সিমলিপাল অরণ্যের দিনরাত্রি…

IMG20200223065729-01
কুয়াশার চাদর পেরিয়েছি সবে….

পঞ্চলিঙ্গেশ্বর আর দেবকুন্ড ঘুরে বারিপাদায় হোটেলে উঠলাম। ঘুম না হওয়ার অনেক কারণ থাকলেও তার দায় মশককুলকে দেওয়ায় যায়। পরের দিন ভোরে উঠে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়েছি, ড্রাইভার আসলো। নাম – শরৎ, আগের দিনই রাতে পরিচয় করে গিয়েছে সে। গাড়ি চললো, উদ্দেশ্য – সিমলিপাল, পিঠাবাটা (পড়ুন পিঠেব্যথা) গেট। আসলে সিমলিপাল ঢোকার একাধিক গেটই রয়েছে, কিন্তু রাস্তা সব গেট থেকে ভালো নয় বা দূরত্বও বেশি, আর বারিপাদা থেকে এই পিঠেব্যথার দূরত্ব অন্যান্য গেট এর চেয়ে কমই। আনন্দের আর সীমা নেই যখন জানলাম আমাদের ড্রাইভারদা বাংলা জানে, বাঙালীর এ যেন স্বর্গে হাতে পাওয়া।

IMG20200223064802-01
অজানার উদ্দেশ্যে..

(আসলে কথাটা সিমিলিপাল কিন্তু প্রচলিত শব্দ সিমলিপালই বলা হয়ে গিয়েছে বারবার)

IMG20200223153956-01
সূর্যলোক গায়ে মাখে এ অরণ্য
IMG20200223084426-01
অক্সিজেনের প্রাচুর্যে
IMG20200223091130-01
সর্পিল পথে অনন্ত বনরাজির পানে..

টিকিট কাটা হলো, গাইড এর জন্য বরাদ্দ টাকা দিতে হবেই। সে এবার গাইড কে গাড়িতে না নিলেও হবে আর আমাদের ড্রাইভার বেশ পরিচিত, সে ওসব থেকে বাঁচিয়ে দিলো নইলে গাড়ির মধ্যে দোকান রাখার বেশ অসুবিধা হতো বইকি! গাড়ি প্রবেশের আগে আমাদের চেকিং করলো একটা পুলিশ…. এলকোহল (এই টার্ম আমি এম এস সি পড়ার সময় শিখেছি) আছে কিনা! এরপর গেট খুলতে গাড়ি ঢুকলো সিমলিপাল জাতীয় উদ্যানে। দুপাশে ঘন জঙ্গলের মাঝের মোরাম রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো….প্রথম গেট আসলো ভজম বলে একটা জায়গায়….এরকম গেট আছে আরও চার বা পাঁচটা গোটা রাস্তায় কিন্তু আমার আর মনেও নেই। তখন বাজে প্রায় সাড়ে সাতটা। আমরা প্রথম গেটটা পেরোলাম আমরা। সুরজিৎ মোটামুটি ড্রাইভারের সাথে হিন্দিতে বাতচিত চালিয়ে যাচ্ছে, ভুলে গিয়েছে যে তিনি বাংলা বলেন, এবং বোঝেন, আমরাও ভাবছি ‘বাতচিত’ কখন বাক্যালাপে পরিণত হবে…!

IMG20200223111057-01
হেথা উর্ধ্বে উঁচায়ে মাথা দিলো ঘুম….
IMG_20200223_162220-01
যত আদিম মহাদ্রুম….

