ঘুরে এলাম কুড়ুমবেড়া-মোগলমারি-শরশঙ্কা…

বহুদিনের ইচ্ছে কুড়ুমবেড়া যাবো…
সেই কবে ফেসবুকে জনৈক ভবঘুরের পোস্ট দেখেছিলাম৷। সেই কত্ত দিনের প্ল্যান একটা। আগে দু’বার ব্যর্থ হয়েছে। তার মধ্যে একবার বুলবুল এর জন্য। শেষমেশ যাওয়া হলো…. তাও কুড়ুমবেড়া শুধু নয়, সাথে মোগলমারি বৌদ্ধবিহার হয়ে শরশঙ্কা দীঘি — এক্কেবারে কম্বো প্যাকেজ যাকে বলে….! সৌমেন তো থাকই, এবার সুুুুুরজিৎও সামিল হলো….!

কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু…

 

IMG20191113105514-01
বহিরাবরণ

এবার কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু করা যাক্…! বেলদা থেকে কেশিয়াড়ী যাওয়ার বাসে করে ১০ কিমিরও কম দূরত্বে কুকাই, সেখান থেকে সদ্য বাঁধানো পথে টোটোই করে গগণেশ্বর গ্রাম…..! বটতলায় এসে থামলো… একদিকে বিস্তীর্ণ পুকুর আর তারই উল্টো দিকে ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলা প্রায় সাতশো বছরের পুরনো এই দুর্গ।ইংরেজরা জেলার গেজেটিয়ার রচনার সময়ও এটিকে দুর্গ বলেই উল্লেখ করেছে।

IMG20191113110357-02
করমবেরা….
IMG_20191114_123357-01
গুগল ম্যাপে স্যাটেলাইট ভার্সান কি? কারুকাজ বটে…

নামের বিভিন্নতায় ‘র’ আর ‘ড়’ এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিলো। ও বাবা, ভেতরো ঢুকে দেখি লেখা আছে আর একরকম- ‘করমবেড়া’!
যাই হোক্, নাম যাই হোক্, এবার একটু ইতিহাস কি বলছে, সেখানে তাকানো যাক্! আর এক গোলমাল! ইতিহাস এমনিতেই বিতর্কিত এবং এই জায়গাটির ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি “নানা মুণির নানা মত” একদম সাড়ম্বরে প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও সেদিকে যাচ্ছি না।

 

একটু ইতিহাস…

১৪৩৮ থেকে ১৪৭০ সালের মধ্যে ওড়িশার রাজা কপিলেন্দ্রদেবের আমলে নির্মিত হয় এই দুর্গ। গজপতি বংশের রাজা কপিলেন্দ্রদেবের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল বর্তমান হুগলি জেলার দক্ষিণ অংশ মান্দারণ থেকে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ পর্যন্ত। অবশ্য মান্দারণ আমার বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই। বারবার গেলেও এটা একদমই অজানা ছিলো। ঝামা বা ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে আদতে একটি শিবমন্দিরই তৈরি হয়েছিল এখানে।

IMG20191113111227-01
প্যানোরমা তে কুড়ুমবেড়া
IMG20191113114133-01
শৈলী…মাকড়া পাথর

প্রথমে আফগান সুলতানরা (পড়ুন দাউদ খাঁ) দখল করেন এ দুর্গ। অতঃপর ঔরঙ্গজেবের আমলে আফগানরা পরাজিত হলে মোগল সম্রাটের হাতে আসে সে দুর্গ। বাংলা এবং উড়িষ্যার বহু মন্দির মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর ফরমান আসে, বাদ যায়নি এই দুর্গের ভেতরকার মন্দিরটিও, একেবারে দুর্গের ভেতরের মাঝে জলাধারের মতো যে ভাঙা অংশটি রয়েছে (যাকে যজ্ঞবেদীও বলা হচ্ছে), দেখলে বোঝা যায়, সেটি কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যদিও ভিন্নমত। তবে তিন গম্বুজের ঐ স্থাপত্যখানি যে মসজিদ সেটাও আন্দাজ করা খানিক সহজই।

IMG20191113111337-01
দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ
IMG20191113115750-02
কিছু নবীন…

তাহের খানের অধীনে সেনাদের আশ্রয় শিবির হয়ে ওঠে কুড়ুমবেড়া। সেই থেকে মন্দির বদলে যায় দুর্গে। ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা যোগেশচন্দ্র বসু লিখেছেন, “…মন্দির গাত্রে উড়িয়া ভাষায় লিখিত যে প্রস্তর ফলকখানি আছে, তাহার প্রায় সকল অক্ষরই ক্ষয় হইয়া গিয়াছে, কেবল দু’একটি স্থান অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট আছে, উহা হইতে ‘বুধবার’ ও ‘মহাদেবঙ্কর মন্দির’ এই দুইটি কথা মাত্র পাওয়া যায়।” (বই খানি আমি পড়িনি যদিও)।

