ধ্যান ‘চাঁদ’ ফিরে আসুন…

১৯৩৫ সাল…
অ্যাডিলেডে একটি হকি ম্যাচ চলছে… দর্শক আসনে স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান, একজনের খেলা দেখে উচ্ছ্বসিত! বললেন – “He scores goals like runs in cricket…”

যাকে নিয়ে বলছেন তিনি মেজর ধ্যানচাঁদ! অবশ্য নামটা আসলেই ধ্যান সিং ছিলো। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন Indian Army তে যোগ দিলেন, তখন প্রখর দৃষ্টিশক্তি আর রিফ্লেক্সের জন্য চাঁদের আলোয় প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। মজা করে সতীর্থরা নাম দিলেন ”চাঁদ”, সেই থেকেই ধ্যান চাঁদ, নামের পরের “সিংহ” উবে গেলো। কিন্তু তার খেলা থেকে উড়লো না….! ছোটো থেকেই ধ্যানজ্ঞান ছিলো হকি স্টিকটা! পেয়ে গেলেন একটা রেজিমেন্টও, তখন চুটিয়ে হকি খেলা হতো সেখানে, হতো প্রতিযোগীতাও৷ কিভাবে সুযোগকে কাজে লাগাতে হয় সেটা ধ্যানচাঁদ শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। প্রথমে সুযোগ পেলেন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে, ব্যস্, নজর পড়লো জাতীয় নির্বাচকদের৷ চললেন কিউইদের দেশে, দুই ডজন থেকে মাত্র চারটে গোল কম করে সেই যে দ্বৈরথ শুরু হলো…. বাকিটা ইতিহাস৷ দেশে ফেরামত্রই আগে পেলেন Lance Nayak এর পদ।

খবরে…

আমস্টারডাম, অলিম্পিক – ১৯২৮
বেশ কিছু মাস আগে একটা খেলায় ইংল্যান্ড কে হারিয়ে দেওয়ায় ব্রিটিশরা কুটনীতি করে আমস্টারডামে ভারতীয় হকি দলকে পাঠালেন না, বেশ টালবাহানার পরে অবশ্য সেটা হয়। অবশ্য ১৯২৪ এর প্যারিস অলিম্পিকে পরিকাঠামোর অভাবে হকি রাখা না হলেও ১৯০৮ আর ১৯২০ এই দুবারই সোনার পদকটা পেয়েছিলো ব্রিটেনই! সুতরাং তাদের একটা ভয় ছিলোই। ভারতীয় দল প্র্যাক্টিস ম্যাচ থেকেই নজর কাড়তে শুরু করে। প্রথম ম্যাচ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ৬-০ তে জয়। তারপর একে একে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড এবং ফাইনালে ডাচরা! জয়ী ভারত! ধ্যানচাঁদ গোটা টুর্নামেন্টে করলেন ১৪ টা গোল। স্থানীয় সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হলো – “This is not a game of hockey, but magic. Dhyan Chand is, in fact, the magician of hockey.” এটাই অলিম্পিকে ভারতের প্রথম সোনা জয় এবং কোনো গোল হজম না করেই!

আমস্টারডামে প্রথমবার সোনার ছেলেরা

১৯৩২, লস অ্যাঞ্জেলস

প্রথম ম্যাচে জাপানকে ১১-১, ফাইনালে আমেরিকাকে ২৪-১…. এতো গোলের ফুলঝুরি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। সহোদর Roop Singh কে সঙ্গে নিয়ে দুই জনে মিলে গোল করলেন ২৫ টা। ক্রীড়াজগৎ আখ্যা দিলো Hockey Twins. দ্বিতীয় সোনা ভারতের সেই হকির হাত ধরেই।

Dhayn Roop Singh – the Hockey Twins

এরপর অধিনায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৩৩ সালে ভারতীয় হকির অন্যতম সম্মানজনক Beighton Cup এ Jhansi Heroes কে জেতান, পরেও অনেকবার বলেছেন সে ম্যাচটাই তার জীবনের প্রিয় ম্যাচ ছিলো, Calcutta Customs এর বিরুদ্ধে। তিনি বলতেন – If anybody asked me which was the best match that I played in, I will unhesitatingly say that it was the 1933 Beighton Cup final between Calcutta Customs and Jhansi Heroes. Calcutta Customs was a great side those days; they had Shaukat Ali, Asad Ali, Claude Deefholts, Seaman, Mohsin, and many others who were then in the first flight of Indian hockey.”

