শুভ জন্মদিন – কামু মুখোপাধ্যায়….

সত্যজিৎ রায়। হ্যাঁ, ছোটোবেলা থেকে এই একটা পরিচালকের নাম আমাদের সবার চেনা। কত বড়ো মাপের পরিচালক ছিলেন। ধরুন, তারই বাড়িতে একদিন হুট করে চলে গেলেন আনকোরা কোনো অভিনেতা যিনি হয়তো আগে একটি সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন। হ্যাঁ, ঠিক এমনটাই করেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। ওনার যে সাহসের ওপর ভর করে সত্যজিৎ রায়ও স্বস্তির ঘুম দিতেন, মানুষটি এরকমই ছিলেন। হঠাৎ করেই একদিন ‘মাণিকদা’র বৈঠকখানায় গিয়ে বলে বসলেন —‘আমি আপনার ছবিতে অভিনয় করতে চাই’। আক্কেলটা ভাবুন খালি। সত্যজিৎ রায় ফিরিয়ে দেননি। “চারুলতা” তে ছোট্ট একটা চরিত্রে সুযোগ দিয়েছিলেন। অতিথি শিল্পীই বলা যায়। অবশ্য তার আগে কামু মুখোপাধ্যায় জীবনের প্রথম অভিনয় করে ফেলেছেন “সোনার হরিণ” চলচ্চিত্রে….. উত্তম কুমার, তরুণ কুমার, ছবি বিশ্বাস, সুপ্রিয়া দেবী, কালী ব্যানার্জি, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কে ছিলো না সেই ছবিতে? তবুও নজর কেড়েছিলেন – ‘আবদাল্লা’!

Kamu's debut

অবশ্য ‘চারুলতা’য় কম স্ক্রিন প্রেজেন্সের জন্য দুঃখ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে, উনি বুঝিয়েছিলেনও যে – কম সময়ে মুন্সিয়ানা দেখানোয় আসল কথা। তারপর “নায়ক” মুক্তি পেলো, ভালোই সময় পেলেন কামু, প্রীতিশ সরকার এর স্পেকট্রাম কোম্পানির কথা মনে নেই? তবে সময় অল্প হোক বা বেশি কামু মুখোপাধ্যায় মানেই দারুন স্ক্রিন প্রেজেন্স… মনে আছে ‘হীরক রাজার দেশে’ র সেই পরোয়ানা দেখতে চাওয়া রক্ষীকে? যার উদ্দেশ্যে গুপিবাঘা গাইবে – “ধরো নাকো…. সান্ত্রী মশাই….!” ঐ ছোট্ট একটা রোল, তাতেই কামাল। মগললাল মেঘরাজের ডেরার ‘অর্জুন’কে ভোলার কথা নয় কারো…. কেরামতি দেখে ‘তনখা’ বাড়িয়ে দেয় মগনলাল, সেই ছুরি ছুঁড়ে সার্কাস দেখানো লোকটার ভূমিকাতেও…..,ঐ টুকু সময়েও কি এক্সপ্রেশন! শেষেরটা ছোঁড়ার পরে কোমর ধরে বসে পড়লেন, গোটা শরীরে পদকের ঝনঝন আওয়াজ। শোনা যায় “সোনার কেল্লা” তে একটা দৃশ্য বাদ দেওয়া হয়েছিলো। ‘মন্দার বোস’এর দুঃসাহসিক অভিযানের স্বাক্ষর ছিলো সেটা, খালি বোতলে বিছে ধরার দৃশ্য, সম্পাদকের কাঁচিতে যেটা জায়গা পেয়েছিলো, তাই দুঃখ করেছিলেন তিনি তার প্রিয় মাণিকদার কাছে। আসলে ঐ দৃশ্য একদম সত্যিই ছিলো। এমনই খল – ছল চরিত্রে তাঁর আদবকায়দা শিক্ষনীয় বিষয়।

Kamu as Guard

Kamu as Arjun

264-kamu-mukherjee-sonar-kella-01

Kamu ft Nayak

অভিনীত চরিত্রগুলি যেমন বিচিত্র ছিলো তেমনই ছিলো তার অভিব্যক্তি। এমনি কি আর “ফটিকাচাঁদ” এ হারুন-অল-রশিদ বা ‘হারুন’ ভরসা হয়ে ওঠে ফটিকের…. জাগলার হারুনই বোধহয় কামু মুখোপাধ্যায়কে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছিলেন নিজেকে মেলে ধরার, তাই তো এ চরিত্র বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রিয় সিনেমাপ্রেমীদের। ‘শাখা প্রশাখা’ তে মজুমদার বাড়ির লোকদের দেখা শোনার ভার তার ওপরেই, কতটুকু সময় আর? “সোনার কেল্লা”, “নায়ক” বা “ফটিকচাঁদ” এ কামুকে যতটুকু সুযোগ দিতে পেরেছেন সত্যজিৎ – সন্দীপ রায় মিলে…. ততটাও অন্যান্য পরিচালকরা তাদের সিনেমায় ব্যবহার করতে পারেননি। তবে যত স্বল্প সময়েরই রোল হতো কামু পর্দায় আসলেই একটা আলাদা ভালো লাগা ছিলো। কি তার চাহনি, কি তার সংলাপ ছু্ঁড়ে দেওয়া – সবেতেই যেন সব সময় একটা চ্যালেঞ্জের ছাপ। সত্যজিৎ রায় মারা যাবার পর তাঁর মরদেহের পাশে বসে অঝোর নয়নে কেঁদেছিলেন কামু, সর্বজনবিদিত সে কথা। কাঁদবেন নাই বা কেন — মাণিকদার মতো তাকে কেউ সাহায্য করেননি যে! বলে না ‘জহুরি তে জহর চেনে’, একদম সে রকমই ব্যাপার। কামুর সাহস আর অকুতোভয়ের ওপর ভরসা করে সত্যজিৎ রায় তাকে ইচ্ছেমতো রোল দিতে পারতেন, ছোট্ট একটা চরিত্রে কম সময় হলেও তাকে দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করতেন৷ “গুগাবাবা ট্রিলজি” র সব সিনেমাতেই তিনি আছেন কিন্তু চিনতে গেলেই হার মেনে যাবো আমরা। যেমন “গুপি বাঘা ফিরে এলো” তে ‘হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার’ বলে দৌড়ে যাচ্ছে গুপি আর বাঘা, পালকির ভেতরে এক রাজা আঙুর খেতে খেতে স্তব্ধ। মনে আছে নিশ্চয়? ভেবে দেখেছেন কি ঐ ছোট্ট একটা দৃশ্য, তাও কতটা স্মরণীয়, সৌজন্যে – অবশ্যই কামু মুখোপাধ্যায় ! “শতরঞ্জ কি খিলাড়ি” তেও আছেন। অন্যান্য পরিচালকরা তেমন উড়তে দেননি তাকে, সে “হংসরাজ” ছবিতে ‘দালাল’ হোক্ বা গৌতম ঘোষের “পার” ছবিতে পাটকলে কাজ দেওয়া ‘সর্দার’ এর চরিত্র – সবকটায় ছোটো, তবে ফ্রেমে এলেই আলাদা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন।

Kamu in HansarajKamu as kingKamu as SardarKamu in Sakha Prasakha

Kamu as Harun
ফটিকের হারুন…

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একটা সুযোগ দিয়েছিলেন, তার ”ফেরা” চলচ্চিত্রে, নাট্যদলের মালিকের ভূমিকায়। জমিয়ে দিয়েছিলেন, “মৌচাক” সিনেমাতেও, ঐ দেড় মিনিট – সুপারভাইজারের মাথা ম্যাসেজ করতে দেখবেন। বাংলা সিনেমাতে চরিত্রাভিনেতাদের রমরমা চিরকালই, নায়কদের ছাপিয়ে তারা জায়গা করে নেন। কিন্তু এই কামু ব্রাত্যই থেকে গেলে, স্বল্প সময়ে ওরকম স্ক্রিন প্রেজেন্স দিয়েও অন্যান্য বাঘা বাঘা পরিচালকরা তাকে সুযোগ তেমন দিতে আর পেরেছিলেন কোথায়? সে কথা টের পেয়েওছিলেন তিনি, নিজে মজা করে বলতেনও সে কথা – “মন্দার বোসের বাজার মন্দা”! সত্যজিৎ রায় খুব ভালোবাসতেন তার ‘মন্দার বোস’ কে। উনি মারা যাবার পর সেভাবে কামু মুখোপাধ্যায় সুযোগ পেলেন না, সন্দীপ রায়ও মনে রাখেননি। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তখনই হারিয়ে ফেললো প্রতিভাবান, অসমসাহসী এই অভিনেতাটিকে, যিনি বারবার দুঃখবোধ করেছেন স্বচ্ছন্দে জায়গা না পাওয়ার জন্য…. অথচ দেখুন কোনো নায়কের অভিনয়ে তাঁর অভিনীত চরিত্র ঢেকে যায়নি, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেই নামও কেউ কেউ এখনও মনে রেখেছেন, এটা হয়? এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। আজ তাঁরই জন্মদিন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের স্বর্ণযুগের প্রতিভাবান এবং প্রভাবশালী অতিথি শিল্পীকে তাই প্রণাম জানাই।

Kamu @ mouchak

সূত্র:: একাধিক ম্যাগাজিন এবং আমার দেখা সিনেমা

© শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর || June 14, 2020

গরমের ছুটিতে দুর্গেশগড়…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ দেখেছিলাম, মণিকান্তপুরের সেই রহস্য উদঘাটন পর্বে পরিচয় হয়েছিলো সোনাদা, ঝিনুক আর আবীরের সাথে। আসলে এই তিনজনকে পর্দায় দেখে অ্যাডভেঞ্চার পিপাসুদের মতো আমারও চলে যেতে ইচ্ছে করে, বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। তাই যখন জানলাম এবার দুর্গেশগড়ে আবার এক অন্য গুপ্তধনের সন্ধানে তিনমূর্তির অভিযান, যার ষাট শতাংশ শ্যুটিং আমার প্রিয় ঝাড়গ্রামে তখন আর অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিলো না।

আগের বার ছিলো শাহ সুজার গুপ্তধন আর এবার দুর্গাবতি দেবরয় এর গুপ্তধন, যা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের থেকে তিনি পেয়েছিলেন।

  • হিস্ট্রি – নট অলওয়েজ বোরিং….

