শুভ জন্মদিন – কামু মুখোপাধ্যায়….

সত্যজিৎ রায়। হ্যাঁ, ছোটোবেলা থেকে এই একটা পরিচালকের নাম আমাদের সবার চেনা। কত বড়ো মাপের পরিচালক ছিলেন। ধরুন, তারই বাড়িতে একদিন হুট করে চলে গেলেন আনকোরা কোনো অভিনেতা যিনি হয়তো আগে একটি সিনেমাতেই অভিনয় করেছেন। হ্যাঁ, ঠিক এমনটাই করেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। ওনার যে সাহসের ওপর ভর করে সত্যজিৎ রায়ও স্বস্তির ঘুম দিতেন, মানুষটি এরকমই ছিলেন। হঠাৎ করেই একদিন ‘মাণিকদা’র বৈঠকখানায় গিয়ে বলে বসলেন —‘আমি আপনার ছবিতে অভিনয় করতে চাই’। আক্কেলটা ভাবুন খালি। সত্যজিৎ রায় ফিরিয়ে দেননি। “চারুলতা” তে ছোট্ট একটা চরিত্রে সুযোগ দিয়েছিলেন। অতিথি শিল্পীই বলা যায়। অবশ্য তার আগে কামু মুখোপাধ্যায় জীবনের প্রথম অভিনয় করে ফেলেছেন “সোনার হরিণ” চলচ্চিত্রে….. উত্তম কুমার, তরুণ কুমার, ছবি বিশ্বাস, সুপ্রিয়া দেবী, কালী ব্যানার্জি, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কে ছিলো না সেই ছবিতে? তবুও নজর কেড়েছিলেন – ‘আবদাল্লা’!

Kamu's debut

অবশ্য ‘চারুলতা’য় কম স্ক্রিন প্রেজেন্সের জন্য দুঃখ করেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে, উনি বুঝিয়েছিলেনও যে – কম সময়ে মুন্সিয়ানা দেখানোয় আসল কথা। তারপর “নায়ক” মুক্তি পেলো, ভালোই সময় পেলেন কামু, প্রীতিশ সরকার এর স্পেকট্রাম কোম্পানির কথা মনে নেই? তবে সময় অল্প হোক বা বেশি কামু মুখোপাধ্যায় মানেই দারুন স্ক্রিন প্রেজেন্স… মনে আছে ‘হীরক রাজার দেশে’ র সেই পরোয়ানা দেখতে চাওয়া রক্ষীকে? যার উদ্দেশ্যে গুপিবাঘা গাইবে – “ধরো নাকো…. সান্ত্রী মশাই….!” ঐ ছোট্ট একটা রোল, তাতেই কামাল। মগললাল মেঘরাজের ডেরার ‘অর্জুন’কে ভোলার কথা নয় কারো…. কেরামতি দেখে ‘তনখা’ বাড়িয়ে দেয় মগনলাল, সেই ছুরি ছুঁড়ে সার্কাস দেখানো লোকটার ভূমিকাতেও…..,ঐ টুকু সময়েও কি এক্সপ্রেশন! শেষেরটা ছোঁড়ার পরে কোমর ধরে বসে পড়লেন, গোটা শরীরে পদকের ঝনঝন আওয়াজ। শোনা যায় “সোনার কেল্লা” তে একটা দৃশ্য বাদ দেওয়া হয়েছিলো। ‘মন্দার বোস’এর দুঃসাহসিক অভিযানের স্বাক্ষর ছিলো সেটা, খালি বোতলে বিছে ধরার দৃশ্য, সম্পাদকের কাঁচিতে যেটা জায়গা পেয়েছিলো, তাই দুঃখ করেছিলেন তিনি তার প্রিয় মাণিকদার কাছে। আসলে ঐ দৃশ্য একদম সত্যিই ছিলো। এমনই খল – ছল চরিত্রে তাঁর আদবকায়দা শিক্ষনীয় বিষয়।

