লাউসেনের হতশ্রী ময়নাগড়ে…

IMG20191116152203-01
ময়নাগড়ের তোরণ

ময়নাগড়ের ইতিহাস বড়োই বিচিত্র! অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় ময়নাগড় মূলতঃ লাউসেনের গড়, ঠিক তেমনই মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। দুটির মধ্যে যোগ-সম্পর্ক স্থাপন করাটাই ইতিহাসের কাজ৷

IMG20191116154859-01
অপেক্ষা… এপারে আসার

উঁকি মারে ইতিহাস….

গৌড়ের অধিপতি দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে যুদ্ধে পরাজিত কর্ণসেন তাঁর অধীনে সেনভূম ও গোপভূম অঞ্চল শাসন করতেন। গৌড়েশ্বর এর মন্ত্রীর নাম ছিলো মহামদ যার চক্রান্তে সোম ঘোষ নামে একজন অনুগত প্রজা কারাগারে বন্দী হন। পরে এই সোম ঘোষের সাথে গৌড়েশ্বরের গাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন হলে রাজপাট্টা, একটি ঘোড়া এবং একশ দেহরক্ষী সৈন্যসহ সোম ঘোষ কর্ণসেনের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। সোম ঘোষের পুত্র ইছাই ঘোষ কর্ণসেনকে যু্দ্ধে পরাস্ত করেন। তাঁর ছয় পুত্রকে বিনাশ করে রাজ্যের অধিকার নেন। পাঠক হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে এটা মহামদের ষড়যন্ত্র বই কিছু নয়। পুত্রশোকে কর্ণসেন-মহিষী বিষপানে আত্মহত্যা করেন। তখন গৌড়েশ্বর কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের অংশবিশেষ (ময়নামণ্ডল) এর রাজত্ব দেন। তিনি আগমন করেন কংসাবতীর শাখানদী কালিন্দীর জলপথে, কর্ণসেনের নতুন রাজধানী কর্ণগড় যা পরে ময়নাগড় নামে বিখ্যাত হয়।

কর্ণসেন এর দ্বিতীয় ধর্মপত্নী রঞ্জাবতী বাঁকুড়ার রামাই পণ্ডিতের উপদেশে ধর্মঠাকুরের তপস্যা করে লাউসেন (বা লবসেন) কে পুত্ররূপে লাভ করেন যিনি মঙ্গলকাব্যে লাম্বাদিত্য নামেও খ্যাত। লাউসেন অজয় নদীর তীরে ইছাই ঘোষকে নিহত করে পিতৃরাজ্য উদ্ধার করেন৷ এইভাবে বীরবর লাউসেনের সাম্রাজ্য বীরভূম থেকে ময়না পর্যন্ত বিস্তার লাভ করলো। এই ময়না গড়ে এখনও লাউসেনের কীর্তিচিহ্ন রয়ে গেছে। রাঢ় বাংলার জাতীয় কাব্য ধর্মমঙ্গল এর নায়ক লাউসেনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িতে জায়গাটি যে ময়নাগড় সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই৷ রঙ্কিনী কালীমূর্ত্তি তাঁরই পূজিত এবং এই কালীমূর্ত্তি অন্যদিকে লাউসেনের বৌদ্ধ ধর্মপ্রীতিকেই স্পষ্ট করে….! যাই হোক্, এ কথায় পরে আসা যাবে।

IMG20191116153632-01
পারাপার @ কালিদহ
IMG20191116152924-01
স্বমহিমায়… নৌরাসযাত্রায়

বঙ্গ হলো। এবার বঙ্গের সাথে কলিঙ্গের যোগসূত্রটা ধরা যাক্।

মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যভুক্ত – ‘জলৌতি দন্ডপাট’ এর অন্যতম৷ পরগণা ছিলো দুটি — সবং-পিংলা, ময়না৷ প্রায় ছয়শো বছর আগে ১৪০৩ খ্রীষ্টাব্দে কপিলেন্দ্রদেব (শোনা শোনা লাগছে কি? কুড়ুমবেড়াতে জড়িত যিনি)
সিংহাসন অধিকার করেন, তার পরে তাঁরই অধস্তন সেনানায়ক কালিন্দীরাম সামন্ত অধিষ্ঠিত হন, সবং এর বালিসীতাগড়ে একটি দুর্গ নির্মিত হয়। প্রাপ্ত সূত্র এবং তথ্য অনুযায়ী এই কালিন্দীরামই হলেন বর্তমানে ময়নাগড়ে বসবাসকারী বাহুবলীন্দ্র বংশের আদিপুরুষ।

