“অনল অন্তরাল” – পর্দার ওপারের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল…

শেখর স্যারের সাথে পরিচয় আসলে ঝাড়গ্রামের সূত্রে৷ তখন মাস্টার্স করছি ওখানে। স্যারের লেখাপত্র পড়েছি কিন্তু জানতাম না উনি আমার কলেজেরই অধ্যাপক। তারপর আমার ঘোরাঘুরির জন্য বিভিন্ন সময় পরামর্শ নিতে হয়েছে।

শারদীয়া আনন্দবাজার ১৪২৭ এ উপন্যাস তালিকায় শেখর মুখোপাধ্যায় নামটা দেখে তাই অপেক্ষা করতে পারিনি। হাতে পাওয়া মাত্রই শুরু করে দিই। বেশ বড়ো উপন্যাস এবং খুব সহজ নয় আবার! তার সবচেয়ে বড়ো কারণ চরিত্রের ভিড়…! অনেক কিছুই জীবনে অপাঠ্য আমার, তবুও বলতে দ্বিধা নেই যে এই কাহিনীতে ঘটনার ঘনঘটা আর চরিত্রের প্রাচুর্য আমি আর কোনো উপন্যাসে পড়িনি৷ তাও প্রথম থেকে একদম শেষ পর্যন্ত অদ্ভুৎ মাদকতায় আমি পড়েছি। রাত জেগে পড়েছি, পড়ে ঘুমিয়েছি আবার উঠে পড়েছি। এরকম তিনবার নিয়ে বসতে হয়েছে! আর শেষ দিকে তো প্রবল টান, যেনো ভাঁটার টান। অনেক কথা বললাম, উপন্যাসের নামটা বলা হয়নি, — “অনল অন্তরাল”! সভ্যতা কালক্রমে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু সমাজ – সভ্যতার পর্দা ক্রমশ পিছিয়ে গিয়েছে…. অতলস্পর্শী যে সে! সূর্যাস্তের পরে যেমন অন্ধকার নেমে আসে, রাঙা আলোর ওপারের গল্প অজানা! সেরকমই পর্দাপতিত হলেই নেমে আসে আঁধার! অজানা থেকে যায় ওপারের ঘটনাপ্রবাহ! লেখকের কলমে উঠে আসে যবনিকার পেছনে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা, কালের নিয়মে একদিন যা এগিয়ে নিয়ে এসেছে আমাদের আর নিজেরা রয়ে গিয়েছে পেছনে!

কাল বললে আবার সাল-তারিখ বলতে হয়। তবে এ উপন্যাসের কাহিনী আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগের এবং এখনও হয়তো প্রবাহমান! পড়তে যখন শুরু করেছিলাম তখন এর বিশালতা বুঝতে পারিনি, কি হতে চলেছে আন্দাজ করতে পারিনি৷

একজন সাড়া ফেলেদেওয়া, মরণাপন্ন লেখকের বহুদিনের গবেষণার উপন্যাস সমাপ্ত করার ডাক পড়ে অমিতজ্যোতি নামের এক নবাগতর কাছে…. শয্যাশায়ী রেবন্ত রায় তাকে সবকিছু হস্তগত করেন! এরপর এই কাঁচা লেখকের উপন্যাস যাত্রা শুরু হয়। উপন্যাসের শুরুয়াত যে সময় দিয়ে সেটা ১৭৩২ সাল! এবার ল্যাপটপে উপন্যাসের গল্প টাইপিং এর মাধ্যমে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে চলতে থাকে পুরো গল্প!
ক্ষমা করবেন, এর চেয়ে বেশি কিছু বলা অসম্ভব।
আসলে গল্পটা একটা বহু দিন আগের এক সম্পর্কের সূত্র খোঁজা!
তবে গোটা কাহিনীতে সে কালের কোন দিকটা তুলে ধরেননি লেখক, আমি সেটা ভাবছি! কত রকমের গান হতো, সে সবও উল্লেখ আছে। হরু ঠাকুর এর নাম আছে! বললাম তো কে নেই এখানে…!
তার সাথে আছে জটিল থেকে জটিলতর সম্পর্কের বুনোট যা মানে না দেশ কালের বেড়াজাল। সতীদাহ থেকে শুরু করে বিধবা বিবাহ – কি নেই সেখানে? এরকম বাস্তব প্রেক্ষাপটের গল্প! যেদিকেই যাই চেনা চেনা গন্ধ! পারাং নদী? সেও চেনা! শোভাবাজার রাজবাড়ি? সেও চিনি! আসলে ইতিহাস টুকরো টুকরো! তারই বা দোষ কোথায়? যে যার গুছিয়ে নিয়ে বাকি ফেলে রেখে দিয়েছে, সেই তো ইতিহাস, সেই তো হেরিটেজ!
নবাব আলিবর্দি থেকে শুরু করে হেস্টিংস – ক্যানিং কে নেই? রবার্ট ক্লাইভ! ডিরোজিও — সব্বাই! নাম নিতে গেলে এ লেখা উপন্যাসের এক তৃতীয়াংশ হয়ে যেতে পারে! নতুন করে অনেক কিছু জেনেছি! কিছুদিন আগে গৌতম ভট্টাচার্যের “বারপুজো” পড়ে বলেছিলাম যে এই বইটাকে কোলকাতার লোকজন আপন করে নেবে, এক্ষেত্রেও তাই! পুরনো কলকাতার আরো একটা দলিল হয়ে থাকবে হয়তো। যেমন জেনেছি ছড়াগুলোর মানে! “গোবিন্দরামের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, নকু ধরের কড়ি, মথুর সেনের বাড়ি!” সেরকমই জেনেছি কিভাবে মেদিনীপুর আলিবর্দি খাঁ এর সাথে জড়িত! জেনেছি নবকৃষ্ণ দেবের রাজা হওয়ার গল্প, জেনেছি বহুবাজার থেকে বউবাজারের গল্প! শোভাবাজার রাজবাড়িতে বলি বন্ধ হওয়ার গল্প!আরও অনেক কিছুই! বলে হয়তো শেষ করা যাবে না। গল্প জেনে গেলেও তথ্য জানতে বইটা আবার পড়া যেতে পারে!

সবচেয়ে ভালো লাগার কারণ, গল্পের স্টাইল! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ি, পড়ার পর বুঝতে পারি – সবটাই লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত, শুধু টুকরো টুকরো ইতিহাসটুকু সত্যি। এক্ষেত্রে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে যতটা বলা হয়েছে, ততটার কতটা সত্য সে আমি জানি না, তবে ইতিহাসের এতো চরিত্রের ভিড়ে, এতো গল্পের ভিড়েও এক অদ্ভুৎ নেশার ঘোরে চুবিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে “অনল অন্তরাল”! এত সব ঘটনার মাঝে একবারও বিরক্ত লাগেনি! আসলে এভাবে ইতিহাস পড়ার সৌভাগ্য হয়নি৷ আমাদের আনাচে কানাচের গলিপথে যদি এতো অচেনা অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে, তার আস্বাদ নিতে কার না ভালো লাগে? অন্তত যেখানে পরীক্ষা দেওয়ার মতো যাতনা থাকে না….!

কতগুলো জিনিসের জন্যে আমি কুর্নিশ জানাবো ঔপন্যাসিককে….
এক, তিনি পুরো বছর আড়াইশোর ঘটনাকে টুকরো টুকরো ইতিহাস দিয়ে দারুন কোলাজ বানিয়েছেন, মাঝে মাঝে নিয়ে এসেছেন আজকের দিনে!

দুই, এমন কাহিনী লিখতে গেলে কতটা অধ্যবসায় প্রয়োজন হয়, তা গল্পের পরতে পরতে যে কোনো পাঠক অনুভব করতে পারবেন!