IMG20191113105731-01
প্রাচীন…

পরে এই দুর্গে মারাঠারাও ঘাঁটি তৈরি করেছিল বলে মনে করা হয়। বেশ কয়েকজন গবেষক সে কথা জানিয়েছেনও। লিখেছেন। তবে এটিকে ঠিক দুর্গ বলা যায় কি? কোনো অস্ত্র ভাণ্ডার নেই, লুকিয়ে থাকার গোপন কুঠুরি নেই, বিপদ-আপদে-আক্রমণে হুট করে পলায়ন করার জন্য বাইরে বেরোনোর রাস্তা কোথায়? সবথেকে বড়ো কথা ওয়াচটাওয়ার নেই। বরং এটি একটি উৎকল স্থাপত্যেরই নির্দেশক, মানে এর গঠন শৈলী। যারা বহু বার পুরী গিয়ে তা করায়ত্ত করতে পারেননি, তাদের প্রতি সমবেদনা।
মাকড়া পাথরে তৈরী অপূর্ব এই সৌধের প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকে রয়েছে তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদ। একদা জেলা গেজেটিয়ারে লেখা হয়েছিল, সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জনৈক মহম্মদ তাহির এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯৯০ সালে কুড়ুমবেড়া অধিগ্রহণ করেছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া।

IMG20191113114533-01
পরিখা থেকে….
IMG20191113111702-01
তিন গম্বুজের মসজিদ
IMG20191113114707-01
মধ্যমণি বিলীন…মসজিদই তাই কেন্দ্র
IMG20191113120751
কারসাজি… ট্রিপল ক্যামেরা 😂

তবে দেখে ভালো লাগলো যে রক্ষণাবেক্ষণ হয়, রেলিং দিয়ে দুর্গ মধ্যস্থ এলাকাগুলিতে এখন বোধহয় আর ঢোকা যায় না। শোভাবর্ধক গাছ লাগানো আছে, রলিং ঘেঁষে। একজন লোককেও দেখলাম, জল দিতে।

দুর্গটির ভেতর এবং বাহির — দারুণ লেগেছে। প্রাকৃতিক বড্ড বেশিই। পরিধি বরাবর হাঁটতে থাকলে মাঝে মাঝে পা হড়কে যায়, শ্যাওলার দল জমি অধিগ্রহণ করেছে যে। পুরো দুর্গটা চক্কর দিতে বেশ সময়ও লাগে….বেশ ঠাণ্ডাও অনুভূত হয়, শ্যুটিং স্পট হিসেবে মন্দ নয়। ভাবতেই অবকা লাগে পুরোটা পাথর কেটে বানানো… অথচ এখনও অটুট,যদিও কিছু পিলার নতুন করে বানানো। যে কোনো একটা কর্ণারে গিয়ে ক্যামেরা তাক করলেই একটা একটা করে লকস্ক্রিন করার ফটো বেরিয়ে আসবে….! সঙ্গে থাকলো – রবিকিরণ, প্রায় সব সময়ই দারুণ দারুণ সব ফ্রেম উপহার দিয়ে দিলো সে।

 

IMG20191113113449-01
সাতরঙা ফ্রেম…
IMG20191113120139-01
প্রাকৃতিক ভাজক…

বাইরে থেকে বহু চেষ্টা করেও… ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, পুকুরপাড় সবকিছুর ইস্তেমাল করেও পুরোটা এলো না। বটগাছের ঝুরির ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে দুর্গ, — তার ভেতর আর বাহির যেন একে অন্যের পরিপূরক৷

IMG20191113122251-01
মৎস্য সন্ধানে… সামনের পুষ্করিণীতে
IMG20191113113004_01-01
প্রতিভাত রবি

—————————————————————-

এবারে মোগলমারি…

IMG20191113144743
কদম কদম বড়ায়ে যা..

বেলদায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে চলে এলাম মনোহরপুর। গুগল ম্যাপে ভুলভাল এবং একাধিক অবস্থানের কারণে প্রথমে হেঁটে বিপথগামী হচ্ছিলাম, সহায় হলেন একজন বৌদিস্থানীয় ভদ্রমহিলা। পরে বুঝলাম একটা পথ নির্দেশক বোর্ডকে আমরা অবহেলা করেছি৷ ব্যাক গিয়ার মেরে হেঁটে প্রায় হাফ কিমি যেতেই গ্রাম্য রাস্তার একপাশে পড়লো – মোগলমারির বৌদ্ধবিহার। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সুন্দর নয়, অর্থ সাহায্যের অভাবে অবহেলিত এবং সুসজ্জিত নয় বটে, তবে তার ইতিহাস রীতিমতো গাম্ভীর্য বহন করে। প্রায় ১৫০০ বছরের ইতিহাস এই মোগলমারি৷ ওখানের এক বিবরণ বোর্ডে দেখলাম লেখা আছে এটি গুপ্তোত্তর যুগের একটি স্থাপত্য!

