ধ্যান ‘চাঁদ’ ফিরে আসুন…

১৯৩৫ সাল…
অ্যাডিলেডে একটি হকি ম্যাচ চলছে… দর্শক আসনে স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান, একজনের খেলা দেখে উচ্ছ্বসিত! বললেন – “He scores goals like runs in cricket…”

যাকে নিয়ে বলছেন তিনি মেজর ধ্যানচাঁদ! অবশ্য নামটা আসলেই ধ্যান সিং ছিলো। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যখন Indian Army তে যোগ দিলেন, তখন প্রখর দৃষ্টিশক্তি আর রিফ্লেক্সের জন্য চাঁদের আলোয় প্র্যাক্টিস শুরু করলেন। মজা করে সতীর্থরা নাম দিলেন ”চাঁদ”, সেই থেকেই ধ্যান চাঁদ, নামের পরের “সিংহ” উবে গেলো। কিন্তু তার খেলা থেকে উড়লো না….! ছোটো থেকেই ধ্যানজ্ঞান ছিলো হকি স্টিকটা! পেয়ে গেলেন একটা রেজিমেন্টও, তখন চুটিয়ে হকি খেলা হতো সেখানে, হতো প্রতিযোগীতাও৷ কিভাবে সুযোগকে কাজে লাগাতে হয় সেটা ধ্যানচাঁদ শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। প্রথমে সুযোগ পেলেন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে, ব্যস্, নজর পড়লো জাতীয় নির্বাচকদের৷ চললেন কিউইদের দেশে, দুই ডজন থেকে মাত্র চারটে গোল কম করে সেই যে দ্বৈরথ শুরু হলো…. বাকিটা ইতিহাস৷ দেশে ফেরামত্রই আগে পেলেন Lance Nayak এর পদ।

খবরে…

আমস্টারডাম, অলিম্পিক – ১৯২৮
বেশ কিছু মাস আগে একটা খেলায় ইংল্যান্ড কে হারিয়ে দেওয়ায় ব্রিটিশরা কুটনীতি করে আমস্টারডামে ভারতীয় হকি দলকে পাঠালেন না, বেশ টালবাহানার পরে অবশ্য সেটা হয়। অবশ্য ১৯২৪ এর প্যারিস অলিম্পিকে পরিকাঠামোর অভাবে হকি রাখা না হলেও ১৯০৮ আর ১৯২০ এই দুবারই সোনার পদকটা পেয়েছিলো ব্রিটেনই! সুতরাং তাদের একটা ভয় ছিলোই। ভারতীয় দল প্র্যাক্টিস ম্যাচ থেকেই নজর কাড়তে শুরু করে। প্রথম ম্যাচ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ৬-০ তে জয়। তারপর একে একে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড এবং ফাইনালে ডাচরা! জয়ী ভারত! ধ্যানচাঁদ গোটা টুর্নামেন্টে করলেন ১৪ টা গোল। স্থানীয় সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হলো – “This is not a game of hockey, but magic. Dhyan Chand is, in fact, the magician of hockey.” এটাই অলিম্পিকে ভারতের প্রথম সোনা জয় এবং কোনো গোল হজম না করেই!

আমস্টারডামে প্রথমবার সোনার ছেলেরা

১৯৩২, লস অ্যাঞ্জেলস

প্রথম ম্যাচে জাপানকে ১১-১, ফাইনালে আমেরিকাকে ২৪-১…. এতো গোলের ফুলঝুরি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো। সহোদর Roop Singh কে সঙ্গে নিয়ে দুই জনে মিলে গোল করলেন ২৫ টা। ক্রীড়াজগৎ আখ্যা দিলো Hockey Twins. দ্বিতীয় সোনা ভারতের সেই হকির হাত ধরেই।

Dhayn Roop Singh – the Hockey Twins

এরপর অধিনায়কের দায়িত্ব পান। ১৯৩৩ সালে ভারতীয় হকির অন্যতম সম্মানজনক Beighton Cup এ Jhansi Heroes কে জেতান, পরেও অনেকবার বলেছেন সে ম্যাচটাই তার জীবনের প্রিয় ম্যাচ ছিলো, Calcutta Customs এর বিরুদ্ধে। তিনি বলতেন – If anybody asked me which was the best match that I played in, I will unhesitatingly say that it was the 1933 Beighton Cup final between Calcutta Customs and Jhansi Heroes. Calcutta Customs was a great side those days; they had Shaukat Ali, Asad Ali, Claude Deefholts, Seaman, Mohsin, and many others who were then in the first flight of Indian hockey.”

The Golen Era of Indian Sports

১৯৩৬ অলিম্পিক, আসর এবার বার্লিন, হিটলারের দেশে

বিভিন্ন দেশকে ৪০ টা গোল দিয়ে, একটিও হজম না করে ধ্যানচাঁদের ভারত ফাইনালে। গোটা বার্লিন শহর ভারতীয় দলের সাফল্য নিয়ে মজে গেলো। পোস্টারে ছয়লাপ সে শহরে – “Visit the hockey stadium to watch the Indian magician Dhyan Chand in action.” গোটা য়ুরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শক উপস্থিত…। বলা হতে লাগলো – “The Olympic Complex now has a magic show too”.
ফাইনালে প্রতিপক্ষ – জার্মানি যারা ভারতকে প্র্যাকটিস ম্যাচে ৪-১ গোলে হারিয়েছিলো, একটু চিন্তিত ছিলো ভারতীয় শিবির। দলের ম্যানেজার পঙ্কজ গুপ্তা তখনকার দিনের একটা পতাকা আনলেন, যেটা জাতীয় কংগ্রেস ব্যবহার করতো, ত্রিরঞ্জিত! তেতে উঠলেন খেলোয়াড়রা! শুরু হলো খেলা! স্টেডিয়ামে অ্যাডলফ হিটলার! প্রথমার্ধে জার্মান গোলকিপারের সঙ্গে জোর সংঘর্ষে দাঁত খোয়ালেন ধ্যানচাঁদ, কিন্তু দমে যাননি! সতীর্থদের বললেন – ওদের উচিৎশিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে বল কন্ট্রোল করতে হয় ওদের শিখিয়ে দেবো৷ প্রথমার্ধে একটু আটকে রাখতে পারলেও, দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো সেই ধুন্ধুমার খেলা, নিজেদের অর্ধ থেকে বলের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করলো জার্মানরা…. নাস্তানাবুদ করে ছাড়লো The Wizard এবং কোম্পানি! ৮-১ গোলে জয় এলো, ফাইনাল জেতার হ্যাটট্রিক করে পরপর তৃতীয় বারের জন্য সোনা পেলো ভারত। উল্লেখযোগ্য অবদান দুইভাই ধ্যানচাঁদ সিং আর রুপ সিং এর।

The Wizard
হিটলারের দেশে সোনাজয়ী দল

এরপরেই সেই বিখ্যাত কথোপকথন, যা আজও ধ্যানচাঁদ কে নিয়ে কথা হলে বলতেই হয়। হিটলার এবং ম্যাজিশিয়ানের মধ্যে–

That conversation between Dhyan Chand & Hitler

হিটলারের প্রস্তাবের সামনেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে কথা বলেছেন তিনি৷ আবার বেশ মজার হলেও কোনো খেলায় গোল না করতে পারলে অভিযোগ জানাতেন গোলপোস্ট এর মাপ নিয়ে এবং দেখা যেতো যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তেমন ভুলটাই হয়েছে। ১৯২৬ থেকে ১৯৪৮ এর বর্ণময় কেরিয়ারে প্রায় ৪০০ র বেশি গোল করেছেন তিনি৷ তাঁর সম্মানার্থে দিল্লীর জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের নাম ২০০২ সালে পরিবর্তন করে করা হয়েছে Dhyan Chand National Hockey Stadium, দেশের বাইরেও এরকম নামকরণ হয়েছে৷ লন্ডনে একটি টিউব স্টেশন আছে তাঁর নামে, জিমখানা ক্লাবেও তিনি উজ্জ্বল অক্ষরে বিরাজমান। হকির জাদুকর বা ম্যাজিশিয়ানের জন্মদিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে তাই প্রতি বছর এই দিনটিকে ভারতবর্ষে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়, দেশের প্রতিটি কোণা থেকে বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বদের পুরস্কার প্রদান করা হয় তাদের সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম গৌরবান্বিত করার জন্যে….

ধ্যান চাঁদ স্টেডিয়াম
রেজিমেন্টে…

১৯৫৬ সালে ভারতীয় আর্মি ছাড়ছেন যখন তখন তিনি ‘মেজর’…. আজ যখন ভারতীয় টিম অলিম্পিকে জায়গা পেতে হিমশিম খেয়ে যায়, তখন আমরা তাঁকে আমাদের দিবাস্বপ্নে অনুভব করতে চাই, করে ফেলি হয়তো…. তিনি শুধু সোনাই দেননি, এটাও বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন যে – হকি খেলেও বিশ্বে নাম কুড়ানো যায়। Happy Birthday, the Wizard!

ঝাঁসির এক পাহাড় চূড়োয়…

তথ্যসূত্র – কথোপকথন https://www.storypick.com/hitler-and-major-dhyan-chand/

ফিচার ইমেজ – Suchita Karmakar 🙏

© শুভঙ্কর দত্ত ✍ || August 29, 2020

লাউসেনের হতশ্রী ময়নাগড়ে…

IMG20191116152203-01
ময়নাগড়ের তোরণ

ময়নাগড়ের ইতিহাস বড়োই বিচিত্র! অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় ময়নাগড় মূলতঃ লাউসেনের গড়, ঠিক তেমনই মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। দুটির মধ্যে যোগ-সম্পর্ক স্থাপন করাটাই ইতিহাসের কাজ৷

IMG20191116154859-01
অপেক্ষা… এপারে আসার

উঁকি মারে ইতিহাস….

গৌড়ের অধিপতি দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে যুদ্ধে পরাজিত কর্ণসেন তাঁর অধীনে সেনভূম ও গোপভূম অঞ্চল শাসন করতেন। গৌড়েশ্বর এর মন্ত্রীর নাম ছিলো মহামদ যার চক্রান্তে সোম ঘোষ নামে একজন অনুগত প্রজা কারাগারে বন্দী হন। পরে এই সোম ঘোষের সাথে গৌড়েশ্বরের গাঢ় বন্ধুত্ব স্থাপন হলে রাজপাট্টা, একটি ঘোড়া এবং একশ দেহরক্ষী সৈন্যসহ সোম ঘোষ কর্ণসেনের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন। সোম ঘোষের পুত্র ইছাই ঘোষ কর্ণসেনকে যু্দ্ধে পরাস্ত করেন। তাঁর ছয় পুত্রকে বিনাশ করে রাজ্যের অধিকার নেন। পাঠক হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে এটা মহামদের ষড়যন্ত্র বই কিছু নয়। পুত্রশোকে কর্ণসেন-মহিষী বিষপানে আত্মহত্যা করেন। তখন গৌড়েশ্বর কর্ণসেনকে দক্ষিণবঙ্গের অংশবিশেষ (ময়নামণ্ডল) এর রাজত্ব দেন। তিনি আগমন করেন কংসাবতীর শাখানদী কালিন্দীর জলপথে, কর্ণসেনের নতুন রাজধানী কর্ণগড় যা পরে ময়নাগড় নামে বিখ্যাত হয়।

কর্ণসেন এর দ্বিতীয় ধর্মপত্নী রঞ্জাবতী বাঁকুড়ার রামাই পণ্ডিতের উপদেশে ধর্মঠাকুরের তপস্যা করে লাউসেন (বা লবসেন) কে পুত্ররূপে লাভ করেন যিনি মঙ্গলকাব্যে লাম্বাদিত্য নামেও খ্যাত। লাউসেন অজয় নদীর তীরে ইছাই ঘোষকে নিহত করে পিতৃরাজ্য উদ্ধার করেন৷ এইভাবে বীরবর লাউসেনের সাম্রাজ্য বীরভূম থেকে ময়না পর্যন্ত বিস্তার লাভ করলো। এই ময়না গড়ে এখনও লাউসেনের কীর্তিচিহ্ন রয়ে গেছে। রাঢ় বাংলার জাতীয় কাব্য ধর্মমঙ্গল এর নায়ক লাউসেনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িতে জায়গাটি যে ময়নাগড় সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নেই৷ রঙ্কিনী কালীমূর্ত্তি তাঁরই পূজিত এবং এই কালীমূর্ত্তি অন্যদিকে লাউসেনের বৌদ্ধ ধর্মপ্রীতিকেই স্পষ্ট করে….! যাই হোক্, এ কথায় পরে আসা যাবে।

IMG20191116153632-01
পারাপার @ কালিদহ

IMG20191116152924-01
স্বমহিমায়… নৌরাসযাত্রায়

বঙ্গ হলো। এবার বঙ্গের সাথে কলিঙ্গের যোগসূত্রটা ধরা যাক্।

মধ্যযুগে ময়না ছিলো উৎকল সাম্রাজ্যভুক্ত – ‘জলৌতি দন্ডপাট’ এর অন্যতম৷ পরগণা ছিলো দুটি — সবং-পিংলা, ময়না৷ প্রায় ছয়শো বছর আগে ১৪০৩ খ্রীষ্টাব্দে কপিলেন্দ্রদেব (শোনা শোনা লাগছে কি? কুড়ুমবেড়াতে জড়িত যিনি)
সিংহাসন অধিকার করেন, তার পরে তাঁরই অধস্তন সেনানায়ক কালিন্দীরাম সামন্ত অধিষ্ঠিত হন, সবং এর বালিসীতাগড়ে একটি দুর্গ নির্মিত হয়। প্রাপ্ত সূত্র এবং তথ্য অনুযায়ী এই কালিন্দীরামই হলেন বর্তমানে ময়নাগড়ে বসবাসকারী বাহুবলীন্দ্র বংশের আদিপুরুষ।

এরপর প্রায় দেড়শো বছর এগিয়ে যায় রাজ্য-রাজ্যত্ব, বংশ পরম্পরায় গোবর্ধন সামন্ত বালিসীতাগড়ের অধিপতি হন। যাই হোক্, উৎকল সাম্রাজ্য তখন হরেক চড়াই-উতরাই এর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে আসছে। সিংহাসনে বসলেন হরিচন্দন। সাম্রাজ্যের স্বরূপ উদঘাটনে তিনি সমস্ত রাজন্যবর্গের থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নিতে উদগ্রীব হলেন। বশ্যতা স্বীকার করতে সম্মত হলেন না গোবর্ধন। বন্দী অবস্থায় তাকে আনা হলো কারাগারে। গোবর্ধনের দেবোপম কান্তি, সঙ্গীতপ্রতিভা, মল্লযুদ্ধ — দেখে মুগ্ধ হলেন রাজা। উৎকল সাম্রাজ্যের খারাপ সময়ে এমন রণনিপুণ এবং রাজকীয় মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপন করতে পিছপা হলেন না উৎকল-নৃপতি৷ সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হলো তাঁকে, সঙ্গে সিংহাসন, রাজচ্ছত্র, চামর, বাণ, ডঙ্কা, যজ্ঞোপবীতাদি রাজচিহ্ন দেওয়া হলো। তাঁকে দেওয়া হলো উপাধি – একটা নয়, তিনটে — ‘রাজা’, ‘আনন্দ’ এবং ‘বাহুবলীন্দ্র’…. যে পদবী এখনও রাজপরিবারের সদস্যরা বহন করেন, এর অর্থ হলো ইন্দ্রের ন্যায় বাহুবলশালী। মূল শাসনকেন্দ্র হিসেবে সিলমোহর পেলো ময়নাগড়।

IMG20191116154812-01
বর্তমান “বাহুবলীন্দ্র” রা

বেয়াড়া জলদস্যু শ্রীধর হুইকে ময়না থেকে উৎখাত করেন তিনি, ফিরে এসেই। তখন তিনি ঐ গড় নতুন করে পরিখাবেষ্টিত করে দুর্ভেদ্য গড়ে পরিণত করতে আগ্রহী হন। দুটি পরিখা (কালিদহ ও মাকড়দহ) দিয়ে ঘেরা ছিলো তার গড়। প্রথম পরিখার মধ্যে চারিদিকে বেশ উঁচু পার্বত্য গুলিবাঁশের ঝাড় (১৯৫৫ সালের পর পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়) এমন ঘনভাবে পরস্পর সংলগ্ন ছিলো যে অস্ত্রধারী সৈন্য তো দূর কোনও যুদ্ধাস্ত্রও প্রবেশ করতে পারতো না। প্রচুর অর্থব্যয়ে রাজা গোবর্ধন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন, যা ছিলো নিখুঁত এবং রন্ধ্রবিহীন, গড় সংস্কারেই তার পরিচয় মেলে। বৃটিশ কালেকটর এইচ.ভি.বেইলির বর্ণনায় সেদিক ফুটে উঠেছে।

IMG20191116154640-01
তাল সারি

IMG20191116154833-01
সেকালের পরিখা আজও অক্ষত

এই হলো যোগসূত্র… এরপর কালের নিয়মে তৃতীয় আর একটি পরিখা আজ বিলীন৷ বালিসীতাগড় এর দুর্গ ধুলায় মিশে গিয়েছে। বাহুবলীন্দ্র সাম্রাজ্যে বংশপরম্পরায় এসেছেন – পরমানন্দ, মাধবানন্দ, গোকুলানন্দ, কৃপানন্দ, জগদানন্দ, ব্রজানন্দ, আনন্দনন্দ, রাধাশ্যামানন্দ। আগ্রার মুঘল দরবারে এক সময় উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিলো পরমানন্দের — উড়িষ্যার রাজপ্রতিনিধি হিসেবে। মুর্শিদাবাদের নবাবী হুকুমতেও জগদানন্দ ছিলেন সমাদৃত। স্বাধীন ময়নাগড় বৃটিশ পর্বে কেবল পরবশ হয়েই রয়ে গিয়েছিল। মারাঠাদের আক্রমণও ভেদ করতে পারেনি প্রতিরক্ষার চাবি, তাও অষ্টাদশ শতকে।

এবার আসি কি আছে এই ময়নাগড়ে….

