন যিনি তার আপ্রাণ চেষ্টা সত্বেও ‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসডি’ এর অন্তর্ভুক্তি আটকানো গেলো না৷ ব্যস……… মার্কারির চরিত্রে র‍্যামি ম্যালেক দারুণ। ইতিমধ্যেই গোল্ডেন গ্লোব জিতে নিয়েছেন৷

বাকিরাও সাবলীল, কিন্তু কাকেই বা চিনতাম৷ মালেককে তবুও আগে কোথাও দেখেছি মনে হয়।

যাই হোক্, সিনেমাটা দেখার আগে মার্কারীর জীবনটা জানলে আরো ভালো হতো৷ তবে এই সিনেমা শুরু হয় ২০১০ এ, তারপর তিন বছর পর মার্কারীর চরিত্রে ভাবা অভিনেতা ছেড়ে দেন৷ পরিচালক সিংগারের সাথে গোলমাল হয় প্রোডাকসান টিমের কারণ তার গড়হাজিরা। এরপর হাল ধরতে ডাকা হলো – ফ্লেচারকে। কিন্তু কি ভাগ্য ভাবুন আমপরিকার ফিলিম গিল্ডের নিয়ম অনুসারে সিনেমার ডিরেক্টর হয়ে গেলেন শুধুমাত্র সিংগার, ফ্লেচার হলেন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর।

সিনেমার চিত্রনাট্যকার বেশ নামকরা। “দ্য থিয়োরি অব এভরিথিং”, “ডার্কেস্ট আাওয়ার” খ্যাত অ্যানটনি মাককার্টন। একটুও বোর হতে দেননি। এগুলো বলার সাহস নেই আমার। অতএব……. শুধু ভালো লাগা নিয়ে থাকি আর দেখতে বলি…

ভালো লাগলো সিনেমা টা দেখে। লাস্ট কুড়ি মিনিটের যে কনসার্ট টা দেখানো হয়েছে ওটা বারবার দেখতে ইচ্ছে করছে……… মার্কারীর নিজের জীবন, তার গান, তার অকুতোভয় সব গ্রাস করে নিলো তার জটিল এইডস রোগ…..

screenshot_20190118-003922~2

তবে অন্য রক্ গায়কদের মতো হতাশার সাগরে ডুব দেননি ইনি৷ ব্যান্ডের সদস্যদের বলে দিয়েছিলেন “FEARLESS LIVES FOREVER “

ব্যস তাতেই We are the champions 🤘

screenshot_20190118-004259

© শুভঙ্কর দত্ত || January 18, 2019

চলো গাড়ি বেলপাহাড়ী, হালকা করে ঘাটশিলা

চলো গাড়ি বেলপাহাড়ী……!
সেই ছোটোবেলায় খেলতাম যেসব বুলি আউড়ে, তার মধ্যে এটা একটা ছিলো। তখন জানতামও না যে বেলপাহাড়ী কদ্দূরে…শুধু পরে জেনেছি যে আমার বাড়ি থেকে বেশ দূরেই। পরে আরো যখন বড়ো হলাম, একটু আধটু ঘুরতে শিখলাম, তারও পরে ফেসবুকে যখন ছবি দেখলাম তখন ইচ্ছেটা আরো বেড়ে গেলো। একবার প্ল্যান করেও যাওয়া হলো না, অবশ্য সে ইতিহাস গোপণ থাকাই শ্রেয়। তারপর এলো এই সেই দিনটা….ঠিক আগের বছরের পুনরাবৃত্তি..! এবারও আগের বারের মতো একটা ফোন এলো ঘুরতে যাওয়ার অফার নিয়ে (মুফতে না তো অবশ্যই), জানতামই যে তারা বেলপাহাড়ী যাচ্ছে। অতঃপর ভেবে কোনো কাম নাই। সাগরেদকেও বলা হলো। বেরিয়ে পড়লাম বছরের একদম পেনাল্টি সপ্তাহে….!