এরপর প্রায় দেড়শো বছর এগিয়ে যায় রাজ্য-রাজ্যত্ব, বংশ পরম্পরায় গোবর্ধন সামন্ত বালিসীতাগড়ের অধিপতি হন। যাই হোক্, উৎকল সাম্রাজ্য তখন হরেক চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে আসছে। সিংহাসনে বসলেন হরিচন্দন। সাম্রাজ্যের স্বরূপ উদঘাটনে তিনি সমস্ত রাজন্যবর্গের থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিতে উদগ্রীব হলেন। বশ্যতা স্বীকার করতে সম্মত হলেন না গোবর্ধন। বন্দী অবস্থায় তাকে আনা হলো কারাগারে। গোবর্ধনের দেবোপম কান্তি, সঙ্গীতপ্রতিভা, মল্লযুদ্ধ — দেখে মুগ্ধ হলেন রাজা। উৎকল সাম্রাজ্যের খারাপ সময়ে এমন রণনিপুণ এবং রাজকীয় মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপন করতে পিছপা হলেন না উৎকল-নৃপতি৷ সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হলো তাঁকে, সঙ্গে সিংহাসন, রাজচ্ছত্র, চামর, বাণ, ডঙ্কা, যজ্ঞোপবীতাদি রাজচিহ্ন দেওয়া হলো। তাঁকে দেওয়া হলো উপাধি – একটা নয়, তিনটে — ‘রাজা’, ‘আনন্দ’ এবং ‘বাহুবলীন্দ্র’…. যে পদবী এখনও রাজপরিবারের সদস্যরা বহন করেন, এর অর্থ হলো ইন্দ্রের ন্যায় বাহুবলশালী। মূল শাসনকেন্দ্র হিসেবে সিলমোহর পেলো ময়নাগড়।

IMG20191116154812-01
বর্তমান “বাহুবলীন্দ্র” রা

বেয়াড়া জলদস্যু শ্রীধর হুইকে ময়না থেকে উৎখাত করেন তিনি, ফিরে এসেই। তখন তিনি ঐ গড় নতুন করে পরিখাবেষ্টিত করে দুর্ভেদ্য গড়ে পরিণত করতে আগ্রহী হন। দুটি পরিখা (কালিদহ ও মাকড়দহ) দিয়ে ঘেরা ছিলো তার গড়। প্রথম পরিখার মধ্যে চারিদিকে বেশ উঁচু পার্বত্য গুলিবাঁশের ঝাড় (১৯৫৫ সালের পর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়) এমন ঘনভাবে পরস্পর সংলগ্ন ছিলো যে অস্ত্রধারী সৈন্য তো দূর কোনও যুদ্ধাস্ত্রও প্রবেশ করতে পারতো না। প্রচুর অর্থব্যয়ে রাজা গোবর্ধন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন, যা ছিলো নিখুঁত এবং রন্ধ্রবিহীন, গড় সংস্কারেই তার পরিচয় মেলে। বৃটিশ কালেকটর এইচ.ভি.বেইলির বর্ণনায় সেদিক ফুটে উঠেছে।

IMG20191116154640-01
তাল সারি
IMG20191116154833-01
সেকালের পরিখা আজও অক্ষত

এই হলো যোগসূত্র… এরপর কালের নিয়মে তৃতীয় আর একটি পরিখা আজ বিলীন৷ বালিসীতাগড় এর দুর্গ ধুলায় মিশে গিয়েছে। বাহুবলীন্দ্র সাম্রাজ্যে বংশপরম্পরায় এসেছেন – পরমানন্দ, মাধবানন্দ, গোকুলানন্দ, কৃপানন্দ, জগদানন্দ, ব্রজানন্দ, আনন্দনন্দ, রাধাশ্যামানন্দ। আগ্রার মুঘল দরবারে এক সময় উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিলো পরমানন্দের — উড়িষ্যার রাজপ্রতিনিধি হিসেবে। মুর্শিদাবাদের নবাবী হুকুমতেও জগদানন্দ ছিলেন সমাদৃত। স্বাধীন ময়নাগড় বৃটিশ পর্বে কেবল পরবশ হয়েই রয়ে গিয়েছিল। মারাঠাদের আক্রমণও ভেদ করতে পারেনি প্রতিরক্ষার চাবি, তাও অষ্টাদশ শতকে।

এবার আসি কি আছে এই ময়নাগড়ে….

