“অনল অন্তরাল” – পর্দার ওপারের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল…

শেখর স্যারের সাথে পরিচয় আসলে ঝাড়গ্রামের সূত্রে৷ তখন মাস্টার্স করছি ওখানে। স্যারের লেখাপত্র পড়েছি কিন্তু জানতাম না উনি আমার কলেজেরই অধ্যাপক। তারপর আমার ঘোরাঘুরির জন্য বিভিন্ন সময় পরামর্শ নিতে হয়েছে।

শারদীয়া আনন্দবাজার ১৪২৭ এ উপন্যাস তালিকায় শেখর মুখোপাধ্যায় নামটা দেখে তাই অপেক্ষা করতে পারিনি। হাতে পাওয়া মাত্রই শুরু করে দিই। বেশ বড়ো উপন্যাস এবং খুব সহজ নয় আবার! তার সবচেয়ে বড়ো কারণ চরিত্রের ভিড়…! অনেক কিছুই জীবনে অপাঠ্য আমার, তবুও বলতে দ্বিধা নেই যে এই কাহিনীতে ঘটনার ঘনঘটা আর চরিত্রের প্রাচুর্য আমি আর কোনো উপন্যাসে পড়িনি৷ তাও প্রথম থেকে একদম শেষ পর্যন্ত অদ্ভুৎ মাদকতায় আমি পড়েছি। রাত জেগে পড়েছি, পড়ে ঘুমিয়েছি আবার উঠে পড়েছি। এরকম তিনবার নিয়ে বসতে হয়েছে! আর শেষ দিকে তো প্রবল টান, যেনো ভাঁটার টান। অনেক কথা বললাম, উপন্যাসের নামটা বলা হয়নি, — “অনল অন্তরাল”! সভ্যতা কালক্রমে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু সমাজ – সভ্যতার পর্দা ক্রমশ পিছিয়ে গিয়েছে…. অতলস্পর্শী যে সে! সূর্যাস্তের পরে যেমন অন্ধকার নেমে আসে, রাঙা আলোর ওপারের গল্প অজানা! সেরকমই পর্দাপতিত হলেই নেমে আসে আঁধার! অজানা থেকে যায় ওপারের ঘটনাপ্রবাহ! লেখকের কলমে উঠে আসে যবনিকার পেছনে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা, কালের নিয়মে একদিন যা এগিয়ে নিয়ে এসেছে আমাদের আর নিজেরা রয়ে গিয়েছে পেছনে!

কাল বললে আবার সাল-তারিখ বলতে হয়। তবে এ উপন্যাসের কাহিনী আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগের এবং এখনও হয়তো প্রবাহমান! পড়তে যখন শুরু করেছিলাম তখন এর বিশালতা বুঝতে পারিনি, কি হতে চলেছে আন্দাজ করতে পারিনি৷

একজন সাড়া ফেলেদেওয়া, মরণাপন্ন লেখকের বহুদিনের গবেষণার উপন্যাস সমাপ্ত করার ডাক পড়ে অমিতজ্যোতি নামের এক নবাগতর কাছে…. শয্যাশায়ী রেবন্ত রায় তাকে সবকিছু হস্তগত করেন! এরপর এই কাঁচা লেখকের উপন্যাস যাত্রা শুরু হয়। উপন্যাসের শুরুয়াত যে সময় দিয়ে সেটা ১৭৩২ সাল! এবার ল্যাপটপে উপন্যাসের গল্প টাইপিং এর মাধ্যমে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে চলতে থাকে পুরো গল্প!
ক্ষমা করবেন, এর চেয়ে বেশি কিছু বলা অসম্ভব।
আসলে গল্পটা একটা বহু দিন আগের এক সম্পর্কের সূত্র খোঁজা!
তবে গোটা কাহিনীতে সে কালের কোন দিকটা তুলে ধরেননি লেখক, আমি সেটা ভাবছি! কত রকমের গান হতো, সে সবও উল্লেখ আছে। হরু ঠাকুর এর নাম আছে! বললাম তো কে নেই এখানে…!
তার সাথে আছে জটিল থেকে জটিলতর সম্পর্কের বুনোট যা মানে না দেশ কালের বেড়াজাল। সতীদাহ থেকে শুরু করে বিধবা বিবাহ – কি নেই সেখানে? এরকম বাস্তব প্রেক্ষাপটের গল্প! যেদিকেই যাই চেনা চেনা গন্ধ! পারাং নদী? সেও চেনা! শোভাবাজার রাজবাড়ি? সেও চিনি! আসলে ইতিহাস টুকরো টুকরো! তারই বা দোষ কোথায়? যে যার গুছিয়ে নিয়ে বাকি ফেলে রেখে দিয়েছে, সেই তো ইতিহাস, সেই তো হেরিটেজ!
নবাব আলিবর্দি থেকে শুরু করে হেস্টিংস – ক্যানিং কে নেই? রবার্ট ক্লাইভ! ডিরোজিও — সব্বাই! নাম নিতে গেলে এ লেখা উপন্যাসের এক তৃতীয়াংশ হয়ে যেতে পারে! নতুন করে অনেক কিছু জেনেছি! কিছুদিন আগে গৌতম ভট্টাচার্যের “বারপুজো” পড়ে বলেছিলাম যে এই বইটাকে কোলকাতার লোকজন আপন করে নেবে, এক্ষেত্রেও তাই! পুরনো কলকাতার আরো একটা দলিল হয়ে থাকবে হয়তো। যেমন জেনেছি ছড়াগুলোর মানে! “গোবিন্দরামের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, নকু ধরের কড়ি, মথুর সেনের বাড়ি!” সেরকমই জেনেছি কিভাবে মেদিনীপুর আলিবর্দি খাঁ এর সাথে জড়িত! জেনেছি নবকৃষ্ণ দেবের রাজা হওয়ার গল্প, জেনেছি বহুবাজার থেকে বউবাজারের গল্প! শোভাবাজার রাজবাড়িতে বলি বন্ধ হওয়ার গল্প!আরও অনেক কিছুই! বলে হয়তো শেষ করা যাবে না। গল্প জেনে গেলেও তথ্য জানতে বইটা আবার পড়া যেতে পারে!

