সিমলিপাল অরণ্যের দিনরাত্রি…

IMG20200223065729-01
কুয়াশার চাদর পেরিয়েছি সবে….

পঞ্চলিঙ্গেশ্বর আর দেবকুন্ড ঘুরে বারিপাদায় হোটেলে উঠলাম। ঘুম না হওয়ার অনেক কারণ থাকলেও তার দায় মশককুলকে দেওয়ায় যায়। পরের দিন ভোরে উঠে প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়েছি, ড্রাইভার আসলো। নাম – শরৎ, আগের দিনই রাতে পরিচয় করে গিয়েছে সে। গাড়ি চললো, উদ্দেশ্য – সিমলিপাল, পিঠাবাটা (পড়ুন পিঠেব্যথা) গেট। আসলে সিমলিপাল ঢোকার একাধিক গেটই রয়েছে, কিন্তু রাস্তা সব গেট থেকে ভালো নয় বা দূরত্বও বেশি, আর বারিপাদা থেকে এই পিঠেব্যথার দূরত্ব অন্যান্য গেট এর চেয়ে কমই। আনন্দের আর সীমা নেই যখন জানলাম আমাদের ড্রাইভারদা বাংলা জানে, বাঙালীর এ যেন স্বর্গে হাতে পাওয়া।

IMG20200223064802-01
অজানার উদ্দেশ্যে..

(আসলে কথাটা সিমিলিপাল কিন্তু প্রচলিত শব্দ সিমলিপালই বলা হয়ে গিয়েছে বারবার)

IMG20200223153956-01
সূর্যলোক গায়ে মাখে এ অরণ্য
IMG20200223084426-01
অক্সিজেনের প্রাচুর্যে
IMG20200223091130-01
সর্পিল পথে অনন্ত বনরাজির পানে..

টিকিট কাটা হলো, গাইড এর জন্য বরাদ্দ টাকা দিতে হবেই। সে এবার গাইড কে গাড়িতে না নিলেও হবে আর আমাদের ড্রাইভার বেশ পরিচিত, সে ওসব থেকে বাঁচিয়ে দিলো নইলে গাড়ির মধ্যে দোকান রাখার বেশ অসুবিধা হতো বইকি! গাড়ি প্রবেশের আগে আমাদের চেকিং করলো একটা পুলিশ…. এলকোহল (এই টার্ম আমি এম এস সি পড়ার সময় শিখেছি) আছে কিনা! এরপর গেট খুলতে গাড়ি ঢুকলো সিমলিপাল জাতীয় উদ্যানে। দুপাশে ঘন জঙ্গলের মাঝের মোরাম রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চললো….প্রথম গেট আসলো ভজম বলে একটা জায়গায়….এরকম গেট আছে আরও চার বা পাঁচটা গোটা রাস্তায় কিন্তু আমার আর মনেও নেই। তখন বাজে প্রায় সাড়ে সাতটা। আমরা প্রথম গেটটা পেরোলাম আমরা। সুরজিৎ মোটামুটি ড্রাইভারের সাথে হিন্দিতে বাতচিত চালিয়ে যাচ্ছে, ভুলে গিয়েছে যে তিনি বাংলা বলেন, এবং বোঝেন, আমরাও ভাবছি ‘বাতচিত’ কখন বাক্যালাপে পরিণত হবে…!

IMG20200223111057-01
হেথা উর্ধ্বে উঁচায়ে মাথা দিলো ঘুম….
IMG_20200223_162220-01
যত আদিম মহাদ্রুম….

এরপর চলেছি, এক অজানা তালিকা কি কি দেখতে পাবো তা ভেবে, দূর থেকে ড্রাইভার এর চোখে পড়লো প্রমাণ সাইজের বনমোরগ। এবার নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার মধ্যেই বনের মধ্যে ঢুকে গেলো সে। আরও এগিয়ে চলেছি, একটা সবুজ পায়রা দৃষ্টি পড়তেই উড়ে মিলিয়ে গেলো…পাহাড়ি পথের বাঁকে মাঝে মাঝেই দেখা মেলে জলের…কোথাও শুকিয়েও গিয়েছে সেই জল। আসলে গহীন অরণ্যের বুক চীরে এগিয়ে চলা নদী বা ঝর্ণায় হবে। একটা জায়গা এলো.. গাছের পাতাগুলো দেখলেই যেন একটা বিশ্বাস জন্মে যায় যে এখানের বাতাস সবই বিশুদ্ধ। এরপর দুটো ময়ূর দেখা গেলো। আহহ, পরমেশ্বর যেন দুহাত দিয়ে গড়েছেন, চিড়িয়াখানায় খাঁচার ওপারে দেখা আর জঙ্গলে তাদের বাসস্থানে নিজস্ব ভঙ্গিমায় দেখা একদম আলাদা মাত্রা। একটা সম্বর দৌড়ে রাস্তা পার হলো। আমাদের দুর্ভাগ্য যে সাথে কারো বাইনোকুলার নেই। গাড়ি কখন যে একটু সমতল পেয়েছে ঠাহর হয়নি। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা ছেলেমেয়ের দল হাত নাড়িয়ে ওয়েলকাম জানাচ্ছে। পরে ভুল ভাঙলো। আসলে অনেকেই পুরনো জামাকাপড় দিয়ে যান এদের, ওরাও হয়তো বুঝেছে আমরা দেবো। আমাদেরকেও বলেছিলো কিন্তু সে কথা খেয়াল ছিলো না বিন্দুমাত্র। মনে মনে স্থির করলাম পরের বার আর হবে না।

IMG20200223101554-01
হল্ট স্টেশনের দোকান খানি
IMG20200223100003
সেই স্কুলবাড়িটা
IMG20200223100656
শুধু বেসনের পাকোড়া
IMG20200223145827-01
বেড়া হয় সব ঘরেরই…

সেখানে স্কুলবাড়িও রয়েছে, রয়েছে আস্ত একটা গ্রাম। আর অনেক সময় ধরেই চোখ পড়ছিলো যে এখানে বিদ্যুৎ দফতর তো পৌঁছায়নি কিন্তু সূর্যদেবতা আর বিজ্ঞানের পরম আশিষে সৌরকোষ দিয়ে চলে যায় এদের। মোবাইলের নেটওয়ার্ক জুড়ে শুধুই শূন্যতা। একজন বন্ধু বললো শুধু একটু নেটওয়ার্কটা লাগতো, আমরা দু একজন বললাম বেশ তো ভালোই লাগছে, নির্ঝঞ্ঝাট আছি। একটা দোকানে গিয়ে পকোড়া সাঁটানো গেল। এতো ওপরে মালপত্র আসে কিভাবে জিগ্যেস করতে ড্রাইভারের থেকে জানা গেল – গাড়ি আসে সপ্তাহে দু দিন। এরপর আবার চলতে শুরু করলো গাড়ি। যাচ্ছি জোরান্দা জলপ্রপাত, পশু-পাখি দেখা ছাড়াও আমাদের পিপাসা মেটানোর জন্য প্রথম গন্তব্যস্থল এটাই। পাহাড়ি রাস্তা ছেড়ে একটু সমতল পেয়েছে গাড়ি। শহুরে – সুবিধেবাদী সভ্যতা থেকে এতো যোজন দূরে এই পাহাড়ি এলাকায় ইঁটের বসতি দেখে ভিরমি খাই আমার মতো পর্যটকেরা। ড্রাইভারের শরণাপন্ন হওয়ার কিঞ্চিৎ পূর্বেই নিজেদের চোখেই দেখি একদল লোকজন ইঁট বানাচ্ছে, আর মাঠে কোদাল দিয়ে মাটি চোপাচ্ছে তিনজন শিশু, বয়স আট বছরও হবে না কারোর।

IMG20200223094938-01
|| মানুষের ঘরবাড়ি ||
IMG20200223095727-01
পাহাড়ের কোলে ঠাঁই হয়নি যাদের…
IMG20200223100050
বিদ্যালয়েরই অংশবিশেষ

টলতে টলতে পৌঁছালাম জোরান্দা জলপ্রপাত। প্রায় পাঁচশো ফুটের এই একধাপের জলপ্রপাতটি ওড়িশার অন্যতম মনোমুগ্ধকর জলপ্রপাত। ঝরাপাতার চাদর মাড়িয়ে হেঁটে পৌঁছালাম এমন একটা জায়গায় যেখান থেকে ঝর্ণাটাকে আধি দেখা যায়, অতঃপর সে জায়গায়….একটা ক্ষীণ স্রোত, খুব কম পরিমাণ জল নিয়েই পাঁচশো ফুট নীচে পড়ছে আর তাতে যে শব্দ সৃষ্টি করেছে সেটা দূরত্বে থাকা পর্যটকদের কানে এমন কিছু বেশি লাগছে না। মিহি সুরে কারা যেন কোরাস ধরেছে।

DSC_6830
ঝরাপাতার বিছানা মাড়িয়ে জোরান্দা অভিমুখে
IMG20200223110501-01
জানান দেয়… আমাদের অবস্থান
IMG20200223104435-01
নয়নাভিরাম…

ঘড়িতে দেখলাম এগারোটাও বাজেনি। কিন্তু এই জলপ্রপাত আর পাহাড়ের অসংখ্য গাছ-গাছালি মিলে এমন এক ধোঁয়ার সৃষ্টি করেছে যে কোনো ছবিই ভালো ওঠে না। সুরজিৎ এর প্ল্যান অনুযায়ী এক রকম টি শার্ট কেনা হয়েছিল, এবার শ্যুটিং এর পালা। একটু অন্যদিকে গিয়ে দেখলাম কতগুলো ঘর এর শুধু কাঠামো বর্তমান। ড্রাইভার পরে বলে দিলো তার কারণ- মাওবাদীদের উৎপাত।

IMG20200223111639-01
এ কি দৃশ্য দেখি অন্য…এ যে বন্য
IMG20200223111311-01
নীল রঙ ছিলো ভীষণ প্রিয়
IMG20200223104736-01
সন্তর্পণে…
IMG20200223110421-01
মধ্যমণি জোরান্দা…
IMG20200223111231
ফ্রেমবন্দী করে রাখার প্রয়াস…আমিও তুলে রাখি
IMG_20200223_104702
শ্যুটিং শেষে ফিরে যেতে হয়

আবার ঐ পথেই গাড়ি এসে একটা পথনির্দেশক বোর্ড চোখে পড়লো। ফেরার পথে চোখে পড়লো সেই দলটাকে। একজন বাচ্চা মেয়ে একটা কোলের বাচ্চাকে নিয়ে লোফালুফি করছে ঐ সদ্য বানানো কাঁচা ইঁটের সারির পেছনেই! গহীনে অরণ্যের রোমাঞ্চকে দশ গোল দেয় সে দৃশ্য, ক্যামেরাবন্দী করার সাহস হলো না। বরেহিপানি ফলস বেশ কিছু কিমি দূরত্বে। আমাদের গন্তব্য – বরেহিপানি। একটা গাড়ি পেছন থেকে এসে ধুলো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেলো। থেমে গেলাম আমরা কিছুক্ষণ, নইলে ঘনঘন গাড়ির আওয়াজে প্রাণীগুলির দর্শন পাবো না। খাওয়াদাওয়ার প্ল্যান শুরু হতে ড্রাইভার বললো যে এখানে দেশী মুরগী কিনে রান্না করিয়েও নেওয়া যায়, সে উদ্দেশ্য “কুকড়া হ্যায়?” অভিযান শুরু হলো কিন্তু সে অভিযান ব্যর্থ হলো। গাড়ি থামলো একটা হোটেলে। খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো…পাশেই একটা অস্থায়ী দোকানে শাল চিকেন বিক্রি হচ্ছে, অতএব একবার চেখে দেখা যাক্, তাই হলো। ম্যানেজার একটু খাদ্যরসিক হলে এসব উটকো খিদেতে সিলমোহর পড়তে বেশি সময় লাগে না।

IMG20200223123723
শাল চিকেন ওরফে স্বর্গ
IMG20200223123449-01
ছদ্মবেশীর দল…
IMG_20200306_172142
প্রস্তুত হয় যেমন করে…

খাবার অর্ডার দিয়ে বরেহিপানির উদ্দেশ্যে গাড়ি রওনা দিলো। এরপর রাস্তায় পড়লো হরিণ। গভীর জঙ্গল যেখানে একটু আলগা হয়েছে সেখানেই ওদের চরে বেড়ানো। একটা টাওয়ারও করা আছে আর তাকে ব্যবহার করা হলো না। আমরা দেখতেই ওরা ভেতরে ঢুকে গেলো। আবার আমরা যখন চলে গিয়েছি এরকম অভিনয় করলাম তখনই বেরিয়ে চলে এলো। যেন “লুকোচুরি” চলছে। আরও দেখতে পাবো এমন আশায় বরেহিপানির দিকে চরৈবতি। চলে এসেছি। জঙ্গলাকীর্ণ সে স্থানে একটা ওয়াচ টাওয়ার আর রেলিং দিয়ে ঘেরা একটা পাহাড়ের কিনারা থেকে দেখছি ওপারে সুউচ্চ একটা পাহাড় থেকে ঝর্ণার জল পড়ছে…. তবে এর উচ্চতা অনেক বেশি, সুরজিৎ জানান দিলো সব ধাপ ধরলে এটিই ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত। প্রায় ১৩০০ ফুটের কাছাকাছি, মানে জোরান্দার আড়াইগুণ। অনেক বেশি রোদ্দুর থাকার কারণে স্পষ্ট বোঝা গেলো। গাছ থেকে ঝরে যাওয়া পাতা, উড়ে যাওয়া পাখির দল সবেমিলে বুড়িবালাম নদীর এই ভয়ংকর অথচ সুন্দর রূপকে আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে তোলে….! পাহাড়ের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলরাশি যে বর্ষার সময়ে তার রূপ আরও বাড়িয়ে নেয় তা পাহাড়ের গা দেখলেই অনুমেয়।

IMG_20200223_125904
চুপটি করে থাক্
IMG20200223132053
নিঃশব্দে শ্যুটিং চলছেই
IMG_20200228_192624-01
বুড়িবালামের ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ – বরেহিপানি

স্নানের উপায় নেই। খিদে পেয়েছে। ফিরে এলাম। ড্রাইভারের সাথে গল্প চালাচ্ছে সুরজিৎ। জানা গেলো – এখানের গ্রামে যারা থাকে তাদের একটা লোকাচার রয়েছে, বছরে একবার জঙ্গলমাতার পুজো হয় এবং তাদের একটা বিশ্বাস রয়েছে যে তাদের গরু, ছাগলগুলিকে এই পুজোর কারণে বাঘ কখনো খাবার করেনি। আমাদের মতো শহুরে ভ্রমণপিপাসু লোকজন এক-দু’দিন ঘুরতে গিয়ে এসব লোকাচারকে অবান্তর বলে হয়তো হাসাহাসি করবে, তবে প্রতিটা জঙ্গলেই যেখানেই মানুষের বাস সেখানেই কিন্তু এমন বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে। হোটেলে ফিরে নানারকম পদ আর কুকড়ার ঝোল দিয়ে ভাত সাঁটানো গেল। তার আগে অবশ্য শাল চিকেন সাঁটানো হয়েছে আরও একবার। শাল পাতায় চিকেন মুড়ে, মশলা মাখিয়ে আগুনে সেঁকে পুড়িয়ে নেওয়া, অতঃপর পাতা গুলো কালো হয়ে গেলে তা খুলে নিয়ে পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখিয়ে….আহা সে কি স্বাদ! একটু হজম হতেই আবার বেরিয়ে পড়লাম শেষ গন্তব্য চাহালা। এবার একটু বন্যপ্রাণী দেখার বড়োই ইচ্ছে প্রকাশ হলো। ড্রাইভারও উৎসাহ দিলো। গাড়ি চললো, রাস্তা একটু ভেজা ভেজা। মনে হলো বেশি যায় না গাড়ি, সুরজিৎ জিগ্যেস করতে জানা গেল– এ জায়গার বন এতো ঘন যে সূর্যের আলো পড়ে না তেমনভাবে। জংলী আর আর্দ্র পথে পাতা পড়ে তাকে আরও নরম করেছে। ফরেস্ট এর পাহারাদারদের একটা টাওয়ারে এসে দাঁড়ালো, ড্রাইভার নেমে গেলো, আমাদেরও ডাকলো৷ দেখলাম কি দুর্বিসহ সে চাকুরী যদিও এখানকার ট্রাইবাল লোকজনদের জন্যই সে চাকরী ঠিকঠাক। সে বললো বাবুরা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন দেখলে অন্য গাড়িগুলোও ভিড় জমাবে। তাই তাড়াতাড়ি আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম। প্রবল উৎকণ্ঠায় চোখ মিলছি গাড়ির জানালা দিয়ে কিন্তু কিছুই পেলাম না। নাহহ, আর বোধ হয় দেখা পাবো না।

IMG20200223125519-01
শিরা ধমনী নিয়ে বরেহিপানি জলপ্রপাত
IMG20200223090551-01
আরণ্যক
IMG20200223142051
ব্যঞ্জন বেষ্টিত খাদ্য, এই একটাই ছবি যত্ন করে তোলা হয়নি

পৌঁছে গেলাম চাহালা। হাট বসলে যাকে খানিকটা সোনাঝুরির মতোই লাগবার কথা। বেশ উচ্চতার ইউক্যালিপটাস দিয়ে ঘেরা এই ওয়াচ টাওয়ারটি আসলে চাহালা নামক গ্রামে উপস্থিত। এটা কোর এরিয়ার মধ্যে বলা চলে। মনোরম এই স্থানে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই দেখা মেলে হরিণ, খরগোশ, ইয়াব্বড়ো কাঠবেড়ালির। কিন্তু ধৈর্য্য ততক্ষণে বিদায় নিয়েছে, একটুক্ষণ ওয়াচ টাওয়ারে কাটিয়েই নেমে এলাম গাড়ির কাছে। হঠাৎ চোখে পড়লো একদম মগডালে একটি Malabar Giant Squirrel মোটা লেজখানা নাড়াতে নাড়াতে টপকে অন্য ডালে…..! ড্রাইভার বললো শেষে বেরোবে কিন্তু অন্য গাড়ির লোকজন একই তালে থাকার দরুন আমরাই আগে বেরিয়ে পড়লাম।

IMG20200223161719
চাহালার ওয়াচ টাওয়ার
IMG20200223161646-01
প্যাভিলিয়নের পথে চাহালায় সূয্যিমামা…
IMG20200223160313
মিনার থেকে চাহালায় অপেক্ষারত ভ্রমণপিয়াসীর দল
IMG_20200223_151424
ফরেস্ট গার্ডদের জীবনযাত্রার হালচাল
IMG_20200223_111059
ফেলে আসা জোরান্দার সেই ধ্বংসাবশেষ, কারণ মাওবাদী
IMG_20200223_151410
১৪ ঘন্টার সঙ্গী

সন্ধ্যে হব হব করছে….অনেকটাই পথ। ঘুমও পাচ্ছে কিন্তু দেখা মেলে তৎক্ষণাৎ দেখতে হবে এইজন্য ঘুমতে ইচ্ছে হলো না। দিনের আলোর জঙ্গল রাতে কি ভয়াল রূপ নেয় তা বোঝা গেলো কয়েক ঘন্টার ঐ জার্নিতে। প্রতিটা গেটে জানান দিয়ে যেতে হয় আমরা পেরোলাম, এত সিরিয়াল নম্বর ছিল, জেনে নিতে হয় কটা গাড়ি পেরিয়েছে। আবার সেই হোটেলে গিয়ে থামলো গাড়ি, চা পানের বিরতি। দেখলাম সেই ছোট্ট মেয়েটা যে থালা পরিস্কার করছিলো তখন এবার সে চা জোগাড়ের অনেক কাজ করে দিলো। আমি বেশ দেখছিলাম, কিন্তু কথা বলার সাহস হয়নি৷ আমাদের সাথে ব্যবহার জামা কাপড় ছিলো না যে। একটা কেমন সুবিধাবাদীর লজ্জা আমার মনে তখন। এবার আবার অনিশ্চয়তার পথে পাড়ি….! একদল মহিলা হাত সেঁকছেন আগুন জ্বালিয়ে। কাজ করতে এসেছিলেন লোকজন, অপেক্ষা করছেন কখন ফরেস্ট এর গাড়ি এসে নিয়ে যাবে। বেশ কিছুটা যেতে ঝিম ধরে গেলো। ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ গাড়িটা দাঁড়ালো, সামনে একটা গাড়ি ছিলো আমাদের অজান্তেই। দাঁড়িয়ে আছে, নিশ্চয় দেখেছে হাতি। এবার আবার সেই ভজম গেট। ড্রাইভার বললো ওরা বাঘ দেখেছে। আমাদের আফসোস এর সীমা নেই। পিঠেব্যথা গেট আর বেশি দূরত্বে নয়। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় রাতের বনানীকে দেখতে দেখতে যখন বন ছেড়ে বেরোলাম তখন রাত সাড়ে আটটা পেরিয়েছে সবে। এমনিতে নাকি ছ’টার আগেই বেরিয়ে যেতে হয়। শরৎ ড্রাইভার বহু অভিজ্ঞতার লোক বলে তার ব্যাপার আলাদা। অবশ্য বিভীষিকাময় হাতি বা বাঘ দেখার উৎকণ্ঠাটা রয়েই গেলো, পথ মধ্যে তেনারা স্থানুবৎ দন্ডায়মান হলে অবস্থা যে কি হতো আমাদের, তা অজ্ঞাতই রয়ে গেল। গাইতে হলো না – ‘পায়ে পড়ি বাঘমামা’….