The Golen Era of Indian Sports

১৯৩৬ অলিম্পিক, আসর এবার বার্লিন, হিটলারের দেশে

বিভিন্ন দেশকে ৪০ টা গোল দিয়ে, একটিও হজম না করে ধ্যানচাঁদের ভারত ফাইনালে। গোটা বার্লিন শহর ভারতীয় দলের সাফল্য নিয়ে মজে গেলো। পোস্টারে ছয়লাপ সে শহরে – “Visit the hockey stadium to watch the Indian magician Dhyan Chand in action.” গোটা য়ুরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক উপস্থিত…। বলা হতে লাগলো – “The Olympic Complex now has a magic show too”.
ফাইনালে প্রতিপক্ষ – জার্মানি যারা ভারতকে প্র্যাকটিস ম্যাচে ৪-১ গোলে হারিয়েছিলো, একটু চিন্তিত ছিলো ভারতীয় শিবির। দলের ম্যানেজার পঙ্কজ গুপ্তা তখনকার দিনের একটা পতাকা আনলেন, যেটা জাতীয় কংগ্রেস ব্যবহার করতো, ত্রিরঞ্জিত! তেতে উঠলেন খেলোয়াড়রা! শুরু হলো খেলা! স্টেডিয়ামে অ্যাডলফ হিটলার! প্রথমার্ধে জার্মান গোলকিপারের সঙ্গে জোর সংঘর্ষে দাঁত খোয়ালেন ধ্যানচাঁদ, কিন্তু দমে যাননি! সতীর্থদের বললেন – ওদের উচিৎশিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে বল কন্ট্রোল করতে হয় ওদের শিখিয়ে দেবো৷ প্রথমার্ধে একটু আটকে রাখতে পারলেও, দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো সেই ধুন্ধুমার খেলা, নিজেদের অর্ধ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করলো জার্মানরা…. নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো The Wizard এবং কোম্পানি! ৮-১ গোলে জয় এলো, ফাইনাল জেতার হ্যাটট্রিক করে পরপর তৃতীয় বারের জন্য সোনা পেলো ভারত। উল্লেখযোগ্য অবদান দুইভাই ধ্যানচাঁদ সিং আর রুপ সিং এর।

The Wizard
হিটলারের দেশে সোনাজয়ী দল

এরপরেই সেই বিখ্যাত কথোপকথন, যা আজও ধ্যানচাঁদ কে নিয়ে কথা হলে বলতেই হয়। হিটলার এবং ম্যাজিশিয়ানের মধ্যে–

That conversation between Dhyan Chand & Hitler

হিটলারের প্রস্তাবের সামনেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে কথা বলেছেন তিনি৷ আবার বেশ মজার হলেও কোনো খেলায় গোল না করতে পারলে অভিযোগ জানাতেন গোলপোস্ট এর মাপ নিয়ে এবং দেখা যেতো যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তেমন ভুলটাই হয়েছে। ১৯২৬ থেকে ১৯৪৮ এর বর্ণময় কেরিয়ারে প্রায় ৪০০ র বেশি গোল করেছেন তিনি৷ তাঁর সম্মানার্থে দিল্লীর জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের নাম ২০০২ সালে পরিবর্তন করে করা হয়েছে Dhyan Chand National Hockey Stadium, দেশের বাইরেও এরকম নামকরণ হয়েছে৷ লন্ডনে একটি টিউব স্টেশন আছে তাঁর নামে, জিমখানা ক্লাবেও তিনি উজ্জ্বল অক্ষরে বিরাজমান। হকির জাদুকর বা ম্যাজিশিয়ানের জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই প্রতি বছর এই দিনটিকে ভারতবর্ষে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়, দেশের প্রতিটি কোণা থেকে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বদের পুরস্কার প্রদান করা হয় তাদের সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম গৌরবান্বিত করার জন্যে….

ধ্যান চাঁদ স্টেডিয়াম
রেজিমেন্টে…

১৯৫৬ সালে ভারতীয় আর্মি ছাড়ছেন যখন তখন তিনি ‘মেজর’…. আজ যখন ভারতীয় টিম অলিম্পিকে জায়গা পেতে হিমশিম খেয়ে যায়, তখন আমরা তাঁকে আমাদের দিবাস্বপ্নে অনুভব করতে চাই, করে ফেলি হয়তো…. তিনি শুধু সোনাই দেননি, এটাও বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন যে – হকি খেলেও বিশ্বে নাম কুড়ানো যায়। Happy Birthday, the Wizard!

ঝাঁসির এক পাহাড় চূড়োয়…

তথ্যসূত্র – কথোপকথন https://www.storypick.com/hitler-and-major-dhyan-chand/

ফিচার ইমেজ – Suchita Karmakar 🙏

© শুভঙ্কর দত্ত ✍ || August 29, 2020