সবচেয়ে ভালো লাগার কারণ, গল্পের স্টাইল! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ি, পড়ার পর বুঝতে পারি – সবটাই লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত, শুধু টুকরো টুকরো ইতিহাসটুকু সত্যি। এক্ষেত্রে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে যতটা বলা হয়েছে, ততটার কতটা সত্য সে আমি জানি না, তবে ইতিহাসের এতো চরিত্রের ভিড়ে, এতো গল্পের ভিড়েও এক অদ্ভুৎ নেশার ঘোরে চুবিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে “অনল অন্তরাল”! এত সব ঘটনার মাঝে একবারও বিরক্ত লাগেনি! আসলে এভাবে ইতিহাস পড়ার সৌভাগ্য হয়নি৷ আমাদের আনাচে কানাচের গলিপথে যদি এতো অচেনা অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে, তার আস্বাদ নিতে কার না ভালো লাগে? অন্তত যেখানে পরীক্ষা দেওয়ার মতো যাতনা থাকে না….!

কতগুলো জিনিসের জন্যে আমি কুর্নিশ জানাবো ঔপন্যাসিককে….
এক, তিনি পুরো বছর আড়াইশোর ঘটনাকে টুকরো টুকরো ইতিহাস দিয়ে দারুন কোলাজ বানিয়েছেন, মাঝে মাঝে নিয়ে এসেছেন আজকের দিনে!

দুই, এমন কাহিনী লিখতে গেলে কতটা অধ্যবসায় প্রয়োজন হয়, তা গল্পের পরতে পরতে যে কোনো পাঠক অনুভব করতে পারবেন!

তিন, গল্প একটা নির্দিষ্ট ক্রোনোলজি কে ফলো করে গেলেও তার দেওয়া তিনটি বংশপুঁজি না দিলে পাঠকের কালঘাম ছুটে যেতো, অবশ্য এই উপন্যাসের পাঠকদেরও কম পরিশ্রম করতে হবে বলে মনে হয় না। এই দিক থেকে পুরোমাত্রাই জড়িয়ে রাখতে সক্ষম…. যে যত বেশি জড়াবে সে তত পিছনে তাকাবে।

চার, শিল্পী অমিতাভ চন্দ্রের অলংকরণ! এমন চমৎকার অলংকরণ বারংবার মনে করিয়ে দেয় পাঠক ভুলে গেলেও! তবে আরও দু তিনখানা তুলির টান থাকলে দারুন লাগতো।

আমাদের চেনা পরিধির মধ্যেও এমন অনেক হয়তো গল্প রয়েছে যা আবহমান কাল ধরেই পর্দার ওপারে…..! অবশ্য এমন পর্দা ফাঁসে অদম্য ইচ্ছে লাগে…. অবশ্য সূত্রও লাগে তার জন্যে….! আবার সে অনলে দগ্ধ হওয়ার ভয় থাকলেও চলে না। “অনল অন্তরাল”, প্রায় তিন শতকের একটা শহরের বিস্মৃত ইতিহাসের জীবন্ত একখণ্ড দলিল হয়ে বেঁচে থাকুক বাঙালির হৃদয়ে….একজন ক্ষুদ্র পাঠক হিসেবে এই কামনা করি! প্রণাম জানাই স্যারকে…. তার অধ্যবসায়কে নতমস্তকে আবারও কুর্নিশ! তবে এবার হয়তো শালধোয়ানিয়ার জন্য অসংখ্য রেবন্ত রায় গজাবে, আর আপনাকে তাগাদা দেবে! যাই হোক্ আপাতত মলাটবন্দী অবস্থায় চাই এই উপন্যাসকে!

তবে এ উপন্যাস পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে জনৈক কবির উক্তিটি – ”যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন..!”অবশ্য এরকম মনে হওয়ার কারণ অজানা।

পুনশ্চঃ সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কথা বলেছেন। এই মানুষটির সাথে মনে হয় মন্দিরময় পাথরার যোগসূত্র আছে।

© শুভঙ্কর দত্ত || August 25, 2020