একটা কনভারশেসন কল এবং… কর্ণগড়

PANO_20171229_145823
প্যনোরমাতে কর্ণগড় মহামায় মন্দির

কথা ছিলো মকর সংক্রান্তিতে কর্ণগড়, দ্বিচক্রীকে বাহন করে যাওয়া হবে!
কথা ছিলো বেলপাহাড়ী ঘুরতে যাওয়া হবে! সঙ্গ এবং সময়ের অভাবে বেলপাহাড়ী সিল্করুট আপাতত বন্ধ! কিন্তু ১৪ ই জানুয়ারির কর্ণগড় ভ্রমণকে একটা কনভারশেসন কল মারফৎ এগিয়ে আনতে হলো! পার্টনার? – সেই বছর দুয়েক আগে যে দুজন জুটেছিল। সৌমেন আর ইমতিয়াজ।

 

dS photography20171230_060449
প্রবেশমুখ থেকে…

 

dS photography20171230_060600
দণ্ডেশ্বর ও খড়্গেশ্বর জীউ মন্দির, প্রবেশদ্বার থেকে

 

বাসে করে ভাদুতলা, তারপর বাকিটা কর্ণগড় গামী বা শিরোমণিগামী অটোতে চেপেছিলাম মনে নেই, তবে হালকার ওপর ফেন্সি করে ভিড় ছিলো, প্রথমে কোথায় পা রাখবো, তা নিয়ে বেশ ধন্দে ছিলাম। যাই হোক্, অটো চলতে শুরু করতেই বসার জায়গায় ঠিকঠাক সেঁটে গেলাম।

 

দু বছর পর মহামায়া মন্দিরে এসে “জুতো স্ট্যান্ড” চোখে পড়লো! বহু বহু স্ট্যান্ড দেখছি, জুতো স্ট্যান্ড, এই প্রথম!কে জানে, হয়তো শেষ বারও। বছর দুয়েক রংটা এমনই কৃত্রিম ছিল কিনা মনে নেই মন্দিরের, তবে প্রথম যখন এসেছিলাম মন্দিরের রংটার মধ্যে একটা প্রাচীন প্রাচীন গন্ধ ছিল। সে যাই হোক্, দুপুরে খেয়ে দেয়ে বেরিয়েছিলাম, কারণ আমাদের সাফসুতরো লক্ষ্যই ছিল ঘোরা আর ছবি তোলা! ওখানে যখন নামছি ইণ্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম বললো দুটো ১৭। তারপর প্রায় দেড় – দু ঘন্টা জুড়ে দাপাদাপি চললো। ফটো শিকার! মকরে এলে ছবি তোলাটা হয়তো ফিকে হয়ে যেতো কিন্তু সেই মহাপ্রসাদ! সে তো প্রাণ জুড়িয়েদিয়েছিলো, সেটা মিস করলাম, স্বাভাবিক। দু ঘন্টার শেষটা কাটলো ঐ পুকুর পাড়ে, সঙ্গে আগের বারের ট্রিপগুলোর স্মৃতি রোমন্থন! বেশ কেটে গেলো। আসার সময়, অটোচালককে জিগ্গেস করতে জানা গেলো – ‘এতো শুধু মন্দির, যে রাস্তা দিয়ে আমরা আসছি, ঐ রাস্তা দিয়ে মন্দির পেরিয়ে গেলে কর্ণগড় এর বিস্তৃত এলাকা চোখে পড়বে, তবে তেমন কিছুই আর নেই!” সবই অঅন্তঃসারশূন্য। তারপর ঠাহর হলো – হ্যাঁ তো, কর্ণগড়, একটা কেমন যেন সমাসবদ্ধ পদ ঠেকছে! চলো তবে একটু হাতড়ানো শুরু হোক্। শুরু করলাম। ওমনি গুগল ঝপঝপ করে কাঙ্খিত দু’খান লিংক দিয়ে দিলো! পড়ে যা জানলাম, বলার চেষ্টা করছি মাত্র-

 

IMG_20171230_071845
Descending….

