ধ্যান ‘চাঁদ’ ফিরে আসুন…

১৯৩৫ সাল…
অ্যাডিলেডে একটি হকি ম্যাচ চলছে… দর্শক আসনে স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান, একজনের খেলা দেখে উচ্ছ্বসিত! বললেন – “He scores goals like runs in cricket…”

যাকে নিয়ে বলছেন তিনি মেজর ধ্যানচাঁদ! অবশ্য নামটা আসলেই ধ্যান সিং ছিলো। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন Indian Army তে যোগ দিলেন, তখন প্রখর দৃষ্টিশক্তি আর রিফ্লেক্সের জন্য চাঁদের আলোয় প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। মজা করে সতীর্থরা নাম দিলেন ”চাঁদ”, সেই থেকেই ধ্যান চাঁদ, নামের পরের “সিংহ” উবে গেলো। কিন্তু তার খেলা থেকে উড়লো না….! ছোটো থেকেই ধ্যানজ্ঞান ছিলো হকি স্টিকটা! পেয়ে গেলেন একটা রেজিমেন্টও, তখন চুটিয়ে হকি খেলা হতো সেখানে, হতো প্রতিযোগীতাও৷ কিভাবে সুযোগকে কাজে লাগাতে হয় সেটা ধ্যানচাঁদ শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। প্রথমে সুযোগ পেলেন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে, ব্যস্, নজর পড়লো জাতীয় নির্বাচকদের৷ চললেন কিউইদের দেশে, দুই ডজন থেকে মাত্র চারটে গোল কম করে সেই যে দ্বৈরথ শুরু হলো…. বাকিটা ইতিহাস৷ দেশে ফেরামত্রই আগে পেলেন Lance Nayak এর পদ।

খবরে…

আমস্টারডাম, অলিম্পিক – ১৯২৮
বেশ কিছু মাস আগে একটা খেলায় ইংল্যান্ড কে হারিয়ে দেওয়ায় ব্রিটিশরা কুটনীতি করে আমস্টারডামে ভারতীয় হকি দলকে পাঠালেন না, বেশ টালবাহানার পরে অবশ্য সেটা হয়। অবশ্য ১৯২৪ এর প্যারিস অলিম্পিকে পরিকাঠামোর অভাবে হকি রাখা না হলেও ১৯০৮ আর ১৯২০ এই দুবারই সোনার পদকটা পেয়েছিলো ব্রিটেনই! সুতরাং তাদের একটা ভয় ছিলোই। ভারতীয় দল প্র্যাক্টিস ম্যাচ থেকেই নজর কাড়তে শুরু করে। প্রথম ম্যাচ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ৬-০ তে জয়। তারপর একে একে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড এবং ফাইনালে ডাচরা! জয়ী ভারত! ধ্যানচাঁদ গোটা টুর্নামেন্টে করলেন ১৪ টা গোল। স্থানীয় সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হলো – “This is not a game of hockey, but magic. Dhyan Chand is, in fact, the magician of hockey.” এটাই অলিম্পিকে ভারতের প্রথম সোনা জয় এবং কোনো গোল হজম না করেই!

আমস্টারডামে প্রথমবার সোনার ছেলেরা

১৯৩২, লস অ্যাঞ্জেলস

প্রথম ম্যাচে জাপানকে ১১-১, ফাইনালে আমেরিকাকে ২৪-১…. এতো গোলের ফুলঝুরি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। সহোদর Roop Singh কে সঙ্গে নিয়ে দুই জনে মিলে গোল করলেন ২৫ টা। ক্রীড়াজগৎ আখ্যা দিলো Hockey Twins. দ্বিতীয় সোনা ভারতের সেই হকির হাত ধরেই।

Dhayn Roop Singh – the Hockey Twins

এরপর অধিনায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৩৩ সালে ভারতীয় হকির অন্যতম সম্মানজনক Beighton Cup এ Jhansi Heroes কে জেতান, পরেও অনেকবার বলেছেন সে ম্যাচটাই তার জীবনের প্রিয় ম্যাচ ছিলো, Calcutta Customs এর বিরুদ্ধে। তিনি বলতেন – If anybody asked me which was the best match that I played in, I will unhesitatingly say that it was the 1933 Beighton Cup final between Calcutta Customs and Jhansi Heroes. Calcutta Customs was a great side those days; they had Shaukat Ali, Asad Ali, Claude Deefholts, Seaman, Mohsin, and many others who were then in the first flight of Indian hockey.”

The Golen Era of Indian Sports

১৯৩৬ অলিম্পিক, আসর এবার বার্লিন, হিটলারের দেশে

বিভিন্ন দেশকে ৪০ টা গোল দিয়ে, একটিও হজম না করে ধ্যানচাঁদের ভারত ফাইনালে। গোটা বার্লিন শহর ভারতীয় দলের সাফল্য নিয়ে মজে গেলো। পোস্টারে ছয়লাপ সে শহরে – “Visit the hockey stadium to watch the Indian magician Dhyan Chand in action.” গোটা য়ুরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক উপস্থিত…। বলা হতে লাগলো – “The Olympic Complex now has a magic show too”.
ফাইনালে প্রতিপক্ষ – জার্মানি যারা ভারতকে প্র্যাকটিস ম্যাচে ৪-১ গোলে হারিয়েছিলো, একটু চিন্তিত ছিলো ভারতীয় শিবির। দলের ম্যানেজার পঙ্কজ গুপ্তা তখনকার দিনের একটা পতাকা আনলেন, যেটা জাতীয় কংগ্রেস ব্যবহার করতো, ত্রিরঞ্জিত! তেতে উঠলেন খেলোয়াড়রা! শুরু হলো খেলা! স্টেডিয়ামে অ্যাডলফ হিটলার! প্রথমার্ধে জার্মান গোলকিপারের সঙ্গে জোর সংঘর্ষে দাঁত খোয়ালেন ধ্যানচাঁদ, কিন্তু দমে যাননি! সতীর্থদের বললেন – ওদের উচিৎশিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে বল কন্ট্রোল করতে হয় ওদের শিখিয়ে দেবো৷ প্রথমার্ধে একটু আটকে রাখতে পারলেও, দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো সেই ধুন্ধুমার খেলা, নিজেদের অর্ধ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করলো জার্মানরা…. নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো The Wizard এবং কোম্পানি! ৮-১ গোলে জয় এলো, ফাইনাল জেতার হ্যাটট্রিক করে পরপর তৃতীয় বারের জন্য সোনা পেলো ভারত। উল্লেখযোগ্য অবদান দুইভাই ধ্যানচাঁদ সিং আর রুপ সিং এর।

The Wizard
হিটলারের দেশে সোনাজয়ী দল

এরপরেই সেই বিখ্যাত কথোপকথন, যা আজও ধ্যানচাঁদ কে নিয়ে কথা হলে বলতেই হয়। হিটলার এবং ম্যাজিশিয়ানের মধ্যে–

That conversation between Dhyan Chand & Hitler

হিটলারের প্রস্তাবের সামনেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে কথা বলেছেন তিনি৷ আবার বেশ মজার হলেও কোনো খেলায় গোল না করতে পারলে অভিযোগ জানাতেন গোলপোস্ট এর মাপ নিয়ে এবং দেখা যেতো যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তেমন ভুলটাই হয়েছে। ১৯২৬ থেকে ১৯৪৮ এর বর্ণময় কেরিয়ারে প্রায় ৪০০ র বেশি গোল করেছেন তিনি৷ তাঁর সম্মানার্থে দিল্লীর জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের নাম ২০০২ সালে পরিবর্তন করে করা হয়েছে Dhyan Chand National Hockey Stadium, দেশের বাইরেও এরকম নামকরণ হয়েছে৷ লন্ডনে একটি টিউব স্টেশন আছে তাঁর নামে, জিমখানা ক্লাবেও তিনি উজ্জ্বল অক্ষরে বিরাজমান। হকির জাদুকর বা ম্যাজিশিয়ানের জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই প্রতি বছর এই দিনটিকে ভারতবর্ষে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়, দেশের প্রতিটি কোণা থেকে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বদের পুরস্কার প্রদান করা হয় তাদের সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম গৌরবান্বিত করার জন্যে….