IMG_20200223_101638
কাচাকাচির জন্য কিলোমিটার হয়তো


IMG20200223113818-01
সংগ্রাম অথবা নিজেরাই শ্রমিক
IMG20200223121218-01
টিফিনে একটু টায়ার খেলা…
DSC_6980
Men In Blue – সুরজিৎ ডেলিভার্স 🤘

ফিরে তো এসেছি, কিন্তু মনে মনে ভাবছি সেখানকার জনজাতির কথা, কিভাবে দিন গুজরান করে ওরা। আমরা সমতলের মানুষ, ফ্লিপকার্ট – অ্যামাজন – সুইগি আরও কত কি আমাদের জীবন জুড়ে….দু চারটে ক্লিকেই মুখে হাসি ফুটিয়ে দেবে। এক মিনিট দেরী করলে আমাদের কত অভিযোগ! ওখানে ওদের অভিযোগই নেই। আর করবেই বা কার কাছে? ড্রাইভারের থেকে জানলাম ওড়িশা সরকার এই লোকজনদের জঙ্গল ছাড়ার জন্য মাথাপিছু আট লাখ করে দেবে কিন্তু তবুও তারা ছাড়তে নারাজ, কি জানি! মোবাইলে ফোন করলে পাওয়া দুঃসাধ্য, কেবল ওরা ফোন করলেই খবর মেলে…। অভাব আছে, অভিযোগ নেই, নিজেদের মতো করে ধান চাষ করে নেয়, না জানি এভাবেই কত অভাবকে ওরা বশ মানিয়ে নিয়েছে। অভিযোজনটাই সব। জীবনটাই আসল। বেঁচে থাকাটাই…..একটা অরণ্য অভিযানই শিখিয়ে দিলো আবার!

IMG20200223093526-01
নাম জানিনা, ক্লান্ত পথ ঘিরেছিলো

পুনশ্চঃ দিনরাত্রি বললাম অথচ আমার কাছে রাতের একটাই ছবি রয়েছে সেটাও দেওয়ার মতো নয়। সুরজিতের থেকে নেওয়া হয়নি। ছেলেটা ফোন করে সিমলিপাল যাওয়ার প্রস্তাবটা দেয়। ভালো লেগেছিলো।

IMG_20200223_131617-01
বরেহিপানির জল কম পড়ায়….

ঋণস্বীকার: প্রায় সব ছবিই আমার তোলা তবুও তিন চারটে ছবি আছে যেগুলো সৌমেন আর শৌণকের তোলা। তবে সবচেয়ে বেশি ঋণী সেই অচেন ভিন্নভাষী মানুষটির প্রতি যিনি আমাদের গ্রুপ ছবিটি তুলে দিয়েছেন, কারণ এই একটাই ছবি পুরো গ্রুপের।

IMG_20200223_104436
Yes! Never Ever Forget You…..
© শুভঙ্কর দত্ত ||   March 6, 2020 

লাউসেনের হতশ্রী ময়নাগড়ে…

IMG20191116152203-01
ময়নাগড়ের তোরণ

ময়নাগড়ের ইতিহাস বড়োই বিচিত্র! অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় ময়নাগড় মূলতঃ লাউসেনের গড়, ঠিক তেমনই মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। দুটির মধ্যে যোগ-সম্পর্ক স্থাপন করাটাই ইতিহাসের কাজ৷

IMG20191116154859-01
অপেক্ষা… এপারে আসার

উঁকি মারে ইতিহাস….

গৌড়ের অধিপতি দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে যুদ্ধে পরাজিত কর্ণসেন তাঁর অধীনে সেনভূম ও গোপভূম অঞ্চল শাসন করতেন। গৌড়েশ্বর এর মন্ত্রীর নাম ছিলো মহামদ যার চক্রান্তে সোম ঘোষ নামে একজন অনুগত প্রজা কারাগারে বন্দী হন। পরে এই সোম ঘোষের সাথে গৌড়েশ্বরের গাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন হলে রাজপাট্টা, একটি ঘোড়া এবং একশ দেহরক্ষী সৈন্যসহ সোম ঘোষ কর্ণসেনের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। সোম ঘোষের পুত্র ইছাই ঘোষ কর্ণসেনকে যু্দ্ধে পরাস্ত করেন। তাঁর ছয় পুত্রকে বিনাশ করে রাজ্যের অধিকার নেন। পাঠক হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে এটা মহামদের ষড়যন্ত্র বই কিছু নয়। পুত্রশোকে কর্ণসেন-মহিষী বিষপানে আত্মহত্যা করেন। তখন গৌড়েশ্বর কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের অংশবিশেষ (ময়নামণ্ডল) এর রাজত্ব দেন। তিনি আগমন করেন কংসাবতীর শাখানদী কালিন্দীর জলপথে, কর্ণসেনের নতুন রাজধানী কর্ণগড় যা পরে ময়নাগড় নামে বিখ্যাত হয়।

কর্ণসেন এর দ্বিতীয় ধর্মপত্নী রঞ্জাবতী বাঁকুড়ার রামাই পণ্ডিতের উপদেশে ধর্মঠাকুরের তপস্যা করে লাউসেন (বা লবসেন) কে পুত্ররূপে লাভ করেন যিনি মঙ্গলকাব্যে লাম্বাদিত্য নামেও খ্যাত। লাউসেন অজয় নদীর তীরে ইছাই ঘোষকে নিহত করে পিতৃরাজ্য উদ্ধার করেন৷ এইভাবে বীরবর লাউসেনের সাম্রাজ্য বীরভূম থেকে ময়না পর্যন্ত বিস্তার লাভ করলো। এই ময়না গড়ে এখনও লাউসেনের কীর্তিচিহ্ন রয়ে গেছে। রাঢ় বাংলার জাতীয় কাব্য ধর্মমঙ্গল এর নায়ক লাউসেনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িতে জায়গাটি যে ময়নাগড় সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই৷ রঙ্কিনী কালীমূর্ত্তি তাঁরই পূজিত এবং এই কালীমূর্ত্তি অন্যদিকে লাউসেনের বৌদ্ধ ধর্মপ্রীতিকেই স্পষ্ট করে….! যাই হোক্, এ কথায় পরে আসা যাবে।

IMG20191116153632-01
পারাপার @ কালিদহ
IMG20191116152924-01
স্বমহিমায়… নৌরাসযাত্রায়

বঙ্গ হলো। এবার বঙ্গের সাথে কলিঙ্গের যোগসূত্রটা ধরা যাক্।

মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যভুক্ত – ‘জলৌতি দন্ডপাট’ এর অন্যতম৷ পরগণা ছিলো দুটি — সবং-পিংলা, ময়না৷ প্রায় ছয়শো বছর আগে ১৪০৩ খ্রীষ্টাব্দে কপিলেন্দ্রদেব (শোনা শোনা লাগছে কি? কুড়ুমবেড়াতে জড়িত যিনি)
সিংহাসন অধিকার করেন, তার পরে তাঁরই অধস্তন সেনানায়ক কালিন্দীরাম সামন্ত অধিষ্ঠিত হন, সবং এর বালিসীতাগড়ে একটি দুর্গ নির্মিত হয়। প্রাপ্ত সূত্র এবং তথ্য অনুযায়ী এই কালিন্দীরামই হলেন বর্তমানে ময়নাগড়ে বসবাসকারী বাহুবলীন্দ্র বংশের আদিপুরুষ।

এরপর প্রায় দেড়শো বছর এগিয়ে যায় রাজ্য-রাজ্যত্ব, বংশ পরম্পরায় গোবর্ধন সামন্ত বালিসীতাগড়ের অধিপতি হন। যাই হোক্, উৎকল সাম্রাজ্য তখন হরেক চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে আসছে। সিংহাসনে বসলেন হরিচন্দন। সাম্রাজ্যের স্বরূপ উদঘাটনে তিনি সমস্ত রাজন্যবর্গের থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিতে উদগ্রীব হলেন। বশ্যতা স্বীকার করতে সম্মত হলেন না গোবর্ধন। বন্দী অবস্থায় তাকে আনা হলো কারাগারে। গোবর্ধনের দেবোপম কান্তি, সঙ্গীতপ্রতিভা, মল্লযুদ্ধ — দেখে মুগ্ধ হলেন রাজা। উৎকল সাম্রাজ্যের খারাপ সময়ে এমন রণনিপুণ এবং রাজকীয় মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপন করতে পিছপা হলেন না উৎকল-নৃপতি৷ সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হলো তাঁকে, সঙ্গে সিংহাসন, রাজচ্ছত্র, চামর, বাণ, ডঙ্কা, যজ্ঞোপবীতাদি রাজচিহ্ন দেওয়া হলো। তাঁকে দেওয়া হলো উপাধি – একটা নয়, তিনটে — ‘রাজা’, ‘আনন্দ’ এবং ‘বাহুবলীন্দ্র’…. যে পদবী এখনও রাজপরিবারের সদস্যরা বহন করেন, এর অর্থ হলো ইন্দ্রের ন্যায় বাহুবলশালী। মূল শাসনকেন্দ্র হিসেবে সিলমোহর পেলো ময়নাগড়।

IMG20191116154812-01
বর্তমান “বাহুবলীন্দ্র” রা

বেয়াড়া জলদস্যু শ্রীধর হুইকে ময়না থেকে উৎখাত করেন তিনি, ফিরে এসেই। তখন তিনি ঐ গড় নতুন করে পরিখাবেষ্টিত করে দুর্ভেদ্য গড়ে পরিণত করতে আগ্রহী হন। দুটি পরিখা (কালিদহ ও মাকড়দহ) দিয়ে ঘেরা ছিলো তার গড়। প্রথম পরিখার মধ্যে চারিদিকে বেশ উঁচু পার্বত্য গুলিবাঁশের ঝাড় (১৯৫৫ সালের পর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়) এমন ঘনভাবে পরস্পর সংলগ্ন ছিলো যে অস্ত্রধারী সৈন্য তো দূর কোনও যুদ্ধাস্ত্রও প্রবেশ করতে পারতো না। প্রচুর অর্থব্যয়ে রাজা গোবর্ধন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন, যা ছিলো নিখুঁত এবং রন্ধ্রবিহীন, গড় সংস্কারেই তার পরিচয় মেলে। বৃটিশ কালেকটর এইচ.ভি.বেইলির বর্ণনায় সেদিক ফুটে উঠেছে।

IMG20191116154640-01
তাল সারি
IMG20191116154833-01
সেকালের পরিখা আজও অক্ষত

এই হলো যোগসূত্র… এরপর কালের নিয়মে তৃতীয় আর একটি পরিখা আজ বিলীন৷ বালিসীতাগড় এর দুর্গ ধুলায় মিশে গিয়েছে। বাহুবলীন্দ্র সাম্রাজ্যে বংশপরম্পরায় এসেছেন – পরমানন্দ, মাধবানন্দ, গোকুলানন্দ, কৃপানন্দ, জগদানন্দ, ব্রজানন্দ, আনন্দনন্দ, রাধাশ্যামানন্দ। আগ্রার মুঘল দরবারে এক সময় উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিলো পরমানন্দের — উড়িষ্যার রাজপ্রতিনিধি হিসেবে। মুর্শিদাবাদের নবাবী হুকুমতেও জগদানন্দ ছিলেন সমাদৃত। স্বাধীন ময়নাগড় বৃটিশ পর্বে কেবল পরবশ হয়েই রয়ে গিয়েছিল। মারাঠাদের আক্রমণও ভেদ করতে পারেনি প্রতিরক্ষার চাবি, তাও অষ্টাদশ শতকে।

এবার আসি কি আছে এই ময়নাগড়ে….

ময়নাদুর্গের চৌহদ্দির মধ্যে রয়েছে বৈষ্ণব – শৈব – শাক্ত মন্দির যা যথাক্রমে শ্যামসুন্দর মন্দির, লোকেশ্বর শিব, মহাকালী রঙ্কিণীদেবী)। রয়েছেন ধর্মঠাকুর (যদিও দেখা হয়নি), মোহান্ত নয়নানন্দ দেবগোস্বামী সমাধিমন্দির, তিন শতাব্দী প্রাচীন সূফীপীর দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা), যা নৌকা থেকে দেখেই শান্ত থাকতে হলো, যদিও সেখানে যাওয়ার জন্য ছোটো ডিঙা রয়েছে। সত্যিই AN ISLAND WITH AN ISLAND এই ময়নাগড় পঞ্চদেবতার গড়ও বটে, যেখানে বৈষ্ণব -শৈব-শাক্ত-ধর্ম-পীর সকলেই আছেন।

IMG20191116164531-01
ময়নাগড় – সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র
IMG20191116160759-01
রাজবাড়ির অংশবিশেষ

সেই মধ্যযুগ থেকেই এখানে গড়ে উঠেছিলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থান। আজও সেই ঐতিহ্য সমানে চলে আসছে। একসময় প্রচলিত ছিলো ধর্ম ঠাকুরের নিত্য পূজা, জগন্নাথ- বলরাম- সুভদ্রা রথযাত্রা, বড় হোলির সান্ধ্যমেলা এবং মহেশ্বরের বৈশাখী গাজন। অবশ্য সেসব আজ স্মৃতিকথা মাত্র। গড়সাফাৎ গ্রামের চতুষ্পার্শ্বে ছিল পরিকল্পিত পরিখা, প্রতিরক্ষার তৃতীয় ধাপ হিসেবে গণ্য হতো। তা আজ অবলুপ্ত। তবে কার্তিকী পূর্ণিমায় বর্ণাঢ্য নৌ-রাসযাত্রার দৃষ্টান্ত আজ বিরল। রাসমেলা পেরিয়ে কালিদহে নৌযাত্রা করে দুর্গে গিয়ে খানিক ঘোরাঘুরির সুযোগ এই রাসমেলাকে এক দারুণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সারা বছর এই ময়নাগড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, শুধুমাত্র এই রাসমেলার কয়েকদিনই। সূর্যাস্তের সময় কালিদহ যে কি রূপ নেয়, তা হয়তো না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। লাউসেন এক কিংবদন্তি, বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুরে পশ্চিম আকাশে কোনো এক অমাবস্যার রাতে সূর্যোদয় ঘটান বলে জনশ্রুতি আছে। যাই হোক্, সে ময়নাগড়ও আজ নেই আর, হতশ্রী, তার গরিমা আর নেই,তবুও তার কাঠামো আজও অটুট। এতো বছর পরেও সেখানে রাজবংশীয়রা রয়েছেন, এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কিচ্ছুটি হয়নি। ভাবতে অবাকই লাগে… তবে পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নালোকে বা সৌদামিনীর ক্ষণিক উপস্থিতিতে কেমন অপরূপ রূপ ধারন করে এই কালিদহ তার বেশ উপভোগ্য – এটুকু দেখার ইচ্ছে রইলো….

IMG20191116163003-01
কালিদহ তখন ডুবুডুবু সূর্যের আভা গায়ে মাখে
IMG20191116163306-01
সূর্যাাস্ত পানে একলা নাও
IMG20191116163858-01
নৈসর্গিক

লোকেশ্বর শিব মন্দির

কালিদহের তীরে রয়েছে লোকেশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বেশ গভীরে শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিলো। বর্গী হামলা থেকে রক্ষা পেতে যে সুড়ঙ্গ পথ নদীতীর অবধি বিস্তৃত ছিলো, তা বেশ ভালো রকম সক্রিয় থাকায় শিবকুন্ডটি বন্যায় অতিরিক্ত জলে ডুবে যায়। মন্দিরটির নির্মাণকাল আধুনিক যুগ হলেও, টেরাকোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়৷ বিষয়বস্তু গুলিও বেশ সময়সাময়িক – অশ্বারোহী, কৃষ্ণের রথ ইত্যাদি। তবে সবথেকে আকর্ষণীয় এবং একই সাথে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া মন্দিরটি চালে একটি নারীমূর্তি। যদিও এখন এমন রঙ করা হয়েছে যে বুঝতে বেশ অসুবিধা হয় যে আদৌ টেরাকোটা আছে কি না। এই শিব মন্দিরেই এখন পূজিত হন রঙ্কিণী দেবী — যা কালীমূর্ত্তির বৌদ্ধ সংস্করণ বলা ভালো। লাউসেনের অস্তিত্বের পরিচায়ক যা….।

IMG20191116155451-01
লোকেশ্বর শিব মন্দির : সামনে থেকে
IMG20191116160104-01
লোকেশ্বর মন্দির : পেছনের দিক
IMG20191116162501-01
রঙ্কিণী কালি মূর্ত্তি
IMG20191116162414-01
টেরাকোটার নিদর্শন : রথ
IMG20191116162406-01
অশ্বারোহী : লোকেশ্বর শিব মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা
IMG20191116162323-02
শায়িত নারী

Statue Of Dignity

লোকেশ্বর শিব মন্দিরের সামনে একটু দূরত্বে রয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ, রাজা জগনানন্দের সম্মানার্থে – Statue of Dignity, ২০১৪ সালে নির্মিত৷ রাজার শেষদশায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ময়নাগড় আক্রমণ করলে জগনানন্দ আত্মসমর্পণ করেননি,গড়ের ভেতরে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকেন। হেস্টিংস অনেক হম্বিতম্বি করলেও ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মীরকাশিমের মধ্যে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী জমিদারী অক্ষুন্নই থেকে গেলো।

IMG20191116155351-01
Statue of Dignity

শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির

কালিদহের তীরে অবস্থিত আর একটি মন্দির — শ্যামসুন্দরজীউর ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দির, দেউল রীতির। এই শ্যামসুন্দরজীউ হলেন বাহুবলীন্দ্র পরিবারের কুলদেবতা। প্রতিষ্ঠা লিপি নেই, খুঁজেও পেলাম না। শুধু সংস্কারের কতগুলি তথ্য মিললো। শ্যামসুন্দর মন্দিরের দেওয়ালে নৃত্যরত গৌর-নিতাই এর মূর্তি পাওয়া গেলো। সেখানে একজন বুকস্টল নিয়ে বসে ছিলেন, একটা বই নিলাম।

IMG20191116161423-01
কুলদেবতার অধিষ্ঠান
IMG20191116161841-01
গৌর – নিতাই
IMG20191116161923-01
সংলগ্ন ঘাটের পথ
IMG20191116162027-01
শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির : গোপাল থাকেন যেখানে 

লাউসেনের গড়

লাউসেন – লাউসেন করছি এতোবার। লাউসেনের নির্মিত গড়ের প্রায় পুরোটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। যেটুকু আছে, যে কোনো সময় হয়তো ভেঙে পড়তে পারে। জঙ্গলাকীর্ণ ঐ ভগ্ন গড়ে এখন বটগাছের বাস৷ স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে কিছু সাপখোপ হয়তো আছে, এখন শীতঘুমে গিয়েছে বলে মুখোমুখি হতে হয়নি। ভেতরে ঢুকে দেখলাম কিছু বিকৃতমস্তিষ্কের লোকজন এসে দেওয়ালে নিজেদের নামগুলি খোদাই করে গিয়েছে। একটা সিঁড়ি আছে, ভাঙা। দেখলাম, কয়েকজন কিশোর বয়সী ছেলে সেটা দিয়ে ওপরে উঠে মজা করছে, আমার একটু ইচ্ছে হলেও, সঙ্গীরা পেছন টানলো। অগত্যা, শুধু ফটো তুলে ক্ষান্ত থাকতে হলো।

