শুভ জন্মদিন – কামু মুখোপাধ্যায়….

সত্যজিৎ রায়। হ্যাঁ, ছোটোবেলা থেকে এই একটা পরিচালকের নাম আমাদের সবার চেনা। কত বড়ো মাপের পরিচালক ছিলেন। ধরুন, তারই বাড়িতে একদিন হুট করে চলে গেলেন আনকোরা কোনো অভিনেতা যিনি হয়তো আগে একটি সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন। হ্যাঁ, ঠিক এমনটাই করেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। ওনার যে সাহসের ওপর ভর করে সত্যজিৎ রায়ও স্বস্তির ঘুম দিতেন, মানুষটি এরকমই ছিলেন। হঠাৎ করেই একদিন ‘মাণিকদা’র বৈঠকখানায় গিয়ে বলে বসলেন —‘আমি আপনার ছবিতে অভিনয় করতে চাই’। আক্কেলটা ভাবুন খালি। সত্যজিৎ রায় ফিরিয়ে দেননি। “চারুলতা” তে ছোট্ট একটা চরিত্রে সুযোগ দিয়েছিলেন। অতিথি শিল্পীই বলা যায়। অবশ্য তার আগে কামু মুখোপাধ্যায় জীবনের প্রথম অভিনয় করে ফেলেছেন “সোনার হরিণ” চলচ্চিত্রে….. উত্তম কুমার, তরুণ কুমার, ছবি বিশ্বাস, সুপ্রিয়া দেবী, কালী ব্যানার্জি, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কে ছিলো না সেই ছবিতে? তবুও নজর কেড়েছিলেন – ‘আবদাল্লা’!

Kamu's debut

অবশ্য ‘চারুলতা’য় কম স্ক্রিন প্রেজেন্সের জন্য দুঃখ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে, উনি বুঝিয়েছিলেনও যে – কম সময়ে মুন্সিয়ানা দেখানোয় আসল কথা। তারপর “নায়ক” মুক্তি পেলো, ভালোই সময় পেলেন কামু, প্রীতিশ সরকার এর স্পেকট্রাম কোম্পানির কথা মনে নেই? তবে সময় অল্প হোক বা বেশি কামু মুখোপাধ্যায় মানেই দারুন স্ক্রিন প্রেজেন্স… মনে আছে ‘হীরক রাজার দেশে’ র সেই পরোয়ানা দেখতে চাওয়া রক্ষীকে? যার উদ্দেশ্যে গুপিবাঘা গাইবে – “ধরো নাকো…. সান্ত্রী মশাই….!” ঐ ছোট্ট একটা রোল, তাতেই কামাল। মগললাল মেঘরাজের ডেরার ‘অর্জুন’কে ভোলার কথা নয় কারো…. কেরামতি দেখে ‘তনখা’ বাড়িয়ে দেয় মগনলাল, সেই ছুরি ছুঁড়ে সার্কাস দেখানো লোকটার ভূমিকাতেও…..,ঐ টুকু সময়েও কি এক্সপ্রেশন! শেষেরটা ছোঁড়ার পরে কোমর ধরে বসে পড়লেন, গোটা শরীরে পদকের ঝনঝন আওয়াজ। শোনা যায় “সোনার কেল্লা” তে একটা দৃশ্য বাদ দেওয়া হয়েছিলো। ‘মন্দার বোস’এর দুঃসাহসিক অভিযানের স্বাক্ষর ছিলো সেটা, খালি বোতলে বিছে ধরার দৃশ্য, সম্পাদকের কাঁচিতে যেটা জায়গা পেয়েছিলো, তাই দুঃখ করেছিলেন তিনি তার প্রিয় মাণিকদার কাছে। আসলে ঐ দৃশ্য একদম সত্যিই ছিলো। এমনই খল – ছল চরিত্রে তাঁর আদবকায়দা শিক্ষনীয় বিষয়।

