একটা কনভারশেসন কল এবং… কর্ণগড়

PANO_20171229_145823
প্যনোরমাতে কর্ণগড় মহামায় মন্দির

কথা ছিলো মকর সংক্রান্তিতে কর্ণগড়, দ্বিচক্রীকে বাহন করে যাওয়া হবে!
কথা ছিলো বেলপাহাড়ী ঘুরতে যাওয়া হবে! সঙ্গ এবং সময়ের অভাবে বেলপাহাড়ী সিল্করুট আপাতত বন্ধ! কিন্তু ১৪ ই জানুয়ারির কর্ণগড় ভ্রমণকে একটা কনভারশেসন কল মারফৎ এগিয়ে আনতে হলো! পার্টনার? – সেই বছর দুয়েক আগে যে দুজন জুটেছিল। সৌমেন আর ইমতিয়াজ।

 

dS photography20171230_060449
প্রবেশমুখ থেকে…

 

dS photography20171230_060600
দণ্ডেশ্বর ও খড়্গেশ্বর জীউ মন্দির, প্রবেশদ্বার থেকে

 

বাসে করে ভাদুতলা, তারপর বাকিটা কর্ণগড় গামী বা শিরোমণিগামী অটোতে চেপেছিলাম মনে নেই, তবে হালকার ওপর ফেন্সি করে ভিড় ছিলো, প্রথমে কোথায় পা রাখবো, তা নিয়ে বেশ ধন্দে ছিলাম। যাই হোক্, অটো চলতে শুরু করতেই বসার জায়গায় ঠিকঠাক সেঁটে গেলাম।

 

দু বছর পর মহামায়া মন্দিরে এসে “জুতো স্ট্যান্ড” চোখে পড়লো! বহু বহু স্ট্যান্ড দেখছি, জুতো স্ট্যান্ড, এই প্রথম!কে জানে, হয়তো শেষ বারও। বছর দুয়েক রংটা এমনই কৃত্রিম ছিল কিনা মনে নেই মন্দিরের, তবে প্রথম যখন এসেছিলাম মন্দিরের রংটার মধ্যে একটা প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ ছিল। সে যাই হোক্, দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরিয়েছিলাম, কারণ আমাদের সাফসুতরো লক্ষ্যই ছিল ঘোরা আর ছবি তোলা! ওখানে যখন নামছি ইণ্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম বললো দুটো ১৭। তারপর প্রায় দেড় – দু ঘন্টা জুড়ে দাপাদাপি চললো। ফটো শিকার! মকরে এলে ছবি তোলাটা হয়তো ফিকে হয়ে যেতো কিন্তু সেই মহাপ্রসাদ! সে তো প্রাণ জুড়িয়েদিয়েছিলো, সেটা মিস করলাম, স্বাভাবিক। দু ঘন্টার শেষটা কাটলো ঐ পুকুর পাড়ে, সঙ্গে আগের বারের ট্রিপগুলোর স্মৃতি রোমন্থন! বেশ কেটে গেলো। আসার সময়, অটোচালককে জিগ্গেস করতে জানা গেলো – ‘এতো শুধু মন্দির, যে রাস্তা দিয়ে আমরা আসছি, ঐ রাস্তা দিয়ে মন্দির পেরিয়ে গেলে কর্ণগড় এর বিস্তৃত এলাকা চোখে পড়বে, তবে তেমন কিছুই আর নেই!” সবই অঅন্তঃসারশূন্য। তারপর ঠাহর হলো – হ্যাঁ তো, কর্ণগড়, একটা কেমন যেন সমাসবদ্ধ পদ ঠেকছে! চলো তবে একটু হাতড়ানো শুরু হোক্। শুরু করলাম। ওমনি গুগল ঝপঝপ করে কাঙ্খিত দু’খান লিংক দিয়ে দিলো! পড়ে যা জানলাম, বলার চেষ্টা করছি মাত্র-

 

IMG_20171230_071845
Descending….

 

dS photography20171230_062032
অস্তগামী সূর্যের সামমে

 

কর্ণগড়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। ইন্দ্রকেতু নামে এক রাজা এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ইন্দ্রকেতুর ছেলে নরেন্দ্রকেতু মনোহরগড় স্থাপন করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। রণবীর সিংহ নামে এক লোধা সর্দারকে রাজ্য শাসনের ভার দেন তিনি। অপুত্রক রণবীর সিংহ অভয়া নামে এক মাঝির ছেলেকে পোষ্যপুত্র করে তাঁর হাতে রাজ্য শাসনের ভার অর্পণ করেন। তারপর বংশপরম্পরায় রাজ্য শাসন চলতে থাকে।

কর্ণগড়ের যাবতীয় আকর্ষণ এই মহামায়া মন্দিরকে কেন্দ্র করে। মন্দিরে মহামায়া ও দণ্ডেশ্বরের বিগ্রহ রয়েছে। উৎকল শিল্পরীতিতে তৈরি মন্দিরটিতে পঞ্চমুণ্ডির আসনও রয়েছে। কর্ণগড়ের নিসর্গও মনোরম। গাছগাছালি, নদী দিয়ে চারদিক ঘেরা। মেদিনীপুর শহর থেকে জায়গাটি খুব বেশি দূরেও নয়। তাই এক সময় এই এলাকাটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, রাস্তা তৈরি হবে, হবে পার্ক। এবার গিয়ে অবশ্য কিছু কেমন প্রস্তুতি চোখে পড়লো। রাস্তা সারাইয়ের কাজও চলছে।