মেদিনীপুর থেকে যাত্রা শুরু হলো ঠিকঠাক সময়েই। বেলপাহাড়ী পৌছানোর আগে অবশ্য শিলদাতে চপ-মুড়ি-বেগুনী সাঁটানো হলো। বেলপাহাড়ী গিয়ে কাঙ্খিত রুমে পৌঁছে ব্যাগ রেখেই বেরিয়ে পড়লাম।

  • পাহাড়ে ঘেরা লালজল

প্রথমেই লালজল….বাঁশপাহাড়ীর দিকে এগিয়ে চলতো থাকলো স্করপিওটা….দু পসারী ঘন সবুজ জঙ্গলটাকে পেছনে ফেলে যত এগোচ্ছি মখমলের মতো রাস্তা ধরে ততই মুগ্ধতার চাদরে নিজেদেরকে ঢেকে ফেলছিলাম, তখনও পৌঁছইনি, কিন্তু পথে গাড়ি থামিয়ে টুকটাক শ্যুটিং হলো শুরু। যানবাহনের দৌরাত্ম্য কম….! শ্যুটিং শেষে পৌঁছালাম লালজল…! পাহাড় না গ্রাম? লালজল আদপে একটা পাহাড়ঘেরা ছোট্ট গ্রাম, যার মূল উপজীব্য হলো লালজল দেবী আর লালজল পাহাড়ের আদিম গুহা। শীতের দুপুরেও উঠতে বেশ কসরত করতে হলো, গুহা পেরিয়ে উঠলাম একদম শিখরে…..সুবিস্তৃত বনরাশির আদরে চোখ মুখ তখনের মতো থ….! লালজলের সম্বন্ধে জানাতে গেলে সে অনেক কথাই বলতে হয়….! আনন্দবাজারের লিংক দিয়ে দেওয়ায় শ্রেয়…! বলে রাখা ভালো যে এখানের ঝরনার জল লাল বলেই এরকম নামকরণ।

img_20181229_121258
লালজল দেবীর মন্দির
img_20181229_120625
গুহা মুখ
img_20181229_114446
লালজল গ্রাম
  • পরিযায়ীদের ঠিকানা – খাঁদারানী ঝিল 

লিস্টে এখন অনেক নাম কিন্তু আাপাতত খাঁদারানী ঝিল…! জংলী ঝাঁকুনির রাস্তাকে হেলায় হারিয়ে দিয়ে পৌঁছালাম ঝিল…! খাঁদারানী ঝিল, যদিও কয়েকদিন আগেই এসেছিলাম একবার। সেতুবন্ধন পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম ওপারে….বিড়ি পাতার গাছ, বাবুই ঘাসের জঙ্গল (যা দিয়ে দড়ির খাট বানানো হয়)….দেখা পেলাম ঝিলের স্থায়ী বাসিন্দা পাতাঝাঁঝিদের, হ্যাঁ সেই ক্লাস সেভেন এইটে পড়া পতঙ্গভুক উদ্ভিদের অন্যতম….! নিরালা নিস্তব্ধ খাঁদারানী, যেখানে এখনো বিদ্যুত বিভাগের আশীর্বাদ পৌঁছায়নি, তাই মাইকের জন্য সৌরকোশও ভরসা কারো কারো কাছে, লাল শালু আর পাতাঝাঁঝি ভরা ঝিলের মাঝে একটা দ্বীপ রয়েছে, যেখানে দেশ-দেশান্তর থেকে অনেক পরিযায়ীরা আসে, তাদের কুহুতানে গোটা ঝিলে পিকনিকরত লোকজনের এতটুকু বোরিং লাগার কথা নয়। ওপার থেকে পিছিয়ে আসতেই চোখে পড়লো– সবুজের উচ্চতাকে হার মানিয়ে ওঠা একা পাহাড়ের শিখর…! কি নাম তার??
গাডরাসিনী পাহাড়…..! উফফ্ কখন যাবো???

img_20181214_113215_hdr
প্লাস্টিক মুক্ত
img_20181229_125132
উঁকি মারে
img_20181214_110103_hdr
ঝিলের সেতু
img_20181214_142109
মাঝে আছে ছোট্ট দ্বীপ
img_20181214_142929_hdr
পাতাঝাঁঝির জঙ্গলে
img_20181214_113244_hdr
সচেতন হোন
img_20181214_130407_hdr
বিড়ি পাতার গাছ – কেন্দু
img_20181214_125950_hdr
বাবুই ঘাসের পাড়ায়

নাহহহহ ততক্ষণে জ্বালানি ভাণ্ডারে কুচকাওয়াজ চলতে শুরু করেছে অনবরত..! অতএব আহারাদি সারা যাক্। বেলপাহাড়ী ফিরে গিয়ে ‘তৃপ্তি’ তে তৃপ্তিভরে খেলাম। একটু জিরিয়েই আবার ঐ পথ ধরেই পরের গন্তব্য…..