 

dS photography20171230_062032
অস্তগামী সূর্যের সামমে

 

কর্ণগড়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। ইন্দ্রকেতু নামে এক রাজা এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে ইন্দ্রকেতুর ছেলে নরেন্দ্রকেতু মনোহরগড় স্থাপন করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। রণবীর সিংহ নামে এক লোধা সর্দারকে রাজ্য শাসনের ভার দেন তিনি। অপুত্রক রণবীর সিংহ অভয়া নামে এক মাঝির ছেলেকে পোষ্যপুত্র করে তাঁর হাতে রাজ্য শাসনের ভার অর্পণ করেন। তারপর বংশপরম্পরায় রাজ্য শাসন চলতে থাকে।

কর্ণগড়ের যাবতীয় আকর্ষণ এই মহামায়া মন্দিরকে কেন্দ্র করে। মন্দিরে মহামায়া ও দণ্ডেশ্বরের বিগ্রহ রয়েছে। উৎকল শিল্পরীতিতে তৈরি মন্দিরটিতে পঞ্চমুণ্ডির আসনও রয়েছে। কর্ণগড়ের নিসর্গও মনোরম। গাছগাছালি, নদী দিয়ে চারদিক ঘেরা। মেদিনীপুর শহর থেকে জায়গাটি খুব বেশি দূরেও নয়। তাই এক সময় এই এলাকাটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, রাস্তা তৈরি হবে, হবে পার্ক। এবার গিয়ে অবশ্য কিছু কেমন প্রস্তুতি চোখে পড়লো। রাস্তা সারাইয়ের কাজও চলছে।

রয়েছে বলতে শুধু মহামায়ার মন্দির। সংরক্ষণের অভাবে বাকি সব হারিয়ে গিয়েছে। বহু খুঁজেও দু-চারটে ইটের বেশি কিছু মিলবে না। চুয়াড় বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত রানি শিরোমণির গড়ের এখন এমনই দশা। গড় অর্থাৎ দুর্গের আর অস্তিত্ব নেই। ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় শেষ অপুত্রক রাজা অজিত সিংহের। তাঁর দুই রানি ছিলেন ভবানী ও শিরোমণি। রানি শিরোমণি ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজনদের এককাট্টা করে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। এই জন্য ইংরেজদের কোপে পড়েন রানি। তাঁকে বন্দিও করা হয়। নাড়াজোলের রাজা আনন্দলাল খানের মধ্যস্থতায় চরম সাজা না হলেও তাঁকে আবাসগড়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

কর্ণগড় ছাড়াও আরও দুটি গড় ছিল রাজবংশের , আবাসগড় ও জামদারগড়। মেদিনীপুর শহরের উত্তরে বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তায় পড়ে। সেখানেও কিছু নিদর্শন মেলে। কিন্তু সময়ের চোরাস্রোতে হারাতে বসেছে সেইসব ইতিহাসের সূত্র। ১৬৯৩ থেকে ১৭১১ সাল প‌র্যন্ত এই গড়ে রাজ করেছিলেন রাজা রাম সিংহ। পরে রানী শিরোমনি এবং নাড়াজোলের রাজা মোহনলাল খাঁ এই গড়ের উন্নয়ন করেছিলেন।

 

মেদিনীপুর শহর থেকে উত্তর দিকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কর্ন রাজবংশের রাজধানী ছিল, তার প্রমাণ আজও মেলে। প্রধান গড় ছিল কর্ণগড়। মেদিনীপুরের প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার ব্যস ধরলে  বিস্তৃত ছিল । এই গড়ের নিজস্ব চরিত্রটি অদ্ভুত। জঙ্গলমহলের জঙ্গলের ভিতর দিয়ে জলস্রোত নদীর আকার ধারণ করে  ‌যেখান দিয়ে বয়ে ‌যেত সেটি গড়ের অন্দরমহল। নদীটি খুবই ছোট, নাম পারাং। গড়ের দু দিক দিয়ে নদীটি প্রবাহিত হয়ে একসঙ্গে মিলিত হত পারাং নদী। অনেকটাই পরিখার মতো। এই গড়ের মধ্যেই ছিল, কুল দেবতাদের মন্দির অধিদেবতা দণ্ডেশ্বর এবং অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভগবতী মহামায়া।

তবে মহামায়ার মন্দিরটি এখনও অটুট রয়েছে যেখানে বসে কবি রামেশ্বর ভট্টাচার্য সাধনা করতেন। প্রচলিত রয়েছে, এখানে বসেই রামেশ্বর শিবায়ন কাব্য রচনা করেছিলেন। রামেশ্বরের কাব্যে কর্ণগড়ের উল্লেখও রয়েছে
‘যশোবন্ত সিংহ/ সর্বগুণযুত/ শ্রীযুত অজিত সিংহের তাত। মেদিনীপুরাধিপতি/ কর্ণগড়ে অবস্থিতি/ ভগবতী যাহার সাক্ষাৎ।’