ধ্যান চাঁদ স্টেডিয়াম
রেজিমেন্টে…

১৯৫৬ সালে ভারতীয় আর্মি ছাড়ছেন যখন তখন তিনি ‘মেজর’…. আজ যখন ভারতীয় টিম অলিম্পিকে জায়গা পেতে হিমশিম খেয়ে যায়, তখন আমরা তাঁকে আমাদের দিবাস্বপ্নে অনুভব করতে চাই, করে ফেলি হয়তো…. তিনি শুধু সোনাই দেননি, এটাও বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন যে – হকি খেলেও বিশ্বে নাম কুড়ানো যায়। Happy Birthday, the Wizard!

ঝাঁসির এক পাহাড় চূড়োয়…

তথ্যসূত্র – কথোপকথন https://www.storypick.com/hitler-and-major-dhyan-chand/

ফিচার ইমেজ – Suchita Karmakar 🙏

© শুভঙ্কর দত্ত ✍ || August 29, 2020

শুভ জন্মদিন ‘ডন’…

সাল ১৯৭১
দক্ষিন আফ্রিকার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন ভর্স্টার এবং অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যানের বাদানুবাদ! বিষয়? — ক্রিকেটে জাতিবিদ্বেষ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা দল জড়িয়ে পড়ছে তাতে। কৃষ্ণাঙ্গদের জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না – এই নিয়ে সে দেশ তোলপাড়! ভর্স্টার এর মতে তাদের যোগ্যতা নেই। অষ্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের তরফ থেকে চেয়ারম্যান জানিয়ে দিলেন – “We will not play them until they choose a team on a non-racist basis.” তিনি জন কে রীতিমতো ভর্ৎসনা করে জানিয়ে দিলেন — তিনি আদৌ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বা গ্যারি সোবার্সের নাম শুনেছেন?

Cut to
সাল ১৯৮৬
স্থান – পলসমুর জেলখানা….
তৎকালীন অষ্ট্রেলিয় প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম ফ্র্যাসের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে, সে দেশের জেলবন্দী সংগ্রামী নেলসন ম্যাণ্ডেলার সাক্ষাৎপ্রার্থী তিনি… তাকে দেখা মাত্রই ‘মাদিবা’ র প্রশ্ন –
“Mr Fraser, can you tell me, is Donald Bradman still alive?”

স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান! আজ ২৭ শে আগষ্ট, আজ তাঁর জন্মদিন, ১৯৭১ এর সেই ক্রিকেট প্রশাসক যিনি ক্রিকেটে জাতিবিদ্বেষের প্রবেশ করতে দেননি। পরিসংখ্যানের আতিশয্যে ডুবে থাকা ব্র্যাডম্যান যে শুধুমাত্র সেরা ক্রিকেটার ছিলেন, তাই নয়, দারুন মানুষও ছিলেন। প্রাক্তন অজি ক্রিকেটার ট্রেভর বেইলির কথায় উঠে আসে সেই কথায় – “He was perfectionist, good at everything he did and very nice man as well”, অবশ্য ম্যাণ্ডেলা আর ডনের কখনো সাক্ষাৎ হয়নি৷ মাদিবা জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ব্র্যাডম্যান তাকে একটা ব্যাট উপহার দিয়ে পাঠান, তাতে লেখা ছিলো – ‘To Nelson Mandela, in recognition of a great unfinished innings’
এরকমই অনেক গল্প আছে ডনকে নিয়ে, তেমনই কিছু পরিসংখ্যান গল্পের মোড়কে শোনা যাক্

ডন ব্র্যাডম্যান এবং তার প্রিয় সাথী

🏏 ৮০ টা ইনিংসে (১০ টা নট আউট) ৬৯৯৬ রান, গড় – ৯৯.৯৪, বলা হয় শেষ ইনিংসে শূন্যের বদলে তিনি যদি চার রান করেও আউট হতেন, তাহলেও তার সর্বকালীন গড় একদম তিনের ঘরে পৌঁছে যেতো। চার্লস ডেভিস নামক এক বিজ্ঞানী তার গবেষণায় দাবী করেন ডনের গড় ১০০ হওয়াই উচিৎ। স্কোরিংয়ের ভুলে ১৯২৮-২৯ অ্যাসেজ সিরিজের টেস্টে তাঁর একটা বাউন্ডারি নাকি জ্যাক রাইডারকে দিয়ে দেওয়া হয়। ওই বাউন্ডারিটা পেলে টেস্ট গড় ১০০ই দাঁড়ায়।

Sachin and Warne met Don on his 90th Birthday

🏏 এক ব্র্যাডম্যান পাগল গবেষক অনেক বছর রিসার্চের পর বলেন যে ডনের পূর্বসূরিরা ইতালীর লোক। পরে জানা যায় তার দাদু জাহাজি ছিলেন, উদ্দেশ্য ছিলো ডাচেদের দেশ কিন্তু পথ ভুলে চলে আসেন সিডনি। এই ভুলটা না হলে হয় তো এমন কিংবদন্তিকে পাওয়া যেতো না যাকে নিয়ে সে দেশের ক্রিকেটার বিল উডফুল বলেছেন – ‘ডন তিনজন অজির সমান’।

🏏 ১৯৪৮ সাল। ভারতে এক আঞ্চলিক দলের সাথে ক্রিকেট খেলছিলো মহারাষ্ট্রের দল, নিম্বলকর নামে এক ব্যাটসম্যান যখন ৪৪৩ রানে অপরাজিত তখন দুই দল এবং আম্পায়ার মিলে সেই ম্যাচটি আর না খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ? ডন ব্র্যাডম্যানে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান ৪৫২, তাই তাদের মনে হয়েছিলো এটা করাই বোধহয় সম্মান জানানো যাবে। একই ঘটনা ঘটেছিলো একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে, অধিনায়ক মার্ক টেলর ব্যাট করছিলেন ৩৩৪ রানে, অপরাজিত। ব্যাট না করার সিদ্ধান্ত নেন। তার মনে হয়েছিলো – ‘স্যার’ কে টপকানোটা ঠিক হবে না৷ কারন – ডন ব্র্যাডম্যানের টেস্ট কেরিয়ার এর সর্বোচ্চ স্কোর ৩৩৪…

সেই প্র্যাক্টিস

🏏 ডন এর শৈশব কেটেছে বাউরালে, সিডনি থেকে বেশ দূরে! তার জীবনের প্রথম শতরান তিনি এখানেরই একটা স্কুলে পড়ার সময় করেন ১২ বছর বসয়ে স্কুল ক্রিকেটে। এইখানের শেফার্ড স্ট্রিটে তাঁর বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দান করেছিলেন স্বয়ং শচীনও। বলা হয়, এখানেই একটা পুরোনো জলট্যাঙ্কিতে একটা স্ট্যাম্প দিয়ে আর গলফ বল দিয়ে প্র্যাকটিস করতেন, যা তার রিফ্লেক্সে সাহায্য করেছিলো।

Bradmanesque

🏏 ব্র্যাডম্যান প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে একই দিনে ২০০ বা তার বেশি রান করেছেন — এমন ঘটনা ২৭ বার ঘটেছে। সুতরাং, বলা যায় তিনি বোলারদের ওপর বেশ কর্তৃত্ব বজায় রেখেই খেলতেন। পরবর্তী কালে Collins English Dictionary তে ডনের এই ডমিনেটিং দৃষ্টিভঙ্গির সম্মানে “Bradmanesque” শব্দটি কে ঠাঁই দেওয়া হয়, যার অর্থ হলো বিপক্ষ দলের বোলারকে ডমিনেট করা।

🏏 প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট নিয়ে কথা উঠলে বলতে হয় — এই লোকটি ১০০টার বেশি শতরান করেছিলেন এবং সেটা ২৯৫ ইনিংসে, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যাণ্ডের ডেনিস কম্পটন করতে নিয়েছিলেন মাত্র ৫৫২ টি ইনিংস!