IMG20191113135851-01
মোগলমারি বৌদ্ধবিহারের প্রবেশপথ
IMG20191113140359-01
খননস্থল

‘মোগলাই’ খেতে গিয়ে প্রথমবার যেমন মনে হয়েছিল বেশ একটা ঐতিহাসিক ফাস্ট ফুড খাচ্ছি, সেরকম ‘মোগলমারি’র নামকরণের কারণ খুঁজতেই অবধারিতভাবেই চলে এলো — মোগলাই থুড়ি মোগল…মুঘল।
কেউ বলেন মুঘল-পাঠান যুদ্ধে অনেক মুঘল সৈন্য মারা গিয়েছিল বলে জায়গাটির নাম মোগলমারি। কেউ বলেন মুঘলরা এই পথ (‘মাড়’ অর্থ পথ) মাড়িয়ে গিয়েছিল; তাই অমন নাম। পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত সুবর্ণরেখা…সে বিহার নেই, নেই সুবর্ণরেখাও, মন খারাপ করেই সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, প্রায় দু-তিনি কিমি দূরে…..
সামন্তরাজা বিক্রমকেশরীর রাজধানী ছিল এ অঞ্চল। কন্যা সখীসেনার পড়াশোনার জন্য জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছিল।

IMG20191113142914-01
মিউজিয়াম @ মোগলমারি
IMG20191113142759
অবহেলিত মিউজিয়াম

চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বিবরণীতেও এই বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ রয়েছে।
২০০৩-০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষক ডঃ অশোক দত্তের তত্ত্বাবধানে খননকার্য প্রথম শুরু হয়, যদিও তার আগে ময়ূরভঞ্জ (অধুনা ওড়িশা) এর আর্কিওলজিকাল সার্ভেতে এর কথা উল্লেখ আছে, হয়তো সেটিই সূত্র হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে অদূরে যেই কুড়ুমবেড়ার গল্প এতক্ষণ করলাম, সেখানে আফগান সুলতান দখল নেওয়ার সময় এই মোগলমারির সেনা ছাউনি থেকেই ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি তাকে আক্রমণ করেন, পরে ঔরঙ্গজেবের মুদ্রার হদিশ মেলে এখানে।
পশ্চিমবঙ্গে আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারগুলির মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়। খননে পাওয়া গেছে প্রায় ৫২ ধরণের নকশাযুক্ত ইঁট, রাজা সমাচার দেবের মিশ্রধাতুর মুদ্রা, স্বর্ণ লকেট এবং মুকুট, বুদ্ধ-বোধিসত্ত্ব-বৌদ্ধ দেবদেবীর ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, স্টাকোর কারুকার্য মণ্ডিত নক্সাযুক্ত দেওয়ালঅলংকরণ ও ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র, প্রদীপ প্রভৃতি জিনিস। গুপ্ত পরবর্তী ব্রাহ্মি অক্ষর যুক্ত সীল ও সীলমোহরও আবিষ্কৃত হয়েছে এইখানে। বর্তমানে খননকার্য স্থগিত আছে, মিউজিয়ামের ওখানের একজন দাদা বললেন এখন আর খননের পারমিশন নেই।

IMG20191113142349
প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শনবাহী…
IMG20191113143056-01
মাটি খুঁড়ে পাওয়া স্টাকো মূর্তির কতিপয় এখনো বিরাজমান

বেশিরভাগই এখানে এখন আর নেই। কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে পাশে একটা ছোট্ট মিউজিয়াম আছে যাতে খননে প্রাপ্ত কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় তরুণ সংঘের উদ্যোগে সে মিউজিয়াম দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছেছি, তখন চাবি লাগানো দেখে ফোন করলাম, একজন খানিক পরে এসেই খুলে দিলেন। একটু একটু গল্প বললেন। মিউজিয়ামটির হাল ফেরাতে এবং সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার জন্যে ওনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁবু খাটানোর মতো একটা জায়গায় গিয়ে দেখলাম কতগুলো আরো মূর্তি৷ মিউজিয়ামের ভেতরে শুধুই খুচরো কতগুলো জিনিসপত্র আছে। বাকি সবই সরকারের অধীনে, কলকাতার জাদুঘরে।
খননকার্যে পাওয়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অবাক করে তথ্য হলো – এখানে একদিনে, একই স্থান থেকে একই সঙ্গে ৯৫ টি ব্রোঞ্জ মূর্তি উদ্ধার পৃথিবীর প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এক বিরলতম নজির। পণ্ডিতগণের মতানুসারে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতে অবস্থিত প্রাচীন এবং বৃহৎ বৌদ্ধ স্থাপত্যগুলির মধ্যে অন্যতম।

IMG20191113142107
এখন সবই যাদুঘরে
IMG20191113143437
পর্যটকদের সাত্ত্বনাদায়ক জায়গাটি

ভারতবর্ষের মাটিতেই পথচলা শুরু হয় হিন্দু – জৈন- বৌদ্ধ ধর্মের। কালক্রমে সব ধর্মের চড়াই-উতরাই হয়েছে। সেই ষষ্ঠ শতক থেকে বারংবার পুনর্নির্মাণের মধ্যে দিয়ে সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে এই মোগলমারি৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের অখ্যাত এক গ্রামের পথের পাশে….. ক’জনই বা আর বুঝবে এর গুরুত্ব? বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে!
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তাই দেখে আসা উচিৎ, এই জন্য যে আমাদের অবহলোর দরুণ কত জানা জিনিসও আমাদের কাছে অজানা হয়েই রয়ে যায়।

পথনির্দেশ – বেলদা থেকে দাঁতনগামী বাসে মনোহরপুর বা ট্রেনে খড়গপুর থেকে ট্রেনে করে নেকুড়সেনি থেকে অনতিদূরেই….