তিন, গল্প একটা নির্দিষ্ট ক্রোনোলজি কে ফলো করে গেলেও তার দেওয়া তিনটি বংশপুঁজি না দিলে পাঠকের কালঘাম ছুটে যেতো, অবশ্য এই উপন্যাসের পাঠকদেরও কম পরিশ্রম করতে হবে বলে মনে হয় না। এই দিক থেকে পুরোমাত্রাই জড়িয়ে রাখতে সক্ষম…. যে যত বেশি জড়াবে সে তত পিছনে তাকাবে।

চার, শিল্পী অমিতাভ চন্দ্রের অলংকরণ! এমন চমৎকার অলংকরণ বারংবার মনে করিয়ে দেয় পাঠক ভুলে গেলেও! তবে আরও দু তিনখানা তুলির টান থাকলে দারুন লাগতো।

আমাদের চেনা পরিধির মধ্যেও এমন অনেক হয়তো গল্প রয়েছে যা আবহমান কাল ধরেই পর্দার ওপারে…..! অবশ্য এমন পর্দা ফাঁসে অদম্য ইচ্ছে লাগে…. অবশ্য সূত্রও লাগে তার জন্যে….! আবার সে অনলে দগ্ধ হওয়ার ভয় থাকলেও চলে না। “অনল অন্তরাল”, প্রায় তিন শতকের একটা শহরের বিস্মৃত ইতিহাসের জীবন্ত একখণ্ড দলিল হয়ে বেঁচে থাকুক বাঙালির হৃদয়ে….একজন ক্ষুদ্র পাঠক হিসেবে এই কামনা করি! প্রণাম জানাই স্যারকে…. তার অধ্যবসায়কে নতমস্তকে আবারও কুর্নিশ! তবে এবার হয়তো শালধোয়ানিয়ার জন্য অসংখ্য রেবন্ত রায় গজাবে, আর আপনাকে তাগাদা দেবে! যাই হোক্ আপাতত মলাটবন্দী অবস্থায় চাই এই উপন্যাসকে!

তবে এ উপন্যাস পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে জনৈক কবির উক্তিটি – ”যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন..!”অবশ্য এরকম মনে হওয়ার কারণ অজানা।

পুনশ্চঃ সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কথা বলেছেন। এই মানুষটির সাথে মনে হয় মন্দিরময় পাথরার যোগসূত্র আছে।

© শুভঙ্কর দত্ত || August 25, 2020

‘অক্ষয়’ অনুভূতি

“মানুষের কতরকমের যে উদ্ভাবনী শক্তি এবং প্রয়োজন৷ আর এতো অক্লান্ত উদ্ভাবনী শক্তি আছে বলেই এত উলটোপালটা প্রয়োজন।”

— অক্ষয় মালবেরি পড়া শেষ করলাম।

এমন উপন্যাস পড়তে পারলে দারুন আরাম লাগে।মনের…! প্রশান্তি, বলা ভালো।  আমাদের মানুষদের একটা দারুন মিল প্রায় সবার মধ্যেই রয়েছে সকলেই জীবনে একবার হলেও শৈশবে ফিরে যাওয়ার বাসনা প্রকাশ করে। হয়তো একাধিকবার!
শৈশবে ফিরে যাওয়া তো সম্ভব নয়৷ কিন্তু বই পড়তে পড়তে তেমন স্বাদ যদি মেলে….!

প্রকৃতি যেখানে মানুষের রূপ পায় আর মানুষের মধ্যেই প্রকৃতির সৌন্দর্য – মণীন্দ্র গুপ্ত কি স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে বইটি পড়িয়ে নিলেন। আহামরি উৎকণ্ঠা অনুভব করিনি পড়তে পড়তে তবুও মনে হচ্ছিলো যে এ বই যত জলদি শেষ করবো তত জলদি জানতে পারবো লেখকের কি গতি হলো!

পার্থিব জগতের বস্তুগুলির তুলনাগুলি কি সুন্দর লেগেছে, সে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। সত্যি বলতে চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করে, বসেও ছিলাম। কতবার যে শৈশবে ফিরে গিয়েছি। না জানি, বয়স্ক মানুষরা পড়লে তাদের কি হাল হবে!  এক অফুরান আনন্দে হয়তো কেউ থামতেই পারবেন না। ছোটোবেলাটা যে কত সুখের, সেটা উপন্যাসের তৃতীয় বা শেষ পর্বে এলেই বোঝা যায়! কারণ পড়তে তুলনামূলক ভালো লাগে না অথচ লেখকের কোন দোষ নেই। তিনি কি সুন্দর সব গল্প বলেছেন আমাদের। পাঠক কি না, খিদে একটু বেশিই! কেউ কেউ চতুর্থ পর্বের জন্য অপেক্ষা করেন, চিঠি পাঠান, অবশ্য তার সম্ভাবনার কথা তিনি অঙ্কুরেই বিনাশ করেছেন।

বারবার পড়তে ইচ্ছে করে যেন মালবেরির অপার্থিব গন্ধ পাই পাতা থেকে। পড়তে পড়তে স্তব্ধ হয়ে ভেবেছি — আহ! এমনটাই তো হয়েছিলো! বয়সকালে গিয়ে ফেলে আসা শৈশবের কাহিনী লেখাটা কতটা কষ্টের আবার আনন্দেরও সে বলাই বাহুল্য! সত্যিই সে জীবন ‘অক্ষয়’! এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ বলে মনে করি আমি।

এর চেয়ে বেশি কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই বা আরও পড়তে হবে দু’বার  অনুভূতি টনটনে করার জন্য।  শব্দ জানলাম বেশ কয়েকটি, নতুন। পরে হয়তো সাহায্য করবে এই ‘অক্ষয়’ই!

শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর

March 16, 2020

 

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” – তিন যুগের পৃথিবীতে অতীশ দীপংকর

‘কেমন লাগলো’ – এ কথার উত্তর দিতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবতে হবে….! গত দুই বছরে ফেসবুকে এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু পেয়ে অন্য স্বাদের বেশ ভালো রকম তিনখানা বইয়ের সন্ধান পাই। আবার তারই এক পোস্টে দেখি তিনিই “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” পড়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। তার আগে নাম শুনিনি, এমনতর নয় যদিও বিষয়টি। কিন্তু একটা বিশ্বাসযোগ্যতা কাজ করলো…..

collegestreet নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বেশ ভালো রকম ছাড়ে পেয়েও গেলাম বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তাও আবার ডেলিভারি চার্জ মুকুব। ব্যস!

উপন্যাসের নামকরণেই লেখা আছে “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী”… হাস্যকর হলো বিষয়টা যখন ওনারা ফোন করে বলছিলেন ‘দাদা আপনার অর্ডার করা দুটো বইয়ের একটাই পেয়েছি’, পরে বুঝিয়ে বলার পর বুঝলেন – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী কোনো আলাদা বই নয়।

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকর এর নিয়ে এমন আকর একখানা উপন্যাসে লেখক তার মুন্সিয়ানার দারুণ পরিচয় বহন করেছেন একথা প্রথমে স্বীকার করে নেওয়ায় ভালো।

এ উপন্যাস জুড়ে চিত্রায়িত হয়েছে অতীশ দীপংকরের জীবনী, তার সাথে জড়িয়ে থাকা শতাধিক চরিত্রের সাক্ষাৎ হয় পাঠকের সাথে।

মোটামুটি আমরা জানি যে ৯৭৭ সালে প্রথম তুর্কি আক্রমণ হয়, সুবুক্তগীন করেন। সফলতা আসেনি। এরপর প্রায় ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি আক্রমণ চালালেন, তুরস্কদেশাগত আক্রমণকারীর রোষানলে পড়লো ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষুদ্র থেকে গভীরতর উপাদান সমূহ – মূর্তি, শাস্ত্র, দর্শন এবং হাজারো পুঁথি তাদের ধর্মান্ধতার চোখে পড়তে বাকি থাকলো না। তিব্বত থেকে আগত পর্যটক – চাগ্ লোচাবা, নালন্দা দর্শনে এই ভয়াবহতার মাঝেই, নালন্দার তৎকালীন অধ্যাপক আর্য শ্রীভদ্র তাকে ফেরালেন না। নালন্দা কাউকে খালি হাতে ফেরায় না বলে তিনি অতীশ দীপংকর ব্যবহৃত একটি কাষ্ঠপেটিকা তুর্কি আক্রমণ থেকে বাঁচাতে তিব্বতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেন।

যাত্রাপথে বিক্রমণিপুর গ্রামের এক তন্ত্রবিদ্যাপটিয়সী গৃহকর্ত্রী স্বয়ংবিদার সাথে পরিচয় হয় তার….. এরপর দু শো বছর পিছিয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ হলো – চন্দ্রগর্ভ, অবধূত, কুন্তলার সাথে৷

রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ জীবনের অর্থ সন্ধান করতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মহর্ষি জিতারির সাথে, পরে অবধূত অদ্বয়বজ্র নামে তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে তন্ত্রচক্রে পড়ে যান৷ রাহুলগুপ্তের শিষ্যত্বে তান্ত্রিক অভিষেক হয়। তার বাল্যসঙ্গী- প্রেমিকা কুন্তলা তাকে প্রত্যাখান করেন…..!