IMG20191116160629-01
জঙ্গলাকীর্ণ
IMG20191116160601-01
আড্ডা, এটিই লাউসেনের গড়
IMG20191116160645-01
না থাকার মতোই
IMG20191116160832-01
মাথাহীন রাজবাড়ি

সম্প্রীতির ময়নাগড়ে…

দ্বিতীয় পরিখার পর গড়ের অন্তর্ভুক্ত যে ভূখণ্ডটি ছিলো সেখানে বর্তমানে রবিবারের বাজার (ময়নার প্রাচীনতম)। এই বাজারেই বসে রাসের মেলা এই ভূখণ্ড ময়নাগড়ের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ দূর করে দেয় এখানে অবস্থিত তোরণটি, যেটি খুব ভিড়েও রাসমেলার মধ্যে সঠিক দিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অতীতে পাঠান,শেখ ও খাঁনদের আনা হয়েছিলো গড় রক্ষার কাজে। গড়সাফাতের প্রাচীন হক্কানি মসজিদটি রাজার অর্থানুকূল্যে নির্মিত। বস্তুত ময়নাগড়ের এক প্রান্তে কালিদহের অপর পাশে রয়েছে সূফীপীরে দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা) । সুতরাং, এই গড়সাফাৎ যে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির সাক্ষর বহন করে চলেছে, তার বাংলা-আরবী শব্দসমন্বয় দেখেই অনুমেয়।

IMG20191116154531-01
সূফীপীরের দরগা, নৌকা থেকে 

আকর্ষণ…

একদা প্রচলিত বাহুবলীন্দ্রদের রথযাত্রা তমলুক মহকুমার মধ্যে প্রাচীনতম৷ ময়নাগড়ের শ্যামসুন্দরজীউর রাস উৎসব পঞ্জিকাতে লিপিবদ্ধ বাংলার অন্যতম একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হয়ে আসা প্রায় ৪৬০ বছরের পুরনো এই রাসমেলা পূর্বে একমাস ধরে হলেও, পরে ২২ দিন এবং বর্তমানে পক্ষকাল ধরে চলে। এই মেলার মুখ্য আকর্ষণ থালার মতো বাতাসা এবং ফুটবলের আকারে কদমা, যদিও এখন ছোট কদমার কদর বেশি, ঠিক যেন কদম ফুলটি।

সত্যজিৎ রায় – গয়নাবড়ি এবং ময়নাগড়

অনেকেই হয়তো জানেনই না সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্ববন্দিত পরিচালকের পা পড়েছিল এই ময়নাগড়ে। এখানকার বিখ্যাত গহনাবড়ি (উপহার স্বরূপ প্রাপ্ত) সত্যজিৎ রায় তার “আগন্তুক” সিনেমার একটি দৃশ্যে ব্যবহার করেন। তারও বহু বছর পূর্বে “অশনি সংকেত” সিনেমার শ্যুটিং এর অভিপ্রায়ে রিক্সা করে এসেছিলেন ময়নাগড়, পরিখাবেষ্টিত গড় ঘুরে দেখেনও, কিন্তু পুরো ইউনিট নিয়ে যাওয়ার সাহস পাননি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গার অসুবিধার জন্য। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ হয়তো পথের পাঁচালীর বোড়াল গ্রামের মতো ময়নাগড়ও বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকতো। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা চিঠি থেকেও বাহুবলীন্দ্র পরিবারের তৈরী গহনাবড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রণবেশ সেন এর কথায় — দুটি জিনিস খুব দুঃখের, এক দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন এবং এতো সুন্দর গহনার মতো বড়ি ভেঙে খাওয়া। তাঁর উদ্যোগে এই বাড়ির গয়নাবড়ি পুরো প্রস্তুতির দৃশ্য কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রে সম্প্রচার করা হয়।

গয়নাবড়ি @ আগন্তুক
আগন্তুক সিনেমার একটি দৃশ্যে : আহারের এতো বাহার

কালিদহ পার হয়ে…

যাই হোক্, আমাদের ভাগ্যটা ভালো ছিলো। আমরা এক শনিবারে তিনটের দিকে রবিবারের বাজারে বসা ঐ রাসমেলাতে পৌঁছে তড়িঘড়ি নৌযাত্রায় চলে যায়, লাউসেনের স্মৃতিবিজড়িত ময়নাগড় ঘুরে যখন ফেরৎ আসি তখন দেখি প্রায় দু’শো লোক নৌরাসযাত্রা উপভোগ করতে উৎসাহে অপেক্ষারত। কালিদহের জলে গোধূলির আকাশ প্রতিফলিত হওয়ার পূর্বেই আমরা সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্রের মেলা থেকে খানিক কদমা কিনে,ব্যাগস্থ করে ফিরে আসি…..!

IMG20191116165353-01
কদমা
IMG_20191119_183434
পুরো মানচিত্র রইলো, যাতে আগ্রহী যারা, তারা কেউ ছেড়ে না আসে (‘কিল্লা ময়নাচৌরা’ থেকে সংগৃহীত), আমরা ঘুরতে পারিনি 

তথ্যসূত্র :
কিল্লা ময়নাচৌরা – ডঃ কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

© শুভঙ্কর দত্ত || November 19, 2019

ঘুরে এলাম কুড়ুমবেড়া-মোগলমারি-শরশঙ্কা…

বহুদিনের ইচ্ছে কুড়ুমবেড়া যাবো…
সেই কবে ফেসবুকে জনৈক ভবঘুরের পোস্ট দেখেছিলাম৷। সেই কত্ত দিনের প্ল্যান একটা। আগে দু’বার ব্যর্থ হয়েছে। তার মধ্যে একবার বুলবুল এর জন্য। শেষমেশ যাওয়া হলো…. তাও কুড়ুমবেড়া শুধু নয়, সাথে মোগলমারি বৌদ্ধবিহার হয়ে শরশঙ্কা দীঘি — এক্কেবারে কম্বো প্যাকেজ যাকে বলে….! সৌমেন তো থাকই, এবার সুুুুুরজিৎও সামিল হলো….!

কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু…

 

IMG20191113105514-01
বহিরাবরণ

এবার কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু করা যাক্…! বেলদা থেকে কেশিয়াড়ী যাওয়ার বাসে করে ১০ কিমিরও কম দূরত্বে কুকাই, সেখান থেকে সদ্য বাঁধানো পথে টোটোই করে গগণেশ্বর গ্রাম…..! বটতলায় এসে থামলো… একদিকে বিস্তীর্ণ পুকুর আর তারই উল্টো দিকে ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলা প্রায় সাতশো বছরের পুরনো এই দুর্গ।ইংরেজরা জেলার গেজেটিয়ার রচনার সময়ও এটিকে দুর্গ বলেই উল্লেখ করেছে।

IMG20191113110357-02
করমবেরা….
IMG_20191114_123357-01
গুগল ম্যাপে স্যাটেলাইট ভার্সান কি? কারুকাজ বটে…

নামের বিভিন্নতায় ‘র’ আর ‘ড়’ এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিলো। ও বাবা, ভেতরো ঢুকে দেখি লেখা আছে আর একরকম- ‘করমবেড়া’!
যাই হোক্, নাম যাই হোক্, এবার একটু ইতিহাস কি বলছে, সেখানে তাকানো যাক্! আর এক গোলমাল! ইতিহাস এমনিতেই বিতর্কিত এবং এই জায়গাটির ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি “নানা মুণির নানা মত” একদম সাড়ম্বরে প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও সেদিকে যাচ্ছি না।

 

একটু ইতিহাস…

১৪৩৮ থেকে ১৪৭০ সালের মধ্যে ওড়িশার রাজা কপিলেন্দ্রদেবের আমলে নির্মিত হয় এই দুর্গ। গজপতি বংশের রাজা কপিলেন্দ্রদেবের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল বর্তমান হুগলি জেলার দক্ষিণ অংশ মান্দারণ থেকে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ পর্যন্ত। অবশ্য মান্দারণ আমার বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই। বারবার গেলেও এটা একদমই অজানা ছিলো। ঝামা বা ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে আদতে একটি শিবমন্দিরই তৈরি হয়েছিল এখানে।

IMG20191113111227-01
প্যানোরমা তে কুড়ুমবেড়া
IMG20191113114133-01
শৈলী…মাকড়া পাথর

প্রথমে আফগান সুলতানরা (পড়ুন দাউদ খাঁ) দখল করেন এ দুর্গ। অতঃপর ঔরঙ্গজেবের আমলে আফগানরা পরাজিত হলে মোগল সম্রাটের হাতে আসে সে দুর্গ। বাংলা এবং উড়িষ্যার বহু মন্দির মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর ফরমান আসে, বাদ যায়নি এই দুর্গের ভেতরকার মন্দিরটিও, একেবারে দুর্গের ভেতরের মাঝে জলাধারের মতো যে ভাঙা অংশটি রয়েছে (যাকে যজ্ঞবেদীও বলা হচ্ছে), দেখলে বোঝা যায়, সেটি কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যদিও ভিন্নমত। তবে তিন গম্বুজের ঐ স্থাপত্যখানি যে মসজিদ সেটাও আন্দাজ করা খানিক সহজই।

IMG20191113111337-01
দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ
IMG20191113115750-02
কিছু নবীন…

তাহের খানের অধীনে সেনাদের আশ্রয় শিবির হয়ে ওঠে কুড়ুমবেড়া। সেই থেকে মন্দির বদলে যায় দুর্গে। ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা যোগেশচন্দ্র বসু লিখেছেন, “…মন্দির গাত্রে উড়িয়া ভাষায় লিখিত যে প্রস্তর ফলকখানি আছে, তাহার প্রায় সকল অক্ষরই ক্ষয় হইয়া গিয়াছে, কেবল দু’একটি স্থান অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট আছে, উহা হইতে ‘বুধবার’ ও ‘মহাদেবঙ্কর মন্দির’ এই দুইটি কথা মাত্র পাওয়া যায়।” (বই খানি আমি পড়িনি যদিও)।

IMG20191113105731-01
প্রাচীন…

পরে এই দুর্গে মারাঠারাও ঘাঁটি তৈরি করেছিল বলে মনে করা হয়। বেশ কয়েকজন গবেষক সে কথা জানিয়েছেনও। লিখেছেন। তবে এটিকে ঠিক দুর্গ বলা যায় কি? কোনো অস্ত্র ভাণ্ডার নেই, লুকিয়ে থাকার গোপন কুঠুরি নেই, বিপদ-আপদে-আক্রমণে হুট করে পলায়ন করার জন্য বাইরে বেরোনোর রাস্তা কোথায়? সবথেকে বড়ো কথা ওয়াচটাওয়ার নেই। বরং এটি একটি উৎকল স্থাপত্যেরই নির্দেশক, মানে এর গঠন শৈলী। যারা বহু বার পুরী গিয়ে তা করায়ত্ত করতে পারেননি, তাদের প্রতি সমবেদনা।
মাকড়া পাথরে তৈরী অপূর্ব এই সৌধের প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকে রয়েছে তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদ। একদা জেলা গেজেটিয়ারে লেখা হয়েছিল, সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জনৈক মহম্মদ তাহির এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯৯০ সালে কুড়ুমবেড়া অধিগ্রহণ করেছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া।

IMG20191113114533-01
পরিখা থেকে….
IMG20191113111702-01
তিন গম্বুজের মসজিদ
IMG20191113114707-01
মধ্যমণি বিলীন…মসজিদই তাই কেন্দ্র
IMG20191113120751
কারসাজি… ট্রিপল ক্যামেরা 😂

তবে দেখে ভালো লাগলো যে রক্ষণাবেক্ষণ হয়, রেলিং দিয়ে দুর্গ মধ্যস্থ এলাকাগুলিতে এখন বোধহয় আর ঢোকা যায় না। শোভাবর্ধক গাছ লাগানো আছে, রলিং ঘেঁষে। একজন লোককেও দেখলাম, জল দিতে।

দুর্গটির ভেতর এবং বাহির — দারুণ লেগেছে। প্রাকৃতিক বড্ড বেশিই। পরিধি বরাবর হাঁটতে থাকলে মাঝে মাঝে পা হড়কে যায়, শ্যাওলার দল জমি অধিগ্রহণ করেছে যে। পুরো দুর্গটা চক্কর দিতে বেশ সময়ও লাগে….বেশ ঠাণ্ডাও অনুভূত হয়, শ্যুটিং স্পট হিসেবে মন্দ নয়। ভাবতেই অবকা লাগে পুরোটা পাথর কেটে বানানো… অথচ এখনও অটুট,যদিও কিছু পিলার নতুন করে বানানো। যে কোনো একটা কর্ণারে গিয়ে ক্যামেরা তাক করলেই একটা একটা করে লকস্ক্রিন করার ফটো বেরিয়ে আসবে….! সঙ্গে থাকলো – রবিকিরণ, প্রায় সব সময়ই দারুণ দারুণ সব ফ্রেম উপহার দিয়ে দিলো সে।

 

IMG20191113113449-01
সাতরঙা ফ্রেম…
IMG20191113120139-01
প্রাকৃতিক ভাজক…

বাইরে থেকে বহু চেষ্টা করেও… ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, পুকুরপাড় সবকিছুর ইস্তেমাল করেও পুরোটা এলো না। বটগাছের ঝুরির ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে দুর্গ, — তার ভেতর আর বাহির যেন একে অন্যের পরিপূরক৷

IMG20191113122251-01
মৎস্য সন্ধানে… সামনের পুষ্করিণীতে
IMG20191113113004_01-01
প্রতিভাত রবি

—————————————————————-

এবারে মোগলমারি…

IMG20191113144743
কদম কদম বড়ায়ে যা..

বেলদায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে চলে এলাম মনোহরপুর। গুগল ম্যাপে ভুলভাল এবং একাধিক অবস্থানের কারণে প্রথমে হেঁটে বিপথগামী হচ্ছিলাম, সহায় হলেন একজন বৌদিস্থানীয় ভদ্রমহিলা। পরে বুঝলাম একটা পথ নির্দেশক বোর্ডকে আমরা অবহেলা করেছি৷ ব্যাক গিয়ার মেরে হেঁটে প্রায় হাফ কিমি যেতেই গ্রাম্য রাস্তার একপাশে পড়লো – মোগলমারির বৌদ্ধবিহার। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সুন্দর নয়, অর্থ সাহায্যের অভাবে অবহেলিত এবং সুসজ্জিত নয় বটে, তবে তার ইতিহাস রীতিমতো গাম্ভীর্য বহন করে। প্রায় ১৫০০ বছরের ইতিহাস এই মোগলমারি৷ ওখানের এক বিবরণ বোর্ডে দেখলাম লেখা আছে এটি গুপ্তোত্তর যুগের একটি স্থাপত্য!

IMG20191113135851-01
মোগলমারি বৌদ্ধবিহারের প্রবেশপথ
IMG20191113140359-01
খননস্থল

‘মোগলাই’ খেতে গিয়ে প্রথমবার যেমন মনে হয়েছিল বেশ একটা ঐতিহাসিক ফাস্ট ফুড খাচ্ছি, সেরকম ‘মোগলমারি’র নামকরণের কারণ খুঁজতেই অবধারিতভাবেই চলে এলো — মোগলাই থুড়ি মোগল…মুঘল।
কেউ বলেন মুঘল-পাঠান যুদ্ধে অনেক মুঘল সৈন্য মারা গিয়েছিল বলে জায়গাটির নাম মোগলমারি। কেউ বলেন মুঘলরা এই পথ (‘মাড়’ অর্থ পথ) মাড়িয়ে গিয়েছিল; তাই অমন নাম। পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত সুবর্ণরেখা…সে বিহার নেই, নেই সুবর্ণরেখাও, মন খারাপ করেই সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, প্রায় দু-তিনি কিমি দূরে…..
সামন্তরাজা বিক্রমকেশরীর রাজধানী ছিল এ অঞ্চল। কন্যা সখীসেনার পড়াশোনার জন্য জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছিল।

IMG20191113142914-01
মিউজিয়াম @ মোগলমারি
IMG20191113142759
অবহেলিত মিউজিয়াম

চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বিবরণীতেও এই বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ রয়েছে।
২০০৩-০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষক ডঃ অশোক দত্তের তত্ত্বাবধানে খননকার্য প্রথম শুরু হয়, যদিও তার আগে ময়ূরভঞ্জ (অধুনা ওড়িশা) এর আর্কিওলজিকাল সার্ভেতে এর কথা উল্লেখ আছে, হয়তো সেটিই সূত্র হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে অদূরে যেই কুড়ুমবেড়ার গল্প এতক্ষণ করলাম, সেখানে আফগান সুলতান দখল নেওয়ার সময় এই মোগলমারির সেনা ছাউনি থেকেই ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি তাকে আক্রমণ করেন, পরে ঔরঙ্গজেবের মুদ্রার হদিশ মেলে এখানে।
পশ্চিমবঙ্গে আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারগুলির মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়। খননে পাওয়া গেছে প্রায় ৫২ ধরণের নকশাযুক্ত ইঁট, রাজা সমাচার দেবের মিশ্রধাতুর মুদ্রা, স্বর্ণ লকেট এবং মুকুট, বুদ্ধ-বোধিসত্ত্ব-বৌদ্ধ দেবদেবীর ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, স্টাকোর কারুকার্য মণ্ডিত নক্সাযুক্ত দেওয়ালঅলংকরণ ও ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র, প্রদীপ প্রভৃতি জিনিস। গুপ্ত পরবর্তী ব্রাহ্মি অক্ষর যুক্ত সীল ও সীলমোহরও আবিষ্কৃত হয়েছে এইখানে। বর্তমানে খননকার্য স্থগিত আছে, মিউজিয়ামের ওখানের একজন দাদা বললেন এখন আর খননের পারমিশন নেই।

IMG20191113142349
প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শনবাহী…
IMG20191113143056-01
মাটি খুঁড়ে পাওয়া স্টাকো মূর্তির কতিপয় এখনো বিরাজমান

বেশিরভাগই এখানে এখন আর নেই। কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে পাশে একটা ছোট্ট মিউজিয়াম আছে যাতে খননে প্রাপ্ত কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় তরুণ সংঘের উদ্যোগে সে মিউজিয়াম দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছেছি, তখন চাবি লাগানো দেখে ফোন করলাম, একজন খানিক পরে এসেই খুলে দিলেন। একটু একটু গল্প বললেন। মিউজিয়ামটির হাল ফেরাতে এবং সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার জন্যে ওনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁবু খাটানোর মতো একটা জায়গায় গিয়ে দেখলাম কতগুলো আরো মূর্তি৷ মিউজিয়ামের ভেতরে শুধুই খুচরো কতগুলো জিনিসপত্র আছে। বাকি সবই সরকারের অধীনে, কলকাতার জাদুঘরে।
খননকার্যে পাওয়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অবাক করে তথ্য হলো – এখানে একদিনে, একই স্থান থেকে একই সঙ্গে ৯৫ টি ব্রোঞ্জ মূর্তি উদ্ধার পৃথিবীর প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এক বিরলতম নজির। পণ্ডিতগণের মতানুসারে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতে অবস্থিত প্রাচীন এবং বৃহৎ বৌদ্ধ স্থাপত্যগুলির মধ্যে অন্যতম।

IMG20191113142107
এখন সবই যাদুঘরে
IMG20191113143437
পর্যটকদের সাত্ত্বনাদায়ক জায়গাটি

ভারতবর্ষের মাটিতেই পথচলা শুরু হয় হিন্দু – জৈন- বৌদ্ধ ধর্মের। কালক্রমে সব ধর্মের চড়াই-উতরাই হয়েছে। সেই ষষ্ঠ শতক থেকে বারংবার পুনর্নির্মাণের মধ্যে দিয়ে সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে এই মোগলমারি৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের অখ্যাত এক গ্রামের পথের পাশে….. ক’জনই বা আর বুঝবে এর গুরুত্ব? বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে!
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তাই দেখে আসা উচিৎ, এই জন্য যে আমাদের অবহলোর দরুণ কত জানা জিনিসও আমাদের কাছে অজানা হয়েই রয়ে যায়।

পথনির্দেশ – বেলদা থেকে দাঁতনগামী বাসে মনোহরপুর বা ট্রেনে খড়গপুর থেকে ট্রেনে করে নেকুড়সেনি থেকে অনতিদূরেই….