এরপর চলেছি, এক অজানা তালিকা কি কি দেখতে পাবো তা ভেবে, দূর থেকে ড্রাইভার এর চোখে পড়লো প্রমাণ সাইজের বনমোরগ। এবার নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার মধ্যেই বনের মধ্যে ঢুকে গেলো সে। আরও এগিয়ে চলেছি, একটা সবুজ পায়রা দৃষ্টি পড়তেই উড়ে মিলিয়ে গেলো…পাহাড়ি পথের বাঁকে মাঝে মাঝেই দেখা মেলে জলের…কোথাও শুকিয়েও গিয়েছে সেই জল। আসলে গহীন অরণ্যের বুক চীরে এগিয়ে চলা নদী বা ঝর্ণায় হবে। একটা জায়গা এলো.. গাছের পাতাগুলো দেখলেই যেন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় যে এখানের বাতাস সবই বিশুদ্ধ। এরপর দুটো ময়ূর দেখা গেলো। আহহ, পরমেশ্বর যেন দুহাত দিয়ে গড়েছেন, চিড়িয়াখানায় খাঁচার ওপারে দেখা আর জঙ্গলে তাদের বাসস্থানে নিজস্ব ভঙ্গিমায় দেখা একদম আলাদা মাত্রা। একটা সম্বর দৌড়ে রাস্তা পার হলো। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সাথে কারো বাইনোকুলার নেই। গাড়ি কখন যে একটু সমতল পেয়েছে ঠাহর হয়নি। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা ছেলেমেয়ের দল হাত নাড়িয়ে ওয়েলকাম জানাচ্ছে। পরে ভুল ভাঙলো। আসলে অনেকেই পুরনো জামাকাপড় দিয়ে যান এদের, ওরাও হয়তো বুঝেছে আমরা দেবো। আমাদেরকেও বলেছিলো কিন্তু সে কথা খেয়াল ছিলো না বিন্দুমাত্র। মনে মনে স্থির করলাম পরের বার আর হবে না।

IMG20200223101554-01
হল্ট স্টেশনের দোকান খানি
IMG20200223100003
সেই স্কুলবাড়িটা
IMG20200223100656
শুধু বেসনের পাকোড়া
IMG20200223145827-01
বেড়া হয় সব ঘরেরই…

সেখানে স্কুলবাড়িও রয়েছে, রয়েছে আস্ত একটা গ্রাম। আর অনেক সময় ধরেই চোখ পড়ছিলো যে এখানে বিদ্যুৎ দফতর তো পৌঁছায়নি কিন্তু সূর্যদেবতা আর বিজ্ঞানের পরম আশিষে সৌরকোষ দিয়ে চলে যায় এদের। মোবাইলের নেটওয়ার্ক জুড়ে শুধুই শূন্যতা। একজন বন্ধু বললো শুধু একটু নেটওয়ার্কটা লাগতো, আমরা দু একজন বললাম বেশ তো ভালোই লাগছে, নির্ঝঞ্ঝাট আছি। একটা দোকানে গিয়ে পকোড়া সাঁটানো গেল। এতো ওপরে মালপত্র আসে কিভাবে জিগ্যেস করতে ড্রাইভারের থেকে জানা গেল – গাড়ি আসে সপ্তাহে দু দিন। এরপর আবার চলতে শুরু করলো গাড়ি। যাচ্ছি জোরান্দা জলপ্রপাত, পশু-পাখি দেখা ছাড়াও আমাদের পিপাসা মেটানোর জন্য প্রথম গন্তব্যস্থল এটাই। পাহাড়ি রাস্তা ছেড়ে একটু সমতল পেয়েছে গাড়ি। শহুরে – সুবিধেবাদী সভ্যতা থেকে এতো যোজন দূরে এই পাহাড়ি এলাকায় ইঁটের বসতি দেখে ভিরমি খাই আমার মতো পর্যটকেরা। ড্রাইভারের শরণাপন্ন হওয়ার কিঞ্চিৎ পূর্বেই নিজেদের চোখেই দেখি একদল লোকজন ইঁট বানাচ্ছে, আর মাঠে কোদাল দিয়ে মাটি চোপাচ্ছে তিনজন শিশু, বয়স আট বছরও হবে না কারোর।

IMG20200223094938-01
|| মানুষের ঘরবাড়ি ||
IMG20200223095727-01
পাহাড়ের কোলে ঠাঁই হয়নি যাদের…
IMG20200223100050
বিদ্যালয়েরই অংশবিশেষ