সিনেমা জুড়ে ইতিহাসের গল্প…. বইয়ের পাতায় পড়তে হলে ভীষণই বোরিং লাগে যে কাহিনী, এখানে সুবর্ণ সেন এর গল্পের ছলে বিষয়টির ভাবগম্ভীর ব্যাপারটিকে লুফে নেওয়ার মতোই সহজ করেছে৷

  • সাবলীল অভিনয়

‘ঝিনুক’ এর চরিত্রে ঈশা সাহা কে আমার বেশ লাগে, নামটার সাথে চরিত্রটা খুব মানায়। প্রথমবার গুপ্তধন উদ্ধার পর্যায়ের পর এবাারেও দারুণ লেগেছে….! সবচেয়ে ভালো লাগে অর্জুনকে, আবীরের চরিত্রে…. সেই বেশ একটা খাদ্যরসিক এবং হিউমারাস চরিত্র যা বাঙলির খুব কাছের লোক৷ সোনাদা কে নিয়ে বলার কিছু নেই।

  • ক্যামিও….

ক্যামিও হিসেবে খরাজের উপস্থিতিটা একটুও বোরিং হতে দেয় না, ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারে হার্দিক পাণ্ডিয়ার মতো ব্যাপারটা….. শেষপাতে চাটনীর মতো, পুরো চেটেপুটে খেলাম, একটা শব্দ বারবার বলছিলো, সেটা আর মনে নেই…

মে মাসে দুর্গাপুজো, কাশবনের পাশ দিয়ে মায়ের আগমণ, বনেদি বাড়ির পুজো — দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গুপ্তধনের সন্ধান গল্পটিকে বড্ড বাঙালিদের করে তোলে, তার সাথে যোগ হওয়া পুজোবাড়ির খাওয়াদাওয়া — সব মিলিয়ে বাঙালিয়ানার অনবদ্য নিদর্শন এই সিনেমা।

  • হারানো সুর আর কথা….

গানের কথার ছলে গুপ্তধনের এ টু জেড জানতে পারা – এদিক থেকে গীতিকার আর সঙ্গীত পরিচালকের প্রতি অতিরিক্ত সম্ভ্রম জাগে…. সেই পুরনো ফ্লেভারটা পুরোমাত্রায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই সুরটা লেগে থাকার মতোই….. সিনেমার গল্পের সাথে, সময়ের সাথে অদ্ভুৎ ভাবে খাপ খেয়ে যায়…!

  • যা কিছু চাইছি.. মোচড়

গল্পের বুনোটে সময় লেগেছে…. সেটা হওয়াটা স্বাভাবিক….. ইতিহাসটাকে বেশ ভালো ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে টুকরো টুকরোভাবে যাতে দর্শকের মাথায় সেঁটে যায় চেয়ার ছাড়ার পরেও….! শেষকালে ঐ রকম একটা মোড় ঘোরানো— আশা করছিলাম, তবে ভাবনারও অতীত ছিলো, আর পরিচালক ধ্রুব ব্যানার্জী পুরো পয়েন্ট নিয়ে চলে গেলেন এখান থেকেই…..!

  • ক্যামেরা…আলো.. ইত্যাদি

সৌমিক হালদার নিজের খ্যাতির মর্যাদা রেখেছেন। এই সিনেমার সাপেক্ষে যেটা খুব মধ্যমানের হলেও চোখে লাগতো, সেরকম একবারও লাগেনি, জমাটিই লেগেছে।
কাজটাকে সহজ করেছে আলোর অনবদ্য ভালো ব্যবহার…. এইরকমভাবে আলোর ব্যবহার কটা সিনেমায় হয়, সন্দেহ আছে, অবশ্য সুযোগও থাকে না

  • বোনাস পয়েন্ট…..

কৌশিক সেন…. ফোকাস টেনেছেন গল্পের খাতিরে, সে জন্য অবশ্য পরিচালকের ধন্যবাদ প্রাপ্য…
আরো আছেন – লিলি চক্রবর্তী, পিসির চরিত্রে ওনার উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরো বেশি করে বোধ হয় আট থেকে আশির জন্য মাস্ট ওয়াচ করে দেবে…..

  • আত্মিক টান

রহস্য, সাসপেন্স আর অ্যাডভেঞ্চার এর সাথে বাঙালির আত্মিক টান, তার সাথে যদি যোগ হয়ে যায় ইতিহাস, তাহলে আর কথায় নেই….! যাকে বলে টরে টক্কা! অযাচিতভাবেই গুপ্তধনের সন্ধানে এসে সোনাদা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে আরও যে বিষয়টি উদঘাটন করলেন, তার জন্য এক্সট্রা একটা নম্বর দেওয়ায় যায় পরিচালককে

  • গরমের ছুটি – লুটি

গরমের ছুটিতে দুর্গাপুজো, সৃজিৎ মুখার্জি ‘উমা’ র হাত ধরে এরকমটা করেছিলেন, সেটা শহরে যদিও আর ধ্রুব ব্যানার্জি করলেন গরমকালে, গ্রীষ্মবকাশে…. অতএব লুটি!

  • পারিবারিক ফিল্মও….

পারিবারিক সিনেমাও বটে৷ একদম শেষে সে কথা আরো বেশি করে জোরালো হলো…..! পিসিমা- সোনাদা- অপুদা (খরাজ) এর কথোপকথনে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক একাত্মতার বিষয়টি বেশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

  • যথাযোগ্য উত্তরাধিকার…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ এর যোগ্য সিক্যুয়েল বলেই মনে করি….. একবারের জন্যেও অগ্রজপ্রতিম সিনেমাটিকে অসম্মান করা হয়নি…. বরং শেষ কয়েক মিনিটের থ্রিল আর গুপ্তধন খোঁজার পন্থাস্বরূপ গান — এই দুটির জন্য অবিসংবাদীভাবে ‘দুর্গেশগড়’ এগিয়ে থাকবে।

  • এবং ঝাড়গ্রাম…

ঝাড়গ্রামকে যারা খুব ভালেবাসি, তাদের জন্য এই সিনেমা দেখা অত্যন্ত জরুরি। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি থেকে শুরু করে চেনা চিল্কিগড় সহ বিভিন্ন অচেনা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই সিনেমার ফ্রেমগুলো। বিশেষ করে রাজবাড়ি….! কি সুন্দরভাবে অন্দরমহলটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরো কিছু জায়গার ছবি ফুটে ওঠে কিন্তু নাম জানি না আমি….! অরণ্যসু্ন্দরী ঝাড়গ্রাম কে ভালো চিত্রায়িত করেছেন ক্যামেরাম্যান৷

সুতরাং এই গরমের ছুটিতে বাড়ির সকলকে নিয়ে ‘দুর্গেশগড়’ ঘুরে আসা যেতেই পারে…. যেখানে  সোনাদা – ঝিলিক – আবীরের দেখা মিলবেই৷

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 29, 2019

‘কণ্ঠ’ – এভাবেও ফিরে পাওয়া যায়

যখন উচ্চমাধ্যমিক পড়তাম, একটা গল্প ছিলো – স্টিফেন লেককের…. “Further Progress In Specialisation.” বাংলা সিনেমায় বিগত দশ বারো বছর ধরে এরকম বিশেষ বিশেষ বিষয় নিয়ে সিনেমা উপহার দিয়েছেন কৌশিক গাঙ্গুলি – নাম বলছি না, যে যার মতো করে মনে করে নিলেই ভালো। আর কেউ বানাননি বলবো না, কিন্তু এরকম ধারাবাহিকভাবে বানাননি কেউই। সেই তালিকায় এবার নবতম সংযোজন শিবপ্রসাদ-নন্দিতার “কণ্ঠ”….

কলকাতার এক রেডিও জকি আর জে অর্জুন (শিবপ্রসাদ) স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার ‘কণ্ঠ’ হারাবেন….. একজন লেখকের কাছে কলমটা যতটা প্রয়োজনীয়, হাতটা যতটা প্রয়োজনীয়, তার চেয়েও একজন রেডিও জকির কাছে তার কণ্ঠটা বেশি করে প্রয়োজন…বস্তুত একজন রেডিও জকির থেকে তার ‘কণ্ঠ’ কেড়ে নেওয়া মানে একটা মরা মানুষেই পরিণত হওয়া, সে কথা তো সিনেমা দেখতে দেখতেই পরিচালক জানিয়ে দিলেন।

কিন্তু সত্যিই ‘কণ্ঠ’ হারিয়ে গেলেই কি সব শেষ? রেডিও জকি তার শো এ জানাচ্ছেন – ” ইচ্ছেশক্তি যখন আছে, তখন তাকে হার মানাবে কে! কণ্ঠ যখন বলতে চায়,,তাকে আটকাবে কে!”

অর্জুন এবং পৃথা (পাওলি দাম) – দুজনেই বাচিক শিল্পী, সম্পর্কের শুরু – গভীরতা – বাঁধন সবটাতেই কণ্ঠের অবদান যে সবচেয়ে বেশি সে কথাও বারবার ফিরে এসেছে গল্পে। কিন্তু কণ্ঠ হারিয়ে যাওয়ায় ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে থাকা একটা মানুষের কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার তাগিদে সহায় হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। এ গল্পে অভিনেতাদের সাথে তাই আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতিকেও কুর্নিশ জানাতে হয়। Laryngectomy র স্পেশালিষ্ট রোমিলা চৌধুরীর চরিত্রে জয়া এহসান এর এই অভিনয় সিনেমাটাকে আরো বেশি প্রাণবন্ত করেছে বলে মনে করি।
Laryngectomy – এই শব্দটা খুব একটা পরিচিত নয়, যতই আমরা ক্যান্সার নামে মারণ রোগের কথা বলি না কেন!! কি সুন্দরভাবে এই শব্দটার মানে বুঝিয়ে দেওয়া হয় গল্পতে…. একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝতে পারবে, এই জায়গাটা দারুণ লেগেছে।

মাঝে মাঝেই সাসপেন্স এর একটা ঝটকা বয়ে চলবে। ভূত নিয়ে সাম্প্রতিক কালে বাংলা সিনেমা বহুল-চর্চিত, সেলুলয়েড এ শিবু আবার নিয়ে এলেন অতিপরিচিত “ভূতের রাজা” কে, ….. সিনেম্যাটিক উপস্থাপনা যাকে বলে…!

পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা ছোট্ট ক্যামিওকে ব্যবহার করা হলো সুনিপুণভাবে….!!
যারা সিনেমা দেখতে বসে চিকিৎসার ধরন দেখে ইন্সট্যান্ট খিল্লি করতে যাবেন তারা একটু জেনে বুঝে করবেন, আসা রাখি— সিনেমার চিত্রনাট্যের খাতিরে এরকমটা করা হয়নি বলেই অন্তত আমার তা মনে হয়।

শিবপ্রসাদ এর পরিচালনা নিয়ে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন ওঠে…..! কিন্তু অভিনয়! সেটা আমি সেই “অ্যাক্সিডেন্ট” সিনেমা থেকে দেখে আসছি, কি অসামান্য অভিনয় দিয়ে যাচ্ছেন এবং খুব সাইলেন্টলি। এই সিনেমার অ আ ক খ সবটা জুড়েই তিনি….! তবুও বর্ণপরিচয় পূর্ণ হতো না যদি না জয়া এহসানের ওরকম একটা অসামান্য উপস্থিতি পেতাম..! পাওলি দাম নিজের জায়গায় দারুণ, নতুন করে বলার কিছু নেই। সিনেম্যাটোগ্রাফি নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়, বেশি কিছু নয়, সাহানা বাজপেয়ীর “সবাই চুপ” গানটাতে ক্যামেরার ব্যবহার দেখে সার্চ করতে বসি কে সেই ক্যামেরাম্যান! শুভঙ্কর ভড়– এই সেই ভদ্রলোক যার অনবদ্য কাজ “বাকিটা ব্যক্তিগত” কে অন্য মাত্রা দেয়।
এই সিনেমার বাড়তি পাওনা অবশ্যই — সিনেমার গানগুলো…. শুরুতেই তার ইঙ্গিত দিয়ে দেবেন স্বয়ং প্রসেন —- “অবাক জলে……… তুমি সেই গান বানানোর কারণ হলে….!”

তবে সবচেয়ে যেটা অসামান্য এবং প্রশংসনীয় লেগেছে সেটা হলো — ‘জুজু’ নামকরণ…! না দেখলে এই ভালো লাগার কারণ অবশ্য বোঝা যাবেই না। শেষ কালে নজরুলের ‘বিদ্রাহী’ কবিতা দিয়ে…… Laryngectomy ক্লাবের সকলে মিলে উপস্থাপন।

এই সিনেমা তাই আশার আলো….! রোগী – পেশেন্ট যে কতটা বন্ধু হওয়া দরকার তাও বলে, শুধু তাই নয়, সবকিছুকে ছাপিয়ে একটা ভালো বন্ধুত্বের গল্পও বলে, ‘কণ্ঠ’ হাতিয়ার করে বিখ্যাত নয়, বরং কাছের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প বলে। বাচিক শিল্পীদের শুধু নয় একই রোগে আক্রান্ত হয়ে কণ্ঠহৃত বহু মানুষের কাছে হয়ে উঠতে পারে এক মৃত-সঞ্জীবনী….! কিভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আর মানবতার মেলবন্ধনে একজন স্বরযন্ত্র হারানো মানুষ কিভাবে ফিরে পাবে তার ‘কণ্ঠ’ জানতে হলে অবশ্যই দেখতে হবে….! বাংলা সিনেমায় প্রতিযোগীতা কি পরিমাণ ফিরে এসেছে, তা বাতলে দেবে “কণ্ঠ”! সিনেমা দেখতে দেখতে আর জে চরিত্রে শিবুর কোনো ভালো পরিবর্ত খুঁজছিলাম, পেলাম না!! কুর্নিশ!! অভিনয়- জাস্টিফায়েড..!

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 18, 2019

প্রেমের উপহার : গল্প হলেও সত্যি…

সিনেমার শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফিরবেন। মাঝে বোনের বাড়িতে দেখা করে যাবেন পরিচালক মশাই..!
গল্পটা সুদূর আমেরিকার৷ নিউইয়র্ক থেকে ফিলাডেলফিয়া তে যাচ্ছিলেন, ট্রেনের সেই যাত্রাপথের একবার থেমে যাওয়া যে তার জীবনে এতো কিছু দিয়ে যাবে, সেকথা বোধ হয় ভাবেননি তিনি। আর ভাববেনই বা কি করে, অদূর ভবিষ্যৎ দেখা যায় নাকি??? সবাই কি আর “প্রিডেস্টিনেশন” এর অধিকারী হতে পারেন নাকি? সবার মগজে টাইম মেশিন এর ফর্মুলা ইনপুট করা আছে….!

পরিচালকের নাম – রিচার্ড লিঙ্কল্যাটার, তখনও ফিল্মজগতে চুনোপুঁটি হিসেবেই পরিচিত। সালটা ১৯৮৯, সবে “Slacker” সিনেমার শ্যুটিং শেষ করে ফিরছেন, ভাবলেন ফিলাডেলফিয়া তে একরাত কাটিয়ে নেবেন। একটা খেলনার দোকানে একটি মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয় তার। নাম – অ্যামি লেরহাউপ্ট, আমেরিকা থেকে ইউরোপ যাবে সে। বেশ কয়েক ঘন্টা হেঁটে হেঁটে গল্প করেন তারা, সিনেমা-রাজনীতি-মিডিয়া সব কিছু উঠে আসে সেই সব কথোপকথনে। প্রেমে পড়ে যান দুজনে, রিচার্ডের হোটেলেই রাত কাটান দুজনে। যেটা স্মরণীয় হয়ে যায় দুজনের কাছেই। পরের দিন সকাল হতেই বিদায় জানাতে হয় একে অপরকে, ফোন নম্বরও এদিক-ওদিক হয় দুজনের মধ্যে। ঠিক হয় ছ’মাস অন্তর একবার করে এই একই স্টেশনে দেখা করবেন তারা, কিন্তু পরিচালক মশাই কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেলে সেসব আর হয় কি করে….! ফোনে কথা হয়েছিলো খুব কম বারই। তারপর কেটে গেছে অনেক গুলো বছর…..!!
রিচার্ডের কথা মতো “that long distance thing”…. স্বভাবতই সে প্রেম আর রইলো না।

ভাবলেন মেয়েটিও হয়তো ভুলে গেছে সে কথা, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের পেশাকে পন্থা হিসেবে বেছে নিলেন। সিনেমা বানাবেন সেই সাক্ষাৎ এর ওপর নির্ভর করে, যদি কোনদিন দেখে অ্যামি, তাহলে হয়তো বুঝতে পারবে যে সেই এক রাতের ভালোবাসা এখনও আছে অটুট, মনের গভীরে, অন্তরালে।
ইথান হক, জুলি ডেলপি কে নেওয়া হলো, স্ক্রিপ্টেও সাহায্য করলেন, জুলি ডেলপি এমনিতেই স্ক্রিপ্ট রাইটার, চিত্রনাট্যতে অবদান রাখলেন কিম ক্রিজান, বিখ্যাত আমেরিকান মহিলা …!

সিনেমার শ্যুটিং হলো পুরো ভিয়েনাকেই কেন বেছে নিলেন? তার মনে হয়েছিলো সিনেমাটির জন্য খুব ন্যাচেরাল এটা- এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেটা জানিয়েছিলেন। ১৯৯৫ এ রিলিজ করলো ” Before Sunrise”…. একদম “from midnight until six in the morning” এর কথা মাথায় রেখেই এমন নাম।
ছবি খুব একটা যে রোজগার করতে পারলো এমন নয়, কিন্তু যত দিন যেতে থাকলো, মানুষের মনে ভালো লাগা জন্মালো এই সিনেমা নিয়ে। রিচার্ড ততদিনে জীবনসঙ্গী পেয়ে গেছেন৷

Before Sunrise
মনোহারি কথোপকথন….@ Before Sunrise

এই সিনেমা টা এখনও বেশ কিছু ওয়েবসাইট, সিনেমাপ্রেমীরা সেরা প্রেমের সিনেমার তালিকায় রাখেন। বিশেষ করে কথোপকথন গুলো মন দিয়ে শোনার মতো….. এমন একটা জায়গায় গিয়ে শেষ হয়, যেখান থেকে দর্শকদের চার পাঁচ রকম জিজ্ঞাসা উঠে আসে, সে সব না হয় সিনেমাটা যারা এখনও দেখেননি তারাই দেখে বুঝে নেবেন। কিন্তু কথাটা হলো অ্যামি কি আদৌ পারলো এটা দেখতে??? জানা গেলো না৷ 

(সিনেমাতে যদিও ফোন নম্বর আদান প্রদানের কথা এড়িয়ে যাওয়া হয় চিত্রনাট্যের খাতিরেই) 

সিকুয়েল এর ভাবনা এলো। এবারেও স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে জুলি জায়গা পেলেন না।
রিচার্ড ভাবলেন, সাক্ষাৎ তো হলো না, যদি হতো কেমন হতো , সে সব ব্যাপার নিয়ে আরো দুটো ফিল্ম বানাবেন- ঠিক হলো। যেখানে ছেড়ে গিয়েছিলেন হাফ ডজন উৎকণ্ঠা জড়ানো প্রশ্ন নিয়ে একদম অন্য জায়গা থেকে শুরু করলেন পরের ফিল্মটা — “Before Sunset” — জেসে (ইথান হক) সেই রাতের কথা স্মরণ করে বই লিখে ইউরোপে ফেমাস হয়ে গেছেন… প্যারিসের একটি বুক স্টোরে তারই পাঠ চলছে আর দেখলেন সেলিন (ডেলপি) বাইরে…! তারপর আবার গল্প,আবার কথোপকথন, আবার সেই রাতের উত্থাপন….! কখনও রাস্তায়, কখনো ফেরিতে….! লেখক তার কনফারেন্সের ফ্লাইট মিস করবেন??? সেলিনের কথা – “Baby you are going to miss the plane” দিয়ে শেষ হলো সিনেমা…..সূর্যাস্ত আর হলোই না। আবারও প্রশ্ন গুচ্ছেক। বাজিমাৎ করলেন পরিচালক।

Before Sunset
পথচলতি গল্পরা @ Before Sunset

পরের ফিল্ম৷ ২০১৩ “Before Midnight” এবার গ্রীস। সেলিনের আর তার দুই জমজ মেয়ে আছে। কেটে গিয়েছে প্রায় দশটা বছর। গ্রীসে গরমের ছুটি কাটাতে গিয়েছেন তারা….তারপর আবার কিছু গল্প, বয়স বাড়ার সাথে তাতে তিক্ততা যুক্ত হলো। এবার উত্তপ্ত কথোপকথন, পরিচালকের “Before Trilogy” র শেষ পর্যায় এটা। অসম্ভব রকমের, অন্য ধরনের কথোপকথন দিয়ে শেষ হলো সিনেমা। এবার হয়তো কোন প্রশ্ন আর পড়ে রইলো না, আগের দুটোর সাথে তুলনা করতে করতে অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই বেশ কিছু ব্যাপার অনুভূত হতে থাকারই কথা, যে যে বয়সে দেখবেন এই সিনেমা,তার সেই রকম ফিলিং আসার কথা, রিচার্ড একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন –

“I always said that the movie was a litmus test for how you view romance.” (New York Times, 2004)!