 

————————————————————-

অপরাহ্নের  শরশঙ্কা দীঘি….

IMG20191113160631-01
যে দিকে দুচোখ যায়..

মোগলমারি পর্ব চুকিয়ে বাসে উঠেছি, সরাইবাজার (দাঁতন) যাবো। সুরজিৎ এর বন্ধুর সাথে দেখা, সে জিগ্যেস করলো কোথায় যাবি?
উত্তরে শরশঙ্কা শুনে আশেপাশের বেশ কয়েকজন অবাক হলেন। সে হোক গে…

দাঁতন থেকে একটা ট্রেকারের মাথায় চেপে বসলাম। দুলতে দুলতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু নামবো কোথায়? শরশঙ্কা বলতে ট্রেকারের হেল্পারের পোস্টে থাকা লোকটি বললো – শরশঙ্কাতে ৪ টে স্টপেজ, কোথায় নামবে? বলে দিলাম যেখানে নামলে দীঘিতে সহজে যাওয়া যাবে। এসব বলতেই স্থানীয় এক ভাই সহায় হলেন, তিনিই বলে দিলেন লোকটিকে আমাদের আসলে কোথায় নামলে সুবিধে হবে। নেমে দীঘির পাড়ে গিয়ে দেখি কতগুলো বাঁদর সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে, উঁচু পাড়ে বসে। একটা জিনিস দেখে রীতিমতো অবাক লাগলো….দীঘিতে যাতে কচুরিপানারা ভিড় না জমায় তার জন্য দীঘির পাড়েই চারপাশে আলাদা আলাদা করে ছোটো ছোটো পুকুর কেটে তার মধ্যেই কচুরিপানাকে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। দীঘির এপার থেকে ওপার স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। যেদিক তাকায় শুধু জল আর জল…..ব্যাকগ্রাউণ্ড জুড়ে শুধু সাদা রং! চারদিকের পাড়ে গাছগাছালি….পাখিদের ডাক! কি অপূর্ব বাস্তুতন্ত্র সেখানে বিরাজ করে, বায়োলজির কেউ গেলে আরো ভালো প্রত্যক্ষ করতে পারতো। দীঘির চারদিকে পাড়ে পাড়ে বেশ কিছু মন্দির রয়েছে।

IMG20191113155355-02
একটু জিরো…..
IMG20191113160810-01
ছটা…
IMG20191113160821-01
দূরে দিগন্তে মন্দির….

ওই দীঘির দক্ষিণ পূর্ব কোনে রয়েছে পীর দেওয়ানগঞ্জের মাজার। পৌষ সংক্রান্তির দিন তাঁর কবরে মাটি দিতে আসেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। পৌষ সংক্রান্তির দিন মেলা বসে। সেখানে রয়েছে পান্ডব ঘাট।
মাজারের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য মন্দির।
জগন্নাথের মন্দির, জটেশ্বর শিব ,ঝিঙ্গেশ্বর শিব, রামেশ্বর শিব,কালী ও শীতলা মন্দির।
সে সব জায়গায় যাওয়া আর হলো না। অপরাহ্নের ডাকে ফিরে আসার ট্রেকার ধরার ছিলো যে….!

IMG20191113155822-01
বিলীয়মান সূর্যের আভা

লোকবিশ্বাস

মহাভারতের মূষল পর্বে শ্রীকৃষ্ণ বৃক্ষে আশ্রয় নেওয়াকালীন জরা ব্যাধের শরাঘাতে হাত থেকে পাঞ্চজন্য শঙ্খ ছিটকে পড়ে। তার আঘাতেই এই দীঘির সৃষ্টি বলে লোকবিশ্বাস।

পাণ্ডবরা বিরাটনগরে যাওয়ার পথে ক্লান্ত হয়ে এই দীঘির পাড়ে রাত্রিযাপন ও স্নান করেন। তারই অনুকল্পে দিঘির একটি ঘাটের নাম পাণ্ডব ঘাট। এই সেই পাণ্ডব ঘাট যেখানে মকর সংক্রান্তিতে স্নান করেন পুণ্যার্থীরা।

রাজ‍্যের বৃহত্তম দীঘি এই দীঘি নিয়ে বহুচর্চিত জনশ্রুতিটি হলো এটি নাকি রাজা শশাঙ্কের আমলে বানানো।
সর শব্দের সংস্কৃত ভাষায় ‘জল’।
রাজা শশাঙ্ক মাকে নিয়ে সম্ভবত জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছিলেন পুরীতে। যাচ্ছিলেন বা ফিরছিলেন ,ওই গ্রামে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে তাঁবু ফেলেন তাঁরা। গ্রামবাসীদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হন শশাঙ্কের মা। প্রশ্ন করেন ,এত ভালো জমি থাকা সত্ত্বেও এখানে ভালো ফসল হয়না কেন ? গ্রামবাসীরা বলেন জলের অভাব। জল নেই গ্রামে। শশাঙ্কের মা তখন বাংলার রাজাকে বলেন , এদের জন্য তুই কিছু করতে পারিস না ?
মায়ের কথায় শশাঙ্ক তখন তাঁর তুন থেকে সবচেয়ে বড় তির বের করেন। প্রতিজ্ঞা করেন,তির যত দূর যাবে , তত বড় করা হবে দীঘি। যা বানাতে সময় লেগেছিল তিন বছর।
শশাঙ্কের শর থেকে সৃষ্ট বলেই এরূপ নামকরণ। তবে কোনোটির তেমন ভিত্তি নেই। যদিও এই জনশ্রুতিগুলিই অপূর্ব সুন্দর এবং সুবিশাল এই দীঘিকে মহিমা দান করেছে!

IMG20191113155240-01
গাছের অলিগলি থেকে…

বেশ কিছুক্ষণ দীঘির পাড়ে বিশ্রাম নিয়ে, টাটকা অক্সিজেন নিয়ে উঠে এলাম, ফেরার জন্যে। সূর্যাস্তটা দেখতে পেলে ১৬ আনা পূর্ণ হতো। ভাবিইনি যে এটাও দেখা হবে, বারবার বাস-ট্রেকার এসব করেও, যতই গুগল ম্যাপ বলে চিৎকার করি না কেন, জীবন্ত জিপিএস খুব বেশি কাজে দেয়, এবারেও তার অন্যথা হয়নি।

IMG20191113161137-01
মন্দির….অন্যতম একটি

পথনির্দেশ – খড়গপুর থেকে ট্রেনে দাঁতন, সেখান থেকে হেঁটে উল্টো দিকে এলে ক্রসিং এর কাছেই ট্রেকার মিলবে অথবা সরাইবাজার গিয়েও ট্রেকার ধরা যায়! বাসেও আসা যায়। দাঁতনগামী বাস ধরে সরাইবাজার, বাকিটা আগের মতোই।

IMG20191113113742
তিনমূর্তি 😉

এখানেই সমাপ্ত….

IMG20191113121323-01
উৎসুক চোখে আমাদের টা টা করে @ কুড়ুমবেড়া

তথ্যসূত্র – গুগল, ফেসবুক এবং সংবাদপত্র.. এছাড়াও অনেকেই সাহায্য করেছে পথনির্দেশ দিয়ে সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে! তাছাড়া সুরজিৎ আর সৌমেন এর উপযুক্ত সঙ্গৎ ছাড়া বারবার বাস পাল্টে তিনটে বেশ দূরত্বে থাকা  জায়গা ঘোরা সম্ভব হতো না।

ও হ্যাঁ, সৌমেনের নব আবিষ্কৃত  অ্যাপটির কথা কি করে ভুলে যায়? সদস্য বেড়ে গেলে উত্তম সাহায্য করবে…! Trip Expense Manager 🤘👌

©  শুভঙ্কর দত্ত || November 14, 2019

 

ইতিহাসের সাক্ষী নাড়াজোল রাজবাড়িতে…

PANO_20190908_133810-01
অন্তরগড়ে…. সারিবদ্ধ

ইতিহাস সাবজেক্টটা মোটেও বিরক্তিকর নয়, বরং ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষক বোধ হয় কমই আছেন, অন্তত যারা পাতায় আবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস চাক্ষুষ করবার সুযোগ করে দেন। তারপর, ঘোরার সাথে না জানা হরেক কাহিনী! অবশ্য মজাটা অন্য জায়গায়, পরীক্ষা দিতে হবে না এসবের…. আগ্রহটা বাড়ে, এই আর কি!

এরকমই জাতীয় কংগ্রেস বা পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুপ্তস্থান নিয়ে আলোচনার সময় মেদিনীপুর এর বিশেষ উল্লেখ থাকলে তখনই ইতিহাস চেটেপুটে নিতাম৷ সে সময় চলে গিয়েছে। এখন ব্যস্ততার জীবন, তার মধ্যেই একদিন টুক্ করে বেরিয়ে যাওয়া….
এরকমই একদিন বেরিয়ে পড়লাম ইতিহাস-বিজড়িত নাড়াজোল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে…. মেদিনীপুর – কেশপুর হয়ে পৌঁছে গেলাম দাসপুর – ১ নং ব্লকের কিসমত নাড়াজোলে….

কিসমতই বটে! কেন কিসমত সে বিষয়ে পরে আসা যাক্….

—————————————————————–

১. নাড়াজোল – নাম কেন?

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ‘নাড়া’ অর্থে আমরা যাকে গ্রাম্য ভাষায় লাড়া বলি অর্থাৎ জমিতে ধান কেটে নেওয়ার পর ধান গাছের যে অংশ জমিতে অবশিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকে আর অসমীয় ভাষা ‘জোলা’ এর মানে জল….. নাড়া+জোলা থেকেই নাড়াজোল।

২. নাড়াজোলের প্রথম ঠাঁই

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীরজাফরকে গদিচ্যুত করে ইংরেজরা তার জামাই মিরকাশিমকে নবাব পদে বসান। বিনিময়ে মিরকাশিম ইংরেজদের উপহার দিলেন মেদিনীপুর, বর্ধমান, ও চট্টগ্রামের জমিদারি এবং এর সাথেই মেদিনীপুরের সঙ্গে নাড়াজোলের স্বাধীনসত্তার অবলুপ্তি ঘটে। পূর্বতন মেদিনীপুর জেলার ৫৪ টি পরগনার মধ্যে নাড়াজোল একটি উল্লেখযোগ্য পরগনা হিসেবে পরিচিত ছিল।

৩. ঘোষবাবুর স্বপ্ন বটে…

আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠার পেছনে জনশ্রুতি রয়েছে —  বর্ধমান নিবাসী উদয়নারায়ন শিকারের খোঁজে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং শিকার করতে করতে গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেন। সন্ধ্যালগ্নে তিনি প্রত্যক্ষ করেন এক অলৌকিক দৃশ্য, তিনি একটি স্থানে অসম্ভব রকমের আলোর আভাস প্রত্যক্ষ করেন। রাত্রে শয়নকালে উদয়নারায়ন দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান এবং সেই স্থান থেকেই দেবী জয়দুর্গার সোনার মূর্তি ও প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। সেই জয়দুর্গা আজও রাজবাড়িতে পূজিত হয়ে আসছেন। সেই ধনসম্পদ দিয়েই রাজা এই রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

IMG_20190908_133443
মূল ফটক
IMG_20190908_131002-01
রাজকীয় বাতায়ন
IMG_20190908_132919-01
বিপ্লবের সাক্ষী

৪. ‘ঘোষ’ থেকে ‘খান’, ভায়া ‘রায়’…

প্রতিষ্ঠাতা উদয়নারায়ণের এক উত্তরপুরুষ কার্ত্তিকরাম ঘোষের আমলে তৎকালীন বাংলার অধীশ্বর থেকে ‘রায়’ উপাধী পান। ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে বলবন্ত রায় তদানীন্তন বাংলার নাজিমের কাছ থেকে খান উপাধি লাভ করেন। সেই থেকে নাড়াজোলের জমিদাররা খান পদবি গ্রহণ করেন।

IMG_20190908_125605-02
শুধু আমিষের জন্য
IMG_20190908_131352
এখন স্কুল….রাজকীয় তাই না?

৫. মোহনলাল খান

এই রাজ পরিবারের স্থাপত্য কীর্তিগুলির প্রায় সবই মোহনলাল খানের আমলে স্থাপিত হয়। লংকার অনুকরণে গড় – লংকাগড় তৈরী করেন, প্রায় ষাড়ে ষাট বিঘা জমিতে পুকুর খনন করে তিনি একটি গৃহ নির্মাণ করেন যা বর্তমানে ‘জলহরি’ নামে খ্যাত। যেটা করতে নাকি সেই সময় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিলো।

IMG_20190908_143011
মধ্যমণি

 

IMG_20190908_143354-01
জলহরি

শুধু তাই নয়, মোহনলাল খান রাজবাড়ির ভেতরের গড়ে একটি দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অযোধ্য থেকে পাথর এবং দেবমূর্তি এনে তিনি নাটমন্দির টি স্থাপন করেন। কথিত আছে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একবার ছোটো রবিকে নিয়ে নাড়াজোল আসেন এবং বেলজিয়াম কাঁচ সমৃদ্ধ এই নাটমন্দির তাকে এতোটাই প্রভাবিত করে যে তিনি এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তিনিকেতনে ছাতিমতলার সাধনামঞ্চ তৈরী করেন।

IMG_20190908_133616
রাজকীয় নাটমন্দির
IMG_20190908_133547
প্রবেশদ্বার

৬. উত্তারাধিকার প্রাপ্তি?

মোহনলাল খানের মৃত্যুর পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে নাড়াজোল রাজপরিবারের উত্তারাধিকার প্রাপ্তি অন্তর্কলহের শুরু হয় যা তখনকার দিনে প্রতিটি রাজবংশেই কমবেশি চালু ছিলো। এরপর মনেন্দ্রলাল খান অধিপতি হওয়ার মধ্যে দিয়ে সে সবের ইতি ঘটে। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারত সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি উৎসব উপলক্ষে ইংরেজ সরকার মহেন্দ্রলাল খানকে ‘রাজা’ উপাধি প্রদান করেন। সেই থেকেই….. নামের আগে রাজা আর পরে খান…

৭. স্বদেশী আন্দোলন এবং নরেন্দ্রলাল খান

এরপর নরেন্দ্রলাল খান রাজা হন এবং তিনি মূলত জনকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের তার নাম স্বণাক্ষরে লেখা থাকবে, তার যোগদানের সাথে সাথেই নাড়াজোল রাজবাড়ির পরিচিতি আরো বাড়তে থাকে। নরেন্দ্রলাল খানের সহযোগিতায় এই রাজবাড়িতেই গুপ্ত সমিতির বৈঠক চলতো। হেমচন্দ্র কানুনগো, অরবিন্দ ঘোষ এর মতো বিপ্লবীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তখন মেদিনীপুর কেন্দ্রিক যে স্বদেশী আন্দোলনটা চলতো তার প্রায় পুরোটাই রাজাদের অর্থানুকূল্যে হতো এবং নরেন্দ্রলাল খান সেই দিক থেকে প্রচুর অর্থই ব্যয় করেন।  নরেন্দ্রলালের প্রতি ইংরেজ সরকারের দৃষ্টি সজাগ ছিল। ১৯০৮ সালের ২৮ শে আগস্ট নরেন্দ্রলালের গোপ প্রাসাদে পুলিশ তল্লাশি চালায় এবং মেদিনীপুর বোমা মামলায় নরেন্দ্রলালকে গ্রেপ্তার করে কনডেমড সেলে রাখা হয়। কিন্তু উপযুক্ত প্রমানের অভাবে নরেন্দ্রলালকে মুক্তি দিতে হয়। নরেন্দ্রলাল খান পরলোকগমন করেন ১৯২১ সালে।

IMG_20190908_131910
গোপন ডেরায়….

৮. দেবেন্দ্রলাল খান…

দেবেন্দ্রলাল খান তার পিতার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এবং পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচনে সরাসরি নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯৩০ সালে ২৬ শে জানুয়ারি তিনি নাড়াজোল রাজবাড়িতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, সেই শুরু হয়, তারপর ১৯৪০ পর্যন্ত সারা মেদিনীপুর জুড়ে তিনি বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়ে গুপ্ত সমিতির সদস্যদের জাগ্রত করেন। এরই ফলস্বরূপ মেদিনীপুরের তিন কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করা হয়, তার মধ্যে বার্জ এর নাম সর্বজনবিদিত৷ ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভপতি হওয়ার পর নেতাজী মেদিনীপুরে আসেন, এবং দেবেন্দ্রলাল খান কে নিয়ে তিনি যে তিনটি সভা করেন তার মধ্যে নাড়াজোল রাজবাড়িতর সভাটি মেদিনীপুরের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ক্ষুদিরাম বসুর বাবা এই রাজবাড়ির তহশিলদার ছিলেন এবং সেই সূত্রে শৈশব থেকেই তার এই রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এইখানে বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা ছিলো, ছিলো বোমা তৈরীর কক্ষ, অস্ত্র রাখার গোপন জায়গা,,শুধু তাই নয়, বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যার প্রধান ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো৷ এছাড়াও বারীণ ঘোষ, উল্লাসকর দত্তের মতো বিপ্লবীদের সব ষড়যন্ত্রের সভা এখানেই সংগঠিত হত।

IMG_20190908_133509
কাছারির মাঠ – নেতাজীর সভাস্থল
IMG_20190908_133500
দুর্গাদালান-শিব মন্দির
IMG_20190908_124503~2
নেতাজী – এখনও অতন্দ্র প্রহরী

৯. গান্ধীজী এবং অন্যান্যরা….

গান্ধীজী এই রাজবাড়িতেই ‘অস্পৃশ্যতা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ১৯২৫ এর দিকে। 

কাজী নজরুল ইসলাম এর পদধূলি পড়েছিল এই রাজবাড়িতে। মোতিলাল নেহেরু থেকে জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইড়ু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পদার্পণে নাড়াজোল পবিত্রভূমিতে পরিণত হয়েছিলো, সে কথা বলাইবাহুল্য।

১০. রানি অঞ্জলি খান….

স্বাধীন ভারতবর্ষের পাঁচ বার বিধায়ক হওয়া রাজপরিবারের সদস্য রানি অঞ্জলি খান নারী শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হন। মেদিনীপুরের গোপ রাজবাড়ি এবং নাড়াজোলের রাজবাড়ি তিনি প্রদান করেন, যা বর্তমানে যথাক্রমে গোপ কলেজ (মহিলা) এবং নাড়াজোল রাজবাড়ি নামে পরিচিত।

IMG_20190908_130546
পূর্বতন নাড়াজোল রাজ কলেজ

 

**************************************

 এরপর থেকেই রাজবাড়ির সাথে সাথে রাজপরিবারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে… ২০০৮ সালে পঃবঃ সরকার হেরিটেজ তকমা দিলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এখন কাজ চলছে যদিও…. এই বছর নেতাজীর জন্মজয়ন্তীর দিনে হাওয়া মহলের সামনেই নেতাজীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে নাড়াজোল গ্রামবাসী এবং প্রশাসনের সহযোগিতায়…! 

এবার নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে কেন কিসমত। যে রাজ বাড়ির দেওয়ালে স্বাধীনতা আন্দোলনের বাঘা বাঘা সব মানুষের নিঃশ্বাস পড়েছে, সেই রাজবাড়ির কিসমত আলাদাই!
ঘোরার জায়গা বলতে রাস্তা দিয়ে ঢুকেই শিব মন্দির, উল্টোদিকে রাসমঞ্চ। তারপর একটু গেলেই পেল্লায় হাওয়া মহল বা নাচ মহল, রাজবাড়ির অন্দরে আমিষ খাওয়া বারণ, তাই এই মহল বানানো, বহুদূর থেকে আসা নর্তকীদের নিয়ে মদ-মাংস সহযোগে ফূর্তিতে মেতে উঠতেন রাজা এবং তার তাঁবেদাররা। এর পেছনেই বাগান আর পবিত্র পুকুরটি কিন্তু সবই এখন সংরক্ষণের অভাব।

IMG_20190908_125818-01
হাওয়া মহলে যেতে হলে…
IMG_20190908_123143
জিরচ্ছে….
IMG_20190908_122234
প্রবীনের কাঁধে নবীন ছোঁয়া
IMG_20190908_124405
হাওয়া মহল
IMG_20190908_124101~2
ফাঁক ফোঁকর..

