ধ্যান ‘চাঁদ’ ফিরে আসুন…

১৯৩৫ সাল…
অ্যাডিলেডে একটি হকি ম্যাচ চলছে… দর্শক আসনে স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান, একজনের খেলা দেখে উচ্ছ্বসিত! বললেন – “He scores goals like runs in cricket…”

যাকে নিয়ে বলছেন তিনি মেজর ধ্যানচাঁদ! অবশ্য নামটা আসলেই ধ্যান সিং ছিলো। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন Indian Army তে যোগ দিলেন, তখন প্রখর দৃষ্টিশক্তি আর রিফ্লেক্সের জন্য চাঁদের আলোয় প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। মজা করে সতীর্থরা নাম দিলেন ”চাঁদ”, সেই থেকেই ধ্যান চাঁদ, নামের পরের “সিংহ” উবে গেলো। কিন্তু তার খেলা থেকে উড়লো না….! ছোটো থেকেই ধ্যানজ্ঞান ছিলো হকি স্টিকটা! পেয়ে গেলেন একটা রেজিমেন্টও, তখন চুটিয়ে হকি খেলা হতো সেখানে, হতো প্রতিযোগীতাও৷ কিভাবে সুযোগকে কাজে লাগাতে হয় সেটা ধ্যানচাঁদ শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। প্রথমে সুযোগ পেলেন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে, ব্যস্, নজর পড়লো জাতীয় নির্বাচকদের৷ চললেন কিউইদের দেশে, দুই ডজন থেকে মাত্র চারটে গোল কম করে সেই যে দ্বৈরথ শুরু হলো…. বাকিটা ইতিহাস৷ দেশে ফেরামত্রই আগে পেলেন Lance Nayak এর পদ।

খবরে…

আমস্টারডাম, অলিম্পিক – ১৯২৮
বেশ কিছু মাস আগে একটা খেলায় ইংল্যান্ড কে হারিয়ে দেওয়ায় ব্রিটিশরা কুটনীতি করে আমস্টারডামে ভারতীয় হকি দলকে পাঠালেন না, বেশ টালবাহানার পরে অবশ্য সেটা হয়। অবশ্য ১৯২৪ এর প্যারিস অলিম্পিকে পরিকাঠামোর অভাবে হকি রাখা না হলেও ১৯০৮ আর ১৯২০ এই দুবারই সোনার পদকটা পেয়েছিলো ব্রিটেনই! সুতরাং তাদের একটা ভয় ছিলোই। ভারতীয় দল প্র্যাক্টিস ম্যাচ থেকেই নজর কাড়তে শুরু করে। প্রথম ম্যাচ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ৬-০ তে জয়। তারপর একে একে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড এবং ফাইনালে ডাচরা! জয়ী ভারত! ধ্যানচাঁদ গোটা টুর্নামেন্টে করলেন ১৪ টা গোল। স্থানীয় সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হলো – “This is not a game of hockey, but magic. Dhyan Chand is, in fact, the magician of hockey.” এটাই অলিম্পিকে ভারতের প্রথম সোনা জয় এবং কোনো গোল হজম না করেই!

আমস্টারডামে প্রথমবার সোনার ছেলেরা

১৯৩২, লস অ্যাঞ্জেলস

প্রথম ম্যাচে জাপানকে ১১-১, ফাইনালে আমেরিকাকে ২৪-১…. এতো গোলের ফুলঝুরি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। সহোদর Roop Singh কে সঙ্গে নিয়ে দুই জনে মিলে গোল করলেন ২৫ টা। ক্রীড়াজগৎ আখ্যা দিলো Hockey Twins. দ্বিতীয় সোনা ভারতের সেই হকির হাত ধরেই।

Dhayn Roop Singh – the Hockey Twins

এরপর অধিনায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৩৩ সালে ভারতীয় হকির অন্যতম সম্মানজনক Beighton Cup এ Jhansi Heroes কে জেতান, পরেও অনেকবার বলেছেন সে ম্যাচটাই তার জীবনের প্রিয় ম্যাচ ছিলো, Calcutta Customs এর বিরুদ্ধে। তিনি বলতেন – If anybody asked me which was the best match that I played in, I will unhesitatingly say that it was the 1933 Beighton Cup final between Calcutta Customs and Jhansi Heroes. Calcutta Customs was a great side those days; they had Shaukat Ali, Asad Ali, Claude Deefholts, Seaman, Mohsin, and many others who were then in the first flight of Indian hockey.”

The Golen Era of Indian Sports

১৯৩৬ অলিম্পিক, আসর এবার বার্লিন, হিটলারের দেশে

বিভিন্ন দেশকে ৪০ টা গোল দিয়ে, একটিও হজম না করে ধ্যানচাঁদের ভারত ফাইনালে। গোটা বার্লিন শহর ভারতীয় দলের সাফল্য নিয়ে মজে গেলো। পোস্টারে ছয়লাপ সে শহরে – “Visit the hockey stadium to watch the Indian magician Dhyan Chand in action.” গোটা য়ুরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক উপস্থিত…। বলা হতে লাগলো – “The Olympic Complex now has a magic show too”.
ফাইনালে প্রতিপক্ষ – জার্মানি যারা ভারতকে প্র্যাকটিস ম্যাচে ৪-১ গোলে হারিয়েছিলো, একটু চিন্তিত ছিলো ভারতীয় শিবির। দলের ম্যানেজার পঙ্কজ গুপ্তা তখনকার দিনের একটা পতাকা আনলেন, যেটা জাতীয় কংগ্রেস ব্যবহার করতো, ত্রিরঞ্জিত! তেতে উঠলেন খেলোয়াড়রা! শুরু হলো খেলা! স্টেডিয়ামে অ্যাডলফ হিটলার! প্রথমার্ধে জার্মান গোলকিপারের সঙ্গে জোর সংঘর্ষে দাঁত খোয়ালেন ধ্যানচাঁদ, কিন্তু দমে যাননি! সতীর্থদের বললেন – ওদের উচিৎশিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে বল কন্ট্রোল করতে হয় ওদের শিখিয়ে দেবো৷ প্রথমার্ধে একটু আটকে রাখতে পারলেও, দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো সেই ধুন্ধুমার খেলা, নিজেদের অর্ধ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করলো জার্মানরা…. নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো The Wizard এবং কোম্পানি! ৮-১ গোলে জয় এলো, ফাইনাল জেতার হ্যাটট্রিক করে পরপর তৃতীয় বারের জন্য সোনা পেলো ভারত। উল্লেখযোগ্য অবদান দুইভাই ধ্যানচাঁদ সিং আর রুপ সিং এর।

The Wizard
হিটলারের দেশে সোনাজয়ী দল

এরপরেই সেই বিখ্যাত কথোপকথন, যা আজও ধ্যানচাঁদ কে নিয়ে কথা হলে বলতেই হয়। হিটলার এবং ম্যাজিশিয়ানের মধ্যে–

That conversation between Dhyan Chand & Hitler

হিটলারের প্রস্তাবের সামনেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে কথা বলেছেন তিনি৷ আবার বেশ মজার হলেও কোনো খেলায় গোল না করতে পারলে অভিযোগ জানাতেন গোলপোস্ট এর মাপ নিয়ে এবং দেখা যেতো যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তেমন ভুলটাই হয়েছে। ১৯২৬ থেকে ১৯৪৮ এর বর্ণময় কেরিয়ারে প্রায় ৪০০ র বেশি গোল করেছেন তিনি৷ তাঁর সম্মানার্থে দিল্লীর জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের নাম ২০০২ সালে পরিবর্তন করে করা হয়েছে Dhyan Chand National Hockey Stadium, দেশের বাইরেও এরকম নামকরণ হয়েছে৷ লন্ডনে একটি টিউব স্টেশন আছে তাঁর নামে, জিমখানা ক্লাবেও তিনি উজ্জ্বল অক্ষরে বিরাজমান। হকির জাদুকর বা ম্যাজিশিয়ানের জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই প্রতি বছর এই দিনটিকে ভারতবর্ষে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়, দেশের প্রতিটি কোণা থেকে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বদের পুরস্কার প্রদান করা হয় তাদের সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম গৌরবান্বিত করার জন্যে….

ধ্যান চাঁদ স্টেডিয়াম
রেজিমেন্টে…

১৯৫৬ সালে ভারতীয় আর্মি ছাড়ছেন যখন তখন তিনি ‘মেজর’…. আজ যখন ভারতীয় টিম অলিম্পিকে জায়গা পেতে হিমশিম খেয়ে যায়, তখন আমরা তাঁকে আমাদের দিবাস্বপ্নে অনুভব করতে চাই, করে ফেলি হয়তো…. তিনি শুধু সোনাই দেননি, এটাও বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন যে – হকি খেলেও বিশ্বে নাম কুড়ানো যায়। Happy Birthday, the Wizard!

ঝাঁসির এক পাহাড় চূড়োয়…

তথ্যসূত্র – কথোপকথন https://www.storypick.com/hitler-and-major-dhyan-chand/

ফিচার ইমেজ – Suchita Karmakar 🙏

© শুভঙ্কর দত্ত ✍ || August 29, 2020

“অনল অন্তরাল” – পর্দার ওপারের ইতিহাসের জীবন্ত দলিল…

শেখর স্যারের সাথে পরিচয় আসলে ঝাড়গ্রামের সূত্রে৷ তখন মাস্টার্স করছি ওখানে। স্যারের লেখাপত্র পড়েছি কিন্তু জানতাম না উনি আমার কলেজেরই অধ্যাপক। তারপর আমার ঘোরাঘুরির জন্য বিভিন্ন সময় পরামর্শ নিতে হয়েছে।

শারদীয়া আনন্দবাজার ১৪২৭ এ উপন্যাস তালিকায় শেখর মুখোপাধ্যায় নামটা দেখে তাই অপেক্ষা করতে পারিনি। হাতে পাওয়া মাত্রই শুরু করে দিই। বেশ বড়ো উপন্যাস এবং খুব সহজ নয় আবার! তার সবচেয়ে বড়ো কারণ চরিত্রের ভিড়…! অনেক কিছুই জীবনে অপাঠ্য আমার, তবুও বলতে দ্বিধা নেই যে এই কাহিনীতে ঘটনার ঘনঘটা আর চরিত্রের প্রাচুর্য আমি আর কোনো উপন্যাসে পড়িনি৷ তাও প্রথম থেকে একদম শেষ পর্যন্ত অদ্ভুৎ মাদকতায় আমি পড়েছি। রাত জেগে পড়েছি, পড়ে ঘুমিয়েছি আবার উঠে পড়েছি। এরকম তিনবার নিয়ে বসতে হয়েছে! আর শেষ দিকে তো প্রবল টান, যেনো ভাঁটার টান। অনেক কথা বললাম, উপন্যাসের নামটা বলা হয়নি, — “অনল অন্তরাল”! সভ্যতা কালক্রমে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু সমাজ – সভ্যতার পর্দা ক্রমশ পিছিয়ে গিয়েছে…. অতলস্পর্শী যে সে! সূর্যাস্তের পরে যেমন অন্ধকার নেমে আসে, রাঙা আলোর ওপারের গল্প অজানা! সেরকমই পর্দাপতিত হলেই নেমে আসে আঁধার! অজানা থেকে যায় ওপারের ঘটনাপ্রবাহ! লেখকের কলমে উঠে আসে যবনিকার পেছনে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা, কালের নিয়মে একদিন যা এগিয়ে নিয়ে এসেছে আমাদের আর নিজেরা রয়ে গিয়েছে পেছনে!

কাল বললে আবার সাল-তারিখ বলতে হয়। তবে এ উপন্যাসের কাহিনী আজ থেকে প্রায় তিনশো বছর আগের এবং এখনও হয়তো প্রবাহমান! পড়তে যখন শুরু করেছিলাম তখন এর বিশালতা বুঝতে পারিনি, কি হতে চলেছে আন্দাজ করতে পারিনি৷

একজন সাড়া ফেলেদেওয়া, মরণাপন্ন লেখকের বহুদিনের গবেষণার উপন্যাস সমাপ্ত করার ডাক পড়ে অমিতজ্যোতি নামের এক নবাগতর কাছে…. শয্যাশায়ী রেবন্ত রায় তাকে সবকিছু হস্তগত করেন! এরপর এই কাঁচা লেখকের উপন্যাস যাত্রা শুরু হয়। উপন্যাসের শুরুয়াত যে সময় দিয়ে সেটা ১৭৩২ সাল! এবার ল্যাপটপে উপন্যাসের গল্প টাইপিং এর মাধ্যমে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে চলতে থাকে পুরো গল্প!
ক্ষমা করবেন, এর চেয়ে বেশি কিছু বলা অসম্ভব।
আসলে গল্পটা একটা বহু দিন আগের এক সম্পর্কের সূত্র খোঁজা!
তবে গোটা কাহিনীতে সে কালের কোন দিকটা তুলে ধরেননি লেখক, আমি সেটা ভাবছি! কত রকমের গান হতো, সে সবও উল্লেখ আছে। হরু ঠাকুর এর নাম আছে! বললাম তো কে নেই এখানে…!
তার সাথে আছে জটিল থেকে জটিলতর সম্পর্কের বুনোট যা মানে না দেশ কালের বেড়াজাল। সতীদাহ থেকে শুরু করে বিধবা বিবাহ – কি নেই সেখানে? এরকম বাস্তব প্রেক্ষাপটের গল্প! যেদিকেই যাই চেনা চেনা গন্ধ! পারাং নদী? সেও চেনা! শোভাবাজার রাজবাড়ি? সেও চিনি! আসলে ইতিহাস টুকরো টুকরো! তারই বা দোষ কোথায়? যে যার গুছিয়ে নিয়ে বাকি ফেলে রেখে দিয়েছে, সেই তো ইতিহাস, সেই তো হেরিটেজ!
নবাব আলিবর্দি থেকে শুরু করে হেস্টিংস – ক্যানিং কে নেই? রবার্ট ক্লাইভ! ডিরোজিও — সব্বাই! নাম নিতে গেলে এ লেখা উপন্যাসের এক তৃতীয়াংশ হয়ে যেতে পারে! নতুন করে অনেক কিছু জেনেছি! কিছুদিন আগে গৌতম ভট্টাচার্যের “বারপুজো” পড়ে বলেছিলাম যে এই বইটাকে কোলকাতার লোকজন আপন করে নেবে, এক্ষেত্রেও তাই! পুরনো কলকাতার আরো একটা দলিল হয়ে থাকবে হয়তো। যেমন জেনেছি ছড়াগুলোর মানে! “গোবিন্দরামের ছড়ি, উমিচাঁদের দাড়ি, নকু ধরের কড়ি, মথুর সেনের বাড়ি!” সেরকমই জেনেছি কিভাবে মেদিনীপুর আলিবর্দি খাঁ এর সাথে জড়িত! জেনেছি নবকৃষ্ণ দেবের রাজা হওয়ার গল্প, জেনেছি বহুবাজার থেকে বউবাজারের গল্প! শোভাবাজার রাজবাড়িতে বলি বন্ধ হওয়ার গল্প!আরও অনেক কিছুই! বলে হয়তো শেষ করা যাবে না। গল্প জেনে গেলেও তথ্য জানতে বইটা আবার পড়া যেতে পারে!