Before Midnight
এবার গল্প বলার পালা অন্যদেরকে @ Before Midnight

 

এতো দূর তো ঠিক আছে। কিন্তু…. তিন বছর একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক্, ২০১৩ থেকে। অর্থাৎ ২০১০ তখন।  ইতিমধ্যে বিখ্যাত তিনটি সিনেমা  অ্যামির এক বান্ধবী দেখেন…! বুঝতে অসুবিধা রইলো না। অনেক চেষ্টার পর পরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তখনই জানা যায় যে অ্যামি লেরহাউপ্ট ১৯৯৪ এ একটি মোটরকার দুর্ঘটনায় মারা যান, সিনেমা শ্যুটিং শুরুর ঠিক এক মাস আগে…..! ভাবা যায়। উনি চেপে দিলেন পুরো ব্যাপারটাকে।
২০১৩ তে Before Midnight এ আর কিছু বাকি রাখলেন না৷ শেষ পর্যন্ত দেখলে, দর্শক প্রথমবারের জন্য দেখতে পাবেন Dedicated to…… AMY LEHRHAUPT…..
স্ক্রিপ্টের জন্য জায়গা পেলেন জুলি ডেলপিও।

তবে কিছুটা অবাক করার হলেও এই সিনেমা বানানোর কথা পরিচালক তাদের প্রথম সাক্ষাতেই জানিয়েছিলেন তার প্রেমিকাকে।

Even as that experience was going on … I was like, “I’m gonna make a film about this.” And she was like, “What ‘this’? What’re you talking about?” And I was like, “Just this. This feeling. This thing that’s going on between us.”

সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন ঘটনাটা খুব দুঃখেরই ছিলো।

ভালোবাসার স্মারকটাই অ্যামি দেখে যেতে পারেনি….সত্যি এমনও হয়….!
সব গল্প তাই গল্প নয়, সত্যিও হয়….! এভাবেই বারবার “গল্প হলেও সত্যি”…….. সত্যিই হয়ে যায়। কুর্নিশ!!


© শুভঙ্কর দত্ত || April 21, 2019 

তথ্যসূত্র : https://slate.com/culture/2013/05/before-sunrise-inspiration-before-midnight-is-dedicated-to-amy-lehrhaupt-who-inspired-the-series.html

__________________________________________

★ সম্প্রতি পুড়ে যাওয়া নটরে ডাম চার্চ নিয়ে ভবিষ্যৎবাণীটা বড়োই মনে করিয়ে দেয় সিনেমাটাকে

20190416_122524
কথায় কথায় নটরে ডাম চার্চ @ Before Sunset

নগরকীর্তন – বাঁচার অধিকার ওদেরও…

সিনেমাটা কেন দেখতে চান?
‘নগরকীর্তন’ এর দুটো টিকিট চাইতেই টিকিট কাউন্টার থেকে ইন্টারভিউসম প্রশ্ন ধেয়ে এলো….
বাংলাসহ সারাভারতে আলোড়ন করা বিশেষ এই সিনেমা দেখতে চাওয়া দুই বন্ধুকে এক বৃদ্ধের এই প্রশ্ন।

বললাম – ‘কৌশিক গাঙ্গুলি আমার প্রিয় পরিচালক…..! একটু ইয়ার্কি মেরেই বললাম, বাকিটা দেখে এসে বলি…!
ভদ্রলোক হাসলেন।
বললেন শুধুই এই কারণ….?

বললাম — না আসলে ঋদ্ধি কেও ভালো লাগে, সেই ‘ওপেন টি বায়োস্কোপ’ থেকেই ফ্যান!
বললেন — ‘কৌশিক গাঙ্গুলি প্রিয় পরিচালক, ঠিক আছে, কিন্তু আমার মনে হয় উনি নিজেকে ঋতুপর্ণর জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন!’

টিকিট কাটা হলো৷
আসলে একটা পরীক্ষা পড়েছিলো কলকাতায়, দুই বন্ধু মিলে ট্রেনে আসতে আসতেই একটা প্ল্যান মাথাচাড়া দেয়, আর পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে ১ কিমি দূরত্বে সিনেমাহলে ‘নগরকীর্তন’ চলছে। সুরজিৎ বললো – ‘এ সুযোগ হাতছাড়া করলে অ্যাচিভমেন্ট বলে কিছু থাকবে…?’ এরকম গোছেরই কিছু। অতএব, চলো, এগিয়ে যাওয়া যাক্। ব্যস্ ‘মিত্রা’ দাঁড়িয়ে আছে!

টিকিট তো কাটলাম, দেড় ঘন্টা বাকি এখনো। এদিক ওদিক ঘুরছি, কিন্তু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তখনও মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সিনেমাটা দেখতেই হবে, অতিশয় আগ্রহকে সঙ্গী করে।

——————————————————————
সিনেমা শুরুর আগে কিছু কথা উঠলো।
এই গল্প সেইসব প্রেমের গল্প, যে গুলো আর পাঁচটা প্রেমের মতো নয়।
ভেসে উঠলো Tributed To…. কে হতে পারে? আরে, নান্ আদার দ্যান ঋতুপর্ণ ঘোষ…!
ছবির নীচে ইটালিক্সে লেখা
“পরজনমে হইও রাধা….”
বুঝতে বাকি রইলো না। সদ্য ‘সমান্তরাল’ দেখেছি৷ কৌশিক গাঙ্গুলিও আগে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ বানিয়েছিলেন, মুখ্য অভিনয়ে ছিলেন স্বয়ং ঋতুপর্ণ৷ তবে কৌশিক গাঙ্গুলি সাহসিকতার পরিচয় দিলেন। সত্যিই তো সিনেমাটা কেন দেখতে যাবো?
‘ছোটোদের ছবি’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘শব্দ’ কেন দেখতে গিয়েছিলাম বা কেন দেখেছি?
কারণ উনি অন্যদের কথা বলেন, অন্যকিছু বলেন, সবাই যেটাকে নিয়ে ভাবেন না, যাদের নিয়ে ভাবেন না, উনি তাদের কথা তুলেই ধরেন। তাই…….! এটা অবশ্য বৃদ্ধকে বলা হয়নি৷

পরিমল-পরি-পুঁটি (ঋদ্ধি সেন) এই গল্প একদিকে চলতে থাকে, আর একদিকে….পুঁটির প্রেম চলতে থাকে, প্রেমিকের ওপর ভরসা করে চলতে থাকে জলে থেকে কুমীরের সাথে লড়াই করার অব্যহতির খোঁজ। শৈশব থেকে মনের মধ্যে পুষতে থাকা নারীত্বটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আবদার — “শরীরে ভুল আছে মধুদা (ঋত্বিক চক্রবর্তী) , শুধরে নিতে হবে….!”
সমান্তরালভাবে দুটো গল্প বলায় একটুও বোরিং লাগেনি, ততটাই সাবলীল লাগলো শুভজিৎ সিংহের কাঁচি চালালনোটা, অবশ্য আগেও ‘ছায়া ও ছবি’, ‘মাছের ঝোল’, ‘বিসর্জন’, ‘শব্দ কল্প দ্রুম’ এর মতো সিনেমাগুলিতে একই কাজ করেছেন।

বহুদিন আগে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ পড়েছিলাম, বেশ লেগেছিলো, সিনেমাটা দেখতে দেখতে বেশ ওটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। যদিও সেখানে গল্প ভিন্ন। তবে সেই উপন্যাসের একজনের উল্লেখ ছিলো বারবার, সিনেমাতে দেখি স্বমহিমায় তিনি উপস্থিত – মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়, পরিচালকের মুন্সীয়ানা চোখে পড়লো, সোমানাথ থেকে মানসী হওয়ার লড়াই – গল্প সবকিছু বলিয়ে নিলেন তার মুখ দিয়ে, শুধু তাই নয়, বলিয়ে নিলেন – শ্রীচৈতন্যদেবের শ্রীকৃষ্ণভাবে মজে যাওয়ার ঘটনাটা তার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়ার ফলে সিনেম্যাটিক ভ্যালু বেড়ে যায় বলেই মনে হয়৷

সিনেমার দৃশ্যপট এতো বাস্তব যে চেনা ছকের বাইরে বেরিয়েও এই সিনেমা হওয়া সত্ত্বেও বারবার মনে হচ্ছিলো এটা বোধ হয় খুব সহজ একটা ঘটনা৷ মধুদের পৈতৃক বাড়ি – নবদ্বীপ, যেখানে চিত্রনাট্য পৌঁছানোর পর থেকেই একটা ক্ষীণ উৎকণ্ঠা সঞ্চারিত হতে বাধ্য দর্শকদের মনে, যেটা তীব্র হয়, যখন দোলপূর্ণিমার আসরে মধু বাঁশি বাজায়, আর পুরুষরূপী নারীমনের পুঁটির আসল রূপ আচমকাই প্রকাশিত হয়ে যায়।

এরপরও আরো ঘটনা……! ঘটতেই থাকে….! শেষ আধ ঘন্টা দর্শকদের শিরদাঁড়া সোজা করে দিতে বাধ্য, ভাবাতে বাধ্য। সিটে আরাম করে বসে থাকা ঘুচিয়ে দিতে সফল এই সিনেমা। ওয়াটসআপ-ফেসবুকের মাধ্যমে কিভাবে কোনো ঘটনা ভাইরাল করা যায় তা দেখাতেও ছাড়লেন না। ‘নগরকীর্তন’ নামটা বেশ ব্যঞ্জনধর্মী বলেই মনে হলো, নগর বা সমাজে চলতে থাকা অহরহ ঘটনাপ্রবাহগুলোকেই বলা হচ্ছে এখানে।
ঋদ্ধি সেন কেন জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে, তার সদুত্তর মিলবেই, কস্টিউম-মেক আপের সাথে যেভাবে পরতে পরতে নিজেকে খাপ খাইয়েছেন, অসাধারণ….! (তাই দুটো জাতীয় পুরস্কার কস্টিউম আর মেকআপে, নগরকীর্তনের ঝুলিতেই) সাথে আবার ঋত্বিক থাকলে তো পাশের লোককে ভালো অ্যাক্টিং করতেই হবে….! আর্ট ডিরেকশন প্রশংসনীয়। কীর্তনের সাথে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন বাঁশিকে, অনেক দুঃখের মাঝে একটা আনন্দের চোরাস্রোত বয়ে যায় দর্শকের অলিন্দ বেয়ে…..! সৌজন্যে – প্রবুদ্ধ ব্যানার্জি….! ভালো লেগেছে সুজন মুখার্জি ওরফে নীলকে, মধুর বৌদির চরিত্রে বিদিপ্তা চক্রবর্তী যতক্ষণ ছিলেন ফাটিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ করে তার শেষ দৃশ্যটা৷