🏏 ডনের সময়কালেই তাঁর তীব্র কম্পিটিটর ছিলেন ‘ওয়ালি’ হ্যামন্ড! গড়ের দিক থেকে তো তাইই। কিন্তু মজার কথা হলো ডন সারাজীবনে টেস্ট কেরিয়ারে কুড়ি ওভার বল করে দুটিই উইকেট পেয়েছিলেন এবং তার মধ্যে একজন ইংল্যান্ডের হ্যামন্ড৷ যদিও প্রথম শিকার ক্যারিবিয়ান ইভান ব্যারো।

🏏 ডনের অধরা রেকর্ডের মধ্যে একটা ৯৭৪ রান, পাঁচ ম্যাচের টেস্টে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে । যেটার কাছে গিয়েছিলেন একমাত্র ওয়ালি, ৯০৫ রান। তাছাড়াও টেস্ট সিরিজের সেরা গড় – ২০১.৫, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে, এটাও অধরা!

🏏 হ্যারাল্ড লারউড, ডগলাস জার্ডিন খ্যাত ১৯৩২-৩৩ এর বিখ্যাত বডিলাইন সিরিজের প্রথম টেস্ট থেকে ডন ব্র্যাডম্যানের সরে যাওয়া নিয়ে ইংল্যান্ড শিবিরে দারুণ হাসাহাসি চলতো। ডন ব্র্যাডম্যান অবশ্য মুখরক্ষা করেছিলেন – ৫ ম্যাচের এই অ্যাশেজ সিরিজে ব্যাটিং গড় ছিলো ৫৬.৫৭! জ্যাক ফিঙ্গলটন নামের এক অজি ব্যাটসম্যান বলেছিলেন – এই সিরিজ ব্র্যাডম্যানের স্টাইলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। বস্তুত এই সিরিজেই ডন জীবনে প্রথম এবং শেষবারের জন্য প্রথম বলে শূন্যরানে আউট হন! পরে লারউডকে এই সিরিজ নিয়ে জিগ্যেস করা হলে তিনি বলেন –
“Bodyline was devised to stifle Bradman’s batting genius. They said I was a killer with the ball, without talking into account that Bradman, with the bat, was the greatest killer of all.” 

সামরিক বাহিনীতে

🏏ব্র্যাডম্যান তার কেরিয়ার চলাকালীন দেশের মোট টেস্ট রানে ২৬ শতাংশই কন্ট্রিবিউট করেছিলেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ এই ছ বছর তার ক্রিকেট জীবন স্তব্ধ ছিলো কারণ তিনি ১৯৪০ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সে দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে, আবার Air Force এও ছিলেন।

Such an Australian Cricketer

🏏 ভারতীয় ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে ছয় ইনিংসে তাঁর গড় ১৭৮.৭৫, এই সিরিজেই একমাত্র ভারতীয় হিসেবে বিজয় হাজারে তাকে শিকার করেছিলেন। ১৯৪৭-৪৮ এর এই সিরিজের একটা আলাদা গুরুত্ব অবশ্য আছে। প্র্যাকটিস ম্যাচের পর বিল ব্রাউনকে ভিনু মানকড় একটি টেস্টে আবারও সেই বিতর্কিত ”মাকড়ীয়” রান আউট করেন। ধারাভাষ্যকার এবং সংবাদপত্রে ভারতীয়দের স্পিরিট নিয়ে প্রশ্ন ওঠে…! পরে ব্র্যাডম্যান তাঁর আত্মজীবনী “Farewell to Cricket” এ লেখেন – “For the life of me, I can’t understand why (the press) questioned his sportsmanship. The laws of cricket make it quite clear that the non-striker must keep within his ground until the ball has been delivered. If not, why is the provision there which enables the bowler to run him out? By backing up too far or too early, the non-striker is very obviously gaining an unfair advantage.”
এটাই স্যার ডন ব্র্যাডম্যান।

🏏 নামের আগে ‘স্যার’ কেন? কারণ তিনি ‘নাইটহুড’ সম্মানে ভূষিত এবং এখনও পর্যন্ত এই উপাধিতে ভূষিত একমাত্র অস্ট্রেলিয় তিনি৷

🏏 নার্ভাস নাইন্টিন নিয়ে আমরা কত কথা বলি। তিনি কখনো ৯০ এর ঘরে গিয়ে আউট হননি৷ আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে অন্তত তাই-ই।

🏏 অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত প্রদেশ এবং প্রদেশের রাজধানীতে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটবোর্ডের যে অফিস আছে সব অফিসের পোস্টঅফিস নাম্বার ৯৯৯৪। এটি স্যার ডনের ব্যাটিং অ্যাভারেজ ৯৯.৯৪ এর সম্মানে।

PO – 9994

🏏 আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে মোট ছটা ছয় মেরেছিলেন, তার মধ্যে একটা ভারতের বিরুদ্ধে আর বাকিগুলো ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে। মজার কথা হলো সারাজীবনে তার বাউন্ডারি আর ওভার বাউন্ডারির পাশে দুটো পাঁচ রানও আছে।

🏏 ১৯৭৮ এর দিকে, ডনের অ্যাডিলেডের বাড়িতে আড্ডাতে এককালের বিশ্বত্রাস জেফ থমসন। রসিকতা করে একজন বলেন আজকের ডনকে কি থামাতে পারবেন থমসন! তৎক্ষনাৎ চ্যালেঞ্জ লুফে নেন দুইজনই! তবে নিরাশ হতে হয়েছিলো জেফকেই। মানে খেলা ছাড়ার তিরিশ বছর পরেও এমন রিফ্লেক্স দেখে তাজ্জব বলে গেছিলেন জেফ, যিনি সবে আট বা ন বছর রিটায়ানমেন্ট নিয়েছেন।

পিয়ানোবাদক

🏏 স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান এর ক্রিকেট শিল্প নিয়ে তো বিস্তর কথা হয়। কিন্তু তিনি আর্টিস্ট ছিলেন যথেষ্টই! ২০১৮ তে আইসিসি একটি প্রতিবেদন বের করে – A Band Of Cricketers, তাতে দেখা যায় মিউজিকের প্রতি তার আগ্রহ। 1930 সালে ”Everyday is a rainbow day for me” বলে একটা গানের রেকর্ড পাওয়া যায়, পিয়ানোবাদক হিসেবেও তার রেকর্ড আছে, ‘Old fashioned locket’ এবং ‘Our bungalow of dreams’ এবল দুটিই ১৯৩০ ইংল্যান্ড সফরে, কলম্বিয়া রেকর্ড স্টুডিও তে করা সেসব। এইসব জিনিসপত্র অবশ্য অনেকদিন চাপা পড়েছিলো, ডোনাল্ড এর নাতনি এগুলো উদঘাটন করে।

🏏 শুধু তাই নয়৷ ১৯৩৬ সালে National Production Ltd.এর সাথে তার চুক্তি হয় এবং সে চুক্তি অনুযায়ী – কোনো সিনেমায় ক্রিকেট খেলার দৃশ্যে তাকে অভিনয় করতে হবে, মানে প্রধানত তার খেলার দৃশ্য দেখানো হবে৷ এই মর্মে একটাই মাত্র পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিতে দেখা যায় — “The flying Doctor”, সেখানে দিনের শেষে নায়ক (যিনি দর্শক) একজন খেলোয়াড়ের সাথে হাতাহাতিতে জড়িয়ে জেলখানার পথ দেখবেন। এই সিনেমার একটি দৃশ্যে ডন ব্র্যাডম্যানকে খালি গায়ে দেখার সৌভাগ্য হয় দর্শকদের।