  • গর্জাস গাডরাসিনী পাহাড় 

পৌঁছে গেলাম গাডরাসিনী পাহাড়ের কোলে। আশ্রম পেরিয়ে সোজা চড়াই এর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ন’জন আরোহী…! ওঠা শুরু হলো। অবশ্য বড়ো পাহাড়ে ওঠার রিহার্সালটা সেই লালজল দিয়েই হয়েছিলো। পাহাড়ে একপ্রস্ত ওঠার পর একটা বিশ্রামের জায়গা মিললো, একটা মন্দির, কি মন্দির, সেসব দেখার সময় কোথায়? এগিয়ে গেলাম আরে উচ্চতার দিকে। এরপর উচ্চতায়, একদম। পুরো বেলপাহাড়ী উঠে এলো চোখের সামনে, সে যে কি মনোরম দৃশ্য, স্বভাবতই একজন সঙ্গী বলছিলো -“সবকিছু ক্যামেরা ধরতে পারে না।” সত্যিই তাই, সে যে কি নৈসর্গিক রূপ, তা বোধহয় প্রত্যক্ষ না করলে বোঝা সম্ভব ছিলো না৷ পাহাড় থেকে যেদিক পানে চাই শুধুই….. যেনো সবুজ গালিচা বিছিয়ে তার ওপর দিয়ে প্রকৃতি হেঁটে বেড়াচ্ছে। রৌদ্র এর চোরাগোপ্তা আক্রমণ আরো গাম্ভীর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়ের গাছগুলোর৷ একটা গুহা যাওয়ার রাস্তার দিকনির্দেশ দেখে নেমে গেলাম। গাছের শিকড়ের কম্ম স্বরূপ আবহবিকারের ফলে যে গুহার সৃষ্টি তার ভেতর যে লোকাচারের পুজা চালু তা একটু পরেই বোঝা গেলো। ওপরে উঠে যেতেই সঙ্গী সাথীদের চোখে পড়লো, পড়লাম। পতাকা নির্দেশিত জায়গাটায় গিয়ে দেখি একখানা রিভার্সিবিল রিঅ্যাকশন হবো হবো করছে….মানে? কি আর…! এবার গাডরাসিনীর মাথা থেকে খাঁদারানীর সর্পিল পথ – স্পষ্ট দেখা মিললো।
নামতে ইচ্ছে করছিলো না, ঘড়ির ছোট কাঁটা কখন চারের ঘাড়ে গিয়ে চুমু খেয়েছে বুঝতেই পারিনি, কম কনট্রাস্ট এর ভানুবাবুর কায়দাতে পাহাড়টা বাঘা বাঘা টুরিস্ট স্পটকে তখন বলে বলে গোল দিচ্ছে…! রোজই দেয়। নেমে এসে আশ্রমের কলের জলে মুখটা ধুলাম, এতো ভারী আর মুলায়েম জল, মনে হলো চানটাই সেরে ফেলি…! এবার…..

img_20181214_164702
অতএব…
img_20181229_145529
চলা শুরু
img_20181229_152622
আবহবিকার @ গাছের শিকড়
img_20181229_152852
ছবির মতোই
img_20181229_153903
সুন্দরী খাঁদারানী – গাডরাসিনীর কোলে
img_20181229_154719
শিখর জয়ের পতাকা
img_20181229_153039
পড়ন্ত বেলায়
pano_20181229_155249
প্যানোরামা তে
  • বনের আঙিনায় ঘাগরা

ঘাগরা….! জলের আঘাত পাওয়া পাথরের বুক চিরে সবুজ নীলচে জলরাশি এগিয়ে চলেছে অনামি কোন মহাপ্রস্থানের পথে। ঝুর ঝুর শব্দে ফেনিল স্রোতস্বিনীকে হার মানিয়ে কখনো প্রকট হয়ে উঠছে শব্দদানবের হাঙ্গামা….! তাতে কি? আদিগন্ত বনানীর আঙিনা জুড়ে থাকা প্রবাহমান এই স্রোত এতটাই ম্রিয়মান যে জলপ্রপাত বলতে কেউ কেউ হয়তো রাগ করবেন বা দু এক মিনিট খিল্লি করতে পারেন। জলের তলায় আজব সব আঁকিবুঁকি। সবই ঐ জলরাশির ক্যালমা….পাথরগুলোকে খেয়ে খেয়ে এমন সব আলপণা….মনুষ্যসৃষ্ট কে হার তো মানাবেই, প্রকৃতি যেখানে ইঞ্জিনিয়ার।

img_20181229_170135
ফেনিল
img_20181229_170149
পাথরের বুক চিরে সবুজাভ জলরাশি
img_20181229_172610
জলের কায়দা
img_20181229_171659
ঘাগরা
img_20181229_171841
জলছবি