টলতে টলতে পৌঁছালাম জোরান্দা জলপ্রপাত। প্রায় পাঁচশো ফুটের এই একধাপের জলপ্রপাতটি ওড়িশার অন্যতম মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। ঝরাপাতার চাদর মাড়িয়ে হেঁটে পৌঁছালাম এমন একটা জায়গায় যেখান থেকে ঝর্ণাটাকে আধি দেখা যায়, অতঃপর সে জায়গায়….একটা ক্ষীণ স্রোত, খুব কম পরিমাণ জল নিয়েই পাঁচশো ফুট নীচে পড়ছে আর তাতে যে শব্দ সৃষ্টি করেছে সেটা দূরত্বে থাকা পর্যটকদের কানে এমন কিছু বেশি লাগছে না। মিহি সুরে কারা যেন কোরাস ধরেছে।

DSC_6830
ঝরাপাতার বিছানা মাড়িয়ে জোরান্দা অভিমুখে
IMG20200223110501-01
জানান দেয়… আমাদের অবস্থান
IMG20200223104435-01
নয়নাভিরাম…

ঘড়িতে দেখলাম এগারোটাও বাজেনি। কিন্তু এই জলপ্রপাত আর পাহাড়ের অসংখ্য গাছ-গাছালি মিলে এমন এক ধোঁয়ার সৃষ্টি করেছে যে কোনো ছবিই ভালো ওঠে না। সুরজিৎ এর প্ল্যান অনুযায়ী এক রকম টি শার্ট কেনা হয়েছিল, এবার শ্যুটিং এর পালা। একটু অন্যদিকে গিয়ে দেখলাম কতগুলো ঘর এর শুধু কাঠামো বর্তমান। ড্রাইভার পরে বলে দিলো তার কারণ- মাওবাদীদের উৎপাত।

IMG20200223111639-01
এ কি দৃশ্য দেখি অন্য…এ যে বন্য
IMG20200223111311-01
নীল রঙ ছিলো ভীষণ প্রিয়
IMG20200223104736-01
সন্তর্পণে…
IMG20200223110421-01
মধ্যমণি জোরান্দা…
IMG20200223111231
ফ্রেমবন্দী করে রাখার প্রয়াস…আমিও তুলে রাখি
IMG_20200223_104702
শ্যুটিং শেষে ফিরে যেতে হয়

আবার ঐ পথেই গাড়ি এসে একটা পথনির্দেশক বোর্ড চোখে পড়লো। ফেরার পথে চোখে পড়লো সেই দলটাকে। একজন বাচ্চা মেয়ে একটা কোলের বাচ্চাকে নিয়ে লোফালুফি করছে ঐ সদ্য বানানো কাঁচা ইঁটের সারির পেছনেই! গহীনে অরণ্যের রোমাঞ্চকে দশ গোল দেয় সে দৃশ্য, ক্যামেরাবন্দী করার সাহস হলো না। বরেহিপানি ফলস বেশ কিছু কিমি দূরত্বে। আমাদের গন্তব্য – বরেহিপানি। একটা গাড়ি পেছন থেকে এসে ধুলো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেলো। থেমে গেলাম আমরা কিছুক্ষণ, নইলে ঘনঘন গাড়ির আওয়াজে প্রাণীগুলির দর্শন পাবো না। খাওয়াদাওয়ার প্ল্যান শুরু হতে ড্রাইভার বললো যে এখানে দেশী মুরগী কিনে রান্না করিয়েও নেওয়া যায়, সে উদ্দেশ্য “কুকড়া হ্যায়?” অভিযান শুরু হলো কিন্তু সে অভিযান ব্যর্থ হলো। গাড়ি থামলো একটা হোটেলে। খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো…পাশেই একটা অস্থায়ী দোকানে শাল চিকেন বিক্রি হচ্ছে, অতএব একবার চেখে দেখা যাক্, তাই হলো। ম্যানেজার একটু খাদ্যরসিক হলে এসব উটকো খিদেতে সিলমোহর পড়তে বেশি সময় লাগে না।

IMG20200223123723
শাল চিকেন ওরফে স্বর্গ
IMG20200223123449-01
ছদ্মবেশীর দল…
IMG_20200306_172142
প্রস্তুত হয় যেমন করে…