ফিল্মে ব্র্যাডম্যান

🏏 রাস্তাঘাট তো নামকরণ করা হয়ই। কিন্তু ব্র্যাডম্যানকে শ্রদ্ধা জানাতে সেদেশের একটা ”বোয়েয়িং” এয়ারক্রাফট কে স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের নামে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয় গন্ধে ও বর্ণে অতুলনীয় Meilland International SA Breed নামের এক গোলাপ ফুল এর নাম Sir Don Bradman Rose রাখা হয়েছে।

এটিই সেই বিখ্যাত গোলাপ ফুল

🏏 তিন ইনিংসে ৫০ গড় শুরু, তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি, সবসময়ই ৫০ এর বেশি গড় থাকা কিংবদন্তীর স্কুল জীবনে প্রিয় বিষয় ছিলো গণিত।

🏏 তার শৈশবে বাড়ি যেটা বাউরালের শেফিল্ড স্ট্রিটে, সেখানে সম্প্রতি একটি ক্রিকেট মিউজিয়াম খোলাও হয়েছে। একটি মূর্তিও আছে এখানে, মেলবোর্ন আর অ্যাডিলেডেও মূর্তি আছে এই কিংবদন্তীর৷

বাউরাল, শেফিল্ড স্ট্রিটে বাড়ি – এখন মিউজিয়াম

🏏 ডনকে নিয়ে অনেকে প্রশস্তি বাক্য শোনা গেলেও, আমার কাছে ওয়ালি হ্যামন্ড এর উক্তিটি সেরা, তখন ওয়ালি ক্যাপ্টেন — “I was forced to admire the cool way Don batted. On one or two occasions, when he was well set, and when he saw me move a fieldsman, he would raise his gloved hand to me in mock salute, and then hit the next ball exactly over the place from which the man had just been moved. Reluctantly I had to admit once more that he was out of the ordinary run of batsmen – a genius!”

জিম লিকার এর ভাষ্যে…

🏏 তবে এতো প্রশংসার পরেও স্বদেশীয় বোলার রডনি হগ বলেছেন যে ব্র্যাডম্যান এই যুগে খেললে হয়তো সেরা গড়ে পৌঁছাতে পারতেন না৷ রেডিওতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন – “Sir Donald Bradman was a freak, but I don’t think he would have averaged 99 now.”

ক্রিকেটার, নির্বাচক এবং ক্রিকেট প্রশাসক প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ‘ডন’ ছিলেন, স্বীকার করে নিতেই হবে৷ নিজের খেলার স্টাইল নিয়ে জিগ্যেস করলে বলতেন – “Predominately a back foot player” কিন্তু ৯২ বছরের জীবনে কখনো তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি।

শুভ জন্মদিন, স্যার ডোনাল্ড জর্জ ব্র্যাডম্যান৷

আবক্ষ ব্র্যাডম্যান

© শুভঙ্কর দত্ত ✍ || August 27, 2020

তথ্যসূত্র ::

১. আইসিসির প্রতিবেদন – https://www.icc-cricket.com/news/630331

২. নেলসন ম্যান্ডেলা সংক্রান্ত – https://www.news.com.au/nelson-mandela-from-his-prison-cell-can-you-tell-me-is-donald-bradman-still-alive/news-story/a69c4ff23df3f8767079ad1e42fb6e49

৩. শৈশবের বাড়ি – https://www.anandabazar.com/supplementary/anandaplus/special-write-up-on-don-bradman-by-gautam-bhattacharya-1.130014

৪. হগের জবানি – https://sportstar.thehindu.com/cricket/international/bradman-would-not-have-been-as-successful-today-rodney-hogg/article9528527.ece

৫. এছাড়াও অনেক দিন আগে পড়া বেশ কিছু পত্রিকা

শতবর্ষেও ‘জীবন্ত মানুষ’ – ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়

“মাসিমা মালপো খামু”
“ভোলা গুঁতো”
“আপনি অত্যন্ত পেট পাতলা লোক”
“আমরা গোরুর কেস করি না”
“আপনার ডাক্তার না হয়ে মোক্তার হওয়া উচিৎ ছিলো”

জন্মশতবর্ষে ”জীবন্ত মানুষ”…

বাংলা সিনেমা জগতের এরকম আরও অনেক সংলাপ দিয়ে তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন….! আজ তাঁরই জন্মের শতবর্ষ! ২৬ শে আগষ্ট, ১৯২০ খৃষ্টাব্দে তিনি বাংলাদেশের (তখন সবটাই ব্রিটিশ ইণ্ডিয়া) মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মোক্তার আর মা সুনীতাদেবী শিক্ষা দপ্তরের চাকরি করতেন! সরোজিনী নাইডুর আত্মীয়া তিনি আবার! অবশ্য এমন হাসাতে পারেন যিনি তার জন্ম যে পূর্ববঙ্গে হবে এমনটাই তো স্বাভাবিক, যদিও বাপ মা প্রদত্ত নাম ছিলো সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়। “সাম্যময়” থেকে “ভানু” হয়ে ওঠার গল্পটা এতো সহজ নয় অবশ্য! হতে পারতেন অভিনেতা বাদে অন্যকিছু – স্বদেশী বা বিপ্লবী বা হয়তো পার্টির সর্বময় কর্তা কিন্তু হলেন কি? ‘কমেডিয়ান’ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়। বলতেন — ছিলাম ‘বাঁড়ুজ্জে’, হয়ে গেলাম ‘ভাঁড়ুজ্জে’…! অবশ্য শুরুটা এভাবে হয়নি। খুব ছোটবেলা থেকেই গুরু মানতেন বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত কে। ছোটবেলা থেকেই তার সাইকেলে চেপে ঘুরেছেন বিস্তর। শুধু তাই নয়, বুকের মধ্যে নিষিদ্ধ বই চেপে বা টিফিন বক্সে রিভলবার নিয়ে ঘুরেছেন, পাচার করেছেন। দীনেশ গুপ্ত মারা যাবার পর জড়িয়ে গিয়েছিলেন অনুশীলন সমিতির কাজে। তখন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে, বিজ্ঞানী সত্যেন বসু, রমেশচন্দ্র মজুমদার বা কবি জসীমউদ্দিনের প্রিয় ছাত্র তিনি, এদিকে পুরোমাত্রায় জড়িয়ে পড়েছেন স্বদেশী আন্দোলনে, হুলিয়া জারি হল তার নামে, ছাড়তে বাধ্য হলেন বাংলা, তাও আবার এক বন্ধুর গাড়ির ব্যাকসিটের পাদানিতে শুয়ে! ভাবা যায় এ পার বাংলায় আগমণটাও তার এরকম নাটকীয়ভাবে হয়েছিলো। এরকম স্বদেশী করা লোক কর্মজীবনের প্রথম দিকে অভিনয় করে বেড়ালেন বেশ কিছু নাটকে, অতঃপর পরিচালকদের নজরে পড়েন। প্রথম ছবি অবশ্য ‘জাগরণ’, ১৯৪৭ সালে, পরিচালক বিভূতি চক্রবর্তীর ডাকে স্টুডিওতে গিয়ে হাজির। পরিচালক বলে বসলেন দুর্ভিক্ষপীড়িত চিমসে চেহারা চরিত্রে তাকে অভিনয় করতে হবে৷ জানতে চাইলেন ভানু রাজি কিনা! ভানু ‘হ্যাঁ’ করতে দেরী করেননি। আসলে তখন ভানু বেশ রোগা ছিলেন, সেটা আমরা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ দেখলেই বুঝতে পারি। সাড়ে চুয়াত্তরেই ভানু প্রথম সাড়া ফেলে দেন, তার কারণ এক ঝাঁক নতুন অভিনেতা – অভিনেত্রীর কেরিয়ার শুরু হতে চলেছে একই ছায়াছবি দিয়ে কিন্তু ভানুর দিশি স্টাইলের কথাবার্তা তাকে আলাদা করে চিনতে বাধ্য করেছিলো। “মাসিমা মালপো খামু” – সংলাপটি তাই আজও প্রতিটা বাঙালির মুখে মুখে। রোগা চেহারার ভানু সেই প্রথম এক ঝাঁক জাত শিল্পীর মাঝেও নিজের স্বতন্ত্রতা তুলে ধরতে পেরেছিলেন, এই ছবি যদি ভালো করে দেখে থাকেন, তাহলে বুঝবেন যে একজন শিল্পী প্রতিটা আলাদা সিচুয়েশন মোতাবেক কেমন হাসাতে পারেন, এদিক থেকে তার মতো সিচুয়েশনাল কমেডিয়ান অভিনেতা বাঙালি আর দেখেনি! শুধু অভিনয় করে হাসাতেন না, বরং আজকাল ওগুলো দেখলে যেনো মনে হয় উনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন – এটাই কমেডি অ্যাক্টিং, আর পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছেন ওনার হাসানো আর কাতুকুতু দিয়ে হাসানোর মধ্যে। “সাড়ে চুয়াত্তর” এ মেসের মিটিং এ কেদারের উপস্থিতি, আমার মতো মেসে থাকা পাবলিকদের কাছে আদর্শ হয়ে থাকবে বোধ হয়। এর পর বেশ কিছু ছবি করলেও, কয়েকটি ছবি আজ অমরত্ব লাভ করেছে, যেমন – ”যমালয়ে জীবন্ত মানুষ”, ”৮০তে আসিও না”, “ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট”, “ভানু পেলো লটারি”, ”পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট”, “মিস প্রিয়ংবদা”…. এর মধ্যে কিছু কিছু ছবিতে ভানুই হিরো আবার টাকাও উনিই ঢেলেছেন। কিন্তু কতগুলো কমেডি, কতগুলো রোমান্টিক কমেডি, আবার বেশ কয়েকটি ছবিতে ভানু-জহরের যুগলবন্দী আমরা দেখতে পাই।

