‘পদ্মশ্রী’ হলেন শ’চারেকের মা

আশীষ
শতায়ুর ছোঁয়া

প্রথা ভেঙেছেন বলে খবরে?
না না, তা কেন হবে? আমার মতো লোক যারা চিনতো না, জানতো না, তাদের কাছে হয়তো নতুন এই খবরের দৌলতে….কিন্তু না…..!

পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণের সময় আমাদের দেশের প্রেসিডেন্টের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেছেন “ভ্রুক্সা মাথে”….! প্রথা ভেঙেছেন ১০৫ বছর বয়সী  বৃদ্ধাটি…! ভাগ্য ভালো বলতে হবে সম্মানীয় রাষ্ট্রপতির, সে কথা স্বীকার করেও নিয়েছেন তিনি…! আবেগঘন মুহুর্তটিকে তুলে রাখার জন্য ফেসবুক পেজেই পোস্ট করেছেন আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ মহাশয়।

সালুমারাদা থিমাক্কা….. Saalumarada Thimmakka…. ইংরেজি থেকে বাংলা করতে হয়তো ভুল হতে পারে….যারা চেনেন না, তাদের চিনিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।

বয়স ১০৫ হবে, নিজেই বলেছেন তার কোনো বার্থ সাটিফিকেট নেই। সালটা ১৯২৮, বিয়ে হলো তার, বয়স কুড়ি হবে তখন। এরপরের কুড়িটা বছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও সন্তান প্রসবে অক্ষম হলেন। ততদিনে “বন্ধ্যা” শব্দটা শুনে হাঁপিয়ে উঠেছেন, একদিন সহ্য করতে না পেরে জলে ঝাঁপ দিলেন, শেষ করে ফেলবেন এ জীবন। কিন্তু সহায় হলো একটা গাছ, বেঁচে গেলেন সে যাত্রায়।
সেই বছরই তার জীবনসঙ্গী, তার স্বামী বিক্কালুচিক্কায়াকে নিয়ে নেমে পড়লেন এক নতুন জীবনের খোঁজে, ব্রতী হলেন এক নতুন কর্মে। সন্তানহীনা হওয়ার শোক ভুলতে ঠিক করলেন গাছ লাগাবেন রাস্তার ধারে, লাগালেন বট গাছ। সন্তানের মা হতে পারেন নি তো কি? মা হয়ে গেলেন প্রায় চারশো খানা গাছেদের, মা না হওয়ার শোক ভুলে গেলেন লোকজনের মুখে শোনা ‘ভ্রুক্সা মাথে’ ডাকে যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘গাছেদের মা’ ……. ‘Mother Of Trees’…
কন্নড় শব্দ Saalumarada মানে হলো গাছেদের সারি, সেই শব্দই বসে গেছে তার নামের বদলে।

বেঙ্গালুরু শহর থেকে অনতিদূরেই হুলিকাল নামে গ্রামে এই কর্মকাণ্ড তার, যার শুরু সেই ১৯৪৮ এ, আজও চলছে। দীর্ঘ ৬৫ বছর ধরে একইভাবে গাছ লাগিয়ে যান মহান এই মানবীটি।

১৯৫৮ তে গ্রামের দুই মুখ্যে প্রথম তাদের লক্ষ্য করেন গাছে জল দিতে, পরে স্থানীয় এক মেলায় ডেকে তাদের রুপোর পদক দিয়ে সম্মান জানানো হয়। তখন সেই গ্রাম থেকে কাছের বাজারে যেতে কর্দমাক্ত পথ পেরোতে হতো। দূর দূরান্তের কুয়া থেকে জল এনে চারাগাছে দিতেন, ১০-১৫ টি করে নতুন নতুন চারাগাছ লাগিয়ে এসেছেন ফি বছর।

১৯৯১ সালটা খুব কঠিন হয়ে গেলো তার জন্য। স্বামী মারা গেলেন। হাস্যকর হলেও শুনলে খারাপ লাগার কথা তার স্বামী নিজের লাগানো গাছ কাটার অপরাধে হাজতবাস করেন, তারপর থেকেই শরীর ভেঙে যায় তার, বয়স্কা মহিলাটিকে রেখে চলে যান ইহলোকে। আত্মীয় সজনরা তাদের জমিজমা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য জবরদখল করলেন, অসহায় বৃদ্ধা বেচে দিলেন কিছু, কম টাকার বিনিময়ে…..! বন্যা হলো, যে বাড়ি ছিলো, সেটাও গেলো নিশ্চিহ্ন হয়ে। কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাহায্য পেয়ে তিনি বিধবা ভাতার জন্য দরখাস্ত করলেন, পেয়েও গেলে ৭৫ টাকা করে, মাসকাবারি বন্দোবস্তো হলো একটা।

থামলেন না, জন্ম দেওয়া চললো নতুন গাছের।
এরপর এলো একটা দিন, সালটা ১৯৯৪….

এক কংগ্রেস নেতা যাচ্ছিলেন ঐ রাস্তা দিয়ে, অপরাহ্নের ক্লান্ত রবিকিরণেও তখন তিনি ঘায়েল, হঠাৎ মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা বাতাস লাগলো গাড়ির ভেতরে এসে…..! গাড়ি থামালেন….!  বয়স্কা মহিলাকে এককালীন ৫০০০ টাকা দিলেন, তক্ষুণি। স্থানীয় এক সভায় সেই নেতা উল্লেখ করলেন সে কথা, সালু তখন স্বপ্নে ভাসছেন। নিরক্ষর হলে কি হবে, তখন গুচ্ছেক শুভেচ্ছা বার্তা আর মিডিয়ার রিপোর্ট প্রকাশিত হলো সেই নিয়ে।
রাজ্যসভার এক সদস্য সচ্চিদানন্দস্বামী তৎকালীন প্রধান বিচারপতি পি.এন.ভাগবতী র কাছে আর্জি করলেন, সালটা ১৯৯৬…. প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়ার থেকে National Citizen’s Award এ ভূষিত হলেন Mother Of Trees….!

(দিল্লীতে সেই সম্মান পেলেন বটে, তবে তাকে যখন বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়, তখন ঐ পুরস্কারের সাথে মানপত্রটি এলেও অর্থটা আসেনি, পরে সেসব কথা তিনি জানিয়েছেন তার বায়োগ্রাফিতে…! বায়োগ্রাফার কে বলেছিলেন সব সত্যি কথা  লিখতে হবে, ফিল্মি হলে চলবে না৷ )

এরপর আর অপেক্ষা করতে হয়নি, বসে থাকতে হয়নি তাকে। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। একজন ছেলেকে দত্তক নেন, শিক্ষিত সেই ছেলের একটি নার্সারি আছে….!
কর্ণাটক সরকার ২০১৪-১৫ সালের দিকে তার নামে একটি প্রকল্প শুরু করে যার উদ্দেশ্য রাস্তার পাশে গাছ লাগানো, Saalumarada Thimmakke Shade Plan….

২০১৬ তে বিবিসি তাকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী এবং অনুপ্রেরণাদায়ী মহিলার দলে তালিকাভুক্ত করেছে।

আমেরিকার একটি সংস্থা তার নামে পরিবেশশিক্ষাটি নামাঙ্কিত করেছে, যা মূলত ওকল্যাণ্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলসে রয়েছে।

পেয়েছেন আরো সম্মান, অজস্র সম্মান….! রাষ্ট্রপতি ভবনে যখন তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দিলেন , কে বলবে ১০৫ বছর বয়সী বয়স্কাটি এখনো তার বুড়ো হাতগুলো দিয়ে পরিচর্যা করেন। ঐ হাসি দেখে কে বলবে তিনি সন্তানহীনা।

কে বলবে তার খাদ্যতালিকায় আছে বিখ্যাত দক্ষিণী মিষ্টি রাগি মুদ্দে….! নিজে আবার বলছেন – এই বয়সেও সময়সুযোগে ফিস্ট হলে তিনি চিকেন বা মাটন খান।

রাষ্ট্রপতি ভবনে পুরস্কার নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি মহাশয়ের মাথায় তার হাতটা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন….. গোটা হল হাততালিতে ফেটে পড়লো…. ‘পদ্মশ্রী’ হলেন শ’চারেকের মা…….!

51 (1)
পদ্মশ্রী হাতে
Mother of trees
INFLUENTIAL & INSPIRING

আমার এক বন্ধুর কথায় ভারতরত্ন বড়ো রাজনৈতিক বাকবিতন্ডাময়, তার চেয়ে “পদ্মশ্রী” ই ভালো….!

আজও তার আক্ষেপ….
শিক্ষিত সমাজ, শহুরে মানুষরা কেন গাছ কেটে দেয়…..!!! ফল দেয়, ফুল দেয়, ছায়া দেয় তবু কেন? কোথায় সেরকম গাছ? এসবই তার আক্ষেপ…!
আসলে সবাই তো আর যন্ত্রণ ঢাকার জন্য জীবন সংগ্রামে লিপ্ত নয়, তাই না?

Mother Of Trees
সন্তানদের মাঝে

——————————————————————

(তথ্য – গুগলে এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে।

ফিচার ফটোর সৌজন্যে – বন্ধুবরেষু সৌমেন দাস….! একবার জানতেও চায়নি কি দরকার ছবিটা।)

© শুভঙ্কর দত্ত || March 17, 2019

‘হীরক রাজার দেশ’ পেরিয়ে তেলকুপিতে তিনমূর্তি

 

PANO_20181220_114704

হীরক রাজার দেশে যাবো…. বড়োই বসনা ছিলো বহুদিন ধরে। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে দেখেছি, লোকজনের করা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে দেখেছি। যতবার দেখি ততবার ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে৷

মাঝরাতে প্ল্যান হলো। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে ভোর ভোর মুখে মাজন নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম — উদ্দেশ্য – হীরক রাজার দেশ…. থুড়ি হীরক রাজার দেশ এর সেই শ্যুটিং স্থল। সেই কবে ছোটোবেলায় সিনেমা হলে দেখেছিলাম রাজসেপাই থেকে লুকিয়ে থাকা উদয়ণ পণ্ডিতকে…সেই ‘দড়ি ধরে মারো টান..’ — জয়চণ্ডী পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে সেলুলয়েডের দৃশ্যগুলো যেন সামনে এসে ধরা দিলো। যাই হোক্, এগোনো যাক্, আসলে আনন্দে আত্মহারা হলে যা হয় আর কি!

KGP-ASN প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চাপার পর যখন ঢুলুঢুলু চোখে আদ্রা পোঁছালাম, হেব্বি খিদে পেয়ে গেলো। আদ্রা স্টেশনের বিখ্যাত বেকারীর আইটেম কটা সাঁটিয়ে দিলাম। ট্রেন ছাড়লো, পরের স্টেশন — ডেস্টিনেশন রিচড, ততক্ষণে ঘড়ি বলছে ১০ টা ২০।
জয়চণ্ডী পাহাড় কি যাবো, স্টেশন চত্বরটা এতো মনোরম, আমাদের মতো ফটোগ্রাফি প্রেমী লোকজন সে স্টেশন ছেড়ে গেলে তো! এদিকে নিজেদের ফটোগ্রাফি নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অটো হাতছাড়া হলো, অতঃপর রিসার্ভ করতে হবে। দুচ্ছাই! যাই হোক্, জয়চণ্ডী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম অটো করে।

 ছবির মতোই সুন্দর জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন

সামনে জয়চণ্ডী পাহাড় — সেই সত্যজিৎ রায়, সেই…… চোখে স্থির। দেরী না করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে শুরু করলাম৷ বেশ চড়াই পথ বেয়ে উপরে উঠছি, একটা রোগগ্রস্থ, জীর্ণ ওয়াচ টাওয়ারকে ডানহাতি ফেলে একটু এগিয়ে যেতেই দেখি মা চণ্ডীর মন্দির। দেবীর নাম অনুসারেই হয়তো পাহাড়ের এমনতর নাম৷ পাশেই বজরংবলী মন্দির। পাহাড়ের একদম ওপরে এসে পুরো পাহারতলী চোখে ভাসছে, বিলম্ব না করে খচাৎ খচাৎ রব তুললো আমাদের তিনমূর্তির ক্যামেরা। মন খুশি করা ফটোগ্রাফি করে কিছুক্ষণ ধরে জয়চণ্ডীর রূপ দর্শন করে নীচে নামলাম, ততক্ষণে আমাদের অটেওয়ালার ফোন চলে এসেছে। এরপর যাবো – তেলকুপি, আগেভাগে বলা ছিলোই, রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে দামোদর তীরে ইতিহাসের শেষ প্রহরীকে দেখার ইচ্ছেটা ফেসবুকের দৌলতে। মাঝে দুপুরের আহারটা সেরে নেওয়া গেলো, রঘুনাথপুরেই। খাওয়া সেরে অটো আবার অটোতে গিয়ে বসলাম।
আহহহ কি রূপ৷ পুরো রাস্তা জুড়ে দূষণমুক্ত ঠাণ্ডা বাতাসে ‘খেতে পেলে শুতে চাই’ এর সমার্থক কিছু একটা অটোতেই হয়ে গেলো। চেলিয়ামার আগে ডানহাতি রাস্তা নিতেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। দূরে সাঁওতালডিহি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রাশি রাশি ধোঁয়ার পাক চোখে পড়লো, দু পসারী কাজু আর খেজুর গাছের মধ্য দিয়ে মখমলের মতো রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গাড়ি পড়লো গিয়ে এবড়ো খেবড়ো একটা রাস্তায়। অঙ্গভঙ্গি করতে করতে অটো এগিয়ে চলছে, তেলকুপির পথনির্দেশক সাইনবোর্ড পেরিয়ে যে রাস্তা পেলাম, তাতে শুধু আমরা পড়তেই বাকি রইলাম। অপকেন্দ্র বলের বদান্যতায় ব্যাগের থেকে বোতল ছিটকে পড়লো রাস্তায়, হু্শ হলো কিছু পরে। তারও পরে বেশ কিছুটা আসতে তেলকুপি ঘাটে এসে দেখি আদিগন্ত জলরাশি– দামোদর ছাড়া আর কি! ফিঙে গুলোর আমন্ত্রণে দূর থেকে দেখতে পাওয়া দেউলটার দিকে এগিয়ে চললাম….হলদে সবুজ সরষে ক্ষেতের মধ্য দিয়েই। সামনে এসে থ!! এবার জুতো মোজা খুলে, জিনসকে থ্রি-কোয়ার্টার করে জলভেঙে যেতে হলো এ পারে….জরাজীর্ণ দেউল, ইতিহাসের শেষ প্রহরী– রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া দামোদরের প্রান্তে বুক চিতিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে….অটোওয়ালার কাছ থেকে জানা গেলো আর একটা মাঝনদীতে,কিন্তু এখন আর নৌকা চলছে না, অতঃএব এতক্ষণ এর উদ্দীপনার সলিল সমাধী হলো। দেউলের সামনে বসে বেশ কিছুক্ষণ শান্ত স্নিগ্ধ দামোদরের রূপ উপভোগ করলাম। একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স যাকে বলে। বসে বসেই তেলকুপি নিয়ে গুগলবাবাজীর স্মরণাপন্ন হতে জানা গেলো বেশ কিছু তথ্য…..!