সবচেয়ে ভালো লাগার কারণ, গল্পের স্টাইল! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ি, পড়ার পর বুঝতে পারি – সবটাই লেখকের মস্তিষ্কপ্রসূত, শুধু টুকরো টুকরো ইতিহাসটুকু সত্যি। এক্ষেত্রে অমিতজ্যোতির ভাষ্যে যতটা বলা হয়েছে, ততটার কতটা সত্য সে আমি জানি না, তবে ইতিহাসের এতো চরিত্রের ভিড়ে, এতো গল্পের ভিড়েও এক অদ্ভুৎ নেশার ঘোরে চুবিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে “অনল অন্তরাল”! এত সব ঘটনার মাঝে একবারও বিরক্ত লাগেনি! আসলে এভাবে ইতিহাস পড়ার সৌভাগ্য হয়নি৷ আমাদের আনাচে কানাচের গলিপথে যদি এতো অচেনা অজানা গল্প লুকিয়ে থাকে, তার আস্বাদ নিতে কার না ভালো লাগে? অন্তত যেখানে পরীক্ষা দেওয়ার মতো যাতনা থাকে না….!

কতগুলো জিনিসের জন্যে আমি কুর্নিশ জানাবো ঔপন্যাসিককে….
এক, তিনি পুরো বছর আড়াইশোর ঘটনাকে টুকরো টুকরো ইতিহাস দিয়ে দারুন কোলাজ বানিয়েছেন, মাঝে মাঝে নিয়ে এসেছেন আজকের দিনে!

দুই, এমন কাহিনী লিখতে গেলে কতটা অধ্যবসায় প্রয়োজন হয়, তা গল্পের পরতে পরতে যে কোনো পাঠক অনুভব করতে পারবেন!

তিন, গল্প একটা নির্দিষ্ট ক্রোনোলজি কে ফলো করে গেলেও তার দেওয়া তিনটি বংশপুঁজি না দিলে পাঠকের কালঘাম ছুটে যেতো, অবশ্য এই উপন্যাসের পাঠকদেরও কম পরিশ্রম করতে হবে বলে মনে হয় না। এই দিক থেকে পুরোমাত্রাই জড়িয়ে রাখতে সক্ষম…. যে যত বেশি জড়াবে সে তত পিছনে তাকাবে।

চার, শিল্পী অমিতাভ চন্দ্রের অলংকরণ! এমন চমৎকার অলংকরণ বারংবার মনে করিয়ে দেয় পাঠক ভুলে গেলেও! তবে আরও দু তিনখানা তুলির টান থাকলে দারুন লাগতো।

আমাদের চেনা পরিধির মধ্যেও এমন অনেক হয়তো গল্প রয়েছে যা আবহমান কাল ধরেই পর্দার ওপারে…..! অবশ্য এমন পর্দা ফাঁসে অদম্য ইচ্ছে লাগে…. অবশ্য সূত্রও লাগে তার জন্যে….! আবার সে অনলে দগ্ধ হওয়ার ভয় থাকলেও চলে না। “অনল অন্তরাল”, প্রায় তিন শতকের একটা শহরের বিস্মৃত ইতিহাসের জীবন্ত একখণ্ড দলিল হয়ে বেঁচে থাকুক বাঙালির হৃদয়ে….একজন ক্ষুদ্র পাঠক হিসেবে এই কামনা করি! প্রণাম জানাই স্যারকে…. তার অধ্যবসায়কে নতমস্তকে আবারও কুর্নিশ! তবে এবার হয়তো শালধোয়ানিয়ার জন্য অসংখ্য রেবন্ত রায় গজাবে, আর আপনাকে তাগাদা দেবে! যাই হোক্ আপাতত মলাটবন্দী অবস্থায় চাই এই উপন্যাসকে!

তবে এ উপন্যাস পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে জনৈক কবির উক্তিটি – ”যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন..!”অবশ্য এরকম মনে হওয়ার কারণ অজানা।

পুনশ্চঃ সাবর্ণ রায়চৌধুরীর কথা বলেছেন। এই মানুষটির সাথে মনে হয় মন্দিরময় পাথরার যোগসূত্র আছে।

© শুভঙ্কর দত্ত || August 25, 2020

প্রেমের উপহার : গল্প হলেও সত্যি…

সিনেমার শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফিরবেন। মাঝে বোনের বাড়িতে দেখা করে যাবেন পরিচালক মশাই..!
গল্পটা সুদূর আমেরিকার৷ নিউইয়র্ক থেকে ফিলাডেলফিয়া তে যাচ্ছিলেন, ট্রেনের সেই যাত্রাপথের একবার থেমে যাওয়া যে তার জীবনে এতো কিছু দিয়ে যাবে, সেকথা বোধ হয় ভাবেননি তিনি। আর ভাববেনই বা কি করে, অদূর ভবিষ্যৎ দেখা যায় নাকি??? সবাই কি আর “প্রিডেস্টিনেশন” এর অধিকারী হতে পারেন নাকি? সবার মগজে টাইম মেশিন এর ফর্মুলা ইনপুট করা আছে….!

পরিচালকের নাম – রিচার্ড লিঙ্কল্যাটার, তখনও ফিল্মজগতে চুনোপুঁটি হিসেবেই পরিচিত। সালটা ১৯৮৯, সবে “Slacker” সিনেমার শ্যুটিং শেষ করে ফিরছেন, ভাবলেন ফিলাডেলফিয়া তে একরাত কাটিয়ে নেবেন। একটা খেলনার দোকানে একটি মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয় তার। নাম – অ্যামি লেরহাউপ্ট, আমেরিকা থেকে ইউরোপ যাবে সে। বেশ কয়েক ঘন্টা হেঁটে হেঁটে গল্প করেন তারা, সিনেমা-রাজনীতি-মিডিয়া সব কিছু উঠে আসে সেই সব কথোপকথনে। প্রেমে পড়ে যান দুজনে, রিচার্ডের হোটেলেই রাত কাটান দুজনে। যেটা স্মরণীয় হয়ে যায় দুজনের কাছেই। পরের দিন সকাল হতেই বিদায় জানাতে হয় একে অপরকে, ফোন নম্বরও এদিক-ওদিক হয় দুজনের মধ্যে। ঠিক হয় ছ’মাস অন্তর একবার করে এই একই স্টেশনে দেখা করবেন তারা, কিন্তু পরিচালক মশাই কাজের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে গেলে সেসব আর হয় কি করে….! ফোনে কথা হয়েছিলো খুব কম বারই। তারপর কেটে গেছে অনেক গুলো বছর…..!!
রিচার্ডের কথা মতো “that long distance thing”…. স্বভাবতই সে প্রেম আর রইলো না।

ভাবলেন মেয়েটিও হয়তো ভুলে গেছে সে কথা, মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের পেশাকে পন্থা হিসেবে বেছে নিলেন। সিনেমা বানাবেন সেই সাক্ষাৎ এর ওপর নির্ভর করে, যদি কোনদিন দেখে অ্যামি, তাহলে হয়তো বুঝতে পারবে যে সেই এক রাতের ভালোবাসা এখনও আছে অটুট, মনের গভীরে, অন্তরালে।
ইথান হক, জুলি ডেলপি কে নেওয়া হলো, স্ক্রিপ্টেও সাহায্য করলেন, জুলি ডেলপি এমনিতেই স্ক্রিপ্ট রাইটার, চিত্রনাট্যতে অবদান রাখলেন কিম ক্রিজান, বিখ্যাত আমেরিকান মহিলা …!

সিনেমার শ্যুটিং হলো পুরো ভিয়েনাকেই কেন বেছে নিলেন? তার মনে হয়েছিলো সিনেমাটির জন্য খুব ন্যাচেরাল এটা- এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেটা জানিয়েছিলেন। ১৯৯৫ এ রিলিজ করলো ” Before Sunrise”…. একদম “from midnight until six in the morning” এর কথা মাথায় রেখেই এমন নাম।
ছবি খুব একটা যে রোজগার করতে পারলো এমন নয়, কিন্তু যত দিন যেতে থাকলো, মানুষের মনে ভালো লাগা জন্মালো এই সিনেমা নিয়ে। রিচার্ড ততদিনে জীবনসঙ্গী পেয়ে গেছেন৷

Before Sunrise
মনোহারি কথোপকথন….@ Before Sunrise

এই সিনেমা টা এখনও বেশ কিছু ওয়েবসাইট, সিনেমাপ্রেমীরা সেরা প্রেমের সিনেমার তালিকায় রাখেন। বিশেষ করে কথোপকথন গুলো মন দিয়ে শোনার মতো….. এমন একটা জায়গায় গিয়ে শেষ হয়, যেখান থেকে দর্শকদের চার পাঁচ রকম জিজ্ঞাসা উঠে আসে, সে সব না হয় সিনেমাটা যারা এখনও দেখেননি তারাই দেখে বুঝে নেবেন। কিন্তু কথাটা হলো অ্যামি কি আদৌ পারলো এটা দেখতে??? জানা গেলো না৷ 

(সিনেমাতে যদিও ফোন নম্বর আদান প্রদানের কথা এড়িয়ে যাওয়া হয় চিত্রনাট্যের খাতিরেই) 

সিকুয়েল এর ভাবনা এলো। এবারেও স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে জুলি জায়গা পেলেন না।
রিচার্ড ভাবলেন, সাক্ষাৎ তো হলো না, যদি হতো কেমন হতো , সে সব ব্যাপার নিয়ে আরো দুটো ফিল্ম বানাবেন- ঠিক হলো। যেখানে ছেড়ে গিয়েছিলেন হাফ ডজন উৎকণ্ঠা জড়ানো প্রশ্ন নিয়ে একদম অন্য জায়গা থেকে শুরু করলেন পরের ফিল্মটা — “Before Sunset” — জেসে (ইথান হক) সেই রাতের কথা স্মরণ করে বই লিখে ইউরোপে ফেমাস হয়ে গেছেন… প্যারিসের একটি বুক স্টোরে তারই পাঠ চলছে আর দেখলেন সেলিন (ডেলপি) বাইরে…! তারপর আবার গল্প,আবার কথোপকথন, আবার সেই রাতের উত্থাপন….! কখনও রাস্তায়, কখনো ফেরিতে….! লেখক তার কনফারেন্সের ফ্লাইট মিস করবেন??? সেলিনের কথা – “Baby you are going to miss the plane” দিয়ে শেষ হলো সিনেমা…..সূর্যাস্ত আর হলোই না। আবারও প্রশ্ন গুচ্ছেক। বাজিমাৎ করলেন পরিচালক।

Before Sunset
পথচলতি গল্পরা @ Before Sunset

পরের ফিল্ম৷ ২০১৩ “Before Midnight” এবার গ্রীস। সেলিনের আর তার দুই জমজ মেয়ে আছে। কেটে গিয়েছে প্রায় দশটা বছর। গ্রীসে গরমের ছুটি কাটাতে গিয়েছেন তারা….তারপর আবার কিছু গল্প, বয়স বাড়ার সাথে তাতে তিক্ততা যুক্ত হলো। এবার উত্তপ্ত কথোপকথন, পরিচালকের “Before Trilogy” র শেষ পর্যায় এটা। অসম্ভব রকমের, অন্য ধরনের কথোপকথন দিয়ে শেষ হলো সিনেমা। এবার হয়তো কোন প্রশ্ন আর পড়ে রইলো না, আগের দুটোর সাথে তুলনা করতে করতে অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই বেশ কিছু ব্যাপার অনুভূত হতে থাকারই কথা, যে যে বয়সে দেখবেন এই সিনেমা,তার সেই রকম ফিলিং আসার কথা, রিচার্ড একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন –

“I always said that the movie was a litmus test for how you view romance.” (New York Times, 2004)!