কেদার এর চরিত্রে ভিড়ের মাঝে


“যমালয়ে জীবন্ত মানুষ” নিয়ে কথা বলতে গেলে শেষ হবে না….. স্বর্গলোকে যমালয়ে ভুল করে তুলে এনে যে কি বিপদ করেছে সেখানের কর্মীরা…!একজন জীবন্ত মানুষ ধরে ধরে ভুল ধরছেন যমরাজ থেকে চিত্রগুপ্তের…। সিস্টেম বদলাতে বদ্ধপরিকর তিনি। সহাস্যে বলছেন ‘যতদিন আছি বুঝলে বিচিত্রগুপ্ত, অপঘাতে মৃত্যু নিয়ে একটা বিহিত করে যাই…’। বিপ্লবী অনন্ত সিংহ ছিলেন ছবির প্রযোজক — তার প্রথম দুটো সিনেমা ফ্লপ করলে, ভানু তাকে বরাভয় দেন। বাকিটা আমরা দেখতে পেয়েছি, আমার তো মনে হয় সিনেমাটা যতটা রোম্যান্টিক কমেডি তার চেয়ে বেশি স্যাটায়ার! স্বর্গলোকের প্রতিটা চরিত্রের সাথে তার কথোপকথনগুলো আলাদা আলাদা ভিডিও ফাইল করে রাখতে ইচ্ছে করে…. তিনি বলছেন – “সেবাই তো আমার ধর্ম, তার ওপর আমি আবার মানুষ!” একবারও ঐ চরিত্রে ভানু ছাড়া ইহ জগতের আর কাউকেই কল্পনা করা কষ্টের ব্যাপার। সিনেমাটি অবশ্য একটি হলিউড ফিল্ম থেকে অনুপ্রাণিত কিন্তু কে ওসব মনে রেখেছে। আবার এই সিনেমাতেই ভানুকে আমরা পেয়েছি দারুন রোম্যান্টিক হিরো হিসেবে…. মাধুরী – সিদ্ধেশ্বর এর প্রেমের দৃশ্যগুলো যেমন রোম্যান্টিক, তেমনই কমেডির। তার প্রেমিকা প্রেম করতে গিয়ে ভক্তিমূলক গান গাইছে, সেখানে পাশে বসে ভানুর মুখের অভিব্যক্তি গান শোনা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য। আবার ভানু-জহরের ঐ অপঘাতে মৃত্যু নিয়ে যে দৃশ্যটা ওটাও অসামান্য….ডুবলো কিন্তু মরলো না, অথচ সাঁতারও জানে না। উর্বশীকে নাচ শেখানোর দৃশ্য — ‘হাম হাম গুড়ি গুড়ি’ নাচ! এই সিনেমাটা দেখার পর ঐ ছোটোবেলাতেই যে এই নামটা নিয়ে কতবার হেসেছি, গুনে শেষ করা যাবে না, এমনকি এখনও! সেখানে নাচের নাম জিগ্যেস করতেই সিধুর অকপট স্বীকারোক্তি – “আগ্রহই হচ্ছে নাচের প্রধান অঙ্গ”, “নাচের একটা ভালো নাম থাকলে আর নাচতেই হয় না…”! এই জায়গাটাই চোখ ফেরানো যায় কি? যায় না।

সিধু হয়ে যমালয়ে

এরপর কথা বলতে গেলে “৮০ তে আসিও না” নিয়ে বলতে হয়, সেখানে আবার সমাজের এক অন্য রূপ, ব্যঙ্গের মাধ্যমে। এক বৃদ্ধের যুবকে পরিণত হয়ে যাওয়ার গল্প, আসলে গল্পটা কিন্তু অন্য – একজন বৃদ্ধের প্রতি তার ছেলেমেয়েদের অবহেলার গল্প। এই সিনেমাতেও ভানু আর রুমা গুহ ঠাকুরতার রসায়ন দেখার মত। “আমি এখন জল পুলিশের আন্ডারে” — এই সংলাপটিকে ভানু ছাড়া অন্য কেউ অমরত্ব দিতে পারতেন কি? মনে হয় না পারতেন বলে। আবার এ ছবিতে জহরও আছেন।

জল পুলিশের Under এ

“পার্সোনাল অ্যাসিসট্যান্ট” আরও একটা ছবি যেটা ভানুর নিজের ছবি, একদমই নিজের, রমাপদ গুপ্ত থেকে রমা গুপ্ত আর মিনতি মিত্র হওয়ার গল্প কোন্ ভানুপ্রিয় দর্শকের মনে নেই! ঐ ছবিতে মেদিনী দেবীর বাড়িতে পিয়ানো বাজানোর দৃশ্য আজও পেটে খিল ধরাতে বাধ্য, তরুন কুমার আর ভানুর বন্ধুত্বের যে সমীকরণ ছবিতে দেখতে পাই, সেটা দারুন লাগে। টাইপিং টেস্টের সময় ভানুর ভেকগুলো তীব্র হাসির উদ্রেক করে আট থেকে আশি – সবারই। এই ছবিটা অবশ্যি করার কথা ছিলো উত্তমকুমারের, কিন্তু মনমতো স্ক্রিপট না পাওয়ার কারণে তিনি সরে দাঁড়ালে ভানুর কাছে অফার আসে, লুফে নেন ভানু৷ নচিকেতা ঘোষ গান লিখে ফেলেছেন উত্তমকুমার আছে জেনে…. ভানু স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শুনে তিনি বলেছিলেন – যা ব্বাবা, ভানু থাকবে জানলে আমি গানই লিখতাম না। অবশ্য সিনেমা দেখে প্রশংসাই করেছিলেন।
ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে গল্পের অভাব নেই। তার বাড়িতে বসতো চাঁদের হাট। কে আসতো না? উত্তমকুমার থেকে সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী থেকে অনুপ কুমার, সোমিত্র চট্টোপাধ্যায়। বিকাশ রায়কে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন, উনি বাড়ি এলে নাকি ওনার পাশে বসতেন না, বসতেন পায়ের কাছে। ছবি বিশ্বাসও ছিলেন ভানুর ভীষন কাছের মানুষ, দিন দুবেলা ভেনোর বাড়ি আসা চাই-ই চাই। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিতে ছবি বিশ্বাস আর তুলসী চক্রবর্তীকে নেওয়া একরকম বাধ্যতামূলকই ছিলো।