IMG_20181220_120246_HDR
পাকদণ্ডী পথের স্যাটেলাইট চিত্র 😛
IMG_20181220_114356_HDR
রুটি রুজির সন্ধানে
IMG_20181220_114841_HDR
পাতা ঝরার মরশুমে
IMG_20181220_123627_HDR
প্রবেশদ্বার
IMG_20181220_113946_HDR
টিলা আর কিলা
PANO_20181220_114628
শীতঘুম ওদের
IMG_20181220_115420_HDR
বিশ্বাস
IMG_20181220_113609_HDR
ওয়াচ টাওয়ার
IMG_20181220_113452_HDR
ফাঁক ফোঁকর
IMG_20181220_114045_HDR
জয় বজরংবলী
IMG_20181220_112256_HDR
ইয়ে দুনিয়া বড়ি গোল গোল গোল
IMG_20181220_114058_HDR
জয় মা চণ্ডী
IMG_20181220_123856_HDR
সত্যজিৎ রায় আজও বেঁচে
IMG_20181220_114250
পাহাড়ীয়া
IMG_20181220_122447
শেষের শুরু, ৪৯২ টা সিঁড়ি
IMG_20181220_115517_HDR
নৈসর্গিক

রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখন লোক গবেষকদের চর্চার বিষয়। তাঁদের মতে, তৈলকম্প লোকমূখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে তেলকুপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সাথে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দরেই জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দির নগরী।

১৮৭৮ সালে জিডি বেগলারের ‘রিপোর্ট অফ আ ট্যুর থ্রু বেঙ্গল প্রভিন্সেস’ রচনাতে এই তেলকুপির মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য মেলে। যেখানে বেগলার তেলকুপিতে মোট ২২টি মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আবার দেবলা মিত্রের ‘তেলকুপি- আ সাবমার্জড টেম্পল সাইট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বইয়েতে তেলকুপির মন্দির নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। তা থেকে জানা যায়, একদা তেলকুপিতে ২৫-২৬টি মন্দির বা দেউল ছিল। ফলে তেলকুপির অতীতের স্বণর্র্যুগ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

কিন্তু ব্যথা দেয় বর্তমান। কারণ দামোদরের উপরে পাঞ্চেত জলাধার তৈরির পরে এই মন্দিরগুলির বেশিরভাগই চলে যায় নদের গর্ভে। কোনও ভাবে মাথা উঁচিয়ে রয়ে গিয়েছে তিনটি দেউল। তার মধ্যে দু’টিকে বছরের প্রায় সব সময়েই দেখা গেলেও একটি শুধুমাত্র গরমকালে দামোদরের জল কমলে দেখা যায়। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে জলাধার তৈরি হলে হয়তো তেলকুপির ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আক্ষেপ আরও রয়েছে, টিকে যাওয়া ওই তিনটি মন্দির ও মূর্তিগুলিরও রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই।

লোক গবেষকদের একাংশের মতে, তেলকুপি নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় তৈলকম্প থেকেই তেলকুপি নামটি এসেছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, সংস্কৃতে তৈল মানে তেল। আবার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তৈল মানে এক ধরনের কর এবং কম্প কথাটি এসেছে মূলত কম্পন অর্থাৎ পরগনা। এ থেকে তাঁদের অনুমান, তৈলকম্প বা অধুনা তেলকুপি ছিল কর প্রদানকারী বা করদ রাজ্য। তেলকুপি নিয়ে প্রাচীন ইতিহাসে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে তৈলকম্পের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কবি লিখেছেন যুদ্ধে যার প্রভাব নদী, পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে, বিস্তীর্ণ পর্বত কন্দরের রাজবর্গের যিনি দর্প দহনকারী, দাবানলের মতো সেই তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর। আবার রামচরিতম কাব্যর উল্লেখিত রুদ্রশিখর যে তৈলকম্পের রাজা ছিলেন, তা জানা যায় জয়পুরের দেওলঘাটার বোড়ামে একটি শিলালিপি থেকে। সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্যে উল্লেখিত রুদ্রশিখর এই তৈলকম্পের রাজা ছিলেন। ততকালীন সময়ে বাংলায় পালযুগে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল.এবং ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিল জৈন ব্যবসায়ীরাই। যাঁরা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি তামাজুড়ি ও তামাখুন থেকে তামা এনে তৈলকম্প বন্দর থেকে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন।

 

IMG_20181220_144252
‘দেউল’ এর জলছবি
IMG_20181220_143732_HDR
শেষ প্রহরী আর সঙ্গে আমরা
IMG_20181220_142541_HDR
তেলকুপি -নিরালায়
IMG_20181220_141735
অবহেলা – তেলকুপির সর্দার
IMG_20181220_143412_HDR
ভগ্নাংশ
IMG_20181220_141517
শেষ প্রহরীর প্রহরীরা
IMG_20181220_141722_HDR
অস্তমিত সূর্যালোকের উদ্ভাসিত ইতিহাস

 

যাই হোক্, এতকিছু জানার পর ঘাবড়ে গেলাম, যে সত্যিই কোথায় চলে এসেছি। শহুরে আলো থেকে শত যোজন দূরেও দেউলটা এখনো ইতিহাসের স্বাক্ষর বয়ে চলেছে, রৌদ্র-ঝড়-দুর্যোগ মাথায় নিয়ো আরামসে ইতিহাসের শেষ প্রহরীর মতো স্থানুবৎ দণ্ডায়মান…..! যেন বলে যাচ্ছে — “এ শহর বা হিম গহ্বর কে আছো কোথায়?” বা “আয় রে ছুটে আয় রে তোরা…!”
যাই হোক্, আরো ছিলো নিদর্শন, পাশের কটা গ্রামের মানুষের দৌলতে, সে আর হলো না দেখা। অটো করে আবার ফিরে যেতে হবে, মনটা একটু খারাপ হলো৷ প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ…ঘুম আর ঢুলের সংমিশ্রণে কখন জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন চলে এসেছি খেয়ালই নেই। পাক্কা দুঘন্টা সময় হাতে, মুড়ি-ঘুগনি দিয়ে উদরপূর্তি করা গেলো।
অবশ্য তার আগে অস্তমিত সূর্যের আভায় দূরের জয়চণ্ডী পাহাড়টাকে বারে বারে…….!
হীরক রাজ্য জয়……! এবার?????

IMG_20181220_100312
ব্রেকফাস্টের ছবি শেষে দিলেও ক্ষতি নেই

 

 

 

IMG_20181220_120854
তিনমূর্তি

 

তবে এ যাত্রার পেছনে আর এক কাহিনী লুক্কায়িত, সে না হয় কোন এক অবসরে হবে। আপাতত…..

————————————————————-

তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা

ঋণ – গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || December 23, 2018 

টুম্বাড – দ্য আননোন মিথ অব হস্তর

…. শো যাও নেহিতো ‘হস্তর’ আ জায়েগা…

যেমনটা চাইছিলাম ঠিক তেমনটাই।
বলিউডে এরকম সিনেমা কবে হয়েছে?
পৌরাণিক – ভৌতিক  সিনেমা। শেষ কবে হয়েছে? জানি না৷ এক কথায় দেখিনি বললেই চলে। পরিচালকের নাম শুনবো কি করে, সে তো অভিষেক করছে এই সিনেমা দিয়ে।
তিনজন ডিরেক্টর। তার মধ্যে একজন অবশ্য জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমার দৌলতে চেনা।
যাই হোক্, সিনেমায় আসা যাক৷
তিন টে চ্যাপ্টারে সিনেমাটা বলা হয়েছে। মহারাষ্ট্র এর পুণের টুম্বাড নামে কোনো অখ্যাত গ্রামের একটা পরিবার এর তিনটে জেনরেশনের গল্প এটা।

কোনো এক কালে এক দেবী ছিলেন। সমৃদ্ধির দেবী- সোনা আর আনাজের পরিপূর্ণ ছিলো। ১৬ কোটি দেবদেবী তার গর্ভ থেকে জন্ম নিলো কিন্তু তার সবচেয়ে ভালোবাসার ছিলো তার প্রথম সন্তান – হস্তর। হস্তর সব সোনা পেয়েছিলো কিন্তু আনাজপাতি নিতে যাওয়ার সময় বাকি সমস্ত দেবদেবীর ক্রোধে পড়লো। দেবী মা ওকে বাঁচালেন বাকিদের রোষানল থেকে, এই শর্তে যে ‘হস্তর’ কে সবাই ভুলে যাবে এবং এই ধরাধামে কোত্থাও সে আর পূজ্যিত হবে না। এই শর্তে মা তার আদরের সন্তানটিকে গর্ভে লুকিয়ে রাখলেন। সবাই ভুলে গেলো ‘হস্তর’ কে।
কিন্তু টুম্বাড এর লোকজন তার মূর্তি গড়লো,মন্দুর গড়লো কোন এক সময়৷ তারপর সেখানে দেবতাদের রাগ বৃষ্টি হয়ে ঝরতে থাকলো। অখ্যাত ঐ গ্রামের পরিবার কিন্তু হস্তরের অভিশাপ আশীর্বাদ এর মতো করে নিলো, কারণ তারা হস্তরের উদরপূর্তির জন্য সচেষ্ট ছিলো। তাদের পূর্বপুরুষরা হস্তরের থেকে সোনা পাওয়ার জন্য প্রাণপাত করতে দস্তুর ছিলেন। — এ গল্প ভিনায়ক রাও তার ছেলে পান্ডুরাং কে শোনাচ্ছে, দেবীর গর্ভে গেলে তবেই সবটা বোঝা সম্ভব৷

ভিনায়ক রাও পনেরো বছর পর ছেড়ে আসা টুম্বাডে আবার যাবে গুপ্তধনের খোঁজে। সেই ম্যানসনে। আবার সেই বুড়ি ঠাকুমা কে খুঁজে পাবে, যে গুপ্তধনের খোঁজে গিয়ে দানবের মতো হয়ে গেছে হস্তরের হস্তক্ষেপে। সেই বুড়ি সবটা বলে দেবে, কি করে হস্তরের থেকে সোনা কাড়ানো যায়। কি তার কৌশল। পুরো পরিমিতির নিপুণ কৌশলে আয়ত্ত করতে হবে গুপ্তখাজানা।  সিনেমার গল্প এতোটাই মৌলিক লাগলো যে, চিত্রনাট্য এতোটাই টানটান যে পুরো গল্প বলে দিলেও এমন কিছু লাভ নেই। সিনেমার সেট ডিজাইন না দেখলে পুরাই লস।

যাই হোক্ দিন আনি দিন খাই ভিনায়ক রাও মোটামুটি সোনা কাড়ানোতে অস্তাদ হয়ে উঠেছে। বেশ পয়সাও হয়েছে। এবার উত্তরপুরুষের পালা।
পাণ্ডুরাং ও রোজ রোজ বাড়িতে রিহার্সাল দেয়, একদিন বাবার সাথে গিয়ে একটু অভিজ্ঞতাও অর্জন করলো বটে। এদিকে দেশ স্বাধীন হলো। পুরনো ঝরঝরে ম্যানসন ভেঙে গ্রাম সাজানোর কথা শুনতেই একসাথে অনেক সোনা আদায়ে সচেষ্ট হলেন ভিনায়ক রাও, লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু? আজ্ঞে  না, মৃত্যু নয়, পিষাচ। হওয়ারই ছিলো। ছেলে বেঁচে ফিরে এলো।

এই হলো গল্প। এখনো মাঝে মাঝে অনেক বাকি। ১৯১৮ -১৯৪৭ এই তিন দশক ধরে টুম্বাডের এক ম্যানসনে ঘটে চলা পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে এই সিনেমার গল্প। পরতে পরতে লোমহর্ষক দৃশ্য, ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিকের অসাধারণ মিশেল সিনেমাটাকে বলিউডে বন্দী করে রাখলো না। মাঝে মাঝে তো মনে হচ্ছিলো কোনো নামজাদা হলিউডি পরিচালকের ফিলিম দেখছি।
এ সিনেমা আন্তর্জাতিক খ্যাতিও কুড়িয়েছে অবশ্য।
এক কথায় অসাধারণ।

ভিনায়কের চরিত্রে অভিনয় করা সোহুম সাহ কে আগে একবার কোথাও একটা দেখেছি কিনা মনে করতে পারছিও না। একবারের জন্যও বোরিং লাগেনি। শুধু পস্তাচ্ছি, কত টাকা খরচ করে তো ভাঁটের কত সিনেমায় দেখতে যায়, কিন্তু যেগুলো হলে গিয়ে দেখার জন্যই বানানো সেগুলো কেন দেখতে যাই না?