ময়নাদুর্গের চৌহদ্দির মধ্যে রয়েছে বৈষ্ণব – শৈব – শাক্ত মন্দির যা যথাক্রমে শ্যামসুন্দর মন্দির, লোকেশ্বর শিব, মহাকালী রঙ্কিণীদেবী)। রয়েছেন ধর্মঠাকুর (যদিও দেখা হয়নি), মোহান্ত নয়নানন্দ দেবগোস্বামী সমাধিমন্দির, তিন শতাব্দী প্রাচীন সূফীপীর দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা), যা নৌকা থেকে দেখেই শান্ত থাকতে হলো, যদিও সেখানে যাওয়ার জন্য ছোটো ডিঙা রয়েছে। সত্যিই AN ISLAND WITH AN ISLAND এই ময়নাগড় পঞ্চদেবতার গড়ও বটে, যেখানে বৈষ্ণব -শৈব-শাক্ত-ধর্ম-পীর সকলেই আছেন।

IMG20191116164531-01
ময়নাগড় – সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র
IMG20191116160759-01
রাজবাড়ির অংশবিশেষ

সেই মধ্যযুগ থেকেই এখানে গড়ে উঠেছিলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থান। আজও সেই ঐতিহ্য সমানে চলে আসছে। একসময় প্রচলিত ছিলো ধর্ম ঠাকুরের নিত্য পূজা, জগন্নাথ- বলরাম- সুভদ্রা রথযাত্রা, বড় হোলির সান্ধ্যমেলা এবং মহেশ্বরের বৈশাখী গাজন। অবশ্য সেসব আজ স্মৃতিকথা মাত্র। গড়সাফাৎ গ্রামের চতুষ্পার্শ্বে ছিল পরিকল্পিত পরিখা, প্রতিরক্ষার তৃতীয় ধাপ হিসেবে গণ্য হতো। তা আজ অবলুপ্ত। তবে কার্তিকী পূর্ণিমায় বর্ণাঢ্য নৌ-রাসযাত্রার দৃষ্টান্ত আজ বিরল। রাসমেলা পেরিয়ে কালিদহে নৌযাত্রা করে দুর্গে গিয়ে খানিক ঘোরাঘুরির সুযোগ এই রাসমেলাকে এক দারুণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সারা বছর এই ময়নাগড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, শুধুমাত্র এই রাসমেলার কয়েকদিনই। সূর্যাস্তের সময় কালিদহ যে কি রূপ নেয়, তা হয়তো না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। লাউসেন এক কিংবদন্তি, বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুরে পশ্চিম আকাশে কোনো এক অমাবস্যার রাতে সূর্যোদয় ঘটান বলে জনশ্রুতি আছে। যাই হোক্, সে ময়নাগড়ও আজ নেই আর, হতশ্রী, তার গরিমা আর নেই,তবুও তার কাঠামো আজও অটুট। এতো বছর পরেও সেখানে রাজবংশীয়রা রয়েছেন, এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কিচ্ছুটি হয়নি। ভাবতে অবাকই লাগে… তবে পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নালোকে বা সৌদামিনীর ক্ষণিক উপস্থিতিতে কেমন অপরূপ রূপ ধারন করে এই কালিদহ তার বেশ উপভোগ্য – এটুকু দেখার ইচ্ছে রইলো….

IMG20191116163003-01
কালিদহ তখন ডুবুডুবু সূর্যের আভা গায়ে মাখে
IMG20191116163306-01
সূর্যাাস্ত পানে একলা নাও
IMG20191116163858-01
নৈসর্গিক

লোকেশ্বর শিব মন্দির

কালিদহের তীরে রয়েছে লোকেশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বেশ গভীরে শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিলো। বর্গী হামলা থেকে রক্ষা পেতে যে সুড়ঙ্গ পথ নদীতীর অবধি বিস্তৃত ছিলো, তা বেশ ভালো রকম সক্রিয় থাকায় শিবকুন্ডটি বন্যায় অতিরিক্ত জলে ডুবে যায়। মন্দিরটির নির্মাণকাল আধুনিক যুগ হলেও, টেরাকোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়৷ বিষয়বস্তু গুলিও বেশ সময়সাময়িক – অশ্বারোহী, কৃষ্ণের রথ ইত্যাদি। তবে সবথেকে আকর্ষণীয় এবং একই সাথে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া মন্দিরটি চালে একটি নারীমূর্তি। যদিও এখন এমন রঙ করা হয়েছে যে বুঝতে বেশ অসুবিধা হয় যে আদৌ টেরাকোটা আছে কি না। এই শিব মন্দিরেই এখন পূজিত হন রঙ্কিণী দেবী — যা কালীমূর্ত্তির বৌদ্ধ সংস্করণ বলা ভালো। লাউসেনের অস্তিত্বের পরিচায়ক যা….।