Kamu as Guard

Kamu as Arjun

264-kamu-mukherjee-sonar-kella-01

Kamu ft Nayak

অভিনীত চরিত্রগুলি যেমন বিচিত্র ছিলো তেমনই ছিলো তার অভিব্যক্তি। এমনি কি আর “ফটিকাচাঁদ” এ হারুন-অল-রশিদ বা ‘হারুন’ ভরসা হয়ে ওঠে ফটিকের…. জাগলার হারুনই বোধহয় কামু মুখোপাধ্যায়কে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছিলেন নিজেকে মেলে ধরার, তাই তো এ চরিত্র বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রিয় সিনেমাপ্রেমীদের। ‘শাখা প্রশাখা’ তে মজুমদার বাড়ির লোকদের দেখা শোনার ভার তার ওপরেই, কতটুকু সময় আর? “সোনার কেল্লা”, “নায়ক” বা “ফটিকচাঁদ” এ কামুকে যতটুকু সুযোগ দিতে পেরেছেন সত্যজিৎ – সন্দীপ রায় মিলে…. ততটাও অন্যান্য পরিচালকরা তাদের সিনেমায় ব্যবহার করতে পারেননি। তবে যত স্বল্প সময়েরই রোল হতো কামু পর্দায় আসলেই একটা আলাদা ভালো লাগা ছিলো। কি তার চাহনি, কি তার সংলাপ ছু্ঁড়ে দেওয়া – সবেতেই যেন সব সময় একটা চ্যালেঞ্জের ছাপ। সত্যজিৎ রায় মারা যাবার পর তাঁর মরদেহের পাশে বসে অঝোর নয়নে কেঁদেছিলেন কামু, সর্বজনবিদিত সে কথা। কাঁদবেন নাই বা কেন — মাণিকদার মতো তাকে কেউ সাহায্য করেননি যে! বলে না ‘জহুরি তে জহর চেনে’, একদম সে রকমই ব্যাপার। কামুর সাহস আর অকুতোভয়ের ওপর ভরসা করে সত্যজিৎ রায় তাকে ইচ্ছেমতো রোল দিতে পারতেন, ছোট্ট একটা চরিত্রে কম সময় হলেও তাকে দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করতেন৷ “গুগাবাবা ট্রিলজি” র সব সিনেমাতেই তিনি আছেন কিন্তু চিনতে গেলেই হার মেনে যাবো আমরা। যেমন “গুপি বাঘা ফিরে এলো” তে ‘হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার’ বলে দৌড়ে যাচ্ছে গুপি আর বাঘা, পালকির ভেতরে এক রাজা আঙুর খেতে খেতে স্তব্ধ। মনে আছে নিশ্চয়? ভেবে দেখেছেন কি ঐ ছোট্ট একটা দৃশ্য, তাও কতটা স্মরণীয়, সৌজন্যে – অবশ্যই কামু মুখোপাধ্যায় ! “শতরঞ্জ কি খিলাড়ি” তেও আছেন। অন্যান্য পরিচালকরা তেমন উড়তে দেননি তাকে, সে “হংসরাজ” ছবিতে ‘দালাল’ হোক্ বা গৌতম ঘোষের “পার” ছবিতে পাটকলে কাজ দেওয়া ‘সর্দার’ এর চরিত্র – সবকটায় ছোটো, তবে ফ্রেমে এলেই আলাদা করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেন।

Kamu in HansarajKamu as kingKamu as SardarKamu in Sakha Prasakha

Kamu as Harun
ফটিকের হারুন…

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একটা সুযোগ দিয়েছিলেন, তার ”ফেরা” চলচ্চিত্রে, নাট্যদলের মালিকের ভূমিকায়। জমিয়ে দিয়েছিলেন, “মৌচাক” সিনেমাতেও, ঐ দেড় মিনিট – সুপারভাইজারের মাথা ম্যাসেজ করতে দেখবেন। বাংলা সিনেমাতে চরিত্রাভিনেতাদের রমরমা চিরকালই, নায়কদের ছাপিয়ে তারা জায়গা করে নেন। কিন্তু এই কামু ব্রাত্যই থেকে গেলে, স্বল্প সময়ে ওরকম স্ক্রিন প্রেজেন্স দিয়েও অন্যান্য বাঘা বাঘা পরিচালকরা তাকে সুযোগ তেমন দিতে আর পেরেছিলেন কোথায়? সে কথা টের পেয়েওছিলেন তিনি, নিজে মজা করে বলতেনও সে কথা – “মন্দার বোসের বাজার মন্দা”! সত্যজিৎ রায় খুব ভালোবাসতেন তার ‘মন্দার বোস’ কে। উনি মারা যাবার পর সেভাবে কামু মুখোপাধ্যায় সুযোগ পেলেন না, সন্দীপ রায়ও মনে রাখেননি। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তখনই হারিয়ে ফেললো প্রতিভাবান, অসমসাহসী এই অভিনেতাটিকে, যিনি বারবার দুঃখবোধ করেছেন স্বচ্ছন্দে জায়গা না পাওয়ার জন্য…. অথচ দেখুন কোনো নায়কের অভিনয়ে তাঁর অভিনীত চরিত্র ঢেকে যায়নি, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন সেই নামও কেউ কেউ এখনও মনে রেখেছেন, এটা হয়? এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পেরেছিলেন কামু মুখোপাধ্যায়। আজ তাঁরই জন্মদিন। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের স্বর্ণযুগের প্রতিভাবান এবং প্রভাবশালী অতিথি শিল্পীকে তাই প্রণাম জানাই।

Kamu @ mouchak

সূত্র:: একাধিক ম্যাগাজিন এবং আমার দেখা সিনেমা

© শুভঙ্কর দত্ত || রামজীবনপুর || June 14, 2020

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s