Before Midnight
এবার গল্প বলার পালা অন্যদেরকে @ Before Midnight

 

এতো দূর তো ঠিক আছে। কিন্তু…. তিন বছর একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক্, ২০১৩ থেকে। অর্থাৎ ২০১০ তখন।  ইতিমধ্যে বিখ্যাত তিনটি সিনেমা  অ্যামির এক বান্ধবী দেখেন…! বুঝতে অসুবিধা রইলো না। অনেক চেষ্টার পর পরিচালকের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তখনই জানা যায় যে অ্যামি লেরহাউপ্ট ১৯৯৪ এ একটি মোটরকার দুর্ঘটনায় মারা যান, সিনেমা শ্যুটিং শুরুর ঠিক এক মাস আগে…..! ভাবা যায়। উনি চেপে দিলেন পুরো ব্যাপারটাকে।
২০১৩ তে Before Midnight এ আর কিছু বাকি রাখলেন না৷ শেষ পর্যন্ত দেখলে, দর্শক প্রথমবারের জন্য দেখতে পাবেন Dedicated to…… AMY LEHRHAUPT…..
স্ক্রিপ্টের জন্য জায়গা পেলেন জুলি ডেলপিও।

তবে কিছুটা অবাক করার হলেও এই সিনেমা বানানোর কথা পরিচালক তাদের প্রথম সাক্ষাতেই জানিয়েছিলেন তার প্রেমিকাকে।

Even as that experience was going on … I was like, “I’m gonna make a film about this.” And she was like, “What ‘this’? What’re you talking about?” And I was like, “Just this. This feeling. This thing that’s going on between us.”

সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন ঘটনাটা খুব দুঃখেরই ছিলো।

ভালোবাসার স্মারকটাই অ্যামি দেখে যেতে পারেনি….সত্যি এমনও হয়….!
সব গল্প তাই গল্প নয়, সত্যিও হয়….! এভাবেই বারবার “গল্প হলেও সত্যি”…….. সত্যিই হয়ে যায়। কুর্নিশ!!


© শুভঙ্কর দত্ত || April 21, 2019 

তথ্যসূত্র : https://slate.com/culture/2013/05/before-sunrise-inspiration-before-midnight-is-dedicated-to-amy-lehrhaupt-who-inspired-the-series.html

__________________________________________

★ সম্প্রতি পুড়ে যাওয়া নটরে ডাম চার্চ নিয়ে ভবিষ্যৎবাণীটা বড়োই মনে করিয়ে দেয় সিনেমাটাকে

20190416_122524
কথায় কথায় নটরে ডাম চার্চ @ Before Sunset

চলো গাড়ি বেলপাহাড়ী, হালকা করে ঘাটশিলা

চলো গাড়ি বেলপাহাড়ী……!
সেই ছোটোবেলায় খেলতাম যেসব বুলি আউড়ে, তার মধ্যে এটা একটা ছিলো। তখন জানতামও না যে বেলপাহাড়ী কদ্দূরে…শুধু পরে জেনেছি যে আমার বাড়ি থেকে বেশ দূরেই। পরে আরো যখন বড়ো হলাম, একটু আধটু ঘুরতে শিখলাম, তারও পরে ফেসবুকে যখন ছবি দেখলাম তখন ইচ্ছেটা আরো বেড়ে গেলো। একবার প্ল্যান করেও যাওয়া হলো না, অবশ্য সে ইতিহাস গোপণ থাকাই শ্রেয়। তারপর এলো এই সেই দিনটা….ঠিক আগের বছরের পুনরাবৃত্তি..! এবারও আগের বারের মতো একটা ফোন এলো ঘুরতে যাওয়ার অফার নিয়ে (মুফতে না তো অবশ্যই), জানতামই যে তারা বেলপাহাড়ী যাচ্ছে। অতঃপর ভেবে কোনো কাম নাই। সাগরেদকেও বলা হলো। বেরিয়ে পড়লাম বছরের একদম পেনাল্টি সপ্তাহে….!

মেদিনীপুর থেকে যাত্রা শুরু হলো ঠিকঠাক সময়েই। বেলপাহাড়ী পৌছানোর আগে অবশ্য শিলদাতে চপ-মুড়ি-বেগুনী সাঁটানো হলো। বেলপাহাড়ী গিয়ে কাঙ্খিত রুমে পৌঁছে ব্যাগ রেখেই বেরিয়ে পড়লাম।

  • পাহাড়ে ঘেরা লালজল

প্রথমেই লালজল….বাঁশপাহাড়ীর দিকে এগিয়ে চলতো থাকলো স্করপিওটা….দু পসারী ঘন সবুজ জঙ্গলটাকে পেছনে ফেলে যত এগোচ্ছি মখমলের মতো রাস্তা ধরে ততই মুগ্ধতার চাদরে নিজেদেরকে ঢেকে ফেলছিলাম, তখনও পৌঁছইনি, কিন্তু পথে গাড়ি থামিয়ে টুকটাক শ্যুটিং হলো শুরু। যানবাহনের দৌরাত্ম্য কম….! শ্যুটিং শেষে পৌঁছালাম লালজল…! পাহাড় না গ্রাম? লালজল আদপে একটা পাহাড়ঘেরা ছোট্ট গ্রাম, যার মূল উপজীব্য হলো লালজল দেবী আর লালজল পাহাড়ের আদিম গুহা। শীতের দুপুরেও উঠতে বেশ কসরত করতে হলো, গুহা পেরিয়ে উঠলাম একদম শিখরে…..সুবিস্তৃত বনরাশির আদরে চোখ মুখ তখনের মতো থ….! লালজলের সম্বন্ধে জানাতে গেলে সে অনেক কথাই বলতে হয়….! আনন্দবাজারের লিংক দিয়ে দেওয়ায় শ্রেয়…! বলে রাখা ভালো যে এখানের ঝরনার জল লাল বলেই এরকম নামকরণ।

img_20181229_121258
লালজল দেবীর মন্দির

img_20181229_120625
গুহা মুখ

img_20181229_114446
লালজল গ্রাম

  • পরিযায়ীদের ঠিকানা – খাঁদারানী ঝিল 

লিস্টে এখন অনেক নাম কিন্তু আাপাতত খাঁদারানী ঝিল…! জংলী ঝাঁকুনির রাস্তাকে হেলায় হারিয়ে দিয়ে পৌঁছালাম ঝিল…! খাঁদারানী ঝিল, যদিও কয়েকদিন আগেই এসেছিলাম একবার। সেতুবন্ধন পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম ওপারে….বিড়ি পাতার গাছ, বাবুই ঘাসের জঙ্গল (যা দিয়ে দড়ির খাট বানানো হয়)….দেখা পেলাম ঝিলের স্থায়ী বাসিন্দা পাতাঝাঁঝিদের, হ্যাঁ সেই ক্লাস সেভেন এইটে পড়া পতঙ্গভুক উদ্ভিদের অন্যতম….! নিরালা নিস্তব্ধ খাঁদারানী, যেখানে এখনো বিদ্যুত বিভাগের আশীর্বাদ পৌঁছায়নি, তাই মাইকের জন্য সৌরকোশও ভরসা কারো কারো কাছে, লাল শালু আর পাতাঝাঁঝি ভরা ঝিলের মাঝে একটা দ্বীপ রয়েছে, যেখানে দেশ-দেশান্তর থেকে অনেক পরিযায়ীরা আসে, তাদের কুহুতানে গোটা ঝিলে পিকনিকরত লোকজনের এতটুকু বোরিং লাগার কথা নয়। ওপার থেকে পিছিয়ে আসতেই চোখে পড়লো– সবুজের উচ্চতাকে হার মানিয়ে ওঠা একা পাহাড়ের শিখর…! কি নাম তার??
গাডরাসিনী পাহাড়…..! উফফ্ কখন যাবো???

img_20181214_113215_hdr
প্লাস্টিক মুক্ত

img_20181229_125132
উঁকি মারে

img_20181214_110103_hdr
ঝিলের সেতু

img_20181214_142109
মাঝে আছে ছোট্ট দ্বীপ

img_20181214_142929_hdr
পাতাঝাঁঝির জঙ্গলে

img_20181214_113244_hdr
সচেতন হোন

img_20181214_130407_hdr
বিড়ি পাতার গাছ – কেন্দু

img_20181214_125950_hdr
বাবুই ঘাসের পাড়ায়

নাহহহহ ততক্ষণে জ্বালানি ভাণ্ডারে কুচকাওয়াজ চলতে শুরু করেছে অনবরত..! অতএব আহারাদি সারা যাক্। বেলপাহাড়ী ফিরে গিয়ে ‘তৃপ্তি’ তে তৃপ্তিভরে খেলাম। একটু জিরিয়েই আবার ঐ পথ ধরেই পরের গন্তব্য…..

  • গর্জাস গাডরাসিনী পাহাড় 

পৌঁছে গেলাম গাডরাসিনী পাহাড়ের কোলে। আশ্রম পেরিয়ে সোজা চড়াই এর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ন’জন আরোহী…! ওঠা শুরু হলো। অবশ্য বড়ো পাহাড়ে ওঠার রিহার্সালটা সেই লালজল দিয়েই হয়েছিলো। পাহাড়ে একপ্রস্ত ওঠার পর একটা বিশ্রামের জায়গা মিললো, একটা মন্দির, কি মন্দির, সেসব দেখার সময় কোথায়? এগিয়ে গেলাম আরে উচ্চতার দিকে। এরপর উচ্চতায়, একদম। পুরো বেলপাহাড়ী উঠে এলো চোখের সামনে, সে যে কি মনোরম দৃশ্য, স্বভাবতই একজন সঙ্গী বলছিলো -“সবকিছু ক্যামেরা ধরতে পারে না।” সত্যিই তাই, সে যে কি নৈসর্গিক রূপ, তা বোধহয় প্রত্যক্ষ না করলে বোঝা সম্ভব ছিলো না৷ পাহাড় থেকে যেদিক পানে চাই শুধুই….. যেনো সবুজ গালিচা বিছিয়ে তার ওপর দিয়ে প্রকৃতি হেঁটে বেড়াচ্ছে। রৌদ্র এর চোরাগোপ্তা আক্রমণ আরো গাম্ভীর্য্য বাড়িয়ে দিয়েছে পাহাড়ের গাছগুলোর৷ একটা গুহা যাওয়ার রাস্তার দিকনির্দেশ দেখে নেমে গেলাম। গাছের শিকড়ের কম্ম স্বরূপ আবহবিকারের ফলে যে গুহার সৃষ্টি তার ভেতর যে লোকাচারের পুজা চালু তা একটু পরেই বোঝা গেলো। ওপরে উঠে যেতেই সঙ্গী সাথীদের চোখে পড়লো, পড়লাম। পতাকা নির্দেশিত জায়গাটায় গিয়ে দেখি একখানা রিভার্সিবিল রিঅ্যাকশন হবো হবো করছে….মানে? কি আর…! এবার গাডরাসিনীর মাথা থেকে খাঁদারানীর সর্পিল পথ – স্পষ্ট দেখা মিললো।
নামতে ইচ্ছে করছিলো না, ঘড়ির ছোট কাঁটা কখন চারের ঘাড়ে গিয়ে চুমু খেয়েছে বুঝতেই পারিনি, কম কনট্রাস্ট এর ভানুবাবুর কায়দাতে পাহাড়টা বাঘা বাঘা টুরিস্ট স্পটকে তখন বলে বলে গোল দিচ্ছে…! রোজই দেয়। নেমে এসে আশ্রমের কলের জলে মুখটা ধুলাম, এতো ভারী আর মুলায়েম জল, মনে হলো চানটাই সেরে ফেলি…! এবার…..

img_20181214_164702
অতএব…

img_20181229_145529
চলা শুরু

img_20181229_152622
আবহবিকার @ গাছের শিকড়

img_20181229_152852
ছবির মতোই

img_20181229_153903
সুন্দরী খাঁদারানী – গাডরাসিনীর কোলে

img_20181229_154719
শিখর জয়ের পতাকা

img_20181229_153039
পড়ন্ত বেলায়

pano_20181229_155249
প্যানোরামা তে

  • বনের আঙিনায় ঘাগরা

ঘাগরা….! জলের আঘাত পাওয়া পাথরের বুক চিরে সবুজ নীলচে জলরাশি এগিয়ে চলেছে অনামি কোন মহাপ্রস্থানের পথে। ঝুর ঝুর শব্দে ফেনিল স্রোতস্বিনীকে হার মানিয়ে কখনো প্রকট হয়ে উঠছে শব্দদানবের হাঙ্গামা….! তাতে কি? আদিগন্ত বনানীর আঙিনা জুড়ে থাকা প্রবাহমান এই স্রোত এতটাই ম্রিয়মান যে জলপ্রপাত বলতে কেউ কেউ হয়তো রাগ করবেন বা দু এক মিনিট খিল্লি করতে পারেন। জলের তলায় আজব সব আঁকিবুঁকি। সবই ঐ জলরাশির ক্যালমা….পাথরগুলোকে খেয়ে খেয়ে এমন সব আলপণা….মনুষ্যসৃষ্ট কে হার তো মানাবেই, প্রকৃতি যেখানে ইঞ্জিনিয়ার।

img_20181229_170135
ফেনিল

img_20181229_170149
পাথরের বুক চিরে সবুজাভ জলরাশি

img_20181229_172610
জলের কায়দা

img_20181229_171659
ঘাগরা

img_20181229_171841
জলছবি

প্রায়ান্ধকার পরিস্থিতিতে আরো গাম্ভীর্য্য বেড়ে গেলো তার। ফিরতে হবে…! ফিরতি পথে এক মিষ্টি দোকানে গিয়ে নলেন গুড়ের রসোগোল্লা দিয়ে কিঞ্চিৎ উদরপূর্তি হলো। এবার সেই রুম।