খাবার অর্ডার দিয়ে বরেহিপানির উদ্দেশ্যে গাড়ি রওনা দিলো। এরপর রাস্তায় পড়লো হরিণ। গভীর জঙ্গল যেখানে একটু আলগা হয়েছে সেখানেই ওদের চরে বেড়ানো। একটা টাওয়ারও করা আছে আর তাকে ব্যবহার করা হলো না। আমরা দেখতেই ওরা ভেতরে ঢুকে গেলো। আবার আমরা যখন চলে গিয়েছি এরকম অভিনয় করলাম তখনই বেরিয়ে চলে এলো। যেন “লুকোচুরি” চলছে। আরও দেখতে পাবো এমন আশায় বরেহিপানির দিকে চরৈবতি। চলে এসেছি। জঙ্গলাকীর্ণ সে স্থানে একটা ওয়াচ টাওয়ার আর রেলিং দিয়ে ঘেরা একটা পাহাড়ের কিনারা থেকে দেখছি ওপারে সুউচ্চ একটা পাহাড় থেকে ঝর্ণার জল পড়ছে…. তবে এর উচ্চতা অনেক বেশি, সুরজিৎ জানান দিলো সব ধাপ ধরলে এটিই ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত। প্রায় ১৩০০ ফুটের কাছাকাছি, মানে জোরান্দার আড়াইগুণ। অনেক বেশি রোদ্দুর থাকার কারণে স্পষ্ট বোঝা গেলো। গাছ থেকে ঝরে যাওয়া পাতা, উড়ে যাওয়া পাখির দল সবেমিলে বুড়িবালাম নদীর এই ভয়ংকর অথচ সুন্দর রূপকে আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে তোলে….! পাহাড়ের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলরাশি যে বর্ষার সময়ে তার রূপ আরও বাড়িয়ে নেয় তা পাহাড়ের গা দেখলেই অনুমেয়।

IMG_20200223_125904
চুপটি করে থাক্
IMG20200223132053
নিঃশব্দে শ্যুটিং চলছেই
IMG_20200228_192624-01
বুড়িবালামের ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ – বরেহিপানি

স্নানের উপায় নেই। খিদে পেয়েছে। ফিরে এলাম। ড্রাইভারের সাথে গল্প চালাচ্ছে সুরজিৎ। জানা গেলো – এখানের গ্রামে যারা থাকে তাদের একটা লোকাচার রয়েছে, বছরে একবার জঙ্গলমাতার পুজো হয় এবং তাদের একটা বিশ্বাস রয়েছে যে তাদের গরু, ছাগলগুলিকে এই পুজোর কারণে বাঘ কখনো খাবার করেনি। আমাদের মতো শহুরে ভ্রমণপিপাসু লোকজন এক-দু’দিন ঘুরতে গিয়ে এসব লোকাচারকে অবান্তর বলে হয়তো হাসাহাসি করবে, তবে প্রতিটা জঙ্গলেই যেখানেই মানুষের বাস সেখানেই কিন্তু এমন বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। হোটেলে ফিরে নানারকম পদ আর কুকড়ার ঝোল দিয়ে ভাত সাঁটানো গেল। তার আগে অবশ্য শাল চিকেন সাঁটানো হয়েছে আরও একবার। শাল পাতায় চিকেন মুড়ে, মশলা মাখিয়ে আগুনে সেঁকে পুড়িয়ে নেওয়া, অতঃপর পাতা গুলো কালো হয়ে গেলে তা খুলে নিয়ে পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে….আহা সে কি স্বাদ! একটু হজম হতেই আবার বেরিয়ে পড়লাম শেষ গন্তব্য চাহালা। এবার একটু বন্যপ্রাণী দেখার বড়োই ইচ্ছে প্রকাশ হলো। ড্রাইভারও উৎসাহ দিলো। গাড়ি চললো, রাস্তা একটু ভেজা ভেজা। মনে হলো বেশি যায় না গাড়ি, সুরজিৎ জিগ্যেস করতে জানা গেল– এ জায়গার বন এতো ঘন যে সূর্যের আলো পড়ে না তেমনভাবে। জংলী আর আর্দ্র পথে পাতা পড়ে তাকে আরও নরম করেছে। ফরেস্ট এর পাহারাদারদের একটা টাওয়ারে এসে দাঁড়ালো, ড্রাইভার নেমে গেলো, আমাদেরও ডাকলো৷ দেখলাম কি দুর্বিসহ সে চাকুরী যদিও এখানকার ট্রাইবাল লোকজনদের জন্যই সে চাকরী ঠিকঠাক। সে বললো বাবুরা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন দেখলে অন্য গাড়িগুলোও ভিড় জমাবে। তাই তাড়াতাড়ি আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম। প্রবল উৎকণ্ঠায় চোখ মিলছি গাড়ির জানালা দিয়ে কিন্তু কিছুই পেলাম না। নাহহ, আর বোধ হয় দেখা পাবো না।