রাস্তার উল্টোদিকে নাড়াজোল রাজবাড়ি, যেখানে আগে নাড়াজোল রাজ কলেজের ক্লাস চলতো নিয়মিত। কলেজের গেট দিয়ে ঢুকেই যেটা প্রথমে দেখা যায়, সেটা নহবতখানা, এখান থেকেই দিনে তিনবার নহবতের সুর ভেসে যেত রাজবাড়ির অন্দরমহলে সহ গোটা নাড়াজোলের আকাশে বাতাসে। এরপর শিব মন্দির, কাছারি, ভগ্নপ্রায় দুর্গাদালান, সরস্বতী দালান, নবরত্ন মন্দির যেখানে এখন জয়দূর্গা পূজিত হন। পরিয়ে গেলেই আসল রাজবাড়ি। যার অন্দরমহলে ঢুকলেই একটা আলাদা গন্ধ অনুভূত হতে বাধ্য। এই রাজবাড়িতেই আগে কলেজের ক্লাস চলতো৷ রাজবাড়ির ভেতর ঢুকলেই বিপ্লবীদের কক্ষগুলি চোখের সামনে চলে আসে। সারি সারি কক্ষ, যতই যাওয়া যায় আর পুরো রাজবাড়িটাই পরিখা দিয়ে ঘেরা। যেটা ভালো করে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। রাজবাড়ির ছাদে ওঠা হলো না। এই আক্ষপে নিয়েই ফিরতে হলো। ফেরার পথে দুপুরের আহার সেরে মাত্র দু কিমি চরণবাবুর ট্যাক্সি চেপে চলে এলাম – লংকাগড়, জলহরি৷ গোটা ভ্রমণের এই জলহরিই ছিলো একটা অমোঘ টান। কি অসাধারণ টেকনোলজি দিয়ে তৈরী হয়েছিলো জানিনা, বেশ বড়োসড়ো একটা পুকুরের মাঝে একটা গড়। পুকুরের চার ধারে না হলেও তিন ধারেই লোকজন বেশ আয়েস করে ছিপ ফেলছে, মাছ পড়ছেও….. ইতিউতি ঘোরার পর বাস ধরলাম….. এবার ইতিহাসের গলি থেকে বিদায়ের পালা! গন্তব্য – সেই মেদিনীপুর!

IMG_20190908_134830
শিবের ৯ রূপ
IMG_20190908_134858
রাসমঞ্চ
IMG_20190908_130134
পেল্লায়….
IMG_20190908_123410-01
সেকেলে প্রযুক্তি আজও অটুট
IMG_20190908_123853-01-01
শুকনো ঝর্ণা @ হাওয়া মহল

একদিনের ট্যুরে আসায় যায়, তবে তার সাথে কিছু যোগও করতে হয়, দুপুর নাগাদ ঘুরে নাড়াজোল বাস স্টপেজে মধ্যাহ্নভোজ সেরে সর্ট রুটে বিদ্যাসাগরের বাড়ি – বীরসিংহ এর দিকে যাওয়া যায়, কুড়ি কিমিও নয়। নাড়াজোল রাজবাড়িতে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে, এমনিতে কলেজের হোস্টেল হওয়ার দৌলতে অনেকেই থাকেন, তাদের থেকেই জানলাম – মাঝে মাঝে ফিল্মের লোকজন আসেন বলে তাদের জন্য একটা রুম বরাদ্দ! আর রাজবাড়ির লোকজন যে কোনো অতিথিকে সর্বাধিক পরিষেবা দিতে সদাপ্রস্তুত….অন্তত এমনটাই আমার জানা।

IMG_20190908_130734-01
নহবতখানা
IMG_20190908_130753~2
রাজার কাছারি… পরে ক্যান্টিন এবং ছাত্র সংসদ
IMG_20190908_132841
রাজদরবারে….
IMG_20190908_133107-01
খিড়কি থেকে
IMG_20190908_133341
কেন তোর উঁচু বাড়ি, কেন তুই বাবু রে?।

কোলকাতা থেকে আসতে হলে মেছগ্রাম হয়ে দাসপুর আসতে হবে, তারপর মেদিনীপুরগামী রাস্তায় বাঁক নিলেই পৌঁছে যাবেন বিপ্লবীদের ডেরায়….! 

IMG_20190908_143431
नमो-नमो, जी शंकरा

 

IMG_20190908_134942~2
ঐতিহ্যশালী রথ
IMG_20190908_124642
নাচ মহলা

 

পুনশ্চঃ
১. তথ্যের জন্য ইউটিউব এবং গুগল দায়ী..
২. থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একদিন আগে জানাতে হয়…রথের সময় জলহরি তে একটি নৌকা চলে।

IMG_20190908_143900
৮০ বন্ধু
© শুভঙ্কর দত্ত || September 9, 2019

গরমের ছুটিতে দুর্গেশগড়…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ দেখেছিলাম, মণিকান্তপুরের সেই রহস্য উদঘাটন পর্বে পরিচয় হয়েছিলো সোনাদা, ঝিনুক আর আবীরের সাথে। আসলে এই তিনজনকে পর্দায় দেখে অ্যাডভেঞ্চার পিপাসুদের মতো আমারও চলে যেতে ইচ্ছে করে, বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। তাই যখন জানলাম এবার দুর্গেশগড়ে আবার এক অন্য গুপ্তধনের সন্ধানে তিনমূর্তির অভিযান, যার ষাট শতাংশ শ্যুটিং আমার প্রিয় ঝাড়গ্রামে তখন আর অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিলো না।

আগের বার ছিলো শাহ সুজার গুপ্তধন আর এবার দুর্গাবতি দেবরয় এর গুপ্তধন, যা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের থেকে তিনি পেয়েছিলেন।

  • হিস্ট্রি – নট অলওয়েজ বোরিং….

সিনেমা জুড়ে ইতিহাসের গল্প…. বইয়ের পাতায় পড়তে হলে ভীষণই বোরিং লাগে যে কাহিনী, এখানে সুবর্ণ সেন এর গল্পের ছলে বিষয়টির ভাবগম্ভীর ব্যাপারটিকে লুফে নেওয়ার মতোই সহজ করেছে৷

  • সাবলীল অভিনয়

‘ঝিনুক’ এর চরিত্রে ঈশা সাহা কে আমার বেশ লাগে, নামটার সাথে চরিত্রটা খুব মানায়। প্রথমবার গুপ্তধন উদ্ধার পর্যায়ের পর এবাারেও দারুণ লেগেছে….! সবচেয়ে ভালো লাগে অর্জুনকে, আবীরের চরিত্রে…. সেই বেশ একটা খাদ্যরসিক এবং হিউমারাস চরিত্র যা বাঙলির খুব কাছের লোক৷ সোনাদা কে নিয়ে বলার কিছু নেই।

  • ক্যামিও….

ক্যামিও হিসেবে খরাজের উপস্থিতিটা একটুও বোরিং হতে দেয় না, ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারে হার্দিক পাণ্ডিয়ার মতো ব্যাপারটা….. শেষপাতে চাটনীর মতো, পুরো চেটেপুটে খেলাম, একটা শব্দ বারবার বলছিলো, সেটা আর মনে নেই…

মে মাসে দুর্গাপুজো, কাশবনের পাশ দিয়ে মায়ের আগমণ, বনেদি বাড়ির পুজো — দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গুপ্তধনের সন্ধান গল্পটিকে বড্ড বাঙালিদের করে তোলে, তার সাথে যোগ হওয়া পুজোবাড়ির খাওয়াদাওয়া — সব মিলিয়ে বাঙালিয়ানার অনবদ্য নিদর্শন এই সিনেমা।

  • হারানো সুর আর কথা….

গানের কথার ছলে গুপ্তধনের এ টু জেড জানতে পারা – এদিক থেকে গীতিকার আর সঙ্গীত পরিচালকের প্রতি অতিরিক্ত সম্ভ্রম জাগে…. সেই পুরনো ফ্লেভারটা পুরোমাত্রায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই সুরটা লেগে থাকার মতোই….. সিনেমার গল্পের সাথে, সময়ের সাথে অদ্ভুৎ ভাবে খাপ খেয়ে যায়…!

  • যা কিছু চাইছি.. মোচড়

গল্পের বুনোটে সময় লেগেছে…. সেটা হওয়াটা স্বাভাবিক….. ইতিহাসটাকে বেশ ভালো ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে টুকরো টুকরোভাবে যাতে দর্শকের মাথায় সেঁটে যায় চেয়ার ছাড়ার পরেও….! শেষকালে ঐ রকম একটা মোড় ঘোরানো— আশা করছিলাম, তবে ভাবনারও অতীত ছিলো, আর পরিচালক ধ্রুব ব্যানার্জী পুরো পয়েন্ট নিয়ে চলে গেলেন এখান থেকেই…..!

  • ক্যামেরা…আলো.. ইত্যাদি

সৌমিক হালদার নিজের খ্যাতির মর্যাদা রেখেছেন। এই সিনেমার সাপেক্ষে যেটা খুব মধ্যমানের হলেও চোখে লাগতো, সেরকম একবারও লাগেনি, জমাটিই লেগেছে।
কাজটাকে সহজ করেছে আলোর অনবদ্য ভালো ব্যবহার…. এইরকমভাবে আলোর ব্যবহার কটা সিনেমায় হয়, সন্দেহ আছে, অবশ্য সুযোগও থাকে না

  • বোনাস পয়েন্ট…..

কৌশিক সেন…. ফোকাস টেনেছেন গল্পের খাতিরে, সে জন্য অবশ্য পরিচালকের ধন্যবাদ প্রাপ্য…
আরো আছেন – লিলি চক্রবর্তী, পিসির চরিত্রে ওনার উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরো বেশি করে বোধ হয় আট থেকে আশির জন্য মাস্ট ওয়াচ করে দেবে…..

  • আত্মিক টান

রহস্য, সাসপেন্স আর অ্যাডভেঞ্চার এর সাথে বাঙালির আত্মিক টান, তার সাথে যদি যোগ হয়ে যায় ইতিহাস, তাহলে আর কথায় নেই….! যাকে বলে টরে টক্কা! অযাচিতভাবেই গুপ্তধনের সন্ধানে এসে সোনাদা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে আরও যে বিষয়টি উদঘাটন করলেন, তার জন্য এক্সট্রা একটা নম্বর দেওয়ায় যায় পরিচালককে

  • গরমের ছুটি – লুটি

গরমের ছুটিতে দুর্গাপুজো, সৃজিৎ মুখার্জি ‘উমা’ র হাত ধরে এরকমটা করেছিলেন, সেটা শহরে যদিও আর ধ্রুব ব্যানার্জি করলেন গরমকালে, গ্রীষ্মবকাশে…. অতএব লুটি!

  • পারিবারিক ফিল্মও….

পারিবারিক সিনেমাও বটে৷ একদম শেষে সে কথা আরো বেশি করে জোরালো হলো…..! পিসিমা- সোনাদা- অপুদা (খরাজ) এর কথোপকথনে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক একাত্মতার বিষয়টি বেশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

  • যথাযোগ্য উত্তরাধিকার…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ এর যোগ্য সিক্যুয়েল বলেই মনে করি….. একবারের জন্যেও অগ্রজপ্রতিম সিনেমাটিকে অসম্মান করা হয়নি…. বরং শেষ কয়েক মিনিটের থ্রিল আর গুপ্তধন খোঁজার পন্থাস্বরূপ গান — এই দুটির জন্য অবিসংবাদীভাবে ‘দুর্গেশগড়’ এগিয়ে থাকবে।

  • এবং ঝাড়গ্রাম…

ঝাড়গ্রামকে যারা খুব ভালেবাসি, তাদের জন্য এই সিনেমা দেখা অত্যন্ত জরুরি। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি থেকে শুরু করে চেনা চিল্কিগড় সহ বিভিন্ন অচেনা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই সিনেমার ফ্রেমগুলো। বিশেষ করে রাজবাড়ি….! কি সুন্দরভাবে অন্দরমহলটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরো কিছু জায়গার ছবি ফুটে ওঠে কিন্তু নাম জানি না আমি….! অরণ্যসু্ন্দরী ঝাড়গ্রাম কে ভালো চিত্রায়িত করেছেন ক্যামেরাম্যান৷

সুতরাং এই গরমের ছুটিতে বাড়ির সকলকে নিয়ে ‘দুর্গেশগড়’ ঘুরে আসা যেতেই পারে…. যেখানে  সোনাদা – ঝিলিক – আবীরের দেখা মিলবেই৷

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 29, 2019

নগরকীর্তন – বাঁচার অধিকার ওদেরও…

সিনেমাটা কেন দেখতে চান?
‘নগরকীর্তন’ এর দুটো টিকিট চাইতেই টিকিট কাউন্টার থেকে ইন্টারভিউসম প্রশ্ন ধেয়ে এলো….
বাংলাসহ সারাভারতে আলোড়ন করা বিশেষ এই সিনেমা দেখতে চাওয়া দুই বন্ধুকে এক বৃদ্ধের এই প্রশ্ন।

বললাম – ‘কৌশিক গাঙ্গুলি আমার প্রিয় পরিচালক…..! একটু ইয়ার্কি মেরেই বললাম, বাকিটা দেখে এসে বলি…!
ভদ্রলোক হাসলেন।
বললেন শুধুই এই কারণ….?

বললাম — না আসলে ঋদ্ধি কেও ভালো লাগে, সেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ থেকেই ফ্যান!
বললেন — ‘কৌশিক গাঙ্গুলি প্রিয় পরিচালক, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হয় উনি নিজেকে ঋতুপর্ণর জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন!’

টিকিট কাটা হলো৷
আসলে একটা পরীক্ষা পড়েছিলো কলকাতায়, দুই বন্ধু মিলে ট্রেনে আসতে আসতেই একটা প্ল্যান মাথাচাড়া দেয়, আর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ১ কিমি দূরত্বে সিনেমাহলে ‘নগরকীর্তন’ চলছে। সুরজিৎ বললো – ‘এ সুযোগ হাতছাড়া করলে অ্যাচিভমেন্ট বলে কিছু থাকবে…?’ এরকম গোছেরই কিছু। অতএব, চলো, এগিয়ে যাওয়া যাক্। ব্যস্ ‘মিত্রা’ দাঁড়িয়ে আছে!

টিকিট তো কাটলাম, দেড় ঘন্টা বাকি এখনো। এদিক ওদিক ঘুরছি, কিন্তু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সিনেমাটা দেখতেই হবে, অতিশয় আগ্রহকে সঙ্গী করে।

——————————————————————
সিনেমা শুরুর আগে কিছু কথা উঠলো।
এই গল্প সেইসব প্রেমের গল্প, যে গুলো আর পাঁচটা প্রেমের মতো নয়।
ভেসে উঠলো Tributed To…. কে হতে পারে? আরে, নান্ আদার দ্যান ঋতুপর্ণ ঘোষ…!
ছবির নীচে ইটালিক্সে লেখা
“পরজনমে হইও রাধা….”
বুঝতে বাকি রইলো না। সদ্য ‘সমান্তরাল’ দেখেছি৷ কৌশিক গাঙ্গুলিও আগে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বানিয়েছিলেন, মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ৷ তবে কৌশিক গাঙ্গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। সত্যিই তো সিনেমাটা কেন দেখতে যাবো?
‘ছোটোদের ছবি’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘শব্দ’ কেন দেখতে গিয়েছিলাম বা কেন দেখেছি?
কারণ উনি অন্যদের কথা বলেন, অন্যকিছু বলেন, সবাই যেটাকে নিয়ে ভাবেন না, যাদের নিয়ে ভাবেন না, উনি তাদের কথা তুলেই ধরেন। তাই…….! এটা অবশ্য বৃদ্ধকে বলা হয়নি৷

পরিমল-পরি-পুঁটি (ঋদ্ধি সেন) এই গল্প একদিকে চলতে থাকে, আর একদিকে….পুঁটির প্রেম চলতে থাকে, প্রেমিকের ওপর ভরসা করে চলতে থাকে জলে থেকে কুমীরের সাথে লড়াই করার অব্যহতির খোঁজ। শৈশব থেকে মনের মধ্যে পুষতে থাকা নারীত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আবদার — “শরীরে ভুল আছে মধুদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী) , শুধরে নিতে হবে….!”
সমান্তরালভাবে দুটো গল্প বলায় একটুও বোরিং লাগেনি, ততটাই সাবলীল লাগলো শুভজিৎ সিংহের কাঁচি চালালনোটা, অবশ্য আগেও ‘ছায়া ও ছবি’, ‘মাছের ঝোল’, ‘বিসর্জন’, ‘শব্দ কল্প দ্রুম’ এর মতো সিনেমাগুলিতে একই কাজ করেছেন।

বহুদিন আগে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ পড়েছিলাম, বেশ লেগেছিলো, সিনেমাটা দেখতে দেখতে বেশ ওটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যদিও সেখানে গল্প ভিন্ন। তবে সেই উপন্যাসের একজনের উল্লেখ ছিলো বারবার, সিনেমাতে দেখি স্বমহিমায় তিনি উপস্থিত – মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালকের মুন্সীয়ানা চোখে পড়লো, সোমানাথ থেকে মানসী হওয়ার লড়াই – গল্প সবকিছু বলিয়ে নিলেন তার মুখ দিয়ে, শুধু তাই নয়, বলিয়ে নিলেন – শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণভাবে মজে যাওয়ার ঘটনাটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার ফলে সিনেম্যাটিক ভ্যালু বেড়ে যায় বলেই মনে হয়৷

সিনেমার দৃশ্যপট এতো বাস্তব যে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়েও এই সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও বারবার মনে হচ্ছিলো এটা বোধ হয় খুব সহজ একটা ঘটনা৷ মধুদের পৈতৃক বাড়ি – নবদ্বীপ, যেখানে চিত্রনাট্য পৌঁছানোর পর থেকেই একটা ক্ষীণ উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হতে বাধ্য দর্শকদের মনে, যেটা তীব্র হয়, যখন দোলপূর্ণিমার আসরে মধু বাঁশি বাজায়, আর পুরুষরূপী নারীমনের পুঁটির আসল রূপ আচমকাই প্রকাশিত হয়ে যায়।

এরপরও আরো ঘটনা……! ঘটতেই থাকে….! শেষ আধ ঘন্টা দর্শকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দিতে বাধ্য, ভাবাতে বাধ্য। সিটে আরাম করে বসে থাকা ঘুচিয়ে দিতে সফল এই সিনেমা। ওয়াটসআপ-ফেসবুকের মাধ্যমে কিভাবে কোনো ঘটনা ভাইরাল করা যায় তা দেখাতেও ছাড়লেন না। ‘নগরকীর্তন’ নামটা বেশ ব্যঞ্জনধর্মী বলেই মনে হলো, নগর বা সমাজে চলতে থাকা অহরহ ঘটনাপ্রবাহগুলোকেই বলা হচ্ছে এখানে।
ঋদ্ধি সেন কেন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, তার সদুত্তর মিলবেই, কস্টিউম-মেক আপের সাথে যেভাবে পরতে পরতে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন, অসাধারণ….! (তাই দুটো জাতীয় পুরস্কার কস্টিউম আর মেকআপে, নগরকীর্তনের ঝুলিতেই) সাথে আবার ঋত্বিক থাকলে তো পাশের লোককে ভালো অ্যাক্টিং করতেই হবে….! আর্ট ডিরেকশন প্রশংসনীয়। কীর্তনের সাথে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঁশিকে, অনেক দুঃখের মাঝে একটা আনন্দের চোরাস্রোত বয়ে যায় দর্শকের অলিন্দ বেয়ে…..! সৌজন্যে – প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি….! ভালো লেগেছে সুজন মুখার্জি ওরফে নীলকে, মধুর বৌদির চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী যতক্ষণ ছিলেন ফাটিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যটা৷

মন ছুঁয়ে যায়, কীর্তনের মাধ্যমে বলা – “তুমি আমারই মতন জ্বলিও…” এই অকপট কথা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে….! রাধার প্রেমে মজে নিজেকেই রাধারাণী করতে উদ্যত।

সবশেষে বলতেই হয় কৌশিক গাঙ্গুলি আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন নিজেকে। অভিনয়ও করিয়ে নিলেন তাদের দিয়ে। ওনারা আশাবাদী এ সিনেমা দেখার পর মানুষজন তাদের হয়তো এতেটা অবজ্ঞা করবেন না। যাদের একঘর করে রাখে সমাজ, তিনি বারবার তাদের উপস্থাপিত করে গেছেন, বলে গেছেন সমাজকে পাল্টে নিতে ভাবধারা, কয়েকজনের বাঁচার মতো সমাজ কি আমারা গড়তে পারিনা, শ্রেনীশত্রু সৃষ্টি করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না…!
হলের টিকিট কাউন্টারের বৃদ্ধ মানুষটির দোষ খুঁজে পেলাম না বিশেষ, কারণ এ সিনেমা সবার জন্য নয়, কৌশিক গাঙ্গুলি বলেইছিলেন, এ সিনেমা রোজগারের জন্য বানানো নয়, এগুলো বানানোর পেছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো বোঝেননি….কবেই বা বুঝবেন।

কবেই বা বুঝবেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কেন আছেন এ সিনেমায়, কেন উৎসর্গ করার জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির নীচে লেখা

‘পর জনমে হইও রাধা…..’