তবে রাণী শিরোমণি স্মরণে মেদিনীপুর শহরেই গেস্ট হাউস আছে, এমনকি ভারতীয় রেল রাণী শিরোমনির স্মৃতির উদ্দেশ্যে আদ্রা-হাওড়া প্যাসেঞ্জার ট্রেনও চালু করেছে! গেস্ট হাউসের কথা কেউ মনে রাখতে না পারলে এই ট্রেনটির কথা তো অনেকেই জানেন!

 

 

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য কর্ণগড় একদিনের ট্রিপ হিসেবে দারুণ! যতবার যাই, অনেক অনেক ছবি কুড়িয়ে আনি আর মনটা বেশ ভালো হয়ে যায়, উৎসবের সময় না গেলে ওখানের নিরিবিলি প্রকৃতির শোভা বেমালুম উপলব্ধি করা যায়, আর মকরে গেলে তো পায়েসসহ উত্তম প্রসাদ খাওয়ার সুযোগ রইলই!

dS photography20171230_062355
ঘরের মধ্যে ঘর
IMG_20171229_155020
ফ্রেম-এ-ক্যামেরা

 

পথনির্দেশিকা:: মেদিনীপুর/খড়গপুর থেকে বাঁকুড়া রোড ধরে ভাদুতলা, তারপর আর বলতে লাগবে কি! অটোওয়ালারা উপস্থিত মহামায়ার অধিষ্ঠানে হাজির করানোর জন্য।

তথ্যসূত্র::
 আনন্দবাজার পত্রিকা
 (http://archives.anandabazar.com/archive/1140102/2med4.html)

 

DSC_0654
চলো এবার, ফেরার পালা….

মহিষাদল, মনে থাকবেই

IMG_20171213_133632
‘মহিষাদল রাজবাড়ি’ প্যানোরমাতে

ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি,
চিল্কিগড় রাজাবাড়ি — এই দুটো দেখার পর পরই মহিষাদল রাজবাড়ি নিজে থেকেই ডেস্টিনেশনের লিস্টে জায়গা করে নেয়, বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সেই সুযোগ হয়ে উঠছিল না, মেদিনীপুর শহর থেকে খানিকটা দূর বলেই হয়তো!
সুযোগ এলো কেমন করে সেটা বলা যাক্। বি এড এর পরীক্ষা পড়েছিলো, আমার কলেজ থেকে প্রায় শ’কিলোমিটার দূরে! কি কারণে এতো দূরে পরীক্ষা, তা জানিনা, বা জানাতে অপারগ। সত্যি বলতে,কারণটা বললে রীতিমতো গুগল ম্যাপের প্রয়োগ নিয়ে গাদাগুচ্ছেক প্রশ্ন উঠে আসবে! যাই হোক, মোটামুটি সাতদিনের পরীক্ষার মাঝে, পর পর পাঁচদিনের একটা টেস্ট ম্যাচের মতো চললো পরীক্ষা, মাঝে একদিন গ্যাপ। ব্যস্, কেল্লাফতে! আর কে আটকায়? তার ওপর তালে তাল মিলিয়ে ঘুরতে যাওয়ার লোক! শুধু টোপ্ ফেললেই হলো, গিলে নেওয়ার জন্যে রেডি পুরো। শীতকালীন বৃষ্টির সাইলেন্ট কিলিং মূর্তিকে উপেক্ষা করেই বেরিয়ে পড়লাম। আসলে আগে থেকে মনে মনে ঠিক করেই রেখেছিলাম, আর প্ল্যানটা একশো শতাংশ কাজে লাগায় হেব্বি খুশি, তাও আবার একখান VVS দিনে!