ময়নাদুর্গের চৌহদ্দির মধ্যে রয়েছে বৈষ্ণব – শৈব – শাক্ত মন্দির যা যথাক্রমে শ্যামসুন্দর মন্দির, লোকেশ্বর শিব, মহাকালী রঙ্কিণীদেবী)। রয়েছেন ধর্মঠাকুর (যদিও দেখা হয়নি), মোহান্ত নয়নানন্দ দেবগোস্বামী সমাধিমন্দির, তিন শতাব্দী প্রাচীন সূফীপীর দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা), যা নৌকা থেকে দেখেই শান্ত থাকতে হলো, যদিও সেখানে যাওয়ার জন্য ছোটো ডিঙা রয়েছে। সত্যিই AN ISLAND WITH AN ISLAND এই ময়নাগড় পঞ্চদেবতার গড়ও বটে, যেখানে বৈষ্ণব -শৈব-শাক্ত-ধর্ম-পীর সকলেই আছেন।

IMG20191116164531-01
ময়নাগড় – সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র

IMG20191116160759-01
রাজবাড়ির অংশবিশেষ

সেই মধ্যযুগ থেকেই এখানে গড়ে উঠেছিলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থান। আজও সেই ঐতিহ্য সমানে চলে আসছে। একসময় প্রচলিত ছিলো ধর্ম ঠাকুরের নিত্য পূজা, জগন্নাথ- বলরাম- সুভদ্রা রথযাত্রা, বড় হোলির সান্ধ্যমেলা এবং মহেশ্বরের বৈশাখী গাজন। অবশ্য সেসব আজ স্মৃতিকথা মাত্র। গড়সাফাৎ গ্রামের চতুষ্পার্শ্বে ছিল পরিকল্পিত পরিখা, প্রতিরক্ষার তৃতীয় ধাপ হিসেবে গণ্য হতো। তা আজ অবলুপ্ত। তবে কার্তিকী পূর্ণিমায় বর্ণাঢ্য নৌ-রাসযাত্রার দৃষ্টান্ত আজ বিরল। রাসমেলা পেরিয়ে কালিদহে নৌযাত্রা করে দুর্গে গিয়ে খানিক ঘোরাঘুরির সুযোগ এই রাসমেলাকে এক দারুণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। সারা বছর এই ময়নাগড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, শুধুমাত্র এই রাসমেলার কয়েকদিনই। সূর্যাস্তের সময় কালিদহ যে কি রূপ নেয়, তা হয়তো না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়। লাউসেন এক কিংবদন্তি, বাঁকুড়া জেলার ময়নাপুরে পশ্চিম আকাশে কোনো এক অমাবস্যার রাতে সূর্যোদয় ঘটান বলে জনশ্রুতি আছে। যাই হোক্, সে ময়নাগড়ও আজ নেই আর, হতশ্রী, তার গরিমা আর নেই,তবুও তার কাঠামো আজও অটুট। এতো বছর পরেও সেখানে রাজবংশীয়রা রয়েছেন, এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও কিচ্ছুটি হয়নি। ভাবতে অবাকই লাগে… তবে পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নালোকে বা সৌদামিনীর ক্ষণিক উপস্থিতিতে কেমন অপরূপ রূপ ধারন করে এই কালিদহ তার বেশ উপভোগ্য – এটুকু দেখার ইচ্ছে রইলো….

IMG20191116163003-01
কালিদহ তখন ডুবুডুবু সূর্যের আভা গায়ে মাখে

IMG20191116163306-01
সূর্যাাস্ত পানে একলা নাও

IMG20191116163858-01
নৈসর্গিক

লোকেশ্বর শিব মন্দির

কালিদহের তীরে রয়েছে লোকেশ্বর শিব মন্দির। মন্দিরের মধ্যে বেশ গভীরে শিবলিঙ্গ স্থাপিত ছিলো। বর্গী হামলা থেকে রক্ষা পেতে যে সুড়ঙ্গ পথ নদীতীর অবধি বিস্তৃত ছিলো, তা বেশ ভালো রকম সক্রিয় থাকায় শিবকুন্ডটি বন্যায় অতিরিক্ত জলে ডুবে যায়। মন্দিরটির নির্মাণকাল আধুনিক যুগ হলেও, টেরাকোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়৷ বিষয়বস্তু গুলিও বেশ সময়সাময়িক – অশ্বারোহী, কৃষ্ণের রথ ইত্যাদি। তবে সবথেকে আকর্ষণীয় এবং একই সাথে দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়া মন্দিরটি চালে একটি নারীমূর্তি। যদিও এখন এমন রঙ করা হয়েছে যে বুঝতে বেশ অসুবিধা হয় যে আদৌ টেরাকোটা আছে কি না। এই শিব মন্দিরেই এখন পূজিত হন রঙ্কিণী দেবী — যা কালীমূর্ত্তির বৌদ্ধ সংস্করণ বলা ভালো। লাউসেনের অস্তিত্বের পরিচায়ক যা….।

IMG20191116155451-01
লোকেশ্বর শিব মন্দির : সামনে থেকে

IMG20191116160104-01
লোকেশ্বর মন্দির : পেছনের দিক

IMG20191116162501-01
রঙ্কিণী কালি মূর্ত্তি

IMG20191116162414-01
টেরাকোটার নিদর্শন : রথ

IMG20191116162406-01
অশ্বারোহী : লোকেশ্বর শিব মন্দিরগাত্রের টেরাকোটা

IMG20191116162323-02
শায়িত নারী

Statue Of Dignity

লোকেশ্বর শিব মন্দিরের সামনে একটু দূরত্বে রয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ, রাজা জগনানন্দের সম্মানার্থে – Statue of Dignity, ২০১৪ সালে নির্মিত৷ রাজার শেষদশায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ময়নাগড় আক্রমণ করলে জগনানন্দ আত্মসমর্পণ করেননি,গড়ের ভেতরে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আত্মগোপন করে থাকেন। হেস্টিংস অনেক হম্বিতম্বি করলেও ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মীরকাশিমের মধ্যে লিখিত চুক্তি অনুযায়ী জমিদারী অক্ষুন্নই থেকে গেলো।

IMG20191116155351-01
Statue of Dignity

শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির

কালিদহের তীরে অবস্থিত আর একটি মন্দির — শ্যামসুন্দরজীউর ‘পঞ্চরত্ন’ মন্দির, দেউল রীতির। এই শ্যামসুন্দরজীউ হলেন বাহুবলীন্দ্র পরিবারের কুলদেবতা। প্রতিষ্ঠা লিপি নেই, খুঁজেও পেলাম না। শুধু সংস্কারের কতগুলি তথ্য মিললো। শ্যামসুন্দর মন্দিরের দেওয়ালে নৃত্যরত গৌর-নিতাই এর মূর্তি পাওয়া গেলো। সেখানে একজন বুকস্টল নিয়ে বসে ছিলেন, একটা বই নিলাম।

IMG20191116161423-01
কুলদেবতার অধিষ্ঠান

IMG20191116161841-01
গৌর – নিতাই

IMG20191116161923-01
সংলগ্ন ঘাটের পথ

IMG20191116162027-01
শ্যামসুন্দরজীউর মন্দির : গোপাল থাকেন যেখানে 

লাউসেনের গড়

লাউসেন – লাউসেন করছি এতোবার। লাউসেনের নির্মিত গড়ের প্রায় পুরোটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। যেটুকু আছে, যে কোনো সময় হয়তো ভেঙে পড়তে পারে। জঙ্গলাকীর্ণ ঐ ভগ্ন গড়ে এখন বটগাছের বাস৷ স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে কিছু সাপখোপ হয়তো আছে, এখন শীতঘুমে গিয়েছে বলে মুখোমুখি হতে হয়নি। ভেতরে ঢুকে দেখলাম কিছু বিকৃতমস্তিষ্কের লোকজন এসে দেওয়ালে নিজেদের নামগুলি খোদাই করে গিয়েছে। একটা সিঁড়ি আছে, ভাঙা। দেখলাম, কয়েকজন কিশোর বয়সী ছেলে সেটা দিয়ে ওপরে উঠে মজা করছে, আমার একটু ইচ্ছে হলেও, সঙ্গীরা পেছন টানলো। অগত্যা, শুধু ফটো তুলে ক্ষান্ত থাকতে হলো।

IMG20191116160629-01
জঙ্গলাকীর্ণ

IMG20191116160601-01
আড্ডা, এটিই লাউসেনের গড়

IMG20191116160645-01
না থাকার মতোই

IMG20191116160832-01
মাথাহীন রাজবাড়ি

সম্প্রীতির ময়নাগড়ে…

দ্বিতীয় পরিখার পর গড়ের অন্তর্ভুক্ত যে ভূখণ্ডটি ছিলো সেখানে বর্তমানে রবিবারের বাজার (ময়নার প্রাচীনতম)। এই বাজারেই বসে রাসের মেলা এই ভূখণ্ড ময়নাগড়ের অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ দূর করে দেয় এখানে অবস্থিত তোরণটি, যেটি খুব ভিড়েও রাসমেলার মধ্যে সঠিক দিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অতীতে পাঠান,শেখ ও খাঁনদের আনা হয়েছিলো গড় রক্ষার কাজে। গড়সাফাতের প্রাচীন হক্কানি মসজিদটি রাজার অর্থানুকূল্যে নির্মিত। বস্তুত ময়নাগড়ের এক প্রান্তে কালিদহের অপর পাশে রয়েছে সূফীপীরে দরগা (হজরত তুর জালাল শাহ দরগা) । সুতরাং, এই গড়সাফাৎ যে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির সাক্ষর বহন করে চলেছে, তার বাংলা-আরবী শব্দসমন্বয় দেখেই অনুমেয়।

IMG20191116154531-01
সূফীপীরের দরগা, নৌকা থেকে 

আকর্ষণ…

একদা প্রচলিত বাহুবলীন্দ্রদের রথযাত্রা তমলুক মহকুমার মধ্যে প্রাচীনতম৷ ময়নাগড়ের শ্যামসুন্দরজীউর রাস উৎসব পঞ্জিকাতে লিপিবদ্ধ বাংলার অন্যতম একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ৷ ১৫৬১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হয়ে আসা প্রায় ৪৬০ বছরের পুরনো এই রাসমেলা পূর্বে একমাস ধরে হলেও, পরে ২২ দিন এবং বর্তমানে পক্ষকাল ধরে চলে। এই মেলার মুখ্য আকর্ষণ থালার মতো বাতাসা এবং ফুটবলের আকারে কদমা, যদিও এখন ছোট কদমার কদর বেশি, ঠিক যেন কদম ফুলটি।

সত্যজিৎ রায় – গয়নাবড়ি এবং ময়নাগড়

অনেকেই হয়তো জানেনই না সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্ববন্দিত পরিচালকের পা পড়েছিল এই ময়নাগড়ে। এখানকার বিখ্যাত গহনাবড়ি (উপহার স্বরূপ প্রাপ্ত) সত্যজিৎ রায় তার “আগন্তুক” সিনেমার একটি দৃশ্যে ব্যবহার করেন। তারও বহু বছর পূর্বে “অশনি সংকেত” সিনেমার শ্যুটিং এর অভিপ্রায়ে রিক্সা করে এসেছিলেন ময়নাগড়, পরিখাবেষ্টিত গড় ঘুরে দেখেনও, কিন্তু পুরো ইউনিট নিয়ে যাওয়ার সাহস পাননি। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং থাকার জায়গার অসুবিধার জন্য। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ হয়তো পথের পাঁচালীর বোড়াল গ্রামের মতো ময়নাগড়ও বিশ্বের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকতো। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা চিঠি থেকেও বাহুবলীন্দ্র পরিবারের তৈরী গহনাবড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রণবেশ সেন এর কথায় — দুটি জিনিস খুব দুঃখের, এক দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন এবং এতো সুন্দর গহনার মতো বড়ি ভেঙে খাওয়া। তাঁর উদ্যোগে এই বাড়ির গয়নাবড়ি পুরো প্রস্তুতির দৃশ্য কলকাতা দূরদর্শন কেন্দ্রে সম্প্রচার করা হয়।

গয়নাবড়ি @ আগন্তুক
আগন্তুক সিনেমার একটি দৃশ্যে : আহারের এতো বাহার

কালিদহ পার হয়ে…

যাই হোক্, আমাদের ভাগ্যটা ভালো ছিলো। আমরা এক শনিবারে তিনটের দিকে রবিবারের বাজারে বসা ঐ রাসমেলাতে পৌঁছে তড়িঘড়ি নৌযাত্রায় চলে যায়, লাউসেনের স্মৃতিবিজড়িত ময়নাগড় ঘুরে যখন ফেরৎ আসি তখন দেখি প্রায় দু’শো লোক নৌরাসযাত্রা উপভোগ করতে উৎসাহে অপেক্ষারত। কালিদহের জলে গোধূলির আকাশ প্রতিফলিত হওয়ার পূর্বেই আমরা সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্রের মেলা থেকে খানিক কদমা কিনে,ব্যাগস্থ করে ফিরে আসি…..!

IMG20191116165353-01
কদমা

IMG_20191119_183434
পুরো মানচিত্র রইলো, যাতে আগ্রহী যারা, তারা কেউ ছেড়ে না আসে (‘কিল্লা ময়নাচৌরা’ থেকে সংগৃহীত), আমরা ঘুরতে পারিনি 

তথ্যসূত্র :
কিল্লা ময়নাচৌরা – ডঃ কৌশিক বাহুবলীন্দ্র

© শুভঙ্কর দত্ত || November 19, 2019

ঘুরে এলাম কুড়ুমবেড়া-মোগলমারি-শরশঙ্কা…

বহুদিনের ইচ্ছে কুড়ুমবেড়া যাবো…
সেই কবে ফেসবুকে জনৈক ভবঘুরের পোস্ট দেখেছিলাম৷। সেই কত্ত দিনের প্ল্যান একটা। আগে দু’বার ব্যর্থ হয়েছে। তার মধ্যে একবার বুলবুল এর জন্য। শেষমেশ যাওয়া হলো…. তাও কুড়ুমবেড়া শুধু নয়, সাথে মোগলমারি বৌদ্ধবিহার হয়ে শরশঙ্কা দীঘি — এক্কেবারে কম্বো প্যাকেজ যাকে বলে….! সৌমেন তো থাকই, এবার সুুুুুরজিৎও সামিল হলো….!

কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু…

 

IMG20191113105514-01
বহিরাবরণ

এবার কুড়ুমবেড়া দিয়ে শুরু করা যাক্…! বেলদা থেকে কেশিয়াড়ী যাওয়ার বাসে করে ১০ কিমিরও কম দূরত্বে কুকাই, সেখান থেকে সদ্য বাঁধানো পথে টোটোই করে গগণেশ্বর গ্রাম…..! বটতলায় এসে থামলো… একদিকে বিস্তীর্ণ পুকুর আর তারই উল্টো দিকে ইতিহাসের স্বাক্ষর বহন করে চলা প্রায় সাতশো বছরের পুরনো এই দুর্গ।ইংরেজরা জেলার গেজেটিয়ার রচনার সময়ও এটিকে দুর্গ বলেই উল্লেখ করেছে।

IMG20191113110357-02
করমবেরা….

IMG_20191114_123357-01
গুগল ম্যাপে স্যাটেলাইট ভার্সান কি? কারুকাজ বটে…

নামের বিভিন্নতায় ‘র’ আর ‘ড়’ এর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিলো। ও বাবা, ভেতরো ঢুকে দেখি লেখা আছে আর একরকম- ‘করমবেড়া’!
যাই হোক্, নাম যাই হোক্, এবার একটু ইতিহাস কি বলছে, সেখানে তাকানো যাক্! আর এক গোলমাল! ইতিহাস এমনিতেই বিতর্কিত এবং এই জায়গাটির ইতিহাস পড়তে গিয়ে দেখি “নানা মুণির নানা মত” একদম সাড়ম্বরে প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও সেদিকে যাচ্ছি না।

 

একটু ইতিহাস…

১৪৩৮ থেকে ১৪৭০ সালের মধ্যে ওড়িশার রাজা কপিলেন্দ্রদেবের আমলে নির্মিত হয় এই দুর্গ। গজপতি বংশের রাজা কপিলেন্দ্রদেবের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল বর্তমান হুগলি জেলার দক্ষিণ অংশ মান্দারণ থেকে দক্ষিণ ভারতের মাদ্রাজ পর্যন্ত। অবশ্য মান্দারণ আমার বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই। বারবার গেলেও এটা একদমই অজানা ছিলো। ঝামা বা ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে আদতে একটি শিবমন্দিরই তৈরি হয়েছিল এখানে।

IMG20191113111227-01
প্যানোরমা তে কুড়ুমবেড়া

IMG20191113114133-01
শৈলী…মাকড়া পাথর

প্রথমে আফগান সুলতানরা (পড়ুন দাউদ খাঁ) দখল করেন এ দুর্গ। অতঃপর ঔরঙ্গজেবের আমলে আফগানরা পরাজিত হলে মোগল সম্রাটের হাতে আসে সে দুর্গ। বাংলা এবং উড়িষ্যার বহু মন্দির মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর ফরমান আসে, বাদ যায়নি এই দুর্গের ভেতরকার মন্দিরটিও, একেবারে দুর্গের ভেতরের মাঝে জলাধারের মতো যে ভাঙা অংশটি রয়েছে (যাকে যজ্ঞবেদীও বলা হচ্ছে), দেখলে বোঝা যায়, সেটি কোনো মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যদিও ভিন্নমত। তবে তিন গম্বুজের ঐ স্থাপত্যখানি যে মসজিদ সেটাও আন্দাজ করা খানিক সহজই।

IMG20191113111337-01
দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ

IMG20191113115750-02
কিছু নবীন…

তাহের খানের অধীনে সেনাদের আশ্রয় শিবির হয়ে ওঠে কুড়ুমবেড়া। সেই থেকে মন্দির বদলে যায় দুর্গে। ‘মেদিনীপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থের প্রণেতা যোগেশচন্দ্র বসু লিখেছেন, “…মন্দির গাত্রে উড়িয়া ভাষায় লিখিত যে প্রস্তর ফলকখানি আছে, তাহার প্রায় সকল অক্ষরই ক্ষয় হইয়া গিয়াছে, কেবল দু’একটি স্থান অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট আছে, উহা হইতে ‘বুধবার’ ও ‘মহাদেবঙ্কর মন্দির’ এই দুইটি কথা মাত্র পাওয়া যায়।” (বই খানি আমি পড়িনি যদিও)।

IMG20191113105731-01
প্রাচীন…

পরে এই দুর্গে মারাঠারাও ঘাঁটি তৈরি করেছিল বলে মনে করা হয়। বেশ কয়েকজন গবেষক সে কথা জানিয়েছেনও। লিখেছেন। তবে এটিকে ঠিক দুর্গ বলা যায় কি? কোনো অস্ত্র ভাণ্ডার নেই, লুকিয়ে থাকার গোপন কুঠুরি নেই, বিপদ-আপদে-আক্রমণে হুট করে পলায়ন করার জন্য বাইরে বেরোনোর রাস্তা কোথায়? সবথেকে বড়ো কথা ওয়াচটাওয়ার নেই। বরং এটি একটি উৎকল স্থাপত্যেরই নির্দেশক, মানে এর গঠন শৈলী। যারা বহু বার পুরী গিয়ে তা করায়ত্ত করতে পারেননি, তাদের প্রতি সমবেদনা।
মাকড়া পাথরে তৈরী অপূর্ব এই সৌধের প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকে রয়েছে তিন গম্বুজ যুক্ত মসজিদ। একদা জেলা গেজেটিয়ারে লেখা হয়েছিল, সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ১৬৯১ খ্রিস্টাব্দে জনৈক মহম্মদ তাহির এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৯৯০ সালে কুড়ুমবেড়া অধিগ্রহণ করেছেন আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া।

IMG20191113114533-01
পরিখা থেকে….