প্রায়ান্ধকার পরিস্থিতিতে আরো গাম্ভীর্য্য বেড়ে গেলো তার। ফিরতে হবে…! ফিরতি পথে এক মিষ্টি দোকানে গিয়ে নলেন গুড়ের রসোগোল্লা দিয়ে কিঞ্চিৎ উদরপূর্তি হলো। এবার সেই রুম।

 

রাতের মেনুতে কি আছে?
বেলপাহাড়ী স্পেশাল – শাল চিকেন… পুরো পাঁকশালা তৈরী করে, খাদ্যবস্তু প্রস্তুত…! রুটি দিয়ে দুমাদ্দুম সাঁটানো হলো। পড়ে রইলো কিছু, নিয়ে এসে মেদিনীপুর প্রিয় লোকজনদের আবদারে মুড়ি দিয়ে হলো ভুরিভোজ।

img_20181229_202303
রান্নার ঠিক পূর্বে : সরঞ্জাম
img_20181229_204511
আরো শীত বাক্সবন্দী কিছু ইচ্ছে আছে
  • নির্জন ঢাঙিকুসুমে সকালটা

সাত সকালে বেরুতে হবে। গন্তব্য – ঘাটশিলা, ভায়া কাকড়াঝোড়। ড্রাইভার চলে এসেছে, হন্তদন্ত করে বেরিয়ে পড়লাম। বেলপাহাড়ী স্পেশাল খেজুর রসকে অবহেলা করি এমন সাহস কার আছে? ড্রাইভারদা ভরসা, নিজে হাতে গড়িয়ে সে পানীয় গলাধঃকরণ করলাম। এবার যাবো ঢাঙিকুসুম। শুধু জানতাম একটা ঝর্ণা আছে, কি, কেমন সেসব জানতামই না। শহুরে জগৎ থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে এমন অখ্যাত একটা জায়গায় যে এতসুন্দর একটা ঝরণা আছে জানতামই না, মনে মনে ভাবছি বর্ষাকালে এর রূপ কেমন হতে পারে….! পাথুরে পথ দিয়ে যত এগোচ্ছি, বিস্তৃত বনরাশি ততই আলিঙ্গন জানিয়ে আরো গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেলাম, শ্যুটিং স্পট। বেশ কিছুক্ষণ চললো রোল-ক্যামেরা,আরে না না অ্যাকশনের জন্য পয়সা কই..! কিন্তু ঝরণা কোথায়..! দিকভ্রান্ত হইনি, হলে ভালো হতো। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি নীচের দিকে বয়ে যাচ্ছে জলরাশি….কুলুকুলু রবে তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে…..! এই তো সেই তাপগতিবিদ্যার চ্যাপ্টারে পড়া স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় এক্কেবারে বাস্তব – চাক্ষুষ উদাহরণ। আর ধরে কে…! হামাগুড়ি দিয়ে যেমন তেমন করে নীচে নামলাম….! আহহহহ কি দেখতে পুরো ঝরণাটা। গোটা ট্রিপে এমন জায়গা বোধ হয় আর কোনেটাকেই লাগেনি, লাগামছাড়া নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু আমরা কজন….! বসেই রইলাম কিছুক্ষণ। এবার আবার পাথুরে পথের নতিকে টেক্কা দিয়ে উঠে এলাম ওপরে…! যেতে হবে ঘাটশিলা। কাকড়াঝোড় পেরিয়ে ঘাটশিলা যাচ্ছি….! পথে পড়লো লাল শালুকের দীঘি, শাল-মহুল-কেন্দু গাছের সারি।

img_20181230_090904
টাটকা
img_20181230_104752
বয়ে চলে যায়
img_20181230_104118
ম্রিয়মান স্রোতস্বিনী
img_20181230_101324
এখন রাস্তা
img_20181230_085509
গুড় প্রস্তুতি
img_20181230_102506
ঢাঙিকুসুমে আমরা
  • ট্রাফিক জ্যামে ঘাটশিলা 