IMG_20171210_140649
‘শহীদ স্তম্ভ’

বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করে যেতে হলো, মহিষাদল। ডিসেম্বরের একটা সকালে বৃষ্টিবিঘ্নিত ওয়েদার। শয়টার যেনো রেনকোর্টের কাজ করে দিলো। মহিষাদল পুরোনো বাসস্টপেজ এ নামলাম। টোটো ধরে নিলাম অনায়াসে, বাজারের মধ্য দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর ডানহাতি “শহীদ স্তম্ভ” (মহিষাদলের প্রতীক বলা চলে, গুগল করলেই এই বিষয়টা সহজেই মেলে) পেরিয়ে সোজা গেলেই রাজ রাজাদের ব্যাপার স্যাপার শুরু। একটা স্কুল পড়লো, বোধ হয়, রাজাদেরই স্থাপিত। ওটা ধরে সোজা এগিয়ে গিয়ে, যেখানে পৌঁছলাম, সেটা ফুলবাগ রাজবাড়ি। প্রবেশ মূল্য নিলো। ১০ টঙ্কা, মাথাপিছু। সানন্দে বিচরণ শুরু হলো কিন্তু কিছু প্রশ্নের জাবর কাটা শুরু। টাকা তো আগের কোনো রাজবাড়িতে প্রবেশের জন্য নেয়নি। তাহলে এখানে নিলো কেন?

*টিকিট কাউন্টার এবং টিকিট, zoom করলেই উত্তর মিলবে কিছু প্রশ্নের

——————

ঢুকতেই উত্তর মিলল। আসলে মহিষাদল রাজবাড়ির এই ফুলবাগ সংস্করণটি সংরক্ষিত! সংগ্রগশালা, অতঃএব কিছু মানি তো খসাতে হবেই। প্রথমে রাজ দরবারে ঢুকতেই বংশধরদের যতকিঞ্চিৎ পরিচিতি, সঙ্গে ব্যবহার্য প্রসাধন সামগ্রীর পরিচিতি, তাদের বিভিন্ন সময়ের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে সখ্যতার চিত্র নিদর্শন পেলাম। একটা জিনিস চোখে পড়ার মতো, অবিভক্ত মেদিনীপুর এর সংস্কৃতি ও শিল্পকলায় মহিষাদল রাজবাটীর অবদান। যেখানে রাজ পরিবারের সদস্য সংস্কৃতি জগতের নামকরা ব্যক্তিত্ব, সেখানে প্রজাদের ওপর তো তার বিন্দুমাত্র হলেও প্রভাব পড়বে! ১০ টাকা টিকিটের বিনিময়ে শুধুমাত্র একটি তলাতেই ঘোরাঘুরি আর ফটো তোলার সুযোগ মিলবে। দ্বিতীয় তলে অবশ্য দুটোর কোন একটি সুযোগও মিলবে না। রাজ দরবার ঘোরার পর, যখন রাজ পরিবারের সদস্যদের করা বহু পরিশ্রমের বিখ্যাতসব শিকার সংরক্ষণের কক্ষে প্রবেশ করলাম, ছবি তোলা নিষেধ। অতএব, তেনারা কি কি শিকার করেছেন, তা আর দেখানো সম্ভব হলো না (তবে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করায় দু একবার বকা খেতেও হলো)!একটা আস্ত এবং সত্যিকারের ঈগল না শকুন দেখলাম,ঠিক খেয়াল নেই তবে প্রমাণ সাইজের। অসংখ্য ব্যাঘ্রের প্রতিমূর্তি দেখে সন্দেহ হতেই গাইডকে জিগ্গেস করতেই বলে দিলেন – এখানে শুধু বডি আর চোখ ছাড়া সবই আসল। তারপর দেখলামও একটা বাঘের চোয়ালসমেত দাঁত। কারো কারো ছাল, মস্তক ইত্যাদি। রাজপরিবারের সদস্যরা যে শিকারে অতিশয় আগ্রহী এবং পারদর্শী ছিলেন তা বলাই বাহুল্য। অস্ত্র কক্ষে ঢুকে অস্ত্র এবং বিনোদনের বিভিন্ন সরঞ্জাম চোখে পড়লো। গাইডের শকুনে নজর টপকে দু একটা অত্যাবশ্যক ক্লিক করেই ফেললাম। এরপর বিশ্রাম কক্ষের আভিজাত্য দেখলাম স্বচক্ষে, খেলার রুমে বিলিয়ার্ডস বোর্ড দেখলাম,বেশ বড়ো! না তারপরেই মালুম হলো জিন্দেগী তে এই প্রথম দেখছি, তার আবার বড়ো ছোট কেমন করে জানবো!