 

রাতের মেনুতে কি আছে?
বেলপাহাড়ী স্পেশাল – শাল চিকেন… পুরো পাঁকশালা তৈরী করে, খাদ্যবস্তু প্রস্তুত…! রুটি দিয়ে দুমাদ্দুম সাঁটানো হলো। পড়ে রইলো কিছু, নিয়ে এসে মেদিনীপুর প্রিয় লোকজনদের আবদারে মুড়ি দিয়ে হলো ভুরিভোজ।

img_20181229_202303
রান্নার ঠিক পূর্বে : সরঞ্জাম

img_20181229_204511
আরো শীত বাক্সবন্দী কিছু ইচ্ছে আছে

  • নির্জন ঢাঙিকুসুমে সকালটা

সাত সকালে বেরুতে হবে। গন্তব্য – ঘাটশিলা, ভায়া কাকড়াঝোড়। ড্রাইভার চলে এসেছে, হন্তদন্ত করে বেরিয়ে পড়লাম। বেলপাহাড়ী স্পেশাল খেজুর রসকে অবহেলা করি এমন সাহস কার আছে? ড্রাইভারদা ভরসা, নিজে হাতে গড়িয়ে সে পানীয় গলাধঃকরণ করলাম। এবার যাবো ঢাঙিকুসুম। শুধু জানতাম একটা ঝর্ণা আছে, কি, কেমন সেসব জানতামই না। শহুরে জগৎ থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে এমন অখ্যাত একটা জায়গায় যে এতসুন্দর একটা ঝরণা আছে জানতামই না, মনে মনে ভাবছি বর্ষাকালে এর রূপ কেমন হতে পারে….! পাথুরে পথ দিয়ে যত এগোচ্ছি, বিস্তৃত বনরাশি ততই আলিঙ্গন জানিয়ে আরো গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় গিয়ে থেমে গেলাম, শ্যুটিং স্পট। বেশ কিছুক্ষণ চললো রোল-ক্যামেরা,আরে না না অ্যাকশনের জন্য পয়সা কই..! কিন্তু ঝরণা কোথায়..! দিকভ্রান্ত হইনি, হলে ভালো হতো। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি নীচের দিকে বয়ে যাচ্ছে জলরাশি….কুলুকুলু রবে তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে…..! এই তো সেই তাপগতিবিদ্যার চ্যাপ্টারে পড়া স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় এক্কেবারে বাস্তব – চাক্ষুষ উদাহরণ। আর ধরে কে…! হামাগুড়ি দিয়ে যেমন তেমন করে নীচে নামলাম….! আহহহহ কি দেখতে পুরো ঝরণাটা। গোটা ট্রিপে এমন জায়গা বোধ হয় আর কোনেটাকেই লাগেনি, লাগামছাড়া নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু আমরা কজন….! বসেই রইলাম কিছুক্ষণ। এবার আবার পাথুরে পথের নতিকে টেক্কা দিয়ে উঠে এলাম ওপরে…! যেতে হবে ঘাটশিলা। কাকড়াঝোড় পেরিয়ে ঘাটশিলা যাচ্ছি….! পথে পড়লো লাল শালুকের দীঘি, শাল-মহুল-কেন্দু গাছের সারি।

img_20181230_090904
টাটকা

img_20181230_104752
বয়ে চলে যায়

img_20181230_104118
ম্রিয়মান স্রোতস্বিনী

img_20181230_101324
এখন রাস্তা

img_20181230_085509
গুড় প্রস্তুতি

img_20181230_102506
ঢাঙিকুসুমে আমরা

  • ট্রাফিক জ্যামে ঘাটশিলা 

সে সব পরিয়ে পৌঁছালাম বুরুডি লেকে, বছর দেড়েক আগে এতো মানুষের ঢলানি তখনো শুরু হয়নি বুরুডির লেকে, এখন দোকান, হোটেল, লেকের জলে নৌবিহার, এসব তার বোরিং তকমা তুলে দিতে সাহায্য করলেও তার সৌন্দর্যের কিছু হ্রাস ঘটেছে, বইকি!!! ধারাগিরী যাওয়ার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম। লাঞ্চ সেরে নিলাম বুরুডিতেই। ওখান  থেকে স্টেশন যাবার পথে পড়লো অপুর স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি – “গৌরীকুঞ্জ”, স্থানীয় একটি ক্লাবের সৌজন্যে যা এখন ঝাড়খণ্ডের দর্শনীয় স্থান। দেখে নিলাম অপুর পাঠশালা, ঝাড়খণ্ডে বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলা স্কুলের থেকে কিছুটা অব্যহতি পেতে যেখানে এখনো আরণ্যক স্রষ্টার উত্তরপুরুষদের অর্থানুকূল্যে বাংলা শেখানো হয় বিনে পয়সায়।

বেরিয়ে এলাম, সুবর্ণরেখা ডাক দিলো। অগত্যা…কিছু অক্সিজেন নেওয়া গেলো। ট্রিপ শেষের মুখে, প্রহর গুনছে অপরাহ্ন, প্রহর গুনছি আমরাও…! যেতে হবে ঘাটশিলা স্টেশন, লক্ষ্য ইস্পাত এক্সপ্রেস, গাড়ির ড্রাইভার খুবই ক্লান্ত, তাই ট্রেন, আর ফিরতেও সুবিধে….! ঘাটশিলা স্টেশনে এসে ট্রেন পেতে একটা জায়গা পেলাম। ট্রেন তো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে……আমি চোখ বুজলাম। ফ্ল্যাশব্যাকে, ফেলে আসা দুটো দিন আর কয়েক শো ছবি….! পিছিয়ে যাচ্ছি আমি ক্রমশ৷

img_20181230_143051
অপুর পাঠশালা

img_20181230_143306
গৌরীকুঞ্জ

  • সিল্করুট বেলপাহাড়ী

এবার একটু রুট বলি। ঘুরতে যারা ভালোবাসেন, তারা বেলপাহাড়ীর জন্য একটা আলাদা দিন রাখুন। পুরোটা একদিনে ঘুরতে চাপ হয়ে যায়, তারপর তো আবার সেলফি তোলার হিড়িক রয়েইছেই। অতএব, এক রাত্রির কাটানোই ভালো, অন্তত যারা দূর থেকে আসবেন। বেলপাহাড়ী আসার এখন অনেক বাস, সরকারী বাসও প্রচুর। কলকাতা থেকে আসার জন্য ঘাটশিলা ট্রেন ধরে ঝাড়গ্রাম, তারপর বাসে বেলপাহাড়ী যাওয়াই যায়, তারজন্য সকাল সকাল আসতে হবে। থাকার জায়গার জন্য হোম স্টে পাবেন৷ হোম স্টের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন তারক কাকু মানে তারক দন্ডপাতকে৷ যোগাযোগ নম্বর- 9434453823…
বেলপাহাড়ী থেকে স্করপিও করতে হবে, ভাড়া নেবে ২৫০০ এর মতো। দূরত্ব নেহাত কম নয়,গুগল ম্যাপে ক্রশচেক করে নিতে পারেন। এটুকু বলতে পারি মাতালদের নৃত্যভূমি দীঘার চেয়ে কয়েকশো গুন ভালো। যাই হোক্ একটু দর কষাকষি করলে কমে যেতেও পারে, মোটামুটি পাঁচ-সাতজন গেলে খরচটা কম পড়বে৷ ঐ আর কি, মাথার সাথে খরচের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক। অবশ্য মোট খরচতো ধ্রুবকই৷

আমরা ঘোরার মাঝে শ্যুটিং এ মেতে

img_20181214_163525
ফিরতে হবে

img_20181230_161658
বাই বাই বেলপাহাড়ী

 

যাই হোক্, এতো না ভেবে বেরিয়ে যেতেই পারেন, ‘চলো গাড়ী বেলপাহাড়ী’ শৈশবের সেই লাইনটা না হয় এবার ভ্রমণের শিরোনামে ঠাঁই পাক্….!

 

©শুভঙ্কর দত্ত || January 4, 2019

প্রতিবিম্ব

‘আলো আমার আলো ওগো…..”
রবীন্দ্রসংগীত খুব পছন্দ করে বিতনু। গানটা ভেসে আসছে কানে, সদ্য উন্মীলিত চোখে এসে পড়লো সকালের রোদ্দুর, স্পষ্ট হলো আরো কিছু..! এতক্ষণ কানেই শুনছিলো সব, এবার দেখলো সব – ওর মা, ওর বোনকে। আরো একজনকে দেখার পর বিতনু বুঝলো গানের আওয়াজের উৎস কি! ওর প্রিয় স্যার নধর বাবু মানে নধর গুপ্ত… তারই মোবাইলে চলছে এই গান। স্যার ওর হাত ধরে বললো কিছু কথা, তারপরেই ও বুঝলো এটা হরিরামপুর ব্লক হাসপাতালেরই ওয়ার্ড রুম….যার একটা বেডে আপাতত ও শয্যাশায়ী।

বিতনু হরিরামপুর বনফুল হাইস্কুলের ক্লাস সেভেনের ছাত্র…! বুদ্ধি সুদ্ধির কথা পরেই হবে, বেশ ভালো ফুটবল খেলে ছেলেটি, শুধু খেলে না, বেশ জয়ের একটা গন্ধ নিয়ে মাঠে নামে। তো সেদিনও ক্লাস এইট বনাম সেভেনের ম্যাচ চলছে….! ঘন বর্ষায় কর্দমাক্ত মাঠটায় ফুটবল স্কিল তো দূরস্থ, খেলাটা যে কতটা রিস্কের সেটা আর না বললেও হয়, তবে মজাটায় আলাদা। এ হেন বর্ষায় ফুটবল না হলে যে ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’ মিথে কুঠারাঘাত করা হবে। মাঠে বাঁশি মুখে দায়িত্ব পালন করছিলেন ইতিহাসের স্যার, অসীম বাবু মানে অসীম সরকার, যিনি আবার ছেলেপুলেদের কাছে ইনফিনিটি গভর্ণমেন্ট নামে বিখ্যাত, নেহাত ভালো ইংরেজী জানা ছাত্রছাত্রী রয়েছে , নইলে যে কি নাম জুটতো, কে জানে।

যখন বিশ্বের বাঘা বাঘা রেফারিরা সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে হলুদ আর লাল কার্ড পকেটস্থ করে আসেন, অসীম বাবু হাতে লাঠি নিয়ে নামেন (মুখে বাঁশি তো রইলই) জঘন্য ফাউলের জন্য একটি প্রহার আর ফুটবল ভুলে কেউ হাতবল খেললে তিন ঘা। সেদিন খেলা হচ্ছিলো ক্লাস সেভেন বনাম ক্লাস এইট এর। ক্লাস এইটের হয়ে তেকাঠির নীচে একহাতে গ্লাভস পরেই দুটো অনবদ্য সেভ করে বনফুল স্কুলের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দিশা দেখিয়েছিলো, কানু, সতীর্থরা কান (অলিভার কান এর অপভ্রংশ) বলতে অবশ্যি কার্পণ্য করে না। তবে কানুর করা সেভ দুখানি বেশ কাজে লাগে, পূর্বনির্ধারিত তিরিশ মিনিটের প্রথমার্ধে সেভেন বিতনুর করা গোলে এগিয়ে যায়, গোল পরিশোধ করে দেয় এইট প্রথমার্ধের একদম শেষে। যদিও সে গোল নিয়ে দ্বন্দ্ব বেঁধে যায়, স্কুলের উল্টোদিকের কালুর দোকান থেকে ডিমভাজার গন্ধ নাকি অসীমবাবুর নাসিকারন্ধ্রে প্রবেশ করায় ওনার বাঁশি বাজাতে লেট হয়ে যায়। ওদিকে লাইসম্যান এর দায়িত্বে থাকা ইলেভেনের পাঁচু সরখেলের নাকি ছুটতে গিয়ে কাদা ছিটকে তার নিজের চোখে ঢুকে যায়, এমতাবস্থায় ঝোপ বুঝে কোপ মারতে এক সেকেণ্ডও লেট করেনি এইটের দীর্ঘদেহী রবিন, না না এ সে হুডওয়ালা রবিন নয়। ক্লাস সেভেনের গোলকিপার অ্যান্টনি সরেনের আবেদন মাঠেই মারা যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বিতনুর সতীর্থ ফরোয়ার্ড সম্রাটকে আটকাতে গিয়ে পেনাল্টি পেয়ে বসে ক্লাস সেভেন। পেনাল্টি কিকটা কার নেওয়ার কথা ছিলো সম্রাটেরই, কিন্তু দলগত সিদ্ধান্তে স্কোরার বিতনুর ওপর সেই দায়িত্ব ন্যস্ত করে সেভেনের কোচ সেভেনের ডাকাবুকো ছাত্র আবদুল্লা! সেই পেনাল্টিতে অবশ্য স্কোরবোর্ডের আহামরি কিছু পরিবর্তন হয়নি। তখনও খেলা প্রায় মিনিট পাঁচেক বাকি, ফ্রি কিক পাই সেভেন, ১-১ স্কোর বোর্ডের খানেক তর্জমার জন্য গোলপোস্ট থেকে অনতিদূর থেকে ফ্রি-কিকের জন্য সম্রাটই সেরা, গোলপোস্টে এইটের চাইনিজ ওয়ালের কাছে ঘোরাঘুরি করছে বিতনু ও তার ছ-সাত সতীর্থ, তার মধ্যে হেডে গোল দেওয়ায় ওস্তাদ বাহাদুর ওরফে ফড়িং (লাফাতে পারায় এসব নাম) ছুটে এসে পেনিট্রেট করবে। এ হেন পরিস্থিতিতে অসীম বাবু আদ্যিকালের ঘড়িটা একপ্রস্থ দেখে নিয়ে বাঁশিতে ফুঁ দেওয়া মাত্র শট এলো, আর সঙ্গে সঙ্গে চাইনিজ ওয়ালের সামনে থাকা বিতনু লুটিয়ে পড়লো। কানের পাশ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে সবুজ ঘাসের রঙ গেলো পাল্টে, রক্ত লাগলো মাথায়, কানমুথোটাই বলটা লেগেছে ওর। কানু তার কানগোড়াটাই ‘বিতনু’, ‘বিতনু’ বলে অনেকবার চিৎকার করলো…..! জীবন বিজ্ঞানের দিদিমণি কাকলি ম্যাম ওকে বড্ড ভালোবাসে, অনেক বার ডাকেও যখন উঠলো না ও, উনি কেঁদেই ফেললেন, নির্দ্বিধায় ওর মাথাটা তুলে নিলেন নিজের কোলে। ক্রন্দনরোল অবশ্য খুব বেশি ছড়ানোর পূর্বেই হেড স্যার স্কুলেরই এক প্রাক্তন ছাত্রের মারুতি দেখতে পেয়ে, কাকলি ম্যামসহ দু’জন ছাত্র আর অসীমবাবুকে পাঠিয়ে দেন ওদের সাথে। একটা গোলপোস্ট ধরে সম্রাট চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলো, শেষ কালে সেও কেঁদে ফেললো। আর পুরো ঘটনাটা নধর গুপ্ত উপরে চেয়ারে বসে বসে প্রত্যক্ষ করলেন, নট নড়ন চড়ন এতোসব কাণ্ড কারখানাতেও। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এলো। আজকের মতো স্কুল ছুটি। সবাই বাড়ি চলে গেলো।