বাবুলাল উত্তর দিলো
“কনশাস এবং উপকারী রিভিউ আর কে দেবে?সবকটায় তো বিক্রিত..!”

© শুভঙ্কর দত্ত, মেদিনীপুর ||December 22, 2018 

প্রতিবিম্ব

‘আলো আমার আলো ওগো…..”
রবীন্দ্রসংগীত খুব পছন্দ করে বিতনু। গানটা ভেসে আসছে কানে, সদ্য উন্মীলিত চোখে এসে পড়লো সকালের রোদ্দুর, স্পষ্ট হলো আরো কিছু..! এতক্ষণ কানেই শুনছিলো সব, এবার দেখলো সব – ওর মা, ওর বোনকে। আরো একজনকে দেখার পর বিতনু বুঝলো গানের আওয়াজের উৎস কি! ওর প্রিয় স্যার নধর বাবু মানে নধর গুপ্ত… তারই মোবাইলে চলছে এই গান। স্যার ওর হাত ধরে বললো কিছু কথা, তারপরেই ও বুঝলো এটা হরিরামপুর ব্লক হাসপাতালেরই ওয়ার্ড রুম….যার একটা বেডে আপাতত ও শয্যাশায়ী।

বিতনু হরিরামপুর বনফুল হাইস্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্র…! বুদ্ধি সুদ্ধির কথা পরেই হবে, বেশ ভালো ফুটবল খেলে ছেলেটি, শুধু খেলে না, বেশ জয়ের একটা গন্ধ নিয়ে মাঠে নামে। তো সেদিনও ক্লাস এইট বনাম সেভেনের ম্যাচ চলছে….! ঘন বর্ষায় কর্দমাক্ত মাঠটায় ফুটবল স্কিল তো দূরস্থ, খেলাটা যে কতটা রিস্কের সেটা আর না বললেও হয়, তবে মজাটায় আলাদা। এ হেন বর্ষায় ফুটবল না হলে যে ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’ মিথে কুঠারাঘাত করা হবে। মাঠে বাঁশি মুখে দায়িত্ব পালন করছিলেন ইতিহাসের স্যার, অসীম বাবু মানে অসীম সরকার, যিনি আবার ছেলেপুলেদের কাছে ইনফিনিটি গভর্ণমেন্ট নামে বিখ্যাত, নেহাত ভালো ইংরেজী জানা ছাত্রছাত্রী রয়েছে , নইলে যে কি নাম জুটতো, কে জানে।

যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা রেফারিরা সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে হলুদ আর লাল কার্ড পকেটস্থ করে আসেন, অসীম বাবু হাতে লাঠি নিয়ে নামেন (মুখে বাঁশি তো রইলই) জঘন্য ফাউলের জন্য একটি প্রহার আর ফুটবল ভুলে কেউ হাতবল খেললে তিন ঘা। সেদিন খেলা হচ্ছিলো ক্লাস সেভেন বনাম ক্লাস এইট এর। ক্লাস এইটের হয়ে তেকাঠির নীচে একহাতে গ্লাভস পরেই দুটো অনবদ্য সেভ করে বনফুল স্কুলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিশা দেখিয়েছিলো, কানু, সতীর্থরা কান (অলিভার কান এর অপভ্রংশ) বলতে অবশ্যি কার্পণ্য করে না। তবে কানুর করা সেভ দুখানি বেশ কাজে লাগে, পূর্বনির্ধারিত তিরিশ মিনিটের প্রথমার্ধে সেভেন বিতনুর করা গোলে এগিয়ে যায়, গোল পরিশোধ করে দেয় এইট প্রথমার্ধের একদম শেষে। যদিও সে গোল নিয়ে দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়, স্কুলের উল্টোদিকের কালুর দোকান থেকে ডিমভাজার গন্ধ নাকি অসীমবাবুর নাসিকারন্ধ্রে প্রবেশ করায় ওনার বাঁশি বাজাতে লেট হয়ে যায়। ওদিকে লাইসম্যান এর দায়িত্বে থাকা ইলেভেনের পাঁচু সরখেলের নাকি ছুটতে গিয়ে কাদা ছিটকে তার নিজের চোখে ঢুকে যায়, এমতাবস্থায় ঝোপ বুঝে কোপ মারতে এক সেকেণ্ডও লেট করেনি এইটের দীর্ঘদেহী রবিন, না না এ সে হুডওয়ালা রবিন নয়। ক্লাস সেভেনের গোলকিপার অ্যান্টনি সরেনের আবেদন মাঠেই মারা যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বিতনুর সতীর্থ ফরোয়ার্ড সম্রাটকে আটকাতে গিয়ে পেনাল্টি পেয়ে বসে ক্লাস সেভেন। পেনাল্টি কিকটা কার নেওয়ার কথা ছিলো সম্রাটেরই, কিন্তু দলগত সিদ্ধান্তে স্কোরার বিতনুর ওপর সেই দায়িত্ব ন্যস্ত করে সেভেনের কোচ সেভেনের ডাকাবুকো ছাত্র আবদুল্লা! সেই পেনাল্টিতে অবশ্য স্কোরবোর্ডের আহামরি কিছু পরিবর্তন হয়নি। তখনও খেলা প্রায় মিনিট পাঁচেক বাকি, ফ্রি কিক পাই সেভেন, ১-১ স্কোর বোর্ডের খানেক তর্জমার জন্য গোলপোস্ট থেকে অনতিদূর থেকে ফ্রি-কিকের জন্য সম্রাটই সেরা, গোলপোস্টে এইটের চাইনিজ ওয়ালের কাছে ঘোরাঘুরি করছে বিতনু ও তার ছ-সাত সতীর্থ, তার মধ্যে হেডে গোল দেওয়ায় ওস্তাদ বাহাদুর ওরফে ফড়িং (লাফাতে পারায় এসব নাম) ছুটে এসে পেনিট্রেট করবে। এ হেন পরিস্থিতিতে অসীম বাবু আদ্যিকালের ঘড়িটা একপ্রস্থ দেখে নিয়ে বাঁশিতে ফুঁ দেওয়া মাত্র শট এলো, আর সঙ্গে সঙ্গে চাইনিজ ওয়ালের সামনে থাকা বিতনু লুটিয়ে পড়লো। কানের পাশ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে সবুজ ঘাসের রঙ গেলো পাল্টে, রক্ত লাগলো মাথায়, কানমুথোটাই বলটা লেগেছে ওর। কানু তার কানগোড়াটাই ‘বিতনু’, ‘বিতনু’ বলে অনেকবার চিৎকার করলো…..! জীবন বিজ্ঞানের দিদিমণি কাকলি ম্যাম ওকে বড্ড ভালোবাসে, অনেক বার ডাকেও যখন উঠলো না ও, উনি কেঁদেই ফেললেন, নির্দ্বিধায় ওর মাথাটা তুলে নিলেন নিজের কোলে। ক্রন্দনরোল অবশ্য খুব বেশি ছড়ানোর পূর্বেই হেড স্যার স্কুলেরই এক প্রাক্তন ছাত্রের মারুতি দেখতে পেয়ে, কাকলি ম্যামসহ দু’জন ছাত্র আর অসীমবাবুকে পাঠিয়ে দেন ওদের সাথে। একটা গোলপোস্ট ধরে সম্রাট চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলো, শেষ কালে সেও কেঁদে ফেললো। আর পুরো ঘটনাটা নধর গুপ্ত উপরে চেয়ারে বসে বসে প্রত্যক্ষ করলেন, নট নড়ন চড়ন এতোসব কাণ্ড কারখানাতেও। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলো। আজকের মতো স্কুল ছুটি। সবাই বাড়ি চলে গেলো।

হেড স্যার হন্তদন্ত হয়ে উপরে উঠে এলেন,
— ‘নধর, তুমি যাওনি কেন নীচে? একবার দেখলে না, সে কি কাণ্ড!’
রসায়নের শিক্ষক নধর গুপ্ত আসলে হেড স্যারেরই ক্লাসমেট, বাড়ির কাছে স্কুলেই পেয়েছিলেন চাকরিটা, কিন্তু প্রিয় বন্ধুর সাথে সেই গ্রাজুয়েশন থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে যখন একসাথে সামিল হয়েছেন, তাই তার বন্ধুর স্কুলেই চাকরি নেন, তখনও হেড স্যার হননি ইংরেজীর অনাময় আধিকারী। হয়েছেন তার পরে, অনেকই পরে।
নধর বাবু বললেন— ‘কে বললো আমি দেখিনি? আমি দেখেছি, এক্কেবারে ড্রোণ ক্যামেরার মতো করে দেখেছি…!’

হেড স্যার অবাক চোখে, ‘মানে?’

— ‘মানে অনেক কিছুই, আবার কিছুই নয়।’

অসীম বাবু ফিরে এলেন ঘন্টাখানেক পর, তাকে মোবাইলে অনেকবার চেষ্টা করেছেন হেড স্যার, কিন্তু বারবার একই উত্তর, অসীম বাবুকে দেখে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন অনাময় বাবু, তার বাড়ির লোককে ফোন করে জানানোর সময় যে কি যন্ত্রণা হচ্ছিলো, তা বোধ হয় তিনিই জানেন। বারবার বুকের বাম দিকটা ডানহাতে করে চাপড়ে চাপড়ে “আল ইজ ওয়েল”, “আল ইজ ওয়েল” বলছিলেন।
অসীম বাবু বলে চললেন –
“খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম স্যার, রক্ত তো জমে গিয়েছিল, ব্রেন হ্যামারেজটা হয়নি, প্রাথমিক চিকিৎসার পর ওটি তে নিয়ে গেলো। ডাক্তার বাদল ব্রহ্মচারী তো বললেন ভয়ের কিছু নেই। কানের ভেস্টিবিউলে নাকি আঘাত লেগেছে, শুনতে পাচ্ছে না কিছুই ওরা চেষ্টা চালাচ্ছেন, জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত…..!”
বলতে বলতে ছুটে গিয়ে স্টাফ রুমের অ্যাকোয়াগার্ডের থেকে পৌনে এক গ্লাস জল চটজলদি গিলে নিলেন….! হাঁপাতে থাকলেন। তখন প্রায় সূর্যাস্তের পালা। নধর বাবুকে অনাময় স্যার কি বললেন শোনা গেলো না, কতগুলো তালচটক পাখি এ তাল গাছ থেকে ও তাল গাছে উড়ে গেলো, সদলবলে তৎক্ষণাৎ গুলমোহরের ফুলবিহীন ডাল গুলো থেকে এক ঝাঁক তিতির উড়ে গেলো পূবদিকের শিরিষ গাছটার দিকে, দুই বন্ধুর কথোপকথন মিলিয়ে গেলো গোধূলির রঙে।

সারা রাত চললো উৎকণ্ঠা। হেড স্যার আর নধর বাবু দুজনেই ছিলেন ওয়ার্ডরুমে, বিতনুর মা আর বোনের সাথে, ওর বোনও তো ঐ স্কুলেরই ছাত্রী, সে অবশ্য সেই ঘটনা সচক্ষে দেখেনি, হা ডু ডু খেলায় ব্যস্ত ছিলো। দাদা সাড়া দিচ্ছে না জেনে সেও সেই যে চুপ হয়েছে, আর রা বেরোইনি বেচারার। নধর বাবু, তার বন্ধুবরেষু অনাময় স্যারকে ভিতরে গিয়ে দেখা করতে বললেন। নধর বাবু তার মা আর বোনকে আশ্বস্ত করতে থাকলেন…, দাদাকে হারানোর ব্যথা তার চেয়ে আর কে জানবে ভালো করে! দুই বন্ধু মিলে দেখা সাক্ষাৎ পর্ব মিটিয়ে কালুর চা দোকানে এসে এক কাপ চা খেয়ে রওনা দেবেন বাড়িতে, এমন সময় হেড স্যার নধর বাবুর হাতদুখানা ধরে বলতে লাগলেন —
‘বাঁচিয়ে দে ভাইটি আমার?’

— ‘আরে আমি কি করবো?’

– ‘কি করে হলো বলতো, এসব?’

–‘ওহহ, এই কথা! দেখছি, কিন্তু বিতনুর কি হবে, হেড স্যার?’ হাসতে হাসতে বললেন তিনি।

– ‘আল ইজ ওয়েল!’

দুজন পথে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে বলতে আসছিলেন, অনাময় বললেন–

‘বিতনু আর সম্রাট ক্লাসের ফার্স্ট আর সেকেণ্ড বয়, ফুটবলেও তেমনি দুরন্ত, কিন্তু ওদের তো শত্রুতা নেই, যতদূর জানি, ওরা নাকি দারুণ বন্ধু, আর এরজন্যই ওদের টিমকে হারানোও চাপের, এতো ভালো বোঝাপড়া যে আমার রোনাল্ডো-রোনাল্ডিনহোর কথা মনে পড়ে যায়।’

— ‘আচ্ছা অনাময়, তুই খেলাটা পুরোটা দেখেছিলি?’

– ‘নাহ!’

— ‘ঠিক আছে। চাপ নিস না। বিতনু সুস্থ হয়ে যাবে, আশা করি…! তবে……’

– ‘তবে, কি?’

— ‘কিছু না, গুডনাইট!’