Kamu as Guard

Kamu as Arjun

264-kamu-mukherjee-sonar-kella-01

Kamu ft Nayak

অভিনীত চরিত্রগুলি যেমন বিচিত্র ছিলো তেমনই ছিলো তার অভিব্যক্তি। এমনি কি আর “ফটিকাচাঁদ” এ হারুন-অল-রশিদ বা ‘হারুন’ ভরসা হয়ে ওঠে ফটিকের…. জাগলার হারুনই বোধহয় কামু মুখোপাধ্যায়কে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছিলেন নিজেকে মেলে ধরার, তাই তো এ চরিত্র বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রিয় সিনেমাপ্রেমীদের। ‘শাখা প্রশাখা’ তে মজুমদার বাড়ির লোকদের দেখা শোনার ভার তার ওপরেই, কতটুকু সময় আর? “সোনার কেল্লা”, “নায়ক” বা “ফটিকচাঁদ” এ কামুকে যতটুকু সুযোগ দিতে পেরেছেন সত্যজিৎ – সন্দীপ রায় মিলে…. ততটাও অন্যান্য পরিচালকরা তাদের সিনেমায় ব্যবহার করতে পারেননি। তবে যত স্বল্প সময়েরই রোল হতো কামু পর্দায় আসলেই একটা আলাদা ভালো লাগা ছিলো। কি তার চাহনি, কি তার সংলাপ ছু্ঁড়ে দেওয়া – সবেতেই যেন সব সময় একটা চ্যালেঞ্জের ছাপ। সত্যজিৎ রায় মারা যাবার পর তাঁর মরদেহের পাশে বসে অঝোর নয়নে কেঁদেছিলেন কামু, সর্বজনবিদিত সে কথা। কাঁদবেন নাই বা কেন — মাণিকদার মতো তাকে কেউ সাহায্য করেননি যে! বলে না ‘জহুরি তে জহর চেনে’, একদম সে রকমই ব্যাপার। কামুর সাহস আর অকুতোভয়ের ওপর ভরসা করে সত্যজিৎ রায় তাকে ইচ্ছেমতো রোল দিতে পারতেন, ছোট্ট একটা চরিত্রে কম সময় হলেও তাকে দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করতেন৷ “গুগাবাবা ট্রিলজি” র সব সিনেমাতেই তিনি আছেন কিন্তু চিনতে গেলেই হার মেনে যাবো আমরা। যেমন “গুপি বাঘা ফিরে এলো” তে ‘হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার’ বলে দৌড়ে যাচ্ছে গুপি আর বাঘা, পালকির ভেতরে এক রাজা আঙুর খেতে খেতে স্তব্ধ। মনে আছে নিশ্চয়? ভেবে দেখেছেন কি ঐ ছোট্ট একটা দৃশ্য, তাও কতটা স্মরণীয়, সৌজন্যে – অবশ্যই কামু মুখোপাধ্যায় ! “শতরঞ্জ কি খিলাড়ি” তেও আছেন। অন্যান্য পরিচালকরা তেমন উড়তে দেননি তাকে, সে “হংসরাজ” ছবিতে ‘দালাল’ হোক্ বা গৌতম ঘোষের “পার” ছবিতে পাটকলে কাজ দেওয়া ‘সর্দার’ এর চরিত্র – সবকটায় ছোটো, তবে ফ্রেমে এলেই আলাদা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন।

Kamu in HansarajKamu as kingKamu as SardarKamu in Sakha Prasakha

Kamu as Harun
ফটিকের হারুন…

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একটা সুযোগ দিয়েছিলেন, তার ”ফেরা” চলচ্চিত্রে, নাট্যদলের মালিকের ভূমিকায়। জমিয়ে দিয়েছিলেন, “মৌচাক” সিনেমাতেও, ঐ দেড় মিনিট – সুপারভাইজারের মাথা ম্যাসেজ করতে দেখবেন। বাংলা সিনেমাতে চরিত্রাভিনেতাদের রমরমা চিরকালই, নায়কদের ছাপিয়ে তারা জায়গা করে নেন। কিন্তু এই কামু ব্রাত্যই থেকে গেলে, স্বল্প সময়ে ওরকম স্ক্রিন প্রেজেন্স দিয়েও অন্যান্য বাঘা বাঘা পরিচালকরা তাকে সুযোগ তেমন দিতে আর পেরেছিলেন কোথায়? সে কথা টের পেয়েওছিলেন তিনি, নিজে মজা করে বলতেনও সে কথা – “মন্দার বোসের বাজার মন্দা”! সত্যজিৎ রায় খুব ভালোবাসতেন তার ‘মন্দার বোস’ কে। উনি মারা যাবার পর সেভাবে কামু মুখোপাধ্যায় সুযোগ পেলেন না, সন্দীপ রায়ও মনে রাখেননি। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তখনই হারিয়ে ফেললো প্রতিভাবান, অসমসাহসী এই অভিনেতাটিকে, যিনি বারবার দুঃখবোধ করেছেন স্বচ্ছন্দে জায়গা না পাওয়ার জন্য…. অথচ দেখুন কোনো নায়কের অভিনয়ে তাঁর অভিনীত চরিত্র ঢেকে যায়নি, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেই নামও কেউ কেউ এখনও মনে রেখেছেন, এটা হয়? এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। আজ তাঁরই জন্মদিন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের স্বর্ণযুগের প্রতিভাবান এবং প্রভাবশালী অতিথি শিল্পীকে তাই প্রণাম জানাই।

