‘কণ্ঠ’ – এভাবেও ফিরে পাওয়া যায়

যখন উচ্চমাধ্যমিক পড়তাম, একটা গল্প ছিলো – স্টিফেন লেককের…. “Further Progress In Specialisation.” বাংলা সিনেমায় বিগত দশ বারো বছর ধরে এরকম বিশেষ বিশেষ বিষয় নিয়ে সিনেমা উপহার দিয়েছেন কৌশিক গাঙ্গুলি – নাম বলছি না, যে যার মতো করে মনে করে নিলেই ভালো। আর কেউ বানাননি বলবো না, কিন্তু এরকম ধারাবাহিকভাবে বানাননি কেউই। সেই তালিকায় এবার নবতম সংযোজন শিবপ্রসাদ-নন্দিতার “কণ্ঠ”….

কলকাতার এক রেডিও জকি আর জে অর্জুন (শিবপ্রসাদ) স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার ‘কণ্ঠ’ হারাবেন….. একজন লেখকের কাছে কলমটা যতটা প্রয়োজনীয়, হাতটা যতটা প্রয়োজনীয়, তার চেয়েও একজন রেডিও জকির কাছে তার কণ্ঠটা বেশি করে প্রয়োজন…বস্তুত একজন রেডিও জকির থেকে তার ‘কণ্ঠ’ কেড়ে নেওয়া মানে একটা মরা মানুষেই পরিণত হওয়া, সে কথা তো সিনেমা দেখতে দেখতেই পরিচালক জানিয়ে দিলেন।

কিন্তু সত্যিই ‘কণ্ঠ’ হারিয়ে গেলেই কি সব শেষ? রেডিও জকি তার শো এ জানাচ্ছেন – ” ইচ্ছেশক্তি যখন আছে, তখন তাকে হার মানাবে কে! কণ্ঠ যখন বলতে চায়,,তাকে আটকাবে কে!”

অর্জুন এবং পৃথা (পাওলি দাম) – দুজনেই বাচিক শিল্পী, সম্পর্কের শুরু – গভীরতা – বাঁধন সবটাতেই কণ্ঠের অবদান যে সবচেয়ে বেশি সে কথাও বারবার ফিরে এসেছে গল্পে। কিন্তু কণ্ঠ হারিয়ে যাওয়ায় ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকা একটা মানুষের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার তাগিদে সহায় হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। এ গল্পে অভিনেতাদের সাথে তাই আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিকেও কুর্নিশ জানাতে হয়। Laryngectomy র স্পেশালিষ্ট রোমিলা চৌধুরীর চরিত্রে জয়া এহসান এর এই অভিনয় সিনেমাটাকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করেছে বলে মনে করি।
Laryngectomy – এই শব্দটা খুব একটা পরিচিত নয়, যতই আমরা ক্যান্সার নামে মারণ রোগের কথা বলি না কেন!! কি সুন্দরভাবে এই শব্দটার মানে বুঝিয়ে দেওয়া হয় গল্পতে…. একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝতে পারবে, এই জায়গাটা দারুণ লেগেছে।

মাঝে মাঝেই সাসপেন্স এর একটা ঝটকা বয়ে চলবে। ভূত নিয়ে সাম্প্রতিক কালে বাংলা সিনেমা বহুল-চর্চিত, সেলুলয়েড এ শিবু আবার নিয়ে এলেন অতিপরিচিত “ভূতের রাজা” কে, ….. সিনেম্যাটিক উপস্থাপনা যাকে বলে…!

পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ছোট্ট ক্যামিওকে ব্যবহার করা হলো সুনিপুণভাবে….!!
যারা সিনেমা দেখতে বসে চিকিৎসার ধরন দেখে ইন্সট্যান্ট খিল্লি করতে যাবেন তারা একটু জেনে বুঝে করবেন, আসা রাখি— সিনেমার চিত্রনাট্যের খাতিরে এরকমটা করা হয়নি বলেই অন্তত আমার তা মনে হয়।

শিবপ্রসাদ এর পরিচালনা নিয়ে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন ওঠে…..! কিন্তু অভিনয়! সেটা আমি সেই “অ্যাক্সিডেন্ট” সিনেমা থেকে দেখে আসছি, কি অসামান্য অভিনয় দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব সাইলেন্টলি। এই সিনেমার অ আ ক খ সবটা জুড়েই তিনি….! তবুও বর্ণপরিচয় পূর্ণ হতো না যদি না জয়া এহসানের ওরকম একটা অসামান্য উপস্থিতি পেতাম..! পাওলি দাম নিজের জায়গায় দারুণ, নতুন করে বলার কিছু নেই। সিনেম্যাটোগ্রাফি নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়, বেশি কিছু নয়, সাহানা বাজপেয়ীর “সবাই চুপ” গানটাতে ক্যামেরার ব্যবহার দেখে সার্চ করতে বসি কে সেই ক্যামেরাম্যান! শুভঙ্কর ভড়– এই সেই ভদ্রলোক যার অনবদ্য কাজ “বাকিটা ব্যক্তিগত” কে অন্য মাত্রা দেয়।
এই সিনেমার বাড়তি পাওনা অবশ্যই — সিনেমার গানগুলো…. শুরুতেই তার ইঙ্গিত দিয়ে দেবেন স্বয়ং প্রসেন —- “অবাক জলে……… তুমি সেই গান বানানোর কারণ হলে….!”

তবে সবচেয়ে যেটা অসামান্য এবং প্রশংসনীয় লেগেছে সেটা হলো — ‘জুজু’ নামকরণ…! না দেখলে এই ভালো লাগার কারণ অবশ্য বোঝা যাবেই না। শেষ কালে নজরুলের ‘বিদ্রাহী’ কবিতা দিয়ে…… Laryngectomy ক্লাবের সকলে মিলে উপস্থাপন।

এই সিনেমা তাই আশার আলো….! রোগী – পেশেন্ট যে কতটা বন্ধু হওয়া দরকার তাও বলে, শুধু তাই নয়, সবকিছুকে ছাপিয়ে একটা ভালো বন্ধুত্বের গল্পও বলে, ‘কণ্ঠ’ হাতিয়ার করে বিখ্যাত নয়, বরং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প বলে। বাচিক শিল্পীদের শুধু নয় একই রোগে আক্রান্ত হয়ে কণ্ঠহৃত বহু মানুষের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক মৃত-সঞ্জীবনী….! কিভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আর মানবতার মেলবন্ধনে একজন স্বরযন্ত্র হারানো মানুষ কিভাবে ফিরে পাবে তার ‘কণ্ঠ’ জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে….! বাংলা সিনেমায় প্রতিযোগীতা কি পরিমাণ ফিরে এসেছে, তা বাতলে দেবে “কণ্ঠ”! সিনেমা দেখতে দেখতে আর জে চরিত্রে শিবুর কোনো ভালো পরিবর্ত খুঁজছিলাম, পেলাম না!! কুর্নিশ!! অভিনয়- জাস্টিফায়েড..!

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 18, 2019

নগরকীর্তন – বাঁচার অধিকার ওদেরও…

সিনেমাটা কেন দেখতে চান?
‘নগরকীর্তন’ এর দুটো টিকিট চাইতেই টিকিট কাউন্টার থেকে ইন্টারভিউসম প্রশ্ন ধেয়ে এলো….
বাংলাসহ সারাভারতে আলোড়ন করা বিশেষ এই সিনেমা দেখতে চাওয়া দুই বন্ধুকে এক বৃদ্ধের এই প্রশ্ন।

বললাম – ‘কৌশিক গাঙ্গুলি আমার প্রিয় পরিচালক…..! একটু ইয়ার্কি মেরেই বললাম, বাকিটা দেখে এসে বলি…!
ভদ্রলোক হাসলেন।
বললেন শুধুই এই কারণ….?

বললাম — না আসলে ঋদ্ধি কেও ভালো লাগে, সেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ থেকেই ফ্যান!
বললেন — ‘কৌশিক গাঙ্গুলি প্রিয় পরিচালক, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হয় উনি নিজেকে ঋতুপর্ণর জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন!’