“যখন বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস,
নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধূলীকালীন মেঘ,
পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে,
আর পালতোলা নৌকা ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতধারায়….
সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে-
আমার কেশপাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থিনির্মিত মালাঃ
তখন… কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব…..
এ রূপে নয়। এ ভাবে নয়। এখানে আর নয়।”

এই কথা বলে মৃত্যুর নিঃসীম অন্ধকারে ডুব দিলেন কুন্তলা। জীবনে চলার পথ সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে, প্রিয়তমা কে হারানোর পর একের পর দুঃস্বপ্ন দেখে বেরিয়ে পড়লেন অনন্তের উদ্দেশ্যে। ওদন্তপুরী মহাবিহারের অধ্যক্ষ আচার্য শীলরক্ষিতের সাক্ষাতে তার জীবনের প্রকৃত পথ সন্ধানে তিনি ব্রতী হোন। এক বৈশাখী তিথিতে চন্দ্রগর্ভকে শ্রামণ্যে দীক্ষিত করেন পণ্ডিত – ভিক্ষু শীলরক্ষিত। শ্রামণ্যের প্রতিজ্ঞাবাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে চন্দ্রগর্ভের অবসান হলো, জন্ম নিলো অতীশ দীপংকর…… চিরজাগ্রত জ্ঞানদীপ যার হৃদয়কন্দরে সতত দেদীপ্যমান!

এরপর আবার ফিরে আসা যাক্ বর্তমানে, যেখানে বাংলাদেশের বিক্রমপুরের অনঙ্গ দাস নামের এক কৃষকের জমি থেকে পাওয়া এক কাঠের বাক্স উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু অধিকার করে বসে। রহস্য আবৃত সেই শ্যাওলা পড়া কাষ্ঠপেটিকার অভ্যন্তরস্থ পুঁথি এবং ধাতব মূর্তির রহস্য সমাধানের দায়িত্ব পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি হয়ে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার গবেষক কলকাতা নিবাসী সম্যক ঘোঘের হাতে, পেলিওগ্রাফি অর্থাৎ ঐতিহাসিক হাতের লেখা নিয়ে পড়াশোনা যার ক্ষেত্র…. তিনি সেই দায় ন্যস্ত করেন অমিতায়ুধ এবং শ্রীপর্ণার ওপর। অমিতায়ুধ সেই দায়িত্ব সযত্নে রক্ষা করতে তড়িঘড়ি বাংলাদেশ যান। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” প্রত্যক্ষ করার উদ্দেশ্য নিয়ে গেলেন বটে কিন্তু পরিচয় হলো কৃষককন্যা জাহ্নবীর সাথে, যেই কথাগুলো শুনিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে ছিলো হাজার বছর আগের এক নারী – কুন্তলা, সেই কথাগুলোই পূর্ববঙ্গীয় সতেজ উচ্চারণে ভটিয়ালির সুরে গান হয়ে ফেরে জাহ্নবীর কণ্ঠে। অমিতায়ুধ তার প্রত্যক্ষদর্শী।

IMG_20190506_143012~2.jpg

মোতালেব মিঁয়ার বাড়িতে বসাবাস কালে উৎসুক্যের দরুণ অমিতায়ুধ আবিষ্কার করে ফেলেন এক অপার্থিব গুঢ় স্থান, পৃথিবীর সমগ্র জাদু-বাস্তবতা থেকে তা অনেক গভীরে, লোকচক্ষুর অনেক আড়ালে তা বিরাজমান….. কালের চক্রে অতীতে গিয়ে সে দৃশ্য দেখতো পেলেন পাঠককুল৷ অমিতায়ুধ উদ্ধার করলেন – ‘শ্বেততারা’, পাথরনির্মিত! কাষ্ঠপেটিকার অবিকল প্রতিরূপ…! সাথে সহস্র শতাব্দী প্রাচীন একটি পুঁথিও, নাম – “করুণকুন্তলাকথা”!

অতঃপর ঔপন্যাসিক পরিচয় করালেন এ কাহিনীর কাহিনীকারের সাথে, শাওন বসু – যার ঐন্দ্রজালিক লেখনীর ওপর ভর করে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক সাহসী মিলনে সৃষ্টি হয় অসাধারণ বিচ্ছুরণ…..! অতীশ দীপংকরের মহিমান্বিত গাথা দৃষ্টিগোচরে আসে পাঠকের। তিব্বত লামা চাগ্ লোচাবা আচম্বিত চুম্বন প্রাপ্ত হোন বাঙালি কুলবধূ স্বয়ংবিদার ওষ্ঠ হতে, বিষ চুম্বনে মুর্ছায়িত হয়ে চাগ্ এর সময় পশ্চাৎ প্রসারণ করলো দুইশত বছর, ধ্বনিত হলো – ” বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি…ধম্মং শরণং গচ্ছামি…”

অধুনাকালের প্রত্নতত্ত্ববিদ অমিতায়ুধ মোতালেব মিয়াঁর বাড়ির এক সুড়ঙ্গ পথে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে খু্ঁজে পেলেন আরো একটি মূর্তি, কাঠের মূর্তি, আরও একটি প্রতিরূপ। বজ্রাসন বিহারে যেই মূর্তিটি দীপংকর তিব্বত যাত্রার পূর্বে পাঠিয়েছিলেন তার জন্মস্থানে, অমিতায়ুধের কাছে পুরোটা পরিস্কার হলো এবার, সমাধান হলো সুড়ঙ্গ পথের গভীর প্যাটার্ন, আশ্চর্য যোগাযোগ পন্থা। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” র রহস্য অমিতায়ুধের দ্বারা পুরোপুরি সমধান করে ফেললেন কাহিনীকার শাওন বসু৷ কিন্তু বাকি থেকে গেলো সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া ধাতব আইকনটি…!

ভারতবর্ষের বিক্রমশীলে অধ্যাপনাকালে অতীশ দীপংকর ভারতবর্ষকে বহিরাগতদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে রাজাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের বার্তা দেন, সে কথা উপন্যাসে গল্প আকারে সুন্দরভাবে বর্ণিত- নয়পাল ও চেদীরাজ কর্ণের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনে দীপংকরের এক অসামান্য দিক তুলে ধরেছেন কাহিনীকার৷ মধ্য তিব্বতীয় সম্রাট এশেওদের আমন্ত্রণে অতীশ দীপংকর পাড়ি দেন তিব্বত অভিমুখে, তিব্বতীয় অনুবাদক বিনয়ধর, বীর্যসিংহ, অতীশের ভাই শ্রীগর্ভ, সচীব পরহিতভদ্র কে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় সে যাত্রা….! আর সর্বক্ষণের সঙ্গী সেই কাষ্ঠপেটিকা, যা শৈশব থেকে তার সাথে আছে– ধাতব মূর্তির সেই কাঠের বাক্স, সেই বাক্স চাগ্ লোচাবার হাত দিয়ে নালন্দায় পাঠিয়ে দেন তিনি। সেই বাক্সই কালক্রমে অনঙ্গ দাসের জমি থেকে উদ্ধার হয়।