ক্লান্ত – অবসন্ন দুটো শরীর তিন মাথার মোড় থেকে দুটো বিপরীতমুখী বর্ষাকালীন রাস্তা ধরে এগোতে থাকলো বাড়ির দিকে।

পরদিন স্কুলের প্রথমার্ধের শুরুতে স্কুলে খবর এলো জ্ঞান ফিরেছে বিতনুর, তবে সব কিছু সচক্ষে দেখে মালুম করতে পারছে, কেউ কিছু বললে তাতে বেমালুম রেসপন্স করছে কিন্তু দুঃখের কথা একটাই যে ও নিজে কথা বলতে পারছে না। রাজ্য বিজ্ঞান মঞ্চ থেকে পুরস্কৃত বিতনুর অদম্য জেদ তার সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার। প্রবল মানসিক শক্তির অধিকারী দ্বাদশবর্ষীয় এই ছেলেটি কথা বলার জন্য কি চেষ্টা চালাচ্ছে, সেটা তো নধরবাবু সকাল সকাল মর্ণিং ওয়াক করতে গিয়ে একপ্রস্ত দেখে এলেন। তার উপস্থিতিতেই ছোড়া সম্বিত ফিরে পেয়েছে, তার থেকে কিছু জানবার চেষ্টা করছিলেন নধর বাবু কিন্তু পারলেন না।

সকালে স্কুলে এসেই তিনি ঐ দুই দলের ছেলেদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেন সেদিনের ঘটনা নিয়ে, কেউ কিছুই বুঝতে পারে নি। নধর বাবু নিথর হয়ে রইলেন। এতোদিন ধরে পড়াচ্ছেন তিনি, তাদেরকে আগাপাশতলা চেনেন তিনি। ফিরে গেলেন হেড স্যারের রুমে।

খানেক পরে কেরাণী হুদমদা এসে ডাকদিলো জনা সাতেককে – অ্যান্টনি, কানু, ফড়িং, রবিন, আবদুল্লা, এইটের কোচ পরমেশ্বর, আর সম্রাটকে…! ওদের লাইব্রেরী রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সুসজ্জিত বইয়ের তাকের একদিকে একটা ফাঁকা চওড়া জায়গাতে, দরজার উল্টোদিকের দেওয়ালে একটা আয়না ঠেসানো, বৃহৎ আকার, শোনা যায় ইংরেজ আমলে তৈরী এই স্কুলে তখনকার দিনে ভুল অ্যাড্রেসে এখানে এসে পৌঁছায় বেলজিয়ান কাঁচের তৈরী এই বৃহৎ আকার আয়নাটি। পরে ডাকবিভাগে বলে কোনো কাজ হয়নি, তখন থেকেই এটি লাইব্রেরীতে কুক্ষিগত। নধর বাবুর হস্তক্ষেপে কিছুদিন আগে এটিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়, হেরিটেজের তকমা পেলে যে কত কিছু পাল্টাই।

নধর বাবু ওদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন –

‘তোমরা আয়নার সামনে গিয়ে এক মিনিট এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকবে..!’
পোলাপানেরা তো যারপরনাই আনন্দিত।
সেই আয়নার সামনে দাঁড়ালে বারো বছরের ছেলেপুলের হাঁটু পর্যন্ত আরামসে দেখা যায়। রুমে শুধু কেরাণী হুদোম, হেড স্যার আর নধর গুপ্ত।

প্রথমে অ্যান্টনি এলো… এক মিনিট হতে চলে গেলো।
ফড়িং এসে এক মিনিট বলতে না বলতেই লাফিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে, বইয়ের গন্ধে তার নাকি অ্যালার্জি।
কানু এসে চুপ করে রইলো।
রবিন চুপ না থাকতে পারে তেরেনাম কাটিং এর চুলটা একবার জার্মান চিরুনি মানে আঙুল দিয়ে কেরামতি মেরে নিলো।

পরমেশ্বর চুপ করে দাঁড়িয়ে, এক মিনিট হয়েছে বলতে হস্তপদে পা গুনতি করে চলে গেলো।
আবদুল্লা কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করলো।

সম্রাট এসে প্রথমে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চাইলো, তারপর মুখ নামিয়ে নিলো, এতক্ষণ ঐ বৃহৎ আয়নার সামনে যারা এসেছে তাদের কারো বেলায় নধর বাবু এসে ঐ আয়নার ত্রিসীমানায় প্রবেশ করেননি, আড়ালে ছিলেন। এবার পুরো সম্রাটের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কড়া গলায় লাইব্রেরী রুমে আন্দোলিত হলো – ‘লুক অ্যাট দ্য মিরর, সম্রাট!’
অতঃপর সম্রাট ফেনিয়ে ফেনিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। বলে চললো–
“সেদিন ও পেনাল্টি নিতে যাওয়ার আগে আমি কত করে বললাম তুই তো একটা গোল করলি, স্কিলফুল গোল, কিন্তু আমায় পেনাল্টিটা কনভার্ট করতে দে না। ও শুনলো না, আমায় নিতে দিলো না, নিজেও মিস করলো। বিজ্ঞান মঞ্চের জেলার পরীক্ষাটাই ওকে আমি দুটো প্রশ্ন জিগ্যেস করেছিলাম, ও আমায় বললো না শুধু আগেরবার আমি ওর থেকে একনম্বর বেশি পেয়ে প্রাইজ পেয়েছিলাম বলে….অথচ টিফিন আনলে একবারও ওকে না দিয়ে খাই না আমি, খেলার মাঠে কার্পণ্য না করে পাশ বাড়িয়ে দিই। ও এতো কেন হিংসে করে আমায়??? তাই আমি রেগে গিয়েছিলাম, তাই আমি……ওকে ইচ্ছে করে মেরেছি স্যার…আমায় শাস্তি দিন!’

এই বলতে বলতে সে বেলজিয়ান কাঁচটার দিকে এগিয়ে গেল, কিছু করে বসে দুঃখের মুডে, এই দেখে হুদোমদা টেনে নিয়ে গেলো। হুদোমদা খুব ভালোবাসে ওকে, বললো – “আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি তুই কত ভালো বন্ধু বিতনুর, যা হাসপাতালে গিয়ে একবার কোলাকুলি করে আয়….”

হেড স্যার অনাময় বাবু তো হতবাক, বাকি ছেলেগুলোর তো মুখ শুকিয়ে গেছে…! নধর বাবু, তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে হাসলেন, সম্রাটের কাঁধ চাপড়ে বললেন —

“আসলে কি জানিস সম্রাট, আমরা কেমন এটা জানার জন্যে মাঝে সাঝে আমাদের মতোই কাউকে দরকার হয়, আমি কি করেছি, সেটা জরিপ করার জন্যও তাই দরকার,….., আমার মতোই, একই অবয়বের একইরকম একটা কায়া লাগে, বুঝলি?”

 

© শুভঙ্কর দত্ত || মেদিনীপুর, December 22, 2018

অপরাধী : অভিনয়?

ব্রাজিল হেরে গেলো?
বিশ্বাস করতে হচ্ছে, তার কারণ একটা লোক……!

তবে একটা জিনিস অদ্ভূত লাগছে খুব, যে ব্রাজিল কে নিয়ে গলা ফাটায় আমরা, মানে বাঙালিরা, ব্রাজিল সমর্থকরা, তাদের কেউ কিন্তু খুব দুঃখিত নয়। তার কারণ,
এক, হতে পারে, বেলজিয়াম যোগ্য দল হিসেবে জিতেছে, প্রথম ম্যাচ থেকে কর্তৃত্বের সাথেই জিতেছে।
দুই, ব্রাজিল দারুণ চেষ্টা করেছে, লজ্জাজনক ভাবে হারেনি। মুহুর্মুহু আক্রমণ করেছে, নিজেদের ছন্দে খেলেছে।

 

কিন্তু কোন বন্ধুই দেখলাম না ব্রাজিলের খেলা নিয়ে কিছু বললো।

আমার আবার আট বছর আগেকার দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, কোয়ার্টার ফাইনালে সেবার নিজেদের প্রথাগত হলুদ জার্সি ছেড়ে নীল রং এর জার্সিতে ব্রাজিল খেলেছিলো ডার্ক কিউট, স্নেইডার, স্টেঙ্কেলবার্গ, রবেন, ভ্যান পার্সির হল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে। সে বার ব্রাজিলে কে ছিলো না? রোবিনহো, কাকা, ডানি আলভেজ, লুই ফাবিয়ানো……! যাই নামই বলি, এইখানে গিয়েই আটকে যেতে হবে। কারণ এবার ব্রাজিল দলে নামডাকে বড়ো এরকম অনেক প্লেয়ারও আছে, ১১ জনের দলে সুযোগ না পেয়েও ডাকসাইটে প্লেয়ার বলা যায়। মনে পড়ছে সেবারও একটা ফ্রি কিক ব্রাজিলের গেলকিপার জুলিয়াস সিজার এবং একজনের ভুলে প্রায় আত্মঘাতী গোল হয়েছিলো, তবে স্নেইডারের কৃতিত্ব কম ছিলো না ফ্রি কিক নেওয়াতে। ১-০ তে এগিয়ে ছিলো ব্রাজিল, ঐ গোলে সমতা এলো। পরের একটা গোলও স্নেইডারের, কর্ণার কিকে হেডার। কাকা অনেক চেষ্টা করেছিলো, রোবিনহোও….! কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। যাক্, ২০১৮ তে আসি………

এই ব্রাজিল দলটাতে প্লেয়ারের অভাব নেই। ভালো স্কিলফুল প্লেয়ার। কুতিনহো, জেসুস, ফিরমিনহো, নেইমার, মার্সেলো, কাসিমেরো, পাওলিনহো, লুইস, সিলভা — সবাই ক্লাব ফুটবল এবং দেশের খেলাতেও নজর কেড়েছে। তবে জেসুসকে কাল কেন এতোক্ষণ ধরে খেলানো হলো বুঝিনি। যাই হোক্ বিতর্ক বাদ।
বেলজিয়ামের খেলা আহামরি কিছু লাগেনি। ম্যাচ সামারিই বলে দেবে বেলজিয়াম শুধু জিতেছে, কর্তৃত্বটা রাখতে পারেনি, ব্রাজিল আর জেতার মধ্যে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়ালো টিনটিনের দেশের গোলরক্ষক কুর্তোয়া। ব্রাজিলের খেলা দেখে খারাপ লাগেনি, চেষ্টা চালিয়ে গেছে। বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের ভিতরে গিয়ে ছোটো ছোটো টোকাতে পাস খেলে গোল দেওয়াটা ব্রাজিলের স্বভাবসিদ্ধ। বেলজিয়াম কোচ এটা ধরে ফেলেছিলেন, ব্রাজিল আক্রমণে এলেই ছেলেদের লেলিয়ে দিলেন ঐ জায়গাটাতে, রেড ডেভিলদের পায়ের জঙ্গলে বল বারবার প্রতিহত হতে থাকলো, সাথে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনাও। নেইমার-কুতিনহোরা বারবার চেষ্টা করে গেলেন কিন্তু হায়…..!
দূর থেকে দু একটা শট নেওয়া হলো। এবার রক্ষণের শেষ প্রহরীর মতো আগলে দাঁড়ালেন থিবো কুর্তোয়া….! একের পর এক অসামান্য সেভ করতে থাকলেন একা হাতে। ২০০৬-২০১৪ যে যে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের গোলরক্ষকগুলোকে দেখলেই বোঝা যায়, কেন তারা জিতেছে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন টিমের গোলরক্ষক সেরকমই হবেন, বকলমে বিখ্যাত হবেন না, কখনই, কাজ করে দেখিয়ে দেবেন। বুঁফো-কাসিয়াস-ন্যয়ার এর পর সম্ভবত কুর্তোয়া সেই সম্ভ্রমের জায়গাটায় চলে গেলেন। সম্ভবত কেন, অবশ্যই গেলেন। নেইমারের হালকা টাচটা যেভাবে প্রতিহত করলেন নিজেকে একটা উচ্চতায় ছুঁড়ে দিয়ে, সেটা দেখে নেইমার নিজেই কিঞ্চিৎ হাসলেন। গোল এলো অগাষ্টোর হেড থেকে। তবে ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে গেলো। বেলজিয়াম প্রথম থেকে অদ্ভূত রণনীতি নিয়ে খেলছিলো, যখন অ্যাটাক করতে যাচ্ছে দশ জন চলে যাচ্ছে, যখন ডিফেণ্ড করছে তখনও দশ জনে। ব্রাজিলের সাম্বা ম্যাজিকটাকে ম্রীয়মাণ করে দিলো তারা প্রথমার্ধেই, যেখানে সেলেকাওরা এক গোল পরিশোধ করার জন্য আঘাত পাওয়া বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে, বেলজিয়াম দ্বিতীয় গোল পাওয়ার পর পুরে মাইণ্ড গেম খেলে চললো। দশ জন ডাকাবুকো লোক মিলে ডিফেণ্ড করলে গোল করা বোধ মারাদোনাও পারতেন না….! বেলজিয়াম দলটাই একমাত্র ইদেন হ্যাজার্ড ব্যতীত সবাই লম্বায় যেমন, চওড়াতেও তেমন, লুকাকুর কথা তো না বলাই ভালো, কেন জানিনা ফুটবলের “ড্যারেন স্যামি” লাগে। ঐ রকম চরকি লাচন করে পাশ দেওয়া, সেই পাশ থেকে দে ব্রুইনের অসম্ভব সেন্টার, আর আলিসন পরাস্ত! এরম গোল দেখলে আর আক্ষেপ থাকে না। ব্রাজিলের সমর্থক হলেও ২০১৪ থেকে বেলজিয়ামকে খুব ফলো করি, খেলা দেখতেও ভালো লাগে, কেমন যেন ‘নতুন জার্মানি, নতুন জার্মানি’ গোছের খেলে। ২০১৪ তে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিলো, ডি মারিয়ার পাশ থেকে হিগুয়েনের গোল বেলজিয়াম এর শেষ চারে যাওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছিলো, ৮ মিনিটের করা গোল, বাকি ৮২ মিনিটেও শোধ করতে পারেনি, অথচ সেই দলেও এরাই ছিলেন, এখন যারা ব্রাজিলকে হারালো। বরাবর বলা হয় বেলজিয়াম নাকি ফুটবলের দক্ষিণ আফ্রিকা, সারা বছর ভালো খেলে বিশ্বকাপের সময় কাঠি বেঁকে যায়….! এবার সামনে সুযোগ অনেক….! কাপ জয় থেকে আর মাত্র দু ম্যাচ দূরে, গোটা বিশ্বের সমর্থন পাবে বেলজিয়াম, নতুন চ্যাম্পিয়ানদের স্বাগত জানাতে যদিও সেমিতে ফ্রান্সের সম্মুখীন হতে হবে। কুর্তোয়া যদি ইট সিমেন্টের প্রাচীর হন, লরিস তো আবার লোহার প্রাচীর…! সে যাই হোক্ এখনও অবধি ১৪ গোল, কর্তৃত্বের সাথে জেতা এবং জাপানের বিরুদ্ধে ২ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোল করে জয়লাভ, জার্মানি – আর্জেন্টিনা – স্পেন – ব্রাজিল এর আপাত সমর্থকদের তারা নিজেদের করে নিয়েছেন।