হেড স্যার হন্তদন্ত হয়ে উপরে উঠে এলেন,
— ‘নধর, তুমি যাওনি কেন নীচে? একবার দেখলে না, সে কি কাণ্ড!’
রসায়নের শিক্ষক নধর গুপ্ত আসলে হেড স্যারেরই ক্লাসমেট, বাড়ির কাছে স্কুলেই পেয়েছিলেন চাকরিটা, কিন্তু প্রিয় বন্ধুর সাথে সেই গ্রাজুয়েশন থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে যখন একসাথে সামিল হয়েছেন, তাই তার বন্ধুর স্কুলেই চাকরি নেন, তখনও হেড স্যার হননি ইংরেজীর অনাময় আধিকারী। হয়েছেন তার পরে, অনেকই পরে।
নধর বাবু বললেন— ‘কে বললো আমি দেখিনি? আমি দেখেছি, এক্কেবারে ড্রোণ ক্যামেরার মতো করে দেখেছি…!’

হেড স্যার অবাক চোখে, ‘মানে?’

— ‘মানে অনেক কিছুই, আবার কিছুই নয়।’

অসীম বাবু ফিরে এলেন ঘন্টাখানেক পর, তাকে মোবাইলে অনেকবার চেষ্টা করেছেন হেড স্যার, কিন্তু বারবার একই উত্তর, অসীম বাবুকে দেখে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন অনাময় বাবু, তার বাড়ির লোককে ফোন করে জানানোর সময় যে কি যন্ত্রণা হচ্ছিলো, তা বোধ হয় তিনিই জানেন। বারবার বুকের বাম দিকটা ডানহাতে করে চাপড়ে চাপড়ে “আল ইজ ওয়েল”, “আল ইজ ওয়েল” বলছিলেন।
অসীম বাবু বলে চললেন –
“খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম স্যার, রক্ত তো জমে গিয়েছিল, ব্রেন হ্যামারেজটা হয়নি, প্রাথমিক চিকিৎসার পর ওটি তে নিয়ে গেলো। ডাক্তার বাদল ব্রহ্মচারী তো বললেন ভয়ের কিছু নেই। কানের ভেস্টিবিউলে নাকি আঘাত লেগেছে, শুনতে পাচ্ছে না কিছুই ওরা চেষ্টা চালাচ্ছেন, জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত…..!”
বলতে বলতে ছুটে গিয়ে স্টাফ রুমের অ্যাকোয়াগার্ডের থেকে পৌনে এক গ্লাস জল চটজলদি গিলে নিলেন….! হাঁপাতে থাকলেন। তখন প্রায় সূর্যাস্তের পালা। নধর বাবুকে অনাময় স্যার কি বললেন শোনা গেলো না, কতগুলো তালচটক পাখি এ তাল গাছ থেকে ও তাল গাছে উড়ে গেলো, সদলবলে তৎক্ষণাৎ গুলমোহরের ফুলবিহীন ডাল গুলো থেকে এক ঝাঁক তিতির উড়ে গেলো পূবদিকের শিরিষ গাছটার দিকে, দুই বন্ধুর কথোপকথন মিলিয়ে গেলো গোধূলির রঙে।

সারা রাত চললো উৎকণ্ঠা। হেড স্যার আর নধর বাবু দুজনেই ছিলেন ওয়ার্ডরুমে, বিতনুর মা আর বোনের সাথে, ওর বোনও তো ঐ স্কুলেরই ছাত্রী, সে অবশ্য সেই ঘটনা সচক্ষে দেখেনি, হা ডু ডু খেলায় ব্যস্ত ছিলো। দাদা সাড়া দিচ্ছে না জেনে সেও সেই যে চুপ হয়েছে, আর রা বেরোইনি বেচারার। নধর বাবু, তার বন্ধুবরেষু অনাময় স্যারকে ভিতরে গিয়ে দেখা করতে বললেন। নধর বাবু তার মা আর বোনকে আশ্বস্ত করতে থাকলেন…, দাদাকে হারানোর ব্যথা তার চেয়ে আর কে জানবে ভালো করে! দুই বন্ধু মিলে দেখা সাক্ষাৎ পর্ব মিটিয়ে কালুর চা দোকানে এসে এক কাপ চা খেয়ে রওনা দেবেন বাড়িতে, এমন সময় হেড স্যার নধর বাবুর হাতদুখানা ধরে বলতে লাগলেন —
‘বাঁচিয়ে দে ভাইটি আমার?’

— ‘আরে আমি কি করবো?’

– ‘কি করে হলো বলতো, এসব?’

–‘ওহহ, এই কথা! দেখছি, কিন্তু বিতনুর কি হবে, হেড স্যার?’ হাসতে হাসতে বললেন তিনি।

– ‘আল ইজ ওয়েল!’

দুজন পথে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে বলতে আসছিলেন, অনাময় বললেন–

‘বিতনু আর সম্রাট ক্লাসের ফার্স্ট আর সেকেণ্ড বয়, ফুটবলেও তেমনি দুরন্ত, কিন্তু ওদের তো শত্রুতা নেই, যতদূর জানি, ওরা নাকি দারুণ বন্ধু, আর এরজন্যই ওদের টিমকে হারানোও চাপের, এতো ভালো বোঝাপড়া যে আমার রোনাল্ডো-রোনাল্ডিনহোর কথা মনে পড়ে যায়।’

— ‘আচ্ছা অনাময়, তুই খেলাটা পুরোটা দেখেছিলি?’

– ‘নাহ!’

— ‘ঠিক আছে। চাপ নিস না। বিতনু সুস্থ হয়ে যাবে, আশা করি…! তবে……’

– ‘তবে, কি?’

— ‘কিছু না, গুডনাইট!’

ক্লান্ত – অবসন্ন দুটো শরীর তিন মাথার মোড় থেকে দুটো বিপরীতমুখী বর্ষাকালীন রাস্তা ধরে এগোতে থাকলো বাড়ির দিকে।

পরদিন স্কুলের প্রথমার্ধের শুরুতে স্কুলে খবর এলো জ্ঞান ফিরেছে বিতনুর, তবে সব কিছু সচক্ষে দেখে মালুম করতে পারছে, কেউ কিছু বললে তাতে বেমালুম রেসপন্স করছে কিন্তু দুঃখের কথা একটাই যে ও নিজে কথা বলতে পারছে না। রাজ্য বিজ্ঞান মঞ্চ থেকে পুরস্কৃত বিতনুর অদম্য জেদ তার সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার। প্রবল মানসিক শক্তির অধিকারী দ্বাদশবর্ষীয় এই ছেলেটি কথা বলার জন্য কি চেষ্টা চালাচ্ছে, সেটা তো নধরবাবু সকাল সকাল মর্ণিং ওয়াক করতে গিয়ে একপ্রস্ত দেখে এলেন। তার উপস্থিতিতেই ছোড়া সম্বিত ফিরে পেয়েছে, তার থেকে কিছু জানবার চেষ্টা করছিলেন নধর বাবু কিন্তু পারলেন না।

সকালে স্কুলে এসেই তিনি ঐ দুই দলের ছেলেদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেন সেদিনের ঘটনা নিয়ে, কেউ কিছুই বুঝতে পারে নি। নধর বাবু নিথর হয়ে রইলেন। এতোদিন ধরে পড়াচ্ছেন তিনি, তাদেরকে আগাপাশতলা চেনেন তিনি। ফিরে গেলেন হেড স্যারের রুমে।

খানেক পরে কেরাণী হুদমদা এসে ডাকদিলো জনা সাতেককে – অ্যান্টনি, কানু, ফড়িং, রবিন, আবদুল্লা, এইটের কোচ পরমেশ্বর, আর সম্রাটকে…! ওদের লাইব্রেরী রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সুসজ্জিত বইয়ের তাকের একদিকে একটা ফাঁকা চওড়া জায়গাতে, দরজার উল্টোদিকের দেওয়ালে একটা আয়না ঠেসানো, বৃহৎ আকার, শোনা যায় ইংরেজ আমলে তৈরী এই স্কুলে তখনকার দিনে ভুল অ্যাড্রেসে এখানে এসে পৌঁছায় বেলজিয়ান কাঁচের তৈরী এই বৃহৎ আকার আয়নাটি। পরে ডাকবিভাগে বলে কোনো কাজ হয়নি, তখন থেকেই এটি লাইব্রেরীতে কুক্ষিগত। নধর বাবুর হস্তক্ষেপে কিছুদিন আগে এটিকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়, হেরিটেজের তকমা পেলে যে কত কিছু পাল্টাই।

নধর বাবু ওদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন –

‘তোমরা আয়নার সামনে গিয়ে এক মিনিট এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকবে..!’
পোলাপানেরা তো যারপরনাই আনন্দিত।
সেই আয়নার সামনে দাঁড়ালে বারো বছরের ছেলেপুলের হাঁটু পর্যন্ত আরামসে দেখা যায়। রুমে শুধু কেরাণী হুদোম, হেড স্যার আর নধর গুপ্ত।

প্রথমে অ্যান্টনি এলো… এক মিনিট হতে চলে গেলো।
ফড়িং এসে এক মিনিট বলতে না বলতেই লাফিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে, বইয়ের গন্ধে তার নাকি অ্যালার্জি।
কানু এসে চুপ করে রইলো।
রবিন চুপ না থাকতে পারে তেরেনাম কাটিং এর চুলটা একবার জার্মান চিরুনি মানে আঙুল দিয়ে কেরামতি মেরে নিলো।

পরমেশ্বর চুপ করে দাঁড়িয়ে, এক মিনিট হয়েছে বলতে হস্তপদে পা গুনতি করে চলে গেলো।
আবদুল্লা কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করলো।

সম্রাট এসে প্রথমে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চাইলো, তারপর মুখ নামিয়ে নিলো, এতক্ষণ ঐ বৃহৎ আয়নার সামনে যারা এসেছে তাদের কারো বেলায় নধর বাবু এসে ঐ আয়নার ত্রিসীমানায় প্রবেশ করেননি, আড়ালে ছিলেন। এবার পুরো সম্রাটের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কড়া গলায় লাইব্রেরী রুমে আন্দোলিত হলো – ‘লুক অ্যাট দ্য মিরর, সম্রাট!’
অতঃপর সম্রাট ফেনিয়ে ফেনিয়ে কাঁদতে শুরু করলো। বলে চললো–
“সেদিন ও পেনাল্টি নিতে যাওয়ার আগে আমি কত করে বললাম তুই তো একটা গোল করলি, স্কিলফুল গোল, কিন্তু আমায় পেনাল্টিটা কনভার্ট করতে দে না। ও শুনলো না, আমায় নিতে দিলো না, নিজেও মিস করলো। বিজ্ঞান মঞ্চের জেলার পরীক্ষাটাই ওকে আমি দুটো প্রশ্ন জিগ্যেস করেছিলাম, ও আমায় বললো না শুধু আগেরবার আমি ওর থেকে একনম্বর বেশি পেয়ে প্রাইজ পেয়েছিলাম বলে….অথচ টিফিন আনলে একবারও ওকে না দিয়ে খাই না আমি, খেলার মাঠে কার্পণ্য না করে পাশ বাড়িয়ে দিই। ও এতো কেন হিংসে করে আমায়??? তাই আমি রেগে গিয়েছিলাম, তাই আমি……ওকে ইচ্ছে করে মেরেছি স্যার…আমায় শাস্তি দিন!’