 

————————————————————-

অপরাহ্নের  শরশঙ্কা দীঘি….

IMG20191113160631-01
যে দিকে দুচোখ যায়..

মোগলমারি পর্ব চুকিয়ে বাসে উঠেছি, সরাইবাজার (দাঁতন) যাবো। সুরজিৎ এর বন্ধুর সাথে দেখা, সে জিগ্যেস করলো কোথায় যাবি?
উত্তরে শরশঙ্কা শুনে আশেপাশের বেশ কয়েকজন অবাক হলেন। সে হোক গে…

দাঁতন থেকে একটা ট্রেকারের মাথায় চেপে বসলাম। দুলতে দুলতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু নামবো কোথায়? শরশঙ্কা বলতে ট্রেকারের হেল্পারের পোস্টে থাকা লোকটি বললো – শরশঙ্কাতে ৪ টে স্টপেজ, কোথায় নামবে? বলে দিলাম যেখানে নামলে দীঘিতে সহজে যাওয়া যাবে। এসব বলতেই স্থানীয় এক ভাই সহায় হলেন, তিনিই বলে দিলেন লোকটিকে আমাদের আসলে কোথায় নামলে সুবিধে হবে। নেমে দীঘির পাড়ে গিয়ে দেখি কতগুলো বাঁদর সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে, উঁচু পাড়ে বসে। একটা জিনিস দেখে রীতিমতো অবাক লাগলো….দীঘিতে যাতে কচুরিপানারা ভিড় না জমায় তার জন্য দীঘির পাড়েই চারপাশে আলাদা আলাদা করে ছোটো ছোটো পুকুর কেটে তার মধ্যেই কচুরিপানাকে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। দীঘির এপার থেকে ওপার স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। যেদিক তাকায় শুধু জল আর জল…..ব্যাকগ্রাউণ্ড জুড়ে শুধু সাদা রং! চারদিকের পাড়ে গাছগাছালি….পাখিদের ডাক! কি অপূর্ব বাস্তুতন্ত্র সেখানে বিরাজ করে, বায়োলজির কেউ গেলে আরো ভালো প্রত্যক্ষ করতে পারতো। দীঘির চারদিকে পাড়ে পাড়ে বেশ কিছু মন্দির রয়েছে।

IMG20191113155355-02
একটু জিরো…..
IMG20191113160810-01
ছটা…
IMG20191113160821-01
দূরে দিগন্তে মন্দির….

ওই দীঘির দক্ষিণ পূর্ব কোনে রয়েছে পীর দেওয়ানগঞ্জের মাজার। পৌষ সংক্রান্তির দিন তাঁর কবরে মাটি দিতে আসেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। পৌষ সংক্রান্তির দিন মেলা বসে। সেখানে রয়েছে পান্ডব ঘাট।
মাজারের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য মন্দির।
জগন্নাথের মন্দির, জটেশ্বর শিব ,ঝিঙ্গেশ্বর শিব, রামেশ্বর শিব,কালী ও শীতলা মন্দির।
সে সব জায়গায় যাওয়া আর হলো না। অপরাহ্নের ডাকে ফিরে আসার ট্রেকার ধরার ছিলো যে….!

IMG20191113155822-01
বিলীয়মান সূর্যের আভা

লোকবিশ্বাস

মহাভারতের মূষল পর্বে শ্রীকৃষ্ণ বৃক্ষে আশ্রয় নেওয়াকালীন জরা ব্যাধের শরাঘাতে হাত থেকে পাঞ্চজন্য শঙ্খ ছিটকে পড়ে। তার আঘাতেই এই দীঘির সৃষ্টি বলে লোকবিশ্বাস।

পাণ্ডবরা বিরাটনগরে যাওয়ার পথে ক্লান্ত হয়ে এই দীঘির পাড়ে রাত্রিযাপন ও স্নান করেন। তারই অনুকল্পে দিঘির একটি ঘাটের নাম পাণ্ডব ঘাট। এই সেই পাণ্ডব ঘাট যেখানে মকর সংক্রান্তিতে স্নান করেন পুণ্যার্থীরা।

রাজ‍্যের বৃহত্তম দীঘি এই দীঘি নিয়ে বহুচর্চিত জনশ্রুতিটি হলো এটি নাকি রাজা শশাঙ্কের আমলে বানানো।
সর শব্দের সংস্কৃত ভাষায় ‘জল’।
রাজা শশাঙ্ক মাকে নিয়ে সম্ভবত জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছিলেন পুরীতে। যাচ্ছিলেন বা ফিরছিলেন ,ওই গ্রামে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে তাঁবু ফেলেন তাঁরা। গ্রামবাসীদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হন শশাঙ্কের মা। প্রশ্ন করেন ,এত ভালো জমি থাকা সত্ত্বেও এখানে ভালো ফসল হয়না কেন ? গ্রামবাসীরা বলেন জলের অভাব। জল নেই গ্রামে। শশাঙ্কের মা তখন বাংলার রাজাকে বলেন , এদের জন্য তুই কিছু করতে পারিস না ?
মায়ের কথায় শশাঙ্ক তখন তাঁর তুন থেকে সবচেয়ে বড় তির বের করেন। প্রতিজ্ঞা করেন,তির যত দূর যাবে , তত বড় করা হবে দীঘি। যা বানাতে সময় লেগেছিল তিন বছর।
শশাঙ্কের শর থেকে সৃষ্ট বলেই এরূপ নামকরণ। তবে কোনোটির তেমন ভিত্তি নেই। যদিও এই জনশ্রুতিগুলিই অপূর্ব সুন্দর এবং সুবিশাল এই দীঘিকে মহিমা দান করেছে!