তবে একটা কথা বলতেই হয়, কাকা-রোনাল্ডো-রোনাল্ডিনহো-রোবিনহো, এদের খেলা দেখার পর নেইমারের খেলা দেখলে রীতিমতো আহত হতে হয়, ২০১০ এর রিপ্লেটাও দেখলাম, কাকাকে পেনাল্টি বক্সে ফাউল করা হলো, বিধিসম্মত, তবুও তিনি পেনাল্টির জন্য বিন্দুমাত্র আবেদন করেননি , রোনাল্ডো বা রোনাল্ডিনহোর যে সব খেলা দেখেছি, পড়ে গেলেন, উঠে আবার দৌড়, প্রতিপক্ষ ফেলে দিলো, ওনারা উঠে দৌড়তে লাগলেন, ব্রাজিলের খেলার এটা একটা গুণ ছিলো, ট্যাকেল এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু নেইমার যেটা করলেন,তাতে করে তাকে আদর্শ করা তো দূর কি বাৎ, কিছুকেমন বিজ্ঞাপণের বিষয়বস্তু হতে পারেন…..! হয়ে গেছেনও, ফেসবুক পেজ অ্যাডমিনদের পোয়া বারো তো এখন….! কাকার মতো সৎ প্লেয়ার বাদ দিলেও, নেইমার অনেক পিছিয়েই থাকবেন। এতো ছলনার আশ্রয় নিতে গিয়ে এতো সময় নষ্ট, মেনে নেওয়া যায় না। তবে একটা জিনিস কিছুতেই বুঝলাম না, রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখালেন না কেন? নিশ্চয় পেনাল্টি নয়, আবার নেইমারও ঠিক করেননি, তাহলে ছলনা করে রেফারিকে প্রতারিত করার মতো ঘৃণ্যতম অপরাধের সাজা স্বরূপ একটা বুকিং কি এমন আহামরি কঠিন কাজ…! আসলে ব্রাজিলের না জেতার কারণ, এটাও, নেইমারের অভিনয় এমন আঙ্গিকে পৌঁছে গেছে যে নিজের দলের সমর্থকরাই বিষ ঢালছে, অভিসম্পাতে জর্জরিত হলো গোটা দলটাই। তবুও কুর্নিশ পোলাডারে, চোট থেকে ফিরে নিজের খেলাটা দিয়েছে। এটুকুও কি মাথায় নেই যে ভিডিও অ্যাসিটেন্ট চালু আছে, ধরা পড়ার তৎক্ষণাৎ সম্ভাবনা আছে। তবে যা দিনকাল পড়েছে, এইভাবে খামোখা ভূপতিত হতে থাকলে সত্যিই একদিন সঙ্গত কারণে পড় গেলে রেফারি ঘুরেও তাকাবেন না, যেমন একটা সময় রবেন  এর সাথে হয়েছে, এখন সুয়ারেজের সসাথে হয়, সেরকমই…..পালে বাঘ পড়ার মতো। তবে কাকারা আট বছর আগে হেরে যাওয়ায় যেরকম দুঃখ হয়েছিলো,সেটা হচ্ছে না, কাকাকে ভালোবাসতাম, নেইমারের অভিনয় সেই ভালোবাসায় “অপরাধী” হয়ে দাঁড়িয়েছে….!

© শুভঙ্কর দত্ত || July 7, 2018

চর্যাপদের খোঁজে চৌথুপীতে

চৌথুপী সঙ্ঘারামে মরণভয় ছড়িয়ে পড়েছে।
….
…….
মহাস্থবির চীবরের কটিবন্ধে হাত দিলেন, গ্রন্থাগারের কুঁজিতালের চাবি এখনও গেঁজেতে ঝুলছে। তবে এ কীভাবে সম্ভব? মহাস্থবির ক্ষিপ্রপদে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলেন এবং থরথর করে কেঁপে উঠলেন। মহামূল্যবান পুঁথির কাষ্ঠ-সিন্দুকগুলো সব উধাও!

—————————————————————

“চৌথুপীর চর্যাপদ” এর কাহিনীর শুরু এমনিই এক আকস্মিক ঘটনা দিয়ে। প্রাককথনে উল্লেখিত সময়কাল ১২০৫ অব্দ।

সত্যি বলতে গোটা উপন্যাসটি পড়ার পর এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি….. প্রথম পাতাটা দেখতেই নিজের ওপর যারপরনাই রাগ হলো, যে কথাটা প্রথম পাতায় লেখা আছে, আমি বেমালুম ভুলে গেলাম কি করে? ছ’মাস পেরোয়নি আমি “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়েছি, তা সত্ত্বেও কি করে পুরোপুরিভাবে ভুলে গেলাম যে এটিও একটি উপন্যাস, পড়তে পড়তে কাহিনীর গহ্বরে চলে গেছি, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢুকেপড়েছি চৌথুপীর সঙ্ঘারামে, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো ভুলেই গেছি আমি এক সামান্য পাঠক, পড়তে পড়তেই কখনো এর রূপ, কখনো ওর রূপের ছাঁচে বসিয়ে ফেলেছি নিজেকেই। যদিও এসব নতুন নয়, পাঁচমুড়ো পড়তে পড়তেই এসব হয়েছিলো… সেই “আমি যদি এটা হতাম”, ‘আমি যদি ওটা হতাম।’ এরকম ভাব।

  • যাই হোক্, এ গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই। পাঁচমুড়োর সাথে কিঞ্চিৎ মিল থাকলেও এই উপন্যাস আসলে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারের আর একটি অমূল্য রত্ন। পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গলকে যথাস্থানে রেখেই বলছি “চৌথুপীর চর্যাপদ” একটি সম্পূর্ণ রূপে গবেষণামূলক কাহিনী,যার পরতে পরতে আছে অসংখ্য তথ্য, এই বিপুল তথ্যসাগরে ভাসতে ভাসতেই পাঠক কখন যে সমান্তরালে চলতে থাকা দুটো কাহিনীর অন্দরমহলের প্রতিটি চরিত্রের সাথে পরিচয় সেরে নেবে, তা অনুমেয় নয়।
  • একসাথে দু’খানা কাহিনীর বুনোট সমান্তরালে চালিয়ে উপন্যাস এর গল্প বলা আগেও হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিশেষত্বটি কি?
    — কি আর? আপনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বইটির শিরোনাম দেখে কতকিছু ভেবে বসে থাকবেন, উপসংহার পড়ার পর ঠাহর হবে যে, আদতে আপনার কল্পনার প্রায় ৯৯ শতাংশই ভুল, মানে লেখক মশায়ের পাঁচমুড়ো না পড়া হলে তো, এরকম ভাবতে একরকম বাধ্য, তবে সেটা পড়া হওয়ার দরুণও আমায় আবার ঠকতে হলো বলা চলে।
  • একসাথে দুটো কাহিনী চালিয়ে যাওয়াটা মুখের কথা নয়, তাও আবার একটা এই এখনকার সময় আর একটা প্রায় ১২০০ অব্দ, তালগোল পাকালেই গেলো।
  • একটি পুঁথিকে কেন্দ্র করে একদিকে হাফি হাবিলদার, মামাজী, বিমলা, লামা, ছেত্রী, অর্জুন এবং যোজনগন্ধার তীব্র অনুসন্ধান। এবার আবার ভাষা হলো সিদ্ধম…..! কি অণুসন্ধান?
    প্রায় আটশো বছর আগের গন্ধকালী, শ্রীধর আচার্য, খু-স্তোনদের আগলে রাখা পুঁথি এবং তুরস্কদের কাহিনী। —- এই দুটো কাহিনীর সমান্তরাল সজ্জাতেই এ উপন্যাস এগিয়ে চলে।
  • কেন পড়বো?
    তার আগে বলি, এই উপন্যাসকে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে ধরলে মহাভুল। লেখক আগে একটা সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্য লিখেছিলেন, এবার একটা চর্যাপদ লিখে ফেললেন। কি? গাঁজাখুরি মনে হচ্ছে? পড়তে পড়তে অবশ্য এসব ভুলেই যাবেন।
  • এ কাহিনীতে অ্যাডভেঞ্চার কম নেই, আবার অতিশয় সিরিয়াস ইস্যুর মাঝে হাস্যরসের উপাদান নেহাত কম নেই, গুলি-বোমা-বারুদের গন্ধে মাখা বাতাস আছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা জাতির অত্যাচার আছে। কি নেই? থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চারের যুগলবন্দী, তার ওপর মন মাতানো সব তথ্য, যা জানলে রীতিমতো অবাক হয়ে যেতে হয়। তবে সবগুলো এমনভাবে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়েছে যে পড়তো পড়তেই এক অদ্ভূত মায়াজালে জড়িয়ে যেতে হয়। এ কাহিনী কিছুক্ষণ পড়ার পর অবশ্য মনে হতে পারে, যেন সিনেমা দেখছি! অবশ্য তা হলেও মন্দ হয় না।

 

IMG_20180629_144150~2
সিদ্ধম্

 

লেখকের পরিচয় নতুন করে কি বলবো? আগেও বলেছি, কতটা নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা থাকলে এরকম উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে উপহার দেওয়া যায় তাও বিদেশ বিভূইয়ে থেকে, সেটা জানতে গেলে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” এবং “ছিরিছাঁদ” এর সঙ্গে সঙ্গে “চৌথুপীর চর্যাপদ” ও পড়তে হবে। কতটা অধ্যবসায় এবং গবেষণা করলে এমনতর রত্নসমান আকর গ্রন্থ পড়ার সুযোগ পাই, তার জন্য সমগ্র বইটি পড়ার পর গ্রন্থতালিকাটি তে চোখ রাখলেই কিছুটা অনুমান করা যায়।

হ্যাঁ, এবার বলা যাক্, পুরো বইটি পড়ার পর কি এমন প্রশ্নের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। সেটা হলো, গল্পের সূত্রপাত কিভাবে হলো, এবং মহাস্থবিরের অনুপস্থিতিতে গল্পের নায়ক-নায়িকা যখন মহামূল্যবান পুঁথিগুলি তুরস্কদের নাগালের বাইরে আনয়ন করলো, তারপর কি হলো? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর ধরেই গল্পের সূত্রপাত। উপন্যাসের শুভারম্ভ।

এবার বলা যাক বইটির আকার নিয়ে। অনেকেই হয়তো সাড়ে চারশো পাতার বই হাতে নিয়েই বিরক্তও বোধ করবেন। তাদের জন্য সত্যিই দুঃখিত, লেখক বোধ করি, পাবলিক ডিম্যাণ্ড ভেবে বইটি লেখেননি, তাহলে হয়তো তিনি দুটি খণ্ডে বইটি প্রকাশ করতেন। আসলে এই চর্যাপদ সম্পূর্ণরূপে গবেষণামূলক একটি উপন্যাস। তবে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ার পর এটি নিয়ে বসলে রীতিমতো বিরক্তি লাগতে পারে, আমারও লেগেছে, তবে ঐ যে আবার বলতে হয়, শেষে গিয়ে অদ্ভূত রকমের আনন্দ লাগবে। কিন্তু সে আনন্দ আরো বেশি হতে পারে যদি পাঁচমুড়ো পড়ার পূর্বে এটা পড়া যায়। বইটি পড়া শুরু করলে যদিও পৃষ্ঠাসংখ্যা নেহাত লেস প্রায়োর মনে হবে, এখানেই লেখকের বাজিমাৎ। চরিত্রের নামকরণ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি মনে রাখার মতো সব নাম, এই উপন্যাসের নায়িকাদ্বয়ের নাম তো আবার বলেই দিলো যে কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে, অবশ্য পরে তা বলেও দিয়েছেন, সেটা কি?? – তা জানার জন্য একবার চৌথুপীতে গিয়ে ঘুরে আসায় শ্রেয়…. তবে ক্লু হিসাবে বলা যায় ঐ কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে বহু সিনেমা হয়েছে।

এটি লেখকের তিন নম্বর উপন্যাস, পাঁচমুড়োর প্রায় বছর দুয়েক পর এই উপন্যাস প্রকাশিত। অর্থাৎ লেখক সাহস পাচ্ছেন হয়তো তার পাঠকের আকুণ্ঠ পিপাসা দেখে। তাই আমাদেরও উচিৎ লেখকের এই গবেষণা-সাধনাকে কুর্নিশ জানানো তা সম্ভব – অবশ্যই অধিক পরিমাণ পাঠকের কাছে এই অসামান্য কাজের আলোকবর্তিকা বহন করা।

★★ ★ তবে এই বই পড়বো কেন তা নিয়ে লেখক গল্পের নায়িকা যোজনগন্ধার ভাষ্যে বলেছেন
যোজনগন্ধা ভাবল তার ওই জ্বরের ঘোরের মধ্যে পড়া গুহ্যচর্য্যায় কি সত্যি সত্যি ওই কাহিনি লেখা ছিল? নাকি সবই তার কল্পনাপ্রসূত ভাবসম্প্রসারণ, জ্বরের ঘোরের মধ্যে মনে ভেসে আসা অতীন্দ্রিয় জলছবি? কে জানে কোনটা সত্যি? তবে এটা সত্যি যে গন্ধকালী, খু্ স্তোন, শান্তভদ্র, তোন-পা’দের মতো নাম না জানা শত শত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী আটশ বছর আগে প্রাণের মায়া ত্যাগ তুচ্ছ করে কত মূলাবন পুঁথি বাঙলা থেকে তিব্বতে নিয়ে গিয়ে তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। যোজনগন্ধা ভাবছিল বাঙালিরা কেউ কি উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে আসবে সেই অমূল্য গ্রন্থগুলিকে ধুলো ঢাকা শবাধার থেকে বের করে আনতে?”