IMG20191113111702-01
তিন গম্বুজের মসজিদ

IMG20191113114707-01
মধ্যমণি বিলীন…মসজিদই তাই কেন্দ্র

IMG20191113120751
কারসাজি… ট্রিপল ক্যামেরা 😂

তবে দেখে ভালো লাগলো যে রক্ষণাবেক্ষণ হয়, রেলিং দিয়ে দুর্গ মধ্যস্থ এলাকাগুলিতে এখন বোধহয় আর ঢোকা যায় না। শোভাবর্ধক গাছ লাগানো আছে, রলিং ঘেঁষে। একজন লোককেও দেখলাম, জল দিতে।

দুর্গটির ভেতর এবং বাহির — দারুণ লেগেছে। প্রাকৃতিক বড্ড বেশিই। পরিধি বরাবর হাঁটতে থাকলে মাঝে মাঝে পা হড়কে যায়, শ্যাওলার দল জমি অধিগ্রহণ করেছে যে। পুরো দুর্গটা চক্কর দিতে বেশ সময়ও লাগে….বেশ ঠাণ্ডাও অনুভূত হয়, শ্যুটিং স্পট হিসেবে মন্দ নয়। ভাবতেই অবকা লাগে পুরোটা পাথর কেটে বানানো… অথচ এখনও অটুট,যদিও কিছু পিলার নতুন করে বানানো। যে কোনো একটা কর্ণারে গিয়ে ক্যামেরা তাক করলেই একটা একটা করে লকস্ক্রিন করার ফটো বেরিয়ে আসবে….! সঙ্গে থাকলো – রবিকিরণ, প্রায় সব সময়ই দারুণ দারুণ সব ফ্রেম উপহার দিয়ে দিলো সে।

 

IMG20191113113449-01
সাতরঙা ফ্রেম…

IMG20191113120139-01
প্রাকৃতিক ভাজক…

বাইরে থেকে বহু চেষ্টা করেও… ওয়াইড অ্যাঙ্গেল, পুকুরপাড় সবকিছুর ইস্তেমাল করেও পুরোটা এলো না। বটগাছের ঝুরির ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে দুর্গ, — তার ভেতর আর বাহির যেন একে অন্যের পরিপূরক৷

IMG20191113122251-01
মৎস্য সন্ধানে… সামনের পুষ্করিণীতে

IMG20191113113004_01-01
প্রতিভাত রবি

—————————————————————-

এবারে মোগলমারি…

IMG20191113144743
কদম কদম বড়ায়ে যা..

বেলদায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে চলে এলাম মনোহরপুর। গুগল ম্যাপে ভুলভাল এবং একাধিক অবস্থানের কারণে প্রথমে হেঁটে বিপথগামী হচ্ছিলাম, সহায় হলেন একজন বৌদিস্থানীয় ভদ্রমহিলা। পরে বুঝলাম একটা পথ নির্দেশক বোর্ডকে আমরা অবহেলা করেছি৷ ব্যাক গিয়ার মেরে হেঁটে প্রায় হাফ কিমি যেতেই গ্রাম্য রাস্তার একপাশে পড়লো – মোগলমারির বৌদ্ধবিহার। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সুন্দর নয়, অর্থ সাহায্যের অভাবে অবহেলিত এবং সুসজ্জিত নয় বটে, তবে তার ইতিহাস রীতিমতো গাম্ভীর্য বহন করে। প্রায় ১৫০০ বছরের ইতিহাস এই মোগলমারি৷ ওখানের এক বিবরণ বোর্ডে দেখলাম লেখা আছে এটি গুপ্তোত্তর যুগের একটি স্থাপত্য!

IMG20191113135851-01
মোগলমারি বৌদ্ধবিহারের প্রবেশপথ

IMG20191113140359-01
খননস্থল

‘মোগলাই’ খেতে গিয়ে প্রথমবার যেমন মনে হয়েছিল বেশ একটা ঐতিহাসিক ফাস্ট ফুড খাচ্ছি, সেরকম ‘মোগলমারি’র নামকরণের কারণ খুঁজতেই অবধারিতভাবেই চলে এলো — মোগলাই থুড়ি মোগল…মুঘল।
কেউ বলেন মুঘল-পাঠান যুদ্ধে অনেক মুঘল সৈন্য মারা গিয়েছিল বলে জায়গাটির নাম মোগলমারি। কেউ বলেন মুঘলরা এই পথ (‘মাড়’ অর্থ পথ) মাড়িয়ে গিয়েছিল; তাই অমন নাম। পাশ দিয়ে একসময় বয়ে যেত সুবর্ণরেখা…সে বিহার নেই, নেই সুবর্ণরেখাও, মন খারাপ করেই সে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে, প্রায় দু-তিনি কিমি দূরে…..
সামন্তরাজা বিক্রমকেশরীর রাজধানী ছিল এ অঞ্চল। কন্যা সখীসেনার পড়াশোনার জন্য জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়েছিল।

IMG20191113142914-01
মিউজিয়াম @ মোগলমারি

IMG20191113142759
অবহেলিত মিউজিয়াম

চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এর বিবরণীতেও এই বৌদ্ধবিহারের উল্লেখ রয়েছে।
২০০৩-০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-গবেষক ডঃ অশোক দত্তের তত্ত্বাবধানে খননকার্য প্রথম শুরু হয়, যদিও তার আগে ময়ূরভঞ্জ (অধুনা ওড়িশা) এর আর্কিওলজিকাল সার্ভেতে এর কথা উল্লেখ আছে, হয়তো সেটিই সূত্র হিসেবে কাজ করে। এখান থেকে অদূরে যেই কুড়ুমবেড়ার গল্প এতক্ষণ করলাম, সেখানে আফগান সুলতান দখল নেওয়ার সময় এই মোগলমারির সেনা ছাউনি থেকেই ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি তাকে আক্রমণ করেন, পরে ঔরঙ্গজেবের মুদ্রার হদিশ মেলে এখানে।
পশ্চিমবঙ্গে আবিষ্কৃত বৌদ্ধবিহারগুলির মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়। খননে পাওয়া গেছে প্রায় ৫২ ধরণের নকশাযুক্ত ইঁট, রাজা সমাচার দেবের মিশ্রধাতুর মুদ্রা, স্বর্ণ লকেট এবং মুকুট, বুদ্ধ-বোধিসত্ত্ব-বৌদ্ধ দেবদেবীর ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, স্টাকোর কারুকার্য মণ্ডিত নক্সাযুক্ত দেওয়ালঅলংকরণ ও ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র, প্রদীপ প্রভৃতি জিনিস। গুপ্ত পরবর্তী ব্রাহ্মি অক্ষর যুক্ত সীল ও সীলমোহরও আবিষ্কৃত হয়েছে এইখানে। বর্তমানে খননকার্য স্থগিত আছে, মিউজিয়ামের ওখানের একজন দাদা বললেন এখন আর খননের পারমিশন নেই।

IMG20191113142349
প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শনবাহী…

IMG20191113143056-01
মাটি খুঁড়ে পাওয়া স্টাকো মূর্তির কতিপয় এখনো বিরাজমান

বেশিরভাগই এখানে এখন আর নেই। কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে পাশে একটা ছোট্ট মিউজিয়াম আছে যাতে খননে প্রাপ্ত কিছু জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় তরুণ সংঘের উদ্যোগে সে মিউজিয়াম দেখানোর ব্যবস্থা থাকে। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছেছি, তখন চাবি লাগানো দেখে ফোন করলাম, একজন খানিক পরে এসেই খুলে দিলেন। একটু একটু গল্প বললেন। মিউজিয়ামটির হাল ফেরাতে এবং সর্বাঙ্গসুন্দর করে তোলার জন্যে ওনার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁবু খাটানোর মতো একটা জায়গায় গিয়ে দেখলাম কতগুলো আরো মূর্তি৷ মিউজিয়ামের ভেতরে শুধুই খুচরো কতগুলো জিনিসপত্র আছে। বাকি সবই সরকারের অধীনে, কলকাতার জাদুঘরে।
খননকার্যে পাওয়া সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং অবাক করে তথ্য হলো – এখানে একদিনে, একই স্থান থেকে একই সঙ্গে ৯৫ টি ব্রোঞ্জ মূর্তি উদ্ধার পৃথিবীর প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে এক বিরলতম নজির। পণ্ডিতগণের মতানুসারে এটি উত্তর-পূর্ব ভারতে অবস্থিত প্রাচীন এবং বৃহৎ বৌদ্ধ স্থাপত্যগুলির মধ্যে অন্যতম।

IMG20191113142107
এখন সবই যাদুঘরে

IMG20191113143437
পর্যটকদের সাত্ত্বনাদায়ক জায়গাটি

ভারতবর্ষের মাটিতেই পথচলা শুরু হয় হিন্দু – জৈন- বৌদ্ধ ধর্মের। কালক্রমে সব ধর্মের চড়াই-উতরাই হয়েছে। সেই ষষ্ঠ শতক থেকে বারংবার পুনর্নির্মাণের মধ্যে দিয়ে সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে এই মোগলমারি৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের অখ্যাত এক গ্রামের পথের পাশে….. ক’জনই বা আর বুঝবে এর গুরুত্ব? বাঁচিয়ে রাখতে হবে যে!
পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তাই দেখে আসা উচিৎ, এই জন্য যে আমাদের অবহলোর দরুণ কত জানা জিনিসও আমাদের কাছে অজানা হয়েই রয়ে যায়।

পথনির্দেশ – বেলদা থেকে দাঁতনগামী বাসে মনোহরপুর বা ট্রেনে খড়গপুর থেকে ট্রেনে করে নেকুড়সেনি থেকে অনতিদূরেই….

 

————————————————————-

অপরাহ্নের  শরশঙ্কা দীঘি….

IMG20191113160631-01
যে দিকে দুচোখ যায়..

মোগলমারি পর্ব চুকিয়ে বাসে উঠেছি, সরাইবাজার (দাঁতন) যাবো। সুরজিৎ এর বন্ধুর সাথে দেখা, সে জিগ্যেস করলো কোথায় যাবি?
উত্তরে শরশঙ্কা শুনে আশেপাশের বেশ কয়েকজন অবাক হলেন। সে হোক গে…

দাঁতন থেকে একটা ট্রেকারের মাথায় চেপে বসলাম। দুলতে দুলতে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু নামবো কোথায়? শরশঙ্কা বলতে ট্রেকারের হেল্পারের পোস্টে থাকা লোকটি বললো – শরশঙ্কাতে ৪ টে স্টপেজ, কোথায় নামবে? বলে দিলাম যেখানে নামলে দীঘিতে সহজে যাওয়া যাবে। এসব বলতেই স্থানীয় এক ভাই সহায় হলেন, তিনিই বলে দিলেন লোকটিকে আমাদের আসলে কোথায় নামলে সুবিধে হবে। নেমে দীঘির পাড়ে গিয়ে দেখি কতগুলো বাঁদর সাদর অভ্যর্থনা জানাচ্ছে, উঁচু পাড়ে বসে। একটা জিনিস দেখে রীতিমতো অবাক লাগলো….দীঘিতে যাতে কচুরিপানারা ভিড় না জমায় তার জন্য দীঘির পাড়েই চারপাশে আলাদা আলাদা করে ছোটো ছোটো পুকুর কেটে তার মধ্যেই কচুরিপানাকে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। দীঘির এপার থেকে ওপার স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। যেদিক তাকায় শুধু জল আর জল…..ব্যাকগ্রাউণ্ড জুড়ে শুধু সাদা রং! চারদিকের পাড়ে গাছগাছালি….পাখিদের ডাক! কি অপূর্ব বাস্তুতন্ত্র সেখানে বিরাজ করে, বায়োলজির কেউ গেলে আরো ভালো প্রত্যক্ষ করতে পারতো। দীঘির চারদিকে পাড়ে পাড়ে বেশ কিছু মন্দির রয়েছে।

IMG20191113155355-02
একটু জিরো…..

IMG20191113160810-01
ছটা…

IMG20191113160821-01
দূরে দিগন্তে মন্দির….

ওই দীঘির দক্ষিণ পূর্ব কোনে রয়েছে পীর দেওয়ানগঞ্জের মাজার। পৌষ সংক্রান্তির দিন তাঁর কবরে মাটি দিতে আসেন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। পৌষ সংক্রান্তির দিন মেলা বসে। সেখানে রয়েছে পান্ডব ঘাট।
মাজারের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য মন্দির।
জগন্নাথের মন্দির, জটেশ্বর শিব ,ঝিঙ্গেশ্বর শিব, রামেশ্বর শিব,কালী ও শীতলা মন্দির।
সে সব জায়গায় যাওয়া আর হলো না। অপরাহ্নের ডাকে ফিরে আসার ট্রেকার ধরার ছিলো যে….!

IMG20191113155822-01
বিলীয়মান সূর্যের আভা

লোকবিশ্বাস

মহাভারতের মূষল পর্বে শ্রীকৃষ্ণ বৃক্ষে আশ্রয় নেওয়াকালীন জরা ব্যাধের শরাঘাতে হাত থেকে পাঞ্চজন্য শঙ্খ ছিটকে পড়ে। তার আঘাতেই এই দীঘির সৃষ্টি বলে লোকবিশ্বাস।

পাণ্ডবরা বিরাটনগরে যাওয়ার পথে ক্লান্ত হয়ে এই দীঘির পাড়ে রাত্রিযাপন ও স্নান করেন। তারই অনুকল্পে দিঘির একটি ঘাটের নাম পাণ্ডব ঘাট। এই সেই পাণ্ডব ঘাট যেখানে মকর সংক্রান্তিতে স্নান করেন পুণ্যার্থীরা।

রাজ‍্যের বৃহত্তম দীঘি এই দীঘি নিয়ে বহুচর্চিত জনশ্রুতিটি হলো এটি নাকি রাজা শশাঙ্কের আমলে বানানো।
সর শব্দের সংস্কৃত ভাষায় ‘জল’।
রাজা শশাঙ্ক মাকে নিয়ে সম্ভবত জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছিলেন পুরীতে। যাচ্ছিলেন বা ফিরছিলেন ,ওই গ্রামে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে তাঁবু ফেলেন তাঁরা। গ্রামবাসীদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হন শশাঙ্কের মা। প্রশ্ন করেন ,এত ভালো জমি থাকা সত্ত্বেও এখানে ভালো ফসল হয়না কেন ? গ্রামবাসীরা বলেন জলের অভাব। জল নেই গ্রামে। শশাঙ্কের মা তখন বাংলার রাজাকে বলেন , এদের জন্য তুই কিছু করতে পারিস না ?
মায়ের কথায় শশাঙ্ক তখন তাঁর তুন থেকে সবচেয়ে বড় তির বের করেন। প্রতিজ্ঞা করেন,তির যত দূর যাবে , তত বড় করা হবে দীঘি। যা বানাতে সময় লেগেছিল তিন বছর।
শশাঙ্কের শর থেকে সৃষ্ট বলেই এরূপ নামকরণ। তবে কোনোটির তেমন ভিত্তি নেই। যদিও এই জনশ্রুতিগুলিই অপূর্ব সুন্দর এবং সুবিশাল এই দীঘিকে মহিমা দান করেছে!

IMG20191113155240-01
গাছের অলিগলি থেকে…

বেশ কিছুক্ষণ দীঘির পাড়ে বিশ্রাম নিয়ে, টাটকা অক্সিজেন নিয়ে উঠে এলাম, ফেরার জন্যে। সূর্যাস্তটা দেখতে পেলে ১৬ আনা পূর্ণ হতো। ভাবিইনি যে এটাও দেখা হবে, বারবার বাস-ট্রেকার এসব করেও, যতই গুগল ম্যাপ বলে চিৎকার করি না কেন, জীবন্ত জিপিএস খুব বেশি কাজে দেয়, এবারেও তার অন্যথা হয়নি।

IMG20191113161137-01
মন্দির….অন্যতম একটি

পথনির্দেশ – খড়গপুর থেকে ট্রেনে দাঁতন, সেখান থেকে হেঁটে উল্টো দিকে এলে ক্রসিং এর কাছেই ট্রেকার মিলবে অথবা সরাইবাজার গিয়েও ট্রেকার ধরা যায়! বাসেও আসা যায়। দাঁতনগামী বাস ধরে সরাইবাজার, বাকিটা আগের মতোই।

IMG20191113113742
তিনমূর্তি 😉

এখানেই সমাপ্ত….

IMG20191113121323-01
উৎসুক চোখে আমাদের টা টা করে @ কুড়ুমবেড়া


তথ্যসূত্র – গুগল, ফেসবুক এবং সংবাদপত্র.. এছাড়াও অনেকেই সাহায্য করেছে পথনির্দেশ দিয়ে সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে! তাছাড়া সুরজিৎ আর সৌমেন এর উপযুক্ত সঙ্গৎ ছাড়া বারবার বাস পাল্টে তিনটে বেশ দূরত্বে থাকা  জায়গা ঘোরা সম্ভব হতো না।

ও হ্যাঁ, সৌমেনের নব আবিষ্কৃত  অ্যাপটির কথা কি করে ভুলে যায়? সদস্য বেড়ে গেলে উত্তম সাহায্য করবে…! Trip Expense Manager 🤘👌

©  শুভঙ্কর দত্ত || November 14, 2019

 

ইতিহাসের সাক্ষী নাড়াজোল রাজবাড়িতে…

PANO_20190908_133810-01
অন্তরগড়ে…. সারিবদ্ধ

ইতিহাস সাবজেক্টটা মোটেও বিরক্তিকর নয়, বরং ইতিহাসের প্রকৃত শিক্ষক বোধ হয় কমই আছেন, অন্তত যারা পাতায় আবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস চাক্ষুষ করবার সুযোগ করে দেন। তারপর, ঘোরার সাথে না জানা হরেক কাহিনী! অবশ্য মজাটা অন্য জায়গায়, পরীক্ষা দিতে হবে না এসবের…. আগ্রহটা বাড়ে, এই আর কি!

এরকমই জাতীয় কংগ্রেস বা পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুপ্তস্থান নিয়ে আলোচনার সময় মেদিনীপুর এর বিশেষ উল্লেখ থাকলে তখনই ইতিহাস চেটেপুটে নিতাম৷ সে সময় চলে গিয়েছে। এখন ব্যস্ততার জীবন, তার মধ্যেই একদিন টুক্ করে বেরিয়ে যাওয়া….
এরকমই একদিন বেরিয়ে পড়লাম ইতিহাস-বিজড়িত নাড়াজোল রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে…. মেদিনীপুর – কেশপুর হয়ে পৌঁছে গেলাম দাসপুর – ১ নং ব্লকের কিসমত নাড়াজোলে….

কিসমতই বটে! কেন কিসমত সে বিষয়ে পরে আসা যাক্….

—————————————————————–

১. নাড়াজোল – নাম কেন?