Kamu @ mouchak

সূত্র:: একাধিক ম্যাগাজিন এবং আমার দেখা সিনেমা

© শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর || June 14, 2020

‘হীরক রাজার দেশ’ পেরিয়ে তেলকুপিতে তিনমূর্তি

 

PANO_20181220_114704

হীরক রাজার দেশে যাবো…. বড়োই বসনা ছিলো বহুদিন ধরে। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে দেখেছি, লোকজনের করা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে দেখেছি। যতবার দেখি ততবার ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে৷

মাঝরাতে প্ল্যান হলো। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে ভোর ভোর মুখে মাজন নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম — উদ্দেশ্য – হীরক রাজার দেশ…. থুড়ি হীরক রাজার দেশ এর সেই শ্যুটিং স্থল। সেই কবে ছোটোবেলায় সিনেমা হলে দেখেছিলাম রাজসেপাই থেকে লুকিয়ে থাকা উদয়ণ পণ্ডিতকে…সেই ‘দড়ি ধরে মারো টান..’ — জয়চণ্ডী পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে সেলুলয়েডের দৃশ্যগুলো যেন সামনে এসে ধরা দিলো। যাই হোক্, এগোনো যাক্, আসলে আনন্দে আত্মহারা হলে যা হয় আর কি!

KGP-ASN প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চাপার পর যখন ঢুলুঢুলু চোখে আদ্রা পোঁছালাম, হেব্বি খিদে পেয়ে গেলো। আদ্রা স্টেশনের বিখ্যাত বেকারীর আইটেম কটা সাঁটিয়ে দিলাম। ট্রেন ছাড়লো, পরের স্টেশন — ডেস্টিনেশন রিচড, ততক্ষণে ঘড়ি বলছে ১০ টা ২০।
জয়চণ্ডী পাহাড় কি যাবো, স্টেশন চত্বরটা এতো মনোরম, আমাদের মতো ফটোগ্রাফি প্রেমী লোকজন সে স্টেশন ছেড়ে গেলে তো! এদিকে নিজেদের ফটোগ্রাফি নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অটো হাতছাড়া হলো, অতঃপর রিসার্ভ করতে হবে। দুচ্ছাই! যাই হোক্, জয়চণ্ডী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম অটো করে।