IMG20200223125519-01
শিরা ধমনী নিয়ে বরেহিপানি জলপ্রপাত
IMG20200223090551-01
আরণ্যক
IMG20200223142051
ব্যঞ্জন বেষ্টিত খাদ্য, এই একটাই ছবি যত্ন করে তোলা হয়নি

পৌঁছে গেলাম চাহালা। হাট বসলে যাকে খানিকটা সোনাঝুরির মতোই লাগবার কথা। বেশ উচ্চতার ইউক্যালিপটাস দিয়ে ঘেরা এই ওয়াচ টাওয়ারটি আসলে চাহালা নামক গ্রামে উপস্থিত। এটা কোর এরিয়ার মধ্যে বলা চলে। মনোরম এই স্থানে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই দেখা মেলে হরিণ, খরগোশ, ইয়াব্বড়ো কাঠবেড়ালির। কিন্তু ধৈর্য্য ততক্ষণে বিদায় নিয়েছে, একটুক্ষণ ওয়াচ টাওয়ারে কাটিয়েই নেমে এলাম গাড়ির কাছে। হঠাৎ চোখে পড়লো একদম মগডালে একটি Malabar Giant Squirrel মোটা লেজখানা নাড়াতে নাড়াতে টপকে অন্য ডালে…..! ড্রাইভার বললো শেষে বেরোবে কিন্তু অন্য গাড়ির লোকজন একই তালে থাকার দরুন আমরাই আগে বেরিয়ে পড়লাম।

IMG20200223161719
চাহালার ওয়াচ টাওয়ার
IMG20200223161646-01
প্যাভিলিয়নের পথে চাহালায় সূয্যিমামা…
IMG20200223160313
মিনার থেকে চাহালায় অপেক্ষারত ভ্রমণপিয়াসীর দল
IMG_20200223_151424
ফরেস্ট গার্ডদের জীবনযাত্রার হালচাল
IMG_20200223_111059
ফেলে আসা জোরান্দার সেই ধ্বংসাবশেষ, কারণ মাওবাদী
IMG_20200223_151410
১৪ ঘন্টার সঙ্গী

সন্ধ্যে হব হব করছে….অনেকটাই পথ। ঘুমও পাচ্ছে কিন্তু দেখা মেলে তৎক্ষণাৎ দেখতে হবে এইজন্য ঘুমতে ইচ্ছে হলো না। দিনের আলোর জঙ্গল রাতে কি ভয়াল রূপ নেয় তা বোঝা গেলো কয়েক ঘন্টার ঐ জার্নিতে। প্রতিটা গেটে জানান দিয়ে যেতে হয় আমরা পেরোলাম, এত সিরিয়াল নম্বর ছিল, জেনে নিতে হয় কটা গাড়ি পেরিয়েছে। আবার সেই হোটেলে গিয়ে থামলো গাড়ি, চা পানের বিরতি। দেখলাম সেই ছোট্ট মেয়েটা যে থালা পরিস্কার করছিলো তখন এবার সে চা জোগাড়ের অনেক কাজ করে দিলো। আমি বেশ দেখছিলাম, কিন্তু কথা বলার সাহস হয়নি৷ আমাদের সাথে ব্যবহার জামা কাপড় ছিলো না যে। একটা কেমন সুবিধাবাদীর লজ্জা আমার মনে তখন। এবার আবার অনিশ্চয়তার পথে পাড়ি….! একদল মহিলা হাত সেঁকছেন আগুন জ্বালিয়ে। কাজ করতে এসেছিলেন লোকজন, অপেক্ষা করছেন কখন ফরেস্ট এর গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। বেশ কিছুটা যেতে ঝিম ধরে গেলো। ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ গাড়িটা দাঁড়ালো, সামনে একটা গাড়ি ছিলো আমাদের অজান্তেই। দাঁড়িয়ে আছে, নিশ্চয় দেখেছে হাতি। এবার আবার সেই ভজম গেট। ড্রাইভার বললো ওরা বাঘ দেখেছে। আমাদের আফসোস এর সীমা নেই। পিঠেব্যথা গেট আর বেশি দূরত্বে নয়। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় রাতের বনানীকে দেখতে দেখতে যখন বন ছেড়ে বেরোলাম তখন রাত সাড়ে আটটা পেরিয়েছে সবে। এমনিতে নাকি ছ’টার আগেই বেরিয়ে যেতে হয়। শরৎ ড্রাইভার বহু অভিজ্ঞতার লোক বলে তার ব্যাপার আলাদা। অবশ্য বিভীষিকাময় হাতি বা বাঘ দেখার উৎকণ্ঠাটা রয়েই গেলো, পথ মধ্যে তেনারা স্থানুবৎ দন্ডায়মান হলে অবস্থা যে কি হতো আমাদের, তা অজ্ঞাতই রয়ে গেল। গাইতে হলো না – ‘পায়ে পড়ি বাঘমামা’….