IMG_20171210_123320_HDR
খিড়কি?
IMG_20171210_124135
ঢাল-তরোয়াল
IMG_20171210_130648
রাজকীয় পালকি:: ফুলবাগ রাজদুয়ার থেকে
IMG_20171210_125847
Royal শোপিস

ভারতীয় মার্গসঙ্গীত জগতের মানুষজন এখানে এসে নিয়মিত সঙ্গীতচর্চা করতেন বিশ শতক জুড়ে। ফৈয়জ খাঁ থেকে শুরু করে বড়ে গোলাম আলি, কুমার মুখার্জি, কণ্ঠে মহারাজের মতো বিখ্যাত মানুষজনের ব্যবহৃত তানপুরা, তবলা, হারমোনিয়াম সংরক্ষিত রয়েছে এখানে।
গ্রন্থাগারটাও মন্দ ছিলো না, সব কিছুতেই একটা বেশ রাজকীয় ব্যাপার ছিলো। রাজবাড়ি চত্বরে কপোত-কপোতীর দেখাও মিললো, হবে নাই বা কেন! সামনেই যে কলেজ। তবে সবকিছুর মধ্যেও কি যেনো একটা মিসিং লাগছিলো। রাজবাড়ি টা সংরক্ষিত হওয়ার কারণে একটু বেশি সাজানো গোছানো বলেই হয়তো একটু খারাপ লাগছিলো বটে,কিন্তু রাজবাড়ি চত্বরে পুরো দুটি ঘন্টার চক্কর এবং ছবি তুলে পুরো ১০ টাকায় উশুল। এর মাঝেই গাইডের থেকে প্রাপ্ত কিছু তথ্য আর রাজবাড়ির দেওয়ালে টাঙানো ইতিহাস থেকে যেটুকু পেলাম, বলার চেষ্টা করছি-

IMG_20171213_144713
ফুলবাগ রাজবাড়ি, যা বর্তমানে সংগ্রহশালা
IMG_20171213_144753
মহিষাদল রাজবাড়ি :: দূর থেকে

*****************************

 মহিষাদল রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠা 

রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জনার্দন উপাধ্যায় । মোগল সম্রাট আকবরের অধীন সেনাবাহিনীর উচ্চপদে কাজ করতেন তিনি। ষষ্ঠদশ শতকে উত্তরপ্রদেশ থেকে জনার্দন উপাধ্যায় ব্যবসার জন্য নদীপথে মহিষাদলের উপকণ্ঠে গেঁওখালিতে আসেন। সে সময় এলাকার রাজা ছিলেন কল্যাণ রায়চৌধুরী। রাজধানী ছিল গড়গুমাই। কল্যাণ রায়চৌধুরির থেকে মহিষাদলের স্বত্ব কিনে তিনি নতুন রাজা হন। আসলে নবাব সরকারের রাজত্ব দিতে ননা পারায় ঐ রাজার রাজত্ব নিলাম হয়ে যায়। আর সুযোগ হাতছাড়া করেননি জনার্দন উপাধ্যায়। বৈরাম খাঁর নামাঙ্কিত তরবারিও উপহার পান সম্রাট আকবরের থেকে। জনার্দন উপাধ্যায়ের পঞ্চম পুরুষ রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়ের পুত্র সন্তান ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর রানী জানকী রাজত্বের দায়িত্ব নেন। এরপর তার জামাতা ছক্কনপ্রসাদ গর্গের ছেলে গুরুপ্রসাদ গর্গ রাজা হন। সেই থেকে মহিষাদলে গর্গদের রাজত্ব। এরপর গুরুপ্রসাদ গর্গ এর দ্বিতীয় পুরুষ রাজা রামনাথ গর্গ নিঃসন্তান হওয়ায় রাজত্ব লাভ করেন দত্তক পুত্র লছমনপ্রসাদ গর্গ। সেই থেকে রাজা লছমন প্রসাদ গর্গের উত্তরপুরুষ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্ত রাজাসানে আসীন ছিলেন।