 ছবির মতোই সুন্দর জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন

সামনে জয়চণ্ডী পাহাড় — সেই সত্যজিৎ রায়, সেই…… চোখে স্থির। দেরী না করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে শুরু করলাম৷ বেশ চড়াই পথ বেয়ে উপরে উঠছি, একটা রোগগ্রস্থ, জীর্ণ ওয়াচ টাওয়ারকে ডানহাতি ফেলে একটু এগিয়ে যেতেই দেখি মা চণ্ডীর মন্দির। দেবীর নাম অনুসারেই হয়তো পাহাড়ের এমনতর নাম৷ পাশেই বজরংবলী মন্দির। পাহাড়ের একদম ওপরে এসে পুরো পাহারতলী চোখে ভাসছে, বিলম্ব না করে খচাৎ খচাৎ রব তুললো আমাদের তিনমূর্তির ক্যামেরা। মন খুশি করা ফটোগ্রাফি করে কিছুক্ষণ ধরে জয়চণ্ডীর রূপ দর্শন করে নীচে নামলাম, ততক্ষণে আমাদের অটেওয়ালার ফোন চলে এসেছে। এরপর যাবো – তেলকুপি, আগেভাগে বলা ছিলোই, রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে দামোদর তীরে ইতিহাসের শেষ প্রহরীকে দেখার ইচ্ছেটা ফেসবুকের দৌলতে। মাঝে দুপুরের আহারটা সেরে নেওয়া গেলো, রঘুনাথপুরেই। খাওয়া সেরে অটো আবার অটোতে গিয়ে বসলাম।
আহহহ কি রূপ৷ পুরো রাস্তা জুড়ে দূষণমুক্ত ঠাণ্ডা বাতাসে ‘খেতে পেলে শুতে চাই’ এর সমার্থক কিছু একটা অটোতেই হয়ে গেলো। চেলিয়ামার আগে ডানহাতি রাস্তা নিতেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। দূরে সাঁওতালডিহি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রাশি রাশি ধোঁয়ার পাক চোখে পড়লো, দু পসারী কাজু আর খেজুর গাছের মধ্য দিয়ে মখমলের মতো রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গাড়ি পড়লো গিয়ে এবড়ো খেবড়ো একটা রাস্তায়। অঙ্গভঙ্গি করতে করতে অটো এগিয়ে চলছে, তেলকুপির পথনির্দেশক সাইনবোর্ড পেরিয়ে যে রাস্তা পেলাম, তাতে শুধু আমরা পড়তেই বাকি রইলাম। অপকেন্দ্র বলের বদান্যতায় ব্যাগের থেকে বোতল ছিটকে পড়লো রাস্তায়, হু্শ হলো কিছু পরে। তারও পরে বেশ কিছুটা আসতে তেলকুপি ঘাটে এসে দেখি আদিগন্ত জলরাশি– দামোদর ছাড়া আর কি! ফিঙে গুলোর আমন্ত্রণে দূর থেকে দেখতে পাওয়া দেউলটার দিকে এগিয়ে চললাম….হলদে সবুজ সরষে ক্ষেতের মধ্য দিয়েই। সামনে এসে থ!! এবার জুতো মোজা খুলে, জিনসকে থ্রি-কোয়ার্টার করে জলভেঙে যেতে হলো এ পারে….জরাজীর্ণ দেউল, ইতিহাসের শেষ প্রহরী– রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া দামোদরের প্রান্তে বুক চিতিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে….অটোওয়ালার কাছ থেকে জানা গেলো আর একটা মাঝনদীতে,কিন্তু এখন আর নৌকা চলছে না, অতঃএব এতক্ষণ এর উদ্দীপনার সলিল সমাধী হলো। দেউলের সামনে বসে বেশ কিছুক্ষণ শান্ত স্নিগ্ধ দামোদরের রূপ উপভোগ করলাম। একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স যাকে বলে। বসে বসেই তেলকুপি নিয়ে গুগলবাবাজীর স্মরণাপন্ন হতে জানা গেলো বেশ কিছু তথ্য…..!

IMG_20181220_120246_HDR
পাকদণ্ডী পথের স্যাটেলাইট চিত্র 😛
IMG_20181220_114356_HDR
রুটি রুজির সন্ধানে
IMG_20181220_114841_HDR
পাতা ঝরার মরশুমে
IMG_20181220_123627_HDR
প্রবেশদ্বার
IMG_20181220_113946_HDR
টিলা আর কিলা
PANO_20181220_114628
শীতঘুম ওদের
IMG_20181220_115420_HDR
বিশ্বাস
IMG_20181220_113609_HDR
ওয়াচ টাওয়ার
IMG_20181220_113452_HDR
ফাঁক ফোঁকর
IMG_20181220_114045_HDR
জয় বজরংবলী
IMG_20181220_112256_HDR
ইয়ে দুনিয়া বড়ি গোল গোল গোল
IMG_20181220_114058_HDR
জয় মা চণ্ডী
IMG_20181220_123856_HDR
সত্যজিৎ রায় আজও বেঁচে
IMG_20181220_114250
পাহাড়ীয়া
IMG_20181220_122447
শেষের শুরু, ৪৯২ টা সিঁড়ি
IMG_20181220_115517_HDR
নৈসর্গিক

রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখন লোক গবেষকদের চর্চার বিষয়। তাঁদের মতে, তৈলকম্প লোকমূখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে তেলকুপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সাথে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দরেই জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দির নগরী।

১৮৭৮ সালে জিডি বেগলারের ‘রিপোর্ট অফ আ ট্যুর থ্রু বেঙ্গল প্রভিন্সেস’ রচনাতে এই তেলকুপির মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য মেলে। যেখানে বেগলার তেলকুপিতে মোট ২২টি মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আবার দেবলা মিত্রের ‘তেলকুপি- আ সাবমার্জড টেম্পল সাইট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বইয়েতে তেলকুপির মন্দির নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। তা থেকে জানা যায়, একদা তেলকুপিতে ২৫-২৬টি মন্দির বা দেউল ছিল। ফলে তেলকুপির অতীতের স্বণর্র্যুগ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