এই তিন মূর্তির সন্ধানের পাশাপাশি কশেরুকা অস্থিমালা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে…! কালের সংস্থাপনে আবার উঠে আসে সেই মন্ত্র, যা ধ্বনিত হয়েছিল অতলস্পর্শী আত্মবিসর্জনের মুহূর্তে কুন্তলার মুখে, বীর্যসিংহ জীবনের শেষ মুহুর্তে যা উচ্চারণ করেছিলেন, সেই গাথার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে বিলম্ব হলো দীপংকরের৷ তখনই শ্বেত কশেরুকার মালাটি চাগ্ কে দান করেন অতীশ যা তিনি পেয়েছেন সেই সুন্দর মুহুর্তে…! এই কশেরুকা যে স্বয়ংবিদার প্রতি তার (চাগ্) গুরুদক্ষিণা স্বরূপ….। তার সাথে সযত্নে রক্ষিত কাষ্ঠপেটিকাটি ও চাগের হাতে দিয়ে ভারতে প্রেরণের ব্যবস্থা করতে বলেন…..! গোটা কাহিনীর অজস্র শব্দমালায় এবার মৃন্ময়ী প্রতিমা, দারুমূর্তি এবং ধাতব আইকন — সব কিছুকে ছাপিয়ে দীপংকরের ভাষ্যে উঠে আসে সেই অমোঘ চিরভাষ্য….. চাগের সেই প্রশ্নের উত্তরে পরিচিত হই রক্তমাংসের মানুষ, এক বাৎসল্যকরুণ হৃদয় – বিশিষ্ট অর্থের অতীশ এর সাথে পরিচিত হয় চাগ্… পরিচিত হই আমরা।

চাগ্ বিমূঢ়ৎ বললেন, “এ মূর্তিতে আপনার আর প্রয়োজন নাই?”
নিঃসংশয়িত প্রত্যয়ে অতীশ উচ্চারণ করলেন, “না, আমার আর প্রয়োজন নাই। আজ দ্বিপ্রহরে এক বালিকাকে দর্শন করে, তার অনাবিল স্নেহের স্পর্শ পেয়ে আমি বুঝেছি, আমি কাষ্ঠ, মৃত্তিকা বা ধাতু নই; আমি মানুষ। আমি শুধু স্নেহবুভুক্ষু অপার এক সত্তা। শুধু সকাতর এক মাতৃহৃদয়। ….. আমি সেই আবর্তমান উচ্ছ্বসিত কারুণ্যব্যাকুলতা…।”

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

নেথাং বিহারের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটিয়ে দেন অতীশ। তাঁর সমাধির ওপর নির্মিত মন্দির কালের নিয়মে জঙ্গলাকীর্ণ আজ। অতীশের তিব্বতীয় শিষ্য ব্রোম্ তোন্ পা জন্ম দেন নতুন এক সম্প্রদায়ের, কাদম্পা থেকে গেলুক্পা হয়ে সেই সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু যাকে আমরা দলাই লামা বলি তিনিও একদিন চিনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ভারতে চলে আসেন।

নগর পত্তন হয়েছে, পুঁথি হারিয়েছে অজস্র- অগুন্তি, হাজার বছর আগেকার সেই ইতিহাসের আক্রমণকারীরা আজও আছে বেঁচে পৃথিবীর বুকে….তার সাথে শাশ্বত থাকবে দীপংকরের মতো শ্রমণরা, যারা হিংসে নয়, প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে দুর্জ্ঞেয় কে জয় করেছেন, মানুষের মনুষ্যত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন বারংবার…..যেখানেই গিয়েছেন চেষ্টা করেছেন শান্তির বার্তা দিতে….!!

লেখকের মতে অতীত – বর্তমান – ভবিষ্যৎ বলে আলাদা কিছু নেই, যুগপৎ প্রবাহমান। একই সমতলে অঙ্কিত পরস্পরছেদী তিনটি বৃত্ত– ঐ তিনটি বৃত্তের ছেদবিন্দু গুলিতে কোনো বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে এক যুগের চরিত্রগুলি পরিচিত হবে অন্য যুগের চরিত্রের সাথে৷ শুধু তাই নয়, ঘটবে বিনিময়ও। বেশ জটিলতর একটি কৌশলে বিষয়টিকে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করা গিয়েছে বলে মনে করি৷ এক সাথে তিনটি গল্প সমান্তরালে চলছে, লেখক প্রস্তাবনাতেই সে কথা বলেছেন এবং আরো সহজবোধ্য যাতে হয় তার জন্য তিনটি আলাদা সময় কে প্রতিটি পরিচ্ছদেই তুলে ধরেছেন। সময় বিশেষে তাদের ভাষা তুলে ধরেছেন৷
দশম-একাদশ শতক, ত্রয়োদশ শতক এবং সাম্প্রতিক কালে বিচরণের পর তাই অভিভূত হয়ে যেতে হয় অসামাণ্য লেখনশৈলীর জন্য, উপন্যাস পড়তে পড়তেই তাই নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে হয় বারবার। নিজেকেও পিছিয়ে যেতে হয় পৃষ্ঠা উল্টিয়ে। তিন যুগ ধরে পরস্পরছেদী নায়িকাদের সাথে তাই বারবার দেখা হয়ে যায়, বুঝতে তবু সুবিধে হয় না তাদের চাওয়া-পাওয়া…! অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকি কখন তাদের প্রাপ্তি পূর্ণ হবে…..! শাওন বসুর কল্পলোকের চরিত্র অমিতায়ুধ, জাহ্নবী এরা বড্ড আপন হয়ে ওঠে তখন, শেষ হওয়ার পরেও তাই মেনে নিতে কিঞ্চিৎ দ্বিধা হয়। কি অসামান্য গবেষণা এবং অধ্যবসায় থাকলে এরকম উপন্যাস আসে তা বলাই বাহুল্য, ঠিক যেই কারণে আনন্দ পুরস্কার এর বাছাই পর্বে ঠাঁইও মিলে যায় লেখক সন্মাত্রানন্দ শোভনের……! কুর্ণিশ ওনাকে..! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “চৌথুপীর চর্যাপদ” পড়েছিলাম বলে এই উপন্যাসের অনেক শব্দার্থ বোঝা সম্ভবপর হয়েছে। বাংলা ভাষায় আজকাল ভালো উপন্যাস আর হয় না- এই গোছের মন্তব্য করে যারা বসে থাকেন তাদের জন্য এই উপন্যাস উপযুক্ত জবাব। লেখকে আরো ধন্যবাদ এই জন্য যে — এই গ্রন্থটিকে কেউ স্রেফ গল্পবই হিসেবে নিলে মস্ত বড়ো ভুল করবে….! এখানে কাহিনীর ধারা বিবরণী এবং শব্দের মনোরম ব্যবহার, লেখনশৈলী সবকিছুই পাঠককে বাধ্য করবে সময় নিয়ে পড়ার জন্য…..! পড়তে গিয়ে উঠে আসবে না জানা কত ইতিহাস…..! একটা পরিচ্ছদের পর আর একটা পরিচ্ছদ এমনভাবে সাজানো যে পড়তে পড়তে ব্রেক কষা বেশ দুঃসাধ্য….! শাওন বসুকে দিয়ে লেখক বলিয়ে নিয়েছেনও এ কাহিনী আরো বড়ো হয়ে যেত…. পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে গেলে পাঠকের বিরক্তির প্রকাশও কাম্য নয় অবশ্য….! সে সবের ধারেকাছে যাননি বলা ভুল, তবে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসেছেন সুকৌশলে….. অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য টাইম মেশিনে ভর করে আলেখ্যটিকে ছোটো করে ফেলেছেন লেখক৷ কয়েকটি ক্ষেত্রে এতো বিশেষ লেগেছে যে বারংবার পড়তে ইচ্ছে করেছে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের প্রতি কতটা ভালোবাসা এবং আনুগত্য থাকলে এরকম তিন টি আলাদা যুগে স্থানবিশেষে আলাদা রকম ভাষারীতি প্রয়োগ করে এরকম রচনা সম্ভব, সে কথা একজন সামন্য পাঠক হিসেবে কল্পনা করা দুঃসাধ্যই..!

হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে যাওয়া নাগরিক সভ্যতার, আজকের পৃথিবীকে জড়িয়ে ফেলেছেন সেই সময়বর্তিকায়….! তিন যুগের তিন নারীর প্রণয়কথায় , শাশ্বত নারীসত্তার জন্মজন্মান্তরে  চিত্রায়িত এই উপন্যাস তাই বাংলা ভাষায় অতীশ অনুসন্ধান এর এক অনন্য ইতিবৃত্ত, এক অসামান্য আলেখ্য, যা বাংলা ভাষার একটি সম্পদ হিসেবে ঠাঁই করে নেবে বলে আশা রাখি৷

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা”
লেখক – সন্মাত্রানন্দ শোভন
ধানসিড়ি
দাম – ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা – ৩৫৯

***************************************

© শুভঙ্কর দত্ত  || May 6, 2019

 

চর্যাপদের খোঁজে চৌথুপীতে

চৌথুপী সঙ্ঘারামে মরণভয় ছড়িয়ে পড়েছে।
….
…….
মহাস্থবির চীবরের কটিবন্ধে হাত দিলেন, গ্রন্থাগারের কুঁজিতালের চাবি এখনও গেঁজেতে ঝুলছে। তবে এ কীভাবে সম্ভব? মহাস্থবির ক্ষিপ্রপদে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলেন এবং থরথর করে কেঁপে উঠলেন। মহামূল্যবান পুঁথির কাষ্ঠ-সিন্দুকগুলো সব উধাও!

—————————————————————

“চৌথুপীর চর্যাপদ” এর কাহিনীর শুরু এমনিই এক আকস্মিক ঘটনা দিয়ে। প্রাককথনে উল্লেখিত সময়কাল ১২০৫ অব্দ।

সত্যি বলতে গোটা উপন্যাসটি পড়ার পর এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি….. প্রথম পাতাটা দেখতেই নিজের ওপর যারপরনাই রাগ হলো, যে কথাটা প্রথম পাতায় লেখা আছে, আমি বেমালুম ভুলে গেলাম কি করে? ছ’মাস পেরোয়নি আমি “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়েছি, তা সত্ত্বেও কি করে পুরোপুরিভাবে ভুলে গেলাম যে এটিও একটি উপন্যাস, পড়তে পড়তে কাহিনীর গহ্বরে চলে গেছি, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢুকেপড়েছি চৌথুপীর সঙ্ঘারামে, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো ভুলেই গেছি আমি এক সামান্য পাঠক, পড়তে পড়তেই কখনো এর রূপ, কখনো ওর রূপের ছাঁচে বসিয়ে ফেলেছি নিজেকেই। যদিও এসব নতুন নয়, পাঁচমুড়ো পড়তে পড়তেই এসব হয়েছিলো… সেই “আমি যদি এটা হতাম”, ‘আমি যদি ওটা হতাম।’ এরকম ভাব।

  • যাই হোক্, এ গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই। পাঁচমুড়োর সাথে কিঞ্চিৎ মিল থাকলেও এই উপন্যাস আসলে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারের আর একটি অমূল্য রত্ন। পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গলকে যথাস্থানে রেখেই বলছি “চৌথুপীর চর্যাপদ” একটি সম্পূর্ণ রূপে গবেষণামূলক কাহিনী,যার পরতে পরতে আছে অসংখ্য তথ্য, এই বিপুল তথ্যসাগরে ভাসতে ভাসতেই পাঠক কখন যে সমান্তরালে চলতে থাকা দুটো কাহিনীর অন্দরমহলের প্রতিটি চরিত্রের সাথে পরিচয় সেরে নেবে, তা অনুমেয় নয়।
  • একসাথে দু’খানা কাহিনীর বুনোট সমান্তরালে চালিয়ে উপন্যাস এর গল্প বলা আগেও হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিশেষত্বটি কি?
    — কি আর? আপনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বইটির শিরোনাম দেখে কতকিছু ভেবে বসে থাকবেন, উপসংহার পড়ার পর ঠাহর হবে যে, আদতে আপনার কল্পনার প্রায় ৯৯ শতাংশই ভুল, মানে লেখক মশায়ের পাঁচমুড়ো না পড়া হলে তো, এরকম ভাবতে একরকম বাধ্য, তবে সেটা পড়া হওয়ার দরুণও আমায় আবার ঠকতে হলো বলা চলে।
  • একসাথে দুটো কাহিনী চালিয়ে যাওয়াটা মুখের কথা নয়, তাও আবার একটা এই এখনকার সময় আর একটা প্রায় ১২০০ অব্দ, তালগোল পাকালেই গেলো।
  • একটি পুঁথিকে কেন্দ্র করে একদিকে হাফি হাবিলদার, মামাজী, বিমলা, লামা, ছেত্রী, অর্জুন এবং যোজনগন্ধার তীব্র অনুসন্ধান। এবার আবার ভাষা হলো সিদ্ধম…..! কি অণুসন্ধান?
    প্রায় আটশো বছর আগের গন্ধকালী, শ্রীধর আচার্য, খু-স্তোনদের আগলে রাখা পুঁথি এবং তুরস্কদের কাহিনী। —- এই দুটো কাহিনীর সমান্তরাল সজ্জাতেই এ উপন্যাস এগিয়ে চলে।
  • কেন পড়বো?
    তার আগে বলি, এই উপন্যাসকে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে ধরলে মহাভুল। লেখক আগে একটা সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্য লিখেছিলেন, এবার একটা চর্যাপদ লিখে ফেললেন। কি? গাঁজাখুরি মনে হচ্ছে? পড়তে পড়তে অবশ্য এসব ভুলেই যাবেন।
  • এ কাহিনীতে অ্যাডভেঞ্চার কম নেই, আবার অতিশয় সিরিয়াস ইস্যুর মাঝে হাস্যরসের উপাদান নেহাত কম নেই, গুলি-বোমা-বারুদের গন্ধে মাখা বাতাস আছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা জাতির অত্যাচার আছে। কি নেই? থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চারের যুগলবন্দী, তার ওপর মন মাতানো সব তথ্য, যা জানলে রীতিমতো অবাক হয়ে যেতে হয়। তবে সবগুলো এমনভাবে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়েছে যে পড়তো পড়তেই এক অদ্ভূত মায়াজালে জড়িয়ে যেতে হয়। এ কাহিনী কিছুক্ষণ পড়ার পর অবশ্য মনে হতে পারে, যেন সিনেমা দেখছি! অবশ্য তা হলেও মন্দ হয় না।

 

IMG_20180629_144150~2
সিদ্ধম্

 

লেখকের পরিচয় নতুন করে কি বলবো? আগেও বলেছি, কতটা নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা থাকলে এরকম উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে উপহার দেওয়া যায় তাও বিদেশ বিভূইয়ে থেকে, সেটা জানতে গেলে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” এবং “ছিরিছাঁদ” এর সঙ্গে সঙ্গে “চৌথুপীর চর্যাপদ” ও পড়তে হবে। কতটা অধ্যবসায় এবং গবেষণা করলে এমনতর রত্নসমান আকর গ্রন্থ পড়ার সুযোগ পাই, তার জন্য সমগ্র বইটি পড়ার পর গ্রন্থতালিকাটি তে চোখ রাখলেই কিছুটা অনুমান করা যায়।

হ্যাঁ, এবার বলা যাক্, পুরো বইটি পড়ার পর কি এমন প্রশ্নের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। সেটা হলো, গল্পের সূত্রপাত কিভাবে হলো, এবং মহাস্থবিরের অনুপস্থিতিতে গল্পের নায়ক-নায়িকা যখন মহামূল্যবান পুঁথিগুলি তুরস্কদের নাগালের বাইরে আনয়ন করলো, তারপর কি হলো? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর ধরেই গল্পের সূত্রপাত। উপন্যাসের শুভারম্ভ।