মন ছুঁয়ে যায়, কীর্তনের মাধ্যমে বলা – “তুমি আমারই মতন জ্বলিও…” এই অকপট কথা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে….! রাধার প্রেমে মজে নিজেকেই রাধারাণী করতে উদ্যত।

সবশেষে বলতেই হয় কৌশিক গাঙ্গুলি আবারও একবার প্রমাণ করে দিলেন নিজেকে। অভিনয়ও করিয়ে নিলেন তাদের দিয়ে। ওনারা আশাবাদী এ সিনেমা দেখার পর মানুষজন তাদের হয়তো এতেটা অবজ্ঞা করবেন না। যাদের একঘর করে রাখে সমাজ, তিনি বারবার তাদের উপস্থাপিত করে গেছেন, বলে গেছেন সমাজকে পাল্টে নিতে ভাবধারা, কয়েকজনের বাঁচার মতো সমাজ কি আমারা গড়তে পারিনা, শ্রেনীশত্রু সৃষ্টি করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দেওয়ার কোনো মানেই হয় না…!
হলের টিকিট কাউন্টারের বৃদ্ধ মানুষটির দোষ খুঁজে পেলাম না বিশেষ, কারণ এ সিনেমা সবার জন্য নয়, কৌশিক গাঙ্গুলি বলেইছিলেন, এ সিনেমা রোজগারের জন্য বানানো নয়, এগুলো বানানোর পেছনে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো বোঝেননি….কবেই বা বুঝবেন।

কবেই বা বুঝবেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় কেন আছেন এ সিনেমায়, কেন উৎসর্গ করার জায়গায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ছবির নীচে লেখা

‘পর জনমে হইও রাধা…..’

© শুভঙ্কর দত্ত || February 25, 2019 

‘ক্যুইন’ এর আত্মজীবনী “বোহেমিয়ান র‍্যাপসডি”

ফারুক বুলসারা বললে কেমন অচেনা লাগে, ফ্রেডি মার্কারী বললেই কেমন একজন চেনা মানুষ হয়ে যায়। ‘ক্যুইন’ ব্যান্ডটার নাম আমি একবারই শুনেছি, সৌজন্যে- ‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসডি’ নামের গানটা৷ তখন নোকিয়ার একটা মোবাইল ছিলো, জাভার.. খবরে পড়েছিলাম দুনিয়ার সবচেয়ে মন ভালো করে দেওয়া গান হলো এটা। বেশ কষ্টাকুষ্টি করে ডাউনলোডও করা হলো, প্রথমবার শুনে তেমন কিছু হলো না। পরে সত্যি সত্যি মন ভালো হওয়ার যখন দরকার পড়ে তখন চালিয়ে শুনতে শুনতে লিরিক্স আর মিউজিকটা মন ছুৃঁয়ে দিলো। সেই থেকে জানি ওটা একটা গান। ২০১৮ তে এসে শুনি ঐ নামে একটা ব্রিটিশ- আমেরিকান সিনেমাও আসছে। ডিরেক্টর কে? সেই ‘ইউজুয়াল সাসপেক্ট’ খ্যাত ব্রায়ান সিংগার৷ ‘এক্স মেন’ দেখিনি আমি।
যাই হোক্, “এ স্টার ইস বর্ন” দেখেছি, তার আগের বছর “লা লা ল্যান্ড” দেখেছি৷ সবই মিউজিক্যাল জার্নি৷ কিন্তু এটা “ক্যুইন” ব্যন্ডটির বায়োপিক বলা যায়৷ এরকম একটা ব্যান্ডের বায়োপিক কবে দেখেছি মনে নেই, আদৌ দেখেছি কিনা, তাও মনে নেই। তার মানে একটা ব্যান্ড কোন জায়গায় পৌঁছলে তা সম্ভব। বাজেটের প্রায় দশ-এগারো গুণ টাকা কামানো টা খুব সহজ কি? যেখানে তথাকথিত কোনো স্টার নেই, হোক্ না হলিউড।

ফারুক বুলসারা…..জন্ম জাঞ্জিবার….মা বাবা পার্সি…. জরাথ্রুস্টের অনুগামী তারা। ফারুকের শৈশব কাটে ভারতে, তারপর তারা চলে আসে ইংল্যান্ডে। সিনেমা থেকে এটুকুই জানা যায়। চারটে কৃন্তক দাঁত বেশি নিয়ে জন্মে ছিলো ফারুক বুলসারা…… একটা ব্যান্ডের পারফর্ম দেখার পর তাদের কাছে গিয়ে দাবি করে বসে আমার এই বেশি দাঁতের জন্য মুখের জায়গাও বেশি৷ তাতে করে গাইতে সুবিধেই হয়। তাদেরও নতুন লিড সিংগার দরকার ছিলো, মেঘ না চাইতেই জলের মতো মিলেও গেলো একজনকে। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-ডেন্টিস্ট ছেড়ে দিয়ে আসা তিনজনের সাথে যুক্ত হলো ফারুক….! ব্যান্ড হলো নতুন৷ নাম হলো – ক্যুইন৷ তারা তাদের প্রথম অ্যালবামের জন্য ভ্যানটাকেও বেচে দিলো। এলো প্রথম অ্যালবাম৷ টাকা ঢাললেন যিনি তার আপ্রাণ চেষ্টা সত্বেও ‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসডি’ এর অন্তর্ভুক্তি আটকানো গেলো না৷ ব্যস……… মার্কারির চরিত্রে র‍্যামি ম্যালেক দারুণ। ইতিমধ্যেই গোল্ডেন গ্লোব জিতে নিয়েছেন৷

বাকিরাও সাবলীল, কিন্তু কাকেই বা চিনতাম৷ মালেককে তবুও আগে কোথাও দেখেছি মনে হয়।

যাই হোক্, সিনেমাটা দেখার আগে মার্কারীর জীবনটা জানলে আরো ভালো হতো৷ তবে এই সিনেমা শুরু হয় ২০১০ এ, তারপর তিন বছর পর মার্কারীর চরিত্রে ভাবা অভিনেতা ছেড়ে দেন৷ পরিচালক সিংগারের সাথে গোলমাল হয় প্রোডাকসান টিমের কারণ তার গড়হাজিরা। এরপর হাল ধরতে ডাকা হলো – ফ্লেচারকে। কিন্তু কি ভাগ্য ভাবুন আমপরিকার ফিলিম গিল্ডের নিয়ম অনুসারে সিনেমার ডিরেক্টর হয়ে গেলেন শুধুমাত্র সিংগার, ফ্লেচার হলেন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর।

সিনেমার চিত্রনাট্যকার বেশ নামকরা। “দ্য থিয়োরি অব এভরিথিং”, “ডার্কেস্ট আাওয়ার” খ্যাত অ্যানটনি মাককার্টন। একটুও বোর হতে দেননি। এগুলো বলার সাহস নেই আমার। অতএব……. শুধু ভালো লাগা নিয়ে থাকি আর দেখতে বলি…

ভালো লাগলো সিনেমা টা দেখে। লাস্ট কুড়ি মিনিটের যে কনসার্ট টা দেখানো হয়েছে ওটা বারবার দেখতে ইচ্ছে করছে……… মার্কারীর নিজের জীবন, তার গান, তার অকুতোভয় সব গ্রাস করে নিলো তার জটিল এইডস রোগ…..

screenshot_20190118-003922~2

তবে অন্য রক্ গায়কদের মতো হতাশার সাগরে ডুব দেননি ইনি৷ ব্যান্ডের সদস্যদের বলে দিয়েছিলেন “FEARLESS LIVES FOREVER “

ব্যস তাতেই We are the champions 🤘

screenshot_20190118-004259

© শুভঙ্কর দত্ত || January 18, 2019

টুম্বাড – দ্য আননোন মিথ অব হস্তর

…. শো যাও নেহিতো ‘হস্তর’ আ জায়েগা…

যেমনটা চাইছিলাম ঠিক তেমনটাই।
বলিউডে এরকম সিনেমা কবে হয়েছে?
পৌরাণিক – ভৌতিক  সিনেমা। শেষ কবে হয়েছে? জানি না৷ এক কথায় দেখিনি বললেই চলে। পরিচালকের নাম শুনবো কি করে, সে তো অভিষেক করছে এই সিনেমা দিয়ে।
তিনজন ডিরেক্টর। তার মধ্যে একজন অবশ্য জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমার দৌলতে চেনা।
যাই হোক্, সিনেমায় আসা যাক৷
তিন টে চ্যাপ্টারে সিনেমাটা বলা হয়েছে। মহারাষ্ট্র এর পুণের টুম্বাড নামে কোনো অখ্যাত গ্রামের একটা পরিবার এর তিনটে জেনরেশনের গল্প এটা।

কোনো এক কালে এক দেবী ছিলেন। সমৃদ্ধির দেবী- সোনা আর আনাজের পরিপূর্ণ ছিলো। ১৬ কোটি দেবদেবী তার গর্ভ থেকে জন্ম নিলো কিন্তু তার সবচেয়ে ভালোবাসার ছিলো তার প্রথম সন্তান – হস্তর। হস্তর সব সোনা পেয়েছিলো কিন্তু আনাজপাতি নিতে যাওয়ার সময় বাকি সমস্ত দেবদেবীর ক্রোধে পড়লো। দেবী মা ওকে বাঁচালেন বাকিদের রোষানল থেকে, এই শর্তে যে ‘হস্তর’ কে সবাই ভুলে যাবে এবং এই ধরাধামে কোত্থাও সে আর পূজ্যিত হবে না। এই শর্তে মা তার আদরের সন্তানটিকে গর্ভে লুকিয়ে রাখলেন। সবাই ভুলে গেলো ‘হস্তর’ কে।
কিন্তু টুম্বাড এর লোকজন তার মূর্তি গড়লো,মন্দুর গড়লো কোন এক সময়৷ তারপর সেখানে দেবতাদের রাগ বৃষ্টি হয়ে ঝরতে থাকলো। অখ্যাত ঐ গ্রামের পরিবার কিন্তু হস্তরের অভিশাপ আশীর্বাদ এর মতো করে নিলো, কারণ তারা হস্তরের উদরপূর্তির জন্য সচেষ্ট ছিলো। তাদের পূর্বপুরুষরা হস্তরের থেকে সোনা পাওয়ার জন্য প্রাণপাত করতে দস্তুর ছিলেন। — এ গল্প ভিনায়ক রাও তার ছেলে পান্ডুরাং কে শোনাচ্ছে, দেবীর গর্ভে গেলে তবেই সবটা বোঝা সম্ভব৷