টিকিট কাটা হলো৷
আসলে একটা পরীক্ষা পড়েছিলো কলকাতায়, দুই বন্ধু মিলে ট্রেনে আসতে আসতেই একটা প্ল্যান মাথাচাড়া দেয়, আর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ১ কিমি দূরত্বে সিনেমাহলে ‘নগরকীর্তন’ চলছে। সুরজিৎ বললো – ‘এ সুযোগ হাতছাড়া করলে অ্যাচিভমেন্ট বলে কিছু থাকবে…?’ এরকম গোছেরই কিছু। অতএব, চলো, এগিয়ে যাওয়া যাক্। ব্যস্ ‘মিত্রা’ দাঁড়িয়ে আছে!

টিকিট তো কাটলাম, দেড় ঘন্টা বাকি এখনো। এদিক ওদিক ঘুরছি, কিন্তু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সিনেমাটা দেখতেই হবে, অতিশয় আগ্রহকে সঙ্গী করে।

——————————————————————
সিনেমা শুরুর আগে কিছু কথা উঠলো।
এই গল্প সেইসব প্রেমের গল্প, যে গুলো আর পাঁচটা প্রেমের মতো নয়।
ভেসে উঠলো Tributed To…. কে হতে পারে? আরে, নান্ আদার দ্যান ঋতুপর্ণ ঘোষ…!
ছবির নীচে ইটালিক্সে লেখা
“পরজনমে হইও রাধা….”
বুঝতে বাকি রইলো না। সদ্য ‘সমান্তরাল’ দেখেছি৷ কৌশিক গাঙ্গুলিও আগে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বানিয়েছিলেন, মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ৷ তবে কৌশিক গাঙ্গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। সত্যিই তো সিনেমাটা কেন দেখতে যাবো?
‘ছোটোদের ছবি’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘শব্দ’ কেন দেখতে গিয়েছিলাম বা কেন দেখেছি?
কারণ উনি অন্যদের কথা বলেন, অন্যকিছু বলেন, সবাই যেটাকে নিয়ে ভাবেন না, যাদের নিয়ে ভাবেন না, উনি তাদের কথা তুলেই ধরেন। তাই…….! এটা অবশ্য বৃদ্ধকে বলা হয়নি৷

পরিমল-পরি-পুঁটি (ঋদ্ধি সেন) এই গল্প একদিকে চলতে থাকে, আর একদিকে….পুঁটির প্রেম চলতে থাকে, প্রেমিকের ওপর ভরসা করে চলতে থাকে জলে থেকে কুমীরের সাথে লড়াই করার অব্যহতির খোঁজ। শৈশব থেকে মনের মধ্যে পুষতে থাকা নারীত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আবদার — “শরীরে ভুল আছে মধুদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী) , শুধরে নিতে হবে….!”
সমান্তরালভাবে দুটো গল্প বলায় একটুও বোরিং লাগেনি, ততটাই সাবলীল লাগলো শুভজিৎ সিংহের কাঁচি চালালনোটা, অবশ্য আগেও ‘ছায়া ও ছবি’, ‘মাছের ঝোল’, ‘বিসর্জন’, ‘শব্দ কল্প দ্রুম’ এর মতো সিনেমাগুলিতে একই কাজ করেছেন।

বহুদিন আগে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ পড়েছিলাম, বেশ লেগেছিলো, সিনেমাটা দেখতে দেখতে বেশ ওটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যদিও সেখানে গল্প ভিন্ন। তবে সেই উপন্যাসের একজনের উল্লেখ ছিলো বারবার, সিনেমাতে দেখি স্বমহিমায় তিনি উপস্থিত – মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালকের মুন্সীয়ানা চোখে পড়লো, সোমানাথ থেকে মানসী হওয়ার লড়াই – গল্প সবকিছু বলিয়ে নিলেন তার মুখ দিয়ে, শুধু তাই নয়, বলিয়ে নিলেন – শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণভাবে মজে যাওয়ার ঘটনাটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার ফলে সিনেম্যাটিক ভ্যালু বেড়ে যায় বলেই মনে হয়৷