এবার বলা যাক বইটির আকার নিয়ে। অনেকেই হয়তো সাড়ে চারশো পাতার বই হাতে নিয়েই বিরক্তও বোধ করবেন। তাদের জন্য সত্যিই দুঃখিত, লেখক বোধ করি, পাবলিক ডিম্যাণ্ড ভেবে বইটি লেখেননি, তাহলে হয়তো তিনি দুটি খণ্ডে বইটি প্রকাশ করতেন। আসলে এই চর্যাপদ সম্পূর্ণরূপে গবেষণামূলক একটি উপন্যাস। তবে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ার পর এটি নিয়ে বসলে রীতিমতো বিরক্তি লাগতে পারে, আমারও লেগেছে, তবে ঐ যে আবার বলতে হয়, শেষে গিয়ে অদ্ভূত রকমের আনন্দ লাগবে। কিন্তু সে আনন্দ আরো বেশি হতে পারে যদি পাঁচমুড়ো পড়ার পূর্বে এটা পড়া যায়। বইটি পড়া শুরু করলে যদিও পৃষ্ঠাসংখ্যা নেহাত লেস প্রায়োর মনে হবে, এখানেই লেখকের বাজিমাৎ। চরিত্রের নামকরণ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি মনে রাখার মতো সব নাম, এই উপন্যাসের নায়িকাদ্বয়ের নাম তো আবার বলেই দিলো যে কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে, অবশ্য পরে তা বলেও দিয়েছেন, সেটা কি?? – তা জানার জন্য একবার চৌথুপীতে গিয়ে ঘুরে আসায় শ্রেয়…. তবে ক্লু হিসাবে বলা যায় ঐ কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে বহু সিনেমা হয়েছে।

এটি লেখকের তিন নম্বর উপন্যাস, পাঁচমুড়োর প্রায় বছর দুয়েক পর এই উপন্যাস প্রকাশিত। অর্থাৎ লেখক সাহস পাচ্ছেন হয়তো তার পাঠকের আকুণ্ঠ পিপাসা দেখে। তাই আমাদেরও উচিৎ লেখকের এই গবেষণা-সাধনাকে কুর্নিশ জানানো তা সম্ভব – অবশ্যই অধিক পরিমাণ পাঠকের কাছে এই অসামান্য কাজের আলোকবর্তিকা বহন করা।

★★ ★ তবে এই বই পড়বো কেন তা নিয়ে লেখক গল্পের নায়িকা যোজনগন্ধার ভাষ্যে বলেছেন
যোজনগন্ধা ভাবল তার ওই জ্বরের ঘোরের মধ্যে পড়া গুহ্যচর্য্যায় কি সত্যি সত্যি ওই কাহিনি লেখা ছিল? নাকি সবই তার কল্পনাপ্রসূত ভাবসম্প্রসারণ, জ্বরের ঘোরের মধ্যে মনে ভেসে আসা অতীন্দ্রিয় জলছবি? কে জানে কোনটা সত্যি? তবে এটা সত্যি যে গন্ধকালী, খু্ স্তোন, শান্তভদ্র, তোন-পা’দের মতো নাম না জানা শত শত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী আটশ বছর আগে প্রাণের মায়া ত্যাগ তুচ্ছ করে কত মূলাবন পুঁথি বাঙলা থেকে তিব্বতে নিয়ে গিয়ে তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। যোজনগন্ধা ভাবছিল বাঙালিরা কেউ কি উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে আসবে সেই অমূল্য গ্রন্থগুলিকে ধুলো ঢাকা শবাধার থেকে বের করে আনতে?”

অবশ্য লেখক যোজনগন্ধার জবানবন্দীতেই বলিয়ে নিলেন – ” আমি এই কাজের দায়িত্ব নিলাম।”

সত্যিই তো, এই একই বার্তা বারবার দিয়ে চলেছেন লেখক…. বাংলা ভাষাটাই তো হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ঐ মহার্ঘ পুঁথি বা বাংলা ভাষার ইতিহাসকে রক্ষা করতে হলে এক দুটে গন্ধকালী বা যোজনগন্ধা, খু স্তোন বা হাফি হাবিলদার কি পাবো না?

IMG_20180629_144115

 © শুভঙ্কর দত্ত || June 30, 2018 

 

ছিরিছাঁদ থেকে ‘শ্রী’ এবং ‘ছন্দ’

‘কী দূরবস্থা! কোনো ছিরিছাঁদ নেই।’ পাশে বসা ময়লা ফতুয়া পরা লোকটা অবজ্ঞার স্বরে বলল, ‘ছিরিছাঁদ ছড়িয়ে আছে। শুধু চাই দেখার চোখ আর শোনার কান।’

 


IMG_20180127_183826~2

 

ব্যাস…. ওমনি গল্প শুরু! ছিরিছাঁদ যে কখন দ্বিখণ্ডিত হয়ে “শ্রী” এবং “ছন্দ” হয়ে গেলো, সেটাই ঠাহর হলো একদম শেষ পাতায়, সাথে পানু রিপোর্টার (গল্পের নায়ক) এর বিড়বিড়ানির মধ্য দিয়ে আক্ষেপ!

 

পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল পড়ে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। বুৃঁদ হয়েছিলাম আমেরিকা নিবাসী লেখকের বাংলা সাহিত্যের প্রতি নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় দেখে। আবার নতুন করে সম্মোহিত হওয়ার কোনো কথায় নেই যদিও!

এ গল্পেও টানটান উত্তেজনা, ভলিউম নিতান্তই কম হওয়ায় পাঠকের একটা আলাদা উদ্দীপনা কাজ করে। মাত্তর ১১০ পাতা, তাও মুখবন্ধ, আশীর্বাণী, সূচীপত্র, লেখকের কথা সব নিয়ে।

তবে পর পর দুটো উপন্যাস পড়ার পর আমার একটাই জিনিস বলতে ইচ্ছে করছে, লেখক মহাশয় যাদের নায়ক করছেন তারা কিন্তু বেশ সাধারন মানের। আগেরটাই “কালাচাঁদ”, এবার পানু রিপোর্টার! খুব ছাপোসা মানুষদের নায়ক করা হচ্ছে, এটা আমার বেশ ভালো লেগেছে।

আর এ বইয়ের সূচিপত্র দেখে অনেকে হয়তো অনেক কিছু ভাববে যে এটা গল্প সংকলন নাকি রে বাবা কিন্তু না , ভয়ের কোন কথা নেই। এটা নতুন স্টাইল, অন্তত আমার কাছে। এ গল্পের অন্যতম হিরো– নাম বলতে অপারগ, কারণ সূচিপত্রে একাধিকবার তিনি উদ্ভাসিত এবং তার বিভিন্ন নামে এক একটি পরিচ্ছদ, দু একটি বাদে! এবং এখানেই বিশেষত্ব।

 

IMG_20180125_234008
অনন্য সূচিপত্র

 

পাঁচমুড়োতে যেমন পঞ্চানন মঙ্গল লিখেছিলেন, এবারও শ্রীছন্দনিকেতনের খোঁজ করতে গিয়ে কখনো মন্দাক্রান্তা, কখনো ভুজঙ্গপ্রয়াত, কখনো চম্পক, কখনো দিগক্ষরা, কখনো একাবলী, কখনো তূণক, তোটক, রুচিরা, একপদী, দ্বিপদী, ত্রিপদী, চৌপদী, পঞ্চচামর, পয়ার, মালিনী, অনুপ্রাস— প্রভৃতি বিভিন্ন সংস্কৃত ছন্দের সফল আনয়ন ঘটিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে। এ বিষয়ে বেশি কিছু বলবার সাহস বা ধৃষ্টতা আমার নেই, যেহেতু শঙ্খ ঘোষ এবং সুধীর চক্রবর্তীর মতো মানুষরা মুখবন্ধ লিখে জানান দিয়েছেন।

 

IMG_20180127_142337~2
চ এ অনুপ্রাস

 

IMG_20180127_183948~2
অনুপ্রাস যখন পয়ারে

 

সত্যিই এ বই পড়লে নতুন করে ছন্দরসিক হতে ইচ্ছা হতেই পারে, বাংলা শব্দের প্রাচুর্য না থাকলেও সহজ সরলভাবে ছন্দ মিলিয়ে কাব্যসৃষ্টির হয়তো অণুপ্রেরণা জাগাবে কিন্তু তার আগে সবচেয়ে যেটা দরকার, সেটা হলো প্রবাসী বাঙালি ভদ্রলোকের নিবিড় অধ্যবসায় এবং গবেষণার এই উপন্যাস বা গ্রন্থকে সর্বাগ্রে পৌঁছে দেওয়া, বিশেষ করে উঠতি কবিদের কাছে।

আমার কাছে তো “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” এর মতো এটাও সংগ্রহশালায় খানিকটা জায়গা অধিগ্রহণ করে নিল।

সূর্যনাথ ভট্টাচার্য মহাশয়কে অনেক ধন্যবাদ, ফেসবুক মারফৎ যার থেকে আমি জানতে পারি।

কৃতজ্ঞতা বইচই ডট কম কে। উৎফুল্লচিত্তে স্বীকার করে নিচ্ছি, বেশ ভালো রকম প্যাকেজিং করেই আমায় পাঠানো হয়েছিলো!