সে সব পরিয়ে পৌঁছালাম বুরুডি লেকে, বছর দেড়েক আগে এতো মানুষের ঢলানি তখনো শুরু হয়নি বুরুডির লেকে, এখন দোকান, হোটেল, লেকের জলে নৌবিহার, এসব তার বোরিং তকমা তুলে দিতে সাহায্য করলেও তার সৌন্দর্যের কিছু হ্রাস ঘটেছে, বইকি!!! ধারাগিরী যাওয়ার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। লাঞ্চ সেরে নিলাম বুরুডিতেই। ওখান  থেকে স্টেশন যাবার পথে পড়লো অপুর স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি – “গৌরীকুঞ্জ”, স্থানীয় একটি ক্লাবের সৌজন্যে যা এখন ঝাড়খণ্ডের দর্শনীয় স্থান। দেখে নিলাম অপুর পাঠশালা, ঝাড়খণ্ডে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলা স্কুলের থেকে কিছুটা অব্যহতি পেতে যেখানে এখনো আরণ্যক স্রষ্টার উত্তরপুরুষদের অর্থানুকূল্যে বাংলা শেখানো হয় বিনে পয়সায়।

বেরিয়ে এলাম, সুবর্ণরেখা ডাক দিলো। অগত্যা…কিছু অক্সিজেন নেওয়া গেলো। ট্রিপ শেষের মুখে, প্রহর গুনছে অপরাহ্ন, প্রহর গুনছি আমরাও…! যেতে হবে ঘাটশিলা স্টেশন, লক্ষ্য ইস্পাত এক্সপ্রেস, গাড়ির ড্রাইভার খুবই ক্লান্ত, তাই ট্রেন, আর ফিরতেও সুবিধে….! ঘাটশিলা স্টেশনে এসে ট্রেন পেতে একটা জায়গা পেলাম। ট্রেন তো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে……আমি চোখ বুজলাম। ফ্ল্যাশব্যাকে, ফেলে আসা দুটো দিন আর কয়েক শো ছবি….! পিছিয়ে যাচ্ছি আমি ক্রমশ৷

img_20181230_143051
অপুর পাঠশালা
img_20181230_143306
গৌরীকুঞ্জ
  • সিল্করুট বেলপাহাড়ী

এবার একটু রুট বলি। ঘুরতে যারা ভালোবাসেন, তারা বেলপাহাড়ীর জন্য একটা আলাদা দিন রাখুন। পুরোটা একদিনে ঘুরতে চাপ হয়ে যায়, তারপর তো আবার সেলফি তোলার হিড়িক রয়েইছেই। অতএব, এক রাত্রির কাটানোই ভালো, অন্তত যারা দূর থেকে আসবেন। বেলপাহাড়ী আসার এখন অনেক বাস, সরকারী বাসও প্রচুর। কলকাতা থেকে আসার জন্য ঘাটশিলা ট্রেন ধরে ঝাড়গ্রাম, তারপর বাসে বেলপাহাড়ী যাওয়াই যায়, তারজন্য সকাল সকাল আসতে হবে। থাকার জায়গার জন্য হোম স্টে পাবেন৷ হোম স্টের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন তারক কাকু মানে তারক দন্ডপাতকে৷ যোগাযোগ নম্বর- 9434453823…
বেলপাহাড়ী থেকে স্করপিও করতে হবে, ভাড়া নেবে ২৫০০ এর মতো। দূরত্ব নেহাত কম নয়,গুগল ম্যাপে ক্রশচেক করে নিতে পারেন। এটুকু বলতে পারি মাতালদের নৃত্যভূমি দীঘার চেয়ে কয়েকশো গুন ভালো। যাই হোক্ একটু দর কষাকষি করলে কমে যেতেও পারে, মোটামুটি পাঁচ-সাতজন গেলে খরচটা কম পড়বে৷ ঐ আর কি, মাথার সাথে খরচের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। অবশ্য মোট খরচতো ধ্রুবকই৷

আমরা ঘোরার মাঝে শ্যুটিং এ মেতে

img_20181214_163525
ফিরতে হবে
img_20181230_161658
বাই বাই বেলপাহাড়ী

 

যাই হোক্, এতো না ভেবে বেরিয়ে যেতেই পারেন, ‘চলো গাড়ী বেলপাহাড়ী’ শৈশবের সেই লাইনটা না হয় এবার ভ্রমণের শিরোনামে ঠাঁই পাক্….!