ভিনায়ক রাও পনেরো বছর পর ছেড়ে আসা টুম্বাডে আবার যাবে গুপ্তধনের খোঁজে। সেই ম্যানসনে। আবার সেই বুড়ি ঠাকুমা কে খুঁজে পাবে, যে গুপ্তধনের খোঁজে গিয়ে দানবের মতো হয়ে গেছে হস্তরের হস্তক্ষেপে। সেই বুড়ি সবটা বলে দেবে, কি করে হস্তরের থেকে সোনা কাড়ানো যায়। কি তার কৌশল। পুরো পরিমিতির নিপুণ কৌশলে আয়ত্ত করতে হবে গুপ্তখাজানা।  সিনেমার গল্প এতোটাই মৌলিক লাগলো যে, চিত্রনাট্য এতোটাই টানটান যে পুরো গল্প বলে দিলেও এমন কিছু লাভ নেই। সিনেমার সেট ডিজাইন না দেখলে পুরাই লস।

যাই হোক্ দিন আনি দিন খাই ভিনায়ক রাও মোটামুটি সোনা কাড়ানোতে অস্তাদ হয়ে উঠেছে। বেশ পয়সাও হয়েছে। এবার উত্তরপুরুষের পালা।
পাণ্ডুরাং ও রোজ রোজ বাড়িতে রিহার্সাল দেয়, একদিন বাবার সাথে গিয়ে একটু অভিজ্ঞতাও অর্জন করলো বটে। এদিকে দেশ স্বাধীন হলো। পুরনো ঝরঝরে ম্যানসন ভেঙে গ্রাম সাজানোর কথা শুনতেই একসাথে অনেক সোনা আদায়ে সচেষ্ট হলেন ভিনায়ক রাও, লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু? আজ্ঞে  না, মৃত্যু নয়, পিষাচ। হওয়ারই ছিলো। ছেলে বেঁচে ফিরে এলো।

এই হলো গল্প। এখনো মাঝে মাঝে অনেক বাকি। ১৯১৮ -১৯৪৭ এই তিন দশক ধরে টুম্বাডের এক ম্যানসনে ঘটে চলা পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে এই সিনেমার গল্প। পরতে পরতে লোমহর্ষক দৃশ্য, ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিকের অসাধারণ মিশেল সিনেমাটাকে বলিউডে বন্দী করে রাখলো না। মাঝে মাঝে তো মনে হচ্ছিলো কোনো নামজাদা হলিউডি পরিচালকের ফিলিম দেখছি।
এ সিনেমা আন্তর্জাতিক খ্যাতিও কুড়িয়েছে অবশ্য।
এক কথায় অসাধারণ।

ভিনায়কের চরিত্রে অভিনয় করা সোহুম সাহ কে আগে একবার কোথাও একটা দেখেছি কিনা মনে করতে পারছিও না। একবারের জন্যও বোরিং লাগেনি। শুধু পস্তাচ্ছি, কত টাকা খরচ করে তো ভাঁটের কত সিনেমায় দেখতে যায়, কিন্তু যেগুলো হলে গিয়ে দেখার জন্যই বানানো সেগুলো কেন দেখতে যাই না?

বাবুলাল উত্তর দিলো
“কনশাস এবং উপকারী রিভিউ আর কে দেবে?সবকটায় তো বিক্রিত..!”

© শুভঙ্কর দত্ত, মেদিনীপুর ||December 22, 2018 

চর্যাপদের খোঁজে চৌথুপীতে

চৌথুপী সঙ্ঘারামে মরণভয় ছড়িয়ে পড়েছে।
….
…….
মহাস্থবির চীবরের কটিবন্ধে হাত দিলেন, গ্রন্থাগারের কুঁজিতালের চাবি এখনও গেঁজেতে ঝুলছে। তবে এ কীভাবে সম্ভব? মহাস্থবির ক্ষিপ্রপদে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলেন এবং থরথর করে কেঁপে উঠলেন। মহামূল্যবান পুঁথির কাষ্ঠ-সিন্দুকগুলো সব উধাও!

—————————————————————

“চৌথুপীর চর্যাপদ” এর কাহিনীর শুরু এমনিই এক আকস্মিক ঘটনা দিয়ে। প্রাককথনে উল্লেখিত সময়কাল ১২০৫ অব্দ।

সত্যি বলতে গোটা উপন্যাসটি পড়ার পর এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি….. প্রথম পাতাটা দেখতেই নিজের ওপর যারপরনাই রাগ হলো, যে কথাটা প্রথম পাতায় লেখা আছে, আমি বেমালুম ভুলে গেলাম কি করে? ছ’মাস পেরোয়নি আমি “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়েছি, তা সত্ত্বেও কি করে পুরোপুরিভাবে ভুলে গেলাম যে এটিও একটি উপন্যাস, পড়তে পড়তে কাহিনীর গহ্বরে চলে গেছি, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢুকেপড়েছি চৌথুপীর সঙ্ঘারামে, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো ভুলেই গেছি আমি এক সামান্য পাঠক, পড়তে পড়তেই কখনো এর রূপ, কখনো ওর রূপের ছাঁচে বসিয়ে ফেলেছি নিজেকেই। যদিও এসব নতুন নয়, পাঁচমুড়ো পড়তে পড়তেই এসব হয়েছিলো… সেই “আমি যদি এটা হতাম”, ‘আমি যদি ওটা হতাম।’ এরকম ভাব।

  • যাই হোক্, এ গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই। পাঁচমুড়োর সাথে কিঞ্চিৎ মিল থাকলেও এই উপন্যাস আসলে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারের আর একটি অমূল্য রত্ন। পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গলকে যথাস্থানে রেখেই বলছি “চৌথুপীর চর্যাপদ” একটি সম্পূর্ণ রূপে গবেষণামূলক কাহিনী,যার পরতে পরতে আছে অসংখ্য তথ্য, এই বিপুল তথ্যসাগরে ভাসতে ভাসতেই পাঠক কখন যে সমান্তরালে চলতে থাকা দুটো কাহিনীর অন্দরমহলের প্রতিটি চরিত্রের সাথে পরিচয় সেরে নেবে, তা অনুমেয় নয়।
  • একসাথে দু’খানা কাহিনীর বুনোট সমান্তরালে চালিয়ে উপন্যাস এর গল্প বলা আগেও হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিশেষত্বটি কি?
    — কি আর? আপনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বইটির শিরোনাম দেখে কতকিছু ভেবে বসে থাকবেন, উপসংহার পড়ার পর ঠাহর হবে যে, আদতে আপনার কল্পনার প্রায় ৯৯ শতাংশই ভুল, মানে লেখক মশায়ের পাঁচমুড়ো না পড়া হলে তো, এরকম ভাবতে একরকম বাধ্য, তবে সেটা পড়া হওয়ার দরুণও আমায় আবার ঠকতে হলো বলা চলে।
  • একসাথে দুটো কাহিনী চালিয়ে যাওয়াটা মুখের কথা নয়, তাও আবার একটা এই এখনকার সময় আর একটা প্রায় ১২০০ অব্দ, তালগোল পাকালেই গেলো।
  • একটি পুঁথিকে কেন্দ্র করে একদিকে হাফি হাবিলদার, মামাজী, বিমলা, লামা, ছেত্রী, অর্জুন এবং যোজনগন্ধার তীব্র অনুসন্ধান। এবার আবার ভাষা হলো সিদ্ধম…..! কি অণুসন্ধান?
    প্রায় আটশো বছর আগের গন্ধকালী, শ্রীধর আচার্য, খু-স্তোনদের আগলে রাখা পুঁথি এবং তুরস্কদের কাহিনী। —- এই দুটো কাহিনীর সমান্তরাল সজ্জাতেই এ উপন্যাস এগিয়ে চলে।
  • কেন পড়বো?
    তার আগে বলি, এই উপন্যাসকে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে ধরলে মহাভুল। লেখক আগে একটা সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্য লিখেছিলেন, এবার একটা চর্যাপদ লিখে ফেললেন। কি? গাঁজাখুরি মনে হচ্ছে? পড়তে পড়তে অবশ্য এসব ভুলেই যাবেন।
  • এ কাহিনীতে অ্যাডভেঞ্চার কম নেই, আবার অতিশয় সিরিয়াস ইস্যুর মাঝে হাস্যরসের উপাদান নেহাত কম নেই, গুলি-বোমা-বারুদের গন্ধে মাখা বাতাস আছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা জাতির অত্যাচার আছে। কি নেই? থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চারের যুগলবন্দী, তার ওপর মন মাতানো সব তথ্য, যা জানলে রীতিমতো অবাক হয়ে যেতে হয়। তবে সবগুলো এমনভাবে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়েছে যে পড়তো পড়তেই এক অদ্ভূত মায়াজালে জড়িয়ে যেতে হয়। এ কাহিনী কিছুক্ষণ পড়ার পর অবশ্য মনে হতে পারে, যেন সিনেমা দেখছি! অবশ্য তা হলেও মন্দ হয় না।

 

IMG_20180629_144150~2
সিদ্ধম্

 

লেখকের পরিচয় নতুন করে কি বলবো? আগেও বলেছি, কতটা নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা থাকলে এরকম উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে উপহার দেওয়া যায় তাও বিদেশ বিভূইয়ে থেকে, সেটা জানতে গেলে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” এবং “ছিরিছাঁদ” এর সঙ্গে সঙ্গে “চৌথুপীর চর্যাপদ” ও পড়তে হবে। কতটা অধ্যবসায় এবং গবেষণা করলে এমনতর রত্নসমান আকর গ্রন্থ পড়ার সুযোগ পাই, তার জন্য সমগ্র বইটি পড়ার পর গ্রন্থতালিকাটি তে চোখ রাখলেই কিছুটা অনুমান করা যায়।

হ্যাঁ, এবার বলা যাক্, পুরো বইটি পড়ার পর কি এমন প্রশ্নের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। সেটা হলো, গল্পের সূত্রপাত কিভাবে হলো, এবং মহাস্থবিরের অনুপস্থিতিতে গল্পের নায়ক-নায়িকা যখন মহামূল্যবান পুঁথিগুলি তুরস্কদের নাগালের বাইরে আনয়ন করলো, তারপর কি হলো? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর ধরেই গল্পের সূত্রপাত। উপন্যাসের শুভারম্ভ।