সাধুবাদ জানাই প্রীতম বসু মহাশয়ের প্রচেষ্টাকে! সশ্রদ্ধ প্রণাম রইলো ওনার প্রতি…..

 

© শুভঙ্কর দত্ত || January 27,2017

“পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” – হদিশ না পাওয়া বাংলা ভাষার ‘মঙ্গলকাব্য’

পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল
প্রচ্ছদ: পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল

গল্পবই পড়াটা সেই কবে থেকেই অলিখিত শখ বানিয়েছি। তবে হালফিল পুজোসংখ্যাগুলির অত্যাধিক চাপে ওদের ভুলেই গেছিলাম, সঙ্গে রোজকার জীবনযাত্রার ব্যস্ততা তো আছেই! যদিও পুজোসংখ্যার হাত ধরেই সূর্যনাথ ভট্টাচার্য স্যারের সাথে ফেবু পরিচয়, আর তারপর এই বইয়ের সন্ধান। যাই হোক্, গৌরচন্দ্রিকা বর্জন করে এবার একটু এগোনো যাক।

বাংলা ভাষা হোক্, আর বাংলা সাহিত্য বেশ কয়েকটা পরিবর্তন এর মধ্য দিয়ে আজ এই জায়গায়। যদিও সব পর্যায় সম্পর্কে মাথা ঘামানোর অবকাশ আমার মতোই গল্পবইপ্রেমীর নেই! কিন্তু যিনি বা যারা বাংলা সাহিত্যকে ভালেবাসেন, চর্চা করেন, তারা এইসব নিয়ে মেতে থাকতেই পারেন।

বইয়ের পাতা ওল্টাতে শুরু করলেই গ্রন্থকার পরিচয় মেলে, আমেরিকা নিবাসী প্রীতম বসু, নিছক ভালোবাসার খাতিরেই এই বই লিখেছেন, এটা বলার মতো সাহস আমার নেই, তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি কতটা ভালোবাসা, কতটা টান আর কতটা গভীরতা থাকলে এমন উপন্যাস লেখা যায়, আমার কল্পনায় তো কুলোচ্ছে না।

বইটির স্বত্ব হয়তো নামিদামী প্রকাশনী কিনতে চায়নি, তাই লেখক মহাশয় নিজেই প্রকাশকের ভূমিকায়। কুর্নিশ জানাই ওনার সাহসকে, নইলে আমার মতো খুদে পাঠক যে বাংলা সাহিত্যের একটা অলিখিত রত্নকে আমার মহাফেজখানা থেকে বঞ্চিত করতাম।

—————————————————————

এবার আসি কাহিনীতে!

পড়তে পড়তে মুখপুস্তিকায় দু একবার পোস্টেছি, কিছু কেমন লিখিয়েদের প্রস্তাব দিয়েছি পড়ার জন্য। সবটাই ভালোলাগা থেকে।

কাহিনীর শুরু ১৯৯৬ সালের পাঁচমুড়োর জমিদার বাড়ির বৈঠনখানা দিয়ে। না, সিনেমার রিভিউ লিখতে বসিনি। আসলে প্রথম পাতাতে একটা প্রাককথন আছে, যা মূল কাহিনী থেকে পাঁচশো বছর পূর্বে।

বাংলা সাহিত্যের বয়স, কত হবে, মেরেকেটে হাজার কি দেড় হাজার বছর। তবে সে ভাষার রূপ-রস-গন্ধ-মাধুর্য-লাবণ্য তাকে যে যথেষ্টই বর্ণময় করেছে তার প্রমাণ পরতে পরতে পাওয়া যাবে শ্রী প্রীতম বসুর “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” উপন্যাসে। প্রাচীনকালের বঙ্গদেশ ও বাংলা ভাষার একটি নিটোল কথাচিত্র লেখক সুচারুরূপে তুলে ধরেছেন, যাতে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার বিভিন্নতা ও বৈশিষ্ট্য, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈদেশিক আক্রমণ, ভিন্নধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থান (হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম), ধর্মাচরণ, লোকাচার, যুদ্ধবিদ্যা, এ-সবই ধরা পড়েছে তাঁর একনিষ্ঠ লেখনীতে। এই আলেখ্যতে দুটি ভিন্ন সময়ের কাহিনীকে উপস্থাপন করেছেন নিজ আঙ্গিকে, এখানেই তার যত পারদর্শিতা, এখানেই ম্যাজিক আর তার একনিষ্ঠ মনোযোগের পরিচয়।

শুধুমাত্র বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে সুদুর প্রবাসে থেকেও যে এমন সুন্দরভাবে হদিশ না পাওয়া বাংলা ভাষাকে তুলে ধরা যায়, তা এই বই না পড়লে সত্যিই জানতাম না।

বললে হয়তো বিশ্বাস করতে হজম হবে নিউ ইয়র্কবাসী লেখক ১২০০-১৪৫০ অব্দের মধ্যেকার বাংলা ভাষাকে তুলে আনতে গিয়ে একটা আস্ত মঙ্গলকাব্য লিখে ফেলেছেন, বিশ্বাস হচ্ছে না! আরে আমি তো পুরোটা পড়ার পরও রীতিমতো বিড়ম্বিত ছিলাম। যেই মঙ্গলকাব্য একাধারে যেমন শিববন্দনা, অন্যদিকে তেমনি অঙ্কের ফর্মুলা, হ্যাঁ, এখানেই লেখকের কেরামতি।
কতটা নিষ্ঠা আর গবেষণা করলে এমন পরিশ্রমলব্ধ গ্রন্থ লেখা যায়,আমার তো নিজেকে পাঠক বলে ভাবলেই গর্ব হচ্ছে।

IMG_20180117_215533~2

 

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে যারা জ্ঞাত, তারা জানেন যে ১২০০ থেকে ১৪৫০ সালের এই প্রায় তিনশো বছরের বাংলা ভাষা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে, সে যুগের ভাষার আকার -আকৃতি, তার রূপ, তার চলন, লিপি, তখনকার সমাজ-সংস্কৃতি কেমন ছিলো তা জানার কোনো উপায়ও তেমন নেই বললেই হয়। লেখক দুঁদে গোয়েন্দার মতোই হদিশ না মেলা বাংলা সাহিত্যের সেই বিশেষ কয়েকটা বছরকে নিজ আঙ্গিকে, নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে রহস্য উদঘাটন করেছেন, আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, জুড়ে দিয়েছেন কতগুলো টুকরো ছবিকে, তাই “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” যেন জিগশ পাজল। তাই এই বই পড়ে এবং সংগ্রহে রেখে আমি অভিভূত, আমি আনন্দিত।

মঙ্গলকাব্যে শিববন্দনার নেপথ্যে গণিতের ব্যাখ্যা কখনো কখনো মাথা খারাপ করে দিতে পারে। কেউ হয়তো সে সব সত্য যাচাই করতে গিয়ে রাতের ঘুমও নষ্ট করতে পারে। এই বই পড়লে জানা-অজানা বহু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়। এমন কিছু সাধারন বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানা যায় যে, অবাক হতে হয়। লেখক প্রতিটা বিষয়কে বেশ বুদ্ধিমত্তার সাথে উপস্থাপন করেছেন, এবং বিষয়গুলি সহজেই মানবমস্তিস্কে রয়ে যায়। যেন গল্পদাদুর আসর।

কখনো পাঁচমুড়োর পটভূমিকায় কালাচাঁদ, সদানন্দ ভটচায, হরু ঠাকুর, বদন, ধাড়া, শেখ প্রভৃতিতে আবার মাঝে মাঝেই গল্পের ছলে কখন যে পাঁচশো বছর পিছিয়ে পাঠককে বেগবতীর তীরে পঞ্চমুন্ড গ্রামে, যেখানে নন্দীধন, জটামদন, জালালউদ্দিন, ভানুমতী, বলরাম উপস্থিত। কিন্তু এই দুই ভিন্ন সময় সারণীতে উপস্থিত হতে পাঠকের কোনরকম অসুবিধা হয় বলে মনে হয় না, তারিয়ে উপভোগ করলাম।
জানা যায় বেশ কিছু তথ্য!