IMG20191116155451-01
লোকেশ্বর শিব মন্দির : সামনে থেকে
IMG20191116160104-01
লোকেশ্বর মন্দির : পেছনের দিক
IMG20191116162501-01
রঙ্কিণী কালি মূর্ত্তি
IMG20191116162414-01
টেরাকোটার নিদর্শন : রথ
IMG20191116162406-01
অশ্বারোহী : লোকেশ্বর শিব মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা
IMG20191116162323-02
শায়িত নারী

Statue Of Dignity

লোকেশ্বর শিব মন্দিরের সামনে একটু দূরত্বে রয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ, রাজা জগনানন্দের সম্মানার্থে – Statue of Dignity, ২০১৪ সালে নির্মিত৷ রাজার শেষদশায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ময়নাগড় আক্রমণ করলে জগনানন্দ আত্মসমর্পণ করেননি,গড়ের ভেতরে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকেন। হেস্টিংস অনেক হম্বিতম্বি করলেও ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মীরকাশিমের মধ্যে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী জমিদারী অক্ষুন্নই থেকে গেলো।

IMG20191116155351-01
Statue of Dignity

শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির

কালিদহের তীরে অবস্থিত আর একটি মন্দির — শ্যামসুন্দরজীউর ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দির, দেউল রীতির। এই শ্যামসুন্দরজীউ হলেন বাহুবলীন্দ্র পরিবারের কুলদেবতা। প্রতিষ্ঠা লিপি নেই, খুঁজেও পেলাম না। শুধু সংস্কারের কতগুলি তথ্য মিললো। শ্যামসুন্দর মন্দিরের দেওয়ালে নৃত্যরত গৌর-নিতাই এর মূর্তি পাওয়া গেলো। সেখানে একজন বুকস্টল নিয়ে বসে ছিলেন, একটা বই নিলাম।

IMG20191116161423-01
কুলদেবতার অধিষ্ঠান
IMG20191116161841-01
গৌর – নিতাই
IMG20191116161923-01
সংলগ্ন ঘাটের পথ
IMG20191116162027-01
শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির : গোপাল থাকেন যেখানে 

লাউসেনের গড়

লাউসেন – লাউসেন করছি এতোবার। লাউসেনের নির্মিত গড়ের প্রায় পুরোটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। যেটুকু আছে, যে কোনো সময় হয়তো ভেঙে পড়তে পারে। জঙ্গলাকীর্ণ ঐ ভগ্ন গড়ে এখন বটগাছের বাস৷ স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে কিছু সাপখোপ হয়তো আছে, এখন শীতঘুমে গিয়েছে বলে মুখোমুখি হতে হয়নি। ভেতরে ঢুকে দেখলাম কিছু বিকৃতমস্তিষ্কের লোকজন এসে দেওয়ালে নিজেদের নামগুলি খোদাই করে গিয়েছে। একটা সিঁড়ি আছে, ভাঙা। দেখলাম, কয়েকজন কিশোর বয়সী ছেলে সেটা দিয়ে ওপরে উঠে মজা করছে, আমার একটু ইচ্ছে হলেও, সঙ্গীরা পেছন টানলো। অগত্যা, শুধু ফটো তুলে ক্ষান্ত থাকতে হলো।

IMG20191116160629-01
জঙ্গলাকীর্ণ
IMG20191116160601-01
আড্ডা, এটিই লাউসেনের গড়
IMG20191116160645-01
না থাকার মতোই
IMG20191116160832-01
মাথাহীন রাজবাড়ি