IMG20191113155240-01
গাছের অলিগলি থেকে…

বেশ কিছুক্ষণ দীঘির পাড়ে বিশ্রাম নিয়ে, টাটকা অক্সিজেন নিয়ে উঠে এলাম, ফেরার জন্যে। সূর্যাস্তটা দেখতে পেলে ১৬ আনা পূর্ণ হতো। ভাবিইনি যে এটাও দেখা হবে, বারবার বাস-ট্রেকার এসব করেও, যতই গুগল ম্যাপ বলে চিৎকার করি না কেন, জীবন্ত জিপিএস খুব বেশি কাজে দেয়, এবারেও তার অন্যথা হয়নি।

IMG20191113161137-01
মন্দির….অন্যতম একটি

পথনির্দেশ – খড়গপুর থেকে ট্রেনে দাঁতন, সেখান থেকে হেঁটে উল্টো দিকে এলে ক্রসিং এর কাছেই ট্রেকার মিলবে অথবা সরাইবাজার গিয়েও ট্রেকার ধরা যায়! বাসেও আসা যায়। দাঁতনগামী বাস ধরে সরাইবাজার, বাকিটা আগের মতোই।

IMG20191113113742
তিনমূর্তি 😉

এখানেই সমাপ্ত….

IMG20191113121323-01
উৎসুক চোখে আমাদের টা টা করে @ কুড়ুমবেড়া

তথ্যসূত্র – গুগল, ফেসবুক এবং সংবাদপত্র.. এছাড়াও অনেকেই সাহায্য করেছে পথনির্দেশ দিয়ে সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে! তাছাড়া সুরজিৎ আর সৌমেন এর উপযুক্ত সঙ্গৎ ছাড়া বারবার বাস পাল্টে তিনটে বেশ দূরত্বে থাকা  জায়গা ঘোরা সম্ভব হতো না।

ও হ্যাঁ, সৌমেনের নব আবিষ্কৃত  অ্যাপটির কথা কি করে ভুলে যায়? সদস্য বেড়ে গেলে উত্তম সাহায্য করবে…! Trip Expense Manager 🤘👌

©  শুভঙ্কর দত্ত || November 14, 2019

 

ইতিহাসের সাক্ষী নাড়াজোল রাজবাড়িতে…

PANO_20190908_133810-01
অন্তরগড়ে…. সারিবদ্ধ

ইতিহাস সাবজেক্টটা মোটেও বিরক্তিকর নয়, বরং ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষক বোধ হয় কমই আছেন, অন্তত যারা পাতায় আবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস চাক্ষুষ করবার সুযোগ করে দেন। তারপর, ঘোরার সাথে না জানা হরেক কাহিনী! অবশ্য মজাটা অন্য জায়গায়, পরীক্ষা দিতে হবে না এসবের…. আগ্রহটা বাড়ে, এই আর কি!

এরকমই জাতীয় কংগ্রেস বা পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুপ্তস্থান নিয়ে আলোচনার সময় মেদিনীপুর এর বিশেষ উল্লেখ থাকলে তখনই ইতিহাস চেটেপুটে নিতাম৷ সে সময় চলে গিয়েছে। এখন ব্যস্ততার জীবন, তার মধ্যেই একদিন টুক্ করে বেরিয়ে যাওয়া….
এরকমই একদিন বেরিয়ে পড়লাম ইতিহাস-বিজড়িত নাড়াজোল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে…. মেদিনীপুর – কেশপুর হয়ে পৌঁছে গেলাম দাসপুর – ১ নং ব্লকের কিসমত নাড়াজোলে….

কিসমতই বটে! কেন কিসমত সে বিষয়ে পরে আসা যাক্….

—————————————————————–

১. নাড়াজোল – নাম কেন?

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ‘নাড়া’ অর্থে আমরা যাকে গ্রাম্য ভাষায় লাড়া বলি অর্থাৎ জমিতে ধান কেটে নেওয়ার পর ধান গাছের যে অংশ জমিতে অবশিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকে আর অসমীয় ভাষা ‘জোলা’ এর মানে জল….. নাড়া+জোলা থেকেই নাড়াজোল।

২. নাড়াজোলের প্রথম ঠাঁই

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীরজাফরকে গদিচ্যুত করে ইংরেজরা তার জামাই মিরকাশিমকে নবাব পদে বসান। বিনিময়ে মিরকাশিম ইংরেজদের উপহার দিলেন মেদিনীপুর, বর্ধমান, ও চট্টগ্রামের জমিদারি এবং এর সাথেই মেদিনীপুরের সঙ্গে নাড়াজোলের স্বাধীনসত্তার অবলুপ্তি ঘটে। পূর্বতন মেদিনীপুর জেলার ৫৪ টি পরগনার মধ্যে নাড়াজোল একটি উল্লেখযোগ্য পরগনা হিসেবে পরিচিত ছিল।