এবার বলা যাক বইটির আকার নিয়ে। অনেকেই হয়তো সাড়ে চারশো পাতার বই হাতে নিয়েই বিরক্তও বোধ করবেন। তাদের জন্য সত্যিই দুঃখিত, লেখক বোধ করি, পাবলিক ডিম্যাণ্ড ভেবে বইটি লেখেননি, তাহলে হয়তো তিনি দুটি খণ্ডে বইটি প্রকাশ করতেন। আসলে এই চর্যাপদ সম্পূর্ণরূপে গবেষণামূলক একটি উপন্যাস। তবে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ার পর এটি নিয়ে বসলে রীতিমতো বিরক্তি লাগতে পারে, আমারও লেগেছে, তবে ঐ যে আবার বলতে হয়, শেষে গিয়ে অদ্ভূত রকমের আনন্দ লাগবে। কিন্তু সে আনন্দ আরো বেশি হতে পারে যদি পাঁচমুড়ো পড়ার পূর্বে এটা পড়া যায়। বইটি পড়া শুরু করলে যদিও পৃষ্ঠাসংখ্যা নেহাত লেস প্রায়োর মনে হবে, এখানেই লেখকের বাজিমাৎ। চরিত্রের নামকরণ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি মনে রাখার মতো সব নাম, এই উপন্যাসের নায়িকাদ্বয়ের নাম তো আবার বলেই দিলো যে কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে, অবশ্য পরে তা বলেও দিয়েছেন, সেটা কি?? – তা জানার জন্য একবার চৌথুপীতে গিয়ে ঘুরে আসায় শ্রেয়…. তবে ক্লু হিসাবে বলা যায় ঐ কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে বহু সিনেমা হয়েছে।

এটি লেখকের তিন নম্বর উপন্যাস, পাঁচমুড়োর প্রায় বছর দুয়েক পর এই উপন্যাস প্রকাশিত। অর্থাৎ লেখক সাহস পাচ্ছেন হয়তো তার পাঠকের আকুণ্ঠ পিপাসা দেখে। তাই আমাদেরও উচিৎ লেখকের এই গবেষণা-সাধনাকে কুর্নিশ জানানো তা সম্ভব – অবশ্যই অধিক পরিমাণ পাঠকের কাছে এই অসামান্য কাজের আলোকবর্তিকা বহন করা।

★★ ★ তবে এই বই পড়বো কেন তা নিয়ে লেখক গল্পের নায়িকা যোজনগন্ধার ভাষ্যে বলেছেন
যোজনগন্ধা ভাবল তার ওই জ্বরের ঘোরের মধ্যে পড়া গুহ্যচর্য্যায় কি সত্যি সত্যি ওই কাহিনি লেখা ছিল? নাকি সবই তার কল্পনাপ্রসূত ভাবসম্প্রসারণ, জ্বরের ঘোরের মধ্যে মনে ভেসে আসা অতীন্দ্রিয় জলছবি? কে জানে কোনটা সত্যি? তবে এটা সত্যি যে গন্ধকালী, খু্ স্তোন, শান্তভদ্র, তোন-পা’দের মতো নাম না জানা শত শত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী আটশ বছর আগে প্রাণের মায়া ত্যাগ তুচ্ছ করে কত মূলাবন পুঁথি বাঙলা থেকে তিব্বতে নিয়ে গিয়ে তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। যোজনগন্ধা ভাবছিল বাঙালিরা কেউ কি উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে আসবে সেই অমূল্য গ্রন্থগুলিকে ধুলো ঢাকা শবাধার থেকে বের করে আনতে?”

অবশ্য লেখক যোজনগন্ধার জবানবন্দীতেই বলিয়ে নিলেন – ” আমি এই কাজের দায়িত্ব নিলাম।”

সত্যিই তো, এই একই বার্তা বারবার দিয়ে চলেছেন লেখক…. বাংলা ভাষাটাই তো হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ঐ মহার্ঘ পুঁথি বা বাংলা ভাষার ইতিহাসকে রক্ষা করতে হলে এক দুটে গন্ধকালী বা যোজনগন্ধা, খু স্তোন বা হাফি হাবিলদার কি পাবো না?

IMG_20180629_144115

 © শুভঙ্কর দত্ত || June 30, 2018 

 

দৃষ্টি-(সম্পর্ক)-কোণ

বাবা, কাছিম মানে কি?
— কাছিম মানে কচ্ছপ!
আর জিজীবিষা মানে?
— মাকে জিগ্যেস করো!
অতঃপর…..
যাই হোক্
কৌশিক গাঙ্গুলির আবার একটা সিনেমা হলে দেখে নিলাম। আগে দেখেছিলাম “বিসর্জন”!
এবার দৃষ্টিকোণ।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো আমি রিভিউ লিখতে বসিনি। আমি আমার ভালো লাগা আর খারাপ লাগাগুলো বলতে এসেছি।
তবে সব কিছু বলার আগে একখানা বিধিসম্মত সতর্কীকরণ লাগেই, সেটা হলো
এক, এই সিনেমাকে প্রসেনজিৎ – ঋতুপর্ণার কামব্যাক সিনেমা “প্রাক্তন” এর সাথে বারবার লড়াই চালাতে হবে…
দুই, কৌশিক গাঙ্গুলির ঘরানার ছবি এটা নয়ই, যদিও তিনি এর আগে রোম্যান্টিক থ্রিলার বানিয়েছেন, “বাস্তুশাপ”! কিন্তু ফ্যামিলি মেলোড্রামা কে কেন্দ্র করে নয়।

সিনেমা শুরু হচ্ছে একটা মৃতদেহ দিয়ে। তারপর গল্প এগিয়ে চললো, আইনজীবি জিওন (প্রসেনজিৎ) এর কাছে সাহায্যপ্রার্থী শ্রীমতি (ঋতুপর্ণা), স্বামী পলাশ (কৌশিক সেন) মারা গিয়েছিলো বছর দুই আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে! না, নামটাই ওরকম। আমার কেন জানিনা মনে হয়েছে, পরিচালক চরিত্রের নামগুলোকেও দেখেশুনেই রেখেছেন। কলকাতার বাহা বাহা উকিল থাকতে জিওন মিত্রকেই কেন! সে প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে হলমুখী হতেই হবে!
তবে এই সিনেমা দেখে বেরিয়ে আসার পর বারবার কয়েকটা জিনিস নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বে কুচকাওয়াজ হতে পারে, যেমন- সিনেমাটায় আদৌ গল্প আছে? জিওন মিত্রের একটা চোখ সেরে গেলো বহু বছর বাদ, সেই কথাটা পরিচালক এতো জলদি দর্শককে না বলতেই পারতেন। আসলে এই প্রশ্নগুলো যে উঠছে, এটাই কোথাও যেন বলে দিচ্ছে, সিনেমাটা উতরে গেছে, কেজি পাস এ যাত্রায়। আসলে পরিচালক গোটা সিনেমাতেই একটু একটু আভাস দিয়ে যাচ্ছেন, এই বুঝি গল্প বাঁক নেবে, একবার তা নিলো অবশ্য। যখন প্রীতম (কৌশিক গাঙ্গুলি), মৃত পলাশের দাদা আর তার বাড়ির আয়া উমাকে দেখা যাবে ঘনিষ্ঠ মুহুর্তে। তারপর থেকেই একটা তুমুল উত্তেজনা কাজ করবে আবার কখন গল্প বাঁক নেয়।

এতো গল্পের মাঝে জিওনের অর্ধাঙ্গীনী রুমকি (চূ্র্ণী) আর জিওনের সম্পর্কের মাঝে শ্রীমতী সেনের ট্রেসপাসিং, যা দিয়ে গল্পের বুনন চলবে কিছুক্ষণ। একসাথে দু আড়াই পিস গল্প সমান্তরালভাবে চলতে চলতেই একসময় ক্লাইম্যাক্সে আসবে সিনেমা। সত্যি বলতে কি, দর্শকদের বসিয়ে রাখাতে সফল হয়েছেন কেজি।
পরকীয়ার গল্পের মাঝে মাঝেই থ্রিলারের হালকা বাতাস গায়ে লাগতে পারে, অবশ্য তা কতটা থ্রিল সেটা বলা মুশকিল। কারণ এর চেয়ে ঢের বেশি থ্রিলার কেজির ‘জ্যাকপট’ বা ‘খাদ’ সিনেমায় আছে!

অভিনয় নিয়ে কিছু না বলায় ভালো। কে নেই? তবে কিছু দৃশ্যে ফ্যামিলি মেলোড্রামা দেখলেই ‘প্রাক্তন’ এর কথা মনে পড়বে, তবে হ্যাঁ, এখানে অপরাজিতা আঢ্যের মতো কেউই নেই। অতএব অভারঅ্যাক্টিং নেই। যতটুকু আছে ফ্যামিলি মেলোড্রামা, পুরোটাই মানানসই এবং গল্পের খাতিরে করা, এমনটাই লেগেছে।
কৌশিক গাঙ্গুলি কতটা ভালো পরিচালক তা জানতে বাঙালি অনেক দেরী করেছে তো বটেই, তবে কতটা ভালো অভিনেতা সেটা আর জানতে বাকি রইলো না, যারা অবশ্য ‘বিসর্জন’ এ ওনার অভিনয় দেখে মুগ্ধ, তারা হয়তো ‘কাঙাল মালষাট’ বা ‘ল্যাপটপ’ দেখেননি। “বিসর্জন” এর আগে তার কটা সিনেমা আম বাঙালি দেখেছে, তা সন্দেহ আছে, তার জন্য অবশ্য জিও-ডিজিটাল-লাইফ অনেকটা দায়ী। “ছায়া ও ছবি” র পর “দৃষ্টিকোণ” দিয়ে কেজি নিজের ঘরানা পাল্টানোর চেষ্টা করেছেন।
সিনেমাটার সবচেয়ে ভালো জিনিস কি?
এডিটিং! অবশ্যই! সৌজন্যে – শুভজিৎ সিংহ।
‘বাস্তুশাপ’, ‘বিসর্জন’, ‘ছায়া ও ছবি’, ‘খোঁজ’, ‘মাছের ঝোল’, আর ডেবিউট করেন ‘ধূমকেতু’ দিয়ে, যদিও সেই সিনেমা রিলিজ করেনি।