 

©শুভঙ্কর দত্ত || January 4, 2019

‘হীরক রাজার দেশ’ পেরিয়ে তেলকুপিতে তিনমূর্তি

 

PANO_20181220_114704

হীরক রাজার দেশে যাবো…. বড়োই বসনা ছিলো বহুদিন ধরে। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে দেখেছি, লোকজনের করা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে দেখেছি। যতবার দেখি ততবার ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে৷

মাঝরাতে প্ল্যান হলো। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে ভোর ভোর মুখে মাজন নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম — উদ্দেশ্য – হীরক রাজার দেশ…. থুড়ি হীরক রাজার দেশ এর সেই শ্যুটিং স্থল। সেই কবে ছোটোবেলায় সিনেমা হলে দেখেছিলাম রাজসেপাই থেকে লুকিয়ে থাকা উদয়ণ পণ্ডিতকে…সেই ‘দড়ি ধরে মারো টান..’ — জয়চণ্ডী পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে সেলুলয়েডের দৃশ্যগুলো যেন সামনে এসে ধরা দিলো। যাই হোক্, এগোনো যাক্, আসলে আনন্দে আত্মহারা হলে যা হয় আর কি!

KGP-ASN প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চাপার পর যখন ঢুলুঢুলু চোখে আদ্রা পোঁছালাম, হেব্বি খিদে পেয়ে গেলো। আদ্রা স্টেশনের বিখ্যাত বেকারীর আইটেম কটা সাঁটিয়ে দিলাম। ট্রেন ছাড়লো, পরের স্টেশন — ডেস্টিনেশন রিচড, ততক্ষণে ঘড়ি বলছে ১০ টা ২০।
জয়চণ্ডী পাহাড় কি যাবো, স্টেশন চত্বরটা এতো মনোরম, আমাদের মতো ফটোগ্রাফি প্রেমী লোকজন সে স্টেশন ছেড়ে গেলে তো! এদিকে নিজেদের ফটোগ্রাফি নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অটো হাতছাড়া হলো, অতঃপর রিসার্ভ করতে হবে। দুচ্ছাই! যাই হোক্, জয়চণ্ডী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম অটো করে।

 ছবির মতোই সুন্দর জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন

সামনে জয়চণ্ডী পাহাড় — সেই সত্যজিৎ রায়, সেই…… চোখে স্থির। দেরী না করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে শুরু করলাম৷ বেশ চড়াই পথ বেয়ে উপরে উঠছি, একটা রোগগ্রস্থ, জীর্ণ ওয়াচ টাওয়ারকে ডানহাতি ফেলে একটু এগিয়ে যেতেই দেখি মা চণ্ডীর মন্দির। দেবীর নাম অনুসারেই হয়তো পাহাড়ের এমনতর নাম৷ পাশেই বজরংবলী মন্দির। পাহাড়ের একদম ওপরে এসে পুরো পাহারতলী চোখে ভাসছে, বিলম্ব না করে খচাৎ খচাৎ রব তুললো আমাদের তিনমূর্তির ক্যামেরা। মন খুশি করা ফটোগ্রাফি করে কিছুক্ষণ ধরে জয়চণ্ডীর রূপ দর্শন করে নীচে নামলাম, ততক্ষণে আমাদের অটেওয়ালার ফোন চলে এসেছে। এরপর যাবো – তেলকুপি, আগেভাগে বলা ছিলোই, রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে দামোদর তীরে ইতিহাসের শেষ প্রহরীকে দেখার ইচ্ছেটা ফেসবুকের দৌলতে। মাঝে দুপুরের আহারটা সেরে নেওয়া গেলো, রঘুনাথপুরেই। খাওয়া সেরে অটো আবার অটোতে গিয়ে বসলাম।
আহহহ কি রূপ৷ পুরো রাস্তা জুড়ে দূষণমুক্ত ঠাণ্ডা বাতাসে ‘খেতে পেলে শুতে চাই’ এর সমার্থক কিছু একটা অটোতেই হয়ে গেলো। চেলিয়ামার আগে ডানহাতি রাস্তা নিতেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। দূরে সাঁওতালডিহি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রাশি রাশি ধোঁয়ার পাক চোখে পড়লো, দু পসারী কাজু আর খেজুর গাছের মধ্য দিয়ে মখমলের মতো রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গাড়ি পড়লো গিয়ে এবড়ো খেবড়ো একটা রাস্তায়। অঙ্গভঙ্গি করতে করতে অটো এগিয়ে চলছে, তেলকুপির পথনির্দেশক সাইনবোর্ড পেরিয়ে যে রাস্তা পেলাম, তাতে শুধু আমরা পড়তেই বাকি রইলাম। অপকেন্দ্র বলের বদান্যতায় ব্যাগের থেকে বোতল ছিটকে পড়লো রাস্তায়, হু্শ হলো কিছু পরে। তারও পরে বেশ কিছুটা আসতে তেলকুপি ঘাটে এসে দেখি আদিগন্ত জলরাশি– দামোদর ছাড়া আর কি! ফিঙে গুলোর আমন্ত্রণে দূর থেকে দেখতে পাওয়া দেউলটার দিকে এগিয়ে চললাম….হলদে সবুজ সরষে ক্ষেতের মধ্য দিয়েই। সামনে এসে থ!! এবার জুতো মোজা খুলে, জিনসকে থ্রি-কোয়ার্টার করে জলভেঙে যেতে হলো এ পারে….জরাজীর্ণ দেউল, ইতিহাসের শেষ প্রহরী– রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া দামোদরের প্রান্তে বুক চিতিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে….অটোওয়ালার কাছ থেকে জানা গেলো আর একটা মাঝনদীতে,কিন্তু এখন আর নৌকা চলছে না, অতঃএব এতক্ষণ এর উদ্দীপনার সলিল সমাধী হলো। দেউলের সামনে বসে বেশ কিছুক্ষণ শান্ত স্নিগ্ধ দামোদরের রূপ উপভোগ করলাম। একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স যাকে বলে। বসে বসেই তেলকুপি নিয়ে গুগলবাবাজীর স্মরণাপন্ন হতে জানা গেলো বেশ কিছু তথ্য…..!