অবশ্য লেখক যোজনগন্ধার জবানবন্দীতেই বলিয়ে নিলেন – ” আমি এই কাজের দায়িত্ব নিলাম।”

সত্যিই তো, এই একই বার্তা বারবার দিয়ে চলেছেন লেখক…. বাংলা ভাষাটাই তো হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ঐ মহার্ঘ পুঁথি বা বাংলা ভাষার ইতিহাসকে রক্ষা করতে হলে এক দুটে গন্ধকালী বা যোজনগন্ধা, খু স্তোন বা হাফি হাবিলদার কি পাবো না?

IMG_20180629_144115

 © শুভঙ্কর দত্ত || June 30, 2018 

 

আমি ভগবান নই: মেসি

দু এক কথা বলতে এইচি…! জানি ধৃষ্টতা  নেই।

মেসিকে নিয়ে খিল্লি করতে কখনোই চাই নি। বরং লোকটার খেলা দেখতে খুব ভালো লাগে। গোল দিলো কিনা তাও দেখি না, দেখি কি সুন্দর ড্রিবল করে শত্রুশিবিরে পেনিট্রেট করছে লোকটা…! সেই ২০১০ এর বিশ্বকাপ ফাইনাল থেকে মেসিকে মুখলুকিয়ে সাপোর্ট করি। রোনাল্ডোর ভক্ত বলে, মেসিকে গালাগাল দিই না, যতটুকু উৎপাটন করি পুরোটাই দোষ কিছু আবালভক্তবৃন্দের জন্য। রোনাল্ডো পেনাল্টি থেকে গোল করার পর যেভাবে তাকে চাঁঠা হচ্ছিলো, মেসির পেনাল্টি মিসের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম….! যাই হোক্ অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। আসলে যতই এদের টিম খারাপ খেলুক, এই দুইই মহাতারকার মধ্যে একটা আলাদা কম্পিটিশন চলেই…! আর মাঠের বাইরে চলে তাদের ফ্যানদের মধ্যে বাক্যবিনিময় বা গালিবর্ষণ।

যেটা বলছিলাম…..

কাল গৌতম ভট্টাচার্যের লেখা পড়ছিলাম, বিশ্বকাপ শুরু হতে নিয়মিতই পড়ছি…! আর্জেন্টিনা হারের জন্য আমি (যদিও আমি কোনো বিরাট লিখিয়ে নই বা ফুটবলবোদ্ধা নই) কোচ সাম্পাওলি এবং মেসিকে সমান ভাবে দায়ী করবো! একটা টিমের একজনকে এতো বড়ো করে দেখা কেন হবে? কেন কোচ একটা প্লেয়ারের কথায় দল নির্বাচন করবেন তাও আর্জেন্টিনার মতো দেশের যে দেশ ফুটবল মানচিত্রে শ্রদ্ধার সাথে ঠাঁই পেয়েছে, কারণ কি শুধুমাত্র তাদের দলে একজন তথাকথিত ভগবান আছেন বলে? একটা ফুটবল দলের পরিচিতি কখনই একটা একা মানুষ, সরি ভগবান হতে পারেন না।
সাম্পাওলি আগেই জানতেন, তার দল বেশি দূর এগোবেনা, তাই আগেভাগে হাত তুলেলে নিয়েছেন। কোপা জেতা টিমের কোচ…! আহা রে কত যেন সাফল্য। এমনি কোচ একটা সুপারস্টার দলের দায়িত্ব নিয়ে মেসিকে সর্বেসর্বা করে দিলেন। একটা ক্লাসে যার রোল এক, পুরো ক্লাস করা অর্থাৎ পড়ানোটা যদি তাকে কেন্দ্র করে হয়, তাহলে অন্যান্য যারা আছেে, যাদের মধ্যে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনাটা ছিল, তা ম্রীয়মাণ হয়ে পড়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সাধারণ বুদ্ধি থেকে যেটা বুঝি, এই একটা জিনিস তারকাখচিত আর একটি দলে নেই, হতে পারে তিনি পাশে কাউকে পাচ্ছেন না, হতে পারে তিনি মার্সেলো-ইস্কো-কার্ভাহাল-লুকাস-আসেনসিও কে মিস করছেন,কিন্তু তার দলে এই ব্যাক্তিকেন্দ্রীক ট্রেনিং দেওয়া হয় না বলেই আমার ধারণা, একজনকে পাখির চোখ করা হয় না বলেই আমার ধারণা। তার ফলস্বরূপ ইউরো জয়, কি আছে দলটায়? আছে কিছু? তার চেয়ে নীল-সাদা দের দল অনেক ভালো, মাঠে কি করলো তা বাদেই বলছি।

এবার আসি মেসির কথায়। না তার খেলা নিয়ে বলার জন্য আনন্দবাজারের মতো একটা বাজারি পত্রিকা আছে। আমি বরং মেসির দায়িত্ব নিয়ে একটু বলি, সমর্থক নই, কিন্তু এটা বলতেই পারি।

  • মেসি কিন্তু চাইলেই অধিনায়ক হিসেবে একটা মেসেজ আপামোর বিশ্ববাসী, ফুটবলপ্রেমী এবং তার সমর্থক এবং অবশ্যই তার কোচ-সহকারী খেলোয়াড়দের দিতে পারেন – “যে আমায় ভগবান ভগবান বলে এতো ডেকো না, আমার এতো উপরে তোলার কিস্সু নেই, এই সম্বোধন আমায় তাড়না দেয় না, বরং মানুষ হিসেবে যে চাপ বয়ে বেড়ানোর কথা, ভগবান ভগবান আওয়াজ কানে এলে সেটা আমার ওপর প্রত্যাশার চাপকে দ্বিগুণ করে দেয়…আমি আমার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলি, আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে পেনাল্টি কিক নেওয়ার পূর্বে আমার মুখবয়ব দেখে তোমরা কিছুই আঁচ করতে পারোনি?”
  •  মেসির আরে বলা উচিৎ, ঠিক যেমন রামোস বলেছিলেন দে হিয়া কে নিয়, পর্তুগালের বিরুদ্ধে ম্যাচ এর পর, সেরকমই…
    “আমার দলের প্রত্যেকটি সদস্যের প্রতিভার ওপর আমার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রত্যেকেই বিশ্ববাসীকে সুন্দর ফুটবল উপহার দেওয়ার জন্য মুখিয়ে, আমাদের সমর্থন করুন। আমাদের….! কোনো ঈশ্বরকে নয়, বা ঈশ্বর সম্বলিত কোনো দলকে নয়। আমাদেরকে সাপোর্ট করুন।”
  • © শুভঙ্কর দত্ত || June 22, 2018

 

দৃষ্টি-(সম্পর্ক)-কোণ

বাবা, কাছিম মানে কি?
— কাছিম মানে কচ্ছপ!
আর জিজীবিষা মানে?
— মাকে জিগ্যেস করো!
অতঃপর…..
যাই হোক্
কৌশিক গাঙ্গুলির আবার একটা সিনেমা হলে দেখে নিলাম। আগে দেখেছিলাম “বিসর্জন”!
এবার দৃষ্টিকোণ।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো আমি রিভিউ লিখতে বসিনি। আমি আমার ভালো লাগা আর খারাপ লাগাগুলো বলতে এসেছি।
তবে সব কিছু বলার আগে একখানা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ লাগেই, সেটা হলো
এক, এই সিনেমাকে প্রসেনজিৎ – ঋতুপর্ণার কামব্যাক সিনেমা “প্রাক্তন” এর সাথে বারবার লড়াই চালাতে হবে…
দুই, কৌশিক গাঙ্গুলির ঘরানার ছবি এটা নয়ই, যদিও তিনি এর আগে রোম্যান্টিক থ্রিলার বানিয়েছেন, “বাস্তুশাপ”! কিন্তু ফ্যামিলি মেলোড্রামা কে কেন্দ্র করে নয়।

সিনেমা শুরু হচ্ছে একটা মৃতদেহ দিয়ে। তারপর গল্প এগিয়ে চললো, আইনজীবি জিওন (প্রসেনজিৎ) এর কাছে সাহায্যপ্রার্থী শ্রীমতি (ঋতুপর্ণা), স্বামী পলাশ (কৌশিক সেন) মারা গিয়েছিলো বছর দুই আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে! না, নামটাই ওরকম। আমার কেন জানিনা মনে হয়েছে, পরিচালক চরিত্রের নামগুলোকেও দেখেশুনেই রেখেছেন। কলকাতার বাহা বাহা উকিল থাকতে জিওন মিত্রকেই কেন! সে প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে হলমুখী হতেই হবে!
তবে এই সিনেমা দেখে বেরিয়ে আসার পর বারবার কয়েকটা জিনিস নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে কুচকাওয়াজ হতে পারে, যেমন- সিনেমাটায় আদৌ গল্প আছে? জিওন মিত্রের একটা চোখ সেরে গেলো বহু বছর বাদ, সেই কথাটা পরিচালক এতো জলদি দর্শককে না বলতেই পারতেন। আসলে এই প্রশ্নগুলো যে উঠছে, এটাই কোথাও যেন বলে দিচ্ছে, সিনেমাটা উতরে গেছে, কেজি পাস এ যাত্রায়। আসলে পরিচালক গোটা সিনেমাতেই একটু একটু আভাস দিয়ে যাচ্ছেন, এই বুঝি গল্প বাঁক নেবে, একবার তা নিলো অবশ্য। যখন প্রীতম (কৌশিক গাঙ্গুলি), মৃত পলাশের দাদা আর তার বাড়ির আয়া উমাকে দেখা যাবে ঘনিষ্ঠ মুহুর্তে। তারপর থেকেই একটা তুমুল উত্তেজনা কাজ করবে আবার কখন গল্প বাঁক নেয়।

এতো গল্পের মাঝে জিওনের অর্ধাঙ্গীনী রুমকি (চূ্র্ণী) আর জিওনের সম্পর্কের মাঝে শ্রীমতী সেনের ট্রেসপাসিং, যা দিয়ে গল্পের বুনন চলবে কিছুক্ষণ। একসাথে দু আড়াই পিস গল্প সমান্তরালভাবে চলতে চলতেই একসময় ক্লাইম্যাক্সে আসবে সিনেমা। সত্যি বলতে কি, দর্শকদের বসিয়ে রাখাতে সফল হয়েছেন কেজি।
পরকীয়ার গল্পের মাঝে মাঝেই থ্রিলারের হালকা বাতাস গায়ে লাগতে পারে, অবশ্য তা কতটা থ্রিল সেটা বলা মুশকিল। কারণ এর চেয়ে ঢের বেশি থ্রিলার কেজির ‘জ্যাকপট’ বা ‘খাদ’ সিনেমায় আছে!

অভিনয় নিয়ে কিছু না বলায় ভালো। কে নেই? তবে কিছু দৃশ্যে ফ্যামিলি মেলোড্রামা দেখলেই ‘প্রাক্তন’ এর কথা মনে পড়বে, তবে হ্যাঁ, এখানে অপরাজিতা আঢ্যের মতো কেউই নেই। অতএব অভারঅ্যাক্টিং নেই। যতটুকু আছে ফ্যামিলি মেলোড্রামা, পুরোটাই মানানসই এবং গল্পের খাতিরে করা, এমনটাই লেগেছে।
কৌশিক গাঙ্গুলি কতটা ভালো পরিচালক তা জানতে বাঙালি অনেক দেরী করেছে তো বটেই, তবে কতটা ভালো অভিনেতা সেটা আর জানতে বাকি রইলো না, যারা অবশ্য ‘বিসর্জন’ এ ওনার অভিনয় দেখে মুগ্ধ, তারা হয়তো ‘কাঙাল মালষাট’ বা ‘ল্যাপটপ’ দেখেননি। “বিসর্জন” এর আগে তার কটা সিনেমা আম বাঙালি দেখেছে, তা সন্দেহ আছে, তার জন্য অবশ্য জিও-ডিজিটাল-লাইফ অনেকটা দায়ী। “ছায়া ও ছবি” র পর “দৃষ্টিকোণ” দিয়ে কেজি নিজের ঘরানা পাল্টানোর চেষ্টা করেছেন।
সিনেমাটার সবচেয়ে ভালো জিনিস কি?
এডিটিং! অবশ্যই! সৌজন্যে – শুভজিৎ সিংহ।
‘বাস্তুশাপ’, ‘বিসর্জন’, ‘ছায়া ও ছবি’, ‘খোঁজ’, ‘মাছের ঝোল’, আর ডেবিউট করেন ‘ধূমকেতু’ দিয়ে, যদিও সেই সিনেমা রিলিজ করেনি।

কেন বললাম যে এডিটিং সবচেয়ে ভালো?
তার কারণ গানগুলোর সাথে দৃশ্যগুলোর সিঙ্ক্রোনাইজেশন। এতো ভালো সিংক বহুদিন চোখে পড়েনি। গান গুলোর ভাষাগুলোও তাই বোধগম্যহতে সহজ হয়। এদিক দিয়ে আবার গোপী ভগৎ এর ক্যামেরার কারসাজিকে বাহবা না দিয়ে উপায় নেই। রাজা নারায়ণ দেব যে সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিসিয়ান, সে কথা দর্শক বেমালুম ভুলেই যাবে, সিনেমার গান শুনে।
চারটে গান আছে- আপাতত কোনটাই প্লে লিস্ট থেকে সরাতে পারছিনা, কারণ – প্রত্যেকটা গানের ভাষা, সৌজন্যে – অনুপম রায়, যেমন – “আমি তোমায় খুব বিরক্ত করছি”!  কেজির ফিল্মের গান এমনিতেই দারুণই হয়।  তবে প্রত্যেকটা গানের সাথে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বানানো দৃশ্যের সিঙ্ক্রোনাইজেশনে আমি অন্তত মুগ্ধ। 

সিনেমার গল্প খুব দুর্বল নয়। আসলে সব কিছু বলে দিয়ে তারপর ব্যাখ্যা দেওয়া, এটাও তো এক রকমের বাজিমাৎ। তাই কেন “দৃষ্টিকোণ”? সে কথা জানতে হলে দেখতে হবে। এ সব সিনেমার ডায়লগ নিয়ে বেশি কিছু বলা যায় না, কারণ ডায়লগের ওপরেই পুরোটা দাঁড়িয়ে। তবু ডায়লগের কথা বললেই আবার “বিসর্জন” এর সাথে তুলনা আসতে পারে।

ও হ্যাঁ, জিজীবিষা মানে Urge To Live মানে বেঁচে থাকার ইচ্ছা! যা দিয়েই গল্পের শেষ। বেঁচে থাকা আর না থাকা নিজের ‘দৃষ্টিকোণ’ থেকে।

তবে সব কিছু ছাড়িয়ে কেজির ঘরানার সিনেমা না ভেবে এই সিনেমা দেখতে গেলে অনেক কিছুই পাওয়া যাবে,
আর উপরিপাওনা হিসেবে প্রসেনজিৎ – ঋতুপর্ণার বহুপ্রতীক্ষিত চুম্বন এর দেখা মিলবে…!