কেন বললাম যে এডিটিং সবচেয়ে ভালো?
তার কারণ গানগুলোর সাথে দৃশ্যগুলোর সিঙ্ক্রোনাইজেশন। এতো ভালো সিংক বহুদিন চোখে পড়েনি। গান গুলোর ভাষাগুলোও তাই বোধগম্যহতে সহজ হয়। এদিক দিয়ে আবার গোপী ভগৎ এর ক্যামেরার কারসাজিকে বাহবা না দিয়ে উপায় নেই। রাজা নারায়ণ দেব যে সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিসিয়ান, সে কথা দর্শক বেমালুম ভুলেই যাবে, সিনেমার গান শুনে।
চারটে গান আছে- আপাতত কোনটাই প্লে লিস্ট থেকে সরাতে পারছিনা, কারণ – প্রত্যেকটা গানের ভাষা, সৌজন্যে – অনুপম রায়, যেমন – “আমি তোমায় খুব বিরক্ত করছি”!  কেজির ফিল্মের গান এমনিতেই দারুণই হয়।  তবে প্রত্যেকটা গানের সাথে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বানানো দৃশ্যের সিঙ্ক্রোনাইজেশনে আমি অন্তত মুগ্ধ। 

সিনেমার গল্প খুব দুর্বল নয়। আসলে সব কিছু বলে দিয়ে তারপর ব্যাখ্যা দেওয়া, এটাও তো এক রকমের বাজিমাৎ। তাই কেন “দৃষ্টিকোণ”? সে কথা জানতে হলে দেখতে হবে। এ সব সিনেমার ডায়লগ নিয়ে বেশি কিছু বলা যায় না, কারণ ডায়লগের ওপরেই পুরোটা দাঁড়িয়ে। তবু ডায়লগের কথা বললেই আবার “বিসর্জন” এর সাথে তুলনা আসতে পারে।

ও হ্যাঁ, জিজীবিষা মানে Urge To Live মানে বেঁচে থাকার ইচ্ছা! যা দিয়েই গল্পের শেষ। বেঁচে থাকা আর না থাকা নিজের ‘দৃষ্টিকোণ’ থেকে।

তবে সব কিছু ছাড়িয়ে কেজির ঘরানার সিনেমা না ভেবে এই সিনেমা দেখতে গেলে অনেক কিছুই পাওয়া যাবে,
আর উপরিপাওনা হিসেবে প্রসেনজিৎ – ঋতুপর্ণার বহুপ্রতীক্ষিত চুম্বন এর দেখা মিলবে…!

 

এক সাথে অনেক দর্শক মিলে বাংলা সিনেমা দেখলাম বহুদিন পরে। সিটে বসে থাকার পর দেখি আস্তে আস্তে অর্ধেক ভর্তি হলো। তাহলে কি লোকজনের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টালো?

©শুভঙ্কর দত্ত || May 4, 2018

এক এক্কে তিন – ব্যোমকেশ এর অগ্নিবাণ!

 

unnamed (2)

প্রথম বার সিনেমা হলে গিয়ে ব্যোমকেশ!
“সত্যান্বেষী”
“অগ্নিবাণ”
আর “উপসংহার”
তিন তিনটে “ব্যোমকেশ” একসাথে। যেনো বাই ওয়ান গেট টু ফ্রি। শুনতে হয়তো অদ্ভূত লাগছে কিন্তু এটাই….! তিনটে গল্প তাও একটা গোটা ফুটবল ম্যাচের সময় ধরে। অঞ্জন দত্ত এখানেই বাজিমাৎ করে ফেলেছেন। আসলে গল্ল তিনটে মনে থাকলে সহজে বোঝা যায় তিনটের মধ্যে একটা বিরাট যোগসূত্র আছে এবং প্রত্যেকটার মূলে একটা বিষ বিষ ব্যাপার আছেই।
সত্যান্বেষী যদিও মলাটে বাঁধা ব্যোমকেশ সমগ্রের প্রথম গল্প কিন্তু শরদিন্দুর লেখা প্রথম রহস্যকাহিনী কি, সেটা জানতে সমগ্রের শেষ দিকে “পরিশিষ্ট” তে উঁকি দিলেই জানা যায়। – “পথের কাঁটা” প্রথম গল্প। যেখানে আমরা সত্যান্বেষী ব্যোমকেশকে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন পাঠক হিসেবে চিনতে পারি। এটা সম্প্রতি সানডে সাসপেন্স এর দৌলতে সবারই জানা প্রায়। যাই হোক্, “সত্যান্বেষী” গল্প নিয়ে বিশেষ কিছুই দেখানো হয়নি, তবু যারা ব্যোমকেশ পড়েছেন, তারা সহজেই এই গল্প মনে রেখেছেন,আশা করা যায়ই, তাই “ব্যোমকেশ ও অগ্নিবাণ” দেখতে গিয়ে প্রথম দৃশ্য দেখে কেউ কেউ অবাক হয়ে যেতেই পারেন যে কি সিনেমা দেখতে এলাম! সত্যান্বেষী র গুপ্ত কোকেন বিক্রেতা অনুকূল “উপসংহার” এর কোকোনদ গুপ্ত। আর “অগ্নিবাণ” এর পরের গল্প “উপসংহার” এটা তো মনেই আছে, আশা করা যায়। অগ্নিবাণ এর কনসেপ্ট কাজে লাগিয়ে উপসংহারে কিস্তিমাৎ। তবে চিত্রনাট্য এর খাতিরে কিছু কেমন রদবদল হয়েছে যদিও, সেগুলো না হয় হলে গিয়েই দেখা যেতেই পারে। যিশুকে ব্যোমকেশ এর চরিত্রে বেশ মানিয়ে গেছে। আবীরকে মনেই পড়ছে না। অজিতকে নিয়ে সম্ভবত পরিচালকও কিছু বলবেন বলে মনে হয় না। মূল গল্প উপসংহার দেখানো হলেও অগ্নিবাণও বেশ আরামসে দেখিয়ে দিলেন এবং পুরোটাই। ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে সেই মেস, মানে সত্যান্বেষী। যতটা দরকার। এখানেই অঞ্জন দত্ত আরো একবার সফল ব্যোমকেশ বানানোয়। একটা গান শুনলাম, একটাই, বেশ ভালো, ঐ পাব সং যাকে বলে, গায়িকা নিয়ে বেশ দোলচালের পর ইউটিউবে গিয়ে দেখলাম, একদম অচেনা। খারাপ লাগেনি সত্যি। নীল দত্তই সম্ভবত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটাও করেছেন, বিঠোফেন পেলাম একদুবার। মাঝে এক দুবার একটু অতিরিক্ত লাগছিলো কিন্তু ঐ যে একসাথে তিনটে গল্প, আর দুটোকে বেশ মোড়কে বাঁধলেন যে, তার জন্য ঐ টুকটাক ভুলে যাওয়া যায় সিনেমা শেষ হওয়ার পরেই। অঞ্জন দত্ত অভিনয়েও বেশ। উপরি পাওয়া হিসেবে স্বস্তিকা, স্ক্রিনে আসতেই হালকা উত্তেজনা বয়ে চলতেই পারে। কড়া ডায়লগ আর ওমনি চরিত্র আর কাউকে মানাতো কিনা, সেটা সম্ভবত মনে আসতেই দেয়নি। সব মিলিয়ে সিনেমাটা দারুন উপোভোগ্য! পুরো ষোলোয়ানা ব্যোমকেশ লাগলো!
IMDB তে ভোটার হিসেবে ১০ এ আট দেবোই। বাংলা সিনেমা নয় দিয়ে দিতেও পারি।

*****

যাই হোক, “আদিম রিপু”, “চিত্রচোর”, “বেণীসংহার”, “কহেন কবি কালিদাস” এর পর তিনটে গল্পজুড়ে এই সিনেমা রীতিমতো দত্তবাবুর অন্যান্য সিনেমাগুলোকে পিছিয়ে দিতেই পারে। সেটা দর্শকদের হাতে অবশ্যই। তবে যিশুকে মানিয়ে গেছে। চুনোপুঁটি দর্শক হিসেবে আর বদল চাইনা ঐ পোস্টে।

—————————————————–

তবে এটা না সিনেমা রিভিউ, না সমালোচনা। এটা শুধু অনুভূতি। আমার রিভিউ পরিচালক কে তার খ্যাতি থেকে নামাবেও না, ওঠাবেও না, প্রোডিউসার এর ক্ষেত্রেও একই কথা। “হরি” সিনেমা হলে ৩০ টাকার টিকিটে এ সিনেমা দেখলে মেদিনীপুর এর কোন বাঙালির কোন ক্ষতি হবে বলে আমার অন্তত মনে হয় না (যদি ঐ ৯০ মিনিট সময় টা ক্ষতির আওতায় ফেলা না হয়)। কারণ অবশ্য আছে, এর আগে মেঘনাদবধ রহস্য দেখতে গিয়ে সাকুল্যে ত্রিশ জনকে দেখেছিলাম, এবার হয়তো দশ জন বেশি তার চেয়ে, এই প্রথম ব্যোমকেশ দেখলাম সিনেমা হলে। কিন্তু সত্যিই যদি ছুটির দিনেও একটা অতি পরিচিত বাঙালি কেন্দ্রীক চরিত্র নিয়ে বানানো সিনেমা দেখতে এতো কম দর্শক আসেন, তাহলে হয়তো হল কর্তৃপক্ষ ও সাহস পাবেনা পরবর্তী কালে এরকম সিনেমা আনতে, এই জন্যই “প্রজাপতি বিস্কুট” ব্রাত্য, “বিসর্জন” এক সপ্তাহ কেন! তারও উত্তর একই। আমি প্রচারও করছি না, তবে সত্যিই বাংলা সিনেমা যারা ভালোবাসেন, যারা ব্যোমকেশকে পড়েছেন, রেডিওতে শুনেছেন, তাদের জন্য বলছি, তাদেরকে বলছি, সবাই কিন্তু তিরিশ টাকা দিয়েও আজকাল বাংলা সিনেমার স্বাদ পায়না।

সিনেমা টা মন্দ নয়!! বাহুবলীর মতো আড়ম্বরপূর্ণ না হোক্, বাঙালি গন্ধ আছে, টিকিয়ে রাখাটায় জরুরি! সেটা কবে বুঝবো আমরা?

বিঃদ্রঃ সাবটাইটেল দেখার অসুবিধার জন্য স্থান পরিবর্তন করার জন্য আমার পার্টনার হাসা হাসি করলো। ভাই সৌমেন, “ধোয়া তুলসিপাতা” ইংরেজিটা কিন্তু আজ জানলাম, “Paragon of virtues”। – কে জানে, হয়তো সংগ্রহ আরো বাড়তো খিল্লিটা না করলে!😂😂

#ByomkeshOAgniban #AnjanDutta

#dS

© শুভঙ্কর দত্ত || October 15, 2017