*রাজবাড়ির দেওয়ালে টাঙানো তথ্য থেকে

এই রাজ পরিবারের রাজারা তিন তিনটে রাজবাড়ি নির্মাণ করেন। পুরোটা অবলুপ্ত, চোখে পড়েনি।
এখন পুরানো নিদর্শন বলতে মহিষাদলে রাজাদের দু’টি রাজবাড়ি রয়েছে। একটি হচ্ছে রঙ্গিবসান রাজবাড়ি। যা আনুমানিক ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি হয়েছিল। অন্যটি ফুলবাগ রাজবাড়ি যা আনুমানিক ১৯৩৪ সালে তৈরি হয়। তা ছাড়াও রাজবাড়ি চত্বরে গোপাল জিউর মন্দির ও রামবাগে রামজীউর মন্দির রয়েছে। রঙ্গিবসান রাজবাড়িতে এখনও রাজ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত কিছু লোকজন বসবাস করেন কি না জানিনা, তবে কিছুলোকজনদের চোখে পড়লো। ঐ রাজবাড়ি যেতে গিয়ে সংস্কৃতির একটা মেলবন্ধনও দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারলো না, একটা পুকুরের এক পারে পীরের আস্তানা, অন্য পারে মন্দির।
নতুন বা বলা ভালো ফুলবাগ রাজবাড়িটির নীচের তলটি সংগ্রহশালা আর উপরের তলে প্রবেশাধিকার নেই সাধারনের। রাজবাড়ি আর সংলগ্ন দর্শনীয় স্থানগুলো দেখলেই বোঝা যায়, রাজারা শিক্ষা-সংস্কৃতিতে প্রজাদের উৎসাহ দিতেন। মহিষাদল রাজ কলেজ থেকে শুরু করে রাজ হাইস্কুল-সহ নানা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন তাঁরা। শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে উন্নয়ন— সব কিছুতেই মহিষাদল রাজবাড়ি অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। মহিষাদলের বিখ্যাত এবং সুপ্রাচীন রথের কথা সর্বজনবিদিত, কথিত আছে রাজপরিবারের সদস্যদের কেউ প্রতিবার রথের দড়িতে টান দিয়েই রথযাত্রা শুরু করেন! সে বিষয়টি অবশ্য কথন বলেই এড়িয়ে গেলেন গাইড ভদ্রলোক।
মোটামুটি সব মিলিয়ে দু-তিন ঘন্টা এদিন ওদিক করে কাটানো যেতেই পারে, সাথে আবার ফটো তোলার বাতিক থাকলে তো হয়েই গেল।

IMG_20171212_212844
রঙ্গিবসান রাজবাড়ি, বাইরে থেকে
IMG_20171212_215228
রঙ্গিবসান রাজবাড়ি
IMG_20171212_215906
শরীফ দরগা আর পাম গাছের সারি : রঙ্গিবসান রাজবাড়ি চত্বরের
IMG_20171210_134713_HDR
শান্ত দরগা
PANO_20171210_134827
একদিকে দরগা, অন্যদিকে মন্দির :: ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষুদ্র সংস্করণ বললে ভুল হবে কি?
IMG_20171210_135046
দরগা শরীফ এর উল্টোধারে, যদিও এটা কিসের মন্দির, জানিনা, ভেতরে প্রবেশ করিনি
IMG_20171210_125810
কভার ছবি হতেই পারে। আইডিয়া – মধুর
IMG_20171210_125901
দেওয়াল যখন গল্প বলে
IMG_20171210_125931
রাজকীয় ডাইনিং

————————————————-

পথনির্দেশিকা

কোন ভাবে মেছেদা স্টেশন, সেখান থেকে ডিরেক্ট মহিষাদল বাস। নতুন বা পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, যেখানে খুশি নামলেই অগুন্তি জীবন্ত জিপিএস এর সাহায্যে অনায়াসে পৌঁছে যাবেন রাজবাটী।

তবে শুধুমাত্র মহিষাদল রাজবাড়ি ও সংলগ্ন দর্শনীয় স্থানের অভিপ্রায় নিয়ে ঘুরতে আসলে ভ্রমণপিয়াসী লোকজনের পিপাসা না মিটতেও পারে।  চিন্তা নেই, অদূরেই গেঁওখালি আছে, হুম, সেই গেঁওখালি, যেখানে দামোদর-রূপনারায়ণ-গঙ্গা মিশেছে, যেখানে জনার্দন উপাধ্যায় এসে ভিড়েছিলেন বেশ কিছু শতাব্দী পূর্বে, আর সাক্ষর রেখেগেছিলেন মহিষাদলে…..

এবং আমরা

তথ্যসূত্র::
১. আনন্দবাজার পত্রিকা http://www.anandabazar.com/district/midnapore/আজক-র-মহ-ষ-দল-ছ-ল-সম-দ-রগর-ভ-1.105010

২. ওখানকার গাইড (নাম জানা হয়নি)

#dS

#MahishadalRajPalace

© শুভঙ্কর দত্ত ||  December 13, 2017