রমাপদ থেকে রমা হয়ে মিনতি মিত্র

তারপর ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিট্যান্ট’ সিনেমাতেও সেই জুটি। বাংলা চলচ্চিত্রের জগতে কমেডি সিনেমা বললে এটা আসবেই….! আমি জানি না এরকম আসল নামেই অভিনেতার ভাগ্যে চরিত্র জুটেছে ক’জনের কপালে! ঐ ফিল্মে ‘কমলা’ তদন্ত উদঘাটনে আসা বৃদ্ধার সাথে ভানু – জহরের দৃশ্যটা দেখবার মতো। ভানুর মুখভঙ্গি আলাদা মাত্রা দেবে যখন বলবে “দুধ!, দুধ দেয়?” বা ”আমরা গোরুর কেস করি না”….. এগুলো সবই চলন্ত ফ্রেম হয়ে থাকবে!

আসল নামেই চরিত্র – অভিনয়

‘ভানু পেলো লটারি’ র প্রথমেই জহরের আগমণ আর ঐ ‘জহুরে’ বলে ডাক্ বলেই দেয় অফস্ক্রিনে তাদের বন্ধুত্বের গাঢ়ত্ব কতটা ছিলো। তখন খুব ছোটোবেলা, টিভিতে দিতো সিনেমাটা৷ ‘আমার এই ছোট্ট ঝুড়ি’ গানটাতে ভানুকে দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকতাম, এই ছবিতে ভানুর গোঁফটাই ছবির ডিএনএ। সাথে, জহরের পাশে একফ্রেমে বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। তারপর দুই ভানু সামনে আসার পর তো আরোই হাস্যকর।

ভানু তখন মধ্যগগণে…

ভানুর আরও একটি হিট ছবি “মিস প্রিয়ংবদা”, হাসির দৃশ্যের জন্য আগের ছবিগুলোর সাথেই যেটাকে স্মরণ করা হয়। বামা চরিত্রে তিনি যে বহুমুখী একটা অভিনয় করেছিলেন, সেটা দেখলেই মনে হয় কত বড় মাপের অভিনেতা ছিলেন…. তরুন কুমারের সাথে গলায় কাঁথা গলিয়ে ধূমপানের দৃশ্যটি বেশ হাস্যকর! মানে উনি যে চরিত্রটা করতেন, তাতে বাঁচতেন, আগের সবগুলোকে সেই মুহুর্তে ভুলিয়ে রাখতে পারতেন। সেরকমই একটা দৃশ্যে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন যেখানে প্রিয়ংবদা নামের মহিলা সেজে তিনি হরিধন বাবুর কাছে যাবেন তাকে পটাতে! এ দৃশ্য দেখার পর ঐ সিনেমার আগের হাসির দৃশ্য কিছুই আর মনে থাকে না।

তরুন – ভানু জুটিতেও

অনস্ক্রিনের ভানুর সেন্স অব হিউমর নিয়ে কথা বলি আমরা কিন্তু মানুষটার পর্দার বাইরের রসবোধ নিয়েও অগাধ কাহিনী আছে। ইষ্টবেঙ্গলের ভক্ত ছিলেন, শচীন দেব বর্মনের সাথে খেলা দেখতে গিয়ে তার থেকে ঝেঁপে খেয়েও নিতেন। ম্যান ম্যানেজার ছিলেন দারুন। শ্যুটিং এ তাকে দেখতে ভিড়! সামাল দিলেন ভানু! ঢাকার হস্টেলে পুজোর খাওয়া নিয়ে গোলমাল….. ভানু এলেন এগিয়ে, উচ্চকণ্ঠে ঘোষনা – কাউকে খাওয়ার দরকার নেই। রসিকতা করতেন গলা ছেড়ে…. প্রায়শই আড্ডাতে বলতেন – ‘‘আমার দশা ক্যামনে শুনেন। মা মারা গ্যাছে। শ্মশানে গেছি। চোখে জল। একটা লোক কাছে আইয়া কইল, আরে ভানুদা কী হইসে? কোনওক্রমে কইলাম, ভাই মা মারা গ্যাসেন। শুইন্যা হাসতে হাসতে চইল্যা যাইতে যাইতে কইল, ‘দ্যাখ, ভানুরে কাঁদলে কেমন লাগে!’ বুঝেন একবার! হালা, নিজে যখন শ্মশান যামু লোকে দেইখ্যা বলবে, ওই দ্যাখ, ভানুর মাথাটা কেমন নড়তাসে!’’ এইসবই তাঁর ভাগ্যবান পুত্র গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষ্যে পড়ি আনন্দবাজারে। কোলকাতা তার এতোটাই প্রিয় ছিলো যে মুম্বইয়ের ডাক প্রত্যাখান করেছেন সহজেই। গুরু দত্তের ‘পিয়াসা’ র অফার ছেড়েছিলেন। তবে বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ‘বন্দীস’, ‘মুসাফির’ সিনেমাতে অভিনয় করেছিলেন। আসলে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন আদ্যোপান্তো দেশীয় সংস্কৃতির মানুষ, চার্লি চ্যাপলিনের স্টাইলটাকে পুরোমাত্রায় দেশীয় স্টাইলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। বিকাশ রায়, ছবি বিশ্বাস এরা ছিলেন ওনার দাদার মতো, গুরু মানতেন…আর জহর? লোকজন ভাবতো এদের খুব কম্পিটিশন কিন্তু একটা ঘটনা সে সব তোয়াক্কায় করতে দিলো না — ভানু গাড়ি কিনেছে, স্টুডিও তে জহর সবাইকে ডেকে বলে দিলো — ভেনোই একমাত্র যে বাংলাদেশে কৌতুক অভিনয় করে গাড়ি কিনেছে। এটা ওর একার গাড়ি নয়, ভেনো প্রতি শনিবার আমার জন্য গাড়ি পাঠাস….. শারদীয়া এই সময় এ এটা পড়েছিলাম। আর ভানু সত্যিই তেল ভরে গাড়ি পাঠিয়ে দিতেন, নিজে ব্যস্ত থাকতেন, ট্যাক্সি তে চড়তেন আর জহুরে চষে বেড়াতো শহর। ভাবা যায়! আমরা শুধু রুপোলি পর্দায় দেখেই আহ্লাদিত হয়ে যায়!