IMG_20181220_120246_HDR
পাকদণ্ডী পথের স্যাটেলাইট চিত্র 😛
IMG_20181220_114356_HDR
রুটি রুজির সন্ধানে
IMG_20181220_114841_HDR
পাতা ঝরার মরশুমে
IMG_20181220_123627_HDR
প্রবেশদ্বার
IMG_20181220_113946_HDR
টিলা আর কিলা
PANO_20181220_114628
শীতঘুম ওদের
IMG_20181220_115420_HDR
বিশ্বাস
IMG_20181220_113609_HDR
ওয়াচ টাওয়ার
IMG_20181220_113452_HDR
ফাঁক ফোঁকর
IMG_20181220_114045_HDR
জয় বজরংবলী
IMG_20181220_112256_HDR
ইয়ে দুনিয়া বড়ি গোল গোল গোল
IMG_20181220_114058_HDR
জয় মা চণ্ডী
IMG_20181220_123856_HDR
সত্যজিৎ রায় আজও বেঁচে
IMG_20181220_114250
পাহাড়ীয়া
IMG_20181220_122447
শেষের শুরু, ৪৯২ টা সিঁড়ি
IMG_20181220_115517_HDR
নৈসর্গিক

রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখন লোক গবেষকদের চর্চার বিষয়। তাঁদের মতে, তৈলকম্প লোকমূখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে তেলকুপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সাথে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দরেই জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দির নগরী।

১৮৭৮ সালে জিডি বেগলারের ‘রিপোর্ট অফ আ ট্যুর থ্রু বেঙ্গল প্রভিন্সেস’ রচনাতে এই তেলকুপির মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য মেলে। যেখানে বেগলার তেলকুপিতে মোট ২২টি মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আবার দেবলা মিত্রের ‘তেলকুপি- আ সাবমার্জড টেম্পল সাইট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বইয়েতে তেলকুপির মন্দির নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। তা থেকে জানা যায়, একদা তেলকুপিতে ২৫-২৬টি মন্দির বা দেউল ছিল। ফলে তেলকুপির অতীতের স্বণর্র্যুগ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