রয়েছে বলতে শুধু মহামায়ার মন্দির। সংরক্ষণের অভাবে বাকি সব হারিয়ে গিয়েছে। বহু খুঁজেও দু-চারটে ইটের বেশি কিছু মিলবে না। চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত রানি শিরোমণির গড়ের এখন এমনই দশা। গড় অর্থাৎ দুর্গের আর অস্তিত্ব নেই। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় শেষ অপুত্রক রাজা অজিত সিংহের। তাঁর দুই রানি ছিলেন ভবানী ও শিরোমণি। রানি শিরোমণি ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনদের এককাট্টা করে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এই জন্য ইংরেজদের কোপে পড়েন রানি। তাঁকে বন্দিও করা হয়। নাড়াজোলের রাজা আনন্দলাল খানের মধ্যস্থতায় চরম সাজা না হলেও তাঁকে আবাসগড়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

কর্ণগড় ছাড়াও আরও দুটি গড় ছিল রাজবংশের , আবাসগড় ও জামদারগড়। মেদিনীপুর শহরের উত্তরে বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তায় পড়ে। সেখানেও কিছু নিদর্শন মেলে। কিন্তু সময়ের চোরাস্রোতে হারাতে বসেছে সেইসব ইতিহাসের সূত্র। ১৬৯৩ থেকে ১৭১১ সাল প‌র্যন্ত এই গড়ে রাজ করেছিলেন রাজা রাম সিংহ। পরে রানী শিরোমনি এবং নাড়াজোলের রাজা মোহনলাল খাঁ এই গড়ের উন্নয়ন করেছিলেন।

 

মেদিনীপুর শহর থেকে উত্তর দিকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কর্ন রাজবংশের রাজধানী ছিল, তার প্রমাণ আজও মেলে। প্রধান গড় ছিল কর্ণগড়। মেদিনীপুরের প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার ব্যস ধরলে  বিস্তৃত ছিল । এই গড়ের নিজস্ব চরিত্রটি অদ্ভুত। জঙ্গলমহলের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে জলস্রোত নদীর আকার ধারণ করে  ‌যেখান দিয়ে বয়ে ‌যেত সেটি গড়ের অন্দরমহল। নদীটি খুবই ছোট, নাম পারাং। গড়ের দু দিক দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে একসঙ্গে মিলিত হত পারাং নদী। অনেকটাই পরিখার মতো। এই গড়ের মধ্যেই ছিল, কুল দেবতাদের মন্দির অধিদেবতা দণ্ডেশ্বর এবং অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভগবতী মহামায়া।

তবে মহামায়ার মন্দিরটি এখনও অটুট রয়েছে যেখানে বসে কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য সাধনা করতেন। প্রচলিত রয়েছে, এখানে বসেই রামেশ্বর শিবায়ন কাব্য রচনা করেছিলেন। রামেশ্বরের কাব্যে কর্ণগড়ের উল্লেখও রয়েছে
‘যশোবন্ত সিংহ/ সর্বগুণযুত/ শ্রীযুত অজিত সিংহের তাত। মেদিনীপুরাধিপতি/ কর্ণগড়ে অবস্থিতি/ ভগবতী যাহার সাক্ষাৎ।’

তবে রাণী শিরোমণি স্মরণে মেদিনীপুর শহরেই গেস্ট হাউস আছে, এমনকি ভারতীয় রেল রাণী শিরোমনির স্মৃতির উদ্দেশ্যে আদ্রা-হাওড়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনও চালু করেছে! গেস্ট হাউসের কথা কেউ মনে রাখতে না পারলে এই ট্রেনটির কথা তো অনেকেই জানেন!

 

 

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কর্ণগড় একদিনের ট্রিপ হিসেবে দারুণ! যতবার যাই, অনেক অনেক ছবি কুড়িয়ে আনি আর মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়, উৎসবের সময় না গেলে ওখানের নিরিবিলি প্রকৃতির শোভা বেমালুম উপলব্ধি করা যায়, আর মকরে গেলে তো পায়েসসহ উত্তম প্রসাদ খাওয়ার সুযোগ রইলই!

dS photography20171230_062355
ঘরের মধ্যে ঘর
IMG_20171229_155020
ফ্রেম-এ-ক্যামেরা

 

পথনির্দেশিকা:: মেদিনীপুর/খড়গপুর থেকে বাঁকুড়া রোড ধরে ভাদুতলা, তারপর আর বলতে লাগবে কি! অটোওয়ালারা উপস্থিত মহামায়ার অধিষ্ঠানে হাজির করানোর জন্য।

তথ্যসূত্র::
 আনন্দবাজার পত্রিকা
 (http://archives.anandabazar.com/archive/1140102/2med4.html)

 

DSC_0654
চলো এবার, ফেরার পালা….