সম্প্রীতির ময়নাগড়ে…

দ্বিতীয় পরিখার পর গড়ের অন্তর্ভুক্ত যে ভূখণ্ডটি ছিলো সেখানে বর্তমানে রবিবারের বাজার (ময়নার প্রাচীনতম)। এই বাজারেই বসে রাসের মেলা এই ভূখণ্ড ময়নাগড়ের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ দূর করে দেয় এখানে অবস্থিত তোরণটি, যেটি খুব ভিড়েও রাসমেলার মধ্যে সঠিক দিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অতীতে পাঠান,শেখ ও খাঁনদের আনা হয়েছিলো গড় রক্ষার কাজে। গড়সাফাতের প্রাচীন হক্কানি মসজিদটি রাজার অর্থানুকূল্যে নির্মিত। বস্তুত ময়নাগড়ের এক প্রান্তে কালিদহের অপর পাশে রয়েছে সূফীপীরে দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা) । সুতরাং, এই গড়সাফাৎ যে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির সাক্ষর বহন করে চলেছে, তার বাংলা-আরবী শব্দসমন্বয় দেখেই অনুমেয়।

IMG20191116154531-01
সূফীপীরের দরগা, নৌকা থেকে 

আকর্ষণ…

একদা প্রচলিত বাহুবলীন্দ্রদের রথযাত্রা তমলুক মহকুমার মধ্যে প্রাচীনতম৷ ময়নাগড়ের শ্যামসুন্দরজীউর রাস উৎসব পঞ্জিকাতে লিপিবদ্ধ বাংলার অন্যতম একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হয়ে আসা প্রায় ৪৬০ বছরের পুরনো এই রাসমেলা পূর্বে একমাস ধরে হলেও, পরে ২২ দিন এবং বর্তমানে পক্ষকাল ধরে চলে। এই মেলার মুখ্য আকর্ষণ থালার মতো বাতাসা এবং ফুটবলের আকারে কদমা, যদিও এখন ছোট কদমার কদর বেশি, ঠিক যেন কদম ফুলটি।

সত্যজিৎ রায় – গয়নাবড়ি এবং ময়নাগড়

অনেকেই হয়তো জানেনই না সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্ববন্দিত পরিচালকের পা পড়েছিল এই ময়নাগড়ে। এখানকার বিখ্যাত গহনাবড়ি (উপহার স্বরূপ প্রাপ্ত) সত্যজিৎ রায় তার “আগন্তুক” সিনেমার একটি দৃশ্যে ব্যবহার করেন। তারও বহু বছর পূর্বে “অশনি সংকেত” সিনেমার শ্যুটিং এর অভিপ্রায়ে রিক্সা করে এসেছিলেন ময়নাগড়, পরিখাবেষ্টিত গড় ঘুরে দেখেনও, কিন্তু পুরো ইউনিট নিয়ে যাওয়ার সাহস পাননি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গার অসুবিধার জন্য। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ হয়তো পথের পাঁচালীর বোড়াল গ্রামের মতো ময়নাগড়ও বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকতো। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা চিঠি থেকেও বাহুবলীন্দ্র পরিবারের তৈরী গহনাবড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রণবেশ সেন এর কথায় — দুটি জিনিস খুব দুঃখের, এক দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন এবং এতো সুন্দর গহনার মতো বড়ি ভেঙে খাওয়া। তাঁর উদ্যোগে এই বাড়ির গয়নাবড়ি পুরো প্রস্তুতির দৃশ্য কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রে সম্প্রচার করা হয়।

গয়নাবড়ি @ আগন্তুক
আগন্তুক সিনেমার একটি দৃশ্যে : আহারের এতো বাহার

কালিদহ পার হয়ে…

যাই হোক্, আমাদের ভাগ্যটা ভালো ছিলো। আমরা এক শনিবারে তিনটের দিকে রবিবারের বাজারে বসা ঐ রাসমেলাতে পৌঁছে তড়িঘড়ি নৌযাত্রায় চলে যায়, লাউসেনের স্মৃতিবিজড়িত ময়নাগড় ঘুরে যখন ফেরৎ আসি তখন দেখি প্রায় দু’শো লোক নৌরাসযাত্রা উপভোগ করতে উৎসাহে অপেক্ষারত। কালিদহের জলে গোধূলির আকাশ প্রতিফলিত হওয়ার পূর্বেই আমরা সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্রের মেলা থেকে খানিক কদমা কিনে,ব্যাগস্থ করে ফিরে আসি…..!

IMG20191116165353-01
কদমা
IMG_20191119_183434
পুরো মানচিত্র রইলো, যাতে আগ্রহী যারা, তারা কেউ ছেড়ে না আসে (‘কিল্লা ময়নাচৌরা’ থেকে সংগৃহীত), আমরা ঘুরতে পারিনি 

তথ্যসূত্র :
কিল্লা ময়নাচৌরা – ডঃ কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

© শুভঙ্কর দত্ত || November 19, 2019