© শুভঙ্কর দত্ত || February 25, 2019 

চলো গাড়ি বেলপাহাড়ী, হালকা করে ঘাটশিলা

চলো গাড়ি বেলপাহাড়ী……!
সেই ছোটোবেলায় খেলতাম যেসব বুলি আউড়ে, তার মধ্যে এটা একটা ছিলো। তখন জানতামও না যে বেলপাহাড়ী কদ্দূরে…শুধু পরে জেনেছি যে আমার বাড়ি থেকে বেশ দূরেই। পরে আরো যখন বড়ো হলাম, একটু আধটু ঘুরতে শিখলাম, তারও পরে ফেসবুকে যখন ছবি দেখলাম তখন ইচ্ছেটা আরো বেড়ে গেলো। একবার প্ল্যান করেও যাওয়া হলো না, অবশ্য সে ইতিহাস গোপণ থাকাই শ্রেয়। তারপর এলো এই সেই দিনটা….ঠিক আগের বছরের পুনরাবৃত্তি..! এবারও আগের বারের মতো একটা ফোন এলো ঘুরতে যাওয়ার অফার নিয়ে (মুফতে না তো অবশ্যই), জানতামই যে তারা বেলপাহাড়ী যাচ্ছে। অতঃপর ভেবে কোনো কাম নাই। সাগরেদকেও বলা হলো। বেরিয়ে পড়লাম বছরের একদম পেনাল্টি সপ্তাহে….!

মেদিনীপুর থেকে যাত্রা শুরু হলো ঠিকঠাক সময়েই। বেলপাহাড়ী পৌছানোর আগে অবশ্য শিলদাতে চপ-মুড়ি-বেগুনী সাঁটানো হলো। বেলপাহাড়ী গিয়ে কাঙ্খিত রুমে পৌঁছে ব্যাগ রেখেই বেরিয়ে পড়লাম।

  • পাহাড়ে ঘেরা লালজল

প্রথমেই লালজল….বাঁশপাহাড়ীর দিকে এগিয়ে চলতো থাকলো স্করপিওটা….দু পসারী ঘন সবুজ জঙ্গলটাকে পেছনে ফেলে যত এগোচ্ছি মখমলের মতো রাস্তা ধরে ততই মুগ্ধতার চাদরে নিজেদেরকে ঢেকে ফেলছিলাম, তখনও পৌঁছইনি, কিন্তু পথে গাড়ি থামিয়ে টুকটাক শ্যুটিং হলো শুরু। যানবাহনের দৌরাত্ম্য কম….! শ্যুটিং শেষে পৌঁছালাম লালজল…! পাহাড় না গ্রাম? লালজল আদপে একটা পাহাড়ঘেরা ছোট্ট গ্রাম, যার মূল উপজীব্য হলো লালজল দেবী আর লালজল পাহাড়ের আদিম গুহা। শীতের দুপুরেও উঠতে বেশ কসরত করতে হলো, গুহা পেরিয়ে উঠলাম একদম শিখরে…..সুবিস্তৃত বনরাশির আদরে চোখ মুখ তখনের মতো থ….! লালজলের সম্বন্ধে জানাতে গেলে সে অনেক কথাই বলতে হয়….! আনন্দবাজারের লিংক দিয়ে দেওয়ায় শ্রেয়…! বলে রাখা ভালো যে এখানের ঝরনার জল লাল বলেই এরকম নামকরণ।

img_20181229_121258
লালজল দেবীর মন্দির
img_20181229_120625
গুহা মুখ
img_20181229_114446
লালজল গ্রাম
  • পরিযায়ীদের ঠিকানা – খাঁদারানী ঝিল 

লিস্টে এখন অনেক নাম কিন্তু আাপাতত খাঁদারানী ঝিল…! জংলী ঝাঁকুনির রাস্তাকে হেলায় হারিয়ে দিয়ে পৌঁছালাম ঝিল…! খাঁদারানী ঝিল, যদিও কয়েকদিন আগেই এসেছিলাম একবার। সেতুবন্ধন পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম ওপারে….বিড়ি পাতার গাছ, বাবুই ঘাসের জঙ্গল (যা দিয়ে দড়ির খাট বানানো হয়)….দেখা পেলাম ঝিলের স্থায়ী বাসিন্দা পাতাঝাঁঝিদের, হ্যাঁ সেই ক্লাস সেভেন এইটে পড়া পতঙ্গভুক উদ্ভিদের অন্যতম….! নিরালা নিস্তব্ধ খাঁদারানী, যেখানে এখনো বিদ্যুত বিভাগের আশীর্বাদ পৌঁছায়নি, তাই মাইকের জন্য সৌরকোশও ভরসা কারো কারো কাছে, লাল শালু আর পাতাঝাঁঝি ভরা ঝিলের মাঝে একটা দ্বীপ রয়েছে, যেখানে দেশ-দেশান্তর থেকে অনেক পরিযায়ীরা আসে, তাদের কুহুতানে গোটা ঝিলে পিকনিকরত লোকজনের এতটুকু বোরিং লাগার কথা নয়। ওপার থেকে পিছিয়ে আসতেই চোখে পড়লো– সবুজের উচ্চতাকে হার মানিয়ে ওঠা একা পাহাড়ের শিখর…! কি নাম তার??
গাডরাসিনী পাহাড়…..! উফফ্ কখন যাবো???

img_20181214_113215_hdr
প্লাস্টিক মুক্ত
img_20181229_125132
উঁকি মারে
img_20181214_110103_hdr
ঝিলের সেতু
img_20181214_142109
মাঝে আছে ছোট্ট দ্বীপ
img_20181214_142929_hdr
পাতাঝাঁঝির জঙ্গলে
img_20181214_113244_hdr
সচেতন হোন
img_20181214_130407_hdr
বিড়ি পাতার গাছ – কেন্দু
img_20181214_125950_hdr
বাবুই ঘাসের পাড়ায়

নাহহহহ ততক্ষণে জ্বালানি ভাণ্ডারে কুচকাওয়াজ চলতে শুরু করেছে অনবরত..! অতএব আহারাদি সারা যাক্। বেলপাহাড়ী ফিরে গিয়ে ‘তৃপ্তি’ তে তৃপ্তিভরে খেলাম। একটু জিরিয়েই আবার ঐ পথ ধরেই পরের গন্তব্য…..

  • গর্জাস গাডরাসিনী পাহাড় 

পৌঁছে গেলাম গাডরাসিনী পাহাড়ের কোলে। আশ্রম পেরিয়ে সোজা চড়াই এর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ন’জন আরোহী…! ওঠা শুরু হলো। অবশ্য বড়ো পাহাড়ে ওঠার রিহার্সালটা সেই লালজল দিয়েই হয়েছিলো। পাহাড়ে একপ্রস্ত ওঠার পর একটা বিশ্রামের জায়গা মিললো, একটা মন্দির, কি মন্দির, সেসব দেখার সময় কোথায়? এগিয়ে গেলাম আরে উচ্চতার দিকে। এরপর উচ্চতায়, একদম। পুরো বেলপাহাড়ী উঠে এলো চোখের সামনে, সে যে কি মনোরম দৃশ্য, স্বভাবতই একজন সঙ্গী বলছিলো -“সবকিছু ক্যামেরা ধরতে পারে না।” সত্যিই তাই, সে যে কি নৈসর্গিক রূপ, তা বোধহয় প্রত্যক্ষ না করলে বোঝা সম্ভব ছিলো না৷ পাহাড় থেকে যেদিক পানে চাই শুধুই….. যেনো সবুজ গালিচা বিছিয়ে তার ওপর দিয়ে প্রকৃতি হেঁটে বেড়াচ্ছে। রৌদ্র এর চোরাগোপ্তা আক্রমণ আরো গাম্ভীর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়ের গাছগুলোর৷ একটা গুহা যাওয়ার রাস্তার দিকনির্দেশ দেখে নেমে গেলাম। গাছের শিকড়ের কম্ম স্বরূপ আবহবিকারের ফলে যে গুহার সৃষ্টি তার ভেতর যে লোকাচারের পুজা চালু তা একটু পরেই বোঝা গেলো। ওপরে উঠে যেতেই সঙ্গী সাথীদের চোখে পড়লো, পড়লাম। পতাকা নির্দেশিত জায়গাটায় গিয়ে দেখি একখানা রিভার্সিবিল রিঅ্যাকশন হবো হবো করছে….মানে? কি আর…! এবার গাডরাসিনীর মাথা থেকে খাঁদারানীর সর্পিল পথ – স্পষ্ট দেখা মিললো।
নামতে ইচ্ছে করছিলো না, ঘড়ির ছোট কাঁটা কখন চারের ঘাড়ে গিয়ে চুমু খেয়েছে বুঝতেই পারিনি, কম কনট্রাস্ট এর ভানুবাবুর কায়দাতে পাহাড়টা বাঘা বাঘা টুরিস্ট স্পটকে তখন বলে বলে গোল দিচ্ছে…! রোজই দেয়। নেমে এসে আশ্রমের কলের জলে মুখটা ধুলাম, এতো ভারী আর মুলায়েম জল, মনে হলো চানটাই সেরে ফেলি…! এবার…..

img_20181214_164702
অতএব…
img_20181229_145529
চলা শুরু
img_20181229_152622
আবহবিকার @ গাছের শিকড়
img_20181229_152852
ছবির মতোই
img_20181229_153903
সুন্দরী খাঁদারানী – গাডরাসিনীর কোলে
img_20181229_154719
শিখর জয়ের পতাকা
img_20181229_153039
পড়ন্ত বেলায়
pano_20181229_155249
প্যানোরামা তে
  • বনের আঙিনায় ঘাগরা

ঘাগরা….! জলের আঘাত পাওয়া পাথরের বুক চিরে সবুজ নীলচে জলরাশি এগিয়ে চলেছে অনামি কোন মহাপ্রস্থানের পথে। ঝুর ঝুর শব্দে ফেনিল স্রোতস্বিনীকে হার মানিয়ে কখনো প্রকট হয়ে উঠছে শব্দদানবের হাঙ্গামা….! তাতে কি? আদিগন্ত বনানীর আঙিনা জুড়ে থাকা প্রবাহমান এই স্রোত এতটাই ম্রিয়মান যে জলপ্রপাত বলতে কেউ কেউ হয়তো রাগ করবেন বা দু এক মিনিট খিল্লি করতে পারেন। জলের তলায় আজব সব আঁকিবুঁকি। সবই ঐ জলরাশির ক্যালমা….পাথরগুলোকে খেয়ে খেয়ে এমন সব আলপণা….মনুষ্যসৃষ্ট কে হার তো মানাবেই, প্রকৃতি যেখানে ইঞ্জিনিয়ার।

img_20181229_170135
ফেনিল
img_20181229_170149
পাথরের বুক চিরে সবুজাভ জলরাশি
img_20181229_172610
জলের কায়দা
img_20181229_171659
ঘাগরা
img_20181229_171841
জলছবি

প্রায়ান্ধকার পরিস্থিতিতে আরো গাম্ভীর্য্য বেড়ে গেলো তার। ফিরতে হবে…! ফিরতি পথে এক মিষ্টি দোকানে গিয়ে নলেন গুড়ের রসোগোল্লা দিয়ে কিঞ্চিৎ উদরপূর্তি হলো। এবার সেই রুম।

 

রাতের মেনুতে কি আছে?
বেলপাহাড়ী স্পেশাল – শাল চিকেন… পুরো পাঁকশালা তৈরী করে, খাদ্যবস্তু প্রস্তুত…! রুটি দিয়ে দুমাদ্দুম সাঁটানো হলো। পড়ে রইলো কিছু, নিয়ে এসে মেদিনীপুর প্রিয় লোকজনদের আবদারে মুড়ি দিয়ে হলো ভুরিভোজ।

img_20181229_202303
রান্নার ঠিক পূর্বে : সরঞ্জাম
img_20181229_204511
আরো শীত বাক্সবন্দী কিছু ইচ্ছে আছে
  • নির্জন ঢাঙিকুসুমে সকালটা

সাত সকালে বেরুতে হবে। গন্তব্য – ঘাটশিলা, ভায়া কাকড়াঝোড়। ড্রাইভার চলে এসেছে, হন্তদন্ত করে বেরিয়ে পড়লাম। বেলপাহাড়ী স্পেশাল খেজুর রসকে অবহেলা করি এমন সাহস কার আছে? ড্রাইভারদা ভরসা, নিজে হাতে গড়িয়ে সে পানীয় গলাধঃকরণ করলাম। এবার যাবো ঢাঙিকুসুম। শুধু জানতাম একটা ঝর্ণা আছে, কি, কেমন সেসব জানতামই না। শহুরে জগৎ থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে এমন অখ্যাত একটা জায়গায় যে এতসুন্দর একটা ঝরণা আছে জানতামই না, মনে মনে ভাবছি বর্ষাকালে এর রূপ কেমন হতে পারে….! পাথুরে পথ দিয়ে যত এগোচ্ছি, বিস্তৃত বনরাশি ততই আলিঙ্গন জানিয়ে আরো গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেলাম, শ্যুটিং স্পট। বেশ কিছুক্ষণ চললো রোল-ক্যামেরা,আরে না না অ্যাকশনের জন্য পয়সা কই..! কিন্তু ঝরণা কোথায়..! দিকভ্রান্ত হইনি, হলে ভালো হতো। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি নীচের দিকে বয়ে যাচ্ছে জলরাশি….কুলুকুলু রবে তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে…..! এই তো সেই তাপগতিবিদ্যার চ্যাপ্টারে পড়া স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় এক্কেবারে বাস্তব – চাক্ষুষ উদাহরণ। আর ধরে কে…! হামাগুড়ি দিয়ে যেমন তেমন করে নীচে নামলাম….! আহহহহ কি দেখতে পুরো ঝরণাটা। গোটা ট্রিপে এমন জায়গা বোধ হয় আর কোনেটাকেই লাগেনি, লাগামছাড়া নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু আমরা কজন….! বসেই রইলাম কিছুক্ষণ। এবার আবার পাথুরে পথের নতিকে টেক্কা দিয়ে উঠে এলাম ওপরে…! যেতে হবে ঘাটশিলা। কাকড়াঝোড় পেরিয়ে ঘাটশিলা যাচ্ছি….! পথে পড়লো লাল শালুকের দীঘি, শাল-মহুল-কেন্দু গাছের সারি।

img_20181230_090904
টাটকা
img_20181230_104752
বয়ে চলে যায়
img_20181230_104118
ম্রিয়মান স্রোতস্বিনী
img_20181230_101324
এখন রাস্তা
img_20181230_085509
গুড় প্রস্তুতি
img_20181230_102506
ঢাঙিকুসুমে আমরা
  • ট্রাফিক জ্যামে ঘাটশিলা 

সে সব পরিয়ে পৌঁছালাম বুরুডি লেকে, বছর দেড়েক আগে এতো মানুষের ঢলানি তখনো শুরু হয়নি বুরুডির লেকে, এখন দোকান, হোটেল, লেকের জলে নৌবিহার, এসব তার বোরিং তকমা তুলে দিতে সাহায্য করলেও তার সৌন্দর্যের কিছু হ্রাস ঘটেছে, বইকি!!! ধারাগিরী যাওয়ার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। লাঞ্চ সেরে নিলাম বুরুডিতেই। ওখান  থেকে স্টেশন যাবার পথে পড়লো অপুর স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি – “গৌরীকুঞ্জ”, স্থানীয় একটি ক্লাবের সৌজন্যে যা এখন ঝাড়খণ্ডের দর্শনীয় স্থান। দেখে নিলাম অপুর পাঠশালা, ঝাড়খণ্ডে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলা স্কুলের থেকে কিছুটা অব্যহতি পেতে যেখানে এখনো আরণ্যক স্রষ্টার উত্তরপুরুষদের অর্থানুকূল্যে বাংলা শেখানো হয় বিনে পয়সায়।

বেরিয়ে এলাম, সুবর্ণরেখা ডাক দিলো। অগত্যা…কিছু অক্সিজেন নেওয়া গেলো। ট্রিপ শেষের মুখে, প্রহর গুনছে অপরাহ্ন, প্রহর গুনছি আমরাও…! যেতে হবে ঘাটশিলা স্টেশন, লক্ষ্য ইস্পাত এক্সপ্রেস, গাড়ির ড্রাইভার খুবই ক্লান্ত, তাই ট্রেন, আর ফিরতেও সুবিধে….! ঘাটশিলা স্টেশনে এসে ট্রেন পেতে একটা জায়গা পেলাম। ট্রেন তো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে……আমি চোখ বুজলাম। ফ্ল্যাশব্যাকে, ফেলে আসা দুটো দিন আর কয়েক শো ছবি….! পিছিয়ে যাচ্ছি আমি ক্রমশ৷

img_20181230_143051
অপুর পাঠশালা
img_20181230_143306
গৌরীকুঞ্জ
  • সিল্করুট বেলপাহাড়ী

এবার একটু রুট বলি। ঘুরতে যারা ভালোবাসেন, তারা বেলপাহাড়ীর জন্য একটা আলাদা দিন রাখুন। পুরোটা একদিনে ঘুরতে চাপ হয়ে যায়, তারপর তো আবার সেলফি তোলার হিড়িক রয়েইছেই। অতএব, এক রাত্রির কাটানোই ভালো, অন্তত যারা দূর থেকে আসবেন। বেলপাহাড়ী আসার এখন অনেক বাস, সরকারী বাসও প্রচুর। কলকাতা থেকে আসার জন্য ঘাটশিলা ট্রেন ধরে ঝাড়গ্রাম, তারপর বাসে বেলপাহাড়ী যাওয়াই যায়, তারজন্য সকাল সকাল আসতে হবে। থাকার জায়গার জন্য হোম স্টে পাবেন৷ হোম স্টের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন তারক কাকু মানে তারক দন্ডপাতকে৷ যোগাযোগ নম্বর- 9434453823…
বেলপাহাড়ী থেকে স্করপিও করতে হবে, ভাড়া নেবে ২৫০০ এর মতো। দূরত্ব নেহাত কম নয়,গুগল ম্যাপে ক্রশচেক করে নিতে পারেন। এটুকু বলতে পারি মাতালদের নৃত্যভূমি দীঘার চেয়ে কয়েকশো গুন ভালো। যাই হোক্ একটু দর কষাকষি করলে কমে যেতেও পারে, মোটামুটি পাঁচ-সাতজন গেলে খরচটা কম পড়বে৷ ঐ আর কি, মাথার সাথে খরচের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। অবশ্য মোট খরচতো ধ্রুবকই৷

আমরা ঘোরার মাঝে শ্যুটিং এ মেতে

img_20181214_163525
ফিরতে হবে
img_20181230_161658
বাই বাই বেলপাহাড়ী

 

যাই হোক্, এতো না ভেবে বেরিয়ে যেতেই পারেন, ‘চলো গাড়ী বেলপাহাড়ী’ শৈশবের সেই লাইনটা না হয় এবার ভ্রমণের শিরোনামে ঠাঁই পাক্….!

 

©শুভঙ্কর দত্ত || January 4, 2019

‘হীরক রাজার দেশ’ পেরিয়ে তেলকুপিতে তিনমূর্তি

 

PANO_20181220_114704

হীরক রাজার দেশে যাবো…. বড়োই বসনা ছিলো বহুদিন ধরে। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে দেখেছি, লোকজনের করা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে দেখেছি। যতবার দেখি ততবার ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে৷

মাঝরাতে প্ল্যান হলো। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে ভোর ভোর মুখে মাজন নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম — উদ্দেশ্য – হীরক রাজার দেশ…. থুড়ি হীরক রাজার দেশ এর সেই শ্যুটিং স্থল। সেই কবে ছোটোবেলায় সিনেমা হলে দেখেছিলাম রাজসেপাই থেকে লুকিয়ে থাকা উদয়ণ পণ্ডিতকে…সেই ‘দড়ি ধরে মারো টান..’ — জয়চণ্ডী পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে সেলুলয়েডের দৃশ্যগুলো যেন সামনে এসে ধরা দিলো। যাই হোক্, এগোনো যাক্, আসলে আনন্দে আত্মহারা হলে যা হয় আর কি!