এই বলতে বলতে সে বেলজিয়ান কাঁচটার দিকে এগিয়ে গেল, কিছু করে বসে দুঃখের মুডে, এই দেখে হুদোমদা টেনে নিয়ে গেলো। হুদোমদা খুব ভালোবাসে ওকে, বললো – “আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি তুই কত ভালো বন্ধু বিতনুর, যা হাসপাতালে গিয়ে একবার কোলাকুলি করে আয়….”

হেড স্যার অনাময় বাবু তো হতবাক, বাকি ছেলেগুলোর তো মুখ শুকিয়ে গেছে…! নধর বাবু, তার বন্ধুর দিকে তাকিয়ে হাসলেন, সম্রাটের কাঁধ চাপড়ে বললেন —

“আসলে কি জানিস সম্রাট, আমরা কেমন এটা জানার জন্যে মাঝে সাঝে আমাদের মতোই কাউকে দরকার হয়, আমি কি করেছি, সেটা জরিপ করার জন্যও তাই দরকার,….., আমার মতোই, একই অবয়বের একইরকম একটা কায়া লাগে, বুঝলি?”

 

© শুভঙ্কর দত্ত || মেদিনীপুর, December 22, 2018

মামা জানে…

কোথায় যাবি?
— আরামবাগ..
আরামবাগের কোথায়?
— জানি না, মামা জানে….!

একটা বস্তু যেটা কি, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, তবে বেশ অনেকক্ষণ থেকেই একটা রুপোলি রঙের ফিতের মতো বেরিয়ে আসছিলো। বাসের একদম পেছনের যে ছ’টা সিট তার একটা সিট,সেটা আবার আমারই পাশে, ফাঁকা ছিলো। ক্ষীরপাই হালদারদীঘি আসতেই মাথায় চুলের ঝুটি আর গায়ে জিন্সের শার্ট পরা বছর পাঁচ সাতের একটা বাচ্চা আমার পাশের সিটে বসে পড়লো। ব্যাগ থেকে কিছু পরে একটা কড়ে আঙুল সাইজের কলা বের খেতে লাগলো, জীবনে সেই প্রথমবার ওরকম কলা আমি চাক্ষুস করলাম। এরপর বাস এগিয়ে চলেছে তার গন্তব্যের দিকে, সরকারী অফিসারদের উদাসীনতার প্রমাণ রাস্তা দিয়েই দুড়ুম দাড়ুম শব্দে বাসের পেছনে বসে আর সে যাত্রাকে উপভোগ করতে পারছিলাম না৷ এর মধ্যে চোখে পড়লো বাচ্চাটা মুখে দিচ্ছে ঐ জিনিসটাই। ওপাশে একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন, বয়স পঞ্চাশের কমই হবে। তিনি ঐ বাচ্চাটিকে জিগ্যেস করলেন – “তুমি ছেলে না মেয়ে?”

— মেয়ে।
এতোক্ষণে বাচ্চাটা যে মেয়ে সেটা ঠাহর হলো। আমি নিজেও কনফিউসড ছিলাম৷ কিছু প্রশ্ন আরো করলেন ভদ্রমহিলা, নব্বই শতাংশ প্রশ্নের উত্তর এলো
“মামা জানে…!”

বাসটা এসে একটা স্টপেজে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ দেখলাম মেয়েটা একটা সিটের নীচে পড়ে থাকা একটা রুমাল ছোঁ মেরে সিটে এসে বসতে যাবে এমন সময় একটা হাত হঠাৎ করে তার মাথায় সাঁটিয়ে চাপড়ালো। বুঝতে অসুবিধা হলো না নব্বই শতাংশ উত্তরে যার নাম নিচ্ছিলো মেয়েটি ইনিই সেই মামা, তাকিয়ে দেখলাম তার কোলেও একটা বাচ্চা।

আমাকে নামতে হবে৷ আর বেশি দেরীও নেই। মেয়েটাকে জিগ্যেস করলাম
কোথায় যাবি………..
……..
…….

তারপর বললাম ঐ গুলোকে মুখে দিচ্ছিস কেন?
ফেলছিস বাসে কেটে কেটে…! ভালো হচ্ছে তো এটা?
তুই মুখে দিচ্ছিস কেন? নোংরা ওগুলো…

—- টাকা দাও, তাহলে দেবো না মুখ ওতে।

আমি বললাম – তোর মামা খাওয়াবে না?
— না
দেখলাম মুখটা যথেষ্ট কঠিন হয়ে এসেছে, বললাম আরামবাগে যেখানে যাবি সেখানে খেতে দেবে তো…সেখানে খেয়ে নিবি৷
বললো — “ক্যাম্পে যাবো..”
আমার মনে হলো নাহহহ, আমি ভুলই শুনেছি…!

এবার প্রায় নামবো, নামবো৷ মেয়েটা টাকা চেয়ে যাচ্ছে। আমি মুখে আঙুল ঠেকানো দেখিয়ে বললাম চুপ করতে৷ তারপর আবারো….

এবার জিগ্যেস করলাম
“তোর নাম কিরে?”

— ফুলটুসি….
পদবী বল্….

— জানি না,
—মামা জানে।

একটু চুপ হয়ে গেলাম, বাসের দুড়ুম দাড়ুম আওয়াজ ততক্ষণে কোথাকারের একটা গোঙানিতে এসে যেন নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছে….! তবু বললাম

“আজ তো কালী পুজো, আরামবাগে অনেক পুজোতে খাওয়াবে৷ খেয়ে নিবি পেট ভরে…”

উত্তর শুনিনি, নেমে পড়েছি। ভয় লাগলো, আবার যদি বলে……

 

© শুভঙ্কর দত্ত, রামজীবনপুর || November 8, 2018

অপরাধী : অভিনয়?

ব্রাজিল হেরে গেলো?
বিশ্বাস করতে হচ্ছে, তার কারণ একটা লোক……!

তবে একটা জিনিস অদ্ভূত লাগছে খুব, যে ব্রাজিল কে নিয়ে গলা ফাটায় আমরা, মানে বাঙালিরা, ব্রাজিল সমর্থকরা, তাদের কেউ কিন্তু খুব দুঃখিত নয়। তার কারণ,
এক, হতে পারে, বেলজিয়াম যোগ্য দল হিসেবে জিতেছে, প্রথম ম্যাচ থেকে কর্তৃত্বের সাথেই জিতেছে।
দুই, ব্রাজিল দারুণ চেষ্টা করেছে, লজ্জাজনক ভাবে হারেনি। মুহুর্মুহু আক্রমণ করেছে, নিজেদের ছন্দে খেলেছে।

 

কিন্তু কোন বন্ধুই দেখলাম না ব্রাজিলের খেলা নিয়ে কিছু বললো।

আমার আবার আট বছর আগেকার দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, কোয়ার্টার ফাইনালে সেবার নিজেদের প্রথাগত হলুদ জার্সি ছেড়ে নীল রং এর জার্সিতে ব্রাজিল খেলেছিলো ডার্ক কিউট, স্নেইডার, স্টেঙ্কেলবার্গ, রবেন, ভ্যান পার্সির হল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে। সে বার ব্রাজিলে কে ছিলো না? রোবিনহো, কাকা, ডানি আলভেজ, লুই ফাবিয়ানো……! যাই নামই বলি, এইখানে গিয়েই আটকে যেতে হবে। কারণ এবার ব্রাজিল দলে নামডাকে বড়ো এরকম অনেক প্লেয়ারও আছে, ১১ জনের দলে সুযোগ না পেয়েও ডাকসাইটে প্লেয়ার বলা যায়। মনে পড়ছে সেবারও একটা ফ্রি কিক ব্রাজিলের গেলকিপার জুলিয়াস সিজার এবং একজনের ভুলে প্রায় আত্মঘাতী গোল হয়েছিলো, তবে স্নেইডারের কৃতিত্ব কম ছিলো না ফ্রি কিক নেওয়াতে। ১-০ তে এগিয়ে ছিলো ব্রাজিল, ঐ গোলে সমতা এলো। পরের একটা গোলও স্নেইডারের, কর্ণার কিকে হেডার। কাকা অনেক চেষ্টা করেছিলো, রোবিনহোও….! কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। যাক্, ২০১৮ তে আসি………

এই ব্রাজিল দলটাতে প্লেয়ারের অভাব নেই। ভালো স্কিলফুল প্লেয়ার। কুতিনহো, জেসুস, ফিরমিনহো, নেইমার, মার্সেলো, কাসিমেরো, পাওলিনহো, লুইস, সিলভা — সবাই ক্লাব ফুটবল এবং দেশের খেলাতেও নজর কেড়েছে। তবে জেসুসকে কাল কেন এতোক্ষণ ধরে খেলানো হলো বুঝিনি। যাই হোক্ বিতর্ক বাদ।
বেলজিয়ামের খেলা আহামরি কিছু লাগেনি। ম্যাচ সামারিই বলে দেবে বেলজিয়াম শুধু জিতেছে, কর্তৃত্বটা রাখতে পারেনি, ব্রাজিল আর জেতার মধ্যে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়ালো টিনটিনের দেশের গোলরক্ষক কুর্তোয়া। ব্রাজিলের খেলা দেখে খারাপ লাগেনি, চেষ্টা চালিয়ে গেছে। বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের ভিতরে গিয়ে ছোটো ছোটো টোকাতে পাস খেলে গোল দেওয়াটা ব্রাজিলের স্বভাবসিদ্ধ। বেলজিয়াম কোচ এটা ধরে ফেলেছিলেন, ব্রাজিল আক্রমণে এলেই ছেলেদের লেলিয়ে দিলেন ঐ জায়গাটাতে, রেড ডেভিলদের পায়ের জঙ্গলে বল বারবার প্রতিহত হতে থাকলো, সাথে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনাও। নেইমার-কুতিনহোরা বারবার চেষ্টা করে গেলেন কিন্তু হায়…..!
দূর থেকে দু একটা শট নেওয়া হলো। এবার রক্ষণের শেষ প্রহরীর মতো আগলে দাঁড়ালেন থিবো কুর্তোয়া….! একের পর এক অসামান্য সেভ করতে থাকলেন একা হাতে। ২০০৬-২০১৪ যে যে দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের গোলরক্ষকগুলোকে দেখলেই বোঝা যায়, কেন তারা জিতেছে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন টিমের গোলরক্ষক সেরকমই হবেন, বকলমে বিখ্যাত হবেন না, কখনই, কাজ করে দেখিয়ে দেবেন। বুঁফো-কাসিয়াস-ন্যয়ার এর পর সম্ভবত কুর্তোয়া সেই সম্ভ্রমের জায়গাটায় চলে গেলেন। সম্ভবত কেন, অবশ্যই গেলেন। নেইমারের হালকা টাচটা যেভাবে প্রতিহত করলেন নিজেকে একটা উচ্চতায় ছুঁড়ে দিয়ে, সেটা দেখে নেইমার নিজেই কিঞ্চিৎ হাসলেন। গোল এলো অগাষ্টোর হেড থেকে। তবে ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে গেলো। বেলজিয়াম প্রথম থেকে অদ্ভূত রণনীতি নিয়ে খেলছিলো, যখন অ্যাটাক করতে যাচ্ছে দশ জন চলে যাচ্ছে, যখন ডিফেণ্ড করছে তখনও দশ জনে। ব্রাজিলের সাম্বা ম্যাজিকটাকে ম্রীয়মাণ করে দিলো তারা প্রথমার্ধেই, যেখানে সেলেকাওরা এক গোল পরিশোধ করার জন্য আঘাত পাওয়া বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে, বেলজিয়াম দ্বিতীয় গোল পাওয়ার পর পুরে মাইণ্ড গেম খেলে চললো। দশ জন ডাকাবুকো লোক মিলে ডিফেণ্ড করলে গোল করা বোধ মারাদোনাও পারতেন না….! বেলজিয়াম দলটাই একমাত্র ইদেন হ্যাজার্ড ব্যতীত সবাই লম্বায় যেমন, চওড়াতেও তেমন, লুকাকুর কথা তো না বলাই ভালো, কেন জানিনা ফুটবলের “ড্যারেন স্যামি” লাগে। ঐ রকম চরকি লাচন করে পাশ দেওয়া, সেই পাশ থেকে দে ব্রুইনের অসম্ভব সেন্টার, আর আলিসন পরাস্ত! এরম গোল দেখলে আর আক্ষেপ থাকে না। ব্রাজিলের সমর্থক হলেও ২০১৪ থেকে বেলজিয়ামকে খুব ফলো করি, খেলা দেখতেও ভালো লাগে, কেমন যেন ‘নতুন জার্মানি, নতুন জার্মানি’ গোছের খেলে। ২০১৪ তে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিলো, ডি মারিয়ার পাশ থেকে হিগুয়েনের গোল বেলজিয়াম এর শেষ চারে যাওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছিলো, ৮ মিনিটের করা গোল, বাকি ৮২ মিনিটেও শোধ করতে পারেনি, অথচ সেই দলেও এরাই ছিলেন, এখন যারা ব্রাজিলকে হারালো। বরাবর বলা হয় বেলজিয়াম নাকি ফুটবলের দক্ষিণ আফ্রিকা, সারা বছর ভালো খেলে বিশ্বকাপের সময় কাঠি বেঁকে যায়….! এবার সামনে সুযোগ অনেক….! কাপ জয় থেকে আর মাত্র দু ম্যাচ দূরে, গোটা বিশ্বের সমর্থন পাবে বেলজিয়াম, নতুন চ্যাম্পিয়ানদের স্বাগত জানাতে যদিও সেমিতে ফ্রান্সের সম্মুখীন হতে হবে। কুর্তোয়া যদি ইট সিমেন্টের প্রাচীর হন, লরিস তো আবার লোহার প্রাচীর…! সে যাই হোক্ এখনও অবধি ১৪ গোল, কর্তৃত্বের সাথে জেতা এবং জাপানের বিরুদ্ধে ২ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোল করে জয়লাভ, জার্মানি – আর্জেন্টিনা – স্পেন – ব্রাজিল এর আপাত সমর্থকদের তারা নিজেদের করে নিয়েছেন।