সিনেমার দৃশ্যপট এতো বাস্তব যে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়েও এই সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও বারবার মনে হচ্ছিলো এটা বোধ হয় খুব সহজ একটা ঘটনা৷ মধুদের পৈতৃক বাড়ি – নবদ্বীপ, যেখানে চিত্রনাট্য পৌঁছানোর পর থেকেই একটা ক্ষীণ উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হতে বাধ্য দর্শকদের মনে, যেটা তীব্র হয়, যখন দোলপূর্ণিমার আসরে মধু বাঁশি বাজায়, আর পুরুষরূপী নারীমনের পুঁটির আসল রূপ আচমকাই প্রকাশিত হয়ে যায়।

এরপরও আরো ঘটনা……! ঘটতেই থাকে….! শেষ আধ ঘন্টা দর্শকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দিতে বাধ্য, ভাবাতে বাধ্য। সিটে আরাম করে বসে থাকা ঘুচিয়ে দিতে সফল এই সিনেমা। ওয়াটসআপ-ফেসবুকের মাধ্যমে কিভাবে কোনো ঘটনা ভাইরাল করা যায় তা দেখাতেও ছাড়লেন না। ‘নগরকীর্তন’ নামটা বেশ ব্যঞ্জনধর্মী বলেই মনে হলো, নগর বা সমাজে চলতে থাকা অহরহ ঘটনাপ্রবাহগুলোকেই বলা হচ্ছে এখানে।
ঋদ্ধি সেন কেন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, তার সদুত্তর মিলবেই, কস্টিউম-মেক আপের সাথে যেভাবে পরতে পরতে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন, অসাধারণ….! (তাই দুটো জাতীয় পুরস্কার কস্টিউম আর মেকআপে, নগরকীর্তনের ঝুলিতেই) সাথে আবার ঋত্বিক থাকলে তো পাশের লোককে ভালো অ্যাক্টিং করতেই হবে….! আর্ট ডিরেকশন প্রশংসনীয়। কীর্তনের সাথে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঁশিকে, অনেক দুঃখের মাঝে একটা আনন্দের চোরাস্রোত বয়ে যায় দর্শকের অলিন্দ বেয়ে…..! সৌজন্যে – প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি….! ভালো লেগেছে সুজন মুখার্জি ওরফে নীলকে, মধুর বৌদির চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী যতক্ষণ ছিলেন ফাটিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যটা৷

মন ছুঁয়ে যায়, কীর্তনের মাধ্যমে বলা – “তুমি আমারই মতন জ্বলিও…” এই অকপট কথা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে….! রাধার প্রেমে মজে নিজেকেই রাধারাণী করতে উদ্যত।

সবশেষে বলতেই হয় কৌশিক গাঙ্গুলি আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন নিজেকে। অভিনয়ও করিয়ে নিলেন তাদের দিয়ে। ওনারা আশাবাদী এ সিনেমা দেখার পর মানুষজন তাদের হয়তো এতেটা অবজ্ঞা করবেন না। যাদের একঘর করে রাখে সমাজ, তিনি বারবার তাদের উপস্থাপিত করে গেছেন, বলে গেছেন সমাজকে পাল্টে নিতে ভাবধারা, কয়েকজনের বাঁচার মতো সমাজ কি আমারা গড়তে পারিনা, শ্রেনীশত্রু সৃষ্টি করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না…!
হলের টিকিট কাউন্টারের বৃদ্ধ মানুষটির দোষ খুঁজে পেলাম না বিশেষ, কারণ এ সিনেমা সবার জন্য নয়, কৌশিক গাঙ্গুলি বলেইছিলেন, এ সিনেমা রোজগারের জন্য বানানো নয়, এগুলো বানানোর পেছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো বোঝেননি….কবেই বা বুঝবেন।

কবেই বা বুঝবেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কেন আছেন এ সিনেমায়, কেন উৎসর্গ করার জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির নীচে লেখা

‘পর জনমে হইও রাধা…..’

© শুভঙ্কর দত্ত || February 25, 2019