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ‘নাড়া’ অর্থে আমরা যাকে গ্রাম্য ভাষায় লাড়া বলি অর্থাৎ জমিতে ধান কেটে নেওয়ার পর ধান গাছের যে অংশ জমিতে অবশিষ্ট হিসেবে পড়ে থাকে আর অসমীয় ভাষা ‘জোলা’ এর মানে জল….. নাড়া+জোলা থেকেই নাড়াজোল।

২. নাড়াজোলের প্রথম ঠাঁই

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীরজাফরকে গদিচ্যুত করে ইংরেজরা তার জামাই মিরকাশিমকে নবাব পদে বসান। বিনিময়ে মিরকাশিম ইংরেজদের উপহার দিলেন মেদিনীপুর, বর্ধমান, ও চট্টগ্রামের জমিদারি এবং এর সাথেই মেদিনীপুরের সঙ্গে নাড়াজোলের স্বাধীনসত্তার অবলুপ্তি ঘটে। পূর্বতন মেদিনীপুর জেলার ৫৪ টি পরগনার মধ্যে নাড়াজোল একটি উল্লেখযোগ্য পরগনা হিসেবে পরিচিত ছিল।

৩. ঘোষবাবুর স্বপ্ন বটে…

আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠার পেছনে জনশ্রুতি রয়েছে —  বর্ধমান নিবাসী উদয়নারায়ন শিকারের খোঁজে এই অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং শিকার করতে করতে গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেন। সন্ধ্যালগ্নে তিনি প্রত্যক্ষ করেন এক অলৌকিক দৃশ্য, তিনি একটি স্থানে অসম্ভব রকমের আলোর আভাস প্রত্যক্ষ করেন। রাত্রে শয়নকালে উদয়নারায়ন দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান এবং সেই স্থান থেকেই দেবী জয়দুর্গার সোনার মূর্তি ও প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। সেই জয়দুর্গা আজও রাজবাড়িতে পূজিত হয়ে আসছেন। সেই ধনসম্পদ দিয়েই রাজা এই রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

IMG_20190908_133443
মূল ফটক

IMG_20190908_131002-01
রাজকীয় বাতায়ন

IMG_20190908_132919-01
বিপ্লবের সাক্ষী

৪. ‘ঘোষ’ থেকে ‘খান’, ভায়া ‘রায়’…

প্রতিষ্ঠাতা উদয়নারায়ণের এক উত্তরপুরুষ কার্ত্তিকরাম ঘোষের আমলে তৎকালীন বাংলার অধীশ্বর থেকে ‘রায়’ উপাধী পান। ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে বলবন্ত রায় তদানীন্তন বাংলার নাজিমের কাছ থেকে খান উপাধি লাভ করেন। সেই থেকে নাড়াজোলের জমিদাররা খান পদবি গ্রহণ করেন।

IMG_20190908_125605-02
শুধু আমিষের জন্য

IMG_20190908_131352
এখন স্কুল….রাজকীয় তাই না?

৫. মোহনলাল খান

এই রাজ পরিবারের স্থাপত্য কীর্তিগুলির প্রায় সবই মোহনলাল খানের আমলে স্থাপিত হয়। লংকার অনুকরণে গড় – লংকাগড় তৈরী করেন, প্রায় ষাড়ে ষাট বিঘা জমিতে পুকুর খনন করে তিনি একটি গৃহ নির্মাণ করেন যা বর্তমানে ‘জলহরি’ নামে খ্যাত। যেটা করতে নাকি সেই সময় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিলো।

IMG_20190908_143011
মধ্যমণি

 

IMG_20190908_143354-01
জলহরি

শুধু তাই নয়, মোহনলাল খান রাজবাড়ির ভেতরের গড়ে একটি দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অযোধ্য থেকে পাথর এবং দেবমূর্তি এনে তিনি নাটমন্দির টি স্থাপন করেন। কথিত আছে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একবার ছোটো রবিকে নিয়ে নাড়াজোল আসেন এবং বেলজিয়াম কাঁচ সমৃদ্ধ এই নাটমন্দির তাকে এতোটাই প্রভাবিত করে যে তিনি এর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তিনিকেতনে ছাতিমতলার সাধনামঞ্চ তৈরী করেন।

IMG_20190908_133616
রাজকীয় নাটমন্দির

IMG_20190908_133547
প্রবেশদ্বার

৬. উত্তারাধিকার প্রাপ্তি?

মোহনলাল খানের মৃত্যুর পর একটা দীর্ঘ সময় ধরে নাড়াজোল রাজপরিবারের উত্তারাধিকার প্রাপ্তি অন্তর্কলহের শুরু হয় যা তখনকার দিনে প্রতিটি রাজবংশেই কমবেশি চালু ছিলো। এরপর মনেন্দ্রলাল খান অধিপতি হওয়ার মধ্যে দিয়ে সে সবের ইতি ঘটে। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ১৯ ফেব্রুয়ারি ভারত সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি উৎসব উপলক্ষে ইংরেজ সরকার মহেন্দ্রলাল খানকে ‘রাজা’ উপাধি প্রদান করেন। সেই থেকেই….. নামের আগে রাজা আর পরে খান…

৭. স্বদেশী আন্দোলন এবং নরেন্দ্রলাল খান

এরপর নরেন্দ্রলাল খান রাজা হন এবং তিনি মূলত জনকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের তার নাম স্বণাক্ষরে লেখা থাকবে, তার যোগদানের সাথে সাথেই নাড়াজোল রাজবাড়ির পরিচিতি আরো বাড়তে থাকে। নরেন্দ্রলাল খানের সহযোগিতায় এই রাজবাড়িতেই গুপ্ত সমিতির বৈঠক চলতো। হেমচন্দ্র কানুনগো, অরবিন্দ ঘোষ এর মতো বিপ্লবীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তখন মেদিনীপুর কেন্দ্রিক যে স্বদেশী আন্দোলনটা চলতো তার প্রায় পুরোটাই রাজাদের অর্থানুকূল্যে হতো এবং নরেন্দ্রলাল খান সেই দিক থেকে প্রচুর অর্থই ব্যয় করেন।  নরেন্দ্রলালের প্রতি ইংরেজ সরকারের দৃষ্টি সজাগ ছিল। ১৯০৮ সালের ২৮ শে আগস্ট নরেন্দ্রলালের গোপ প্রাসাদে পুলিশ তল্লাশি চালায় এবং মেদিনীপুর বোমা মামলায় নরেন্দ্রলালকে গ্রেপ্তার করে কনডেমড সেলে রাখা হয়। কিন্তু উপযুক্ত প্রমানের অভাবে নরেন্দ্রলালকে মুক্তি দিতে হয়। নরেন্দ্রলাল খান পরলোকগমন করেন ১৯২১ সালে।

IMG_20190908_131910
গোপন ডেরায়….

৮. দেবেন্দ্রলাল খান…

দেবেন্দ্রলাল খান তার পিতার থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন এবং পরাধীন ভারতবর্ষের শৃঙ্খল মোচনে সরাসরি নিজেকে নিযুক্ত করেছিলেন বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনে। ১৯৩০ সালে ২৬ শে জানুয়ারি তিনি নাড়াজোল রাজবাড়িতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, সেই শুরু হয়, তারপর ১৯৪০ পর্যন্ত সারা মেদিনীপুর জুড়ে তিনি বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়ে গুপ্ত সমিতির সদস্যদের জাগ্রত করেন। এরই ফলস্বরূপ মেদিনীপুরের তিন কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করা হয়, তার মধ্যে বার্জ এর নাম সর্বজনবিদিত৷ ১৯৩৮ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভপতি হওয়ার পর নেতাজী মেদিনীপুরে আসেন, এবং দেবেন্দ্রলাল খান কে নিয়ে তিনি যে তিনটি সভা করেন তার মধ্যে নাড়াজোল রাজবাড়িতর সভাটি মেদিনীপুরের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। ক্ষুদিরাম বসুর বাবা এই রাজবাড়ির তহশিলদার ছিলেন এবং সেই সূত্রে শৈশব থেকেই তার এই রাজবাড়ির সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এইখানে বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা ছিলো, ছিলো বোমা তৈরীর কক্ষ, অস্ত্র রাখার গোপন জায়গা,,শুধু তাই নয়, বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। যার প্রধান ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো৷ এছাড়াও বারীণ ঘোষ, উল্লাসকর দত্তের মতো বিপ্লবীদের সব ষড়যন্ত্রের সভা এখানেই সংগঠিত হত।

IMG_20190908_133509
কাছারির মাঠ – নেতাজীর সভাস্থল

IMG_20190908_133500
দুর্গাদালান-শিব মন্দির

IMG_20190908_124503~2
নেতাজী – এখনও অতন্দ্র প্রহরী

৯. গান্ধীজী এবং অন্যান্যরা….

গান্ধীজী এই রাজবাড়িতেই ‘অস্পৃশ্যতা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ১৯২৫ এর দিকে। 

কাজী নজরুল ইসলাম এর পদধূলি পড়েছিল এই রাজবাড়িতে। মোতিলাল নেহেরু থেকে জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইড়ু এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পদার্পণে নাড়াজোল পবিত্রভূমিতে পরিণত হয়েছিলো, সে কথা বলাইবাহুল্য।

১০. রানি অঞ্জলি খান….

স্বাধীন ভারতবর্ষের পাঁচ বার বিধায়ক হওয়া রাজপরিবারের সদস্য রানি অঞ্জলি খান নারী শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হন। মেদিনীপুরের গোপ রাজবাড়ি এবং নাড়াজোলের রাজবাড়ি তিনি প্রদান করেন, যা বর্তমানে যথাক্রমে গোপ কলেজ (মহিলা) এবং নাড়াজোল রাজবাড়ি নামে পরিচিত।

IMG_20190908_130546
পূর্বতন নাড়াজোল রাজ কলেজ

 

**************************************

 এরপর থেকেই রাজবাড়ির সাথে সাথে রাজপরিবারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে… ২০০৮ সালে পঃবঃ সরকার হেরিটেজ তকমা দিলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। এখন কাজ চলছে যদিও…. এই বছর নেতাজীর জন্মজয়ন্তীর দিনে হাওয়া মহলের সামনেই নেতাজীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে নাড়াজোল গ্রামবাসী এবং প্রশাসনের সহযোগিতায়…! 

এবার নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে কেন কিসমত। যে রাজ বাড়ির দেওয়ালে স্বাধীনতা আন্দোলনের বাঘা বাঘা সব মানুষের নিঃশ্বাস পড়েছে, সেই রাজবাড়ির কিসমত আলাদাই!
ঘোরার জায়গা বলতে রাস্তা দিয়ে ঢুকেই শিব মন্দির, উল্টোদিকে রাসমঞ্চ। তারপর একটু গেলেই পেল্লায় হাওয়া মহল বা নাচ মহল, রাজবাড়ির অন্দরে আমিষ খাওয়া বারণ, তাই এই মহল বানানো, বহুদূর থেকে আসা নর্তকীদের নিয়ে মদ-মাংস সহযোগে ফূর্তিতে মেতে উঠতেন রাজা এবং তার তাঁবেদাররা। এর পেছনেই বাগান আর পবিত্র পুকুরটি কিন্তু সবই এখন সংরক্ষণের অভাব।

IMG_20190908_125818-01
হাওয়া মহলে যেতে হলে…

IMG_20190908_123143
জিরচ্ছে….

IMG_20190908_122234
প্রবীনের কাঁধে নবীন ছোঁয়া

IMG_20190908_124405
হাওয়া মহল

IMG_20190908_124101~2
ফাঁক ফোঁকর..

রাস্তার উল্টোদিকে নাড়াজোল রাজবাড়ি, যেখানে আগে নাড়াজোল রাজ কলেজের ক্লাস চলতো নিয়মিত। কলেজের গেট দিয়ে ঢুকেই যেটা প্রথমে দেখা যায়, সেটা নহবতখানা, এখান থেকেই দিনে তিনবার নহবতের সুর ভেসে যেত রাজবাড়ির অন্দরমহলে সহ গোটা নাড়াজোলের আকাশে বাতাসে। এরপর শিব মন্দির, কাছারি, ভগ্নপ্রায় দুর্গাদালান, সরস্বতী দালান, নবরত্ন মন্দির যেখানে এখন জয়দূর্গা পূজিত হন। পরিয়ে গেলেই আসল রাজবাড়ি। যার অন্দরমহলে ঢুকলেই একটা আলাদা গন্ধ অনুভূত হতে বাধ্য। এই রাজবাড়িতেই আগে কলেজের ক্লাস চলতো৷ রাজবাড়ির ভেতর ঢুকলেই বিপ্লবীদের কক্ষগুলি চোখের সামনে চলে আসে। সারি সারি কক্ষ, যতই যাওয়া যায় আর পুরো রাজবাড়িটাই পরিখা দিয়ে ঘেরা। যেটা ভালো করে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। রাজবাড়ির ছাদে ওঠা হলো না। এই আক্ষপে নিয়েই ফিরতে হলো। ফেরার পথে দুপুরের আহার সেরে মাত্র দু কিমি চরণবাবুর ট্যাক্সি চেপে চলে এলাম – লংকাগড়, জলহরি৷ গোটা ভ্রমণের এই জলহরিই ছিলো একটা অমোঘ টান। কি অসাধারণ টেকনোলজি দিয়ে তৈরী হয়েছিলো জানিনা, বেশ বড়োসড়ো একটা পুকুরের মাঝে একটা গড়। পুকুরের চার ধারে না হলেও তিন ধারেই লোকজন বেশ আয়েস করে ছিপ ফেলছে, মাছ পড়ছেও….. ইতিউতি ঘোরার পর বাস ধরলাম….. এবার ইতিহাসের গলি থেকে বিদায়ের পালা! গন্তব্য – সেই মেদিনীপুর!

IMG_20190908_134830
শিবের ৯ রূপ

IMG_20190908_134858
রাসমঞ্চ

IMG_20190908_130134
পেল্লায়….

IMG_20190908_123410-01
সেকেলে প্রযুক্তি আজও অটুট

IMG_20190908_123853-01-01
শুকনো ঝর্ণা @ হাওয়া মহল

একদিনের ট্যুরে আসায় যায়, তবে তার সাথে কিছু যোগও করতে হয়, দুপুর নাগাদ ঘুরে নাড়াজোল বাস স্টপেজে মধ্যাহ্নভোজ সেরে সর্ট রুটে বিদ্যাসাগরের বাড়ি – বীরসিংহ এর দিকে যাওয়া যায়, কুড়ি কিমিও নয়। নাড়াজোল রাজবাড়িতে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে, এমনিতে কলেজের হোস্টেল হওয়ার দৌলতে অনেকেই থাকেন, তাদের থেকেই জানলাম – মাঝে মাঝে ফিল্মের লোকজন আসেন বলে তাদের জন্য একটা রুম বরাদ্দ! আর রাজবাড়ির লোকজন যে কোনো অতিথিকে সর্বাধিক পরিষেবা দিতে সদাপ্রস্তুত….অন্তত এমনটাই আমার জানা।

IMG_20190908_130734-01
নহবতখানা

IMG_20190908_130753~2
রাজার কাছারি… পরে ক্যান্টিন এবং ছাত্র সংসদ

IMG_20190908_132841
রাজদরবারে….

IMG_20190908_133107-01
খিড়কি থেকে

IMG_20190908_133341
কেন তোর উঁচু বাড়ি, কেন তুই বাবু রে?।

কোলকাতা থেকে আসতে হলে মেছগ্রাম হয়ে দাসপুর আসতে হবে, তারপর মেদিনীপুরগামী রাস্তায় বাঁক নিলেই পৌঁছে যাবেন বিপ্লবীদের ডেরায়….! 

IMG_20190908_143431
नमो-नमो, जी शंकरा

 

IMG_20190908_134942~2
ঐতিহ্যশালী রথ

IMG_20190908_124642
নাচ মহলা

 

পুনশ্চঃ
১. তথ্যের জন্য ইউটিউব এবং গুগল দায়ী..
২. থাকতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে একদিন আগে জানাতে হয়…রথের সময় জলহরি তে একটি নৌকা চলে।

IMG_20190908_143900
৮০ বন্ধু

© শুভঙ্কর দত্ত || September 9, 2019

গরমের ছুটিতে দুর্গেশগড়…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ দেখেছিলাম, মণিকান্তপুরের সেই রহস্য উদঘাটন পর্বে পরিচয় হয়েছিলো সোনাদা, ঝিনুক আর আবীরের সাথে। আসলে এই তিনজনকে পর্দায় দেখে অ্যাডভেঞ্চার পিপাসুদের মতো আমারও চলে যেতে ইচ্ছে করে, বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। তাই যখন জানলাম এবার দুর্গেশগড়ে আবার এক অন্য গুপ্তধনের সন্ধানে তিনমূর্তির অভিযান, যার ষাট শতাংশ শ্যুটিং আমার প্রিয় ঝাড়গ্রামে তখন আর অপেক্ষা করা সম্ভব হচ্ছিলো না।

আগের বার ছিলো শাহ সুজার গুপ্তধন আর এবার দুর্গাবতি দেবরয় এর গুপ্তধন, যা রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের থেকে তিনি পেয়েছিলেন।

  • হিস্ট্রি – নট অলওয়েজ বোরিং….

সিনেমা জুড়ে ইতিহাসের গল্প…. বইয়ের পাতায় পড়তে হলে ভীষণই বোরিং লাগে যে কাহিনী, এখানে সুবর্ণ সেন এর গল্পের ছলে বিষয়টির ভাবগম্ভীর ব্যাপারটিকে লুফে নেওয়ার মতোই সহজ করেছে৷

  • সাবলীল অভিনয়

‘ঝিনুক’ এর চরিত্রে ঈশা সাহা কে আমার বেশ লাগে, নামটার সাথে চরিত্রটা খুব মানায়। প্রথমবার গুপ্তধন উদ্ধার পর্যায়ের পর এবাারেও দারুণ লেগেছে….! সবচেয়ে ভালো লাগে অর্জুনকে, আবীরের চরিত্রে…. সেই বেশ একটা খাদ্যরসিক এবং হিউমারাস চরিত্র যা বাঙলির খুব কাছের লোক৷ সোনাদা কে নিয়ে বলার কিছু নেই।

  • ক্যামিও….

ক্যামিও হিসেবে খরাজের উপস্থিতিটা একটুও বোরিং হতে দেয় না, ভারতীয় ব্যাটিং অর্ডারে হার্দিক পাণ্ডিয়ার মতো ব্যাপারটা….. শেষপাতে চাটনীর মতো, পুরো চেটেপুটে খেলাম, একটা শব্দ বারবার বলছিলো, সেটা আর মনে নেই…

মে মাসে দুর্গাপুজো, কাশবনের পাশ দিয়ে মায়ের আগমণ, বনেদি বাড়ির পুজো — দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গুপ্তধনের সন্ধান গল্পটিকে বড্ড বাঙালিদের করে তোলে, তার সাথে যোগ হওয়া পুজোবাড়ির খাওয়াদাওয়া — সব মিলিয়ে বাঙালিয়ানার অনবদ্য নিদর্শন এই সিনেমা।

  • হারানো সুর আর কথা….