কিন্তু ব্যথা দেয় বর্তমান। কারণ দামোদরের উপরে পাঞ্চেত জলাধার তৈরির পরে এই মন্দিরগুলির বেশিরভাগই চলে যায় নদের গর্ভে। কোনও ভাবে মাথা উঁচিয়ে রয়ে গিয়েছে তিনটি দেউল। তার মধ্যে দু’টিকে বছরের প্রায় সব সময়েই দেখা গেলেও একটি শুধুমাত্র গরমকালে দামোদরের জল কমলে দেখা যায়। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে জলাধার তৈরি হলে হয়তো তেলকুপির ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আক্ষেপ আরও রয়েছে, টিকে যাওয়া ওই তিনটি মন্দির ও মূর্তিগুলিরও রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই।

লোক গবেষকদের একাংশের মতে, তেলকুপি নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় তৈলকম্প থেকেই তেলকুপি নামটি এসেছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, সংস্কৃতে তৈল মানে তেল। আবার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তৈল মানে এক ধরনের কর এবং কম্প কথাটি এসেছে মূলত কম্পন অর্থাৎ পরগনা। এ থেকে তাঁদের অনুমান, তৈলকম্প বা অধুনা তেলকুপি ছিল কর প্রদানকারী বা করদ রাজ্য। তেলকুপি নিয়ে প্রাচীন ইতিহাসে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে তৈলকম্পের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কবি লিখেছেন যুদ্ধে যার প্রভাব নদী, পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে, বিস্তীর্ণ পর্বত কন্দরের রাজবর্গের যিনি দর্প দহনকারী, দাবানলের মতো সেই তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর। আবার রামচরিতম কাব্যর উল্লেখিত রুদ্রশিখর যে তৈলকম্পের রাজা ছিলেন, তা জানা যায় জয়পুরের দেওলঘাটার বোড়ামে একটি শিলালিপি থেকে। সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্যে উল্লেখিত রুদ্রশিখর এই তৈলকম্পের রাজা ছিলেন। ততকালীন সময়ে বাংলায় পালযুগে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল.এবং ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিল জৈন ব্যবসায়ীরাই। যাঁরা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি তামাজুড়ি ও তামাখুন থেকে তামা এনে তৈলকম্প বন্দর থেকে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন।

 

IMG_20181220_144252
‘দেউল’ এর জলছবি
IMG_20181220_143732_HDR
শেষ প্রহরী আর সঙ্গে আমরা
IMG_20181220_142541_HDR
তেলকুপি -নিরালায়
IMG_20181220_141735
অবহেলা – তেলকুপির সর্দার
IMG_20181220_143412_HDR
ভগ্নাংশ
IMG_20181220_141517
শেষ প্রহরীর প্রহরীরা
IMG_20181220_141722_HDR
অস্তমিত সূর্যালোকের উদ্ভাসিত ইতিহাস

 

যাই হোক্, এতকিছু জানার পর ঘাবড়ে গেলাম, যে সত্যিই কোথায় চলে এসেছি। শহুরে আলো থেকে শত যোজন দূরেও দেউলটা এখনো ইতিহাসের স্বাক্ষর বয়ে চলেছে, রৌদ্র-ঝড়-দুর্যোগ মাথায় নিয়ো আরামসে ইতিহাসের শেষ প্রহরীর মতো স্থানুবৎ দণ্ডায়মান…..! যেন বলে যাচ্ছে — “এ শহর বা হিম গহ্বর কে আছো কোথায়?” বা “আয় রে ছুটে আয় রে তোরা…!”
যাই হোক্, আরো ছিলো নিদর্শন, পাশের কটা গ্রামের মানুষের দৌলতে, সে আর হলো না দেখা। অটো করে আবার ফিরে যেতে হবে, মনটা একটু খারাপ হলো৷ প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ…ঘুম আর ঢুলের সংমিশ্রণে কখন জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন চলে এসেছি খেয়ালই নেই। পাক্কা দুঘন্টা সময় হাতে, মুড়ি-ঘুগনি দিয়ে উদরপূর্তি করা গেলো।
অবশ্য তার আগে অস্তমিত সূর্যের আভায় দূরের জয়চণ্ডী পাহাড়টাকে বারে বারে…….!
হীরক রাজ্য জয়……! এবার?????

IMG_20181220_100312
ব্রেকফাস্টের ছবি শেষে দিলেও ক্ষতি নেই

 

 

 

IMG_20181220_120854
তিনমূর্তি

 

তবে এ যাত্রার পেছনে আর এক কাহিনী লুক্কায়িত, সে না হয় কোন এক অবসরে হবে। আপাতত…..

————————————————————-

তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা

ঋণ – গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || December 23, 2018