পার্শ্বচরিত্র হলেও সমানে নজর কেড়েছেন

সেই কত ছোটোবেলায় দেখেছিলাম ‘ভ্রান্তিবিলাস’, এখনও মনে আছে তার “কিংকর” চরিত্রটাকে.. ঐ নিশিতে ডাকার সিনে তার যে অভিব্যক্তি এখনও চোখে লেগে আছে। “চৌরঙ্গী”র শাজাহান হোটেলের সবাইকে ভুলে গেলেও ভুলতে পারবো না ন্যাটাহরি কে! ঐ কোঁকড়ানো চুল আর গোল চশমার ছবি দেখলে যে কেউ বলবে ওটা নিত্যহরির অবয়ব। এগুলো সবই ভানুর পার্শ্বচরিত্র কিন্তু তাতেও দাগ রেখেছেন সমানে। ‘পাশের বাড়ি’ বলে একটা ছবি করেছিলেন কেরিয়ারের প্রথম দিকে, বেশ কিছু বছর পরে হিন্দিতে ‘পাড়োসান’ হচ্ছে, মেহবুব তো ভানুর কাছে চলে এলেন পরামর্শ নিতে, একই রোল যে। সাড়ে চুয়াত্তর এর কাজ দেখে কেষ্ট মুখুজ্জে প্রায় কোলে তুলে নিয়েছিলেন।

তবে ভানুর বেশ কিছু ছবির রেকর্ড আজ আর পাওয়া যায় না। বেশ কিছু বছর আগে ‘নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে’ ছবিটির সংস্করণ উদ্ধার করা হয়, নইলে বাংলা সিনেমার দর্শক ভানুর অভিনীত সেরা সিনেমাটা দেখা থেকে বঞ্চিত হতেনই। সারা জীবন কমেডি চরিত্রেই অভিনয় করিয়ে যাওয়া পরিচালকরা বোধ হয় বুঝতে পারেননি যে উনি সিরিয়াস চরিত্রেও সমান দক্ষ এবং এই ছবি তার প্রমাণ। প্রহ্লাদ চন্দ্র ঘোষ থেকে পরাশর ঘোষ থেকে সন্ন্যাসী – চরিত্রটা ভানু অসামান্য শিল্পনৈপুণ্যতায় তুলে ধরেছেন। এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন ওনার নিজের মেয়ে, বাসবী বন্দ্যোপাধ্যায়, শিশু শিল্পীর চরিত্রে! এই ছবিটা দেখার পরে হয়তো অনেক দক্ষ পরিচালকই হাত কামড়ে ছিলেন ভানুর জাত সঠিকভাবে না চিনতে পারার জন্য। এই ছবির কিছু গানের তালিম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিতে হয়েছিলো ভানুর স্ত্রীর কাছে, যিনি আবার নামকরা গায়িকা ছিলেন, আকাশবাণীতে গাইতেন। এই ছবির প্রথমার্ধ হাসালেও দ্বিতীয়ার্ধ যে কোনো মানুষকে কাঁদিয়ে দেবে এবং তার একমাত্র কারণ ভানুর অভিনয়।

নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া ভানু

ভানু, উত্তমকুমার থেকে শুরু করে জহর, অনিল চট্টোপাধ্যায় এনারা ‘অভিনেতৃ সংঘ’ করেছিলেন, কিন্তু একসময় উত্তমকুমার সেখান থেকে বেরিয়ে গেলে ভানু আঘাত পান, কাজ কম পেতে থাকেন। কিন্তু কখনোই বসে থাকেননি। রেডিও তে নাটক করলেন, হাস্যকৌতুক করলেন! তার কিছু কিছু নমুনা আজ আমরা ইউটিউবে পায়। বেশিরভাগটাই হয়তো আমরা সংরক্ষণ করতেই পারিনি। বেশ কয়েকবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পরে মারা যান ১৯৮৩ তে! মারা যাওয়ার পরের বছর তার শেষ অভিনীত সিনেমাটি মুক্তি পায় – শোরগোল। শুধু আক্ষেপ একটাই শুধুমাত্র কমেডিয়ান হয়েই রয়ে গেলেন। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এমনই একজন শিল্পী যিনি প্রতিটি চরিত্রে বেঁচেছেন, উত্তরসূরীকে শিখিয়ে গিয়েছেন কমেডি অ্যাক্টিং আসলেই কি, যিনি আদ্যোপান্ত বুঝিয়ে দিয়েছেন – দেশীয় সংস্কৃতিটাকে নিজের মধ্যে দিয়ে জনমানসে বাঁচিয়ে রাখার মাহাত্ম্যটাও শিল্প, যিনি বরাভয় জুগিয়েছেন পরিচালকদের মনে অথচ কত সহজ সরল এবং স্বতন্ত্র ভঙ্গিমায় নিজের হিট ছবিগুলো পর পর দিয়ে গেছেন….. জন্মশতবর্ষে এসেও তাই তিনি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে আছেন…..আসলেই তিনি “জীবন্ত মানুষ” !

ব্যক্তিগত জীবনে ‘ভানু’

সাহায্য — ১. শারদীয়া এই সময় (১৪২৬)
২. আনন্দবাজার পত্রিকার ” পত্রিকা” সংস্করণ

© শুভঙ্কর দত্ত || August 26, 2020

প্রসঙ্গ – হিউম্যানিটি

 

তখনও অফিসিয়ালি গ্র্যাজুয়েট হইনি। লাস্ট ইয়ারের পরীক্ষা দিয়েছি মাত্র। লাস্ট ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হতে না হতেই বা তারও আগে বেশ কয়েকটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্নাতকোত্তর এর ফর্ম ফিল আপ করতে দেয়।

আশেপাশের কোন বন্ধুর এটিএম কার্ড ছিলো না বলে আমার কার্ড দিয়ে অনেকেই ফর্ম ফিল আপ করতো। যা হোক্…..

সেবার বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ফর্ম ফিল আপ। আমার বন্ধু তাপস আমায় ধরেছে, সেই মিস ট্রান্সজাকশনের যুগে আমার অকুতোভয়ই হয়তো আমার কথা ভাবতে তাকে বাধ্য করে।

ফরম ফিল শুরু করলাম। তার আগে অবশ্য আমি ঐ একই কাজ করেছি। তাই ঐ ফরম্যাটটা মোটামুটি মনেই ছিলো। তবে যে জিনিসটা নিয়ে বলছি সেটা ভাসা ভাসা মনে পড়ছে।
রিলিজিয়ন এর জায়গাটায় আসতেই (ঠিক মনে নেই বানান করে লিখতে হয়েছিলো নাকি অপশনের মধ্যে চয়েস করতে হয়েছিল) তাপস থামিয়ে দিলো।
আমি তো অবাক৷ এমনিতেই বন্ধুটি যুক্তিবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য, ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসীও নয়, পরিবেশপ্রেমী এবং বিজ্ঞান-সচেতনতাটা তীব্রভাবে আছে।
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগে বললো – “ওটা অন্য কিছু করলে হয় না?”
( সম্ভবত কোনো অপশন থেকে বাছতে হয়নি তখন, তাহলে তো খবর হয়ে যেতো৷ আবার ফাঁকাও রাখা যাবে না, পাওয়ার প্লের মতো ম্যানডেটোরি)
আমি বললাম – “সে আবার কি?”
(দেখছি আমি…..)
বললো – “এই ধর যদি Others করে Humanism করি….!”

বলেছিলাম – “ধর্, তোকে প্রমাণ হিসেবে কিছু চাইলো, তখন কি করবি? কি দরকার ভাই, বেকার চব্ব করে! বাদ দে….”

টিকটিকর মতো ঘাড় নাড়লো আর একটা সল্প তীব্রতার ‘হুমমম’ ছেড়ে বললো — “যাক্ গে বাদ দে…”

বললাম – “দেখ ভাই তুই যে কাজ করিস তার জন্য তুই এমনিতেই মানবতাবাদী, তার জন্য খাতায় কলমে যাওয়ার দরকার নেই।”

আজ এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কতগুলো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে….