গানের কথার ছলে গুপ্তধনের এ টু জেড জানতে পারা – এদিক থেকে গীতিকার আর সঙ্গীত পরিচালকের প্রতি অতিরিক্ত সম্ভ্রম জাগে…. সেই পুরনো ফ্লেভারটা পুরোমাত্রায় ফিরিয়ে দিয়েছেন। এই সুরটা লেগে থাকার মতোই….. সিনেমার গল্পের সাথে, সময়ের সাথে অদ্ভুৎ ভাবে খাপ খেয়ে যায়…!

  • যা কিছু চাইছি.. মোচড়

গল্পের বুনোটে সময় লেগেছে…. সেটা হওয়াটা স্বাভাবিক….. ইতিহাসটাকে বেশ ভালো ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে টুকরো টুকরোভাবে যাতে দর্শকের মাথায় সেঁটে যায় চেয়ার ছাড়ার পরেও….! শেষকালে ঐ রকম একটা মোড় ঘোরানো— আশা করছিলাম, তবে ভাবনারও অতীত ছিলো, আর পরিচালক ধ্রুব ব্যানার্জী পুরো পয়েন্ট নিয়ে চলে গেলেন এখান থেকেই…..!

  • ক্যামেরা…আলো.. ইত্যাদি

সৌমিক হালদার নিজের খ্যাতির মর্যাদা রেখেছেন। এই সিনেমার সাপেক্ষে যেটা খুব মধ্যমানের হলেও চোখে লাগতো, সেরকম একবারও লাগেনি, জমাটিই লেগেছে।
কাজটাকে সহজ করেছে আলোর অনবদ্য ভালো ব্যবহার…. এইরকমভাবে আলোর ব্যবহার কটা সিনেমায় হয়, সন্দেহ আছে, অবশ্য সুযোগও থাকে না

  • বোনাস পয়েন্ট…..

কৌশিক সেন…. ফোকাস টেনেছেন গল্পের খাতিরে, সে জন্য অবশ্য পরিচালকের ধন্যবাদ প্রাপ্য…
আরো আছেন – লিলি চক্রবর্তী, পিসির চরিত্রে ওনার উপস্থিতি সিনেমাটিকে আরো বেশি করে বোধ হয় আট থেকে আশির জন্য মাস্ট ওয়াচ করে দেবে…..

  • আত্মিক টান

রহস্য, সাসপেন্স আর অ্যাডভেঞ্চার এর সাথে বাঙালির আত্মিক টান, তার সাথে যদি যোগ হয়ে যায় ইতিহাস, তাহলে আর কথায় নেই….! যাকে বলে টরে টক্কা! অযাচিতভাবেই গুপ্তধনের সন্ধানে এসে সোনাদা তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে আরও যে বিষয়টি উদঘাটন করলেন, তার জন্য এক্সট্রা একটা নম্বর দেওয়ায় যায় পরিচালককে

  • গরমের ছুটি – লুটি

গরমের ছুটিতে দুর্গাপুজো, সৃজিৎ মুখার্জি ‘উমা’ র হাত ধরে এরকমটা করেছিলেন, সেটা শহরে যদিও আর ধ্রুব ব্যানার্জি করলেন গরমকালে, গ্রীষ্মবকাশে…. অতএব লুটি!

  • পারিবারিক ফিল্মও….

পারিবারিক সিনেমাও বটে৷ একদম শেষে সে কথা আরো বেশি করে জোরালো হলো…..! পিসিমা- সোনাদা- অপুদা (খরাজ) এর কথোপকথনে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে পারিবারিক একাত্মতার বিষয়টি বেশ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

  • যথাযোগ্য উত্তরাধিকার…

‘গুপ্তধনের সন্ধানে’ এর যোগ্য সিক্যুয়েল বলেই মনে করি….. একবারের জন্যেও অগ্রজপ্রতিম সিনেমাটিকে অসম্মান করা হয়নি…. বরং শেষ কয়েক মিনিটের থ্রিল আর গুপ্তধন খোঁজার পন্থাস্বরূপ গান — এই দুটির জন্য অবিসংবাদীভাবে ‘দুর্গেশগড়’ এগিয়ে থাকবে।

  • এবং ঝাড়গ্রাম…

ঝাড়গ্রামকে যারা খুব ভালেবাসি, তাদের জন্য এই সিনেমা দেখা অত্যন্ত জরুরি। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি থেকে শুরু করে চেনা চিল্কিগড় সহ বিভিন্ন অচেনা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই সিনেমার ফ্রেমগুলো। বিশেষ করে রাজবাড়ি….! কি সুন্দরভাবে অন্দরমহলটাকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরো কিছু জায়গার ছবি ফুটে ওঠে কিন্তু নাম জানি না আমি….! অরণ্যসু্ন্দরী ঝাড়গ্রাম কে ভালো চিত্রায়িত করেছেন ক্যামেরাম্যান৷

সুতরাং এই গরমের ছুটিতে বাড়ির সকলকে নিয়ে ‘দুর্গেশগড়’ ঘুরে আসা যেতেই পারে…. যেখানে  সোনাদা – ঝিলিক – আবীরের দেখা মিলবেই৷

 

© শুভঙ্কর দত্ত || May 29, 2019

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” – তিন যুগের পৃথিবীতে অতীশ দীপংকর

‘কেমন লাগলো’ – এ কথার উত্তর দিতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবতে হবে….! গত দুই বছরে ফেসবুকে এক বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু পেয়ে অন্য স্বাদের বেশ ভালো রকম তিনখানা বইয়ের সন্ধান পাই। আবার তারই এক পোস্টে দেখি তিনিই “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” পড়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। তার আগে নাম শুনিনি, এমনতর নয় যদিও বিষয়টি। কিন্তু একটা বিশ্বাসযোগ্যতা কাজ করলো…..

collegestreet নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে বেশ ভালো রকম ছাড়ে পেয়েও গেলাম বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তাও আবার ডেলিভারি চার্জ মুকুব। ব্যস!

উপন্যাসের নামকরণেই লেখা আছে “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী”… হাস্যকর হলো বিষয়টা যখন ওনারা ফোন করে বলছিলেন ‘দাদা আপনার অর্ডার করা দুটো বইয়ের একটাই পেয়েছি’, পরে বুঝিয়ে বলার পর বুঝলেন – অতীশ দীপংকরের পৃথিবী কোনো আলাদা বই নয়।

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকর এর নিয়ে এমন আকর একখানা উপন্যাসে লেখক তার মুন্সিয়ানার দারুণ পরিচয় বহন করেছেন একথা প্রথমে স্বীকার করে নেওয়ায় ভালো।

এ উপন্যাস জুড়ে চিত্রায়িত হয়েছে অতীশ দীপংকরের জীবনী, তার সাথে জড়িয়ে থাকা শতাধিক চরিত্রের সাক্ষাৎ হয় পাঠকের সাথে।

মোটামুটি আমরা জানি যে ৯৭৭ সালে প্রথম তুর্কি আক্রমণ হয়, সুবুক্তগীন করেন। সফলতা আসেনি। এরপর প্রায় ত্রয়োদশ শতকের প্রথম দিকে ইখতিয়ারউদ্দিন বখতিয়ার খিলজি আক্রমণ চালালেন, তুরস্কদেশাগত আক্রমণকারীর রোষানলে পড়লো ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির ক্ষুদ্র থেকে গভীরতর উপাদান সমূহ – মূর্তি, শাস্ত্র, দর্শন এবং হাজারো পুঁথি তাদের ধর্মান্ধতার চোখে পড়তে বাকি থাকলো না। তিব্বত থেকে আগত পর্যটক – চাগ্ লোচাবা, নালন্দা দর্শনে এই ভয়াবহতার মাঝেই, নালন্দার তৎকালীন অধ্যাপক আর্য শ্রীভদ্র তাকে ফেরালেন না। নালন্দা কাউকে খালি হাতে ফেরায় না বলে তিনি অতীশ দীপংকর ব্যবহৃত একটি কাষ্ঠপেটিকা তুর্কি আক্রমণ থেকে বাঁচাতে তিব্বতে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেন।

যাত্রাপথে বিক্রমণিপুর গ্রামের এক তন্ত্রবিদ্যাপটিয়সী গৃহকর্ত্রী স্বয়ংবিদার সাথে পরিচয় হয় তার….. এরপর দু শো বছর পিছিয়ে গিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ হলো – চন্দ্রগর্ভ, অবধূত, কুন্তলার সাথে৷

রাজপুত্র চন্দ্রগর্ভ জীবনের অর্থ সন্ধান করতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মহর্ষি জিতারির সাথে, পরে অবধূত অদ্বয়বজ্র নামে তান্ত্রিকের পাল্লায় পড়ে তন্ত্রচক্রে পড়ে যান৷ রাহুলগুপ্তের শিষ্যত্বে তান্ত্রিক অভিষেক হয়। তার বাল্যসঙ্গী- প্রেমিকা কুন্তলা তাকে প্রত্যাখান করেন…..!

“যখন বৃক্ষরাজির ভিতর দিয়ে বহে যাবে সমুষ্ণ বাতাস,
নদীর উপর ছায়া ফেলবে গোধূলীকালীন মেঘ,
পুষ্পরেণু ভেসে আসবে বাতাসে,
আর পালতোলা নৌকা ভেসে যাবে বিক্ষিপ্ত স্রোতধারায়….
সহসা অবলুপ্ত দৃষ্টি ফিরে পেয়ে তুমি দেখবে-
আমার কেশপাশে বিজড়িত রয়েছে অস্থিনির্মিত মালাঃ
তখন… কেবল তখনই আমি তোমার কাছে আসব…..
এ রূপে নয়। এ ভাবে নয়। এখানে আর নয়।”

এই কথা বলে মৃত্যুর নিঃসীম অন্ধকারে ডুব দিলেন কুন্তলা। জীবনে চলার পথ সন্ধানে ব্যর্থ হয়ে, প্রিয়তমা কে হারানোর পর একের পর দুঃস্বপ্ন দেখে বেরিয়ে পড়লেন অনন্তের উদ্দেশ্যে। ওদন্তপুরী মহাবিহারের অধ্যক্ষ আচার্য শীলরক্ষিতের সাক্ষাতে তার জীবনের প্রকৃত পথ সন্ধানে তিনি ব্রতী হোন। এক বৈশাখী তিথিতে চন্দ্রগর্ভকে শ্রামণ্যে দীক্ষিত করেন পণ্ডিত – ভিক্ষু শীলরক্ষিত। শ্রামণ্যের প্রতিজ্ঞাবাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে চন্দ্রগর্ভের অবসান হলো, জন্ম নিলো অতীশ দীপংকর…… চিরজাগ্রত জ্ঞানদীপ যার হৃদয়কন্দরে সতত দেদীপ্যমান!

এরপর আবার ফিরে আসা যাক্ বর্তমানে, যেখানে বাংলাদেশের বিক্রমপুরের অনঙ্গ দাস নামের এক কৃষকের জমি থেকে পাওয়া এক কাঠের বাক্স উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু অধিকার করে বসে। রহস্য আবৃত সেই শ্যাওলা পড়া কাষ্ঠপেটিকার অভ্যন্তরস্থ পুঁথি এবং ধাতব মূর্তির রহস্য সমাধানের দায়িত্ব পড়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি হয়ে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার গবেষক কলকাতা নিবাসী সম্যক ঘোঘের হাতে, পেলিওগ্রাফি অর্থাৎ ঐতিহাসিক হাতের লেখা নিয়ে পড়াশোনা যার ক্ষেত্র…. তিনি সেই দায় ন্যস্ত করেন অমিতায়ুধ এবং শ্রীপর্ণার ওপর। অমিতায়ুধ সেই দায়িত্ব সযত্নে রক্ষা করতে তড়িঘড়ি বাংলাদেশ যান। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” প্রত্যক্ষ করার উদ্দেশ্য নিয়ে গেলেন বটে কিন্তু পরিচয় হলো কৃষককন্যা জাহ্নবীর সাথে, যেই কথাগুলো শুনিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে ছিলো হাজার বছর আগের এক নারী – কুন্তলা, সেই কথাগুলোই পূর্ববঙ্গীয় সতেজ উচ্চারণে ভটিয়ালির সুরে গান হয়ে ফেরে জাহ্নবীর কণ্ঠে। অমিতায়ুধ তার প্রত্যক্ষদর্শী।

IMG_20190506_143012~2.jpg

মোতালেব মিঁয়ার বাড়িতে বসাবাস কালে উৎসুক্যের দরুণ অমিতায়ুধ আবিষ্কার করে ফেলেন এক অপার্থিব গুঢ় স্থান, পৃথিবীর সমগ্র জাদু-বাস্তবতা থেকে তা অনেক গভীরে, লোকচক্ষুর অনেক আড়ালে তা বিরাজমান….. কালের চক্রে অতীতে গিয়ে সে দৃশ্য দেখতো পেলেন পাঠককুল৷ অমিতায়ুধ উদ্ধার করলেন – ‘শ্বেততারা’, পাথরনির্মিত! কাষ্ঠপেটিকার অবিকল প্রতিরূপ…! সাথে সহস্র শতাব্দী প্রাচীন একটি পুঁথিও, নাম – “করুণকুন্তলাকথা”!

অতঃপর ঔপন্যাসিক পরিচয় করালেন এ কাহিনীর কাহিনীকারের সাথে, শাওন বসু – যার ঐন্দ্রজালিক লেখনীর ওপর ভর করে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক সাহসী মিলনে সৃষ্টি হয় অসাধারণ বিচ্ছুরণ…..! অতীশ দীপংকরের মহিমান্বিত গাথা দৃষ্টিগোচরে আসে পাঠকের। তিব্বত লামা চাগ্ লোচাবা আচম্বিত চুম্বন প্রাপ্ত হোন বাঙালি কুলবধূ স্বয়ংবিদার ওষ্ঠ হতে, বিষ চুম্বনে মুর্ছায়িত হয়ে চাগ্ এর সময় পশ্চাৎ প্রসারণ করলো দুইশত বছর, ধ্বনিত হলো – ” বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি…ধম্মং শরণং গচ্ছামি…”

অধুনাকালের প্রত্নতত্ত্ববিদ অমিতায়ুধ মোতালেব মিয়াঁর বাড়ির এক সুড়ঙ্গ পথে দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে খু্ঁজে পেলেন আরো একটি মূর্তি, কাঠের মূর্তি, আরও একটি প্রতিরূপ। বজ্রাসন বিহারে যেই মূর্তিটি দীপংকর তিব্বত যাত্রার পূর্বে পাঠিয়েছিলেন তার জন্মস্থানে, অমিতায়ুধের কাছে পুরোটা পরিস্কার হলো এবার, সমাধান হলো সুড়ঙ্গ পথের গভীর প্যাটার্ন, আশ্চর্য যোগাযোগ পন্থা। “নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা” র রহস্য অমিতায়ুধের দ্বারা পুরোপুরি সমধান করে ফেললেন কাহিনীকার শাওন বসু৷ কিন্তু বাকি থেকে গেলো সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ থেকে উদ্ধার হওয়া ধাতব আইকনটি…!

ভারতবর্ষের বিক্রমশীলে অধ্যাপনাকালে অতীশ দীপংকর ভারতবর্ষকে বহিরাগতদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে রাজাদের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের বার্তা দেন, সে কথা উপন্যাসে গল্প আকারে সুন্দরভাবে বর্ণিত- নয়পাল ও চেদীরাজ কর্ণের মধ্যে মৈত্রী স্থাপনে দীপংকরের এক অসামান্য দিক তুলে ধরেছেন কাহিনীকার৷ মধ্য তিব্বতীয় সম্রাট এশেওদের আমন্ত্রণে অতীশ দীপংকর পাড়ি দেন তিব্বত অভিমুখে, তিব্বতীয় অনুবাদক বিনয়ধর, বীর্যসিংহ, অতীশের ভাই শ্রীগর্ভ, সচীব পরহিতভদ্র কে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় সে যাত্রা….! আর সর্বক্ষণের সঙ্গী সেই কাষ্ঠপেটিকা, যা শৈশব থেকে তার সাথে আছে– ধাতব মূর্তির সেই কাঠের বাক্স, সেই বাক্স চাগ্ লোচাবার হাত দিয়ে নালন্দায় পাঠিয়ে দেন তিনি। সেই বাক্সই কালক্রমে অনঙ্গ দাসের জমি থেকে উদ্ধার হয়।

এই তিন মূর্তির সন্ধানের পাশাপাশি কশেরুকা অস্থিমালা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে…! কালের সংস্থাপনে আবার উঠে আসে সেই মন্ত্র, যা ধ্বনিত হয়েছিল অতলস্পর্শী আত্মবিসর্জনের মুহূর্তে কুন্তলার মুখে, বীর্যসিংহ জীবনের শেষ মুহুর্তে যা উচ্চারণ করেছিলেন, সেই গাথার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে বিলম্ব হলো দীপংকরের৷ তখনই শ্বেত কশেরুকার মালাটি চাগ্ কে দান করেন অতীশ যা তিনি পেয়েছেন সেই সুন্দর মুহুর্তে…! এই কশেরুকা যে স্বয়ংবিদার প্রতি তার (চাগ্) গুরুদক্ষিণা স্বরূপ….। তার সাথে সযত্নে রক্ষিত কাষ্ঠপেটিকাটি ও চাগের হাতে দিয়ে ভারতে প্রেরণের ব্যবস্থা করতে বলেন…..! গোটা কাহিনীর অজস্র শব্দমালায় এবার মৃন্ময়ী প্রতিমা, দারুমূর্তি এবং ধাতব আইকন — সব কিছুকে ছাপিয়ে দীপংকরের ভাষ্যে উঠে আসে সেই অমোঘ চিরভাষ্য….. চাগের সেই প্রশ্নের উত্তরে পরিচিত হই রক্তমাংসের মানুষ, এক বাৎসল্যকরুণ হৃদয় – বিশিষ্ট অর্থের অতীশ এর সাথে পরিচিত হয় চাগ্… পরিচিত হই আমরা।

চাগ্ বিমূঢ়ৎ বললেন, “এ মূর্তিতে আপনার আর প্রয়োজন নাই?”
নিঃসংশয়িত প্রত্যয়ে অতীশ উচ্চারণ করলেন, “না, আমার আর প্রয়োজন নাই। আজ দ্বিপ্রহরে এক বালিকাকে দর্শন করে, তার অনাবিল স্নেহের স্পর্শ পেয়ে আমি বুঝেছি, আমি কাষ্ঠ, মৃত্তিকা বা ধাতু নই; আমি মানুষ। আমি শুধু স্নেহবুভুক্ষু অপার এক সত্তা। শুধু সকাতর এক মাতৃহৃদয়। ….. আমি সেই আবর্তমান উচ্ছ্বসিত কারুণ্যব্যাকুলতা…।”

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

নেথাং বিহারের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাটিয়ে দেন অতীশ। তাঁর সমাধির ওপর নির্মিত মন্দির কালের নিয়মে জঙ্গলাকীর্ণ আজ। অতীশের তিব্বতীয় শিষ্য ব্রোম্ তোন্ পা জন্ম দেন নতুন এক সম্প্রদায়ের, কাদম্পা থেকে গেলুক্পা হয়ে সেই সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু যাকে আমরা দলাই লামা বলি তিনিও একদিন চিনের আক্রমণ থেকে বাঁচতে ভারতে চলে আসেন।

নগর পত্তন হয়েছে, পুঁথি হারিয়েছে অজস্র- অগুন্তি, হাজার বছর আগেকার সেই ইতিহাসের আক্রমণকারীরা আজও আছে বেঁচে পৃথিবীর বুকে….তার সাথে শাশ্বত থাকবে দীপংকরের মতো শ্রমণরা, যারা হিংসে নয়, প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে দুর্জ্ঞেয় কে জয় করেছেন, মানুষের মনুষ্যত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন বারংবার…..যেখানেই গিয়েছেন চেষ্টা করেছেন শান্তির বার্তা দিতে….!!