KGP-ASN প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চাপার পর যখন ঢুলুঢুলু চোখে আদ্রা পোঁছালাম, হেব্বি খিদে পেয়ে গেলো। আদ্রা স্টেশনের বিখ্যাত বেকারীর আইটেম কটা সাঁটিয়ে দিলাম। ট্রেন ছাড়লো, পরের স্টেশন — ডেস্টিনেশন রিচড, ততক্ষণে ঘড়ি বলছে ১০ টা ২০।
জয়চণ্ডী পাহাড় কি যাবো, স্টেশন চত্বরটা এতো মনোরম, আমাদের মতো ফটোগ্রাফি প্রেমী লোকজন সে স্টেশন ছেড়ে গেলে তো! এদিকে নিজেদের ফটোগ্রাফি নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অটো হাতছাড়া হলো, অতঃপর রিসার্ভ করতে হবে। দুচ্ছাই! যাই হোক্, জয়চণ্ডী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম অটো করে।

 ছবির মতোই সুন্দর জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন

সামনে জয়চণ্ডী পাহাড় — সেই সত্যজিৎ রায়, সেই…… চোখে স্থির। দেরী না করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে শুরু করলাম৷ বেশ চড়াই পথ বেয়ে উপরে উঠছি, একটা রোগগ্রস্থ, জীর্ণ ওয়াচ টাওয়ারকে ডানহাতি ফেলে একটু এগিয়ে যেতেই দেখি মা চণ্ডীর মন্দির। দেবীর নাম অনুসারেই হয়তো পাহাড়ের এমনতর নাম৷ পাশেই বজরংবলী মন্দির। পাহাড়ের একদম ওপরে এসে পুরো পাহারতলী চোখে ভাসছে, বিলম্ব না করে খচাৎ খচাৎ রব তুললো আমাদের তিনমূর্তির ক্যামেরা। মন খুশি করা ফটোগ্রাফি করে কিছুক্ষণ ধরে জয়চণ্ডীর রূপ দর্শন করে নীচে নামলাম, ততক্ষণে আমাদের অটেওয়ালার ফোন চলে এসেছে। এরপর যাবো – তেলকুপি, আগেভাগে বলা ছিলোই, রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে দামোদর তীরে ইতিহাসের শেষ প্রহরীকে দেখার ইচ্ছেটা ফেসবুকের দৌলতে। মাঝে দুপুরের আহারটা সেরে নেওয়া গেলো, রঘুনাথপুরেই। খাওয়া সেরে অটো আবার অটোতে গিয়ে বসলাম।
আহহহ কি রূপ৷ পুরো রাস্তা জুড়ে দূষণমুক্ত ঠাণ্ডা বাতাসে ‘খেতে পেলে শুতে চাই’ এর সমার্থক কিছু একটা অটোতেই হয়ে গেলো। চেলিয়ামার আগে ডানহাতি রাস্তা নিতেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। দূরে সাঁওতালডিহি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রাশি রাশি ধোঁয়ার পাক চোখে পড়লো, দু পসারী কাজু আর খেজুর গাছের মধ্য দিয়ে মখমলের মতো রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গাড়ি পড়লো গিয়ে এবড়ো খেবড়ো একটা রাস্তায়। অঙ্গভঙ্গি করতে করতে অটো এগিয়ে চলছে, তেলকুপির পথনির্দেশক সাইনবোর্ড পেরিয়ে যে রাস্তা পেলাম, তাতে শুধু আমরা পড়তেই বাকি রইলাম। অপকেন্দ্র বলের বদান্যতায় ব্যাগের থেকে বোতল ছিটকে পড়লো রাস্তায়, হু্শ হলো কিছু পরে। তারও পরে বেশ কিছুটা আসতে তেলকুপি ঘাটে এসে দেখি আদিগন্ত জলরাশি– দামোদর ছাড়া আর কি! ফিঙে গুলোর আমন্ত্রণে দূর থেকে দেখতে পাওয়া দেউলটার দিকে এগিয়ে চললাম….হলদে সবুজ সরষে ক্ষেতের মধ্য দিয়েই। সামনে এসে থ!! এবার জুতো মোজা খুলে, জিনসকে থ্রি-কোয়ার্টার করে জলভেঙে যেতে হলো এ পারে….জরাজীর্ণ দেউল, ইতিহাসের শেষ প্রহরী– রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া দামোদরের প্রান্তে বুক চিতিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে….অটোওয়ালার কাছ থেকে জানা গেলো আর একটা মাঝনদীতে,কিন্তু এখন আর নৌকা চলছে না, অতঃএব এতক্ষণ এর উদ্দীপনার সলিল সমাধী হলো। দেউলের সামনে বসে বেশ কিছুক্ষণ শান্ত স্নিগ্ধ দামোদরের রূপ উপভোগ করলাম। একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স যাকে বলে। বসে বসেই তেলকুপি নিয়ে গুগলবাবাজীর স্মরণাপন্ন হতে জানা গেলো বেশ কিছু তথ্য…..!

IMG_20181220_120246_HDR
পাকদণ্ডী পথের স্যাটেলাইট চিত্র 😛
IMG_20181220_114356_HDR
রুটি রুজির সন্ধানে
IMG_20181220_114841_HDR
পাতা ঝরার মরশুমে
IMG_20181220_123627_HDR
প্রবেশদ্বার
IMG_20181220_113946_HDR
টিলা আর কিলা
PANO_20181220_114628
শীতঘুম ওদের
IMG_20181220_115420_HDR
বিশ্বাস
IMG_20181220_113609_HDR
ওয়াচ টাওয়ার
IMG_20181220_113452_HDR
ফাঁক ফোঁকর
IMG_20181220_114045_HDR
জয় বজরংবলী
IMG_20181220_112256_HDR
ইয়ে দুনিয়া বড়ি গোল গোল গোল
IMG_20181220_114058_HDR
জয় মা চণ্ডী
IMG_20181220_123856_HDR
সত্যজিৎ রায় আজও বেঁচে
IMG_20181220_114250
পাহাড়ীয়া
IMG_20181220_122447
শেষের শুরু, ৪৯২ টা সিঁড়ি
IMG_20181220_115517_HDR
নৈসর্গিক

রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখন লোক গবেষকদের চর্চার বিষয়। তাঁদের মতে, তৈলকম্প লোকমূখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে তেলকুপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সাথে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দরেই জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দির নগরী।

১৮৭৮ সালে জিডি বেগলারের ‘রিপোর্ট অফ আ ট্যুর থ্রু বেঙ্গল প্রভিন্সেস’ রচনাতে এই তেলকুপির মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য মেলে। যেখানে বেগলার তেলকুপিতে মোট ২২টি মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আবার দেবলা মিত্রের ‘তেলকুপি- আ সাবমার্জড টেম্পল সাইট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বইয়েতে তেলকুপির মন্দির নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। তা থেকে জানা যায়, একদা তেলকুপিতে ২৫-২৬টি মন্দির বা দেউল ছিল। ফলে তেলকুপির অতীতের স্বণর্র্যুগ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

কিন্তু ব্যথা দেয় বর্তমান। কারণ দামোদরের উপরে পাঞ্চেত জলাধার তৈরির পরে এই মন্দিরগুলির বেশিরভাগই চলে যায় নদের গর্ভে। কোনও ভাবে মাথা উঁচিয়ে রয়ে গিয়েছে তিনটি দেউল। তার মধ্যে দু’টিকে বছরের প্রায় সব সময়েই দেখা গেলেও একটি শুধুমাত্র গরমকালে দামোদরের জল কমলে দেখা যায়। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে জলাধার তৈরি হলে হয়তো তেলকুপির ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আক্ষেপ আরও রয়েছে, টিকে যাওয়া ওই তিনটি মন্দির ও মূর্তিগুলিরও রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই।

লোক গবেষকদের একাংশের মতে, তেলকুপি নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় তৈলকম্প থেকেই তেলকুপি নামটি এসেছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, সংস্কৃতে তৈল মানে তেল। আবার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তৈল মানে এক ধরনের কর এবং কম্প কথাটি এসেছে মূলত কম্পন অর্থাৎ পরগনা। এ থেকে তাঁদের অনুমান, তৈলকম্প বা অধুনা তেলকুপি ছিল কর প্রদানকারী বা করদ রাজ্য। তেলকুপি নিয়ে প্রাচীন ইতিহাসে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে তৈলকম্পের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কবি লিখেছেন যুদ্ধে যার প্রভাব নদী, পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে, বিস্তীর্ণ পর্বত কন্দরের রাজবর্গের যিনি দর্প দহনকারী, দাবানলের মতো সেই তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর। আবার রামচরিতম কাব্যর উল্লেখিত রুদ্রশিখর যে তৈলকম্পের রাজা ছিলেন, তা জানা যায় জয়পুরের দেওলঘাটার বোড়ামে একটি শিলালিপি থেকে। সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্যে উল্লেখিত রুদ্রশিখর এই তৈলকম্পের রাজা ছিলেন। ততকালীন সময়ে বাংলায় পালযুগে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল.এবং ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিল জৈন ব্যবসায়ীরাই। যাঁরা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি তামাজুড়ি ও তামাখুন থেকে তামা এনে তৈলকম্প বন্দর থেকে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন।

 

IMG_20181220_144252
‘দেউল’ এর জলছবি
IMG_20181220_143732_HDR
শেষ প্রহরী আর সঙ্গে আমরা
IMG_20181220_142541_HDR
তেলকুপি -নিরালায়
IMG_20181220_141735
অবহেলা – তেলকুপির সর্দার
IMG_20181220_143412_HDR
ভগ্নাংশ
IMG_20181220_141517
শেষ প্রহরীর প্রহরীরা
IMG_20181220_141722_HDR
অস্তমিত সূর্যালোকের উদ্ভাসিত ইতিহাস

 

যাই হোক্, এতকিছু জানার পর ঘাবড়ে গেলাম, যে সত্যিই কোথায় চলে এসেছি। শহুরে আলো থেকে শত যোজন দূরেও দেউলটা এখনো ইতিহাসের স্বাক্ষর বয়ে চলেছে, রৌদ্র-ঝড়-দুর্যোগ মাথায় নিয়ো আরামসে ইতিহাসের শেষ প্রহরীর মতো স্থানুবৎ দণ্ডায়মান…..! যেন বলে যাচ্ছে — “এ শহর বা হিম গহ্বর কে আছো কোথায়?” বা “আয় রে ছুটে আয় রে তোরা…!”
যাই হোক্, আরো ছিলো নিদর্শন, পাশের কটা গ্রামের মানুষের দৌলতে, সে আর হলো না দেখা। অটো করে আবার ফিরে যেতে হবে, মনটা একটু খারাপ হলো৷ প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ…ঘুম আর ঢুলের সংমিশ্রণে কখন জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন চলে এসেছি খেয়ালই নেই। পাক্কা দুঘন্টা সময় হাতে, মুড়ি-ঘুগনি দিয়ে উদরপূর্তি করা গেলো।
অবশ্য তার আগে অস্তমিত সূর্যের আভায় দূরের জয়চণ্ডী পাহাড়টাকে বারে বারে…….!
হীরক রাজ্য জয়……! এবার?????

IMG_20181220_100312
ব্রেকফাস্টের ছবি শেষে দিলেও ক্ষতি নেই

 

 

 

IMG_20181220_120854
তিনমূর্তি

 

তবে এ যাত্রার পেছনে আর এক কাহিনী লুক্কায়িত, সে না হয় কোন এক অবসরে হবে। আপাতত…..

————————————————————-

তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা

ঋণ – গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || December 23, 2018 

অপরাধী : অভিনয়?

ব্রাজিল হেরে গেলো?
বিশ্বাস করতে হচ্ছে, তার কারণ একটা লোক……!

তবে একটা জিনিস অদ্ভূত লাগছে খুব, যে ব্রাজিল কে নিয়ে গলা ফাটায় আমরা, মানে বাঙালিরা, ব্রাজিল সমর্থকরা, তাদের কেউ কিন্তু খুব দুঃখিত নয়। তার কারণ,
এক, হতে পারে, বেলজিয়াম যোগ্য দল হিসেবে জিতেছে, প্রথম ম্যাচ থেকে কর্তৃত্বের সাথেই জিতেছে।
দুই, ব্রাজিল দারুণ চেষ্টা করেছে, লজ্জাজনক ভাবে হারেনি। মুহুর্মুহু আক্রমণ করেছে, নিজেদের ছন্দে খেলেছে।

 

কিন্তু কোন বন্ধুই দেখলাম না ব্রাজিলের খেলা নিয়ে কিছু বললো।

আমার আবার আট বছর আগেকার দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, কোয়ার্টার ফাইনালে সেবার নিজেদের প্রথাগত হলুদ জার্সি ছেড়ে নীল রং এর জার্সিতে ব্রাজিল খেলেছিলো ডার্ক কিউট, স্নেইডার, স্টেঙ্কেলবার্গ, রবেন, ভ্যান পার্সির হল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে। সে বার ব্রাজিলে কে ছিলো না? রোবিনহো, কাকা, ডানি আলভেজ, লুই ফাবিয়ানো……! যাই নামই বলি, এইখানে গিয়েই আটকে যেতে হবে। কারণ এবার ব্রাজিল দলে নামডাকে বড়ো এরকম অনেক প্লেয়ারও আছে, ১১ জনের দলে সুযোগ না পেয়েও ডাকসাইটে প্লেয়ার বলা যায়। মনে পড়ছে সেবারও একটা ফ্রি কিক ব্রাজিলের গেলকিপার জুলিয়াস সিজার এবং একজনের ভুলে প্রায় আত্মঘাতী গোল হয়েছিলো, তবে স্নেইডারের কৃতিত্ব কম ছিলো না ফ্রি কিক নেওয়াতে। ১-০ তে এগিয়ে ছিলো ব্রাজিল, ঐ গোলে সমতা এলো। পরের একটা গোলও স্নেইডারের, কর্ণার কিকে হেডার। কাকা অনেক চেষ্টা করেছিলো, রোবিনহোও….! কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। যাক্, ২০১৮ তে আসি………

এই ব্রাজিল দলটাতে প্লেয়ারের অভাব নেই। ভালো স্কিলফুল প্লেয়ার। কুতিনহো, জেসুস, ফিরমিনহো, নেইমার, মার্সেলো, কাসিমেরো, পাওলিনহো, লুইস, সিলভা — সবাই ক্লাব ফুটবল এবং দেশের খেলাতেও নজর কেড়েছে। তবে জেসুসকে কাল কেন এতোক্ষণ ধরে খেলানো হলো বুঝিনি। যাই হোক্ বিতর্ক বাদ।
বেলজিয়ামের খেলা আহামরি কিছু লাগেনি। ম্যাচ সামারিই বলে দেবে বেলজিয়াম শুধু জিতেছে, কর্তৃত্বটা রাখতে পারেনি, ব্রাজিল আর জেতার মধ্যে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়ালো টিনটিনের দেশের গোলরক্ষক কুর্তোয়া। ব্রাজিলের খেলা দেখে খারাপ লাগেনি, চেষ্টা চালিয়ে গেছে। বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের ভিতরে গিয়ে ছোটো ছোটো টোকাতে পাস খেলে গোল দেওয়াটা ব্রাজিলের স্বভাবসিদ্ধ। বেলজিয়াম কোচ এটা ধরে ফেলেছিলেন, ব্রাজিল আক্রমণে এলেই ছেলেদের লেলিয়ে দিলেন ঐ জায়গাটাতে, রেড ডেভিলদের পায়ের জঙ্গলে বল বারবার প্রতিহত হতে থাকলো, সাথে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনাও। নেইমার-কুতিনহোরা বারবার চেষ্টা করে গেলেন কিন্তু হায়…..!
দূর থেকে দু একটা শট নেওয়া হলো। এবার রক্ষণের শেষ প্রহরীর মতো আগলে দাঁড়ালেন থিবো কুর্তোয়া….! একের পর এক অসামান্য সেভ করতে থাকলেন একা হাতে। ২০০৬-২০১৪ যে যে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের গোলরক্ষকগুলোকে দেখলেই বোঝা যায়, কেন তারা জিতেছে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন টিমের গোলরক্ষক সেরকমই হবেন, বকলমে বিখ্যাত হবেন না, কখনই, কাজ করে দেখিয়ে দেবেন। বুঁফো-কাসিয়াস-ন্যয়ার এর পর সম্ভবত কুর্তোয়া সেই সম্ভ্রমের জায়গাটায় চলে গেলেন। সম্ভবত কেন, অবশ্যই গেলেন। নেইমারের হালকা টাচটা যেভাবে প্রতিহত করলেন নিজেকে একটা উচ্চতায় ছুঁড়ে দিয়ে, সেটা দেখে নেইমার নিজেই কিঞ্চিৎ হাসলেন। গোল এলো অগাষ্টোর হেড থেকে। তবে ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে গেলো। বেলজিয়াম প্রথম থেকে অদ্ভূত রণনীতি নিয়ে খেলছিলো, যখন অ্যাটাক করতে যাচ্ছে দশ জন চলে যাচ্ছে, যখন ডিফেণ্ড করছে তখনও দশ জনে। ব্রাজিলের সাম্বা ম্যাজিকটাকে ম্রীয়মাণ করে দিলো তারা প্রথমার্ধেই, যেখানে সেলেকাওরা এক গোল পরিশোধ করার জন্য আঘাত পাওয়া বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে, বেলজিয়াম দ্বিতীয় গোল পাওয়ার পর পুরে মাইণ্ড গেম খেলে চললো। দশ জন ডাকাবুকো লোক মিলে ডিফেণ্ড করলে গোল করা বোধ মারাদোনাও পারতেন না….! বেলজিয়াম দলটাই একমাত্র ইদেন হ্যাজার্ড ব্যতীত সবাই লম্বায় যেমন, চওড়াতেও তেমন, লুকাকুর কথা তো না বলাই ভালো, কেন জানিনা ফুটবলের “ড্যারেন স্যামি” লাগে। ঐ রকম চরকি লাচন করে পাশ দেওয়া, সেই পাশ থেকে দে ব্রুইনের অসম্ভব সেন্টার, আর আলিসন পরাস্ত! এরম গোল দেখলে আর আক্ষেপ থাকে না। ব্রাজিলের সমর্থক হলেও ২০১৪ থেকে বেলজিয়ামকে খুব ফলো করি, খেলা দেখতেও ভালো লাগে, কেমন যেন ‘নতুন জার্মানি, নতুন জার্মানি’ গোছের খেলে। ২০১৪ তে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিলো, ডি মারিয়ার পাশ থেকে হিগুয়েনের গোল বেলজিয়াম এর শেষ চারে যাওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছিলো, ৮ মিনিটের করা গোল, বাকি ৮২ মিনিটেও শোধ করতে পারেনি, অথচ সেই দলেও এরাই ছিলেন, এখন যারা ব্রাজিলকে হারালো। বরাবর বলা হয় বেলজিয়াম নাকি ফুটবলের দক্ষিণ আফ্রিকা, সারা বছর ভালো খেলে বিশ্বকাপের সময় কাঠি বেঁকে যায়….! এবার সামনে সুযোগ অনেক….! কাপ জয় থেকে আর মাত্র দু ম্যাচ দূরে, গোটা বিশ্বের সমর্থন পাবে বেলজিয়াম, নতুন চ্যাম্পিয়ানদের স্বাগত জানাতে যদিও সেমিতে ফ্রান্সের সম্মুখীন হতে হবে। কুর্তোয়া যদি ইট সিমেন্টের প্রাচীর হন, লরিস তো আবার লোহার প্রাচীর…! সে যাই হোক্ এখনও অবধি ১৪ গোল, কর্তৃত্বের সাথে জেতা এবং জাপানের বিরুদ্ধে ২ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোল করে জয়লাভ, জার্মানি – আর্জেন্টিনা – স্পেন – ব্রাজিল এর আপাত সমর্থকদের তারা নিজেদের করে নিয়েছেন।