আটশো শতকে ভারতীয় পণ্ডিতের হাত ধরে সুপ্রাচীণ গণিতশাস্ত্র পৌঁছায় বাগদাদের রাজসভায়, পশ্চিমী দুনিয়ার কাছে যার দৌলতে আরবরা নিজেদের অ্যালজেব্রার উদভাবক বলে জাহির করেন। আরবিতে অনুবাদ করা হয় সেই পুঁথিগুলির। সেই সূত্রেই পরবর্তীকালে অল-খোয়ারিজমি ‘ভারতের সংখ্যা দিয়ে গণনাপদ্ধতি’ ব্যবহার করে “অ্যালগরিদম”এর জনক হিসাবে পশ্চিমী দুনিয়ার কাছে পরিচিত হন (অল-খোয়ারিজম এর অপভ্রংশই আজকের অ্যালগরিদম) আর তারপর বক্তিয়ার খিলজি ভারতের গর্ব নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে আক্রমণ করেন এবং সুপরিকল্পিতভাবে তিন মাস ধরে পোড়ান হয় ভারতের মহামূল্যবান পুঁথিসমূহকে, যাতে কিনা ভারতের একান্ত নিজস্ব গণিতবিদ্যা আবিষ্কারের উজ্জ্বল ইতিহাস কালের গর্ভে চিরকালের মতো নিমজ্জিত হয়। জানতে পারি তখনই আবিষ্কৃত হয়ে গেছিল আলোর গতিবেগের পরিমাপ, ‘পাই’-এর মান, অ্যালজেব্রা, ত্রিকোণমিতি, দশমিকের ব্যবহার, পিথাগোরাসের থিওরেম – পিথাগোরাসের জন্মের দুশো বছর আগেই।

বইটি মনযোগ দিয়ে পড়লে জানা যায় ভারতবর্ষে প্রথম কামান বাবর প্রথম পানিপথের যুদ্ধে ব্যবহার করার অনেক পূর্বেই চতুর্দশ শতাব্দী থেকে ভারতে নানা যুদ্ধে কামান ব্যবহৃত হতো। যার পরিচায়ক স্বয়ং বিদ্যাপতি। পানিপথের যুদ্ধের অন্তড ন বছর পূর্বেই পতুগিজ শাসক প্রতিনিধি জোআঁ-ডি-সিলভেরা চট্টগ্রামের উপকূলের কাছে চালে-বোঝাই নৌকা দখল করলে তিনি চট্টগ্রামের শাসনকর্তা দ্বারা কামান দ্বারা প্রতিহত হন। এ ঘটনা বাবর তার আত্মজীবনী তেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে বাঙালিরা কামান দাগা এবং নৌ বিদ্যায় এগিয়ে। এই সব তথ্য অবশ্য লেখক মহাশয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পড়াশুনোর ফল, তা আলেখ্যর শেষে গ্রন্থপঞ্জিতপ চোখ রাখলেই বোঝা যায়।

তৎকালীন বাংলা লিপি যে ব্রাহ্মী লিপির পূর্বভারতীয় রূপ ‘কুটিলা’ থেকে উৎপন্ন হয়েছে তার ফরমেটিভ নমুনা এই গ্রন্থটিতে দেওয়ায় পাঠকের লিপিটি সম্বন্ধে ধারণা পরিষ্কার করবে। বাংলা লিপি যে দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আজকের চেহারায় পৌঁছেছে, কিংবা তার বর্ণ-বিন্যাস বা লেখায় নির্দিষ্ট কিছু বর্ণের ব্যবহারের আধিক্য – বিভিন্ন চরিত্রের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে লেখক তা অনায়াসে ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পচ্ছলে।

মঙ্গলকাব্যে দেবতার স্থানমাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক বিজ্ঞানমনস্কতাকে বিসর্জন দেননি। বদনের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন কিভাবে শিবলিঙ্গ ধোয়া জল খেয়ে গ্রামসুদ্ধ লোকের কালাজ্বর সেরে যায়। আসলে তার পেছনে নালন্দায় পড়াশোনা করা পুরোহিত নন্দীধনের চীন দেশের প্রাচুর্য এক ধাতব খণ্ডের কথা উল্লেখ করেছেন এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অর্থাৎ বাস্তব আঙ্গিকে যার সাথে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর ইউরিয়াস্টিবামিন নিয়ে রিসার্চের কথা বলেছেন, আসলে এই অ্যান্টিমনি বা স্টিবিয়াম (ল্যাটিন) চীনেই বেশি মেলে। তাই এই কালাজ্বর এর হাত থেকে বাঁচার আসল রসদ যে বিজ্ঞান তা পাঠককূলকে বলতে ভোলেননি, এটাও বলতে ভোলেননি যে, উ এন ব্রহ্মচারীর নাম দু বার নোবেল কমিটিতে রেকমেন্ড করাও হয়।

যে কোন মঙ্গলকাব্যেই দেবদেবীর মহিমা বর্ণনা করা হয়ে থাকে, একাধিক চরিত্রের ভিড়ে কখন যে সেটাও ফুটিয়ে তুললেন,তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভানুমতী আর বলরামকে অত্যাচারী জটামদনের হাত থেকে বাঁচতে পালাবার সময় বাবা পঞ্চানন বা পাঁচমুখওয়ালা শিব ঠাকুর মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে, কাব্যরূপে। পুরো কৃতিত্বই লেখকের।

শুরুতেই লেখক স্বীকার করে নিয়েছেন, এ নিছক কাল্পনিক কাহিনী, তবু তা লক্ষ্য না করে পড়তে শুরু করলে কেউ হয়তো সত্যি বলে ভাবতেও পারেন। “মঙ্গলকাব্য” শিরোনামে রচিত হলেও টানটান রহস্য আর ফিকশনের মড়কে এক অভূতপূর্ব আলেখ্য উপহার দিয়েছে শ্রী প্রীতম বসু। তাই বাংলা সাহিত্যের দিকে বিশেষ ঝোঁক না থাকলেও যারা অ্যাডভেঞ্চার বা রহস্য রোমাঞ্চ ভালোবাসেন, এ বই তাদের পিপাসও মেটাবে, আশা রাখি।

দেবাশীষ রায় এর প্রচ্ছদ প্রথম দেখাতেই “পাঁচমুড়োর মঞ্চাননমঙ্গল”কে অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়, মনে হয় যেন সেই সুপ্রাচীন বঙ্গসামজেরই কথকতা লুকিয়ে থাকবে ভিতরের পাতায়।

*****************************************

তবে শেষ করার আগে একটা কথা বলতেই হয়, নিজেদের পায়ে কুড়ুল মারা বাঙালি জাতির হারিয়ে যাওয়া, হদিশ না মেলা বাংলাভাষার যখন সফল পুনরুত্থানে একজন প্রবাসী বাঙালী মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন, যখন সুপ্রাচীন বাংলা সমাজ ও বাঙালির স্বরূপ উদঘাটনে এগিয়ে এসেছেন, তখন আমাদেরও উচিৎ তার এই মহৎ প্রচেষ্টাকে অভিবাদন জানানো, সাধুবাদ জানিয়ে সাগ্রহে তার নিরলস পরিশ্রমের দাম দেওয়া এবং তা সম্ভব একমাত্র নিজে পড়ে অবশ্যই নয়, সকলে মিলে পড়ে এবং অন্যদের পড়িয়ে।

সব শেষে বিজ্ঞান-সাহিত্য-সংস্কৃতি-দর্শন সবকিছু মেলবন্ধন ঘটানো বাংলা সাহিত্যের এই দলিল লেখকে অনেক অনেক প্রণাম জানাই হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে।

 

IMG_20180110_213729

 

অনলাইনে ঘরে বসে এই বই পেতে হলে এই লিংকের সাহায্য নিতে হবে। আমিও অনলাইনেই কিনেছি। 

https://www.boichoi.com/index.php?route=product/manufacturer/info&manufacturer_id=541

 

© শুভঙ্কর দত্ত || January 17, 2018