 

এক সাথে অনেক দর্শক মিলে বাংলা সিনেমা দেখলাম বহুদিন পরে। সিটে বসে থাকার পর দেখি আস্তে আস্তে অর্ধেক ভর্তি হলো। তাহলে কি লোকজনের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টালো?

©শুভঙ্কর দত্ত || May 4, 2018

নিমকহারামের দেউড়ী

“ধীরে চলনা হ্যায় মুশকিল তো জলদি হি সহি…..”

সত্যিই এই ক’দিন যা চলেছি, তাতে এই লাইনটাই মনে পড়ছে! পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলী, পূর্ব-পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দক্ষিন – উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং — মোট এগারো খানা জেলার অক্সিজেন আরাম করে নিয়েছি বলা চলে! যাই হোক্ কোত্থেকে শুরু করবো এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটালো ঐতিহাসিক স্থানের প্রতি আমার আকুণ্ঠ পিপাসা! আপাতত “মুর্শিদাবাদ” দিয়ে অর্থাৎ যাত্রা শেষ দিয়ে শুরু হোক্ ব্লগে জল দেওয়া।

দার্জিলিং যাত্রা শেষ করে সমতলে নামছি। কথা ছিলো শুধু হাজারদুয়ারী দেখা হবে কিন্তু হাতে খানিকটা সময় আর ভ্রমণপিপাসু কিছু বাঙালি একজোট হলে যা হয়, তারপর আবার দর কষাকষির পর মোটামুটি একটা ইয়ে হতেই চলো ‘এ’ – এক্কাগাড়ি ঐ ছুটেছে……..

IMG_20180407_072435
এক্কাগাড়ি ঐ ছুটেছে

প্রথমেই গেলাম হাজারদুয়ারীর পাশের রাস্তা দিয়ে, আজিমুন্নেসা বেগমের জীবন্ত সমাধি।

PANO_20180407_092256
জীবন্ত কবর,

বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলি খান এর কন্যা ছিলেন আজিমুন্নেসা বেগম। জনশ্রুতি রয়েছ, কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় নবাবি হেকিম দৈনিক একটি মানবশিশুর কলিজা দিয়ে ওষুধ তৈরি করে দিতেন। অসুখ সেরে গেলেও তিনি মানবশিশুর কলিজায় নেশাগ্রস্ত হয়ে গোপনে নিয়মিত ভাবে শিশুদের কলিজা খেতে থাকেন। এই ঘটনা মুর্শিদকুলি খাঁ জানতে পেরে তাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নির্দেশ দেন। মুর্শিদাবাদ ঘুরতে গিয়ে টাঙ্গার (এক্কাগাড়ি বা টমটম) চালকের কাছে এমন কথা শুনে সত্যিই চমৎকৃত হয়েছিলাম। একতলা পাকা মঞ্চের উপর মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে আজিমুন্নেসার সমাধি, যে মসজিদটা তৈরী করিয়েছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ এর কন্যা স্বয়ং! মঞ্চের উপরিভাগে বাম পাশে একটা দেয়াল ছাড়া মসজিদের আর কোন চিহ্ন বর্তমানে নাই। কথিত আছে সাধারণ মানুষের পদধূলিতে তার শিশু হত্যার পাপ মোচনের জন্য মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে তাকে জীবন্ত সমাহিত করা হয়। 

তারপর একই রাস্তা ধরে দক্ষিণে শর্টকাট নিয়ে চলে গেলাম কাঠগোলা বাগানবাড়ি। তবে কাঠগোলা তে পরম প্রাপ্তি হলো ওখানকার ছান্দসিক গাইড দাদা, এতো সুন্দরভাবে বলে গেলেন খিদে তিষ্টা কোনদিকে উড়ে গেলো।

IMG_20180407_095602
কাঠগোলা মহল্লায়

লক্ষীপৎ, জগপৎ, মহীপৎ ও ধনপৎ । হাজারদুয়ারি থেকে ৪ কিমি উত্তরে চার ভাইয়ের এই কাঠগোলা বাগান। ১৭৮০ সালে কাঠগোলা বাগানের প্রতিষ্ঠতা করেন লক্ষীপৎ সিং দুগর। প্রায় ২৫০বিঘা জায়গা নিয়ে বিশাল বাগানের মধ্যে দোতালা অট্টালিকার সামনে বড় পুকুর খনন করা হয়। সেই পুকুরে থাকত নানা ধরনের রঙ্গীন মাছ। নবাব সৈয়দ হাসান আলী মির্জা কাঠগোলা বাগানের নাচ মহলে অংশ গ্রহণ করতেন। এখানে জৈন মন্দির ও প্রাসাদ ছাড়াও রয়েছে চিড়িয়াখানা, হেরেম ও শ্বেত পাথরে বাঁধানো পুকুর। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মহামূল্যবান আসবাব ও তৈজসপত্র।

কাঠগোলা নামটি আসলে কাঠগোলাপ এরই অপভ্রংশ বলা যায়। সেকালে প্রচুর কাঠের আসবাবপত্রের ব্যবসা ছিলো আর ছিলো গোলাপের বাগান। সেখান থেকেই এই নাম।

IMG_20180407_102644
হাত কাটা কার্তিক, শিল্পসত্ত্বা আর যাতে বিকশিত না হয়

 

IMG_20180407_102726
সিংহদুয়ার
IMG_20180407_094346
কাঠগোলা বাগানবাড়ির প্রবেশপথ

 

IMG_20180407_102738
সুড়ঙ্গপথ

 

IMG_20180407_094544
‘দুগর’দের কেউ

 

IMG_20180407_101913
আজও স্মৃতি
IMG_20180407_101925
রন্ধনশালা

 

IMG_20180407_101736
মাছেদের কবরস্থান

 

বহুদিন এ প্রাসাদ বন্ধ বা পরিত্যক্তই ছিলো বলা যায়। ১৮৭০ সালে এ প্রাসাদটি আবার পুনর্নির্মান করা হয়। লক্ষীপৎ সিং দুগরের বংশধর সঞ্জয় সিং ও সিদ্ধার্থ এখন এর দেখাশোনা করেন। কথিত আছে, কাঠগোলা বাগানের পূর্বদিকে যে প্রাচীন মসজিদ ও কবরস্থান আছে সেখানকার এক ইঁদারার কাছ থেকে দুগড় পরিবার প্রচুর গুপ্তধন পেয়েছিলেন। প্রাপ্ত সব টাকায় তারা বাগান সাজাতে ও মন্দির নির্মাণ করতে খরচ করেছিলেন।

IMG_20180407_101723
এখন ফাঁকা মহল

সেকালে কাঠগোলা বাগানে জলসা হতো এবং অনেক লোকের সমাগম হতো। বর্তমানে কাঠগোলা বাগান একটি দর্শনীয় স্থান। অট্টালিকা, সংগ্রহশালা, গোপন সুরঙ্গপথ, আদিনাথ মন্দির, বাঁধানো পুকুর সব কিছু নিয়ে মুর্শিদাবাদের এই দর্শনীয় স্থানটি অতুলনীয়।

এরপর জগৎ শেঠ এর বাড়ি
জগৎ শেঠ  বাংলার অত্যন্ত ধনী ব্যাংকার ফতেহ চাঁদকে আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ‘জগৎ শেঠ’ বা বিশ্বের ব্যাংকার উপাধি প্রদান করা হয়। জগৎ শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানিক চাঁদ। তিনি আঠারো শতকের প্রথম দিকে পাটনা থেকে ঢাকা আসেন এবং এখানে একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলী খানতার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে, মানিক চাঁদ তার সাথে নতুন রাজধানীতে চলে যান। মুর্শিদাবাদে তিনি ছিলেন নওয়াবের খুবই প্রিয়ভাজন এবং পরে নওয়াবের ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ লাভ করেন। দিল্লির সিংহাসনে আরোহণের পর পরই সম্রাট ফররুখ সিয়ার ‘নগর শেঠ’ (নগরের ব্যাংকার) উপাধি প্রদান করে মানিক চাঁদকে সম্মানিত করেন। ১৭১৪ সালে মানিক চাঁদের মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র (দত্তক পুত্র) ও উত্তরাধিকারী ফতেহ চাঁদের নেতৃত্বে পরিবারটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করে। পরে সম্রাট মাহমুদ শাহ ফতেহ চাঁদকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি প্রদান করলে এ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি দেশে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের একটি স্থাপনা ও জায়গা। জগৎ শেঠের বাড়ি মুর্শিদাবাদ শহরতলীর অদূরে নশিপুর এলাকাতে আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে তা হলো নবাবী আমলের ধর্নাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি জগৎ শেঠের বাড়িটি। সেখানে জগৎ শেঠদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস ও আসবাবপত্র রয়েছে। বাড়ির ঠিক পিছনে রয়েছে ভূগর্ভস্থ গুপ্ত সুরঙ্গ, মাটির তলায় গুপ্ত ঘর। রয়েছে জগৎশেঠের টাকশালে তৈরি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, স্বর্ণ ও রৌপ্য শাড়ি, খাজঞ্চি খানা, ঢাকাই মসলিন ও তৎকালিন ব্যবহার্য্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শণ সমূহ। বাড়ির আঙিনায় রয়েছে বিশাল একটি মন্দির।

জগৎ শেঠের বাড়ির বিভিন্ন অংশ

 

এরপর রাস্তায় আসতে আসতে চোখে পড়লো নসিপুর রাজবাড়ী যার অনুকরণে হাজারদুয়ারী তৈরী হয়েছে।

IMG_20180407_110417
নসিপুর রাজবাড়ি 

নসিপুর রাজবাটী তে কেন তার ঘোড়াকে থামতে বললো না চালক, তা বুঝলাম না। অদূরেই রঘুনাথজীউ মন্দির/আশ্রম ছিলো বলেই হয়তো!
ফরাগঞ্জের দেবোত্তর ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি মুর্শিদাবাদের একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এটি মুর্শিদাবাদ পৌরসভা কর্তৃক ঘোষিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য। আনুমানিক ২৫০ বছর আগে এই স্থাপনাটি নির্মিত হয়। বাংলা ১১৬৮ সালে মহন্ত লছমন দাস ঢাকার উর্দু বাজার থেকে এসে মীর জাফরের আদি বাড়ি সংলগ্ন স্থানে এই জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেন। তবে রঘুনাথ মন্দিরটি বেশ চমকপ্রদ, উপরের দিকে আঁকা আছে একদিকে সিংহ আর একদিকে ঘোড়া, মাঝে ঢালের মতো….নীচে লেখা পলাশীর যুদ্ধ। বিস্তৃত এই জায়গায় আছে প্রাচীন কাষ্ঠ শিল্পে খোদিত এবং রাজস্থানের তুষারশুভ্র মর্মরে শতাধিক বছরের প্রাচীন প্রাসাদ। বয়সের ভারে প্রাসাদটি আজ জরাজীর্ণ অবস্থা। এটি বন্ধই থাকে। পাশের ভবনে আছে ঐতিহ্যবাহী সোনার রথ, বেলোয়ারী ঝাড়, ঐতিহ্যময় আসবাবপত্র, প্রাচীন যুগের বেবি অস্টিন মোটর যান, পুরনো রান্না সরঞ্জাম ইত্যাদি। কথিত আছে, প্রাচীন যুগের এই বেবি অস্টিন গাড়িটি আশি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল, যা আজ ছোট একটি গ্যারেজে রাখা আছে। পাশেই আছে সোনার রথ। দর্শনার্থীদের জন্য দিনের সব সময়ই এটি খোলা থাকে।

IMG_20180407_111551
বহু কম টাকার রথ, তবে সোনার

রঘুনাথ মন্দিরের বিভিন্ন দর্শনীয় বিষয়সমূহ

IMG_20180409_101209
৮০ টাকার অস্টিন, Surajit Maiti র থেকে পেলাম ছবিখানা

বেশ কয়েকটা জায়গা তাড়াহুড়োর সাথে দেখতে দেখতে যখন ক্লান্ত তখন এক্কাগাড়ির চালক হাজারদুয়ারী নিয়ে বলতে শুরু করেছেন, আমরাও গল্প করে যাচ্ছি, ভদ্রলোক রেগে গেলেন। আমরা আবার মনোনিবেশ করলাম। বস্তুত বলে রাখি, অনেকেই হয়তো জানে হাজারদুয়ারী সিরাজের তৈরী, এটা ভাবা বেশ বড়ো ভুল। তৈরী তো নয়ই, বরং উনি কখনো এই অপূর্ব স্থাপত্যটিকে দেখে যেতে পারেন নি জীবনকালে। চালক ই তো জীবন্ত জিপিএস এর মতোই….বলে চলেছেন–