৩. ঘোষবাবুর স্বপ্ন বটে…

আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠার পেছনে জনশ্রুতি রয়েছে —  বর্ধমান নিবাসী উদয়নারায়ন শিকারের খোঁজে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং শিকার করতে করতে গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেন। সন্ধ্যালগ্নে তিনি প্রত্যক্ষ করেন এক অলৌকিক দৃশ্য, তিনি একটি স্থানে অসম্ভব রকমের আলোর আভাস প্রত্যক্ষ করেন। রাত্রে শয়নকালে উদয়নারায়ন দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান এবং সেই স্থান থেকেই দেবী জয়দুর্গার সোনার মূর্তি ও প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। সেই জয়দুর্গা আজও রাজবাড়িতে পূজিত হয়ে আসছেন। সেই ধনসম্পদ দিয়েই রাজা এই রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

IMG_20190908_133443
মূল ফটক
IMG_20190908_131002-01
রাজকীয় বাতায়ন
IMG_20190908_132919-01
বিপ্লবের সাক্ষী

৪. ‘ঘোষ’ থেকে ‘খান’, ভায়া ‘রায়’…

প্রতিষ্ঠাতা উদয়নারায়ণের এক উত্তরপুরুষ কার্ত্তিকরাম ঘোষের আমলে তৎকালীন বাংলার অধীশ্বর থেকে ‘রায়’ উপাধী পান। ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে বলবন্ত রায় তদানীন্তন বাংলার নাজিমের কাছ থেকে খান উপাধি লাভ করেন। সেই থেকে নাড়াজোলের জমিদাররা খান পদবি গ্রহণ করেন।

IMG_20190908_125605-02
শুধু আমিষের জন্য
IMG_20190908_131352
এখন স্কুল….রাজকীয় তাই না?

৫. মোহনলাল খান

এই রাজ পরিবারের স্থাপত্য কীর্তিগুলির প্রায় সবই মোহনলাল খানের আমলে স্থাপিত হয়। লংকার অনুকরণে গড় – লংকাগড় তৈরী করেন, প্রায় ষাড়ে ষাট বিঘা জমিতে পুকুর খনন করে তিনি একটি গৃহ নির্মাণ করেন যা বর্তমানে ‘জলহরি’ নামে খ্যাত। যেটা করতে নাকি সেই সময় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিলো।

IMG_20190908_143011
মধ্যমণি

 

IMG_20190908_143354-01
জলহরি

শুধু তাই নয়, মোহনলাল খান রাজবাড়ির ভেতরের গড়ে একটি দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অযোধ্য থেকে পাথর এবং দেবমূর্তি এনে তিনি নাটমন্দির টি স্থাপন করেন। কথিত আছে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একবার ছোটো রবিকে নিয়ে নাড়াজোল আসেন এবং বেলজিয়াম কাঁচ সমৃদ্ধ এই নাটমন্দির তাকে এতোটাই প্রভাবিত করে যে তিনি এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তিনিকেতনে ছাতিমতলার সাধনামঞ্চ তৈরী করেন।

IMG_20190908_133616
রাজকীয় নাটমন্দির
IMG_20190908_133547
প্রবেশদ্বার

৬. উত্তারাধিকার প্রাপ্তি?

মোহনলাল খানের মৃত্যুর পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে নাড়াজোল রাজপরিবারের উত্তারাধিকার প্রাপ্তি অন্তর্কলহের শুরু হয় যা তখনকার দিনে প্রতিটি রাজবংশেই কমবেশি চালু ছিলো। এরপর মনেন্দ্রলাল খান অধিপতি হওয়ার মধ্যে দিয়ে সে সবের ইতি ঘটে। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারত সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি উৎসব উপলক্ষে ইংরেজ সরকার মহেন্দ্রলাল খানকে ‘রাজা’ উপাধি প্রদান করেন। সেই থেকেই….. নামের আগে রাজা আর পরে খান…

৭. স্বদেশী আন্দোলন এবং নরেন্দ্রলাল খান

এরপর নরেন্দ্রলাল খান রাজা হন এবং তিনি মূলত জনকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের তার নাম স্বণাক্ষরে লেখা থাকবে, তার যোগদানের সাথে সাথেই নাড়াজোল রাজবাড়ির পরিচিতি আরো বাড়তে থাকে। নরেন্দ্রলাল খানের সহযোগিতায় এই রাজবাড়িতেই গুপ্ত সমিতির বৈঠক চলতো। হেমচন্দ্র কানুনগো, অরবিন্দ ঘোষ এর মতো বিপ্লবীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তখন মেদিনীপুর কেন্দ্রিক যে স্বদেশী আন্দোলনটা চলতো তার প্রায় পুরোটাই রাজাদের অর্থানুকূল্যে হতো এবং নরেন্দ্রলাল খান সেই দিক থেকে প্রচুর অর্থই ব্যয় করেন।  নরেন্দ্রলালের প্রতি ইংরেজ সরকারের দৃষ্টি সজাগ ছিল। ১৯০৮ সালের ২৮ শে আগস্ট নরেন্দ্রলালের গোপ প্রাসাদে পুলিশ তল্লাশি চালায় এবং মেদিনীপুর বোমা মামলায় নরেন্দ্রলালকে গ্রেপ্তার করে কনডেমড সেলে রাখা হয়। কিন্তু উপযুক্ত প্রমানের অভাবে নরেন্দ্রলালকে মুক্তি দিতে হয়। নরেন্দ্রলাল খান পরলোকগমন করেন ১৯২১ সালে।