কিন্তু ব্যথা দেয় বর্তমান। কারণ দামোদরের উপরে পাঞ্চেত জলাধার তৈরির পরে এই মন্দিরগুলির বেশিরভাগই চলে যায় নদের গর্ভে। কোনও ভাবে মাথা উঁচিয়ে রয়ে গিয়েছে তিনটি দেউল। তার মধ্যে দু’টিকে বছরের প্রায় সব সময়েই দেখা গেলেও একটি শুধুমাত্র গরমকালে দামোদরের জল কমলে দেখা যায়। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে জলাধার তৈরি হলে হয়তো তেলকুপির ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আক্ষেপ আরও রয়েছে, টিকে যাওয়া ওই তিনটি মন্দির ও মূর্তিগুলিরও রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই।

লোক গবেষকদের একাংশের মতে, তেলকুপি নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় তৈলকম্প থেকেই তেলকুপি নামটি এসেছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, সংস্কৃতে তৈল মানে তেল। আবার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তৈল মানে এক ধরনের কর এবং কম্প কথাটি এসেছে মূলত কম্পন অর্থাৎ পরগনা। এ থেকে তাঁদের অনুমান, তৈলকম্প বা অধুনা তেলকুপি ছিল কর প্রদানকারী বা করদ রাজ্য। তেলকুপি নিয়ে প্রাচীন ইতিহাসে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে তৈলকম্পের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কবি লিখেছেন যুদ্ধে যার প্রভাব নদী, পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে, বিস্তীর্ণ পর্বত কন্দরের রাজবর্গের যিনি দর্প দহনকারী, দাবানলের মতো সেই তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর। আবার রামচরিতম কাব্যর উল্লেখিত রুদ্রশিখর যে তৈলকম্পের রাজা ছিলেন, তা জানা যায় জয়পুরের দেওলঘাটার বোড়ামে একটি শিলালিপি থেকে। সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্যে উল্লেখিত রুদ্রশিখর এই তৈলকম্পের রাজা ছিলেন। ততকালীন সময়ে বাংলায় পালযুগে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল.এবং ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিল জৈন ব্যবসায়ীরাই। যাঁরা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি তামাজুড়ি ও তামাখুন থেকে তামা এনে তৈলকম্প বন্দর থেকে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন।

 

IMG_20181220_144252
‘দেউল’ এর জলছবি
IMG_20181220_143732_HDR
শেষ প্রহরী আর সঙ্গে আমরা
IMG_20181220_142541_HDR
তেলকুপি -নিরালায়
IMG_20181220_141735
অবহেলা – তেলকুপির সর্দার
IMG_20181220_143412_HDR
ভগ্নাংশ
IMG_20181220_141517
শেষ প্রহরীর প্রহরীরা
IMG_20181220_141722_HDR
অস্তমিত সূর্যালোকের উদ্ভাসিত ইতিহাস

 

যাই হোক্, এতকিছু জানার পর ঘাবড়ে গেলাম, যে সত্যিই কোথায় চলে এসেছি। শহুরে আলো থেকে শত যোজন দূরেও দেউলটা এখনো ইতিহাসের স্বাক্ষর বয়ে চলেছে, রৌদ্র-ঝড়-দুর্যোগ মাথায় নিয়ো আরামসে ইতিহাসের শেষ প্রহরীর মতো স্থানুবৎ দণ্ডায়মান…..! যেন বলে যাচ্ছে — “এ শহর বা হিম গহ্বর কে আছো কোথায়?” বা “আয় রে ছুটে আয় রে তোরা…!”
যাই হোক্, আরো ছিলো নিদর্শন, পাশের কটা গ্রামের মানুষের দৌলতে, সে আর হলো না দেখা। অটো করে আবার ফিরে যেতে হবে, মনটা একটু খারাপ হলো৷ প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ…ঘুম আর ঢুলের সংমিশ্রণে কখন জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন চলে এসেছি খেয়ালই নেই। পাক্কা দুঘন্টা সময় হাতে, মুড়ি-ঘুগনি দিয়ে উদরপূর্তি করা গেলো।
অবশ্য তার আগে অস্তমিত সূর্যের আভায় দূরের জয়চণ্ডী পাহাড়টাকে বারে বারে…….!
হীরক রাজ্য জয়……! এবার?????

IMG_20181220_100312
ব্রেকফাস্টের ছবি শেষে দিলেও ক্ষতি নেই

 

 

 

IMG_20181220_120854
তিনমূর্তি

 

তবে এ যাত্রার পেছনে আর এক কাহিনী লুক্কায়িত, সে না হয় কোন এক অবসরে হবে। আপাতত…..

————————————————————-

তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা

ঋণ – গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || December 23, 2018