IMG_20180407_120609-01
ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারী

 

১৮৩৭ সালে নবাব নাজিম হুমায়ুন খাঁয়ের জন্য ৮০ ফুট উঁচু তিনতলা গম্বুজওয়ালা এই প্রাসাদ অর্থাৎ হাজারদুয়ারূ নির্মিত হয়। আদপে ৯০০টি দরজা হলেও আরও ১০০টি কৃত্রিম দরজা রয়েছে প্রাসাদে। তাই নাম হাজারদুয়ারি। প্রাচীন মুর্শিদাবাদের স্মৃতি নিয়ে অপরূপ গথিকশৈলীর এই প্রাসাদ এখন মিউজিয়াম। আক্ষরিক অর্থেই এ এক ঐতিহাসিক জাদুঘর। নীচের তলায় রয়েছে তৎকালীন নবাবদের ব্যবহৃত প্রায় ২৭০০টি অস্ত্রশস্ত্র। যার মধ্যে আলিবর্দি ও সিরাজের তরবারি এমনকী যে ছুরিকা দিয়ে মহম্মদি বেগ সিরাজকে খুন করেছিল তা পর্যন্ত রক্ষিত আছে এই সংগ্রহশালায়। এই সুরম্য বিশাল রাজপ্রাসাদের দ্বিতলে দেখা যায় রুপোর সিংহাসন যেটি ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী মহারানি ভিক্টোরিয়ার দেওয়া উপহার। ১৬১টি ঝাড়যুক্ত বিশাল ঝাড়বাতির নীচে সিংহাসনে বসে নবাব দরবার পরিচালনা করতেন। মন্ত্রণাকক্ষের লুকোচুরি আয়না, দেশ-বিদেশ থেকে সংগৃহীত বিশ্ববিখ্যাত সব ঘড়ি, মার্শাল, টিশিয়ান, রাফায়েল, ভ্যান ডাইক প্রমুখ ইউরোপীয় শিল্পীর অয়েল পেন্টিং, প্রাচীন সব পাথরের মূর্তি হাজারদুয়ারিকে বিখ্যাত করে তুলেছে। ত্রিতলে আছে নবাবী আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন সোনা দিয়ে মোড়া কোরাণ শরিফ, অমূল্য পুঁথিপত্র, আইন-ই-আকবরির পান্ডুলিপি সহ অসংখ্য বইয়ের সম্ভার। ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসেরও কিছু বিশিষ্ট নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এই মিউজিয়ামে। হাজারদুয়ারির চত্বরে রয়েছে ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে জনার্দন কর্মকারের তৈরি ১৮ ফুট লম্বা, আট টন ওজনের ‘জাহানকোষা’ কামান বা বিশ্বজয়ী কামান। এই কামানে একবার তোপ দাগতে ৩০ কেজি বারুদ লাগত বলে জানা যায়। এটি বাচ্চেওয়ালি কামান নামেও পরিচিত।

IMG_20180407_120703
ঘন্টা
IMG_20180407_120649
১৯৭০ বা ৭১ এ লাস্ট চলেছিলো
IMG_20180407_072514
হাজারদুয়ারীর মেন গেট
IMG_20180407_114629
হাজারদুয়ারী
IMG_20180407_125307
ইমামবারা

 

IMG_20180407_130031
এক গোলার শব্দে অনেক প্রসূতির বাচ্চা নষ্ট হয়, তাই এর নাম বাচ্চেবোলি কামান

 

তবে সবকিছু দেখার পরেও গুগল ম্যাপে একটি বার চোখ রাখলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। এক পাগল হকার আমাদের বলছিলো – ‘এটা মীরজাফর এর এলাকা, গদ্দারী কে করবে না?’ লোকটা বলছিলো – ‘এই শালারা সেখানেই ঘুরতে নিয়ে যাবে যেখানে ঢুকতে টাকা লাগবে, তোমরা চলো, আমি ঘোরাবো গোটা মুর্শিদাবাদ, টাকা লাগবে না!’ বলতে বলতে দেখলাম একজন তেড়ে এলো! এ ঘটনা ঘোরাঘুরির অব্যবহিত পূর্বেই। যদিও তার আগেই সকাল সকাল বাস থামতেই ভাগীরথী নদী, ফেরী ঘাট আর ওয়াসিফ আলি মির্জার বাড়িটা দেখে নিলাম।

ওয়াসিফ ভবনের বিশেষ বিশেষ অংশ

 

ও বলা হয়নি, ভগ্নপ্রায় মীরজাফরের বাড়িটা পড়লো কাঠগোলা আসতে আসতে….. কিন্তু স্রেফ একটা দেওয়াল, এক্কাগাড়ির ঘোড়াটাও দাঁড়ালো না, হয়তো ওরও খেয়াল আছে….ওটা “নিমকহারামের দেউড়ী”…

IMG_20180407_070021_HDR
এবার ফেরার পালা

 

তথ্যসূত্র : এক্কাগাড়ির চালককাকু এবং অবশ্যই ঈশ্বররূপী গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর  // April 9, 2018

‘ভ্যালেন্টাইন’ কেন কয়? সে কি কেবলই প্রেমময়? 😜

১৪ ই ফেব্রুয়ারী!

🌹♥🌹♥🌹♥🌹♥🌹♥🌹♥🌹

স্কুলে ছুটির নোটিফিকেশন এলো, ছেলেদের উদ্দেশ্যে “শিবারাত্রি”র জন্য ছুটি থাকবে, একথা জানাতেই তারা রে রে করে উঠলো….
— স্যার শুধু শিবারত্রির কারণেই?
— অন্য কারণে স্কুল ছুটি থাকলে কি খুব ভালো লাগতো? পয়সা আছে পার্ক যাওয়ার?

আর কি বলবো? ফোক্কর ছেলে পিলে সব, এমনি করেই চুপ করাতে হয়।
তবে হ্যাঁ , সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় এর শিবরাত্রির কারণে ছুটির বিজ্ঞপ্তি মোটামুটি ভাইরাল, কারণ খবর এমন ভাবে লেখা হয়েছে তাতে সবাই কারণ হিসেবে প্রায়ই ভালোবাসার দিনটিকে ধরেছে, কিন্তু ঘটনাটা উল্টো- আদতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরকে প্রেম দিবসের অনাকাঙ্খিত ভিড় থেকে মুক্ত রাখতে।
——————————————————–

যাই হোক্

বছরের অন্যদিন গুলো কি দোষ করলো? আসুন বন্ধুরা সাড়ম্বরে উদযাপন করার আগে জেনে নিই, বলা যায় না,হয়তো কখনো প্রেমের ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ইতস্তত বোধ করতে হলো….

🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹

ভালোবাসা দিবস বা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে একটি বার্ষিক উৎসবের দিন যা ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা এবং অনুরাগের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হয়ে থাকে, যদিও অধিকাংশ দেশেই দিনটি ছুটির দিন নয়।

************************************

 ইতিহাস 

************************************

২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রি ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে সে সময়ের রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তাকে বন্দি করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল।

সম্রাট লক্ষ করেন, যুদ্ধের কঠিনতম মুহূর্তে বিবাহিত যুবকদের তুলনায় অবিবাহিত যুবকরা ধৈর্যের পরিচয় বেশি দেয়। বিবাহিত যুবকরা অনেক সময় স্ত্রী-পুত্রের টানে যুদ্ধে যেতেও অস্বীকৃতি জানায়। তাই যুগলবন্দি বা যে কোনো পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন তিনি। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। গোপনে তার গির্জায় পরিণয় প্রথা চালু রাখেন। এ খবর জানাজানি হলে সম্রাট তাকে কারাগারে বন্দি করার নির্দেশ দেন। জেলের ভেতরই পরিচয় ঘটে জেলারের এক অন্ধ মেয়ের সঙ্গে। বন্দি অবস্থাতেই তিনি চিকিৎসা করে অন্ধ মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। এভাবে ভ্যালেন্টাইন মেয়েটির প্রেমে পড়ে যান। অবশ্য এর আগেই মেয়েটি ও আরও ৪৬ জন তার খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিল। সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল। মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে লেখা এক চিঠির শেষে তিনি লিখেছিলেন- ইতি তোমার ভ্যালেন্টাইন।

তারপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইনস দিবস ঘোষণা করেন। খ্রিস্টানজগতে পাদ্রি-সাধু সন্তদের স্মরণ ও কর্মের জন্য এ ধরনের অনেক দিবস রয়েছে। যেমন ২৩ এপ্রিল- সেন্ট জজ ডে, ১১ নভেম্বর- সেন্ট মার্টিন ডে, ২৪ আগস্ট- সেন্ট বার্থোলোমিজম ডে, ১ নভেম্বর- আল সেইন্টম ডে, ৩০ নভেম্বর- সেন্ট অ্যান্ড্র– ডে, ১৭ মার্চ- সেন্ট প্যাট্রিক ডে।

পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে জন্মদিনের উৎসব, ধর্মোৎসব সবক্ষেত্রেই ভোগের বিষয়টি মুখ্য। তাই গির্জার ভেতরেও মদ পান করতে তারা কসুর করে না। খ্রিস্টীয় এই ভ্যালেন্টাইনস দিবসের চেতনা বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৭৬ সালে ফ্রান্স সরকার ভ্যালেন্টাইন উৎসব নিষিদ্ধ করে। ইংল্যান্ডে ক্ষমতাসীন পিউরিটানরাও একসময় প্রশাসনিকভাবে এ দিবস উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানিতে বিভিন্ন সময়ে এ দিবস প্রত্যাখ্যাত হয়।

***—***—***—***—***—***—***–
ভিন্ন একটি মত অবশ্য এরকম কথা বলছে…..

 প্রাচীন রোমানদের ধর্ম ছিল প্যাগান ধর্ম এবং তারা বিভিন্ন দেবতাদের পুজা করতো। লুপারকাস ছিল তাদের বন্য পশু দেবতা। এই দেবতার প্রতি ভালবাসা জানিয়ে তারা ‘লুপারক্যালিয়া’ (Lupercalia) নামক পুজা উৎসব করতো। এই ‘লুপারক্যালিয়া’ উৎসব আগে ফেব্রুয়া (Februa) নামে পরিচিত ছিল, যেখান থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের উৎপত্তি। রোমানরা এই ‘লুপারক্যালিয়া’ পুজার উৎসব ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়াতে পালন করতো যার মূল দিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়া বা ফেব্রুয়ারী। এই পুজার প্রধান আকর্ষণ ছিল লটারি। বিনোদন ও আনন্দের জন্য যুবকদের মাঝে যুবতীদের বণ্টন করে দেয়াই ছিল এ লটারির উদ্দেশ্য।পরবর্তী বছর আবার নতুন করে লটারি না হওয়া পর্যন্ত যুবকেরা তাদের জন্য বরাদ্দ মেয়েদের এক বছর ভোগ করার সুযোগ পেত। এই ‘লুপারক্যালিয়া’র দিনে আরেকটি প্রথা ছিল। এদিন তারা ছাগল ও কুকুর তাদের দেবতাদের জন্য উৎসর্গ করত… আর উৎসর্গিত ছাগল ও কুকুরের রক্ত গায়ে মেখে তাদেরই চামড়ার পোশাক ও চাবুক বানিয়ে যুবকরা ঐ চাবুক দিয়ে যুবতীদের আঘাত করতো। তাদের বিশ্বাস ছিল এতে যুবতী নারীদের গর্ভধারণ ক্ষমতা বেড়ে যায়। রোমান শাসকেরা একসময় তাদের প্যাগান ধর্ম পরিবর্তন করে খ্রিষ্টানধর্ম গ্রহন করে। ধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য জনগনের প্যাগান সংস্কৃতি ঠিক রেখে তা খ্রিস্টধর্মের ব্যানারে নিয়ে যায়। যেমন Sunday তে রোমান প্যাগানরা তাদের Sun God এর পুজা করতো। খ্রিষ্টান হওয়ার পর তারা Sunday কেই তাদের খ্রিষ্টান ধর্মের উপসনার দিন বানিয়ে নেয়। ভ্যালেন্টাইন নামক এক পাদ্রি ছিল, তিনি তৃতীয় দশকে রোমে মারা গিয়েছিলেন… আর তার মৃত্যু দিন ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্যাগানরা ১৪ ফেব্রুয়ারিতে লুপারক্যালিয়া পালন করত, আর খৃষ্টানররা ১৪ ফেব্রুয়ারি পালন করত পাদ্রি ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু দিবস হিসেবে। যাই হোক, জনগনের মাঝ থেকে প্যাগান ধর্মের চিহ্ন মুছে ফেলতে গেলাসিয়াস নামের খ্রিষ্টান পোপ এবার রোমান গড লুপারকাস এর বদলে খ্রিষ্টান পাদ্রী সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন এর নামে ১৪ ফেব্রুয়ারীকে ভ্যালেন্টাইন ডে ঘোষণা করে। তখন প্যাগানদের লুপারক্যালিয়াই রূপান্তর হয় খ্রিস্টানদের ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ তে।

*************************************

বর্তমানকালে পাশ্চাত্যে এ উৎসব মহাসমারোহে উদযাপন করা হয়। যুক্তরাজ্যে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় ১০০ কোটি পাউন্ড ব্যয় করে এই ভালোবাসা দিবসের জন্য কার্ড, ফুল, চকোলেট, অন্যান্য উপহারসামগ্রী ও শুভেচ্ছা কার্ড কিনতে। এ দিবস উপলক্ষে আনুমানিক আড়াই কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান করা হয়।

🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹

সূত্রঃ বাংলাদেশের ‘যুগান্তর’ পত্রিকা এবং অবশ্যই সবজান্তা গুগুল।

© শুভঙ্কর দত্ত || February 14, 2018