Religion – Humanity করলেই কি মানবতাবাদী হওয়া যায়?
নাকি নির্দিষ্ট কোনো ধর্মে থেকে মানবতাবাদী হওয়া যায় না?
মানুষের প্রতি যত দরদ তার মানে ধর্ম – হিউম্যানিটি হলেই থাকবে? অন্যথায়?
নাকি যে কোনো ধর্মই আমার চোখে এতো খারাপ হয়ে গেছে যে EMV এর NOTA মতো আশ্রয়ে গিয়ে বেশ হাওয়া লাগাতে পারবো?
কোনটা? জানতে ইচ্ছে করছে।

****** ****** ****** ******

© শুভঙ্কর দত্ত || June 1, 2019

“মন্দিরময় পাথরা”, আরো একবার

PANO_20170910_112720

আবার সেই পাথরা, সেই কাঁসাই এর পাড় বরাবর সারি সারি টেরাকোটার নিদর্শন!
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই!
ইয়াসিন পাঠানের আগলে রাখা ‘মন্দিরময় পাথরা’…

IMG_20170910_115804_HDR
পাথরার পথে

কিন্তু এবার আর দ্বিচক্রীকে বাহন করে নয়, ভাদর মাসের তপ্ত রোদের চোখরাঙানির সামনে সাইকেলে করে ১৪ কিমি যাওয়ার ইচ্ছা অবদমিত হতে বাধ্য। যাইহোক, শ্যামলা,  সৌমেন আর শিবাস কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, ও হ্যাঁ, অটো তে করে। অনেকদিন বেরোয়নি, ওরাও জোর করলো আর বেশ ভালোও হলো। এরপর থেকে প্ল্যানগুলো আশা করি কনভার্ট হবেই!

IMG_20170910_123944_HDR
যে তিনজনের অসম্ভব পুলক না থাকলে আজ যাত্রা হতো না!

***
বছরখানেক আগে একবার গিয়েছিলাম, বহু জীবন্ত জিপিএস কাজে লেগেছিলো। এবার যেনো আমিই ওদের জিপিএস। ঘুরতে ফিরতে বছরখানেক আগের স্মৃতি ফিরে আসছিলো, বইকি!

IMG_20170910_112231_HDR
কেউ কোত্থাও নাই

 

IMG_20170910_122401_HDR
বিচারালয়,

IMG_20170910_121535_HDR
অনেকদিন ধরে চলতিপথে দেখি, আজ পেলাম: “কেউ” বা “কেউমুক” — প্রায় বিলুপ্তির পথে কিন্তু! ধন্যবাদ পাথরা

IMG_20170910_123528_HDR
AAO MILO CHALE

তবে আগের বার এর চেয়ে এবার একটা জিনিস উপরিপাওনা ছিলো সেটা হলো Redmi Note 4 কিন্তু তাতে কি! ভেজা তুলোর ভাসমান মেঘের সেই চীরপরিচিত “শরৎ” স্পেশাল আকাশ উধাও!  যতই রেডমি হোক, ফটোশিকারিদের তো সেই দুর্মূল্য আকাশ সাপ্লাই করতে পারবে না! তাই না? অগত্যা, কিন্তু কিন্তু করে কাজ চালাতে হলো,  আর কি! এবার যে জিনিসগুলো মনে রাখা খুব প্রয়োজন,সেটা হলো, আর যাই ভুলে যান না ক্যানো, একখান গামছা না নিলে খুব কষ্ট করে; কাঁসাইয়ের বুকে ঝাঁপ মারার লোভ সম্বরণ করতে হবে কিন্তু।

*****
জনশ্রুতি মোটামুটি এরকম –

বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দি খাঁ জনৈক বিদ্যানন্দ ঘোষালকে রত্নচক পরগনায় খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে তহশিলদার নিয়োগ করলেন। তিনি ক্রমেই বিশাল ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে ফুলেফেঁপে উঠতে লাগলেন। নবাব আলীবর্দির বিষনজরে পড়লেন! কেন? God Knows!
হয়তো মুর্শিদাবাদের দরবারে উপঢৌকন পৌঁছে দেওয়াতে গাফিলতি হয়েছিল। নবাব হুকুম দিলেন, হাতির পায়ের নিচে ফেলে বিদ্যানন্দ ঘোষালকে থেঁতলে দেওয়া হোক !
কিন্তু  মাহুত শত চেষ্টা করেও হাতিকে একচুল নড়াতে পারল না। হাতির এই মহানুভবতা দেখে নবাব আলীবর্দি খুশি হয়ে বিদ্যানন্দ ঘোষালকে তৎক্ষণাৎ মুক্তি দিলেন ।

বিদ্যানন্দ ও তাঁর উত্তরসূরীরা একের পর এক মন্দির বানিয়েছিলেন পাথরায়। যা কালক্রমে পড়েছে ধ্বংসের মুখে । মন্দিরের ভেতর থেকে মূর্তি লোপাট করেছে চোরেরা। পুজো আচ্চাও হয় না বললেই চলে। বেশিরভাগ মূর্তিই লোপাট।

IMG_20170910_115714_HDR

IMG_20170910_121809

IMG_20170910_122204_HDR
নাটমন্দির, মাদুর থাকলে শুয়ে পড়তাম,ভেতরে

IMG_20170910_122056_HDR
হতে পারে কারাগার, হতে পারে দরবার

এখান থেকেই লড়াই শুরু হলো ইয়াসিন পাঠানের । পাশ্ববর্তী গ্রাম হাতিহল্কায় সাধারণ পরিবারের সন্তান ইয়াসিন। মাত্র ১৭ বছর বয়স থেকেই এই পুরাকীর্তির দিকে তাঁর নিখাদ ভালোবাসা। তাঁর উদ্যোগ, বাঁচাতেই হবে মন্দিরগুলিকে। ১৯৭১ সালে স্থানীয় লোকজনকে সচেতন করে শুরু হলো তাঁর ‘মন্দির বাঁচাও’-য়ের লড়াই। বার বার প্রশাসনের কাছে ধর্না দিয়েছেন। রাজ্য ও কেন্দ্রের কাছে শত শত বার দরবার করেছেন। অনেক লোক তাঁর এই আগ্রহকে প্রথমে ভালোভাবে নেয়নি, পরে অবশ্য ইয়াসিনের প্রচেষ্টা দেখে সবাই ইয়াসিনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

ইয়াসিন পাঠান ১৯৯০ সালে তৈরি করলেন পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ সমিতি। নিজের সামান্য উপার্জনের টাকা খরচ করে দৌড়েছেন কলকাতা-দিল্লি। পকেটের পয়সায় ছেপেছেন লিফলেট । তাঁর কথা জেনে তাঁকে উৎসাহ দিতে এসেছেন তারাপদ সাঁতরা বা ডেভিড ম্যাকাচ্চিয়নের মতো পুরাতাত্ত্বিকেরা। ইয়াসিন পাঠান লিখেছেন পাথরা নিয়ে “মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্ত” এবং “Archeological list and map of district Paschim Medinipur” নামে দুটি বই । অবশেষে ইয়াসিনের প্রচেষ্টা সার্থক হলো, ২০০৩-এ ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ পাথরার ৩৪টি মন্দির অধিগ্রহণ করেছে । ৩৪টির মধ্যে ১৯টির সামান্য সংস্কার হয়েছে।

IMG_20170910_125000_HDRIMG_20170910_112440_HDR

IMG_20170910_122723_HDR

IMG_20170910_115313_HDR
কলাবাগানের সাথে ইতিহাস

তথ্যসূত্র: কিছুটা Google এবং অবশ্যই “মুখপুস্তিকা”।

♦ তবে কি, মন্দির গুলোর বাইরে এবং ভিতরের দেওয়ালে এতো লেখালেখির বহর দেখে একটা জিনিস মনে আসবেই যে, এরা কি খাতা বা স্লেট এ লেখার সুযোগ পাইনি! ক্যামেরাগুলোও খুব চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল, সেদিক থেকে।

♦ পথনির্দেশিকা: মেদিনীপুর শহর থেকে ১৪ কিমি দূরে “পাথরা”। মেদিনীপুর বা খড়গপুর থেকে যেকোনো ভাবে আমতলা, অতঃপর অটো! হেলতে দূলতে ঠিক সারিবদ্ধ মন্দির এর সামনে নিয়ে গিয়ে ফেলবে। চিন্তা নেই!!

©শুভঙ্কর দত্ত, September 10, 2017

#মন্দিরময়_পাথরা #dS