তবে একটা কথা বলতেই হয়, কাকা-রোনাল্ডো-রোনাল্ডিনহো-রোবিনহো, এদের খেলা দেখার পর নেইমারের খেলা দেখলে রীতিমতো আহত হতে হয়, ২০১০ এর রিপ্লেটাও দেখলাম, কাকাকে পেনাল্টি বক্সে ফাউল করা হলো, বিধিসম্মত, তবুও তিনি পেনাল্টির জন্য বিন্দুমাত্র আবেদন করেননি , রোনাল্ডো বা রোনাল্ডিনহোর যে সব খেলা দেখেছি, পড়ে গেলেন, উঠে আবার দৌড়, প্রতিপক্ষ ফেলে দিলো, ওনারা উঠে দৌড়তে লাগলেন, ব্রাজিলের খেলার এটা একটা গুণ ছিলো, ট্যাকেল এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু নেইমার যেটা করলেন,তাতে করে তাকে আদর্শ করা তো দূর কি বাৎ, কিছুকেমন বিজ্ঞাপণের বিষয়বস্তু হতে পারেন…..! হয়ে গেছেনও, ফেসবুক পেজ অ্যাডমিনদের পোয়া বারো তো এখন….! কাকার মতো সৎ প্লেয়ার বাদ দিলেও, নেইমার অনেক পিছিয়েই থাকবেন। এতো ছলনার আশ্রয় নিতে গিয়ে এতো সময় নষ্ট, মেনে নেওয়া যায় না। তবে একটা জিনিস কিছুতেই বুঝলাম না, রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখালেন না কেন? নিশ্চয় পেনাল্টি নয়, আবার নেইমারও ঠিক করেননি, তাহলে ছলনা করে রেফারিকে প্রতারিত করার মতো ঘৃণ্যতম অপরাধের সাজা স্বরূপ একটা বুকিং কি এমন আহামরি কঠিন কাজ…! আসলে ব্রাজিলের না জেতার কারণ, এটাও, নেইমারের অভিনয় এমন আঙ্গিকে পৌঁছে গেছে যে নিজের দলের সমর্থকরাই বিষ ঢালছে, অভিসম্পাতে জর্জরিত হলো গোটা দলটাই। তবুও কুর্নিশ পোলাডারে, চোট থেকে ফিরে নিজের খেলাটা দিয়েছে। এটুকুও কি মাথায় নেই যে ভিডিও অ্যাসিটেন্ট চালু আছে, ধরা পড়ার তৎক্ষণাৎ সম্ভাবনা আছে। তবে যা দিনকাল পড়েছে, এইভাবে খামোখা ভূপতিত হতে থাকলে সত্যিই একদিন সঙ্গত কারণে পড় গেলে রেফারি ঘুরেও তাকাবেন না, যেমন একটা সময় রবেন  এর সাথে হয়েছে, এখন সুয়ারেজের সসাথে হয়, সেরকমই…..পালে বাঘ পড়ার মতো। তবে কাকারা আট বছর আগে হেরে যাওয়ায় যেরকম দুঃখ হয়েছিলো,সেটা হচ্ছে না, কাকাকে ভালোবাসতাম, নেইমারের অভিনয় সেই ভালোবাসায় “অপরাধী” হয়ে দাঁড়িয়েছে….!

© শুভঙ্কর দত্ত || July 7, 2018

নিমকহারামের দেউড়ী

“ধীরে চলনা হ্যায় মুশকিল তো জলদি হি সহি…..”

সত্যিই এই ক’দিন যা চলেছি, তাতে এই লাইনটাই মনে পড়ছে! পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলী, পূর্ব-পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দক্ষিন – উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং — মোট এগারো খানা জেলার অক্সিজেন আরাম করে নিয়েছি বলা চলে! যাই হোক্ কোত্থেকে শুরু করবো এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটালো ঐতিহাসিক স্থানের প্রতি আমার আকুণ্ঠ পিপাসা! আপাতত “মুর্শিদাবাদ” দিয়ে অর্থাৎ যাত্রা শেষ দিয়ে শুরু হোক্ ব্লগে জল দেওয়া।

দার্জিলিং যাত্রা শেষ করে সমতলে নামছি। কথা ছিলো শুধু হাজারদুয়ারী দেখা হবে কিন্তু হাতে খানিকটা সময় আর ভ্রমণপিপাসু কিছু বাঙালি একজোট হলে যা হয়, তারপর আবার দর কষাকষির পর মোটামুটি একটা ইয়ে হতেই চলো ‘এ’ – এক্কাগাড়ি ঐ ছুটেছে……..

IMG_20180407_072435
এক্কাগাড়ি ঐ ছুটেছে

প্রথমেই গেলাম হাজারদুয়ারীর পাশের রাস্তা দিয়ে, আজিমুন্নেসা বেগমের জীবন্ত সমাধি।

PANO_20180407_092256
জীবন্ত কবর,

বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলি খান এর কন্যা ছিলেন আজিমুন্নেসা বেগম। জনশ্রুতি রয়েছ, কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় নবাবি হেকিম দৈনিক একটি মানবশিশুর কলিজা দিয়ে ওষুধ তৈরি করে দিতেন। অসুখ সেরে গেলেও তিনি মানবশিশুর কলিজায় নেশাগ্রস্ত হয়ে গোপনে নিয়মিত ভাবে শিশুদের কলিজা খেতে থাকেন। এই ঘটনা মুর্শিদকুলি খাঁ জানতে পেরে তাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নির্দেশ দেন। মুর্শিদাবাদ ঘুরতে গিয়ে টাঙ্গার (এক্কাগাড়ি বা টমটম) চালকের কাছে এমন কথা শুনে সত্যিই চমৎকৃত হয়েছিলাম। একতলা পাকা মঞ্চের উপর মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে আজিমুন্নেসার সমাধি, যে মসজিদটা তৈরী করিয়েছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ এর কন্যা স্বয়ং! মঞ্চের উপরিভাগে বাম পাশে একটা দেয়াল ছাড়া মসজিদের আর কোন চিহ্ন বর্তমানে নাই। কথিত আছে সাধারণ মানুষের পদধূলিতে তার শিশু হত্যার পাপ মোচনের জন্য মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে তাকে জীবন্ত সমাহিত করা হয়। 

তারপর একই রাস্তা ধরে দক্ষিণে শর্টকাট নিয়ে চলে গেলাম কাঠগোলা বাগানবাড়ি। তবে কাঠগোলা তে পরম প্রাপ্তি হলো ওখানকার ছান্দসিক গাইড দাদা, এতো সুন্দরভাবে বলে গেলেন খিদে তিষ্টা কোনদিকে উড়ে গেলো।

IMG_20180407_095602
কাঠগোলা মহল্লায়

লক্ষীপৎ, জগপৎ, মহীপৎ ও ধনপৎ । হাজারদুয়ারি থেকে ৪ কিমি উত্তরে চার ভাইয়ের এই কাঠগোলা বাগান। ১৭৮০ সালে কাঠগোলা বাগানের প্রতিষ্ঠতা করেন লক্ষীপৎ সিং দুগর। প্রায় ২৫০বিঘা জায়গা নিয়ে বিশাল বাগানের মধ্যে দোতালা অট্টালিকার সামনে বড় পুকুর খনন করা হয়। সেই পুকুরে থাকত নানা ধরনের রঙ্গীন মাছ। নবাব সৈয়দ হাসান আলী মির্জা কাঠগোলা বাগানের নাচ মহলে অংশ গ্রহণ করতেন। এখানে জৈন মন্দির ও প্রাসাদ ছাড়াও রয়েছে চিড়িয়াখানা, হেরেম ও শ্বেত পাথরে বাঁধানো পুকুর। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মহামূল্যবান আসবাব ও তৈজসপত্র।

কাঠগোলা নামটি আসলে কাঠগোলাপ এরই অপভ্রংশ বলা যায়। সেকালে প্রচুর কাঠের আসবাবপত্রের ব্যবসা ছিলো আর ছিলো গোলাপের বাগান। সেখান থেকেই এই নাম।

IMG_20180407_102644
হাত কাটা কার্তিক, শিল্পসত্ত্বা আর যাতে বিকশিত না হয়

 

IMG_20180407_102726
সিংহদুয়ার
IMG_20180407_094346
কাঠগোলা বাগানবাড়ির প্রবেশপথ

 

IMG_20180407_102738
সুড়ঙ্গপথ

 

IMG_20180407_094544
‘দুগর’দের কেউ

 

IMG_20180407_101913
আজও স্মৃতি
IMG_20180407_101925
রন্ধনশালা

 

IMG_20180407_101736
মাছেদের কবরস্থান

 

বহুদিন এ প্রাসাদ বন্ধ বা পরিত্যক্তই ছিলো বলা যায়। ১৮৭০ সালে এ প্রাসাদটি আবার পুনর্নির্মান করা হয়। লক্ষীপৎ সিং দুগরের বংশধর সঞ্জয় সিং ও সিদ্ধার্থ এখন এর দেখাশোনা করেন। কথিত আছে, কাঠগোলা বাগানের পূর্বদিকে যে প্রাচীন মসজিদ ও কবরস্থান আছে সেখানকার এক ইঁদারার কাছ থেকে দুগড় পরিবার প্রচুর গুপ্তধন পেয়েছিলেন। প্রাপ্ত সব টাকায় তারা বাগান সাজাতে ও মন্দির নির্মাণ করতে খরচ করেছিলেন।

IMG_20180407_101723
এখন ফাঁকা মহল

সেকালে কাঠগোলা বাগানে জলসা হতো এবং অনেক লোকের সমাগম হতো। বর্তমানে কাঠগোলা বাগান একটি দর্শনীয় স্থান। অট্টালিকা, সংগ্রহশালা, গোপন সুরঙ্গপথ, আদিনাথ মন্দির, বাঁধানো পুকুর সব কিছু নিয়ে মুর্শিদাবাদের এই দর্শনীয় স্থানটি অতুলনীয়।

এরপর জগৎ শেঠ এর বাড়ি
জগৎ শেঠ  বাংলার অত্যন্ত ধনী ব্যাংকার ফতেহ চাঁদকে আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ‘জগৎ শেঠ’ বা বিশ্বের ব্যাংকার উপাধি প্রদান করা হয়। জগৎ শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানিক চাঁদ। তিনি আঠারো শতকের প্রথম দিকে পাটনা থেকে ঢাকা আসেন এবং এখানে একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলী খানতার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে, মানিক চাঁদ তার সাথে নতুন রাজধানীতে চলে যান। মুর্শিদাবাদে তিনি ছিলেন নওয়াবের খুবই প্রিয়ভাজন এবং পরে নওয়াবের ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ লাভ করেন। দিল্লির সিংহাসনে আরোহণের পর পরই সম্রাট ফররুখ সিয়ার ‘নগর শেঠ’ (নগরের ব্যাংকার) উপাধি প্রদান করে মানিক চাঁদকে সম্মানিত করেন। ১৭১৪ সালে মানিক চাঁদের মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র (দত্তক পুত্র) ও উত্তরাধিকারী ফতেহ চাঁদের নেতৃত্বে পরিবারটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করে। পরে সম্রাট মাহমুদ শাহ ফতেহ চাঁদকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি প্রদান করলে এ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি দেশে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের একটি স্থাপনা ও জায়গা। জগৎ শেঠের বাড়ি মুর্শিদাবাদ শহরতলীর অদূরে নশিপুর এলাকাতে আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে তা হলো নবাবী আমলের ধর্নাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি জগৎ শেঠের বাড়িটি। সেখানে জগৎ শেঠদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস ও আসবাবপত্র রয়েছে। বাড়ির ঠিক পিছনে রয়েছে ভূগর্ভস্থ গুপ্ত সুরঙ্গ, মাটির তলায় গুপ্ত ঘর। রয়েছে জগৎশেঠের টাকশালে তৈরি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, স্বর্ণ ও রৌপ্য শাড়ি, খাজঞ্চি খানা, ঢাকাই মসলিন ও তৎকালিন ব্যবহার্য্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শণ সমূহ। বাড়ির আঙিনায় রয়েছে বিশাল একটি মন্দির।

জগৎ শেঠের বাড়ির বিভিন্ন অংশ

 

এরপর রাস্তায় আসতে আসতে চোখে পড়লো নসিপুর রাজবাড়ী যার অনুকরণে হাজারদুয়ারী তৈরী হয়েছে।

IMG_20180407_110417
নসিপুর রাজবাড়ি 

নসিপুর রাজবাটী তে কেন তার ঘোড়াকে থামতে বললো না চালক, তা বুঝলাম না। অদূরেই রঘুনাথজীউ মন্দির/আশ্রম ছিলো বলেই হয়তো!
ফরাগঞ্জের দেবোত্তর ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি মুর্শিদাবাদের একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এটি মুর্শিদাবাদ পৌরসভা কর্তৃক ঘোষিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য। আনুমানিক ২৫০ বছর আগে এই স্থাপনাটি নির্মিত হয়। বাংলা ১১৬৮ সালে মহন্ত লছমন দাস ঢাকার উর্দু বাজার থেকে এসে মীর জাফরের আদি বাড়ি সংলগ্ন স্থানে এই জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেন। তবে রঘুনাথ মন্দিরটি বেশ চমকপ্রদ, উপরের দিকে আঁকা আছে একদিকে সিংহ আর একদিকে ঘোড়া, মাঝে ঢালের মতো….নীচে লেখা পলাশীর যুদ্ধ। বিস্তৃত এই জায়গায় আছে প্রাচীন কাষ্ঠ শিল্পে খোদিত এবং রাজস্থানের তুষারশুভ্র মর্মরে শতাধিক বছরের প্রাচীন প্রাসাদ। বয়সের ভারে প্রাসাদটি আজ জরাজীর্ণ অবস্থা। এটি বন্ধই থাকে। পাশের ভবনে আছে ঐতিহ্যবাহী সোনার রথ, বেলোয়ারী ঝাড়, ঐতিহ্যময় আসবাবপত্র, প্রাচীন যুগের বেবি অস্টিন মোটর যান, পুরনো রান্না সরঞ্জাম ইত্যাদি। কথিত আছে, প্রাচীন যুগের এই বেবি অস্টিন গাড়িটি আশি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল, যা আজ ছোট একটি গ্যারেজে রাখা আছে। পাশেই আছে সোনার রথ। দর্শনার্থীদের জন্য দিনের সব সময়ই এটি খোলা থাকে।

IMG_20180407_111551
বহু কম টাকার রথ, তবে সোনার

রঘুনাথ মন্দিরের বিভিন্ন দর্শনীয় বিষয়সমূহ

IMG_20180409_101209
৮০ টাকার অস্টিন, Surajit Maiti র থেকে পেলাম ছবিখানা

বেশ কয়েকটা জায়গা তাড়াহুড়োর সাথে দেখতে দেখতে যখন ক্লান্ত তখন এক্কাগাড়ির চালক হাজারদুয়ারী নিয়ে বলতে শুরু করেছেন, আমরাও গল্প করে যাচ্ছি, ভদ্রলোক রেগে গেলেন। আমরা আবার মনোনিবেশ করলাম। বস্তুত বলে রাখি, অনেকেই হয়তো জানে হাজারদুয়ারী সিরাজের তৈরী, এটা ভাবা বেশ বড়ো ভুল। তৈরী তো নয়ই, বরং উনি কখনো এই অপূর্ব স্থাপত্যটিকে দেখে যেতে পারেন নি জীবনকালে। চালক ই তো জীবন্ত জিপিএস এর মতোই….বলে চলেছেন–

IMG_20180407_120609-01
ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারী

 

১৮৩৭ সালে নবাব নাজিম হুমায়ুন খাঁয়ের জন্য ৮০ ফুট উঁচু তিনতলা গম্বুজওয়ালা এই প্রাসাদ অর্থাৎ হাজারদুয়ারূ নির্মিত হয়। আদপে ৯০০টি দরজা হলেও আরও ১০০টি কৃত্রিম দরজা রয়েছে প্রাসাদে। তাই নাম হাজারদুয়ারি। প্রাচীন মুর্শিদাবাদের স্মৃতি নিয়ে অপরূপ গথিকশৈলীর এই প্রাসাদ এখন মিউজিয়াম। আক্ষরিক অর্থেই এ এক ঐতিহাসিক জাদুঘর। নীচের তলায় রয়েছে তৎকালীন নবাবদের ব্যবহৃত প্রায় ২৭০০টি অস্ত্রশস্ত্র। যার মধ্যে আলিবর্দি ও সিরাজের তরবারি এমনকী যে ছুরিকা দিয়ে মহম্মদি বেগ সিরাজকে খুন করেছিল তা পর্যন্ত রক্ষিত আছে এই সংগ্রহশালায়। এই সুরম্য বিশাল রাজপ্রাসাদের দ্বিতলে দেখা যায় রুপোর সিংহাসন যেটি ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী মহারানি ভিক্টোরিয়ার দেওয়া উপহার। ১৬১টি ঝাড়যুক্ত বিশাল ঝাড়বাতির নীচে সিংহাসনে বসে নবাব দরবার পরিচালনা করতেন। মন্ত্রণাকক্ষের লুকোচুরি আয়না, দেশ-বিদেশ থেকে সংগৃহীত বিশ্ববিখ্যাত সব ঘড়ি, মার্শাল, টিশিয়ান, রাফায়েল, ভ্যান ডাইক প্রমুখ ইউরোপীয় শিল্পীর অয়েল পেন্টিং, প্রাচীন সব পাথরের মূর্তি হাজারদুয়ারিকে বিখ্যাত করে তুলেছে। ত্রিতলে আছে নবাবী আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন সোনা দিয়ে মোড়া কোরাণ শরিফ, অমূল্য পুঁথিপত্র, আইন-ই-আকবরির পান্ডুলিপি সহ অসংখ্য বইয়ের সম্ভার। ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসেরও কিছু বিশিষ্ট নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এই মিউজিয়ামে। হাজারদুয়ারির চত্বরে রয়েছে ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে জনার্দন কর্মকারের তৈরি ১৮ ফুট লম্বা, আট টন ওজনের ‘জাহানকোষা’ কামান বা বিশ্বজয়ী কামান। এই কামানে একবার তোপ দাগতে ৩০ কেজি বারুদ লাগত বলে জানা যায়। এটি বাচ্চেওয়ালি কামান নামেও পরিচিত।

IMG_20180407_120703
ঘন্টা
IMG_20180407_120649
১৯৭০ বা ৭১ এ লাস্ট চলেছিলো
IMG_20180407_072514
হাজারদুয়ারীর মেন গেট
IMG_20180407_114629
হাজারদুয়ারী
IMG_20180407_125307
ইমামবারা

 

IMG_20180407_130031
এক গোলার শব্দে অনেক প্রসূতির বাচ্চা নষ্ট হয়, তাই এর নাম বাচ্চেবোলি কামান

 

তবে সবকিছু দেখার পরেও গুগল ম্যাপে একটি বার চোখ রাখলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। এক পাগল হকার আমাদের বলছিলো – ‘এটা মীরজাফর এর এলাকা, গদ্দারী কে করবে না?’ লোকটা বলছিলো – ‘এই শালারা সেখানেই ঘুরতে নিয়ে যাবে যেখানে ঢুকতে টাকা লাগবে, তোমরা চলো, আমি ঘোরাবো গোটা মুর্শিদাবাদ, টাকা লাগবে না!’ বলতে বলতে দেখলাম একজন তেড়ে এলো! এ ঘটনা ঘোরাঘুরির অব্যবহিত পূর্বেই। যদিও তার আগেই সকাল সকাল বাস থামতেই ভাগীরথী নদী, ফেরী ঘাট আর ওয়াসিফ আলি মির্জার বাড়িটা দেখে নিলাম।

ওয়াসিফ ভবনের বিশেষ বিশেষ অংশ

 

ও বলা হয়নি, ভগ্নপ্রায় মীরজাফরের বাড়িটা পড়লো কাঠগোলা আসতে আসতে….. কিন্তু স্রেফ একটা দেওয়াল, এক্কাগাড়ির ঘোড়াটাও দাঁড়ালো না, হয়তো ওরও খেয়াল আছে….ওটা “নিমকহারামের দেউড়ী”…

IMG_20180407_070021_HDR
এবার ফেরার পালা

 

তথ্যসূত্র : এক্কাগাড়ির চালককাকু এবং অবশ্যই ঈশ্বররূপী গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর  // April 9, 2018