লেখকের মতে অতীত – বর্তমান – ভবিষ্যৎ বলে আলাদা কিছু নেই, যুগপৎ প্রবাহমান। একই সমতলে অঙ্কিত পরস্পরছেদী তিনটি বৃত্ত– ঐ তিনটি বৃত্তের ছেদবিন্দু গুলিতে কোনো বিশেষ বিশেষ মুহুর্তে এক যুগের চরিত্রগুলি পরিচিত হবে অন্য যুগের চরিত্রের সাথে৷ শুধু তাই নয়, ঘটবে বিনিময়ও। বেশ জটিলতর একটি কৌশলে বিষয়টিকে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত করা গিয়েছে বলে মনে করি৷ এক সাথে তিনটি গল্প সমান্তরালে চলছে, লেখক প্রস্তাবনাতেই সে কথা বলেছেন এবং আরো সহজবোধ্য যাতে হয় তার জন্য তিনটি আলাদা সময় কে প্রতিটি পরিচ্ছদেই তুলে ধরেছেন। সময় বিশেষে তাদের ভাষা তুলে ধরেছেন৷
দশম-একাদশ শতক, ত্রয়োদশ শতক এবং সাম্প্রতিক কালে বিচরণের পর তাই অভিভূত হয়ে যেতে হয় অসামাণ্য লেখনশৈলীর জন্য, উপন্যাস পড়তে পড়তেই তাই নিজের মতো করে গুছিয়ে নিতে হয় বারবার। নিজেকেও পিছিয়ে যেতে হয় পৃষ্ঠা উল্টিয়ে। তিন যুগ ধরে পরস্পরছেদী নায়িকাদের সাথে তাই বারবার দেখা হয়ে যায়, বুঝতে তবু সুবিধে হয় না তাদের চাওয়া-পাওয়া…! অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকি কখন তাদের প্রাপ্তি পূর্ণ হবে…..! শাওন বসুর কল্পলোকের চরিত্র অমিতায়ুধ, জাহ্নবী এরা বড্ড আপন হয়ে ওঠে তখন, শেষ হওয়ার পরেও তাই মেনে নিতে কিঞ্চিৎ দ্বিধা হয়। কি অসামান্য গবেষণা এবং অধ্যবসায় থাকলে এরকম উপন্যাস আসে তা বলাই বাহুল্য, ঠিক যেই কারণে আনন্দ পুরস্কার এর বাছাই পর্বে ঠাঁইও মিলে যায় লেখক সন্মাত্রানন্দ শোভনের……! কুর্ণিশ ওনাকে..! বহুদিন আগে প্রীতম বসুর “চৌথুপীর চর্যাপদ” পড়েছিলাম বলে এই উপন্যাসের অনেক শব্দার্থ বোঝা সম্ভবপর হয়েছে। বাংলা ভাষায় আজকাল ভালো উপন্যাস আর হয় না- এই গোছের মন্তব্য করে যারা বসে থাকেন তাদের জন্য এই উপন্যাস উপযুক্ত জবাব। লেখকে আরো ধন্যবাদ এই জন্য যে — এই গ্রন্থটিকে কেউ স্রেফ গল্পবই হিসেবে নিলে মস্ত বড়ো ভুল করবে….! এখানে কাহিনীর ধারা বিবরণী এবং শব্দের মনোরম ব্যবহার, লেখনশৈলী সবকিছুই পাঠককে বাধ্য করবে সময় নিয়ে পড়ার জন্য…..! পড়তে গিয়ে উঠে আসবে না জানা কত ইতিহাস…..! একটা পরিচ্ছদের পর আর একটা পরিচ্ছদ এমনভাবে সাজানো যে পড়তে পড়তে ব্রেক কষা বেশ দুঃসাধ্য….! শাওন বসুকে দিয়ে লেখক বলিয়ে নিয়েছেনও এ কাহিনী আরো বড়ো হয়ে যেত…. পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে গেলে পাঠকের বিরক্তির প্রকাশও কাম্য নয় অবশ্য….! সে সবের ধারেকাছে যাননি বলা ভুল, তবে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসেছেন সুকৌশলে….. অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের এক অদৃশ্য টাইম মেশিনে ভর করে আলেখ্যটিকে ছোটো করে ফেলেছেন লেখক৷ কয়েকটি ক্ষেত্রে এতো বিশেষ লেগেছে যে বারংবার পড়তে ইচ্ছে করেছে, বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের প্রতি কতটা ভালোবাসা এবং আনুগত্য থাকলে এরকম তিন টি আলাদা যুগে স্থানবিশেষে আলাদা রকম ভাষারীতি প্রয়োগ করে এরকম রচনা সম্ভব, সে কথা একজন সামন্য পাঠক হিসেবে কল্পনা করা দুঃসাধ্যই..!

হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে যাওয়া নাগরিক সভ্যতার, আজকের পৃথিবীকে জড়িয়ে ফেলেছেন সেই সময়বর্তিকায়….! তিন যুগের তিন নারীর প্রণয়কথায় , শাশ্বত নারীসত্তার জন্মজন্মান্তরে  চিত্রায়িত এই উপন্যাস তাই বাংলা ভাষায় অতীশ অনুসন্ধান এর এক অনন্য ইতিবৃত্ত, এক অসামান্য আলেখ্য, যা বাংলা ভাষার একটি সম্পদ হিসেবে ঠাঁই করে নেবে বলে আশা রাখি৷

* * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * * *

“নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা”
লেখক – সন্মাত্রানন্দ শোভন
ধানসিড়ি
দাম – ৫০০ টাকা
পৃষ্ঠা – ৩৫৯

***************************************

© শুভঙ্কর দত্ত  || May 6, 2019

 

‘হীরক রাজার দেশ’ পেরিয়ে তেলকুপিতে তিনমূর্তি

 

PANO_20181220_114704

হীরক রাজার দেশে যাবো…. বড়োই বসনা ছিলো বহুদিন ধরে। ট্রেনে আসা যাওয়ার পথে দেখেছি, লোকজনের করা সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টে দেখেছি। যতবার দেখি ততবার ইচ্ছেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে৷

মাঝরাতে প্ল্যান হলো। ব্যাগপত্তর গুছিয়ে ভোর ভোর মুখে মাজন নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম — উদ্দেশ্য – হীরক রাজার দেশ…. থুড়ি হীরক রাজার দেশ এর সেই শ্যুটিং স্থল। সেই কবে ছোটোবেলায় সিনেমা হলে দেখেছিলাম রাজসেপাই থেকে লুকিয়ে থাকা উদয়ণ পণ্ডিতকে…সেই ‘দড়ি ধরে মারো টান..’ — জয়চণ্ডী পাহাড়ের সামনে দাঁড়ালে সেলুলয়েডের দৃশ্যগুলো যেন সামনে এসে ধরা দিলো। যাই হোক্, এগোনো যাক্, আসলে আনন্দে আত্মহারা হলে যা হয় আর কি!

KGP-ASN প্যাসেঞ্জার ট্রেনে চাপার পর যখন ঢুলুঢুলু চোখে আদ্রা পোঁছালাম, হেব্বি খিদে পেয়ে গেলো। আদ্রা স্টেশনের বিখ্যাত বেকারীর আইটেম কটা সাঁটিয়ে দিলাম। ট্রেন ছাড়লো, পরের স্টেশন — ডেস্টিনেশন রিচড, ততক্ষণে ঘড়ি বলছে ১০ টা ২০।
জয়চণ্ডী পাহাড় কি যাবো, স্টেশন চত্বরটা এতো মনোরম, আমাদের মতো ফটোগ্রাফি প্রেমী লোকজন সে স্টেশন ছেড়ে গেলে তো! এদিকে নিজেদের ফটোগ্রাফি নিয়ে মাতামাতি করতে গিয়ে অটো হাতছাড়া হলো, অতঃপর রিসার্ভ করতে হবে। দুচ্ছাই! যাই হোক্, জয়চণ্ডী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম অটো করে।

 ছবির মতোই সুন্দর জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন

সামনে জয়চণ্ডী পাহাড় — সেই সত্যজিৎ রায়, সেই…… চোখে স্থির। দেরী না করে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে শুরু করলাম৷ বেশ চড়াই পথ বেয়ে উপরে উঠছি, একটা রোগগ্রস্থ, জীর্ণ ওয়াচ টাওয়ারকে ডানহাতি ফেলে একটু এগিয়ে যেতেই দেখি মা চণ্ডীর মন্দির। দেবীর নাম অনুসারেই হয়তো পাহাড়ের এমনতর নাম৷ পাশেই বজরংবলী মন্দির। পাহাড়ের একদম ওপরে এসে পুরো পাহারতলী চোখে ভাসছে, বিলম্ব না করে খচাৎ খচাৎ রব তুললো আমাদের তিনমূর্তির ক্যামেরা। মন খুশি করা ফটোগ্রাফি করে কিছুক্ষণ ধরে জয়চণ্ডীর রূপ দর্শন করে নীচে নামলাম, ততক্ষণে আমাদের অটেওয়ালার ফোন চলে এসেছে। এরপর যাবো – তেলকুপি, আগেভাগে বলা ছিলোই, রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে দামোদর তীরে ইতিহাসের শেষ প্রহরীকে দেখার ইচ্ছেটা ফেসবুকের দৌলতে। মাঝে দুপুরের আহারটা সেরে নেওয়া গেলো, রঘুনাথপুরেই। খাওয়া সেরে অটো আবার অটোতে গিয়ে বসলাম।
আহহহ কি রূপ৷ পুরো রাস্তা জুড়ে দূষণমুক্ত ঠাণ্ডা বাতাসে ‘খেতে পেলে শুতে চাই’ এর সমার্থক কিছু একটা অটোতেই হয়ে গেলো। চেলিয়ামার আগে ডানহাতি রাস্তা নিতেই কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। দূরে সাঁওতালডিহি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রাশি রাশি ধোঁয়ার পাক চোখে পড়লো, দু পসারী কাজু আর খেজুর গাছের মধ্য দিয়ে মখমলের মতো রাস্তা দিয়ে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর গাড়ি পড়লো গিয়ে এবড়ো খেবড়ো একটা রাস্তায়। অঙ্গভঙ্গি করতে করতে অটো এগিয়ে চলছে, তেলকুপির পথনির্দেশক সাইনবোর্ড পেরিয়ে যে রাস্তা পেলাম, তাতে শুধু আমরা পড়তেই বাকি রইলাম। অপকেন্দ্র বলের বদান্যতায় ব্যাগের থেকে বোতল ছিটকে পড়লো রাস্তায়, হু্শ হলো কিছু পরে। তারও পরে বেশ কিছুটা আসতে তেলকুপি ঘাটে এসে দেখি আদিগন্ত জলরাশি– দামোদর ছাড়া আর কি! ফিঙে গুলোর আমন্ত্রণে দূর থেকে দেখতে পাওয়া দেউলটার দিকে এগিয়ে চললাম….হলদে সবুজ সরষে ক্ষেতের মধ্য দিয়েই। সামনে এসে থ!! এবার জুতো মোজা খুলে, জিনসকে থ্রি-কোয়ার্টার করে জলভেঙে যেতে হলো এ পারে….জরাজীর্ণ দেউল, ইতিহাসের শেষ প্রহরী– রঘুনাথপুর থেকে ২২ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া দামোদরের প্রান্তে বুক চিতিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে….অটোওয়ালার কাছ থেকে জানা গেলো আর একটা মাঝনদীতে,কিন্তু এখন আর নৌকা চলছে না, অতঃএব এতক্ষণ এর উদ্দীপনার সলিল সমাধী হলো। দেউলের সামনে বসে বেশ কিছুক্ষণ শান্ত স্নিগ্ধ দামোদরের রূপ উপভোগ করলাম। একেবারে পিনড্রপ সাইলেন্স যাকে বলে। বসে বসেই তেলকুপি নিয়ে গুগলবাবাজীর স্মরণাপন্ন হতে জানা গেলো বেশ কিছু তথ্য…..!

IMG_20181220_120246_HDR
পাকদণ্ডী পথের স্যাটেলাইট চিত্র 😛

IMG_20181220_114356_HDR
রুটি রুজির সন্ধানে

IMG_20181220_114841_HDR
পাতা ঝরার মরশুমে

IMG_20181220_123627_HDR
প্রবেশদ্বার

IMG_20181220_113946_HDR
টিলা আর কিলা

PANO_20181220_114628
শীতঘুম ওদের

IMG_20181220_115420_HDR
বিশ্বাস

IMG_20181220_113609_HDR
ওয়াচ টাওয়ার

IMG_20181220_113452_HDR
ফাঁক ফোঁকর

IMG_20181220_114045_HDR
জয় বজরংবলী

IMG_20181220_112256_HDR
ইয়ে দুনিয়া বড়ি গোল গোল গোল

IMG_20181220_114058_HDR
জয় মা চণ্ডী

IMG_20181220_123856_HDR
সত্যজিৎ রায় আজও বেঁচে

IMG_20181220_114250
পাহাড়ীয়া

IMG_20181220_122447
শেষের শুরু, ৪৯২ টা সিঁড়ি

IMG_20181220_115517_HDR
নৈসর্গিক

রঘুনাথপুর ২ ব্লকের সদর চেলিয়ামা থেকে কমবেশি সাত-আট কিলোমিটার দূরের এই তেলকূপি এখন লোক গবেষকদের চর্চার বিষয়। তাঁদের মতে, তৈলকম্প লোকমূখে পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে তেলকুপি হয়েছে। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের একদা সমৃদ্ধ এই বন্দর থেকে তাম্রলিপ্ত অধুনা তমলুকের সাথে জলপথে চলত বাণিজ্য। সেই সূত্রে এই বন্দরেই জৈন ব্যবসায়ীরা গড়ে তুলেছিলেন মন্দির নগরী।

১৮৭৮ সালে জিডি বেগলারের ‘রিপোর্ট অফ আ ট্যুর থ্রু বেঙ্গল প্রভিন্সেস’ রচনাতে এই তেলকুপির মন্দির সম্পর্কে কিছু তথ্য মেলে। যেখানে বেগলার তেলকুপিতে মোট ২২টি মন্দিরের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আবার দেবলা মিত্রের ‘তেলকুপি- আ সাবমার্জড টেম্পল সাইট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বইয়েতে তেলকুপির মন্দির নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। তা থেকে জানা যায়, একদা তেলকুপিতে ২৫-২৬টি মন্দির বা দেউল ছিল। ফলে তেলকুপির অতীতের স্বণর্র্যুগ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

কিন্তু ব্যথা দেয় বর্তমান। কারণ দামোদরের উপরে পাঞ্চেত জলাধার তৈরির পরে এই মন্দিরগুলির বেশিরভাগই চলে যায় নদের গর্ভে। কোনও ভাবে মাথা উঁচিয়ে রয়ে গিয়েছে তিনটি দেউল। তার মধ্যে দু’টিকে বছরের প্রায় সব সময়েই দেখা গেলেও একটি শুধুমাত্র গরমকালে দামোদরের জল কমলে দেখা যায়। বাসিন্দাদের আক্ষেপ, মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে জলাধার তৈরি হলে হয়তো তেলকুপির ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আক্ষেপ আরও রয়েছে, টিকে যাওয়া ওই তিনটি মন্দির ও মূর্তিগুলিরও রক্ষণাবেক্ষণের কোনও উদ্যোগ নেই।

লোক গবেষকদের একাংশের মতে, তেলকুপি নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটি ধরে নেওয়া হয় তৈলকম্প থেকেই তেলকুপি নামটি এসেছে। তাঁরা জানাচ্ছেন, সংস্কৃতে তৈল মানে তেল। আবার কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তৈল মানে এক ধরনের কর এবং কম্প কথাটি এসেছে মূলত কম্পন অর্থাৎ পরগনা। এ থেকে তাঁদের অনুমান, তৈলকম্প বা অধুনা তেলকুপি ছিল কর প্রদানকারী বা করদ রাজ্য। তেলকুপি নিয়ে প্রাচীন ইতিহাসে কিছু উল্লেখ না থাকলেও সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে তৈলকম্পের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে কবি লিখেছেন যুদ্ধে যার প্রভাব নদী, পর্বত ও উপান্তভূমি জুড়ে, বিস্তীর্ণ পর্বত কন্দরের রাজবর্গের যিনি দর্প দহনকারী, দাবানলের মতো সেই তৈলকম্পের কল্পতরু রুদ্রশিখর। আবার রামচরিতম কাব্যর উল্লেখিত রুদ্রশিখর যে তৈলকম্পের রাজা ছিলেন, তা জানা যায় জয়পুরের দেওলঘাটার বোড়ামে একটি শিলালিপি থেকে। সন্ধ্যাকর নন্দীর কাব্যে উল্লেখিত রুদ্রশিখর এই তৈলকম্পের রাজা ছিলেন। ততকালীন সময়ে বাংলায় পালযুগে জৈন ধর্ম প্রসার লাভ করেছিল.এবং ধর্মের প্রসারে ভূমিকা নিয়েছিল জৈন ব্যবসায়ীরাই। যাঁরা এই অঞ্চলের দু’টি তামার খনি তামাজুড়ি ও তামাখুন থেকে তামা এনে তৈলকম্প বন্দর থেকে তাম্রলিপ্তে নিয়ে যেতেন।

 

IMG_20181220_144252
‘দেউল’ এর জলছবি

IMG_20181220_143732_HDR
শেষ প্রহরী আর সঙ্গে আমরা

IMG_20181220_142541_HDR
তেলকুপি -নিরালায়

IMG_20181220_141735
অবহেলা – তেলকুপির সর্দার

IMG_20181220_143412_HDR
ভগ্নাংশ

IMG_20181220_141517
শেষ প্রহরীর প্রহরীরা

IMG_20181220_141722_HDR
অস্তমিত সূর্যালোকের উদ্ভাসিত ইতিহাস

 

যাই হোক্, এতকিছু জানার পর ঘাবড়ে গেলাম, যে সত্যিই কোথায় চলে এসেছি। শহুরে আলো থেকে শত যোজন দূরেও দেউলটা এখনো ইতিহাসের স্বাক্ষর বয়ে চলেছে, রৌদ্র-ঝড়-দুর্যোগ মাথায় নিয়ো আরামসে ইতিহাসের শেষ প্রহরীর মতো স্থানুবৎ দণ্ডায়মান…..! যেন বলে যাচ্ছে — “এ শহর বা হিম গহ্বর কে আছো কোথায়?” বা “আয় রে ছুটে আয় রে তোরা…!”
যাই হোক্, আরো ছিলো নিদর্শন, পাশের কটা গ্রামের মানুষের দৌলতে, সে আর হলো না দেখা। অটো করে আবার ফিরে যেতে হবে, মনটা একটু খারাপ হলো৷ প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ…ঘুম আর ঢুলের সংমিশ্রণে কখন জয়চণ্ডী পাহাড় জংশন চলে এসেছি খেয়ালই নেই। পাক্কা দুঘন্টা সময় হাতে, মুড়ি-ঘুগনি দিয়ে উদরপূর্তি করা গেলো।
অবশ্য তার আগে অস্তমিত সূর্যের আভায় দূরের জয়চণ্ডী পাহাড়টাকে বারে বারে…….!
হীরক রাজ্য জয়……! এবার?????