IMG_20190908_131910
গোপন ডেরায়….

৮. দেবেন্দ্রলাল খান…

দেবেন্দ্রলাল খান তার পিতার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এবং পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচনে সরাসরি নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯৩০ সালে ২৬ শে জানুয়ারি তিনি নাড়াজোল রাজবাড়িতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, সেই শুরু হয়, তারপর ১৯৪০ পর্যন্ত সারা মেদিনীপুর জুড়ে তিনি বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়ে গুপ্ত সমিতির সদস্যদের জাগ্রত করেন। এরই ফলস্বরূপ মেদিনীপুরের তিন কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করা হয়, তার মধ্যে বার্জ এর নাম সর্বজনবিদিত৷ ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভপতি হওয়ার পর নেতাজী মেদিনীপুরে আসেন, এবং দেবেন্দ্রলাল খান কে নিয়ে তিনি যে তিনটি সভা করেন তার মধ্যে নাড়াজোল রাজবাড়িতর সভাটি মেদিনীপুরের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ক্ষুদিরাম বসুর বাবা এই রাজবাড়ির তহশিলদার ছিলেন এবং সেই সূত্রে শৈশব থেকেই তার এই রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এইখানে বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা ছিলো, ছিলো বোমা তৈরীর কক্ষ, অস্ত্র রাখার গোপন জায়গা,,শুধু তাই নয়, বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যার প্রধান ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো৷ এছাড়াও বারীণ ঘোষ, উল্লাসকর দত্তের মতো বিপ্লবীদের সব ষড়যন্ত্রের সভা এখানেই সংগঠিত হত।

IMG_20190908_133509
কাছারির মাঠ – নেতাজীর সভাস্থল
IMG_20190908_133500
দুর্গাদালান-শিব মন্দির
IMG_20190908_124503~2
নেতাজী – এখনও অতন্দ্র প্রহরী

৯. গান্ধীজী এবং অন্যান্যরা….

গান্ধীজী এই রাজবাড়িতেই ‘অস্পৃশ্যতা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ১৯২৫ এর দিকে। 

কাজী নজরুল ইসলাম এর পদধূলি পড়েছিল এই রাজবাড়িতে। মোতিলাল নেহেরু থেকে জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইড়ু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পদার্পণে নাড়াজোল পবিত্রভূমিতে পরিণত হয়েছিলো, সে কথা বলাইবাহুল্য।

১০. রানি অঞ্জলি খান….

স্বাধীন ভারতবর্ষের পাঁচ বার বিধায়ক হওয়া রাজপরিবারের সদস্য রানি অঞ্জলি খান নারী শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হন। মেদিনীপুরের গোপ রাজবাড়ি এবং নাড়াজোলের রাজবাড়ি তিনি প্রদান করেন, যা বর্তমানে যথাক্রমে গোপ কলেজ (মহিলা) এবং নাড়াজোল রাজবাড়ি নামে পরিচিত।

IMG_20190908_130546
পূর্বতন নাড়াজোল রাজ কলেজ

 

**************************************

 এরপর থেকেই রাজবাড়ির সাথে সাথে রাজপরিবারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে… ২০০৮ সালে পঃবঃ সরকার হেরিটেজ তকমা দিলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এখন কাজ চলছে যদিও…. এই বছর নেতাজীর জন্মজয়ন্তীর দিনে হাওয়া মহলের সামনেই নেতাজীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে নাড়াজোল গ্রামবাসী এবং প্রশাসনের সহযোগিতায়…! 

এবার নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে কেন কিসমত। যে রাজ বাড়ির দেওয়ালে স্বাধীনতা আন্দোলনের বাঘা বাঘা সব মানুষের নিঃশ্বাস পড়েছে, সেই রাজবাড়ির কিসমত আলাদাই!
ঘোরার জায়গা বলতে রাস্তা দিয়ে ঢুকেই শিব মন্দির, উল্টোদিকে রাসমঞ্চ। তারপর একটু গেলেই পেল্লায় হাওয়া মহল বা নাচ মহল, রাজবাড়ির অন্দরে আমিষ খাওয়া বারণ, তাই এই মহল বানানো, বহুদূর থেকে আসা নর্তকীদের নিয়ে মদ-মাংস সহযোগে ফূর্তিতে মেতে উঠতেন রাজা এবং তার তাঁবেদাররা। এর পেছনেই বাগান আর পবিত্র পুকুরটি কিন্তু সবই এখন সংরক্ষণের অভাব।

IMG_20190908_125818-01
হাওয়া মহলে যেতে হলে…
IMG_20190908_123143
জিরচ্ছে….
IMG_20190908_122234
প্রবীনের কাঁধে নবীন ছোঁয়া
IMG_20190908_124405
হাওয়া মহল
IMG_20190908_124101~2
ফাঁক ফোঁকর..