তবে একটা কথা বলতেই হয়, কাকা-রোনাল্ডো-রোনাল্ডিনহো-রোবিনহো, এদের খেলা দেখার পর নেইমারের খেলা দেখলে রীতিমতো আহত হতে হয়, ২০১০ এর রিপ্লেটাও দেখলাম, কাকাকে পেনাল্টি বক্সে ফাউল করা হলো, বিধিসম্মত, তবুও তিনি পেনাল্টির জন্য বিন্দুমাত্র আবেদন করেননি , রোনাল্ডো বা রোনাল্ডিনহোর যে সব খেলা দেখেছি, পড়ে গেলেন, উঠে আবার দৌড়, প্রতিপক্ষ ফেলে দিলো, ওনারা উঠে দৌড়তে লাগলেন, ব্রাজিলের খেলার এটা একটা গুণ ছিলো, ট্যাকেল এড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু নেইমার যেটা করলেন,তাতে করে তাকে আদর্শ করা তো দূর কি বাৎ, কিছুকেমন বিজ্ঞাপণের বিষয়বস্তু হতে পারেন…..! হয়ে গেছেনও, ফেসবুক পেজ অ্যাডমিনদের পোয়া বারো তো এখন….! কাকার মতো সৎ প্লেয়ার বাদ দিলেও, নেইমার অনেক পিছিয়েই থাকবেন। এতো ছলনার আশ্রয় নিতে গিয়ে এতো সময় নষ্ট, মেনে নেওয়া যায় না। তবে একটা জিনিস কিছুতেই বুঝলাম না, রেফারি তাকে হলুদ কার্ড দেখালেন না কেন? নিশ্চয় পেনাল্টি নয়, আবার নেইমারও ঠিক করেননি, তাহলে ছলনা করে রেফারিকে প্রতারিত করার মতো ঘৃণ্যতম অপরাধের সাজা স্বরূপ একটা বুকিং কি এমন আহামরি কঠিন কাজ…! আসলে ব্রাজিলের না জেতার কারণ, এটাও, নেইমারের অভিনয় এমন আঙ্গিকে পৌঁছে গেছে যে নিজের দলের সমর্থকরাই বিষ ঢালছে, অভিসম্পাতে জর্জরিত হলো গোটা দলটাই। তবুও কুর্নিশ পোলাডারে, চোট থেকে ফিরে নিজের খেলাটা দিয়েছে। এটুকুও কি মাথায় নেই যে ভিডিও অ্যাসিটেন্ট চালু আছে, ধরা পড়ার তৎক্ষণাৎ সম্ভাবনা আছে। তবে যা দিনকাল পড়েছে, এইভাবে খামোখা ভূপতিত হতে থাকলে সত্যিই একদিন সঙ্গত কারণে পড় গেলে রেফারি ঘুরেও তাকাবেন না, যেমন একটা সময় রবেন  এর সাথে হয়েছে, এখন সুয়ারেজের সসাথে হয়, সেরকমই…..পালে বাঘ পড়ার মতো। তবে কাকারা আট বছর আগে হেরে যাওয়ায় যেরকম দুঃখ হয়েছিলো,সেটা হচ্ছে না, কাকাকে ভালোবাসতাম, নেইমারের অভিনয় সেই ভালোবাসায় “অপরাধী” হয়ে দাঁড়িয়েছে….!

© শুভঙ্কর দত্ত || July 7, 2018

চর্যাপদের খোঁজে চৌথুপীতে

চৌথুপী সঙ্ঘারামে মরণভয় ছড়িয়ে পড়েছে।
….
…….
মহাস্থবির চীবরের কটিবন্ধে হাত দিলেন, গ্রন্থাগারের কুঁজিতালের চাবি এখনও গেঁজেতে ঝুলছে। তবে এ কীভাবে সম্ভব? মহাস্থবির ক্ষিপ্রপদে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলেন এবং থরথর করে কেঁপে উঠলেন। মহামূল্যবান পুঁথির কাষ্ঠ-সিন্দুকগুলো সব উধাও!

—————————————————————

“চৌথুপীর চর্যাপদ” এর কাহিনীর শুরু এমনিই এক আকস্মিক ঘটনা দিয়ে। প্রাককথনে উল্লেখিত সময়কাল ১২০৫ অব্দ।

সত্যি বলতে গোটা উপন্যাসটি পড়ার পর এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি….. প্রথম পাতাটা দেখতেই নিজের ওপর যারপরনাই রাগ হলো, যে কথাটা প্রথম পাতায় লেখা আছে, আমি বেমালুম ভুলে গেলাম কি করে? ছ’মাস পেরোয়নি আমি “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়েছি, তা সত্ত্বেও কি করে পুরোপুরিভাবে ভুলে গেলাম যে এটিও একটি উপন্যাস, পড়তে পড়তে কাহিনীর গহ্বরে চলে গেছি, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢুকেপড়েছি চৌথুপীর সঙ্ঘারামে, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো ভুলেই গেছি আমি এক সামান্য পাঠক, পড়তে পড়তেই কখনো এর রূপ, কখনো ওর রূপের ছাঁচে বসিয়ে ফেলেছি নিজেকেই। যদিও এসব নতুন নয়, পাঁচমুড়ো পড়তে পড়তেই এসব হয়েছিলো… সেই “আমি যদি এটা হতাম”, ‘আমি যদি ওটা হতাম।’ এরকম ভাব।

  • যাই হোক্, এ গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই। পাঁচমুড়োর সাথে কিঞ্চিৎ মিল থাকলেও এই উপন্যাস আসলে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারের আর একটি অমূল্য রত্ন। পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গলকে যথাস্থানে রেখেই বলছি “চৌথুপীর চর্যাপদ” একটি সম্পূর্ণ রূপে গবেষণামূলক কাহিনী,যার পরতে পরতে আছে অসংখ্য তথ্য, এই বিপুল তথ্যসাগরে ভাসতে ভাসতেই পাঠক কখন যে সমান্তরালে চলতে থাকা দুটো কাহিনীর অন্দরমহলের প্রতিটি চরিত্রের সাথে পরিচয় সেরে নেবে, তা অনুমেয় নয়।
  • একসাথে দু’খানা কাহিনীর বুনোট সমান্তরালে চালিয়ে উপন্যাস এর গল্প বলা আগেও হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিশেষত্বটি কি?
    — কি আর? আপনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বইটির শিরোনাম দেখে কতকিছু ভেবে বসে থাকবেন, উপসংহার পড়ার পর ঠাহর হবে যে, আদতে আপনার কল্পনার প্রায় ৯৯ শতাংশই ভুল, মানে লেখক মশায়ের পাঁচমুড়ো না পড়া হলে তো, এরকম ভাবতে একরকম বাধ্য, তবে সেটা পড়া হওয়ার দরুণও আমায় আবার ঠকতে হলো বলা চলে।
  • একসাথে দুটো কাহিনী চালিয়ে যাওয়াটা মুখের কথা নয়, তাও আবার একটা এই এখনকার সময় আর একটা প্রায় ১২০০ অব্দ, তালগোল পাকালেই গেলো।
  • একটি পুঁথিকে কেন্দ্র করে একদিকে হাফি হাবিলদার, মামাজী, বিমলা, লামা, ছেত্রী, অর্জুন এবং যোজনগন্ধার তীব্র অনুসন্ধান। এবার আবার ভাষা হলো সিদ্ধম…..! কি অণুসন্ধান?
    প্রায় আটশো বছর আগের গন্ধকালী, শ্রীধর আচার্য, খু-স্তোনদের আগলে রাখা পুঁথি এবং তুরস্কদের কাহিনী। —- এই দুটো কাহিনীর সমান্তরাল সজ্জাতেই এ উপন্যাস এগিয়ে চলে।
  • কেন পড়বো?
    তার আগে বলি, এই উপন্যাসকে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে ধরলে মহাভুল। লেখক আগে একটা সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্য লিখেছিলেন, এবার একটা চর্যাপদ লিখে ফেললেন। কি? গাঁজাখুরি মনে হচ্ছে? পড়তে পড়তে অবশ্য এসব ভুলেই যাবেন।
  • এ কাহিনীতে অ্যাডভেঞ্চার কম নেই, আবার অতিশয় সিরিয়াস ইস্যুর মাঝে হাস্যরসের উপাদান নেহাত কম নেই, গুলি-বোমা-বারুদের গন্ধে মাখা বাতাস আছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা জাতির অত্যাচার আছে। কি নেই? থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চারের যুগলবন্দী, তার ওপর মন মাতানো সব তথ্য, যা জানলে রীতিমতো অবাক হয়ে যেতে হয়। তবে সবগুলো এমনভাবে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়েছে যে পড়তো পড়তেই এক অদ্ভূত মায়াজালে জড়িয়ে যেতে হয়। এ কাহিনী কিছুক্ষণ পড়ার পর অবশ্য মনে হতে পারে, যেন সিনেমা দেখছি! অবশ্য তা হলেও মন্দ হয় না।

 

IMG_20180629_144150~2
সিদ্ধম্

 

লেখকের পরিচয় নতুন করে কি বলবো? আগেও বলেছি, কতটা নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা থাকলে এরকম উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে উপহার দেওয়া যায় তাও বিদেশ বিভূইয়ে থেকে, সেটা জানতে গেলে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” এবং “ছিরিছাঁদ” এর সঙ্গে সঙ্গে “চৌথুপীর চর্যাপদ” ও পড়তে হবে। কতটা অধ্যবসায় এবং গবেষণা করলে এমনতর রত্নসমান আকর গ্রন্থ পড়ার সুযোগ পাই, তার জন্য সমগ্র বইটি পড়ার পর গ্রন্থতালিকাটি তে চোখ রাখলেই কিছুটা অনুমান করা যায়।

হ্যাঁ, এবার বলা যাক্, পুরো বইটি পড়ার পর কি এমন প্রশ্নের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। সেটা হলো, গল্পের সূত্রপাত কিভাবে হলো, এবং মহাস্থবিরের অনুপস্থিতিতে গল্পের নায়ক-নায়িকা যখন মহামূল্যবান পুঁথিগুলি তুরস্কদের নাগালের বাইরে আনয়ন করলো, তারপর কি হলো? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর ধরেই গল্পের সূত্রপাত। উপন্যাসের শুভারম্ভ।

এবার বলা যাক বইটির আকার নিয়ে। অনেকেই হয়তো সাড়ে চারশো পাতার বই হাতে নিয়েই বিরক্তও বোধ করবেন। তাদের জন্য সত্যিই দুঃখিত, লেখক বোধ করি, পাবলিক ডিম্যাণ্ড ভেবে বইটি লেখেননি, তাহলে হয়তো তিনি দুটি খণ্ডে বইটি প্রকাশ করতেন। আসলে এই চর্যাপদ সম্পূর্ণরূপে গবেষণামূলক একটি উপন্যাস। তবে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ার পর এটি নিয়ে বসলে রীতিমতো বিরক্তি লাগতে পারে, আমারও লেগেছে, তবে ঐ যে আবার বলতে হয়, শেষে গিয়ে অদ্ভূত রকমের আনন্দ লাগবে। কিন্তু সে আনন্দ আরো বেশি হতে পারে যদি পাঁচমুড়ো পড়ার পূর্বে এটা পড়া যায়। বইটি পড়া শুরু করলে যদিও পৃষ্ঠাসংখ্যা নেহাত লেস প্রায়োর মনে হবে, এখানেই লেখকের বাজিমাৎ। চরিত্রের নামকরণ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি মনে রাখার মতো সব নাম, এই উপন্যাসের নায়িকাদ্বয়ের নাম তো আবার বলেই দিলো যে কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে, অবশ্য পরে তা বলেও দিয়েছেন, সেটা কি?? – তা জানার জন্য একবার চৌথুপীতে গিয়ে ঘুরে আসায় শ্রেয়…. তবে ক্লু হিসাবে বলা যায় ঐ কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে বহু সিনেমা হয়েছে।

এটি লেখকের তিন নম্বর উপন্যাস, পাঁচমুড়োর প্রায় বছর দুয়েক পর এই উপন্যাস প্রকাশিত। অর্থাৎ লেখক সাহস পাচ্ছেন হয়তো তার পাঠকের আকুণ্ঠ পিপাসা দেখে। তাই আমাদেরও উচিৎ লেখকের এই গবেষণা-সাধনাকে কুর্নিশ জানানো তা সম্ভব – অবশ্যই অধিক পরিমাণ পাঠকের কাছে এই অসামান্য কাজের আলোকবর্তিকা বহন করা।

★★ ★ তবে এই বই পড়বো কেন তা নিয়ে লেখক গল্পের নায়িকা যোজনগন্ধার ভাষ্যে বলেছেন
যোজনগন্ধা ভাবল তার ওই জ্বরের ঘোরের মধ্যে পড়া গুহ্যচর্য্যায় কি সত্যি সত্যি ওই কাহিনি লেখা ছিল? নাকি সবই তার কল্পনাপ্রসূত ভাবসম্প্রসারণ, জ্বরের ঘোরের মধ্যে মনে ভেসে আসা অতীন্দ্রিয় জলছবি? কে জানে কোনটা সত্যি? তবে এটা সত্যি যে গন্ধকালী, খু্ স্তোন, শান্তভদ্র, তোন-পা’দের মতো নাম না জানা শত শত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী আটশ বছর আগে প্রাণের মায়া ত্যাগ তুচ্ছ করে কত মূলাবন পুঁথি বাঙলা থেকে তিব্বতে নিয়ে গিয়ে তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। যোজনগন্ধা ভাবছিল বাঙালিরা কেউ কি উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে আসবে সেই অমূল্য গ্রন্থগুলিকে ধুলো ঢাকা শবাধার থেকে বের করে আনতে?”