IMG_20181220_100312
ব্রেকফাস্টের ছবি শেষে দিলেও ক্ষতি নেই

 

 

 

IMG_20181220_120854
তিনমূর্তি

 

তবে এ যাত্রার পেছনে আর এক কাহিনী লুক্কায়িত, সে না হয় কোন এক অবসরে হবে। আপাতত…..

————————————————————-

তথ্যসূত্র – আনন্দবাজার পত্রিকা

ঋণ – গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || December 23, 2018 

চর্যাপদের খোঁজে চৌথুপীতে

চৌথুপী সঙ্ঘারামে মরণভয় ছড়িয়ে পড়েছে।
….
…….
মহাস্থবির চীবরের কটিবন্ধে হাত দিলেন, গ্রন্থাগারের কুঁজিতালের চাবি এখনও গেঁজেতে ঝুলছে। তবে এ কীভাবে সম্ভব? মহাস্থবির ক্ষিপ্রপদে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করলেন এবং থরথর করে কেঁপে উঠলেন। মহামূল্যবান পুঁথির কাষ্ঠ-সিন্দুকগুলো সব উধাও!

—————————————————————

“চৌথুপীর চর্যাপদ” এর কাহিনীর শুরু এমনিই এক আকস্মিক ঘটনা দিয়ে। প্রাককথনে উল্লেখিত সময়কাল ১২০৫ অব্দ।

সত্যি বলতে গোটা উপন্যাসটি পড়ার পর এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি….. প্রথম পাতাটা দেখতেই নিজের ওপর যারপরনাই রাগ হলো, যে কথাটা প্রথম পাতায় লেখা আছে, আমি বেমালুম ভুলে গেলাম কি করে? ছ’মাস পেরোয়নি আমি “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়েছি, তা সত্ত্বেও কি করে পুরোপুরিভাবে ভুলে গেলাম যে এটিও একটি উপন্যাস, পড়তে পড়তে কাহিনীর গহ্বরে চলে গেছি, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢুকেপড়েছি চৌথুপীর সঙ্ঘারামে, এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো ভুলেই গেছি আমি এক সামান্য পাঠক, পড়তে পড়তেই কখনো এর রূপ, কখনো ওর রূপের ছাঁচে বসিয়ে ফেলেছি নিজেকেই। যদিও এসব নতুন নয়, পাঁচমুড়ো পড়তে পড়তেই এসব হয়েছিলো… সেই “আমি যদি এটা হতাম”, ‘আমি যদি ওটা হতাম।’ এরকম ভাব।

  • যাই হোক্, এ গল্প নিয়ে বলার কিছু নেই। পাঁচমুড়োর সাথে কিঞ্চিৎ মিল থাকলেও এই উপন্যাস আসলে বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারের আর একটি অমূল্য রত্ন। পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গলকে যথাস্থানে রেখেই বলছি “চৌথুপীর চর্যাপদ” একটি সম্পূর্ণ রূপে গবেষণামূলক কাহিনী,যার পরতে পরতে আছে অসংখ্য তথ্য, এই বিপুল তথ্যসাগরে ভাসতে ভাসতেই পাঠক কখন যে সমান্তরালে চলতে থাকা দুটো কাহিনীর অন্দরমহলের প্রতিটি চরিত্রের সাথে পরিচয় সেরে নেবে, তা অনুমেয় নয়।
  • একসাথে দু’খানা কাহিনীর বুনোট সমান্তরালে চালিয়ে উপন্যাস এর গল্প বলা আগেও হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিশেষত্বটি কি?
    — কি আর? আপনি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বইটির শিরোনাম দেখে কতকিছু ভেবে বসে থাকবেন, উপসংহার পড়ার পর ঠাহর হবে যে, আদতে আপনার কল্পনার প্রায় ৯৯ শতাংশই ভুল, মানে লেখক মশায়ের পাঁচমুড়ো না পড়া হলে তো, এরকম ভাবতে একরকম বাধ্য, তবে সেটা পড়া হওয়ার দরুণও আমায় আবার ঠকতে হলো বলা চলে।
  • একসাথে দুটো কাহিনী চালিয়ে যাওয়াটা মুখের কথা নয়, তাও আবার একটা এই এখনকার সময় আর একটা প্রায় ১২০০ অব্দ, তালগোল পাকালেই গেলো।
  • একটি পুঁথিকে কেন্দ্র করে একদিকে হাফি হাবিলদার, মামাজী, বিমলা, লামা, ছেত্রী, অর্জুন এবং যোজনগন্ধার তীব্র অনুসন্ধান। এবার আবার ভাষা হলো সিদ্ধম…..! কি অণুসন্ধান?
    প্রায় আটশো বছর আগের গন্ধকালী, শ্রীধর আচার্য, খু-স্তোনদের আগলে রাখা পুঁথি এবং তুরস্কদের কাহিনী। —- এই দুটো কাহিনীর সমান্তরাল সজ্জাতেই এ উপন্যাস এগিয়ে চলে।
  • কেন পড়বো?
    তার আগে বলি, এই উপন্যাসকে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে ধরলে মহাভুল। লেখক আগে একটা সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্য লিখেছিলেন, এবার একটা চর্যাপদ লিখে ফেললেন। কি? গাঁজাখুরি মনে হচ্ছে? পড়তে পড়তে অবশ্য এসব ভুলেই যাবেন।
  • এ কাহিনীতে অ্যাডভেঞ্চার কম নেই, আবার অতিশয় সিরিয়াস ইস্যুর মাঝে হাস্যরসের উপাদান নেহাত কম নেই, গুলি-বোমা-বারুদের গন্ধে মাখা বাতাস আছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা জাতির অত্যাচার আছে। কি নেই? থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চারের যুগলবন্দী, তার ওপর মন মাতানো সব তথ্য, যা জানলে রীতিমতো অবাক হয়ে যেতে হয়। তবে সবগুলো এমনভাবে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়েছে যে পড়তো পড়তেই এক অদ্ভূত মায়াজালে জড়িয়ে যেতে হয়। এ কাহিনী কিছুক্ষণ পড়ার পর অবশ্য মনে হতে পারে, যেন সিনেমা দেখছি! অবশ্য তা হলেও মন্দ হয় না।

 

IMG_20180629_144150~2
সিদ্ধম্

 

লেখকের পরিচয় নতুন করে কি বলবো? আগেও বলেছি, কতটা নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা থাকলে এরকম উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে উপহার দেওয়া যায় তাও বিদেশ বিভূইয়ে থেকে, সেটা জানতে গেলে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” এবং “ছিরিছাঁদ” এর সঙ্গে সঙ্গে “চৌথুপীর চর্যাপদ” ও পড়তে হবে। কতটা অধ্যবসায় এবং গবেষণা করলে এমনতর রত্নসমান আকর গ্রন্থ পড়ার সুযোগ পাই, তার জন্য সমগ্র বইটি পড়ার পর গ্রন্থতালিকাটি তে চোখ রাখলেই কিছুটা অনুমান করা যায়।

হ্যাঁ, এবার বলা যাক্, পুরো বইটি পড়ার পর কি এমন প্রশ্নের জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। সেটা হলো, গল্পের সূত্রপাত কিভাবে হলো, এবং মহাস্থবিরের অনুপস্থিতিতে গল্পের নায়ক-নায়িকা যখন মহামূল্যবান পুঁথিগুলি তুরস্কদের নাগালের বাইরে আনয়ন করলো, তারপর কি হলো? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর ধরেই গল্পের সূত্রপাত। উপন্যাসের শুভারম্ভ।

এবার বলা যাক বইটির আকার নিয়ে। অনেকেই হয়তো সাড়ে চারশো পাতার বই হাতে নিয়েই বিরক্তও বোধ করবেন। তাদের জন্য সত্যিই দুঃখিত, লেখক বোধ করি, পাবলিক ডিম্যাণ্ড ভেবে বইটি লেখেননি, তাহলে হয়তো তিনি দুটি খণ্ডে বইটি প্রকাশ করতেন। আসলে এই চর্যাপদ সম্পূর্ণরূপে গবেষণামূলক একটি উপন্যাস। তবে “পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল” পড়ার পর এটি নিয়ে বসলে রীতিমতো বিরক্তি লাগতে পারে, আমারও লেগেছে, তবে ঐ যে আবার বলতে হয়, শেষে গিয়ে অদ্ভূত রকমের আনন্দ লাগবে। কিন্তু সে আনন্দ আরো বেশি হতে পারে যদি পাঁচমুড়ো পড়ার পূর্বে এটা পড়া যায়। বইটি পড়া শুরু করলে যদিও পৃষ্ঠাসংখ্যা নেহাত লেস প্রায়োর মনে হবে, এখানেই লেখকের বাজিমাৎ। চরিত্রের নামকরণ নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই, যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি মনে রাখার মতো সব নাম, এই উপন্যাসের নায়িকাদ্বয়ের নাম তো আবার বলেই দিলো যে কোথায় যেন একটা যোগসূত্র আছে, অবশ্য পরে তা বলেও দিয়েছেন, সেটা কি?? – তা জানার জন্য একবার চৌথুপীতে গিয়ে ঘুরে আসায় শ্রেয়…. তবে ক্লু হিসাবে বলা যায় ঐ কনসেপ্টের ওপর ভিত্তি করে বহু সিনেমা হয়েছে।

এটি লেখকের তিন নম্বর উপন্যাস, পাঁচমুড়োর প্রায় বছর দুয়েক পর এই উপন্যাস প্রকাশিত। অর্থাৎ লেখক সাহস পাচ্ছেন হয়তো তার পাঠকের আকুণ্ঠ পিপাসা দেখে। তাই আমাদেরও উচিৎ লেখকের এই গবেষণা-সাধনাকে কুর্নিশ জানানো তা সম্ভব – অবশ্যই অধিক পরিমাণ পাঠকের কাছে এই অসামান্য কাজের আলোকবর্তিকা বহন করা।

★★ ★ তবে এই বই পড়বো কেন তা নিয়ে লেখক গল্পের নায়িকা যোজনগন্ধার ভাষ্যে বলেছেন
যোজনগন্ধা ভাবল তার ওই জ্বরের ঘোরের মধ্যে পড়া গুহ্যচর্য্যায় কি সত্যি সত্যি ওই কাহিনি লেখা ছিল? নাকি সবই তার কল্পনাপ্রসূত ভাবসম্প্রসারণ, জ্বরের ঘোরের মধ্যে মনে ভেসে আসা অতীন্দ্রিয় জলছবি? কে জানে কোনটা সত্যি? তবে এটা সত্যি যে গন্ধকালী, খু্ স্তোন, শান্তভদ্র, তোন-পা’দের মতো নাম না জানা শত শত ভিক্ষু-ভিক্ষুণী আটশ বছর আগে প্রাণের মায়া ত্যাগ তুচ্ছ করে কত মূলাবন পুঁথি বাঙলা থেকে তিব্বতে নিয়ে গিয়ে তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছে। যোজনগন্ধা ভাবছিল বাঙালিরা কেউ কি উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে আসবে সেই অমূল্য গ্রন্থগুলিকে ধুলো ঢাকা শবাধার থেকে বের করে আনতে?”

অবশ্য লেখক যোজনগন্ধার জবানবন্দীতেই বলিয়ে নিলেন – ” আমি এই কাজের দায়িত্ব নিলাম।”

সত্যিই তো, এই একই বার্তা বারবার দিয়ে চলেছেন লেখক…. বাংলা ভাষাটাই তো হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ঐ মহার্ঘ পুঁথি বা বাংলা ভাষার ইতিহাসকে রক্ষা করতে হলে এক দুটে গন্ধকালী বা যোজনগন্ধা, খু স্তোন বা হাফি হাবিলদার কি পাবো না?

IMG_20180629_144115

 © শুভঙ্কর দত্ত || June 30, 2018 

 

নিমকহারামের দেউড়ী

“ধীরে চলনা হ্যায় মুশকিল তো জলদি হি সহি…..”

সত্যিই এই ক’দিন যা চলেছি, তাতে এই লাইনটাই মনে পড়ছে! পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলী, পূর্ব-পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দক্ষিন – উত্তর দিনাজপুর, দার্জিলিং — মোট এগারো খানা জেলার অক্সিজেন আরাম করে নিয়েছি বলা চলে! যাই হোক্ কোত্থেকে শুরু করবো এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটালো ঐতিহাসিক স্থানের প্রতি আমার আকুণ্ঠ পিপাসা! আপাতত “মুর্শিদাবাদ” দিয়ে অর্থাৎ যাত্রা শেষ দিয়ে শুরু হোক্ ব্লগে জল দেওয়া।

দার্জিলিং যাত্রা শেষ করে সমতলে নামছি। কথা ছিলো শুধু হাজারদুয়ারী দেখা হবে কিন্তু হাতে খানিকটা সময় আর ভ্রমণপিপাসু কিছু বাঙালি একজোট হলে যা হয়, তারপর আবার দর কষাকষির পর মোটামুটি একটা ইয়ে হতেই চলো ‘এ’ – এক্কাগাড়ি ঐ ছুটেছে……..

IMG_20180407_072435
এক্কাগাড়ি ঐ ছুটেছে

প্রথমেই গেলাম হাজারদুয়ারীর পাশের রাস্তা দিয়ে, আজিমুন্নেসা বেগমের জীবন্ত সমাধি।

PANO_20180407_092256
জীবন্ত কবর,

বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদ কুলি খান এর কন্যা ছিলেন আজিমুন্নেসা বেগম। জনশ্রুতি রয়েছ, কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় নবাবি হেকিম দৈনিক একটি মানবশিশুর কলিজা দিয়ে ওষুধ তৈরি করে দিতেন। অসুখ সেরে গেলেও তিনি মানবশিশুর কলিজায় নেশাগ্রস্ত হয়ে গোপনে নিয়মিত ভাবে শিশুদের কলিজা খেতে থাকেন। এই ঘটনা মুর্শিদকুলি খাঁ জানতে পেরে তাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নির্দেশ দেন। মুর্শিদাবাদ ঘুরতে গিয়ে টাঙ্গার (এক্কাগাড়ি বা টমটম) চালকের কাছে এমন কথা শুনে সত্যিই চমৎকৃত হয়েছিলাম। একতলা পাকা মঞ্চের উপর মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে আজিমুন্নেসার সমাধি, যে মসজিদটা তৈরী করিয়েছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ এর কন্যা স্বয়ং! মঞ্চের উপরিভাগে বাম পাশে একটা দেয়াল ছাড়া মসজিদের আর কোন চিহ্ন বর্তমানে নাই। কথিত আছে সাধারণ মানুষের পদধূলিতে তার শিশু হত্যার পাপ মোচনের জন্য মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে তাকে জীবন্ত সমাহিত করা হয়। 

তারপর একই রাস্তা ধরে দক্ষিণে শর্টকাট নিয়ে চলে গেলাম কাঠগোলা বাগানবাড়ি। তবে কাঠগোলা তে পরম প্রাপ্তি হলো ওখানকার ছান্দসিক গাইড দাদা, এতো সুন্দরভাবে বলে গেলেন খিদে তিষ্টা কোনদিকে উড়ে গেলো।

IMG_20180407_095602
কাঠগোলা মহল্লায়

লক্ষীপৎ, জগপৎ, মহীপৎ ও ধনপৎ । হাজারদুয়ারি থেকে ৪ কিমি উত্তরে চার ভাইয়ের এই কাঠগোলা বাগান। ১৭৮০ সালে কাঠগোলা বাগানের প্রতিষ্ঠতা করেন লক্ষীপৎ সিং দুগর। প্রায় ২৫০বিঘা জায়গা নিয়ে বিশাল বাগানের মধ্যে দোতালা অট্টালিকার সামনে বড় পুকুর খনন করা হয়। সেই পুকুরে থাকত নানা ধরনের রঙ্গীন মাছ। নবাব সৈয়দ হাসান আলী মির্জা কাঠগোলা বাগানের নাচ মহলে অংশ গ্রহণ করতেন। এখানে জৈন মন্দির ও প্রাসাদ ছাড়াও রয়েছে চিড়িয়াখানা, হেরেম ও শ্বেত পাথরে বাঁধানো পুকুর। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মহামূল্যবান আসবাব ও তৈজসপত্র।

কাঠগোলা নামটি আসলে কাঠগোলাপ এরই অপভ্রংশ বলা যায়। সেকালে প্রচুর কাঠের আসবাবপত্রের ব্যবসা ছিলো আর ছিলো গোলাপের বাগান। সেখান থেকেই এই নাম।

IMG_20180407_102644
হাত কাটা কার্তিক, শিল্পসত্ত্বা আর যাতে বিকশিত না হয়

 

IMG_20180407_102726
সিংহদুয়ার

IMG_20180407_094346
কাঠগোলা বাগানবাড়ির প্রবেশপথ

 

IMG_20180407_102738
সুড়ঙ্গপথ

 

IMG_20180407_094544
‘দুগর’দের কেউ

 

IMG_20180407_101913
আজও স্মৃতি

IMG_20180407_101925
রন্ধনশালা

 

IMG_20180407_101736
মাছেদের কবরস্থান

 

বহুদিন এ প্রাসাদ বন্ধ বা পরিত্যক্তই ছিলো বলা যায়। ১৮৭০ সালে এ প্রাসাদটি আবার পুনর্নির্মান করা হয়। লক্ষীপৎ সিং দুগরের বংশধর সঞ্জয় সিং ও সিদ্ধার্থ এখন এর দেখাশোনা করেন। কথিত আছে, কাঠগোলা বাগানের পূর্বদিকে যে প্রাচীন মসজিদ ও কবরস্থান আছে সেখানকার এক ইঁদারার কাছ থেকে দুগড় পরিবার প্রচুর গুপ্তধন পেয়েছিলেন। প্রাপ্ত সব টাকায় তারা বাগান সাজাতে ও মন্দির নির্মাণ করতে খরচ করেছিলেন।