IMG_20200223_101638
কাচাকাচির জন্য কিলোমিটার হয়তো


IMG20200223113818-01
সংগ্রাম অথবা নিজেরাই শ্রমিক
IMG20200223121218-01
টিফিনে একটু টায়ার খেলা…
DSC_6980
Men In Blue – সুরজিৎ ডেলিভার্স 🤘

ফিরে তো এসেছি, কিন্তু মনে মনে ভাবছি সেখানকার জনজাতির কথা, কিভাবে দিন গুজরান করে ওরা। আমরা সমতলের মানুষ, ফ্লিপকার্ট – অ্যামাজন – সুইগি আরও কত কি আমাদের জীবন জুড়ে….দু চারটে ক্লিকেই মুখে হাসি ফুটিয়ে দেবে। এক মিনিট দেরী করলে আমাদের কত অভিযোগ! ওখানে ওদের অভিযোগই নেই। আর করবেই বা কার কাছে? ড্রাইভারের থেকে জানলাম ওড়িশা সরকার এই লোকজনদের জঙ্গল ছাড়ার জন্য মাথাপিছু আট লাখ করে দেবে কিন্তু তবুও তারা ছাড়তে নারাজ, কি জানি! মোবাইলে ফোন করলে পাওয়া দুঃসাধ্য, কেবল ওরা ফোন করলেই খবর মেলে…। অভাব আছে, অভিযোগ নেই, নিজেদের মতো করে ধান চাষ করে নেয়, না জানি এভাবেই কত অভাবকে ওরা বশ মানিয়ে নিয়েছে। অভিযোজনটাই সব। জীবনটাই আসল। বেঁচে থাকাটাই…..একটা অরণ্য অভিযানই শিখিয়ে দিলো আবার!

IMG20200223093526-01
নাম জানিনা, ক্লান্ত পথ ঘিরেছিলো

পুনশ্চঃ দিনরাত্রি বললাম অথচ আমার কাছে রাতের একটাই ছবি রয়েছে সেটাও দেওয়ার মতো নয়। সুরজিতের থেকে নেওয়া হয়নি। ছেলেটা ফোন করে সিমলিপাল যাওয়ার প্রস্তাবটা দেয়। ভালো লেগেছিলো।

IMG_20200223_131617-01
বরেহিপানির জল কম পড়ায়….

ঋণস্বীকার: প্রায় সব ছবিই আমার তোলা তবুও তিন চারটে ছবি আছে যেগুলো সৌমেন আর শৌণকের তোলা। তবে সবচেয়ে বেশি ঋণী সেই অচেন ভিন্নভাষী মানুষটির প্রতি যিনি আমাদের গ্রুপ ছবিটি তুলে দিয়েছেন, কারণ এই একটাই ছবি পুরো গ্রুপের।

IMG_20200223_104436
Yes! Never Ever Forget You…..
© শুভঙ্কর দত্ত ||   March 6, 2020