রাস্তার উল্টোদিকে নাড়াজোল রাজবাড়ি, যেখানে আগে নাড়াজোল রাজ কলেজের ক্লাস চলতো নিয়মিত। কলেজের গেট দিয়ে ঢুকেই যেটা প্রথমে দেখা যায়, সেটা নহবতখানা, এখান থেকেই দিনে তিনবার নহবতের সুর ভেসে যেত রাজবাড়ির অন্দরমহলে সহ গোটা নাড়াজোলের আকাশে বাতাসে। এরপর শিব মন্দির, কাছারি, ভগ্নপ্রায় দুর্গাদালান, সরস্বতী দালান, নবরত্ন মন্দির যেখানে এখন জয়দূর্গা পূজিত হন। পরিয়ে গেলেই আসল রাজবাড়ি। যার অন্দরমহলে ঢুকলেই একটা আলাদা গন্ধ অনুভূত হতে বাধ্য। এই রাজবাড়িতেই আগে কলেজের ক্লাস চলতো৷ রাজবাড়ির ভেতর ঢুকলেই বিপ্লবীদের কক্ষগুলি চোখের সামনে চলে আসে। সারি সারি কক্ষ, যতই যাওয়া যায় আর পুরো রাজবাড়িটাই পরিখা দিয়ে ঘেরা। যেটা ভালো করে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। রাজবাড়ির ছাদে ওঠা হলো না। এই আক্ষপে নিয়েই ফিরতে হলো। ফেরার পথে দুপুরের আহার সেরে মাত্র দু কিমি চরণবাবুর ট্যাক্সি চেপে চলে এলাম – লংকাগড়, জলহরি৷ গোটা ভ্রমণের এই জলহরিই ছিলো একটা অমোঘ টান। কি অসাধারণ টেকনোলজি দিয়ে তৈরী হয়েছিলো জানিনা, বেশ বড়োসড়ো একটা পুকুরের মাঝে একটা গড়। পুকুরের চার ধারে না হলেও তিন ধারেই লোকজন বেশ আয়েস করে ছিপ ফেলছে, মাছ পড়ছেও….. ইতিউতি ঘোরার পর বাস ধরলাম….. এবার ইতিহাসের গলি থেকে বিদায়ের পালা! গন্তব্য – সেই মেদিনীপুর!

IMG_20190908_134830
শিবের ৯ রূপ
IMG_20190908_134858
রাসমঞ্চ
IMG_20190908_130134
পেল্লায়….
IMG_20190908_123410-01
সেকেলে প্রযুক্তি আজও অটুট
IMG_20190908_123853-01-01
শুকনো ঝর্ণা @ হাওয়া মহল

একদিনের ট্যুরে আসায় যায়, তবে তার সাথে কিছু যোগও করতে হয়, দুপুর নাগাদ ঘুরে নাড়াজোল বাস স্টপেজে মধ্যাহ্নভোজ সেরে সর্ট রুটে বিদ্যাসাগরের বাড়ি – বীরসিংহ এর দিকে যাওয়া যায়, কুড়ি কিমিও নয়। নাড়াজোল রাজবাড়িতে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে, এমনিতে কলেজের হোস্টেল হওয়ার দৌলতে অনেকেই থাকেন, তাদের থেকেই জানলাম – মাঝে মাঝে ফিল্মের লোকজন আসেন বলে তাদের জন্য একটা রুম বরাদ্দ! আর রাজবাড়ির লোকজন যে কোনো অতিথিকে সর্বাধিক পরিষেবা দিতে সদাপ্রস্তুত….অন্তত এমনটাই আমার জানা।

IMG_20190908_130734-01
নহবতখানা
IMG_20190908_130753~2
রাজার কাছারি… পরে ক্যান্টিন এবং ছাত্র সংসদ
IMG_20190908_132841
রাজদরবারে….
IMG_20190908_133107-01
খিড়কি থেকে
IMG_20190908_133341
কেন তোর উঁচু বাড়ি, কেন তুই বাবু রে?।

কোলকাতা থেকে আসতে হলে মেছগ্রাম হয়ে দাসপুর আসতে হবে, তারপর মেদিনীপুরগামী রাস্তায় বাঁক নিলেই পৌঁছে যাবেন বিপ্লবীদের ডেরায়….! 

IMG_20190908_143431
नमो-नमो, जी शंकरा

 

IMG_20190908_134942~2
ঐতিহ্যশালী রথ
IMG_20190908_124642
নাচ মহলা

 

পুনশ্চঃ
১. তথ্যের জন্য ইউটিউব এবং গুগল দায়ী..
২. থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একদিন আগে জানাতে হয়…রথের সময় জলহরি তে একটি নৌকা চলে।

IMG_20190908_143900
৮০ বন্ধু
© শুভঙ্কর দত্ত || September 9, 2019