IMG_20180407_101723
এখন ফাঁকা মহল

সেকালে কাঠগোলা বাগানে জলসা হতো এবং অনেক লোকের সমাগম হতো। বর্তমানে কাঠগোলা বাগান একটি দর্শনীয় স্থান। অট্টালিকা, সংগ্রহশালা, গোপন সুরঙ্গপথ, আদিনাথ মন্দির, বাঁধানো পুকুর সব কিছু নিয়ে মুর্শিদাবাদের এই দর্শনীয় স্থানটি অতুলনীয়।

এরপর জগৎ শেঠ এর বাড়ি
জগৎ শেঠ  বাংলার অত্যন্ত ধনী ব্যাংকার ফতেহ চাঁদকে আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ‘জগৎ শেঠ’ বা বিশ্বের ব্যাংকার উপাধি প্রদান করা হয়। জগৎ শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানিক চাঁদ। তিনি আঠারো শতকের প্রথম দিকে পাটনা থেকে ঢাকা আসেন এবং এখানে একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলী খানতার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে, মানিক চাঁদ তার সাথে নতুন রাজধানীতে চলে যান। মুর্শিদাবাদে তিনি ছিলেন নওয়াবের খুবই প্রিয়ভাজন এবং পরে নওয়াবের ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ লাভ করেন। দিল্লির সিংহাসনে আরোহণের পর পরই সম্রাট ফররুখ সিয়ার ‘নগর শেঠ’ (নগরের ব্যাংকার) উপাধি প্রদান করে মানিক চাঁদকে সম্মানিত করেন। ১৭১৪ সালে মানিক চাঁদের মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র (দত্তক পুত্র) ও উত্তরাধিকারী ফতেহ চাঁদের নেতৃত্বে পরিবারটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করে। পরে সম্রাট মাহমুদ শাহ ফতেহ চাঁদকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি প্রদান করলে এ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি দেশে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের একটি স্থাপনা ও জায়গা। জগৎ শেঠের বাড়ি মুর্শিদাবাদ শহরতলীর অদূরে নশিপুর এলাকাতে আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে তা হলো নবাবী আমলের ধর্নাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি জগৎ শেঠের বাড়িটি। সেখানে জগৎ শেঠদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস ও আসবাবপত্র রয়েছে। বাড়ির ঠিক পিছনে রয়েছে ভূগর্ভস্থ গুপ্ত সুরঙ্গ, মাটির তলায় গুপ্ত ঘর। রয়েছে জগৎশেঠের টাকশালে তৈরি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, স্বর্ণ ও রৌপ্য শাড়ি, খাজঞ্চি খানা, ঢাকাই মসলিন ও তৎকালিন ব্যবহার্য্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শণ সমূহ। বাড়ির আঙিনায় রয়েছে বিশাল একটি মন্দির।

জগৎ শেঠের বাড়ির বিভিন্ন অংশ

 

এরপর রাস্তায় আসতে আসতে চোখে পড়লো নসিপুর রাজবাড়ী যার অনুকরণে হাজারদুয়ারী তৈরী হয়েছে।

IMG_20180407_110417
নসিপুর রাজবাড়ি 

নসিপুর রাজবাটী তে কেন তার ঘোড়াকে থামতে বললো না চালক, তা বুঝলাম না। অদূরেই রঘুনাথজীউ মন্দির/আশ্রম ছিলো বলেই হয়তো!
ফরাগঞ্জের দেবোত্তর ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি মুর্শিদাবাদের একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এটি মুর্শিদাবাদ পৌরসভা কর্তৃক ঘোষিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য। আনুমানিক ২৫০ বছর আগে এই স্থাপনাটি নির্মিত হয়। বাংলা ১১৬৮ সালে মহন্ত লছমন দাস ঢাকার উর্দু বাজার থেকে এসে মীর জাফরের আদি বাড়ি সংলগ্ন স্থানে এই জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেন। তবে রঘুনাথ মন্দিরটি বেশ চমকপ্রদ, উপরের দিকে আঁকা আছে একদিকে সিংহ আর একদিকে ঘোড়া, মাঝে ঢালের মতো….নীচে লেখা পলাশীর যুদ্ধ। বিস্তৃত এই জায়গায় আছে প্রাচীন কাষ্ঠ শিল্পে খোদিত এবং রাজস্থানের তুষারশুভ্র মর্মরে শতাধিক বছরের প্রাচীন প্রাসাদ। বয়সের ভারে প্রাসাদটি আজ জরাজীর্ণ অবস্থা। এটি বন্ধই থাকে। পাশের ভবনে আছে ঐতিহ্যবাহী সোনার রথ, বেলোয়ারী ঝাড়, ঐতিহ্যময় আসবাবপত্র, প্রাচীন যুগের বেবি অস্টিন মোটর যান, পুরনো রান্না সরঞ্জাম ইত্যাদি। কথিত আছে, প্রাচীন যুগের এই বেবি অস্টিন গাড়িটি আশি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল, যা আজ ছোট একটি গ্যারেজে রাখা আছে। পাশেই আছে সোনার রথ। দর্শনার্থীদের জন্য দিনের সব সময়ই এটি খোলা থাকে।

IMG_20180407_111551
বহু কম টাকার রথ, তবে সোনার

রঘুনাথ মন্দিরের বিভিন্ন দর্শনীয় বিষয়সমূহ

IMG_20180409_101209
৮০ টাকার অস্টিন, Surajit Maiti র থেকে পেলাম ছবিখানা

বেশ কয়েকটা জায়গা তাড়াহুড়োর সাথে দেখতে দেখতে যখন ক্লান্ত তখন এক্কাগাড়ির চালক হাজারদুয়ারী নিয়ে বলতে শুরু করেছেন, আমরাও গল্প করে যাচ্ছি, ভদ্রলোক রেগে গেলেন। আমরা আবার মনোনিবেশ করলাম। বস্তুত বলে রাখি, অনেকেই হয়তো জানে হাজারদুয়ারী সিরাজের তৈরী, এটা ভাবা বেশ বড়ো ভুল। তৈরী তো নয়ই, বরং উনি কখনো এই অপূর্ব স্থাপত্যটিকে দেখে যেতে পারেন নি জীবনকালে। চালক ই তো জীবন্ত জিপিএস এর মতোই….বলে চলেছেন–

IMG_20180407_120609-01
ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারী

 

১৮৩৭ সালে নবাব নাজিম হুমায়ুন খাঁয়ের জন্য ৮০ ফুট উঁচু তিনতলা গম্বুজওয়ালা এই প্রাসাদ অর্থাৎ হাজারদুয়ারূ নির্মিত হয়। আদপে ৯০০টি দরজা হলেও আরও ১০০টি কৃত্রিম দরজা রয়েছে প্রাসাদে। তাই নাম হাজারদুয়ারি। প্রাচীন মুর্শিদাবাদের স্মৃতি নিয়ে অপরূপ গথিকশৈলীর এই প্রাসাদ এখন মিউজিয়াম। আক্ষরিক অর্থেই এ এক ঐতিহাসিক জাদুঘর। নীচের তলায় রয়েছে তৎকালীন নবাবদের ব্যবহৃত প্রায় ২৭০০টি অস্ত্রশস্ত্র। যার মধ্যে আলিবর্দি ও সিরাজের তরবারি এমনকী যে ছুরিকা দিয়ে মহম্মদি বেগ সিরাজকে খুন করেছিল তা পর্যন্ত রক্ষিত আছে এই সংগ্রহশালায়। এই সুরম্য বিশাল রাজপ্রাসাদের দ্বিতলে দেখা যায় রুপোর সিংহাসন যেটি ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী মহারানি ভিক্টোরিয়ার দেওয়া উপহার। ১৬১টি ঝাড়যুক্ত বিশাল ঝাড়বাতির নীচে সিংহাসনে বসে নবাব দরবার পরিচালনা করতেন। মন্ত্রণাকক্ষের লুকোচুরি আয়না, দেশ-বিদেশ থেকে সংগৃহীত বিশ্ববিখ্যাত সব ঘড়ি, মার্শাল, টিশিয়ান, রাফায়েল, ভ্যান ডাইক প্রমুখ ইউরোপীয় শিল্পীর অয়েল পেন্টিং, প্রাচীন সব পাথরের মূর্তি হাজারদুয়ারিকে বিখ্যাত করে তুলেছে। ত্রিতলে আছে নবাবী আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন সোনা দিয়ে মোড়া কোরাণ শরিফ, অমূল্য পুঁথিপত্র, আইন-ই-আকবরির পান্ডুলিপি সহ অসংখ্য বইয়ের সম্ভার। ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসেরও কিছু বিশিষ্ট নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এই মিউজিয়ামে। হাজারদুয়ারির চত্বরে রয়েছে ১৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে জনার্দন কর্মকারের তৈরি ১৮ ফুট লম্বা, আট টন ওজনের ‘জাহানকোষা’ কামান বা বিশ্বজয়ী কামান। এই কামানে একবার তোপ দাগতে ৩০ কেজি বারুদ লাগত বলে জানা যায়। এটি বাচ্চেওয়ালি কামান নামেও পরিচিত।

IMG_20180407_120703
ঘন্টা

IMG_20180407_120649
১৯৭০ বা ৭১ এ লাস্ট চলেছিলো

IMG_20180407_072514
হাজারদুয়ারীর মেন গেট

IMG_20180407_114629
হাজারদুয়ারী

IMG_20180407_125307
ইমামবারা

 

IMG_20180407_130031
এক গোলার শব্দে অনেক প্রসূতির বাচ্চা নষ্ট হয়, তাই এর নাম বাচ্চেবোলি কামান

 

তবে সবকিছু দেখার পরেও গুগল ম্যাপে একটি বার চোখ রাখলেই অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যায়। এক পাগল হকার আমাদের বলছিলো – ‘এটা মীরজাফর এর এলাকা, গদ্দারী কে করবে না?’ লোকটা বলছিলো – ‘এই শালারা সেখানেই ঘুরতে নিয়ে যাবে যেখানে ঢুকতে টাকা লাগবে, তোমরা চলো, আমি ঘোরাবো গোটা মুর্শিদাবাদ, টাকা লাগবে না!’ বলতে বলতে দেখলাম একজন তেড়ে এলো! এ ঘটনা ঘোরাঘুরির অব্যবহিত পূর্বেই। যদিও তার আগেই সকাল সকাল বাস থামতেই ভাগীরথী নদী, ফেরী ঘাট আর ওয়াসিফ আলি মির্জার বাড়িটা দেখে নিলাম।

ওয়াসিফ ভবনের বিশেষ বিশেষ অংশ

 

ও বলা হয়নি, ভগ্নপ্রায় মীরজাফরের বাড়িটা পড়লো কাঠগোলা আসতে আসতে….. কিন্তু স্রেফ একটা দেওয়াল, এক্কাগাড়ির ঘোড়াটাও দাঁড়ালো না, হয়তো ওরও খেয়াল আছে….ওটা “নিমকহারামের দেউড়ী”…

IMG_20180407_070021_HDR
এবার ফেরার পালা

 

তথ্যসূত্র : এক্কাগাড়ির চালককাকু এবং অবশ্যই ঈশ্বররূপী গুগল

© শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর  // April 9, 2018

“মন্দিরময় পাথরা”, আরো একবার

PANO_20170910_112720

আবার সেই পাথরা, সেই কাঁসাই এর পাড় বরাবর সারি সারি টেরাকোটার নিদর্শন!
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই!
ইয়াসিন পাঠানের আগলে রাখা ‘মন্দিরময় পাথরা’…

IMG_20170910_115804_HDR
পাথরার পথে

কিন্তু এবার আর দ্বিচক্রীকে বাহন করে নয়, ভাদর মাসের তপ্ত রোদের চোখরাঙানির সামনে সাইকেলে করে ১৪ কিমি যাওয়ার ইচ্ছা অবদমিত হতে বাধ্য। যাইহোক, শ্যামলা,  সৌমেন আর শিবাস কে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, ও হ্যাঁ, অটো তে করে। অনেকদিন বেরোয়নি, ওরাও জোর করলো আর বেশ ভালোও হলো। এরপর থেকে প্ল্যানগুলো আশা করি কনভার্ট হবেই!

IMG_20170910_123944_HDR
যে তিনজনের অসম্ভব পুলক না থাকলে আজ যাত্রা হতো না!

***
বছরখানেক আগে একবার গিয়েছিলাম, বহু জীবন্ত জিপিএস কাজে লেগেছিলো। এবার যেনো আমিই ওদের জিপিএস। ঘুরতে ফিরতে বছরখানেক আগের স্মৃতি ফিরে আসছিলো, বইকি!

IMG_20170910_112231_HDR
কেউ কোত্থাও নাই

 

IMG_20170910_122401_HDR
বিচারালয়,

IMG_20170910_121535_HDR
অনেকদিন ধরে চলতিপথে দেখি, আজ পেলাম: “কেউ” বা “কেউমুক” — প্রায় বিলুপ্তির পথে কিন্তু! ধন্যবাদ পাথরা

IMG_20170910_123528_HDR
AAO MILO CHALE

তবে আগের বার এর চেয়ে এবার একটা জিনিস উপরিপাওনা ছিলো সেটা হলো Redmi Note 4 কিন্তু তাতে কি! ভেজা তুলোর ভাসমান মেঘের সেই চীরপরিচিত “শরৎ” স্পেশাল আকাশ উধাও!  যতই রেডমি হোক, ফটোশিকারিদের তো সেই দুর্মূল্য আকাশ সাপ্লাই করতে পারবে না! তাই না? অগত্যা, কিন্তু কিন্তু করে কাজ চালাতে হলো,  আর কি! এবার যে জিনিসগুলো মনে রাখা খুব প্রয়োজন,সেটা হলো, আর যাই ভুলে যান না ক্যানো, একখান গামছা না নিলে খুব কষ্ট করে; কাঁসাইয়ের বুকে ঝাঁপ মারার লোভ সম্বরণ করতে হবে কিন্তু।

*****
জনশ্রুতি মোটামুটি এরকম –

বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দি খাঁ জনৈক বিদ্যানন্দ ঘোষালকে রত্নচক পরগনায় খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে তহশিলদার নিয়োগ করলেন। তিনি ক্রমেই বিশাল ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে ফুলেফেঁপে উঠতে লাগলেন। নবাব আলীবর্দির বিষনজরে পড়লেন! কেন? God Knows!
হয়তো মুর্শিদাবাদের দরবারে উপঢৌকন পৌঁছে দেওয়াতে গাফিলতি হয়েছিল। নবাব হুকুম দিলেন, হাতির পায়ের নিচে ফেলে বিদ্যানন্দ ঘোষালকে থেঁতলে দেওয়া হোক !
কিন্তু  মাহুত শত চেষ্টা করেও হাতিকে একচুল নড়াতে পারল না। হাতির এই মহানুভবতা দেখে নবাব আলীবর্দি খুশি হয়ে বিদ্যানন্দ ঘোষালকে তৎক্ষণাৎ মুক্তি দিলেন ।

বিদ্যানন্দ ও তাঁর উত্তরসূরীরা একের পর এক মন্দির বানিয়েছিলেন পাথরায়। যা কালক্রমে পড়েছে ধ্বংসের মুখে । মন্দিরের ভেতর থেকে মূর্তি লোপাট করেছে চোরেরা। পুজো আচ্চাও হয় না বললেই চলে। বেশিরভাগ মূর্তিই লোপাট।

IMG_20170910_115714_HDR

IMG_20170910_121809

IMG_20170910_122204_HDR
নাটমন্দির, মাদুর থাকলে শুয়ে পড়তাম,ভেতরে

IMG_20170910_122056_HDR
হতে পারে কারাগার, হতে পারে দরবার

এখান থেকেই লড়াই শুরু হলো ইয়াসিন পাঠানের । পাশ্ববর্তী গ্রাম হাতিহল্কায় সাধারণ পরিবারের সন্তান ইয়াসিন। মাত্র ১৭ বছর বয়স থেকেই এই পুরাকীর্তির দিকে তাঁর নিখাদ ভালোবাসা। তাঁর উদ্যোগ, বাঁচাতেই হবে মন্দিরগুলিকে। ১৯৭১ সালে স্থানীয় লোকজনকে সচেতন করে শুরু হলো তাঁর ‘মন্দির বাঁচাও’-য়ের লড়াই। বার বার প্রশাসনের কাছে ধর্না দিয়েছেন। রাজ্য ও কেন্দ্রের কাছে শত শত বার দরবার করেছেন। অনেক লোক তাঁর এই আগ্রহকে প্রথমে ভালোভাবে নেয়নি, পরে অবশ্য ইয়াসিনের প্রচেষ্টা দেখে সবাই ইয়াসিনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

ইয়াসিন পাঠান ১৯৯০ সালে তৈরি করলেন পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ সমিতি। নিজের সামান্য উপার্জনের টাকা খরচ করে দৌড়েছেন কলকাতা-দিল্লি। পকেটের পয়সায় ছেপেছেন লিফলেট । তাঁর কথা জেনে তাঁকে উৎসাহ দিতে এসেছেন তারাপদ সাঁতরা বা ডেভিড ম্যাকাচ্চিয়নের মতো পুরাতাত্ত্বিকেরা। ইয়াসিন পাঠান লিখেছেন পাথরা নিয়ে “মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্ত” এবং “Archeological list and map of district Paschim Medinipur” নামে দুটি বই । অবশেষে ইয়াসিনের প্রচেষ্টা সার্থক হলো, ২০০৩-এ ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ পাথরার ৩৪টি মন্দির অধিগ্রহণ করেছে । ৩৪টির মধ্যে ১৯টির সামান্য সংস্কার হয়েছে।

IMG_20170910_125000_HDRIMG_20170910_112440_HDR

IMG_20170910_122723_HDR

IMG_20170910_115313_HDR
কলাবাগানের সাথে ইতিহাস

তথ্যসূত্র: কিছুটা Google এবং অবশ্যই “মুখপুস্তিকা”।

♦ তবে কি, মন্দির গুলোর বাইরে এবং ভিতরের দেওয়ালে এতো লেখালেখির বহর দেখে একটা জিনিস মনে আসবেই যে, এরা কি খাতা বা স্লেট এ লেখার সুযোগ পাইনি! ক্যামেরাগুলোও খুব চোখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল, সেদিক থেকে।

♦ পথনির্দেশিকা: মেদিনীপুর শহর থেকে ১৪ কিমি দূরে “পাথরা”। মেদিনীপুর বা খড়গপুর থেকে যেকোনো ভাবে আমতলা, অতঃপর অটো! হেলতে দূলতে ঠিক সারিবদ্ধ মন্দির এর সামনে নিয়ে গিয়ে ফেলবে। চিন্তা নেই!!

©শুভঙ্কর দত্ত, September 10, 2017

#মন্দিরময়_পাথরা #dS