অবশ্য লেখক যোজনগন্ধার জবানবন্দীতেই বলিয়ে নিলেন – ” আমি এই কাজের দায়িত্ব নিলাম।”

সত্যিই তো, এই একই বার্তা বারবার দিয়ে চলেছেন লেখক…. বাংলা ভাষাটাই তো হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ঐ মহার্ঘ পুঁথি বা বাংলা ভাষার ইতিহাসকে রক্ষা করতে হলে এক দুটে গন্ধকালী বা যোজনগন্ধা, খু স্তোন বা হাফি হাবিলদার কি পাবো না?

IMG_20180629_144115

 © শুভঙ্কর দত্ত || June 30, 2018 

 

আমি ভগবান নই: মেসি

দু এক কথা বলতে এইচি…! জানি ধৃষ্টতা  নেই।

মেসিকে নিয়ে খিল্লি করতে কখনোই চাই নি। বরং লোকটার খেলা দেখতে খুব ভালো লাগে। গোল দিলো কিনা তাও দেখি না, দেখি কি সুন্দর ড্রিবল করে শত্রুশিবিরে পেনিট্রেট করছে লোকটা…! সেই ২০১০ এর বিশ্বকাপ ফাইনাল থেকে মেসিকে মুখলুকিয়ে সাপোর্ট করি। রোনাল্ডোর ভক্ত বলে, মেসিকে গালাগাল দিই না, যতটুকু উৎপাটন করি পুরোটাই দোষ কিছু আবালভক্তবৃন্দের জন্য। রোনাল্ডো পেনাল্টি থেকে গোল করার পর যেভাবে তাকে চাঁঠা হচ্ছিলো, মেসির পেনাল্টি মিসের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম….! যাই হোক্ অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। আসলে যতই এদের টিম খারাপ খেলুক, এই দুইই মহাতারকার মধ্যে একটা আলাদা কম্পিটিশন চলেই…! আর মাঠের বাইরে চলে তাদের ফ্যানদের মধ্যে বাক্যবিনিময় বা গালিবর্ষণ।

যেটা বলছিলাম…..

কাল গৌতম ভট্টাচার্যের লেখা পড়ছিলাম, বিশ্বকাপ শুরু হতে নিয়মিতই পড়ছি…! আর্জেন্টিনা হারের জন্য আমি (যদিও আমি কোনো বিরাট লিখিয়ে নই বা ফুটবলবোদ্ধা নই) কোচ সাম্পাওলি এবং মেসিকে সমান ভাবে দায়ী করবো! একটা টিমের একজনকে এতো বড়ো করে দেখা কেন হবে? কেন কোচ একটা প্লেয়ারের কথায় দল নির্বাচন করবেন তাও আর্জেন্টিনার মতো দেশের যে দেশ ফুটবল মানচিত্রে শ্রদ্ধার সাথে ঠাঁই পেয়েছে, কারণ কি শুধুমাত্র তাদের দলে একজন তথাকথিত ভগবান আছেন বলে? একটা ফুটবল দলের পরিচিতি কখনই একটা একা মানুষ, সরি ভগবান হতে পারেন না।
সাম্পাওলি আগেই জানতেন, তার দল বেশি দূর এগোবেনা, তাই আগেভাগে হাত তুলেলে নিয়েছেন। কোপা জেতা টিমের কোচ…! আহা রে কত যেন সাফল্য। এমনি কোচ একটা সুপারস্টার দলের দায়িত্ব নিয়ে মেসিকে সর্বেসর্বা করে দিলেন। একটা ক্লাসে যার রোল এক, পুরো ক্লাস করা অর্থাৎ পড়ানোটা যদি তাকে কেন্দ্র করে হয়, তাহলে অন্যান্য যারা আছেে, যাদের মধ্যে বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনাটা ছিল, তা ম্রীয়মাণ হয়ে পড়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। সাধারণ বুদ্ধি থেকে যেটা বুঝি, এই একটা জিনিস তারকাখচিত আর একটি দলে নেই, হতে পারে তিনি পাশে কাউকে পাচ্ছেন না, হতে পারে তিনি মার্সেলো-ইস্কো-কার্ভাহাল-লুকাস-আসেনসিও কে মিস করছেন,কিন্তু তার দলে এই ব্যাক্তিকেন্দ্রীক ট্রেনিং দেওয়া হয় না বলেই আমার ধারণা, একজনকে পাখির চোখ করা হয় না বলেই আমার ধারণা। তার ফলস্বরূপ ইউরো জয়, কি আছে দলটায়? আছে কিছু? তার চেয়ে নীল-সাদা দের দল অনেক ভালো, মাঠে কি করলো তা বাদেই বলছি।

এবার আসি মেসির কথায়। না তার খেলা নিয়ে বলার জন্য আনন্দবাজারের মতো একটা বাজারি পত্রিকা আছে। আমি বরং মেসির দায়িত্ব নিয়ে একটু বলি, সমর্থক নই, কিন্তু এটা বলতেই পারি।

  • মেসি কিন্তু চাইলেই অধিনায়ক হিসেবে একটা মেসেজ আপামোর বিশ্ববাসী, ফুটবলপ্রেমী এবং তার সমর্থক এবং অবশ্যই তার কোচ-সহকারী খেলোয়াড়দের দিতে পারেন – “যে আমায় ভগবান ভগবান বলে এতো ডেকো না, আমার এতো উপরে তোলার কিস্সু নেই, এই সম্বোধন আমায় তাড়না দেয় না, বরং মানুষ হিসেবে যে চাপ বয়ে বেড়ানোর কথা, ভগবান ভগবান আওয়াজ কানে এলে সেটা আমার ওপর প্রত্যাশার চাপকে দ্বিগুণ করে দেয়…আমি আমার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলি, আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে পেনাল্টি কিক নেওয়ার পূর্বে আমার মুখবয়ব দেখে তোমরা কিছুই আঁচ করতে পারোনি?”
  •  মেসির আরে বলা উচিৎ, ঠিক যেমন রামোস বলেছিলেন দে হিয়া কে নিয়, পর্তুগালের বিরুদ্ধে ম্যাচ এর পর, সেরকমই…
    “আমার দলের প্রত্যেকটি সদস্যের প্রতিভার ওপর আমার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রত্যেকেই বিশ্ববাসীকে সুন্দর ফুটবল উপহার দেওয়ার জন্য মুখিয়ে, আমাদের সমর্থন করুন। আমাদের….! কোনো ঈশ্বরকে নয়, বা ঈশ্বর সম্বলিত কোনো দলকে নয়। আমাদেরকে সাপোর্ট করুন।”
  • © শুভঙ্কর দত্ত || June 22, 2018

 

ছিরিছাঁদ থেকে ‘শ্রী’ এবং ‘ছন্দ’

‘কী দূরবস্থা! কোনো ছিরিছাঁদ নেই।’ পাশে বসা ময়লা ফতুয়া পরা লোকটা অবজ্ঞার স্বরে বলল, ‘ছিরিছাঁদ ছড়িয়ে আছে। শুধু চাই দেখার চোখ আর শোনার কান।’

 


IMG_20180127_183826~2

 

ব্যাস…. ওমনি গল্প শুরু! ছিরিছাঁদ যে কখন দ্বিখণ্ডিত হয়ে “শ্রী” এবং “ছন্দ” হয়ে গেলো, সেটাই ঠাহর হলো একদম শেষ পাতায়, সাথে পানু রিপোর্টার (গল্পের নায়ক) এর বিড়বিড়ানির মধ্য দিয়ে আক্ষেপ!

 

পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল পড়ে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। বুৃঁদ হয়েছিলাম আমেরিকা নিবাসী লেখকের বাংলা সাহিত্যের প্রতি নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় দেখে। আবার নতুন করে সম্মোহিত হওয়ার কোনো কথায় নেই যদিও!

এ গল্পেও টানটান উত্তেজনা, ভলিউম নিতান্তই কম হওয়ায় পাঠকের একটা আলাদা উদ্দীপনা কাজ করে। মাত্তর ১১০ পাতা, তাও মুখবন্ধ, আশীর্বাণী, সূচীপত্র, লেখকের কথা সব নিয়ে।

তবে পর পর দুটো উপন্যাস পড়ার পর আমার একটাই জিনিস বলতে ইচ্ছে করছে, লেখক মহাশয় যাদের নায়ক করছেন তারা কিন্তু বেশ সাধারন মানের। আগেরটাই “কালাচাঁদ”, এবার পানু রিপোর্টার! খুব ছাপোসা মানুষদের নায়ক করা হচ্ছে, এটা আমার বেশ ভালো লেগেছে।

আর এ বইয়ের সূচিপত্র দেখে অনেকে হয়তো অনেক কিছু ভাববে যে এটা গল্প সংকলন নাকি রে বাবা কিন্তু না , ভয়ের কোন কথা নেই। এটা নতুন স্টাইল, অন্তত আমার কাছে। এ গল্পের অন্যতম হিরো– নাম বলতে অপারগ, কারণ সূচিপত্রে একাধিকবার তিনি উদ্ভাসিত এবং তার বিভিন্ন নামে এক একটি পরিচ্ছদ, দু একটি বাদে! এবং এখানেই বিশেষত্ব।

 

IMG_20180125_234008
অনন্য সূচিপত্র

 

পাঁচমুড়োতে যেমন পঞ্চানন মঙ্গল লিখেছিলেন, এবারও শ্রীছন্দনিকেতনের খোঁজ করতে গিয়ে কখনো মন্দাক্রান্তা, কখনো ভুজঙ্গপ্রয়াত, কখনো চম্পক, কখনো দিগক্ষরা, কখনো একাবলী, কখনো তূণক, তোটক, রুচিরা, একপদী, দ্বিপদী, ত্রিপদী, চৌপদী, পঞ্চচামর, পয়ার, মালিনী, অনুপ্রাস— প্রভৃতি বিভিন্ন সংস্কৃত ছন্দের সফল আনয়ন ঘটিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে। এ বিষয়ে বেশি কিছু বলবার সাহস বা ধৃষ্টতা আমার নেই, যেহেতু শঙ্খ ঘোষ এবং সুধীর চক্রবর্তীর মতো মানুষরা মুখবন্ধ লিখে জানান দিয়েছেন।

 

IMG_20180127_142337~2
চ এ অনুপ্রাস

 

IMG_20180127_183948~2
অনুপ্রাস যখন পয়ারে

 

সত্যিই এ বই পড়লে নতুন করে ছন্দরসিক হতে ইচ্ছা হতেই পারে, বাংলা শব্দের প্রাচুর্য না থাকলেও সহজ সরলভাবে ছন্দ মিলিয়ে কাব্যসৃষ্টির হয়তো অণুপ্রেরণা জাগাবে কিন্তু তার আগে সবচেয়ে যেটা দরকার, সেটা হলো প্রবাসী বাঙালি ভদ্রলোকের নিবিড় অধ্যবসায় এবং গবেষণার এই উপন্যাস বা গ্রন্থকে সর্বাগ্রে পৌঁছে দেওয়া, বিশেষ করে উঠতি কবিদের কাছে।

আমার কাছে তো “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” এর মতো এটাও সংগ্রহশালায় খানিকটা জায়গা অধিগ্রহণ করে নিল।

সূর্যনাথ ভট্টাচার্য মহাশয়কে অনেক ধন্যবাদ, ফেসবুক মারফৎ যার থেকে আমি জানতে পারি।

কৃতজ্ঞতা বইচই ডট কম কে। উৎফুল্লচিত্তে স্বীকার করে নিচ্ছি, বেশ ভালো রকম প্যাকেজিং করেই আমায় পাঠানো হয়েছিলো!

সাধুবাদ জানাই প্রীতম বসু মহাশয়ের প্রচেষ্টাকে! সশ্রদ্ধ প্রণাম রইলো ওনার প্রতি…..

 

© শুভঙ্কর দত্ত || January 27,2017